ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. ইসরাফিল প্রাং এর বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত একটি কথা আমাকে বিশেষভাবে ভাবিয়েছে, “আমার পরিবারের কোনো নারী রাতে ১০টার পর বাইরে থাকেন না।”
রাত দশটার ব্যাপারটা বেশ রহস্যময়। একজন নারী ৯টা ৫৯ মিনিটে যদি দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হন, তাহলে ১০টা ১ মিনিটে ঠিক কোন constitutional transformation ঘটে যে তাঁকে আর নিজের হলে ঢোকার সিদ্ধান্তটুকুও স্বাধীনভাবে নিতে দেওয়া যায় না? ঘড়ির কাঁটা দশটা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের adulthood এর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়?
যদি তাই হয়, তাহলে ভর্তি ফরমের সঙ্গে ছোট অক্ষরে লিখে দেওয়া উচিত, “আপনার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকত্ব প্রতিদিন রাত ১০টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
আর “আমার পরিবারের কোনো নারী রাত দশটার পর বাইরে থাকেন না”, এইটা যদি পাবলিক পলিসি তৈরির গ্রহণযোগ্য যুক্তি হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে অযথা জটিল রাখারই বা প্রয়োজন কী?
একাডেমিক কাউন্সিল, সিন্ডিকেট, স্ট্যাটিউটস রেগুলেশনস, কনস্টিটিউশনাল প্রিন্সিপলস, এসবের বদলে প্রত্যেক প্রশাসকের পারিবারিক রুটিন সংগ্রহ করলেই তো একটি পূর্ণাঙ্গ গভর্নেন্স ম্যানুয়াল তৈরি হয়ে যায়।
একজনের পরিবারের মেয়েরা দশটার পর বের হন না, আরেকজনের পরিবারের মেয়েরা হয়তো জিন্স পরেন না, তৃতীয়জনের পরিবারের মেয়েরা পুরুষ সহপাঠীর সঙ্গে কফি খান না। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে সেটির নাম দিতে পারে- Personal Household Values-Based Higher Education Policy.
একজন ব্যক্তি তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য কী ধরনের জীবনযাপন উপযুক্ত মনে করেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়। কিন্তু একজন প্রক্টরের পরিবারের নারীরা কখন বাড়ি ফেরেন, সেটি একটি রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ক নারী শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা নির্ধারণের কোনো নীতিগত, আইনগত বা সাংবিধানিক মানদণ্ড হতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পারিবারিক অভিভাবক না। একজন প্রক্টর কোনো শিক্ষার্থীর বাবা, ভাই বা স্বামী নন। নারী শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি কারও “মা-বোন” পরিচয়ে। তাঁরা ভর্তি হয়েছেন শিক্ষার্থী, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং নাগরিক হিসেবে।
নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার “আমাদের মা-বোন” বলা আপাতদৃষ্টিতে সম্মানসূচক শোনালেও এর মধ্যে একটি গভীর paternalistic politics আছে। এই কথাটিও শুনতে খুব সিনেম্যাটিক মমতাময়ী শাবানা টাইপ।
কিন্তু একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নাগরিক থেকে “মা-বোনে” রূপান্তর করার এই সাংস্কৃতিক দক্ষতা সত্যিই বিস্ময়কর। বাংলাদেশে নারীর স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ট্র্যাজেডি এই যে, তাঁকে এত বেশি “সম্মান” করা হয় যে মাঝে মাঝে স্বাধীন হওয়ার জায়গাটাই আর থাকে না। তাঁকে বেদিতে তুলে রাখব, রক্ষা করব, সম্মান করব, শুধু নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মতো করে মাটিতে নামতে দেব না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ নারী-পুরুষের সমতার কথা বলছে, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ আইনানুগ আচরণ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলছে, ৩৬ অনুচ্ছেদ যুক্তিসংগত আইনগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে চলাফেরার স্বাধীনতার কথা বলছে।
আর তার বিপরীতে প্রশাসনিক যুক্তি যদি দাঁড়ায়, “কিন্তু আমাদের বাড়ির মেয়েরা তো দশটার পর বের হয় না”, তাহলে আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য এটা অন্তত অসাধারণ একটা কেস স্টাডি হতে পারে: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণে সংবিধান বনাম বাসার নিয়ম- কোনটির ওজন বেশি?
তবে এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে আবাসিক হলে কোনো নিয়ম থাকতে পারবে না। বিশ্ববিদ্যালয় হল কোনো হোটেল নয়; সমষ্টিগত আবাসিক জীবনের জন্য প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, দর্শনার্থী নীতি, পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা, সবই প্রয়োজন।
কিন্তু যুক্তিসংগত নিয়ন্ত্রণ আর লিঙ্গভিত্তিক অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্ব এক জিনিস না। নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর চলাচলের ওপর যদি উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন মাত্রার বিধিনিষেধ ও দায় চাপানো হয়, তাহলে শুধু “এটাই হলের নিয়ম” বলে আলোচনা শেষ করা যায় না।
আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো, রাত দশটার পর আসলে কী ঘটে? নিরাপত্তা যদি প্রকৃত যুক্তি হয়, তাহলে কারফিউ নিরাপত্তার একটি অদ্ভুত সংজ্ঞা। কারণ গেট বন্ধ করলে ক্যাম্পাস নিরাপদ হয় না। বরং দেরিতে ফেরা একজন নারী শিক্ষার্থীকে গেটের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে কোনো ফ্লোর টিচার বা হল প্রশাসকের ফোন ধরার অপেক্ষায় রাখা তাঁর নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়াতে পারে। নিরাপত্তার নামে যে ব্যবস্থা একজন নারীকে অপেক্ষাকৃত অনিরাপদ অবস্থায় ফেলে, সেটিকে নিরাপত্তানীতি বলার আগে নিয়ন্ত্রণনীতি কি না, সেটাও পরীক্ষা করা দরকার।
একটা খুব সাধারণ উদাহরণ ধরা যাক। একজন ছাত্রী সন্ধ্যায় লাইব্রেরিতে থিসিস বা গবেষণা নিয়ে কাজ করছেন। কেউ নাটকের রিহার্সাল করছে। কেউ ডিবেটিং কম্পিটিশন এ অংশ নিয়েছে। কেউ ডিপার্টমেন্টাল প্রোগ্রাম বা সেমিনার এ ছিল।কেউ টিউশন করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালায়। কেউ সাংবাদিকতা করে। কেউ রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাজে ছিল। কেউ অসুস্থ বন্ধুকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। আর ঢাকা শহরের যানজট তো আলাদা বাস্তবতা। এসব কাজের কোনটি রাত দশটার পর হঠাৎ অনৈতিক হয়ে যায়?
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পুরুষ শিক্ষার্থী রাত পর্যন্ত লাইব্রেরিতে থাকতে পারেন, বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দিতে পারেন, রাজনৈতিক সভা করতে পারেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন। তাঁর রাতের ক্যাম্পাস, ফ্রেন্ডশিপ, নেটওয়ার্কিং, পলিটিক্স, ইন্টেলেকচুয়াল এক্সচেঞ্জ- সবই ইউনিভার্সিটি লাইফ এর অংশ।
কিন্তু একজন নারীকে যদি দশটার মধ্যে হলে ফেরার জন্য নিজের একাডেমিক এবং সোশ্যাল লাইফ অরগানাইজ করতে হয়, তাহলে আমরা তাঁর চলাচল সীমিত করছি, এবং একই সাথে আমরা তাঁর university experience, social capital, networking, cultural participation, political participation এবং public-space citizenship ও সংকুচিত করছি।
বৈষম্য শুধু হলের গেটে ঘটে না। তার প্রভাব ভবিষ্যতের opportunity পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। Feminist geography আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝিয়েছে, space কখনো gender-neutral না। কে কোথায় যেতে পারে, কখন যেতে পারে, কতক্ষণ থাকতে পারে এবং উপস্থিত থাকার জন্য কাকে explanation দিতে হয়, ক্ষমতা এসবের মধ্যেও কাজ করে।
“রাত নারীদের জন্য নিরাপদ নয়”, এই কথা যদি আমরা অপরিবর্তনীয় সামাজিক সত্য হিসেবে মেনে নিই, তাহলে সমস্যার সমাধান করার বদলে সমস্যাটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিই। পাবলিক স্পেস কে নারীর জন্য নিরাপদ করার বদলে নারীকে পাবলিক স্পেস থেকে সরিয়ে দিই।
সমস্যা হয়রানি? সমাধান:মেয়েকে ঘরে ঢোকাও।
সমস্যা অনিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা? সমাধান:মেয়েকে আগে ফিরতে বলো।
সমস্যা অপর্যাপ্ত ক্যাম্পাস নিরাপত্তা? সমাধান:মেয়েদের হলের গেট বন্ধ করো।
অপরাধীর চলাচলের স্বাধীনতা অক্ষত থাকে, কিন্তু ভুক্তভোগীর চলাচলের ওপর কারফিউ বসে। এটা নিরাপত্তার রাজনীতি না, এটা victim management।
এখানে সাংবিধানের সমান অধিকারের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি নারী ও পুরুষের জন্য বাস্তবে ভিন্ন মাত্রার স্বাধীনতা তৈরি করে, তাহলে শুধু কাগজে-কলমে সমতা, “দুজনেই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী”যথেষ্ট না।
দেখতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের প্রকৃত চাপ ও সীমাবদ্ধতা কার ওপর পড়ছে। একজনের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন যদি অবাধ প্রাপ্তবয়স্ক স্বাধীনতার ওপর দাঁড়ায়, আর অন্যজনের প্রাপ্তবয়স্ক জীবন যদি প্রতিনিয়ত অনুমতিনির্ভর হয়, তাহলে সেখানে সমতার প্রশ্ন উঠবেই।
এখানে একজন প্রক্টরের ভূমিকা নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রক্টরিয়াল বিধিমালায় প্রক্টরের দায়িত্বকে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও আচরণ এবং ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা রক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত বর্ণনায় প্রক্টরিয়াল এখতিয়ারও আবাসিক হলের বাইরের ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের আচরণ ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একজন প্রক্টরের কাজ শিক্ষার্থীদের নৈতিক অভিভাবক হয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তবয়স্কত্বের সীমারেখা নির্ধারণ করা না। তাঁর কাজ নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, অধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
আর একজন শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বটি আরও বড়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটা জায়গা, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে নিজের বিচারবোধ ব্যবহার করতে শেখে, কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করতে শেখে, মতবিরোধ সামলাতে শেখে এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় নিতে শেখে। বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক সেই জায়গা, যেখানে অভিভাবকত্বের ধারণা ধীরে ধীরে নাগরিকত্বের ধারণাকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার কথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণে ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের পর গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও স্বায়ত্তশাসনকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করে।
সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই ২০২৬ সালে এসে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশাসনিক যুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়, “আমার পরিবারের নারীরা এটা করেন না”-
তাহলে আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীন ও স্বশাসিত নাগরিক গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখি, নাকি একটি বৃহৎ পারিবারিক বাড়ি হিসেবে, যেখানে প্রশাসকের ব্যক্তিগত পারিবারিক মূল্যবোধই হাজার হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রাপ্তবয়স্কত্ব, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার সীমারেখা নির্ধারণ করবে?
আমি বরং একজন প্রক্টরের কাছ থেকে অন্য ধরনের কথা শুনতে চাই-
-রাত দশটার পর নারী শিক্ষার্থীরা কি নিরাপদে হলে ফিরতে পারছে?
-ক্যাম্পাসের কোন জায়গাগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই? যথেষ্ট নিরাপত্তা টহল কি আছে?
-রাতে নিরাপদ পরিবহন কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?
-হয়রানির অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কি কার্যকর?
-জরুরি পরিস্থিতিতে হলে প্রবেশ কেন একজন শিক্ষক ফোন ধরবেন কি না, তার ওপর নির্ভর করবে?
-রাতে শিক্ষা, গবেষণা বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম শেষে ফেরা শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল প্রবেশব্যবস্থা বা নিবন্ধনপদ্ধতি কি চালু করা যায়?
-নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তথ্য-প্রমাণনির্ভর, নারী-পুরুষের সমতার প্রতি সংবেদনশীল নীতিমালা কি তৈরি করা যায়?
এগুলো একজন প্রক্টরের কাজ। “আমার মা-বোন কখন বাড়ি ফেরেন”- এটা না।
নারী স্বজনদের হলে প্রবেশ, এক হলের শিক্ষার্থীর অন্য হলে যাওয়া কিংবা অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও সার্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রশাসনিক চিন্তার একমাত্র সমাধান হতে পারে না।
পরিচয় যাচাই করা যায়, দর্শনার্থীদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা রাখা যায়, নির্দিষ্ট সাধারণ স্থান নির্ধারণ করা যায়, জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমের সুযোগ রাখা যায়, ডিজিটাল প্রবেশের নথি সংরক্ষণ করা যায়। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অর্থ হলো ঝুঁকির উৎস চিহ্নিত করে তার মাত্রা অনুযায়ী যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক ব্যবস্থা নেওয়া। সবাইকে আটকে দেওয়া কোনো উন্নত নিরাপত্তানীতি না ।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর সম্মানযোগ্যতার ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর স্থানিক শৃঙ্খলা ও চলাচলের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। “ভালো মেয়ে” কোথায় যায়, কার সঙ্গে যায়, কী পরে, কতক্ষণ বাইরে থাকে, কখন বাড়ি ফেরে, এসব দিয়েই তাঁর চরিত্রের সামাজিক মূল্যায়ন করা হয়। একজন পুরুষ রাত বারোটায় ফিরলে প্রশ্ন হতে পারে, “এত দেরি হলো কেন?” একজন নারী একই সময়ে ফিরলে প্রশ্নটি খুব সহজেই বদলে যায়, “এত রাতে বাইরে কী করছিলে?”
সময় একই। নাগরিকত্ব একই। কিন্তু moral judgement আলাদা। আমরা মেয়েদের বলি, পড়াশোনা করো। গবেষণা করো। নেতৃত্ব দাও। রাজনীতি বোঝো। ডিবেট করো। কালচারাল লাইফ এ অংশ নাও। পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হও। পৃথিবী বদলাও। তারপর রাত দশটায় বলি, এবার গেটে ফিরে এসো। তোমার পৃথিবী বদলানোর সময় শেষ।
বেগম রোকেয়া বেঁচে থাকলে ‘অবরোধবাসিনী’ নামটি দেখে হয়তো অবাক হওয়ার চেয়ে continuity টাই বেশি চিনতেন। একসময় নারীকে অন্দরমহলে রাখার যুক্তি ছিল ইজ্জত ও নিরাপত্তা। এক শতাব্দী পরে আমরা শব্দভাণ্ডার মডার্নাইজ করেছি, এখন বলি পলিসি, ডিসিপ্লিন , সেফগার্ডিং, সিকিউরিটি। সফটওয়্যার আপডেট হয়েছে; অপারেটিং সিস্টেম বদলায়নি।
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত? বেশ ভালো কথা। কিন্তু তাঁর স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বানাচ্ছেন কেন?
নারীকে নিরাপদ রাখা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, সেই নিরাপত্তার মূল্য হিসেবে নারীর স্বাধীনতাকেই সীমিত করে দেওয়া সমাধান না, নিয়ন্ত্রণ।
নারীর জন্য রাত অনিরাপদ হলে রাতকে নিরাপদ করুন।
Harassment হলে harasser এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।
অন্ধকার হলে আলো বাড়ান। ট্রান্সপোর্ট অনিরাপদ হলে সেফ ট্রান্সপোর্ট দিন।সিকিউরিটি দুর্বল হলে সিকিউরিটি শক্তিশালী করুন। Emergency response ব্যর্থ হলে সেটি কার্যকর করুন। নারীকে সরিয়ে দিয়ে পাবলিক স্পেসকে নিরাপদ ঘোষণা করবেননা।
গেট বন্ধ করা খুব সহজ প্রশাসন। ক্যাম্পাস নিরাপদ করা কঠিন প্রশাসন। একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীর জন্য দরজা বন্ধ করার মানুষ নন, তাঁর কাজ জ্ঞানের দরজা খুলে দেওয়া। আর একজন প্রক্টরের সাফল্য এই দিয়ে মাপা উচিত নয় যে রাত দশটার মধ্যে কতজন নারীকে গেটের ভেতরে ঢোকানো গেল।
কৃতিত্ব এখানে যে, রাত দশটার পরও বিশ্ববিদ্যালয়টি তার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা নিরাপদ, স্বাধীন এবং সমান রাখতে পারল?
কারফিউ বানাতে একটা ঘড়ি আর একটা তালা যথেষ্ট। নিরাপদ, সমান এবং স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে লাগে গভর্নেন্স।
লুবনা তুরিন