সারিকার বিয়ের বয়স তখন তিন মাস। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন অভ্যাস। বিয়ের পর মেয়েদের জীবনে যে ছোটখাটো পরিবর্তনগুলো আসে, সেগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। কোন কাপটা কার পছন্দ, সকালে কে আগে ঘুম থেকে ওঠে, চায়ের মধ্যে চিনি কতটুকু দিতে হয়, কোন আত্মীয়ের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়,এসব শিখতে শিখতেই তার দিন কেটে যাচ্ছিল।
তবে নতুন সংসারে একটা বিষয় নিয়ে সে বেশ বিব্রত থাকত। তার স্বামী রাশেদ তার হাত-পা একেবারেই পছন্দ করত না।
সারিকার হাতের চামড়া একটু খসখসে। গোড়ালিও বেশ ফাটা। ছোটবেলা থেকেই এমন। শীতকালে সমস্যা একটু বাড়ে। মায়ের কাছ থেকে সে অনেকবার শুনেছে, নিয়মিত তেল মাখতে হয়, পা পরিষ্কার রাখতে হয়। কিন্তু পড়াশোনা, পরীক্ষা, ক্লাস আর অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যে নিজের হাত-পায়ের যত্ন নেওয়া তার হয়ে ওঠেনি।
বিয়ের পর রাশেদ বিষয়টা প্রথম তুলেছিল বেশ স্বাভাবিকভাবেই। একদিন রাতে পাশাপাশি বসে টেলিভিশন দেখছিল তারা। রাশেদ সারিকার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল। তারপর বলল, ‘তোমার হাত এত রুক্ষ কেন?’
সারিকা হেসে বলেছিল, ‘জানি না। ছোটবেলা থেকেই এমন।’
‘একটু যত্ন নিতে পারো না? মেয়েদের হাত তো সুন্দর, নরম হওয়া উচিত। কোমল হাত ধরতেও রোমান্টিক লাগে।'
সারিকা কথাটা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল, হয়তো স্বামীর একটা ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। একটু ক্রিম মাখলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা সেখানেই থামল না।
কিছুদিন পর রাশেদ আবার বলল, ‘আমাদের পাশের বাসার ভাবিকে দেখেছ? কী সুন্দর হাত-পা! সবসময় কী সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে নিজেকে।’
সারিকা তখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে পেঁয়াজ কাটছিল। কথাটা শুনে একটু থমকে গিয়েছিল। তারপর স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলেছিল, ‘ওনার হয়তো সময় আছে। বা স্কিন কোয়ালিটি ভালো।'
রাশেদ হেসে বলেছিল, ‘সময় তো সবারই থাকে। আসলে নিজের প্রতি ইন্টারেস্ট থাকতে হয়।স্বামী কি পছন্দ করে তা জানতে হয়। ’
সেদিন রাতে সারিকা অনেকক্ষণ ধরে নিজের হাত দুটো দেখেছিল। আঙুলের গিঁট, তালুর পাশের শক্ত চামড়া, নখের চারপাশের শুষ্কতা। গোড়ালির ফাটা জায়গাগুলোও ভালো করে দেখেছিল। মনে হচ্ছিল, তার শরীরের এমন কিছু একটা আছে, যা অন্যদের চোখে খুবই অস্বাভাবিক।
এরপর থেকে তার বাথরুমের তাক ক্রমশ ভরে উঠতে লাগল। একদিন একটা ফুট ক্রিম, আরেকদিন হ্যান্ড ক্রিম। কখনো গ্লিসারিন, কখনো পেট্রোলিয়াম জেলি। ইউটিউব দেখে ঘরোয়া পদ্ধতিও চেষ্টা করল। রাতে ঘুমানোর আগে পায়ে ক্রিম মেখে মোজা পরে থাকত। সকালে উঠে আবার হাত-পায়ে লোশন লাগাত।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছিল তার আচরণে।
আগে ঘরে বসে পা ছড়িয়ে বই পড়ত। এখন পা গুটিয়ে বসে। আগে স্বামীর সামনে খালি পায়ে হাঁটতে কোনো অস্বস্তি ছিল না। এখন ঘরের মধ্যেও স্যান্ডেল পরে থাকে। কখনো রাশেদ হঠাৎ তার হাত ধরতে এলে সে অবচেতনভাবেই হাত সরিয়ে নেয়।
রাশেদ অবশ্য এসব পরিবর্তন খুব একটা খেয়াল করত না। তার কাছে বিষয়টা ছিল খুব সাধারণ। স্ত্রীকে একটু সুন্দর ও পরিপাটি হতে বলেছে, এর মধ্যে এমন কী আছে!
সারিকা কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তিতে ভুগতে শুরু করেছিল। অথচ মেয়েটা পড়াশোনায় অসম্ভব ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্সে পড়ছে। তার কাছে পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সব সূত্র, গাণিতিক মডেল কিংবা কোয়ান্টাম মেকানিকসের তত্ত্ব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কোনো একটা সমস্যার সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত তার মাথায় অন্য কিছু ঢুকত না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা তাকে বেশ পছন্দ করতেন। ক্লাসে কোনো জটিল প্রশ্ন উঠলে অনেক সময় তার দিকে তাকাতেন। সারিকা জানত, তার একটা নিজস্ব জগৎ আছে। সেই জগতে তার মেধা, পরিশ্রম আর স্বপ্নের মূল্য আছে।
একদিন একটা কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বসেছিল সে। সামনে কয়েকটা বই, ল্যাপটপে গবেষণাপত্র, পাশে খাতায় অসংখ্য সমীকরণ। রাশেদ ঘরে ঢুকে কিছু একটা বলেছিল। সারিকা শুনতে পায়নি।
কিছুক্ষণ পর রাশেদ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোমাকে কিছু বলছি। শুনছ না?’
‘তোমার পায়ের অবস্থাটা দেখেছ? কতবার বললাম একটা ভালো ক্রিম কিনতে। টাকা তো দেই। ’
সারিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আবার খাতার দিকে তাকাল। সেদিন প্রথমবার তার মনে হলো, পড়াশোনায় ডুবে থাকলে এই কথাগুলো তাকে আর আগের মতো আঘাত করে না। একটা সমীকরণের সমাধান খুঁজতে খুঁজতে সে যেন নিজের ভেতরে এমন একটা জায়গা খুঁজে পায়, যেখানে তার হাতের চামড়া কিংবা গোড়ালির ফাটা অংশের কোনো গুরুত্ব নেই।
সেই জায়গাটায় সে কেবল সারিকা। একজন শিক্ষার্থী। একজন মেধাবী মানুষ। যার সামনে অনেকগুলো সম্ভাবনা পড়ে আছে।
এরপর থেকে সে আরও বেশি করে পড়াশোনায় মন দিতে শুরু করল। নামাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ, গবেষণা, পরীক্ষার প্রস্তুতি, সবকিছুতেই নিজেকে ব্যস্ত রাখত। কখনো কখনো মনে হতো, নিজের জায়নামাজ আর পড়ার টেবিলটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
এর মধ্যে একদিন খবর এল, সারিকার মা বেশ অসুস্থ। মায়ের শরীর খারাপ শুনে সে অস্থির হয়ে পড়ল। রাশেদকে নিয়ে বাবার বাড়ি গেল।
মায়ের শরীর তখন বেশ দুর্বল। সারিকা মায়ের ঘরে বসে গল্প করছিল। পুরোনো দিনের কথা, আত্মীয়স্বজনের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা সবকিছু নিয়েই কথা হচ্ছিল। অনেক দিন পর মায়ের কাছে এসে তার বেশ ভালো লাগছিল।
রাশেদও সেদিন বেশ হাসিখুশি ছিল। শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করছিল। চা খেতে খেতে নানা প্রসঙ্গ উঠল। একসময় সারিকা রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
রাশেদ তখন হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘আপনারা সারিকার হাত-পা দেখেছেন? একেবারে সিরিশ কাগজের মতো! কত বলি একটু যত্ন নিতে, কিছুতেই কিছু হয় না। পাশের বাসার ভাবিও একদিন কি জানি ক্রিম দিয়ে গেল। সেটাও মাখে না।’
কথাটা বলে সে নিজেই হেসে উঠল।
সারিকা প্রথমে বুঝতেই পারেনি কী বলবে। হাতে চায়ের কাপ নিয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে কাপগুলো টেবিলে রেখে এক পাশে বসে পড়ল।
তার বাবা-মা দুজনেই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মা প্রথমে মেয়ের দিকে তাকালেন। তারপর জামাইয়ের দিকে।
রাশেদ একটু হেসে বলল, ‘না মানে, ওর হাত-পা খুব রুক্ষ। বলি একটু যত্ন নিতে। মেয়েদের তো নিজেদের একটু গুছিয়ে রাখা উচিত। সব মেয়েরাই তো নিজের স্কিনের যত্ন নেয়।’
সারিকার মা এবার বেশ শক্ত গলায় বললেন, ‘তাতে তোমার কী সমস্যা?’
মা বললেন, ‘সারিকার হাত-পা ছোটবেলা থেকেই এমন। শীতকালে একটু বেশি হয়। আমরা জানি। কিন্তু তুমি ওর হাত-পা নিয়ে এত কথা বলো কেন?’
রাশেদ পরিস্থিতিটা হালকা করার চেষ্টা করল।
‘আরে না মা, আমি তো মজা করেই বললাম।’
‘তোমার কাছে মজা হতে পারে। কিন্তু যার শরীর নিয়ে কথা বলছ, তার কাছে সেটা মজা নাও হতে পারে।’
মায়ের গলার স্বর এবার আরও দৃঢ় হলো।
‘মেয়েটা ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় ভালো। নিজের পড়াশোনা, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কত পরিশ্রম করে। এখন অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্সে পড়ছে। ওর মাথায় কত কিছু ঘোরে, কত স্বপ্ন আছে। তুমি ওর সঙ্গে অন্য মেয়েদের তুলনা করো, ওর হাত-পা নিয়ে কথা বলো। তোমার কি একবারও মনে হয় না, কথাগুলো ওর খারাপ লাগতে পারে?’
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
সারিকা মাথা নিচু করে বসে ছিল। তার খুব ইচ্ছে করছিল মায়ের হাতটা ধরে। কিন্তু সেদিনও সে নিজের হাত দুটো কোলে গুটিয়ে রেখেছিল।
মা আবার বললেন, ‘একটা মেয়ে বিয়ে করে স্বামীর বাড়িতে যায় বলে তার শরীর নিয়ে স্বামীর পছন্দ-অপছন্দের পরীক্ষা দিতে হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। হাত-পা নরম না হলে মানুষ ছোট হয়ে যায় না। আর নিজের স্ত্রীকে অন্য বাসার মহিলার সঙ্গে তুলনা করার কী দরকার?’
রাশেদ এবার আর কোনো উত্তর দিল না।
যে কথাগুলো সে এতদিন খুব স্বাভাবিকভাবে বলে এসেছে, সেগুলোই আজ অন্য একজনের মুখে শুনে তার অস্বস্তি হচ্ছিল। বিশেষ করে শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে। সে বুঝতে পারছিল না, কীভাবে কথাটা সামলাবে। লজ্জায় তার কান ঝা ঝা করা শুরু করেছে। ঘাড়ও গরম হয়ে উঠেছে।
সারিকার বাবা এতক্ষণ চুপ ছিলেন। এবার শুধু বললেন, ‘মেয়েটাকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়েছি তোমার সঙ্গে সংসার করতে। নিজের শরীর আর নিজেকে নিয়ে সারাক্ষণ সংকোচে থাকার জন্য নয়। তোমার থেকে আরো বেটার এক্সপেক্ট করেছিলাম রাশেদ। '
সেদিন দুপুরের খাবারের পর সারিকা মায়ের ঘরে গেল। মা বিছানায় শুয়ে ছিলেন। সারিকা পাশে বসতেই মা তার হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিলেন।
অনেকক্ষণ ধরে হাতের তালু, আঙুল, নখের পাশটা দেখলেন।
তারপর বললেন, ‘কী রে, এত ক্রিম মাখিস কেন?’
সারিকা একটু হেসে বলল, ‘এমনিই।’
মা হাতের ওপর হাত রেখে বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই তো এমন। মনে আছে, তুই যখন পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়তি, তখন হাতের চামড়া উঠে যেত। কতবার বলেছি, একটু বিশ্রাম নে। শুনতিস না।’
মা আবার বললেন, ‘তোর হাতের চামড়া কেমন, সেটা নিয়ে তোর এত চিন্তা করার কী আছে? আমার আম্মারও এমন ছিল। কত কিছু মাখত। তবুও দুদিন পর একই। যত্ন নিবি, তবে মন ছোট করবি না। ’
সারিকা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল।
সন্ধ্যার দিকে রাশেদ ঘরে এসে দেখল সারিকা বই খুলে বসেছে। পাশে খাতায় অসমাপ্ত একটা সমীকরণ। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কেমন বাধোবাধো গলায় বলল, ‘কী পড়ছ?’
সারিকা মুখ তুলে তাকাল। তারপর আবার খাতার দিকে চোখ নামিয়ে নিল। ‘একটা প্রবলেম সলভ করছি।’
সারিকার হাত দুটো তখন খাতার ওপর ছড়িয়ে রাখা। আঙুলের গিঁটে শুষ্কতা, তালুর পাশে শক্ত চামড়া, নখের চারপাশে সামান্য খসখসে ভাব। তার হাতের চেহারায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
শুধু সেদিন মায়ের বাড়িতে এসে সে প্রথমবার বুঝেছিল, তার হাত দুটো নিয়ে তার নিজের যতটা না অস্বস্তি ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি অস্বস্তি তৈরি করে দেওয়া হয়েছিল অন্য একজনের কথায়।
টেবিলের ওপর রাখা খাতায় একটা সমীকরণ অসমাপ্ত পড়ে ছিল। সারিকা পেনসিল হাতে তুলে নিল
Nabila Noshin Shejuti