"পরকীয়া অত্যন্ত জরুরি জিনিস” - এই মর্মে একটি ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে জেনেটিক্স ও প্রাণী আচরণের নামে এমন কিছু দাবি করা হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আংশিক ও খণ্ডিত উপস্থাপনা মাত্র।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। “পরকীয়া” মূলত একটি আইনগত ও সামাজিক পরিভাষা, যা বৈধ বিবাহ বা বৈবাহিক চুক্তি ভঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক চুক্তি ভঙ্গকে কখনোই “অত্যন্ত জরুরি জিনিস” বলা যায় না।
হয়তো বক্তা এখানে পরকীয়া বলতে বহুগামিতা (পলিগামি) বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু জিনবিদ্যা বা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান কোথাও বলে না যে বহুগামিতা মানুষের জন্য অপরিহার্য বা সর্বোত্তম প্রজনন কৌশল।
অনেকে দাবি করেন, “বহুগামিতা জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ায়, তাই এটি ভালো” এবং “প্রাণীজগতেও তো এমনটাই দেখা যায়।” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল ও একমাত্রিক নয়। জিনগত বৈচিত্র্য, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানুষের মানসিক দক্ষতা এবং প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য কাজ করে।
প্রথম সমস্যা হলো, মানব সমাজে বহুগামিতা সাধারণত সমানভাবে বিস্তৃত হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা শারীরিকভাবে প্রভাবশালী পুরুষ এবং তুলনামূলকভাবে অধিক আকর্ষণীয় নারীদের মধ্যেই এটি কেন্দ্রীভূত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিক স্বাধীন পশ্চিমা সমাজগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বহু যৌনসঙ্গী থাকার প্রবণতা পুরো জনগোষ্ঠীতে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে না; বরং একটি অপেক্ষাকৃত ছোট অংশের মধ্যেই তা কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে বহুগামিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করে - এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
জিনগত বৈচিত্র্য অবশ্যই একটি প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি নতুন পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন বা নতুন রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অভিযোজনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে তাই বলে বৈচিত্র্য যত বেশি, ততই ভালো - এমন ধারণাও সঠিক নয়। যেমন আত্মীয়দের মধ্যে প্রজননের ফলে ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন যেমন হতে পারে, তেমনি অত্যন্ত দূরবর্তী জিনগত মিশ্রণেও আউটব্রিডিং ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি এখানে ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করে।
প্রাণীজগতে বহুগামিতা যেমন প্রচলিত, তেমনি বহু প্রজাতিতে একগামিতাও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত। উল্লুক, বহু প্রজাতির পাখি এবং কিছু কুকুরজাতীয় প্রাণী দীর্ঘমেয়াদি যুগল-বন্ধন গড়ে তোলে। এটি প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট পরিবেশে একগামিতাও একটি সফল বিবর্তনীয় কৌশল হতে পারে।
মূল বিষয় হলো, জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ানোর জন্য বহুগামিতা একমাত্র বা সর্বোত্তম উপায় নয়। জনসংখ্যার মধ্যে অভিবাসন, জিন-প্রবাহ (gene flow) এবং সময়ে সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃপ্রজননও একই ভূমিকা পালন করে।
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের মিলন কৌশলও একমাত্রিক নয়। মানুষ একটি মিশ্র প্রজনন কৌশল অনুসরণকারী প্রজাতি। পুরুষের ক্ষেত্রে কিছু মাত্রায় বহুগামিতার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ পুরুষের প্রজনন সাফল্যের তারতম্য সাধারণত নারীর তুলনায় বেশি।
মানুষের সন্তানের আছে দীর্ঘতম শিশুকাল। যা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পরিচর্যানির্ভর সন্তান লালন পালনের উদাহরণ। তাকে বড় করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, শিক্ষা ও সম্পদের প্রয়োজন হয়। ফলে পরিবারে পিতার বিনিয়োগও বিবর্তনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই সামাজিক একবিবাহ বা স্থিতিশীল যুগল-বন্ধন একটি শক্তিশালী অভিযোজন হিসেবে গড়ে উঠেছে। অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্রেসিনের মতো যুগল-বন্ধনকারী হরমোন এবং সামাজিক নিয়ম—উভয়ই এই বন্ধনকে শক্তিশালী করে।
প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ভারসাম্য। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত জিনগত বৈচিত্র্য, সংক্রামক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি হ্রাস, সন্তানের কার্যকর লালন-পালন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। শুধু একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্যগুলোকে উপেক্ষা করলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এই কারণেই প্রকৃতিতে কোনো একক প্রজনন কৌশল সর্বজনীনভাবে বিজয়ী নয়। কোথাও বহুগামিতা, কোথাও একগামিতা, আবার কোথাও পরিবেশভেদে নমনীয় কৌশল দেখা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু সমাজে একবিবাহ শুধু নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে নয়, বরং রোগ নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের তুলনামূলক সুষম বণ্টন এবং সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি লালন-পালনের জন্য একটি কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় শুধু জিনগত বৈচিত্র্যই যথেষ্ট নয়। মানুষের শিশুর শৈশব অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক দীর্ঘ। একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে পরিণত হতে প্রায় ১৫–২০ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে সে ভাষা, সহযোগিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিয়ম, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বন্দ্ব মোকাবিলার মতো দক্ষতা মূলত পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেই শেখে। এর কারণ হল মানুষ কগনিটিভ প্রাণী। অর্থাৎ তার বেঁচে থাকায় জিনের সমান গুরুত্বপূর্ণ হল তার চিন্তা ও আচরণগত শিক্ষা যেটা সে দীর্ঘ শিশুকালে শেখে। প্রাণীজগতে উল্লুকেরও আছে মানুষের কাছাকাছি শিশুকাল। এটা আশ্চর্য নয় যে প্রকৃতিতে তারাও একাগামী জীবন যাপন করে।
মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংগ্রামের চেয়ে সামাজিক দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই দক্ষতাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে বিকশিত হয় একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং ধারাবাহিক পারিবারিক পরিবেশে। ঘন ঘন সম্পর্ক পরিবর্তন, পরিবার ভাঙন বা অস্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ এই শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির **অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্ব** অনুযায়ী, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর সঙ্গে প্রধান পরিচর্যাকারীর নিরাপদ ও ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা তার মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। এই নিরাপদ সংযুক্তি থেকেই শিশুর নিরাপত্তাবোধ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক গড়ার সক্ষমতা জন্ম নেয়। এই সম্পর্কের জন্য ধারাবাহিক উপস্থিতি, পরিকল্পিত পরিচর্যা এবং মানসিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে পিতার ভূমিকাও কেবল অর্থনৈতিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা যায়, একজন সক্রিয় ও স্থিতিশীল পিতৃচরিত্র শিশুর আত্মবিশ্বাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা, অধ্যবসায়, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষাগত সাফল্যের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। পিতা অনেক সময় শিশুকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করেন। বিপরীতে, পিতার দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি বা অস্থিতিশীল উপস্থিতি এসব বিকাশকে দুর্বল করতে পারে।
এই কারণেই মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসে সামাজিক একগামিতা বা স্থিতিশীল যুগল-বন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও মানুষের মধ্যে বহুগামিতার জৈবিক প্রবণতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
সবশেষে বলা যায়, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য শুধু জিনগত বৈচিত্র্যই যথেষ্ট নয়। সমানভাবে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা পরবর্তী প্রজন্মকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল, সামাজিকভাবে দক্ষ, সহযোগিতাপূর্ণ এবং প্রতিকূলতার মুখে সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। বিবর্তন আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল কোনো চরমপন্থা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য।