আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
আমেরিকায় গিয়ে বব নামে এক ব্যক্তির সাথে পরিচয় হলো যে একজন ভিয়েতনাম ফেরত বিমানসেনা ও সৌখিন এনিম্যাল কেয়ারগিভার। সে তার জীবনের একটি গল্প বলে নিম নামে এক শিম্পাঞ্জীর। একসময় সে যার দেখাশোনা করত (কেয়ারগিভিং)। ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কির একটি তত্ত্ব আছে যে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে কথা বলতে পারে কারণ ভাব প্রকাশের ভাষার ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্কের ভৌত আঙ্গিক ক্ষমতা (অয়্যারড ইন ব্রেইন)। তার মতে ভাষার ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ শিক্ষা (লার্নিং) নয়।
চমস্কির তত্ত্ব অনুসারে আমাদের রক্ত পাম্পের জন্য যেমন হার্ট, শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য যেমন লাং আছে, ভাষার জন্যও মস্তিষ্কে সেরকম একটি স্নায়ুতান্ত্রিক (নিউরাল) অঙ্গ আছে যেটি মানুষ ছাড়া কারও নেই। সেই কারণে আর কোনো প্রাণীর পক্ষে ভাব প্রকাশের ভাষার ব্যবহার সম্ভব নয় এবং সেটা অনুভব প্রকাশের শব্দে সীমাবদ্ধ মাত্র। চমস্কির এই তত্ত্বটি অনেক ভাষাবিদ, জীববিদ ও মনোবীদ মানেন না এবং এটি নিয়ে পুরো বিজ্ঞানীজগত দুই ভাগে বিভক্ত যার মধ্যে চমস্কিপন্থীর সংখ্যা কমই ছিল। চমস্কি-বিরোধীদের বক্তব্য হলো মানুষ এবং গ্রেট এপরা জিনগতভাবে খুবই কাছাকাছি এবং শেখালে তারাও ভাব প্রকাশের ভাষা রপ্ত করতে পারবে। তাদের ধারণা তফাৎটা শিক্ষা-সাংস্কৃতিক। যেমন অনেকে ভাবে নারী-পুরুষের মানসিক প্রভেদটা শিক্ষা-সাংস্কৃতিক, স্নায়ু-দৈহিক বা মৌলিক নয়।
আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি ও সাইকোলজির অধ্যাপক হার্বার্ট এস টেরেসের নেতৃত্বে ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি একটি প্রকল্প নেওয়া হয় প্রজেক্ট নিম নামে। এতে একটি শিশু শিম্পাঞ্জিকে সমবয়সী মানব শিশুদের সাথে একটি পরিবারে বড় করে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। একই সাথে তাকে আমেরিকান সাইন ল্যাংগুয়েজ (এএসএল) শিখিয়ে তার সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করা হয়। শিম্পাঞ্জিকে সাইন ল্যাংগুয়েজ শিখিয়ে সফল হলে, এটি যেহেতু নোয়াম চমস্কির তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করবে তাই বিদ্রুপ করে শিম্পাঞ্জিটির নাম দেওয়া হয় নিম চিম্পস্কি। তখনকার একটি মার্কিন পরিবার এই গবেষণায় সহযোগীতা করতে রাজি হয়। নিম নামের শিম্পাঞ্জিটি ঐ পরিবারের আরও দুটি সমবয়ষ্ক মানব শিশুর সাথে বড় হতে থাকে গবেষক ও সাইন ল্যাংগুয়েজ ট্রেইনারদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে।
বারো বছর ঐ পরিবারের সাথে থেকে ১২৫টি সাইন ল্যাংগুয়েজ ভোকাবুলারি বা সাংকেতিক ভাষা শব্দভাণ্ডার শেখে নিম। কিন্তু সেগুলো ব্যবহার করে নিজের মনের কোনো বক্তব্য বলতে পরত না নিম। সে শুধু অনুভব বা নিজের চাহিদা প্রকাশের জন্য সংকেত দিতে পারত যেমন "কলা চাই", "খেলতে চাই", "খাবার চাই" – অর্থাৎ নিজের শারীরিক চাহিদা ও অভিযোগ ছাড়া নিমের আর কোনো বক্তব্য বা বলার কিছু ছিল না। “নিম হ্যাজ নো স্টেটমেন্ট টু কমিউনিকেট” – বা "নিমের কোন বক্তব্য বলার নেই" এটাই ছিল গবেষণার অন্তিম ফলাফল। অর্থাৎ নিম কথা বলার জন্য ভাষা জানে কিন্তু নিমের মনে বলার মত কোনো কথা নেই নিজের ইন্দ্রিয় উপভোগ বা শারীরিক অভাব-অভিযোগের বিষয় ছাড়া।
যথারীতি টেরেসের গবেষণা ব্যর্থ হয়। বিষয়টা মোটেই নতুন নয়। মানব শিশু যখন ইশারা করতে শেখে বা এমনকি কথাও বলতে শেখে তখনও তার কোনো বক্তব্য থাকে না। সে শুধু নিজের প্রয়োজনটা জানায়, ইচ্ছাটা জানায় বা অনিচ্ছা বা কষ্টটা জানায়। কোনো কিছু সম্পর্কে মানুষের ভ্যালিড বক্তব্য বা স্টেটমেন্ট তৈরি হয় মানুষের পার্সোনা বা ব্যক্তিত্ব তৈরি হওয়ার পর। সেই বক্তব্য সামগ্রিক বা ইউনিভার্সাল হয় মানুষের কনশিয়েন্স অর্থাৎ বিবেক বা বিচারবুদ্ধি তৈরি হওয়ার পর। খ্যাতনামা মনোবিদ কার্ল ইয়ুং-এর বক্তব্য যেমন “মনে কষ্ট ছাড়া কারও মনে বিবেক তৈরি হয় না”। ইয়ুং আরও বলেন আমাদের মনের মধ্যে এমন কিছু আছে যা একটি সামগ্রিক বিচারবোধ বা ইউনিভার্সাল জাজমেন্ট তৈরি করতে পারে।
ভাষা সম্পর্কে আমাদের একটা ভ্রান্ত ধারণা হলো ভাষাকে আমরা ভাব প্রকাশের একটি মাধ্যম বা টুল মনে করি। আমরা ধরে নিই চিন্তা বা ভাব আমাদের মধ্যে ভেতর থেকেই জন্ম নেয় এবং ভাষা দিয়ে আমরা সেগুলোকে শুধু প্রকাশ করি মাত্র। এটা শুধু ঐ শিম্পাঞ্জি নিমের মতো মানুষেরও অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেই সত্য। যা ব্যবহৃত হয় আমাদের বেসিক ইনস্টিংক্ট বা মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যেগুলো হলো খাদ্য, নিরাপত্তা ও বংশবিস্তারের তাড়না ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন।
আমাদের চিন্তাকে এর চেয়ে গভীরে পৌঁছাতে গেলে ভাষা শুধু অন্য ব্যক্তি বা সমাজের সাথে যোগাযোগের টুল নয়, নিজের মস্তিষ্কের উন্নততর অংশের সাথে যোগাযোগেরও পথ; মানে চিন্তা বা বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন বা কগনিটিভ ডেভেলপমেন্টের মাধ্যম হলো ভাষা। ভাষা ছাড়া আমরা নিজেদের মস্তিষ্কেরও অনেক অংশের উন্নয়নে অক্ষম।
মস্তিষ্কের উন্নয়নের সেই পথ কেমন হবে সেটা আবার ভাষাটি কী সেটার উপর নির্ভর করে। জীবনযাপনের ধারা, পরিবেশ, প্রকৃতি, সময় ও সংস্কৃতি ভাষাকে তৈরি করে। সেই ভাষা আবার আমাদের মস্তিষ্ককে তথা তার চিন্তা ও বোধকে রূপায়িত করে বা রেন্ডার করে। সুতরাং ভাষা শুধু ব্যক্তির মনের ভাব প্রকাশের টুল নয়, ব্যক্তির মন কেমন হবে সেটাও প্রকৃতি, সমাজ ও পরিবেশ ভাষার মাধ্যমে ঠিক করে দেয়।
ভাষা রক্ষা মানে শুধু তাই সাইনবোর্ড ও অক্ষর রক্ষা নয়, বইয়ের ছাপা বা পত্রিকার বিলুপ্তি ঠেকানো নয়, বাংলা একাডেমির বইমেলার বাজার রক্ষা নয়; ভাষা রক্ষা মানে বাঙালি মনকে বিলুপ্ত হওয়া থেকে রক্ষা করা। বাংলা হারিয়ে গেলে শুধু বাঙালি সংস্কৃতিই হারাবে না, বাঙালি মনও হারিয়ে যাবে।
© সিরাজুল হোসেন