খান আসাদ: বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতি ক্যন্সারের মতো

খান আসাদ: ইউরোপে লিবারেল ও বামেরা একটি আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি মুসলমানদের নিয়ে। এরা সব সময় ‘মুসলমানদের’ সহায়তা করেছে, কারণ এরা বহুজাতিক সমাজের স্বপ্ন দেখে, একটি বহুজাতি ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে। কেন করে? তার জবাব ইউরোপের ইতিহাসের ভেতরে আছে। জাতিগত বা সংস্কৃতির পার্থক্যকে, ব্যবহার করা হয়েছে সহিংসতার জন্য। ফ্যাসিস্টরা এটা করেছে। ইউরোপীয় লিবারেল ও বামপন্থীরা ফ্যাসিজম থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এরা আর জাতি বা সংস্কৃতি ঘৃণায়, তথা আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু এখন শাদা বর্ণবাদী নিওনাৎসিদের উত্থান ঘটছে। এরা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ধারনায় বিশ্বাসী নয়। নিওনাৎসিদের উত্থানে ‘রাজনৈতিক ইসলামের’ বা ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের একটি ভূমিকা আছে। ফলে ইউরোপে ‘ইসলাম বা মুসলমান’ নিয়ে যে রাজনীতি, ডান ও বামের, সেটি একেবারেই ইউরোপীয়দের নিজেদের ঘরের রাজনীতি।
ভারতীয় উপমহাদেশ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। পাকিস্তানে ও ভারতে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রধান্যে। বাংলাদেশেও সাম্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতি ক্যন্সারের মতো। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ের রাজনীতিও ফ্যাসিবাদ। মুক্তিযুদ্ধ না হলে, আমরা হয়তো আফগানিস্তানের চেয়েও খারাপ অবস্থায় থাকতাম। ভুলভাবে ‘ইসলাম বা মুসলমানকে জাতীয় পরিচয় হিসেবে ভাবা হচ্ছে, ইউরোপেও। জাতি ও ধর্মসম্প্রদায় যে আলাদা তা গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। ‘আরবীয়’ না বলে ‘মুসলমান’ বলা হয়। ‘ইসলাম ভার্সেস ওয়েস্ট’ একটি সাধারণীকৃত আরোপিত ধারণা, যা ছিলো একটি কৌশল আড়াল করার, একাধারে সাম্রাজ্যবাদ অন্যধারে বিভিন্ন জাতির স্বকীয় সংস্কৃতিকে। সাম্রাজ্যবাদী বুদ্ধিজীবীদের এই ফাঁদে পা এডোয়ার্ড সাইদের মতো বামপন্থীও দিয়েছেন। উদহারণ সাঈদের বইয়ের শিরোনাম Covering Islam অথবা আহমদ ছফা বাঙালি ‘মুসলমানের’ মন খোঁজেন।
ইউরোপে এখন লিবারেল ও বামদের আত্মজিজ্ঞাসার পর্ব চলছে। ফ্রান্সের ঘটনার আগে থেকেই, মাল্টিকালচারালইজমের পক্ষে এবং ‘ইসলামোফোবিয়ার’ বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা কি আসলে তাদের নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে কিনা। ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে, সংস্কৃতির নামে ‘রাজনৈতিক ইসলামকে’ ভুলভাবে সংস্কৃতি ভেবে, এর ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে আড়াল করছে কিনা। বৈধতা দিচ্ছে কিনা অন্য অঞ্চলের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে। ব্যাপারটা এরকম যে ডানপন্থীরা যখন মুসলমানদের ডেমোনাইজ করছে বা সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করছে, লিবারেল ও বামপন্থীরা তখন ‘মুসলমানদের’ রোমান্টিসাইজ করছে। ‘ইসলামী’ গান কতো সুন্দর এবং ‘ইসলামী’ কাবাব কতো ভালো, সেই আলাপ করছে। এর মাঝে হারিয়ে যাছে, আরবি, পার্সি, বিহারি বা বাঙালি জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয়।
গান ও খাবার ‘ইসলামী’ হয়ে যাচ্ছে। বামেরা আসলে, সাম্রাজ্যবাদ ও রাজনৈতিক ইসলামের দেওয়া আত্মপরিচয়ের রাজনীতির মধ্যে আটকে গেছে কিনা, আত্মজিজ্ঞাসা সেখানে। সবাই না। অনেকেই স্থানীয় ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার সাথে বৈশ্বিকভাবে সকল ধরনের ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার জ্ঞান রাখেন। ‘মুসলমান’ আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করাটা এখন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে অমর্ত্যসেনের Identity & Violence খুব কাজের বই। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি, সেটা আজ বিশ্বব্যাপী। বহুত্ববাদী আত্মপরিচয় ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিকল্প দরকার। যে বিকল্প বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্তি দেবে, শুধু ইউরোপীয়দের নয়, আরবীয় বা ভারতীয়দের নয়, সকল মানুষকে। আজকে তাই সেই বৈশ্বিক বদলের রাজনীতি চাই, বৈশ্বিক সংহতির ভিত্তিতে। Leave No One Behind. ফেসবুক থেকে
No comments:
Post a Comment