হিমালয়ের বুক জুড়ে জ্ঞানগঞ্জের গল্প বহুদিনের। কেউ বলেন এটি সিদ্ধপুরুষদের গোপন আশ্রম, কেউ বলেন এটি চতুর্থ মাত্রার এক অদৃশ্য লোক, আবার কেউ মনে করেন এটি মানুষের চেতনার সর্বোচ্চ স্তরের প্রতীক। এই সমস্ত মতের মধ্যে কোনটি সত্য, তার চূড়ান্ত উত্তর আজও কারও কাছে নেই। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, জ্ঞানগঞ্জকে ঘিরে যত আলোচনা হয়, তার অধিকাংশই প্রবেশের পথ নিয়ে। যেন জ্ঞানগঞ্জে পৌঁছানোই আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা একটি মৌলিক প্রশ্নকে প্রায়ই এড়িয়ে যাই।
মানুষ কেন জ্ঞানগঞ্জে যেতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে সমগ্র রহস্যের প্রথম দরজা।
আজকের পৃথিবীতে আধ্যাত্মিকতাও অনেক সময় এক ধরনের অহংকারের অলংকার হয়ে উঠেছে। কেউ অলৌকিক শক্তির খোঁজে ছুটছেন, কেউ বিরল গুরু খুঁজছেন, কেউ এমন একটি গল্প চান যা অন্যদের বিস্মিত করবে। "আমি জ্ঞানগঞ্জে গিয়েছি", "আমি অমুক সিদ্ধপুরুষের দর্শন পেয়েছি", "আমাকে গোপন দীক্ষা দেওয়া হয়েছে", এসব বাক্য অনেক সময় আত্মিক উপলব্ধির চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
সম্ভবত এই কারণেই, যদি সত্যিই জ্ঞানগঞ্জ বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তার দরজা অধিকাংশ মানুষের জন্য বন্ধ।
কারণ যে ব্যক্তি নিজেকে বিশেষ প্রমাণ করতে চায়, সে এখনও বিশেষ হওয়ার বাসনায় আবদ্ধ। আর যেখানে অহংকারের সূক্ষ্মতম কণাটুকুও রয়ে গেছে, সেখানে সত্য কখনও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয় না।
জ্ঞানগঞ্জের সবচেয়ে বড় প্রহরী হয়তো কোনো যোগী নন। সবচেয়ে বড় প্রহরী মানুষের নিজের মন।
যে মন প্রতিনিয়ত বিচার করে, তুলনা করে, স্বীকৃতি চায়, ভয় পায়, লোভ করে, নিজের জন্য কিছু অর্জন করতে চায়, সেই মনই অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে। আমরা ভাবি পাহাড় আমাদের পথ আটকে দিয়েছে। অথচ বাস্তবে আমাদের নিজের মনই পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতীয় দর্শনের প্রতিটি শাখাই একটি কথা বারবার বলেছে, বাইরের জগত মানুষের অন্তর্জগতের প্রতিফলন। উপনিষদ থেকে তন্ত্র, যোগ থেকে বৌদ্ধ দর্শন, সর্বত্র একই ইঙ্গিত। যে নিজের মধ্যে আলো জ্বালাতে পারেনি, সে বাইরে হাজার সূর্য খুঁজেও অন্ধকারেই থাকবে।
তাই আমার কাছে জ্ঞানগঞ্জের সবচেয়ে গভীর অর্থ ভৌগোলিক নয়, নৈতিক।
যে মানুষের ভেতরে সত্যের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা জন্মেছে, যে নিজের ভুলের সামনে দাঁড়াতে পারে, যে ক্ষমতার চেয়ে করুণাকে বড় মনে করে, যে প্রতিদিন নিজের অজ্ঞতাকে চিনতে শেখে, তার মধ্যেই জ্ঞানগঞ্জের প্রথম দরজা খুলতে শুরু করে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, কঠোর তপস্যা করলেই হয়তো রহস্যের দ্বার খুলে যাবে। কিন্তু ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, বহু সাধক বছরের পর বছর সাধনা করেও কিছুই পাননি। আবার কেউ কেউ এক মুহূর্তের নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণে এমন উপলব্ধি লাভ করেছেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
কারণ আধ্যাত্মিকতার জগতে সময় নয়, রূপান্তরই আসল।
জ্ঞানগঞ্জ যদি সত্যিই কোনো গুপ্তলোক হয়, তবে সেখানে প্রবেশের অনুমতি কেবল সেই মানুষই পাবেন, যার উপস্থিতি পৃথিবীর জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। যে সেখানে গিয়ে নিজের শক্তি বাড়ানোর জন্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণের জন্য প্রস্তুত।
আবার যদি জ্ঞানগঞ্জ কেবল একটি প্রতীক হয়, তাহলেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ মানুষের চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে প্রবেশের অধিকারও কেবল সেই ব্যক্তিরই, যে নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পেরেছে।
আজ আমরা প্রযুক্তির যুগে বাস করছি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি পাহাড়, নদী, মরুভূমি, সমুদ্র স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে। তবুও মানুষের ভেতরের অন্ধকার এখনও কোনো যন্ত্র মাপতে পারেনি। মানুষের করুণা, প্রেম, ত্যাগ, উপলব্ধি কিংবা ঈশ্বরানুভূতি এখনও কোনো পরীক্ষাগারে সম্পূর্ণভাবে বন্দি করা যায়নি।
এই জায়গাতেই জ্ঞানগঞ্জের কাহিনি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এটি আমাদের বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় না। বরং মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান বস্তুজগতকে অনুসন্ধান করে, আর সাধনা অনুসন্ধান করে অনুসন্ধানকারীকে। দুটি পথের উদ্দেশ্য আলাদা। একটিকে দিয়ে অন্যটিকে বিচার করতে গেলে বিভ্রান্তি জন্মায়।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।
জ্ঞানগঞ্জের গল্প শুনে অনেকেই হিমালয়ে ছুটে যান। কিন্তু যদি নিজের ঘরে, নিজের পরিবারে, নিজের কর্মক্ষেত্রে আমরা অসত্য, হিংসা, প্রতারণা, লোভ আর অহংকার নিয়েই বেঁচে থাকি, তাহলে হিমালয়ের হাজার গুহাও আমাদের কাছে কেবল পাথরই হয়ে থাকবে।
কারণ স্থান পরিবর্তন করলেই চেতনা পরিবর্তিত হয় না।
চেতনা পরিবর্তিত হলে একই স্থানও সম্পূর্ণ নতুন হয়ে ওঠে।
হয়তো সেই কারণেই বহু গুরু বলেছেন, সত্যিকারের তীর্থযাত্রা বাইরে নয়, ভেতরে।
জ্ঞানগঞ্জের দরজা খুঁজতে গিয়ে আমরা হয়তো ভুলে যাই যে, প্রতিদিন আমাদের সামনে অসংখ্য ছোট ছোট দরজা খুলে যায়। যখন আমরা কাউকে ক্ষমা করি, যখন নিজের ভুল স্বীকার করি, যখন কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই সাহায্যের হাত বাড়াই, যখন সত্যকে সুবিধার উপরে স্থান দিই, তখন আমাদের চেতনা একটু একটু করে প্রসারিত হয়। এই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলিই হয়তো সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রকৃত পদক্ষেপ।
শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়, জ্ঞানগঞ্জের সবচেয়ে বড় রহস্য তার অবস্থান নয়, মানুষের প্রস্তুতি।
কারণ সত্যিকারের জ্ঞান কখনও কাউকে তার কৌতূহলের জন্য আহ্বান করে না। সত্য আহ্বান করে কেবল তাকে, যে নিজেকে সত্যের হাতে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে প্রস্তুত।
তাই জ্ঞানগঞ্জের সন্ধান শুরু করার আগে হিমালয়ের পথ নয়, নিজের অন্তরের পথটিই খুঁজে দেখা উচিত।
হয়তো একদিন দেখা যাবে, যে জ্ঞানগঞ্জকে আমরা বরফঢাকা কোনো অদৃশ্য উপত্যকায় খুঁজছিলাম, তার প্রথম দরজাটি নিঃশব্দে খুলেছিল আমাদের নিজের হৃদয়ের মধ্যেই।
Tomojit Ganguly