মেয়েদের সমস্যা নিয়ে মেয়েটা অনেকক্ষণ আমার উপর মনের ঝাল ঝাড়ল। চারদিকে বদ পুরুষ তাকে লক্ষ্য করেই যেন প্রতিদিন পরিকল্পনা করে বাইরে বের হয় এমন একটা নিশ্চিত ধারণা তার। মেয়েটা ভালো ছাত্রী ছিল। এখন একটা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। তার দিনের আট ঘণ্টা যায় টেলিফোনে ক্লায়েন্টদের কারিগরি প্রশ্নের জবাব দিতে। দেড় দেড় তিন ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকে। আট ঘণ্টা ঘুম আর তিন ঘণ্টা ফেসবুক বা টিভির সামনে। বাকি দু’ঘণ্টা প্রাত্যহিক অন্যান্য রুটিন কাজ।
মেয়াটার রান্না করে বুয়া, গাড়ি চালায় ড্রাইভার। আমাকে বলল ভাইয়া কিছুই ভালো লাগে না, কোনো কিছুতে উৎসাহ পাই না। স্বপ্ন হচ্ছে শুধু বৃষ্টিতে ভিজতে আর সাইকেল চালাতে পারা। আমি বললাম সাইকেল চালাতে বা বৃষ্টিতে ভেজা স্বপ্ন কেন? বাস্তব করতে সমস্যা কী? বলল কোথায় ভিজব, কোথায় চালাব। করা হয় না। দেশটা মেয়েদের উপযুক্ত না।
আমি বললাম তোমার দিনের ২৪ ঘণ্টায় একটি কাজও নেই যেটা নতুন। যেটা তোমার পরিকল্পনা, তোমার সিদ্ধান্তে তুমি কর, তোমার কৃতকর্মের ফলাফল পেয়ে তুমি খুশি হও। সামান্য কাজও যদি মানুষ নিজের মন থেকে করে সেটাতে বাস্তব ফলাফল মেলে, আত্মা পরিতৃপ্ত হয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
আমাদের মায়েরা, খালারা যারা শুধু রান্না করত, তারা নিজের পরিকল্পনায় সেটা করত। ভালো হলে আত্মতৃপ্তি পেত। খারাপ হলে ভালো করার চেষ্টা করত। তাতে সফল হতো। এটাই আত্মিক সুখ। বইয়ে বা ম্যানুয়ালে লেখা পদ্ধতি অনুসরণ করে নাসায় কাজ করেও যেটা পাওয়া যায় না। অনেক টাকা পাওয়া যেতে পারে, সেটা দিয়ে দামি বাড়ি, গাড়ি বা ছুটি কাটাতে হাওয়াই দ্বীপে পাড়ি দেওয়া যেতে পারে কিন্তু তাতে স্বল্প সময়ের জন্য একঘেঁয়েমি ভুলে থাকা যায় কিন্তু বেঁচে থাকার উদ্যোগ বা আনন্দ কোনোটাই বাড়ে না।
আমি বললাম তুমি অন্তত সাইকেল চালানোটা শুরু কর। আমাদের মস্তিষ্কের নানা অংশ থাকে। কোনটা গণিতে পারদর্শী, কোনটা ভাষায়, কোনটা কল্পনায় আবার কোনটা হাতের কাজে। কোনো একটি কাজে পারদর্শিতা থাকলে বা সেটাই প্রতিদিন করলে মস্তিষ্কের অন্য অংশে জং ধরে যেতে থাকে। নানা অংশের সংযোগগুলো সক্রিয় না থাকলে নতুন সংযোগ তৈরি হয় না বা পুরোনো সংযোগগুলো মরে যেতে থাকে।
যারা শুধু কেতাবি প্রকৌশলবিদ্যা বা বিশেষায়িত কাজ করছে তাদের এমন হবার সম্ভাবনা বেশি। রান্না এমন একটি কাজ যেখানে মস্তিষ্কের পরিকল্পনা, আন্দাজ, হাতের কাজ, স্বাদের বোধ এবং ফলাফল উপভোগ, ভ্রান্তি সংশোধন—এই সবগুলো অংশ জড়িত থাকে। এর ফলে এটা আত্মবিশ্বাস যতটা বাড়ায়, শুধু রুটিন গণিত কষা সেটা নাও করতে পারে। সেই কারণেই সব আধুনিক সমাজেই মানুষের বিভিন্ন জটিল শখ থাকে। পেশাগত কাজের বাইরেও তারা সেই শখ বেছে নেয় যাতে মস্তিষ্কের অক্রিয় অংশগুলো সক্রিয় থাকে।
সাইকেল চালানো এমনই একটা সমন্বিত কাজ মস্তিষ্কের জন্য। এতে প্রতিটা মুহূর্তে চালককে সিদ্ধান্ত নিতে হয় রিকশাটা এই গতিতে আসছে, পেছনে একটা গাড়ি আছে এই মুহূর্তে সে কী করবে। এই সিদ্ধান্ত সাদা চোখে খুবই অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে কিন্তু এতে নিউরাল পাথওয়েগুলো ব্যবহৃত হয় যেখানে পরিস্থিতি বিবেচনা, দক্ষতা পরিমাপ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ফলাফল—এই সমন্বিত চর্চা হয়।
মেয়েটাকে বললাম মস্তিষ্কের একটি অংশ শুধু ব্যবহৃত হতে থাকলে বাকি অংশগুলো শিশুকালে ফিরে যায়। তখন মানুষ যা বলে তাই বিশ্বাস হয়। নিজের ব্যক্তিত্ব আর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়। আনন্দ বেদনা শুধু প্রতিযোগিতা, হিংসা, টাকা আর বস্তুগত চাওয়া-পাওয়া আর শপিংয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যায় আর পরিণত বয়সে ভুয়া হাদিসের ধর্মই হয়ে ওঠে একমাত্র লেবাস কারণ বাকি সবকিছুতে সে হেরে গেছে মনে করে।