গতকাল গেছিলাম বাজারে।
ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল। প্রায় ২০ কেজি সাইজের এক আস্ত টুনা রাখা আছে। সত্যি বলতে কি, মেদিনীপুরের বাজারে এত বড় টুনা আমি আগে কখনো দেখিনি। চকচকে রূপোলি-নীল গা, টানটান কোথায় কুচকে নেই। অর্থাৎ একদম টাটকা! যেন এইমাত্র সমুদ্র থেকে তুলে আনা হয়েছে।
দেখেই মনে হল এরকম টাটকা মাছের স্বাদ হবে অসাধারণ, এই মাছ যেভাবে হোক নিতেই হবে।
সোজা এগিয়ে গেলাম।
দাদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কত করে?
অম্লান বদনে হেসে বলল, ৮০০ টাকা কেজি।
টুনা ৮০০ টাকা কেজি! বলে কি!
শুনে একটু থমকালাম বটে, কিন্তু চোখ তো ততক্ষণে মাছের ওপর আটকে গেছে। মনে মনে ভাবলাম, এত বড় মাছ রোজ আসে না। তাই বললাম, আমাকে ৩০০ গ্রামের মতো কেটে দেবে?
প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করল, এত বড় মাছ থেকে ৩০০ গ্রাম কাটতে চায় না কেউই।
অনেক বলে কয়ে রাজি করালাম। শেষে যখন কেটেকুটে দাঁড়িপাল্লায় তুলল, ওজন হল প্রায় ৪০০ গ্রাম। আমি আর কথা বাড়ালাম না, দাম দিয়ে ব্যাগে ভরে নিলাম। মনে তখন একটাই আনন্দ, আজ বাড়িতে একটা জম্পেশ কিছু হবে।
মাছ নিয়ে সোজা ছুটলাম নারকেলের দিকে। ওখানে এক মাসি বসেন, বহু বছর ধরে চিনি। উনি দেখে শুনে এমন নারকেল দেন, যার শাঁসটা নরম কিন্তু বেশ মোটা, আর একদম টক ভাব থাকে না। এই রান্নার জন্য এরকম নারকেলই তো চাই। টক নারকেল হলে পুরো স্বাদটাই নষ্ট হয়ে যাবে। মাসি হাসিমুখে একটা নারকেল বেছে দিলেন, আমি নিশ্চিন্ত মনে বাড়ির পথ ধরলাম।
বাড়ি ফিরেই আগে গেলাম উঠোনের কোণে, যেখানে কারিপাতার গাছটা আছে। টাটকা সবুজ পাতা থেকে বেশ কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নিলাম। ওর গন্ধ না হলে এই রান্না অসম্পূর্ণ। তারপর সোজা গন্তব্য রান্নাঘর।
তবে বলে রাখি, এই যে রান্নাটা আজ করছি, এটা আজকের কোনো ইউটিউব রেসিপি নয়। এই রান্নার বয়স কম করে হলেও হাজার বছর। এর নাম হুমান ফিশ কারি।
আজকের এই অসাধারণ পদের জন্য আমাদের প্রথমেই প্রণাম জানাতে হবে সারস্বত ব্রাহ্মণদের।
হ্যাঁ, সেই সুদূর কাশ্মীরের সারস্বত ব্রাহ্মণ, যাঁরা একসময় ছিলেন সারদা পীঠের, অর্থাৎ দেবী নীল সরস্বতীর মন্দিরের প্রধান পূজারী। ইতিহাস বলে, কাশ্মীরের সরস্বতী নদীর তীরে তাঁদের বাস ছিল বলেই তাঁদের নাম সারস্বত।
এখানেই সবার মনে একটা প্রশ্ন জাগবে, কাশ্মীরে তো সমুদ্র নেই, সামুদ্রিক মাছও পাওয়া যায় না, তাহলে টুনা বা সুরমাই মাছের এই কারির সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কীভাবে হল?
আসলে এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ, করুণ এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস, যা অনেকেই জানেন না।
আসুন, রান্নার আগে সেই ইতিহাসটা একটু জেনে নিই।
সে প্রায় কয়েক হাজার বছর পূর্বের কথা। তখন ছিলেন আদি শঙ্করাচার্য। তিনি এই সারদা পীঠেই দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেছিলেন এবং এখান থেকেই তিনি জগৎগুরু শঙ্করাচার্য হয়ে ওঠেন। সাধনায় তুষ্ট হয়ে দেবী নীল সরস্বতী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন এবং তাঁর নিজের স্বরূপ হিসাবে একটি চন্দন কাঠের মূর্তি এবং চারটি বেদ প্রদান করেন।
দেবী নির্দেশ দিয়েছিলেন, ভারতের চার কোণে এই চার বেদকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সনাতন ধর্ম চিরকাল অক্ষুণ্ণ থাকে।
সেই আদেশ মেনেই আচার্য শঙ্কর দেবীর চন্দন স্বরূপটি স্থাপন করেন তাঁর নিজের প্রদেশ কর্ণাটকে, যা আজ শ্রী শৃঙ্গেরী শারদা পীঠম নামে পরিচিত, চিকমাগলুরে অবস্থিত।
আর চারটি বেদ স্থাপন করে চারটি মহান মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি হল উত্তরাখণ্ডের গাড়োয়াল অঞ্চলে শ্রী জ্যোতির মঠ, দ্বিতীয়টি গুজরাটের দ্বারকায় শ্রী কালিকা মঠ বা শারদা মঠ, তৃতীয়টি ওড়িশার পুরীতে শ্রী গোবর্ধন মঠ, এবং চতুর্থটি কর্ণাটকেই।
এই চার মঠ আজও হিন্দু ধর্মের চার স্তম্ভ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে।
এই প্রসঙ্গে আরো বিশদে অন্য একদিন লিখব।
যাইহোক, মূল ঘটনায় ফিরি। একদিন দেবী নীল সরস্বতী সারস্বত ব্রাহ্মণদের ডেকে বললেন, তিনি এই পীঠ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এবং অচিরেই এই মহান পীঠ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
দেবীর মুখে এই কথা শুনে ব্রাহ্মণরা দিশেহারা হয়ে পড়লেন। তাঁদের আরাধ্য, তাদের বংশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তাদের প্রাণের দেবীই যখন থাকবেন না, তখন তাঁরা কাশ্মীরে থেকে কী করবেন?
দেবীর প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাশ্মীর ছাড়তে শুরু করলেন। কেউ গেলেন উত্তরে, কেউ দক্ষিণে।
তেমনই এক দল দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে পৌঁছলেন পশ্চিমঘাট পর্বতমালার কোলে, আরব সাগরের তীরে, বর্তমান গোয়া, দমন, দিউ এবং উপকূলীয় কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের সমুদ্রতটে।
এখানে এসে তাঁদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে গেল। কাশ্মীরের কঠোর নিরামিষাশী ব্রাহ্মণের দল ধীরে ধীরে সমুদ্রের কাছাকাছি এসে আমিষ খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন। পরিস্থিতির কারণে তাঁরা মাছ খেতে শুরু করলেন।
কিন্তু রান্নার পদ্ধতি ভুললেন না। তাঁদের সঙ্গে আনা চিরাচরিত কাশ্মীরি শুকনো লঙ্কার ব্যবহার, ধনে-জিরা-মেথির ফোড়ন আর গরম মশলার কৌশলের সঙ্গে মিশে গেল এই নতুন দেশের সহজলভ্য নারকেল, তেঁতুল, কোকম আর কারিপাতা।
এই দুই রান্নার ধরনার সংস্কৃতির মিলনেই জন্ম নিল এক অদ্ভুত সুন্দর যুগলবন্দী, যার নাম আজ আমরা বলি কোঙ্কনি কুইজিন বা সারস্বত কুইজিন।
আজকের যে জনপ্রিয় পদগুলো আমরা গোয়ান ফিশ কারি, ম্যাঙ্গালোরিয়ান গাসি, মালাবার কারি বা অন্ধ্র চেট্টিনাড কারি নামে চিনি জানি, তার প্রত্যেকটির মূল উৎসই হল এই হাজার বছরের পুরোনো সারস্বতদের হুমান রন্ধনশৈলী।
হুমান শব্দটি এসেছে কোঙ্কনি হুম্মন থেকে, যার অর্থ হল টক-ঝাল ঝোল।
এ তো গেল রান্নার ইতিহাস।
কিন্তু প্রশ্ন হল, কাশ্মীরে যে সারস্বত ব্রাহ্মণরা রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের কী হল?
ইতিহাস সাক্ষী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা আক্রমণে তাঁদের ওপর অত্যাচার বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে অনেকেই ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হন। যে অল্প সংখ্যক ব্রাহ্মণ তখনও সমস্ত অত্যাচার সহ্য করে নিজেদের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে কাশ্মীরে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে, স্বাধীন ভারতের বুকেই, এক রাতের মধ্যে ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে ছড়িয়ে পড়তে হল সারা পৃথিবী জুড়ে। এ এক অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়।
আর যাঁরা গোয়ার কোঙ্কন অঞ্চলে চলে এসেছিলেন, তাঁদের কি হল?
না। তাদের ভাগ্যও খুব সুখের হয়নি। কয়েকশো বছর পূর্বে সেখানে এসেছিল পর্তুগিজরা। তাদের শাসনে আবার শুরু হল নতুন করে ধর্ম পরিবর্তনের পর্ব।
ফলে সারস্বতদের এই যাত্রা বা এক্সোডাস যেন কোনোদিনই থামেনি। তবুও তাঁরা যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই নিজেদের মেধা, রান্না, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার ছাপ রেখে গিয়েছেন। আজও গোয়া এবং কোঙ্কন উপকূলে খুব কম সংখ্যক হলেও সারস্বত ব্রাহ্মণরা রয়ে গেছেন, তাঁদের হাত ধরেই আজও বেঁচে আছে এই হুমান রান্নার ঐতিহ্য।
এবার ফিরে আসি আমার আজকের রান্নার কথায়। বিশ্বাস করুন, এই রান্নার স্বাদ একবার যে খেয়েছে, সে ভুলতে পারবে না। যাঁরা বাড়িতে একবার ট্রাই করতে চান, তাঁদের জন্য রইল আমার রেসিপি।
রেসিপি:
প্রথমে নারকেলটা ভালো করে কুরিয়ে নিয়ে অল্প গরম জল দিয়ে চটকে তার থেকে ঘন নারকেলের দুধ বের করে আলাদা করে রাখুন। এরপর ছিবড়েটা আবার রেখে দিন, ওটা পরে মশলার সঙ্গে বাটা হবে।
মাছগুলো ভালো করে ধুয়ে নুন, হলুদ আর অল্প কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো মাখিয়ে দশ মিনিট রেখে দিন।
এবার একটা শুকনো কড়াইতে গোটা ধনে, জিরা, গোলমরিচ, অল্প মেথি আর শুকনো লঙ্কা একসঙ্গে দিয়ে কম আঁচে সুন্দর গন্ধ বেরোনো পর্যন্ত ড্রাই রোস্ট করে নিন। ঠান্ডা হলে এটা গুঁড়ো করে নেবেন।
এরপর মিক্সিতে ওই নারকেলের ছিবড়ে, আগে থেকে ভেজে রাখা মশলা, কয়েকটা কারিপাতা, এক টুকরো আদা, দু-তিন কোয়া রসুন, একটা ছোট পেঁয়াজ, একটা টমেটো আর একটু তেঁতুল একসঙ্গে দিয়ে একদম মসৃণ করে বেটে নিন। প্রয়োজনে অল্প জল দেবেন।
এবার কড়াইতে ওই বাটা মশলাটা দিয়ে তার দ্বিগুণ পরিমাণ জল যোগ করুন এবং কম আঁচে ফুটতে দিন। ফুটে উঠলে স্বাদমতো নুন আর সামান্য চিনি দিন। এই সময় কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়োটা দিন, তাতে রঙটা হবে গাঢ় লাল। মাঝে মাঝে নাড়তে থাকুন।
অন্য একটা কড়াইতে সর্ষের তেল বা নারকেল তেল গরম করে তাতে গোটা মেথি, কারিপাতা, সর্ষে, কুচোনো পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিন। চাইলে এই তেলে মাছগুলো দু-পিঠ হালকা করে ভেজে নিতে পারেন।
এই ধাপটা কিন্তু সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক, না করলেও চলবে। যদিও আমি আজ নারকেল তেলেই মাছটা হালকা ভেজেছি, তাতে গন্ধটা আরও ভালো খোলে।
এদিকে যখন মশলার জল ফুটে অর্ধেক হয়ে আসবে, তখন মাছগুলো আস্তে করে ছেড়ে দিন। পাঁচ মিনিট পর ওপরে আগে থেকে বের করে রাখা ঘন নারকেলের দুধটা ঢেলে দিন। আরো পাঁচ মিনিট কম আঁচে রেখে নামিয়ে নিন। মনে রাখবেন, নারকেলের দুধ দেওয়ার পর বেশি ফোটাবেন না, তাহলে দুধ ফেটে যেতে পারে।
গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন। আর যদি পারেন, সকালে রান্না করে রাতে খাবেন। তখন মশলা মাছের ভেতরে ঢুকে স্বাদ হবে আরো দশ গুণ।


