Monday, September 28, 2026

আমার প থ চলাতেই আন ন্দ।


গাড়ির জানালা দিয়ে যে দিকে তাকাই , সেদিকে ই পাহাড় । সমতল দেশের মেয়ে আমি পাহাড় মানে 

অপার বিস্ময় । ভাল ছ বি তুলতে পারি না  আমি । যদি পারতাম তাহ লে রূপবতী  জাপানের রূপের ছটা 

তুলে ধ রতে পার তাম। 




 চলার প থে দেখি সোকেসে সাজানো নানা ঢঙ্গের গাড়ি । অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। 

ম নে হচ্ছিল আমি  কোন এক বাড়ির লিভিং রুমে ঢুকে  পড়েছি । এক পাশে ন্যাচার দিয়ে সাজানো আর অন্য দিকে তার গাড়ির কালেকশন দিয়ে  সাজিয়ে রেখেছে।


আপনি কি একজন ন্যাচারাল মানুষ হিসেবেই মরতে চান, নাকি আপনি চান আপনার পরবর্তী প্রজন্ম এডিটেড বা সম্পাদিত হোক?

 



কুর্জগেসাগ্ট (Kurzgesagt)-এর এই কালারফুল অ্যানিমেশন দেখে যদি আপনার মনে হয় এটি শুধুই একটি এডুকেশনাল ভিডিও, তবে আপনি বড় ভুল করছেন।
এটি আসলে মানবজাতির অবিচ্যুারি বা শোকসংবাদ এবং একই সাথে এক নতুন প্রজাতির বার্থ সার্টিফিকেট।
আমরা অনেকেই জানি যে, কোনো সফটওয়্যারের ভার্সন ১. ০ সবসময় বাগি (Buggy) এবং অদক্ষ হয়। বিশ্বাস করুন বা না করুন, আপনি, আমি এবং এই পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষ, আমরা সবাই হলাম সেই হিউম্যান ১. ০, যা গ্লিচে ভরা, ভাইরাস অ্যাটাকে ক্র্যাশ করে এবং মাত্র ৭০-৮০ বছর চললেই হার্ডওয়্যার ফেইল করে।
ক্রিসপার (CRISPR) টেকনোলজি আমাদের হাতে সেই সোর্স কোড তুলে দিয়েছে যা দিয়ে আমরা এই হিউম্যান ১. ০-কে হিউম্যান ২. ০-তে আপগ্রেড করতে পারি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আপগ্রেডের প্রাইস ট্যাগ বা মূল্য কে নির্ধারণ করবে? আর এই আপগ্রেড কি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নাকি এটি তৈরি করবে এক চিরস্থায়ী জেনেটিক অ্যারিস্টোক্রেসি?
ভিডিওর শুরুতেই যে এনালজি বা উপমা দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত পাওয়ারফুল, ১৯৮০ সালের কম্পিউটার আর আজকের সুপার কম্পিউটার। আমরা কম্পিউটারকে যতটা বদলেছি, নিজেদের বায়োলজিকে ততটা বদলাইনি। কিন্তু এখন সেই সময় এসেছে।
ক্রিসপার ক্যাজ-৯ (CRISPR Cas) টেকনোলজিকে আমি দেখি বায়োলজিক্যাল ফটোশপ হিসেবে।
আগে ডিএনএ বদলানো ছিল ম্যাপ দেখে রাস্তা খোঁজার মতো জটিল, আর এখন এটা জিপিএস ব্যবহারের মতো সহজ। মাত্র ১০ ডলারে ফ্লুরোসেন্ট জেব্রাফিশ বা অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা মাছ পাওয়া যাচ্ছে, এটা কোনো সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট নয়, এটা বায়োলজির কমোডিফিকেশন বা পণ্যীকরণ।
যখন ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ১০ ডলারে বিক্রি করা হয়, তখন বুঝতে হবে পবিত্রতা বা স্যাক্রেড বলে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সব কিছুই এখন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবলেম। আর আমরা সবাই জানি, যেকোনো প্রবলেমের অপটিমাইজড সলিউশন বের করা সম্ভব। কিন্তু এই অপটিমাইজেশনের নেশা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?
ডার্ক সাইকোলজির লেন্স দিয়ে দেখলে, মানুষের সবচেয়ে আদিম ভয় হলো মৃত্যু এবং সবচেয়ে আদিম আকাঙ্ক্ষা হলো অমরত্ব বা ইমর্টালিটি।
ভিডিওতে এজিং বা বার্ধক্যকে একটি রোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি একটি প্যারাডাইম শিফট। এতদিন আমরা মৃত্যুকে নিয়তি ভাবতাম, এখন আমরা মৃত্যুকে ভাবছি টেকনিক্যাল ফেইলিউর।
ডিএনএ ব্রেক করছে, সেল রিপেয়ার হচ্ছে না, এগুলো সব ফিক্স করা সম্ভব। কিন্তু ভাবুন তো, যদি সত্যিই মৃত্যুকে জয় করা যায়, তবে এই সমাজের পাওয়ার ডাইনামিক্স বা ক্ষমতার সমীকরণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
আজ একজন বিলিয়নেয়ার বা ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ মারা যান, ফলে তার সম্পদ এবং ক্ষমতা হাতবদল হয়, সমাজে নতুন নেতৃত্ব আসে। মৃত্যুই হলো প্রকৃতির একমাত্র ইকুলাইজার বা সাম্যবাদক।
কিন্তু যদি জেফ বেজোস বা ইলন মাস্কের মতো মানুষেরা ১০০০ বছর বাঁচেন? তাদের সম্পদ কম্পাউন্ড ইন্টারেস্টে বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে যাবে যে তারা একেকজন কোয়াড্রিলিয়নিয়ার, কুইন্টিলিয়নিয়ার এ পরিণত হবেন।
ফলে সাধারণ মানুষ তখন শুধু তাদের প্রজা নয়, তাদের বায়োলজিক্যাল সাব-অর্ডিনেট বা অধস্তন প্রজাতিতে পরিণত হবে।
আমরা একটি পার্মানেন্ট রুলিং ক্লাস বা চিরস্থায়ী শাসকগোষ্ঠী তৈরি করার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মৃত্যু কেবল গরিবদের জন্যই বরাদ্দ থাকবে।
স্লিপারি স্লোপ বা পিচ্ছিল ঢালের কনসেপ্টটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা শুরু করবো মহৎ উদ্দেশ্য দিয়ে, ক্যান্সার নিরাময়, এইচআইভি নির্মূল, জেনেটিক রোগ দূর করা।
কে চাইবে তার সন্তান অসুস্থ হয়ে জন্মাক? কেউ না।
এই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল বা যৌক্তিকতাই হলো ফাঁদ। একবার যখন আপনি রোগের জন্য ভ্রূণের ডিএনএ এডিট করা মেনে নেবেন, তখন পরবর্তী ধাপগুলো আটকানো অসম্ভব।
যদি অ্যালঝাইমার্স দূর করা যায়, তবে কেন মেটাবলিজম বাড়িয়ে স্থূলতা দূর করা যাবে না? যদি দৃষ্টিশক্তি ঠিক করা যায়, তবে কেন কানের রঙ বা চোখের রঙ পছন্দমতো নেওয়া যাবে না?
আর যদি এসবই করা যায়, তবে কেন আইকিউ (IQ) বা বুদ্ধিমত্তা বাড়ানো যাবে না? এখান থেকেই শুরু হবে ডিজাইনার বেবির যুগ।
মানুষ তখন আর জন্মাবে না, মানুষকে ম্যানুফ্যাকচার বা উৎপাদন করা হবে।
পিতামাতারা সন্তানের জন্য ক্যাটালগ দেখে ফিচার সিলেক্ট করবেন, আমার বাচ্চার আইকিউ ১৮০ চাই, নীল চোখ চাই, আর অলিম্পিক এথলেটদের মতো মাসল চাই।
এর ফলে সমাজে এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি হবে যারা জন্মগতভাবেই আমাদের চেয়ে সুপিরিয়র। তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামাটা হবে একটা সাধারণ টয়োটা গাড়ি নিয়ে ফর্মুলা ওয়ান রেস কারের সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো।
এটি কোনো ফেয়ার গেম নয়, এটি বায়োলজিক্যাল ডমিনেশন।
ভিডিওর সবচেয়ে ডিস্টার্বিং বা অস্বস্তিকর অংশ ছিল টোটালিটারিয়ান বা একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদাহরণটি। উত্তর কোরিয়ার মতো কোনো রাষ্ট্র যদি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে?
চিন্তা করুন, একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের আনুগত্য বা লয়্যালটি জেনেটিক্যালি কোড করে দিচ্ছে। এমন মানুষ তৈরি করা হচ্ছে যারা বিদ্রোহ করার কথা চিন্তাই করতে পারবে না, কারণ তাদের মস্তিষ্কের সেই নিউরাল পাথওয়েগুলোই এডিট করে দেওয়া হয়েছে।
তারা হবে পারফেক্ট সোলজার, পারফেক্ট ওয়ার্কার, যাদের কোনো ক্লান্তি নেই, প্রশ্ন নেই, শুধু আছে অন্ধ আনুগত্য। একে বলা যেতে পারে বায়ো-ফ্যাসিজম।
জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসে আমরা ব্রেইন ওয়াশ বা মগজধোলাই দেখেছি, কিন্তু জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং তাকে হার্ডওয়্যার লেভেলে নিয়ে যাবে। তখন আর প্রপাগান্ডার দরকার হবে না, কারণ মানুষটি জন্মগতভাবেই গোলাম হিসেবে প্রোগ্রামড।
রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে যদি বায়োলজির চাবিকাঠি চলে যায়, তবে স্বাধীনতা বা ফ্রি উইল শব্দটি ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলতে হবে।
দর্শনের জায়গা থেকে প্রশ্ন আসে, মানুষের সংজ্ঞা কী? আমাদের ভুলত্রুটি, আমাদের সীমাবদ্ধতা, আমাদের বার্ধক্য, এগুলোই কি আমাদের মানুষ করে না?
আমরা যদি সব নিখুঁত বা পারফেক্ট করে ফেলি, তবে আমরা কি আর মানুষ থাকবো, নাকি আমরা অর্গানিক রোবট হয়ে যাবো?
আমরা প্রকৃতির বিবর্তন বা ন্যাচারাল সিলেকশনকে বাইপাস করে ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন-এর পথে হাঁটছি। কিন্তু ডিজাইনটা কার? ডিজাইনটা হলো মানুষের, যা লোভ, ভয় আর অহংকারে পূর্ণ।
আমরা যখন নিজেদের ডিজাইন করবো, তখন আমরা আমাদের বায়াস বা পক্ষপাতিত্বগুলোকেও এমপ্লিফাই বা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবো। আমরা এমন এক জগত তৈরি করবো যেখানে বৈচিত্র্য বা ডাইভারসিটি থাকবে না, থাকবে শুধু অপটিমাইজড মনোটনি বা যান্ত্রিক একঘেয়েমি।
তবুও, একজন এনথুজিয়াস্ট হিসেবে আমি এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে অস্বীকার করতে পারি না। মহাকাশ ভ্রমণের জন্য আমাদের শরীরকে বদলানো প্রয়োজন, রেডিয়েশন সহ্য করার ক্ষমতা প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে অন্য গ্রহে বসতি স্থাপন করতে হলে আমাদের হিউম্যান ২. ০ হতেই হবে। এটি আমাদের বিবর্তনের পরবর্তী ধাপ।
কিন্তু এই ধাপটি পার হওয়ার জন্য আমাদের যে উইজডম বা প্রজ্ঞা দরকার, তা কি আমাদের আছে? আমরা আগুনের ব্যবহার শিখেছি, কিন্তু সেই আগুন দিয়ে ঘর গরম করার চেয়ে শহর পোড়াতেই বেশি ব্যবহার করেছি।
ক্রিসপার হলো সেই প্রমিথিউসের আগুন।
এটি দিয়ে আমরা রোগমুক্ত পৃথিবী গড়তে পারি, আবার এটি দিয়ে আমরা বায়ো-উইপন বা জীবাণু অস্ত্র বানিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সভ্যতা ধ্বংসও করতে পারি।
ভিডিওটি শেষ হয়েছে একটি আশার বাণী দিয়ে, কিন্তু আমার কাছে সেটি সতর্কবাণী মনে হয়েছে। বলা হয়েছে, ভবিষ্যত আসছে, আপনি প্রস্তুত হোন বা না হোন। এটিই হলো আল্টিমেট ট্রুথ।
টেকনোলজি কারো জন্য অপেক্ষা করে না। আমরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি এই টেকনোলজিকে রেগুলেট করবো, নাকি একে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে দেবো?
যারা আজ এই আর্টিকেলটি পড়ছেন, তাদের বলছি, নিজের শরীর এবং জেনেটিক ডেটার ওপর অধিকার বজায় রাখাটাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। কারণ কর্পোরেশনগুলো এখন আর শুধু আপনার পকেটের টাকা বা আপনার ব্রাউজিং ডেটা চায় না, তারা চায় আপনার ডিএনএ, আপনার অস্তিত্বের ব্লু-প্রিন্ট।
পরিশেষে, নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি কি একজন ন্যাচারাল মানুষ হিসেবেই মরতে চান, নাকি আপনি চান আপনার পরবর্তী প্রজন্ম এডিটেড বা সম্পাদিত হোক? উত্তরটা সহজ নয়।
কারণ যখন দেখবেন আপনার পাশের বাড়ির এডিটেড বাচ্চাটি আপনার ন্যাচারাল বাচ্চার চেয়ে পরীক্ষায় ভালো করছে, খেলায় ভালো করছে, তখন আপনিও লাইনে দাঁড়াবেন আপনার বাচ্চাকে আপগ্রেড করার জন্য।
আমরা সবাই এই ইঁদুর দৌড়ে শামিল হবো এবং এভাবেই একদিন হোমো স্যাপিয়েন্স বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তার জায়গায় আসবে এক নতুন প্রজাতি, যাদের শরীর রক্ত-মাংসের, কিন্তু আত্মা সিলিকন ভ্যালির অ্যালগরিদমে তৈরি। পৃথিবীটা তাদেরই হবে, আর আমরা হবো মিউজিয়ামে রাখা ফসিল, যাদের দিকে তাকিয়ে তারা হাসবে আর ভাববে, এরা কতই না প্রিমিটিভ বা আদিম ছিল, যারা মৃত্যুকে মেনে নিতো, ভাগ্যকে মেনে নিতো।

এই হ্যাংওভারটা কাটানো কঠিন, কারণ আমরা নিজের অজান্তেই নিজেদের বিলুপ্তির কন্ট্রাক্ট সাইন করে ফেলেছি।

Touhidul Islam

Sunday, September 27, 2026

বাঙালি ও ভারতবর্ষে বিচক্ষণ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

 


নবাব সিরাজদৌলা সম্পর্কে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, ‘সিরাজ উদ্দৌলা, সিংহাসনে অধিরূঢ় হইয়া, মাতামহের পুরাণ কৰ্ম্মচারী ও সেনাপতিদিগকে পদচ্যুত করিলেন। কুপ্রবৃত্তির উত্তেজক কতিপয় অল্পবয়স্ক দুষ্ক্রিয়াসক্ত ব্যক্তি তাঁহার প্ৰিয়পাত্র ও বিশ্বাসভাজন হইয়া উঠিল। তাহারা, প্ৰতিদিন, তাঁহাকে কেবল অন্যায্য ও নিষ্ঠুর ব্যাপারের অনুষ্ঠানে পরামর্শ দিতে লাগিল। ঐ সকল পরামর্শের এই ফল দর্শিয়াছিল যে, তৎকালে, প্ৰায় কোনও ব্যক্তির সম্পত্তি বা কোনও স্ত্রীলোকের সতীত্ব রক্ষা পায় নাই’ (বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম অধ্যায়, শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর)।

বামপন্থি ইতিহাস লেখক অসিত বন্দোপাধ্যায় এ কারণে বিদ্যাসাগরকে ‘সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী’ বলে অবিহত করেন। তিনি লেখন, ‘বিদ্যাসাগর প্রায় মার্শম্যানের অবিকল অনুবাদ করিয়াছেন। মার্শম্যানের সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গিমাও তিনি হুবহু স্বীকার করিয়া লইয়া অনুবাদ করিয়াছেন’।
রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিদ্যাসাগরের বাড়িতে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য নাস্তিক থেকে বিদ্যাসাগরকে ধর্মের পথে আনা। রামকষ্ণের সঙ্গ অসহ্য ঠেকেছিলো বিদ্যাসাগরের। রামকৃষ্ণ খাতির জমাতে বিদ্যাসাগরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি সাগরে এসেছি, ইচ্ছা আছে কিছু রত্ম সংগ্রহ করে নিয়ে যাব’। বিদ্যাসাগর বিরক্ত হয়ে উত্তর করলেন, ‘আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হবে বলে তো মনে হয় না, কারণ এ সাগরে কেবল শামুকই পাবেন’। এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে পরে রামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এমন কি তাঁর (বিদ্যাসাগরের) নিজের মোক্ষলাভের জন্য ভগবানের নাম করবারও কোন স্পৃহা নেই, সেইটা বোধ হয় তাঁর সবচেয়ে বড় ত্যাগ। অন্য লোকের উপকার করতে গিয়ে তিনি নিজের আত্মার উপকার করার প্রয়োজন অগ্রাহ্য করেছেন (বিনয় ঘোষ লিখিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, পৃষ্ঠা- ১৫৭)।
নকশালরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙ্গেছিলো কারণ তিনি তাদের দৃষ্টিতে বুর্জোয়া সাম্রাজ্যবাদী। তাঁকে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ বলতেও বামপন্থি ঐতিহাসিকদের আটকায়নি। কারণ তিনি নবাব সিরাজদৌলার সমালোচনা করেছিলেন। কার্ল মার্কস ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহকে ভারতীয়দের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ বলে দাবী করেছিলেন আর দেশীয় বিপ্লবীরা নবাব সিরাজের পরাজয়কে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত বলে দাবী করেন। নবাব সিরাজদৌলার নানা আলিবর্দি খানকে ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে ‘দুরাত্মা’ বলা হয়েছে। সিরাজ তার নানাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। তার পরাজয়ে বাংলার সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার সূর্য কেমন করে অস্ত যায় কে জানে!
বিদ্যাসাগর তার হিন্দু সমাজের ধর্মীয় বিধানকে আইন করিয়ে নিষিদ্ধ করেন। হিন্দুদের ধর্মীয় আচার নিয়ে প্রকাশ্যে ঠাট্টা করতেন। বেদ শাস্ত্রকে অপ্রয়োজনীয় বলে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের কথা বলেও তিনি হিন্দুদের কাছে ‘হিন্দু ধর্ম বিদ্বেষী’ হননি কিন্তু নবাব সিরাজের বিরুদ্ধে বলেই বামাতী সংঘের কাছে তিনি ‘ইসলাম বিদ্বেষী সাম্রাজ্যবাদী’!
বিদ্যাসাগারের জন্মদিন গেলো। বাঙালি ও ভারতবর্ষে দুইজন বিচক্ষণ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বুদ্ধিজীবী হচ্ছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই দুইজনই পুরো ভারতবর্ষের ভবিষ্যতকে দেখতে পেয়েছিলেন। নবাব বাদশাহদের সামন্ত যুগ শেষ করে পশ্চিমের বাষ্মইঞ্জিন আর আধুনিক অস্ত্রের, আধুনিক বিজ্ঞান ও দর্শনের যুগ শুরু হয়েছে। এইসব নবাব সুলতান বাহশাহদের বুলবুলি উড়াউড়ি, বাঈজি নাচ আর শের লেখার অলস সাম্রাজ্যের দিন শেষ। ফলে দুইজনই ভারতে ইংরেজ শাসনকে বাস্তবতা হিসেবে দেখেছিলেন। তারা জানতেন ভারতের পরাধীনতাই যেখানে নিয়তি সেখানে এমন এক শাসকের শাসন হোক যেখান থেকে ভারতবাসী আধুনিক সব বিদ্যা অর্জন করতে পারবে। সেটাই হয়েছিল। সেদিন ইংরেজিরা কার্তুজে কথিত শূকরের চর্বি লাগানোর ধর্মান্ধ গুজবে সৃষ্টি (এই গুজব রটিয়েছিল ওহাবী জিহাদীরা) বিদ্রোহ দমন করে সফল না হলে ভারতবর্ষ একশো বছর পিছিয়ে যেতো বুলবুলি উড়ানো নবাবদের হাতে।
বঙ্কিমচন্দ্র সরকারী চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে তার ইংরেজ কর্তৃপক্ষ সিপাহী যুদ্ধে কারা জিতবে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ইংরেজরা জিতবে না তিনি এমনটা মনে করলে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে আসতেন না। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর তার কলেজের গেইট খুলে দিয়েছিলেন ইংরেজ সৈন্যদের জন্য।
যারা কম্পিউটার বের হবার পর সেটাকে গ্রহণ করতে পারেনি সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্র মনে করে তাদের কি করে বিদ্যাসাগর বঙ্কিমের মত দূরদৃষ্টি হবে বলুন?
-সুষুপ্ত পাঠক
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬