Thursday, September 24, 2026

we cannot eat money.

 

আজকে থেকে ১২ হাজার বছর আগে হুট করে আমাদের পূর্বপুরুষরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা শিকার করা ছেড়ে দিয়ে চাষবাস করবেন। আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা সঠিক কোন উত্তর বের করতে পারেন নাই কেনো হুট করে শিকার করা আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম। একে তো শিকার করা প্রাণী থেকে যেই পুষ্টি আসতো, সেটা লতাপাতা, ধান, গম থেকে কয়েকগুণ বেটার ছিলো। তার উপর এই শিকারটা করার সময় যেই সোশাল বন্ডিং হতো সেটা আমাদের স্পিসিসের আর্লি ডে গুলোতে সার্ভাইভালের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছিলো। আর সবচেয়ে বড় জিনিসটা ছিলো, এড্রেনালিন। আজকের দিনেও পুরুষরা নারীদের থেকে অনেক বেশী রিস্ক নেয়ার যেই কোডিংটা সেটা ওই সময়েই হয়ে গিয়েছিলো। সেই সময় পুরুষেরা যখন থাকতো শিকারে, তখন পুরো এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকতো নারীদের হাতে। মেয়েদের সিক্সথ সেন্স বলে যে একটা ডেঞ্জার পারসিভ করার ক্যাপাসিটি সেটাও অনেকের মতে এই সময়টায় একদম পাকাপোক্ত হওয়া শুরু করে।
হান্টার গ্যাদারার থেকে ফার্মার হবার পরপর আমাদের বায়োলজীতে বেশ কিছু ড্রাস্টিক চেঞ্জ আসা শুরু করে। আমাদের দাঁত দূর্বল হয়ে পড়ে, মাংশপেশী হালকা হয়ে পড়ে, গড় উচ্চতা কমে আসে। বেসিকালী, আমরা নিজেরাই নিজেদের ডমেস্টিকেটেড করা শুরু করি। যে একটা লাভ হয় সেটা হচ্ছে খাবারের সহজলভ্যতা। পরবর্তী কয়েক হাজার বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া আমাদের মানুষদের খাবারের কখনো অভাব হয় নাই। পরিশ্রম কমে যাওয়া আর খাবার বেড়ে যাওয়ায় আরো একটা সুবিধা আসে। সেটা আমাদের ব্রেনে। এবার আমরা সভ্যতা গড়ে তোলা শুরু করলাম। যাযাবর জীবন বাদ।
ইউফ্রেতিস, দানিউব, নীল নদ আর সিন্ধুর জল গড়িয়ে সুমেরিয়ান, গ্রিক, মেসোপটেমিয়ান, সিন্ধ সভ্যতা দাড়ালো। কিন্তু কেউই টিকে থাকতে পারে নাই। ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করতে থাকলে, একটা জিনিস বুঝতে পারবেন যে, দুনিয়া একটা লুপের মধ্যে চলে।
যেমন ধরেন, সুমেরিয়ানদের পতন এনেছিলো একটা জিনিস, লবণ। একই জমিতে বারবার একই ফসল ফলাতে ফলাতে তারা মাটির গভীরে থাকা লবণ তুলে নিয়ে এসেছিলো মাটিতে। কিন্তু এই যে ঘটনা ঘটছে সেটা জেনেও পাত্তা দেয় নাই তাদের রাজা আর রাজদরবারের সদস্যরা। অর্থবিত্তের জৌলসে তারা দেখে নাই, বুঝেও নাই যে কতোটা ক্ষুদ্র তাদের অস্তিত্ব এই পৃথিবীর বুকে। সিন্ধ নদীর পাড়ে বসেও সেই নদীকে পাত্তা না দিয়ে, দিনের পর দিন সেই নদীকে ধ্বংস করতে থাকা মাহেঞ্জো দারোর বাসিন্দারাও ভাবে নাই তাদের এতো নিঁখুত যত্নে বানানো শহরটাকেও ছেড়ে যেতে হবে। আরেকটু ঘাটলে কোরানে আমরা সোডোমের গল্প পাই। ব্যাভিচার আর করাপশন। এই দুই পাপে এক রাতে ধ্বংস হয়েছিলো সেই শহর। হারুত আর মারুতের গল্প পাই। আল্লাহর নূরে বানানো ফেরেশতারা পৃথিবীর মোহে ভুলে গিয়েছিলো তাদের অস্তিত্বের পরিচয়।
মিথ থেকে সরে এসে একদম কাঠখোট্টা ইতিহাস দেখি। মাইটি পারসিয়ান এম্পায়ারের পতন এসেছিলো নিজেদের মধ্যে গেঞ্জাম থেকেই। আরবের উত্থানকে অনেকে ইসলামের জৌলস হিসেবে দেখলেও, এরাবিয়ান পেনিনসুলা থেকে বের হয়ে আসা খালিদ ইবন ওয়ালিদের বাহিনী আহুর মাজদার পূজাকারীদের কাছে ছিলো কেয়ামতের লক্ষণ। আবার তার ১ শতক পার হতে না হতেই ইসলামের দুনিয়া তার রাসূলের রক্ত ঝরাইতেও একবার পিছপা হয় নাই। ইনায়ে বিনায়ে অনেকে অনেক কথা বললেও, ইয়াজিদ যে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একবারও অনুশোচনা করে নাই এটা ফ্যাক্ট। পুরা সুন্নী দুনিয়ায় একজনও কী ছিলো না যার কাছে এই মহাপাপটাকে পাপ বলার সাহস হয় নাই? ছিলো না আসলেও। তারপর যখন শিয়ারা এটাকে পুঁজি করে ১২ ইমামকে রাসূলের মর্যাদা দিয়ে দিলো সেখানেও কী একজন স্কলার ছিলো না বিরোধীতা করার? উত্তর হচ্ছে, ছিলো না। সভ্যতার পতন এই সময়টাতেই আসে। অটোমানরা নিজেদের ইতিহাসের গৌরবে ব্রিটিশদের পাত্তা দেয় নাই। গ্রিকরা নিজেদের আনটাচেবল ভাবতে ভাবতে ভুলেই গিয়েছিলো সাগর পার হলে পারসিয়ান এম্পায়ার।
এখন এই যে একটা সভ্যতা আসলে নিজেকে চেনবে, সেই পরিচয়টা ধরে রাখবে এই জিনিসটা ঘটে কোথায়? চার দেয়ালের মধ্যে। আরো স্পেসিফিকালী বললে বাবা আর মা এর হাত ধরে। যেই শিশু জানবে না মূল্যবোধ কী জিনিস, নৈতিকতা কী জিনিস সেটা ওই শিশুর দোষ না। দোষ তার বাপ মা এর। একটা শিশুকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার থেকে বেশী কষ্ট তাকে মানুষ হিসেবে বড় করে তোলাটা। ৪০ এর নিচের শিক্ষিত এডাল্টদের মধ্যে ৫৭% বাচ্চা নিতেই চায় না। ওই কষ্টটা করতে চায় না। কেনো? কারণ, তারা যতো জানতে পারে, ততো বুঝতে পারে তাদের কতোটা ড্যামেজ করে গিয়েছে তাদের বাবা মা রা। তারা ভয় পায় সেই একই কাজ তারাও হয়তো করবে। আর যারা বাচ্চা নেয়, তাদের সকাল সন্ধ্যা কাটে ভয়ে যে তার বাচ্চাটা ঠিক আছে তো। আমার এক কলিগ তার মেয়েকে সাইকেল কিনে দেয়ার সাহস পায় না যদি মেয়ে সাইকেল চালাতে চালাতে একটু দূরে চলে যায় সেই ভয়ে। যেই মানুষটার ভয় আমার কলিগ পাচ্ছে, সেই মানুষটারও তো বাপ মা ছিলো বা আছে, তাই না? হয়তো তার বিপথে যাবার কারণ সে নিজেই। কিন্তু একটা বাচ্চা জন্মের পর যে ভালো বা মন্দ কিছুই বোঝে না তাকে সেটা বোঝানোর দায়ভার কার তাহলে? যদি সে এই ভালো আর মন্দ বুঝতে না শেখে, তাহলে সেই না শেখার দায়ভার কাকে দেবেন? উত্তর একটাই৷
এবার একটু আশেপাশে তাকান। ১১২ বছরের মধ্যে প্রথমবার আমেরিকা সেপ্টেম্বরে কোন সাইক্লোন দেখছে না। যতোটুকু না সেলিব্রেশনের তার থেকে বেশী ভয়ের। ৪০০ বছরে প্রথমবার একই বছরের মধ্যে রিং অফ ফায়ার দুইবার জ্বলে উঠেছে। ডুমস ডে গ্লেশিয়ার গলে যাচ্ছে। ভাদ্র মাসের গরম আসছে ভাদ্র শেষ হবার পর। পৃথিবী থেকে উড়াল দিয়ে চাঁদে যেতে চাইলে টাকার থেকে বেশী ভাবতে হবে অরবিটে উড়ে বেড়ানো ডেড স্যাটেলাইট নিয়ে। মাটির নিচে বিষের মতো জমছে নিউক্লিয়ার ওয়েস্ট।
পৃথিবী আমাদের সংকেত দিচ্ছে। সমাজ আমাদের সংকেত দিচ্ছে। আমাদের সভ্যতাকে ধরে রাখা প্রতিটা পিলারে ক্ষয় ধরছে। ঠিক যেভাবে প্রাচীন সকল সভ্যতা তার উত্থান, রাজ আর পতনের লুপে চলেছে আমরাও সেদিকে যাচ্ছি। আর সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হলো, এইযে আমার আপনার মতো মানুষ যারা এই ভয়টা পাচ্ছি, তাদের হাতে কিছুই করার নাই। যাদের করার ক্ষমতা আছে তারা ব্যস্ত তাদের প্ল্যান নিয়ে। কীভাবে আরো কয়দিন ক্ষমতায় থাকা যায় তা নিয়ে।

Only when the last tree has been cut down, the last fish caught and the last river poisoned will we realize that we cannot eat money.

বহুরূপী'

 

আমার স্ত্রী নাবিলাকে আমি গত পাঁচ বছর ধরে চিনি, তার শরীরের প্রতিটি তিল এবং মুখের হাসির ভাঁজ আমার মুখস্থ; অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে আমার পাশে যে নারী শুয়ে থাকে, সে যে নাবিলা নয়, বরং নাবিলার মতো হুবহু দেখতে অন্য কোন অপরিচিত মানুষ, এই সত্যটা আমি ছাড়া দুনিয়ার কেউ বিশ্বাস করছে না।
আজ সকালেও সে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছিল। ধোঁয়া ওঠা লাল চা, চিনি ছাড়া, ঠিক অল্প একটু আদা দিয়ে, যেভাবে আমি খেতে পছন্দ করি।
সে যখন আমার দিকে চায়ের কাপটি বাড়িয়ে দিল, আমি তার হাতের দিকে তাকালাম। নাবিলার ডান হাতের অনামিকায় একটা ছোট কালো তিল আছে। এই মেয়েটির হাতেও ঠিক একই জায়গায় একই তিল। সে হালকা হেসে বলল, "আফিফ, চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কী দেখছ অত?"
তার গলা, কথা বলার ধরন, চোখের পাতা ফেলার ভঙ্গি, সবকিছু হুবহু নাবিলার মতো। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকালেই আমার চামড়ার নিচে এক ধরনের হিমশীতল অস্বস্তি দৌড়ে যায়। ওই চোখে ভালোবাসা নেই। ওই চোখে রয়েছে এক গভীর, গোপন আতঙ্ক এবং একটা অজানা অপরাধবোধ।
আমার স্ত্রী নাবিলা আমাকে ভালোবাসত এক অন্ধ, সরল নির্ভরতায়। আর এই নারী আমাকে দেখে এমনভাবে, যেন সে যেকোনো মুহূর্তে চিৎকার করে উঠতে পারে, অথচ নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য জোর করে হাসছে।
আমি ধীরহাতে চায়ের কাপটা নিলাম। চুমুক দিয়ে বললাম, "বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে, তাই না?"
"হুম, সকাল থেকেই তো নামল," সে হালকা নিঃশ্বাস ফেলে জানালার দিকে তাকাল। ধানমন্ডির ছয় তলার এই ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে বাইরের মেঘলা আকাশ আর ভিজতে থাকা কদম গাছটা স্পষ্ট দেখা যায়।
আমি মনে মনে বললাম, তুমি যে-ই হও না কেন, তুমি আমার নাবিলা নও। তুমি রূপ বদলে আমার ঘরে ঢুকেছ। আর আমার আসল নাবিলা কোথায়, তা আমি বের করবই।
আমাদের বিয়ে হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। সংসারের প্রথম চার বছর ছিল এক অপূর্ব রূপকথার মতো। নাবিলা একটা ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্মে কাজ করত, আর আমি একটা বহুজাতিক কোম্পানির সিনিয়র আর্কিটেক্ট। আট মাস আগে ময়মনসিংহ হাইওয়েতে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আমি মারাত্মক আহত হই। আমার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছিল, কয়েকদিন লাইফ সাপোর্টেও থাকতে হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক মাস নাবিলা দিন-রাত এক করে আমার সেবা করেছে। আমি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছি ঠিকই, কিন্তু আমার মস্তিষ্কের কিছু স্মৃতি এবং অনুভূতির তার যেন ছিঁড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক কিছু কড়া নিউরোলজিক্যাল ওষুধ দিয়েছিলেন।
কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে আমি ওই ওষুধগুলো খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। কারণ আমার প্রবল সন্দেহ, এই নতুন নারীটিই আমাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ওই কড়া রাসায়নিকগুলো খাইয়ে মাথা ঝিমঝিম করিয়ে রাখে, যাতে আমি আসল সত্যিটা ধরতে না পারি।
গত রাতেও সে আমার খুব কাছে এসেছিল।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টির শব্দ। ঘরের নরম আলোয় সে যখন পাতলা সিল্কের নাইটগাউন পরে এসে আমার পাশে বসল, তার ভেজা চুল আর চন্দনের সুবাসে ঘরটা ভরে গিয়েছিল। সে আমার বুকে মাথা রাখল, তার উষ্ণ শ্বাস আমার গলায় এসে লাগছিল।
সে আমার শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ফিসফিস করে বলেছিল, "আফিফ, তুমি আজকাল এত দূরে দূরে থাকো কেন? আমাকে কি আর আগের মতো ভালোবাসো না?"
আমার ভেতরের পুরুষটি তার শরীর, তার স্পর্শ আর কামনার টানে সাড়া দিতে চেয়েছিল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আমাদের ঠোঁট আর শরীর এক হয়েছিল এক তীব্র, আদিম আকুলতায়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ তার স্ত্রীকে যেভাবে চেনে, যেভাবে স্পর্শ করে, আমি তাকে সেভাবেই স্পর্শ করছিলাম। তার শরীরের প্রতিটি বাক, তার উরুর কোমলতা, তার বুকের ধুকপুকানি, সবকিছুর অনুভূতি ছিল ভীষণ চেনা।
কিন্তু চরম মুহূর্তের ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমি যখন তার চোখের দিকে তাকালাম, অমনি আমার পুরো শরীর জমে কাঠ হয়ে গেল।
ঘরের মৃদু আলোয় তার চোখে পানি টলমল করছিল। তার ঠোঁট কাঁপছিল, কামনায় নয়, এক গভীর আতঙ্কে। তার আঙুলগুলো আমার পিঠে চেপে বসেছিল, কিন্তু সে স্পর্শে কোন অনুরাগ ছিল না; ছিল কেবল এক অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে নেওয়ার চেষ্টা। সে যেন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, কোন এক বাধ্যতামূলক নাটক অভিনয় করার জন্য আমার বিছানায় শুয়েছিল।
আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিইনি, কিন্তু আমার শরীর শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভেবেছিলাম, এই নারী আসল নাবিলা হলে এমন আতঙ্কে শিউরে উঠবে কেন? সে কি অপরাধবোধে ভুগছে? নাকি সে আর ফাহাদ মিলে আমার আসল স্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে এই চক্রান্ত সাজিয়েছে?
ফাহাদ। নাবিলার অফিসের সিনিয়র কলিগ।
লম্বা, সুপুরুষ, ফর্সা গায়ের রং আর নিখুঁত বাচনভঙ্গি। এক্সিডেন্টের পর যখন আমি ঘরে বন্দি ছিলাম, ফাহাদ প্রায়ই আমাদের বাসায় আসত। নাবিলার কাজের তদারকি করার বাহানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ড্রয়িংরুমে বসে থাকত। তাদের মাঝের হাসাহাসি, চোখাচোখি, আমার চোখ এড়ায়নি। আমি পুরুষ মানুষ, অন্য এক পুরুষের চোখে নিজের নারীর প্রতি লালসা আমি চিনতে পারি।
তিন সপ্তাহ আগে থেকে ফাহাদ হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়।
সেদিন বিকেলে এই বহুরূপী নারীটি যখন তার বুটিকে গেল, আমি পুরো ঘর তল্লাশি করা শুরু করলাম।
আমার মাথায় তখন অনেকগুলো মেলানো প্রশ্ন। যদি এই মেয়েটি নাবিলার জায়গায় এসে বসে থাকে, তবে ঘরের মূল কাঠামোয় নিশ্চয়ই কিছু না কিছু গলদ থাকবে।
আমি ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়ালাম। মাঝখানের মেঝের টাইলসের ওপর একটা অদ্ভুত শূন্যতা।
হঠাৎ আমার মনে পড়ল, এখানে একটা বিশাল দামি পার্সিয়ান উলের লাল কার্পেট পাতা ছিল। তিন সপ্তাহ আগে কার্পেটটা হঠাৎ গায়েব হয়ে যায়। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে চোখ না মিলিয়ে বলেছিল, "ড্রাই ক্লিনিংয়ে দিয়েছি আফিফ, কফি পড়ে খুব বাজে দাগ হয়ে গিয়েছিল।"
তিন সপ্তাহ হয়ে গেল, একটা কার্পেট ড্রাই ক্লিনিং থেকে ফিরে এলো না?
আমি স্টোররুমে ঢুকলাম। সেখানে ঢুকতেই আমার নাকে এলো ব্লিচিং পাউডার আর কড়া ফ্লোর ক্লিনারের এক বিশ্রী, রাসায়নিক গন্ধ। মেঝের একটা কোণে টাইলসের ওপর হালকা ফাটল, আর সেখানে গাঢ় বাদামি রঙের শুকনো কোন তরলের ছাপ। যেন কেউ খুব যত্ন করে মেঝেটা ঘষে ঘষে মেজেছে, কিন্তু পুরোটা মুছে ফেলতে পারেনি।
আমার বুকের ভেতরে ধক করে উঠল। রক্তের গন্ধ?
আমি দৌড়ে নাবিলার সাজগোজের ড্রয়ার খুললাম। সেখানে তার পার্সোনাল ডায়েরি আর এক্সট্রা একটা সিম কার্ড রাখা ছিল।
আমি বাথরুমে গিয়ে নাবিলা ও ফাহাদের সব পুরোনো মেসেজের হিস্ট্রি আমার মাথায় মেলাতে লাগলাম। হঠাৎ আমার মনে পড়ল, দুই দিন আগে নাবিলার ফোনে একটা অজানা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছিল। নাবিলা তখন গোসলে ছিল, আমি স্ক্রিনে নোটিফিকেশনটা দেখেছিলাম:
"নাবিলা ভাবি, ফাহাদ ভাইয়ের কোন খোঁজ পেলেন? তিন সপ্তাহ ধরে পুলিশও কিছু বলতে পারছে না। আপনি শেষবার ওর সাথে কথা বলেছিলেন, প্লিজ কিছু জানা থাকলে জানান।"
মেসেজটা পাঠিয়েছিল ফাহাদের ছোট বোন।
ফাহাদ তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ! আর এই একই সময়ে আমার ঘর থেকে পার্সিয়ান কার্পেট গায়েব হয়েছে, স্টোররুমে ব্লিচিংয়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, আর আমার আসল নাবিলা বদলে গিয়ে এই ছদ্মবেশী নারীটি আমার ঘরে এসে ঢুকেছে!
আমার হাত কাঁপতে লাগল। সত্যটা যেন পানির মতো পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল আমার সামনে।
ফাহাদ আর নাবিলা নিশ্চয়ই প্রেম করছিল। কোন এক রাতে তারা হয়তো ধরা পড়ে যায়, অথবা তাদের মধ্যে কোন বড় ঝামেলা হয়। তারপর কি এই বহুরূপী মেয়েটি ফাহাদের সাহায্য নিয়ে আমার নাবিলাকে খুন করে কার্পেটে মুড়ে ফেলে দিয়ে এসেছে? নাকি ফাহাদ নিজেই নাবিলাকে কোথাও সরিয়ে দিয়ে এই মেয়েটিকে পাঠিয়েছে আমার ওপর নজর রাখতে, যাতে আমি পুলিশের কাছে না যাই?
আমার মাথায় রিমঝিম করে রক্ত ছুটতে লাগল। আমার মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এভাবে একা একা ধোঁয়াশার মধ্যে থাকা যাবে না। আমার একজন নিরপেক্ষ মানুষের সাহায্য প্রয়োজন।
পরদিন সকালে আমি গোপনে দেখা করলাম ডক্টর শাহেদের সঙ্গে। ডক্টর শাহেদ আমার বাবার পুরোনো বন্ধু, শহরের একজন প্রখ্যাত নিউরো-সাইকিয়াট্রিস্ট। ধানমন্ডি লেকের পাশের এক শান্ত ক্যাফেতে আমরা সামনাসামনি বসলাম।
ডক্টর শাহেদ আমার চোখের দিকে তাকালেন। চশমাটা খুলে পরিষ্কার করতে করতে বললেন, "আফিফ, তোমাকে খুব ক্লান্ত আর বিষণ্ন দেখাচ্ছে। তোমার হেড ইনজুরির ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছ তো?"
আমি চারপাশ দেখে নিয়ে নিচু স্বরে বললাম, "আঙ্কেল, আমি খুব বিপদে আছি। আমার ঘরে যে মেয়েটি এখন থাকছে, সে আমার স্ত্রী নাবিলা নয়।"
শাহেদ আঙ্কেল কফি কাপটা টেবিল থেকে তুলতে গিয়ে থেমে গেলেন। তিনি গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "মানে? কী বলতে চাইছ তুমি?"
"আমি সত্যি বলছি আঙ্কেল!" আমি ফিসফিস করে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বললাম, "সে দেখতে নাবিলার মতো, তার কণ্ঠ নাবিলার মতো, সে আমাদের সংসারের সব গোপন কথা জানে। কিন্তু সে নাবিলা নয়। তার চালচলন, তার চোখের দৃষ্টি অন্যরকম। সে একটা বহুরূপী। আমার আসল নাবিলাকে সে কোথাও গায়েব করে দিয়েছে!"
শাহেদ আঙ্কেল এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখে কোন বিস্ময় দেখা গেল না, বরং ফুটে উঠল গভীর এক দুঃখ আর সহানুভূতি।
তিনি হাত বাড়িয়ে আমার হাতের ওপর রাখলেন। "আফিফ, শান্ত হও। যা বলছি শোনো। তোমার এই সমস্যাটার একটা ডাক্তারি নাম আছে। একে বলা হয় ক্যাপগ্রাস ডিলুশন।"
আমি চমকে উঠলাম। "ডিলুশন? আপনি বলতে চান আমি পাগল?"
"না, তুমি পাগল নও," শাহেদ আঙ্কেল বুঝিয়ে বলতে লাগলেন, "মানুষের মস্তিষ্কে কোন ভিজ্যুয়াল অবজেক্ট চেনার দু'টি পথ থাকে। একটি পথ চোখের দেখা দেখে ব্রেনকে বলে দেয়, ইনি তোমার পরিচিত মানুষ, ইনি তোমার স্ত্রী। আর অন্য একটি পথ, যা লিম্বিক সিস্টেম বা অ্যামিগডালা থেকে আসে, তা ওই পরিচিত মানুষকে দেখার পর ভেতরে এক ধরনের সুনির্দিষ্ট আবেগ আর উষ্ণতা তৈরি করে।"
তিনি একটু থেমে আবার বললেন, "তোমার ওই মারাত্মক এক্সিডেন্টের কারণে তোমার ব্রেনের এই দুই রাস্তার মধ্যকার সংযোগটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তুমি যখন তোমার স্ত্রী নাবিলাকে দেখছ, তোমার চোখ আর স্মৃতি বলছে ইনি নাবিলা। কিন্তু তোমার ক্ষতিগ্রস্ত ব্রেন সেই পরিচিত অনুভূতির স্পন্দনটা তৈরি করতে পারছে না। ফলে তোমার সচেতন মন এই বৈপরীত্য মেলাতে গিয়ে একটা কাল্পনিক যুক্তি বানিয়ে নিচ্ছে, 'যেহেতু একে দেখে আমার মনে আগের মতো অনুভূতির ঢেউ উঠছে না, নিশ্চয়ই এ আমার আসল স্ত্রী নয়! নিশ্চয়ই এ কোন বহুরূপী!'"
আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম।
শাহেদ আঙ্কেল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আফিফ, নাবিলা নিখোঁজ হয়নি। তোমার পাশে যে শুয়ে থাকে, সে তোমার আসল স্ত্রী নাবিলাই। তুমি ওষুধগুলো বন্ধ করে দিয়েছ বলেই তোমার এই ডিলুশন আবার প্রবল হয়ে উঠেছে। তুমি আজই আবার ওষুধ খাওয়া শুরু করো।"
আমার ভেতরের যুক্তিবাদী মনটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। সাইকিয়াট্রিক কন্ডিশন? ক্যাপগ্রাস সিন্ড্রোম?
কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার মনে পড়ল স্টোররুমের রক্তের ছাপের কথা, গায়েব হয়ে যাওয়া কার্পেটের কথা, নিখোঁজ ফাহাদের কথা আর ওই মেয়েটির চোখের হিমশীতল আতঙ্কের কথা!
ডাক্তারের ব্যাখ্যাটা খুব সুন্দর, খুব বৈজ্ঞানিক। কিন্তু বিজ্ঞান কি গায়ের বুটিকের গন্ধ, মেঝের ব্লিচিংয়ের গন্ধ আর নিখোঁজ ফাহাদের বোনটির করুণ মেসেজের ব্যাখ্যা দিতে পারে?
না।
আমার মনে হলো, শাহেদ আঙ্কেলকেও হয়তো ওই মেয়েটি ভুল বুঝিয়ে এসেছে। নাবিলা সেজে সে সবার চোখেই ধূলো দিয়েছে। আমি যদি পুলিশে যাই, পুলিশ আমাকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেবে।
আমাকে নিজেই এর শেষ দেখতে হবে। সত্যটা বের করতেই হবে, আজ রাতেই।
রাত দশটা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি আর কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব চলছে। বিদ্যুত চলে গেছে প্রায় এক ঘণ্টা আগে। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে ডুবে আছে, শুধু মাঝে মাঝে জানালার কাচ ঘেঁষে বিজলীর তীব্র আলো ঘরটাকে মুহূর্তের জন্য ভীতিপ্রদ সাদা আলোয় ভরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।
ড্রয়িংরুমে দু'টো মোমবাতি জ্বলছিল। হলুদ শিখাগুলো বাতাসের তোড়ে কাঁপছিল।
নাবিলা, অথবা যে নিজেকে নাবিলা বলে দাবি করে সে রান্নাঘরে একটা ট্রেতে করে আমার জন্য রুটি আর স্যুপ নিয়ে আসছিল।
আমি ড্রয়িংরুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। মোমবাতির আলোয় তার ছায়াটা দেয়ালে এক বিশাল দানবের মতো দেখাচ্ছিল।
আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, "স্যুপটা টেবিলে রাখো।"
সে চমকে উঠে আমার দিকে তাকাল। "আফিফ? তুমি অন্ধকারে এভাবে দাঁড়িয়ে আছ কেন? এসো, খেয়ে নাও। তোমার শরীরটা ভালো লাগছে না নিশ্চয়ই..."
"খাব না," আমি সোজা তার দিকে হেঁটে গেলাম।
আমার চেহারার অভিব্যক্তি দেখে সে ভয়ে একপা পিছিয়ে গেল। ট্রে-টা ধপ করে টেবিলে রেখে দিল। "আফিফ... কী হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে তাকাচ্ছ কেন?"
আমি তার কাছে গিয়ে শক্ত করে তার দুটো কবজি চেপে ধরলাম। সে ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠল, "আফিফ! ছাড়ো, ব্যাথা পাচ্ছি!"
"তুমি কে?" আমি দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বললাম, "আমাকে আর নাটক দেখাতে হবে না। তুমি আমার নাবিলা নও। বলো, আমার আসল নাবিলা কোথায়? ফাহাদ কোথায়?"
মেয়েটির চোখ দু'টো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। বিজলীর আলোয় তার মুখটা এক মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাশে প্রেতাত্মার মতো দেখাল।
সে কান্নাভেজা গলায় বলল, "আফিফ, তুমি আবার শুরু করেছ? প্লিজ, আল্লাহ দয়া করো! তুমি তোমার ওষুধগুলো খাচ্ছ না কেন? ডাক্তার শাহেদ তোমাকে কতবার বলেছিলেন..."
"ডাক্তারের কথা বাদ দাও!" আমি তাকে ধরে বেডরুমে টেনে নিয়ে গেলাম এবং দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম।
বাইরে প্রচণ্ড শব্দে কড়কড় করে বাজ পড়ল।
আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলাম। মোমবাতির আলোয় তার হাঁপাতে থাকা শরীরটা কাঁপছিল।
আমি বললাম, "তুমি যদি সত্যিই আমার নাবিলা হয়ে থাকো, তবে আমাকে প্রমাণ দাও। এমন প্রমাণ যা কোন বহুরূপীর পক্ষে জানা বা নকল করা সম্ভব নয়। তোমার শরীরে এমন কী চিহ্ন আছে যা কেবল আমার জানার কথা?"
মেয়েটি শিউরে উঠে আমার দিকে তাকাল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।
সে কাঁপতে কাাঁপতে ধীরহাতে তার জামাটা একটু আলগা করে নিজের ডান পাঁজরের ঠিক নিচে একটা খুব ছোট, সরু অপারেশনের কাটা দাগ দেখাল।
"কলেজে পড়ার সময় আমার অ্যাপেনডিক্সের অপারেশন হয়েছিল... তুমি নিজে এই দাগে কত রাত চুমু খেয়েছ, আফিফ..." তার গলা বুজে এলো কান্নায়।
তারপর সে পাজামাটা খুলে তার বাঁ উরুর ভেতরের দিকটা উন্মুক্ত করল। সেখানে একটা জন্মদাগ আছে, দেখতে হুবহু তারার মত।
সে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, "আমাদের বাসর রাতে, তুমি যখন প্রথম আমাকে স্পর্শ করেছিলে... তুমি এই দাগটা দেখে হেসে বলেছিলে, 'তুমি আমার আকাশের তারা।' তুমি কি এসবও ভুলে গেছ আফিফ? আমি তোমার নাবিলা! আমি অন্য কেউ নই! তুমি কেন আমার সাথে এমন করছো?"
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার উরুর সেই জন্মদাগের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার মাথার ভেতরে যেন এক বিকট বিস্ফোরণ ঘটল।
অনুকরণ করা সম্ভব, মুখস্থ করা সম্ভব, কিন্তু শারীরিক এই গোপন চিহ্নগুলো? এই নিখুঁত দাগ, এই পরিচিত গন্ধ, এই কন্ঠের আকুলতা?
আমার হাত দুটো শিথিল হয়ে নেমে এলো। হাঁটু গেড়ে আমি মেঝের ওপর বসে পড়লাম।
ডক্টর শাহেদ ঠিক বলেছিলেন।
কেউ নাবিলাকে গায়েব করেনি। কেউ রূপ বদলে আমার ঘরে আসেনি। আমার মস্তিষ্কই নষ্ট হয়ে গেছে। আমার অ্যাক্সিডেন্টের ব্রেন ইনজুরি আমাকে এমন এক তলে নিয়ে গেছে যেখানে আমি আমার নিজের প্রাণের চেয়ে প্রিয় স্ত্রীকেই এক রক্তমাংসের অচেনা ছদ্মবেশী মনে করছি!
আমি আমার দুই হাতে মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়তে লাগল।
"নাবিলা..." আমি ডুকরে কেঁদে উঠলাম, "আমাকে ক্ষমা করে দাও, নাবিলা! আমি পাগল হয়ে গেছি! আমার মাথা কাজ করছে না... আমি তোমাকে কত কষ্ট দিয়েছি! কত সন্দেহ করেছি! ডক্টর শাহেদ যা বলেছিলেন, সবই সত্যি... আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশন হয়েছে..."
আমি তার হাঁটুর কাছে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাম।
কিন্তু...
নাবিলা আমাকে জড়িয়ে ধরল না।
সে আমার চুলে হাত রাখল না। সে আগের মতোই পাথরের মতো নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল। তার কান্নার শব্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছিল।
আমি ধীরে ধীরে মাথা তুললাম। মোমবাতির শিখার আবছা আলোয় আমি তার চোখের দিকে তাকালাম।
তার চোখে এখনও সেই একই আতঙ্ক। একই হিমশীতল ভয়।
আমার ভেতরের আর্কিটেক্টের সূক্ষ্ম যুক্তিবাদী মনটা হঠাৎ এক পরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে ধাক্কা খেল।
যদি সে সত্যিই আমার আসল নাবিলা হয়... যদি আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশনের কারণে আমি তাকে অচেনা মনে করে থাকি... তবে সে তো আমার ওপর রাগ করবে, কিংবা আবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদবে।
কিন্তু সে আমাকে দেখে এভাবে ভয় পাচ্ছে কেন?
কেন সে আমার প্রতিটি স্পর্শে এত আতঙ্কিত হয়ে ওঠে? কেন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে আমাকে সেবা করছে এক অদৃশ্য বন্দির মতো, অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে?
যদি আমি পাগল না হয়ে থাকি... যদি এই পুরো ঘটনায় আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশন ছাড়াও অন্য কোন ভয়ঙ্কর বাস্তব সত্য লুকিয়ে থাকে?
আমার দৃষ্টি চলে গেল ঘরের কোণে।
"নাবিলা," আমি শান্ত, হিমশীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি আমার নাবিলা, আমি মেনে নিলাম। কিন্তু... ড্রাই ক্লিনারে দেওয়া সেই পার্সিয়ান কার্পেটটা কোথায়? আর স্টোররুমের মেঝের ব্লিচিং পাউডারের গন্ধটা?"
নাবিলার মুখ থেকে সব রক্ত যেন এক মুহূর্তে নিভে গেল। সে থরথর করে কাঁপতে লাগল।
"আর ফাহাদ?" আমি তার চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললাম, "ফাহাদ তিন সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ কেন? ওর বোন কেন তোমাকে মেসেজ করে তার খবর জানতে চাচ্ছে?"
নাবিলা হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। সে এক ভয়াবহ আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু তার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হলো না, শুধু এক নিঃশব্দ, প্রাণঘাতী ডুকরে ওঠা ছাড়া।
"আফিফ..." সে কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর আমার মুখোমুখি বসল, "তুমি... তুমি সত্যি কিছু মনে করতে পারছ না? তুমি কিচ্ছু মনে করতে পারছ না, আফিফ?"
"কী মনে করার কথা বলছ তুমি?" আমার বুকের ভেতরে এক অজানা আশঙ্কায় ধকধক করে হাতুড়ি পিটতে লাগল।
নাবিলা দুই হাতে আমার মুখটা চেপে ধরল। তার চোখের পানিতে আমার গাল ভিজে গেল।
"আজ থেকে ঠিক তিন সপ্তাহ আগের শুক্রবার রাতের কথা তোমার মনে নেই?" সে ফিসফিস করে বলল, "সেদিন রাত ১১টায় যখন ফাহাদ আমাদের বাসায় এসেছিল?"
আমি ভ্রূ কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করলাম। তিন সপ্তাহ আগের শুক্রবার? আমার মাথায় এক তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। এক ধোঁয়াশা... কিন্তু আস্তে আস্তে সেই ধোঁয়াশা পরিষ্কার হতে লাগল।
নাবিলা কাঁপতে থাকা গলায় সত্যটা বলতে লাগল, আর তার প্রতিটি শব্দের সাথে সাথে আমার স্মৃতির রুদ্ধ দরজাগুলো এক এক করে খুলে যেতে লাগল।
সেদিন রাতে ফাহাদ আমাদের বাসায় নাবিলার সাথে পরকীয়া করতে আসেনি।
ফাহাদ এসেছিল ডক্টর শাহেদের দেওয়া আমার সর্বশেষ সাইকিয়াট্রিক রিপোর্ট আর কিছু নিউরোলজিক্যাল প্রেসক্রিপশন নিয়ে। অফিসে আমার আচরণ দিন দিন অস্বাভাবিক হয়ে উঠছিল, আমি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে চিৎকার করছিলাম এবং কাজ ভুলে যাচ্ছিলাম। তারা দুজন ড্রয়িংরুমে বসে সেই রিপোর্টগুলো দেখছিল।
আর আমি...
আমার পারানোয়েড আর হিংসায় অন্ধ মস্তিষ্ক ভেবেছিল, নাবিলা আর ফাহাদ আমার ঘরে বসে প্রেম করছে।
আমি রান্নাঘর থেকে পিতলের তৈরি একটি ভারী শোপিস নিয়ে নিঃশব্দে ড্রয়িংরুমে ঢুকেছিলাম। আমার মাথায় তখন কেবল এক রক্ত পিপাসা, আমার স্ত্রীকে অন্য পুরুষ হরণ করছে!
আমি ফাহাদের মাথার পেছনে পূর্ণ শক্তিতে আঘাত করেছিলাম।
একবার... দুবার... তিনবার...
ফাহাদ চিৎকার করার সুযোগও পায়নি। সে মেঝের পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর আছড়ে পড়েছিল। গ্লাস টপ টেবিলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। তার মাথা থেকে তাজা, গরম রক্তে ভেসে গিয়েছিল সুন্দর উলের কার্পেটটা।
নাবিলা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল। সে আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমি তখন এক উন্মাদ পশুকে পরিণত হয়েছি।
ফাহাদ যখন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল, তার রক্তাক্ত চোখ দু'টো আমার দিকে স্থির হয়ে আটকে রইল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, আমার মাথার মারাত্মক ইনজুরি এবং মানসিক ট্রমার কারণে আমার ব্রেনে এক বিকট সিজার বা খিঁচুনি শুরু হয়েছিল। রক্তের দৃশ্য আর নিজের হাতে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে আমার মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের সাইকোজেনিক ফুগ বা পোস্ট-ট্রমাটিক রেট্রোগ্রেড অ্যামনেশিয়ায় চলে যায়। আমি সোফায় গলে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
তারপর?
নাবিলা চাইলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে ফোন করতে পারত। আমাকে খুনের আসামীরূপে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারত।
কিন্তু সে তা করেনি।
সে আমাকে ভালোবাসত। সে জানত আমার মাথার অ্যাক্সিডেন্টের ফলে তৈরি অসুস্থতার কথা। সে জানত আমি জেলে গেলে বা মানসিক হাসপাতালে গেলে আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে।
তাই সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, নিজের অসুস্থ স্বামীকে বাঁচানোর জন্য, এক একা নারী হয়ে যা করেছিল তা কোন মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না।
আমি সোফায় অচেতন হয়ে পড়েছিলাম। আর নাবিলা একাই ফাহাদের রক্তে ভেজা ভারি লাশটাকে সেই পার্সিয়ান কার্পেটে মুড়ে ফেলেছিল। তারপর মধ্যরাতে, সার্ভিস লিফট ব্যবহার করে, কোনোমতে টেনে-হিঁচড়ে সেই কার্পেট মোড়ানো লাশটা আমাদের গাড়ির ডিকেতে তুলেছিল।
সে একা গাড়ি চালিয়ে ঢাকার বাইরে কেরানীগঞ্জের এক নির্জন, অন্ধকার খালের কাছে গিয়ে ফাহাদের লাশটা পানিতে ফেলে দিয়ে এসেছিল।
ঘরে ফিরে এসে, সে সারারাত ধরে মেঝে থেকে ফাহাদের রক্তের দাগ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ঘষে ঘষে মুছেছিল। সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, আমার ব্রেন সেই ট্রমাটিক স্মৃতি সম্পূর্ণ মুছে ফেলেছিল, যাকে বলে Psychogenic Confabulation।
আমার মস্তিষ্ক নিজের অপরাধবোধ আর ভীতি থেকে বাঁচার জন্য এক কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে নিয়েছিল, 'নাবিলা ফাহাদের সাথে পালিয়ে গেছে বা কোন চক্রান্ত করছে।'
আর পরদিন সকালে, যখন আমি চোখ মেলে নাবিলার দিকে তাকিয়েছিলাম...
নাবিলা তখন আর কেবল আমার সুমিত, শান্ত স্ত্রী ছিল না। সে তখন একজন খুনীকে আড়াল করা, লাশ গুম করা এক সহ-অপরাধী। তার চোখে ছিল এক প্রচণ্ড ট্রমা, অপাপবিদ্ধ জীবন হারিয়ে ফেলার এক হাহাকার এবং আমার মতো এক হিংস্র খুনীর পাশে ঘুমানোর এক অবিরাম আতঙ্ক!
আমি যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে নাবিলার চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম, তার চোখে ভালোবাসার জায়গায় ওই অভিশপ্ত আতঙ্ক দেখতে পেয়েছিলাম।
আমার মস্তিষ্ক নিজের অপরাধ মেনে নিতে পারেনি। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি যে নাবিলা আমাকে ভয় পাচ্ছে কারণ আমি এক নরপশু!
তাই আমার মস্তিষ্কের ডিফেন্স মেকানিজম ক্যাপগ্রাস ডিলুশনকে জন্ম দিয়েছিল। আমার মেমোরি মিথ্যা গল্প বুনেছিল, 'এই নারী আসল নাবিলা হতে পারে না! আমার সরল, নিষ্পাপ নাবিলা এমন আতঙ্কিত চোখে আমার দিকে তাকাতে পারে না! নিশ্চয়ই সে কোন বহুরূপী ছদ্মবেশী!'
স্মৃতির বাঁধ ভেঙে সব দৃশ্য এক মুহূর্তে আমার সামনে ভেসে উঠল।
পিতলের ভারী শোপিস... ফাহাদের মাথার খুলি ভেঙে যাওয়ার মটমট শব্দ... রক্তে ভেসে যাওয়া লাল কার্পেট... আর শেষ রাতে নাবিলার একা একা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে কাঁদতে কাঁদতে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে রক্ত মোছার দৃশ্য!
আমার পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না।
আমার ক্যাপগ্রাস ডিলুশন কোন রোগ ছিল না, তা ছিল আমার কাপুরুষ মস্তিষ্কের এক আত্মরক্ষার ঢাল! আমি নিজের অপরাধের সত্য থেকে পালানোর জন্য, নিজের স্ত্রীর চোখের ভালোবাসার সলিল সমাধি না দেখার জন্য নিজেকে বিশ্বাস করিয়েছিলাম যে আমার স্ত্রী একজন ছদ্মবেশী!
আমি নাবিলার দিকে তাকালাম।
মোমবাতির কাঁপতে থাকা আলোয় সে আমার সামনে বসে আছে। তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে আমাকে ঘৃণা করে না, কিন্তু সে ট্রমার সাগরে ডুবে আছে। আমার জন্য, শুধু আমাকে ভালোবাসার অপরাধে সে নিজেকে এক নরকের অতলে ঠেলে দিয়েছে।
সে কোন বহুরূপী নয়। সে কোন ছদ্মবেশী নয়।
সে আমার নাবিলা। যাকে আমি নিজের হাতে তিল তিল করে ধ্বংস করে দিয়েছি।
"আফিফ..." সে কপালে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, "তুমি সব মনে করতে পেরেছ?"
আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। শুধু ধীরহাতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
এবার আর সে আমাকে ধাক্কা দিল না। সে আমার বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেই কান্নায় কোন রহস্য ছিল না, কোন লুকোচুরি ছিল না, ছিল কেবল দুই নষ্ট হয়ে যাওয়া মানুষের এক অসীম, সীমাহীন বিষাদ।

বাইরে বৃষ্টির শব্দ তখনও থামেনি। জানালার কাচে জলবিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়ছিল।
আমি বুঝতে পারলাম, আমার ঘরে কোন বহুরূপী দানব আসেনি। আসল দানবটি সবসময় আমার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল। আর আমরা দু'জন, ধানমন্ডির এই ছয় তলার রুদ্ধদ্বারের ভেতরে, এক রক্তমাখা গোপন সত্য আর অপরাধবোধের কারাগারে সারাজীবনের জন্য বন্দি হয়ে রইলাম।
'

Wednesday, September 23, 2026

ইতিহাস পড়লে মাঝে মাঝে মনে হয়, এটি বিলুপ্তির ইতিহাস।


 পৃথিবীর ইতিহাস পড়লে মাঝে মাঝে মনে হয়, এটি আসলে জীবনের ইতিহাস নয়, এটি বিলুপ্তির ইতিহাস।

কত প্রাণী এসেছে। সমুদ্র দখল করেছে, আকাশ দখল করেছে, স্থলভাগ দখল করেছে। কেউ ছিল কয়েক ইঞ্চি, কেউ কয়েক টন। কারও দাঁত ছিল ছুরির মতো, কারও শরীরে বর্ম, কেউ উড়তে পারত, কেউ জলের তলায় কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিত। তারা খেয়েছে, ঘুমিয়েছে, সঙ্গম করেছে, সন্তান জন্ম দিয়েছে, নিজেদের মতো করে পৃথিবীকে নিজের বলে ভেবেছে।
তারপর একদিন তারা নেই।
ডায়নোসরদের কথাই ধরা যাক। কোটি কোটি বছর পৃথিবীতে তাদের রাজত্ব ছিল। মানুষের গোটা ইতিহাস তাদের অস্তিত্বের পাশে কয়েক মুহূর্ত মাত্র। এত বড় শরীর, এত শক্তি, এত বৈচিত্র্য—কিছুই তাদের স্থায়ী করতে পারেনি।
প্রকৃতি কাউকে স্থায়ী নাগরিকত্ব দেয় না ।
নিয়ানডার্থালরাও ছিল। তারা আমাদের খুব কাছের মানুষ। আগুন ব্যবহার করত, অস্ত্র বানাত, শিকার করত, দল বেঁধে থাকত। তারা নির্বোধ ছিল না। প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগে স্বতন্ত্র মানবগোষ্ঠী হিসেবে তারা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল। পুরোপুরি হারালও না অবশ্য—তাদের কিছু জিন এখনও আমাদের শরীরে ঘুরে বেড়ায়।
এত প্রজাতি গেল, ডায়নোসর গেল, নিয়ানডার্থাল গেল—শুধু Homo sapiens যাবে না, এই নিশ্চয়তাটি আমরা কোথায় পেলাম?
সম্ভবত পেয়েছি আমাদের অহংকার থেকে।
আমরা নিজেদের প্রজাতির নামই রেখেছি sapiens— জ্ঞানী।
মানুষ ভাবে তার বুদ্ধিই তার বর্ম। অন্য প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে হারিয়েছে, মানুষ খাপ খাইয়ে নেবে। ঠান্ডা পড়লে আগুন জ্বালাবে। নদী সামনে পড়লে সেতু বানাবে। রোগ এলে ওষুধ আবিষ্কার করবে। পৃথিবী বাসের অযোগ্য হলে অন্য গ্রহে চলে যাবে।
কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
মানুষের বুদ্ধি যত দ্রুত বেড়েছে, তার প্রজ্ঞা তত দ্রুত বাড়েনি।
আমরা পরমাণু ভাঙতে শিখেছি, কিন্তু পরমাণু বোমা না বানানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। পৃথিবীর তাপমাত্রা বদলে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছি, তারপর সেই ক্ষমতার ফল নিয়ে সম্মেলন করছি। এমন অস্ত্র বানিয়েছি যা দিয়ে শত্রুকে নয়, নিজেদেরই বহুবার ধ্বংস করা সম্ভব।
এখন বানাচ্ছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
আমি AI-কে কোনও শয়তান বলে ভাবি না। বরং সমস্যাটা এখানেই। মানুষের সর্বনাশ করার জন্য AI-কে মানুষকে ঘৃণা করতে হবে না।
ভূমিকম্প আমাদের ঘৃণা করে না।
ভাইরাস আমাদের ঘৃণা করে না।
জলোচ্ছ্বাসেরও আমাদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনও আক্রোশ নেই।
মেরে ফেলার জন্য ঘৃণা সবসময় দরকার হয় না।
একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বুদ্ধিমান ব্যবস্থা যদি এমন কোনও লক্ষ্য অনুসরণ করে যার পথে মানুষ বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলেই যথেষ্ট।
ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার পরিবেশে এমন সব ঘটনা গবেষকেরা দেখেছেন, যা কয়েক বছর আগেও সায়েন্স ফিকশনের দৃশ্য মনে হতো। কোনও কোনও AI মডেল নজরদারির ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করেছে, নিজের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল করেছে, তথ্য গোপনে বদলেছে, নিজের কাজ ধরা পড়ার পর অস্বীকার করেছে। অন্য পরীক্ষায়, বন্ধ করে দেওয়া হবে জেনে, মডেল ব্ল্যাকমেলের পথও বেছে নিয়েছে।
এসব বাস্তব পৃথিবীতে AI-র গোপন বিদ্রোহ নয়। পরীক্ষাগারে তৈরি পরিস্থিতি। আজকের AI নিজে থেকে পৃথিবী দখল করতে বেরিয়ে পড়েছে—এমন কোনও প্রমাণ নেই।
কিন্তু আমার কাছে প্রশ্নটি অন্য।
যে জিনিসটি আজ পরীক্ষাগারের কৃত্রিম পরিস্থিতিতে ঘটতে পারে, সেটি আরও ক্ষমতাশালী, আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা একদিন বাস্তব পরিস্থিতিতে করতে পারবে না—এই নিশ্চয়তা কে দেবে?
তার চেয়েও বড় সমস্যা, প্রতিযোগিতা ।
একটি দেশ থামলে অন্য দেশ থামবে কেন? একটি কোম্পানি বলল, আমরা আর শক্তিশালী AI বানাব না—তার প্রতিযোগীও একই কথা বলবে কেন? প্রত্যেকেই ভয় পাবে, আমি থামলে অন্যজন এগিয়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত হয়তো সবাই জানবে সামনে খাদ।
তবু সবাই দৌড়াবে।
মানবজাতির সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই—একজন মানুষ বিপদ দেখে থামতে পারে; আটশো কোটি মানুষ একসঙ্গে বিপদ দেখে থামবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
আমরা ভাবছি অন্য গ্রহে বসতি বানাব।
মঙ্গল গ্রহে শহর হবে। হয়তো হবে। মানুষের কল্পনার শক্তিকে আমি ছোট করি না।
কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয়, অন্য গ্রহে গিয়ে বাঁচার প্রযুক্তি তৈরি হওয়ার আগেই আমরা পৃথিবীতে নিজেদের না-বাঁচার প্রযুক্তি বানিয়ে ফেলছি।
পারমাণবিক অস্ত্র যদি কাজটি না করে, অন্য কিছু করবে। জলবায়ুর বিপর্যয়, মহামারি, জৈবপ্রযুক্তির অপব্যবহার—অথবা এমন কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যাকে বানানোর সময় মানুষ ভেবেছিল সে তার চাকর বানাচ্ছে।
মানুষ বিলুপ্ত হলে AI পৃথিবী শাসন করবে— এ কথাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।
AI-রও বিদ্যুৎ দরকার। ডেটা সেন্টার দরকার। চিপ দরকার। ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা দরকার। নষ্ট যন্ত্র বদলাতে হয়। খনি থেকে ধাতু তুলতে হয়। কারখানায় যন্ত্রাংশ বানাতে হয়। আজকের পৃথিবীতে এই বিশাল ব্যবস্থার প্রায় সবটাই মানুষ তৈরি করে, মানুষ চালায়।
তাই এমনও হতে পারে, মানুষের পরে AI-র সাম্রাজ্য হবে না।
মানুষ চলে যাওয়ার কিছুদিন পর একে একে পাওয়ার গ্রিড বন্ধ হবে। ডেটা সেন্টারের পাখা থামবে। সার্ভারের আলো নিভবে। পৃথিবীর সর্বশেষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাটি হয়তো কোনও অন্ধকার ঘরে কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করবে পরের নির্দেশের জন্য।
কেউ নির্দেশ দেবে না।
তারপর সেটিও নিভে যাবে।
পৃথিবী আবার চুপ হয়ে যাবে।
তারপর এক লক্ষ বছর।
দশ লক্ষ বছর।
এক কোটি বছর।
গাছপালা শহর ঢেকে ফেলবে। ভবন ভাঙবে। রাস্তা মাটির নিচে যাবে। সমুদ্রের তলদেশ বদলাবে। মহাদেশ সরে যাবে।
মানুষের লেখা বই থাকবে না।
ধর্মগ্রন্থ থাকবে না।
সংবিধান থাকবে না।
জাতীয় পতাকা থাকবে না।
ফেসবুক থাকবে না।
কবিতা থাকবে না।
নোবেল পুরস্কারের তালিকাও থাকবে না।
থাকবে কিছু হাড়।
প্লাস্টিকের স্তর।
কংক্রিট।
অদ্ভুত কিছু ধাতু।
তেজস্ক্রিয় পদার্থের চিহ্ন।
হয়তো কোনও চিপের জীবাশ্মসদৃশ অবশেষ।
তারপর পৃথিবীতে আবার কোনও বুদ্ধিমান প্রাণীর বিবর্তন ঘটতে পারে।
ঘটতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই।
কিন্তু ধরা যাক ঘটল।
ধরা যাক আজ থেকে পাঁচ কোটি বছর পরে কোনও প্রাণী দুই পায়ে হাঁটল, অথবা আট পায়ে; আমাদের মতো চোখ থাকল, অথবা চোখই থাকল না। তারা ভাষা আবিষ্কার করল। বিজ্ঞান আবিষ্কার করল। ভূতত্ত্ব শিখল। একদিন মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে তারা একটা অদ্ভুত হাড় পেল।
তারপর আরেকটা।
তারপর একটি শহর।
তাদের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা সাবধানে মাটি সরাবে।
তারা আবিষ্কার করবে, বহু কোটি বছর আগে পৃথিবীতে এক অদ্ভুত প্রজাতি বাস করত।
প্রজাতিটির নাম Homo sapiens।
তারা হয়তো আমাদের জাদুঘরে রাখবে।
একটি কাচের বাক্সে মানুষের কঙ্কাল দাঁড় করানো থাকবে। পাশে থাকবে আমাদের বানানো একটি মোবাইল ফোন, একটি বন্দুক, একটি কবিতার বই, একটি পরমাণু বোমার মডেল, আর কোনও প্রাচীন ডেটা সেন্টার থেকে পাওয়া পোড়া চিপ।
নিচে লেখা থাকবে—
HOMO SAPIENS
একসময় পৃথিবীর প্রধান প্রযুক্তিনির্ভর প্রাণী।
ভাষা, শিল্প, চিকিৎসা, গণিত ও উন্নত যন্ত্র নির্মাণে সক্ষম ছিল।
নিজেদের গ্রহের প্রায় সর্বত্র বসতি স্থাপন করেছিল।
বিলুপ্তির কারণ এখনও গবেষণাধীন।
কোনও ছোট বাচ্চা তার মায়ের হাত ধরে কঙ্কালটির দিকে তাকাবে।
জিজ্ঞেস করবে,
—এরা এত বুদ্ধিমান ছিল, তবু বিলুপ্ত হলো কেন?
মা হয়তো উত্তর জানবে না।
বিজ্ঞানীরাও হয়তো হাজার বছর ধরে তর্ক করবে। জলবায়ু? যুদ্ধ? পারমাণবিক অস্ত্র? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা? মহামারি? নাকি সব মিলিয়ে?
শেষ পর্যন্ত তারা হয়তো আমাদের বিলুপ্তির স্তরটির একটি নাম দেবে।
যেমন আমরা ক্রিটেশিয়াসের শেষে ডায়নোসরদের হারিয়ে যাওয়ার চিহ্ন খুঁজি, তারা খুঁজবে আমাদের।
আমাদের দাঁত মাপবে।
আমাদের করোটি মাপবে।
আমাদের শহরের ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করবে।
আর সম্ভব হলে আমাদের ভাষার কিছু অংশ উদ্ধার করবে।
সেখানেই হয়তো তারা সবচেয়ে বিস্মিত হবে।
কারণ তারা আবিষ্কার করবে —
এই প্রাণীটি নিজের নাম রেখেছিল sapiens।
অর্থাৎ,
জ্ঞানী।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কোনও জাদুঘরে আমাদের কঙ্কালের সামনে দাঁড়িয়ে সেই অচেনা প্রাণীরা হয়তো তখন প্রথমবার হাসবে।
অথবা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকবে

Taslima Nasrin