শুনলাম বাংলাদেশের আত্মগর্বে 'চৌকষ' বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তাদের শিখা অনির্বাণ নিভিয়ে দিয়েছে। শোনা যাচ্ছে তারা ইসলামের চার খলিফার নামে নতুন ব্যাটালিয়নের নামকরনও করেছে। ক্রিকেট খেলা এবং মাঠে ড্রেসিংরুমে সেজদা যেরকম নির্বোধ পরস্পরবিরোধী (ননসেন্সিক্যাল প্যারাডক্সিক্যাল) আচরণ, বাংলাদেশের সংবিধান এবং সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় কর্মকান্ড ঠিক একই রকম নির্বোধ পরস্পরবিরোধী আচরণ। এগুলো সবই মানসিক সীমাবদ্ধতা বা চিন্তাগত বিকৃতির লক্ষণ। উপরের বিষয়গুলো সত্য হলে ক্রিকেটের যে পরিণতি, সেনাবাহিনীর, এবং তাদের হাতে দেশ থাকলে দেশেরও একই পরিণতি হবে - লিখে রাখেন।
-------
একজন আমাকে প্রশ্ন করল, আপনি বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলা দেখেন না? আমি বললাম, একসময় দেখতাম, এখন দেখি না। সে বলল, কেন? আমি বললাম, যখন থেকে খেলায় জিতলে ক্রিকেটাররা ড্রেসিং রুমে নামাজ আদায় করে, তখন থেকে আর দেখি না। সে বলল, কেন সেটা? আপনি কি ইসলামবিরোধী? আমি বললাম, না, আমি ইসলামবিরোধী না, আমি ননসেন্স বা অর্থহীন আচরণবিরোধী। সে বলল, নামাজ পড়া কি ননসেন্স? আমি তাকে একটা গল্প বললাম:
এক লোক এক ওষুধের দোকানে গিয়ে বলছে: "ভাই, কন্ডোম আছে?"
দোকানদার বলল: "আছে।"
লোকটা বলল: "কালো রঙের হবে?"
দোকানদার বলল: "না।"
লোকটা পাড়ার অনেক দোকানে খুঁজে না পেয়ে ভুলে প্রথম দোকানে আবার গিয়ে জিজ্ঞাসা করল: "ভাই, কালো কন্ডোম আছে?"
লোকটার অতি আগ্রহ দেখে দোকানদার বলল: "ভাই, বললাম তো কালো রঙেরটা নেই, কিন্তু কালো দিয়ে কী হবে?"
লোকটা বলল: "ভাই, সম্প্রতি আমার প্রেমিকার স্বামী মারা গেছে, তাই শোক প্রকাশের জন্য কালো রঙেরটা খুঁজছি।"
সেটা শুনে দোকানদার তো হতভম্ব!
আমার এই গল্প শুনে উক্ত ব্যক্তি বেশ বিরক্ত হল, বলল, এর সঙ্গে ড্রেসিং রুমে নামাজ আদায়ের কী সম্পর্ক? আমি তাকে বললাম, নামাজ আদায়ের নয়, এটা নির্বোধ পরস্পরবিরোধী (ননসেন্সিক্যাল প্যারাডক্সিক্যাল) আচরণের একটি উদাহরণ। মনে হল না, সে উদাহরণটা বুঝেছে।
আমি তাকে বললাম, ক্রিকেট খেলা কী? এটা কি একটা বিনোদন নয়? ইসলামে কি গণবিনোদন বা পাবলিক এন্টারটেইনমেন্ট উৎসাহিত? হয়তো এটাকে আক্ষরিকভাবে হারাম করা হয়নি, তবুও অনুৎসাহিত করা আছে। পেশাদারি বিনোদন তো একেবারেই অনুৎসাহিত। সেই আমলে যারা বাজিগর, কসরতকারী ছিল, যারা গণবিনোদনে পেশাদার ছিল, ইসলাম কখনই তাদের মূল্যায়িত করেনি। বরং তাদের থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। ইসলামের বিনোদন হচ্ছে ইবাদত এবং ধর্মীয় উৎসব পালন।
একথা শুনে উক্ত ব্যক্তি একটু চুপ করে গেলেন। তারপর বললেন, খেলাধুলা হারাম নয়। আমি বললাম, ঠিক, সেটা হারাম নয়, কিন্তু পেশাদারি বিনোদন একেবারেই অনুৎসাহিত। তিনি বললেন, সেটা বুঝলাম, কিন্তু নামাজ পড়লে সমস্যা কী? আমি বললাম, সেই জন্যই তো আপনাকে কালো কন্ডোমের গল্পটা বললাম। একথায় তার কোনো ভাবান্তর হল না। মনে হল, তিনি ধরতে পারছেন না মিলটা কোথায়। আমি তাকে ভেঙে বললাম, কোনো নিয়মের কেউ একটি বড় বিচ্যুতি করছে, ছোট একটা ইতিবাচক আচরণ বড় বিচ্যুতিকে জায়েজ তো করেই না, বরং সে যে পুরো নিয়মটির প্রতিই অশ্রদ্ধাশীল, সেটা প্রমাণ করে।
লোকটি তবুও ভাবলেশহীন। সে আমাকে বলল, তবুও নামাজ পড়া ভালো। আমি তাকে তখন বললাম, নামাজ মানে কী? কীভাবে নামাজ পড়তে হবে, সেটা কি কোরআনে আছে? কোরআনে আছে কীভাবে অজু করতে হবে, কীভাবে মসজিদে প্রবেশ করতে হবে, কিন্তু পাঁচবার নামাজ পড়তে হবে, সেটা নেই; রুকু-সেজদা, তরিকার বর্ণনা নেই কেন? উক্ত ব্যক্তি এবার নীরব।
আমি তাকে বললাম, নামাজ বা সালাতের প্রকৃত অর্থ হাত বাঁধা, রুকু-সেজদার রছম (রিচ্যুয়াল) নয়। সেটা হলে কোরআনে সেই তরিকার স্পষ্ট নির্দেশ থাকত। সেটা নেই বলেই এই তরিকা নিয়ে সুন্নি, শিয়া ও নানা সেক্টে প্রভেদ। মসজিদে গিয়ে বা বাড়িতে নামাজ বা সালাতের প্রকৃত অর্থ হল কোরআন থেকে পাঠ। কোরআন যখন লিখিত ছিল না, তখন এটিই ছিল সম্মিলিতভাবে কোরআন মনে রাখার একটি পদ্ধতি। নামাজ বা সালাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য নামাজের সময় এই পাঠ আত্মীকরণ করা, এবং তার চেয়েও বড় কাজ কোরআনের সেই অন্তঃস্থকৃত শিক্ষাকে নিজের জীবনে প্রয়োগ করা। নামাজ বা সালাত কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত রুকু-সেজদার রছম (রিচ্যুয়াল) নয় একেবারেই।
উক্ত ব্যক্তি এবারও নীরব। আমি তাকে বললাম, তখন জানাই ছিল যে মানুষ নামাজ বা সালাতকে ভুল পথে নিয়ে যাবে। সেই কারণে ভূয়া নামাজিদের সাবধান করে কোরানে আছে:
"তুমি কি দেখেছ তাকে, যে তার কর্মফলকে মিথ্যা মনে করে? সে তো ওই ব্যক্তি, যে এতিমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। এবং সে অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহ প্রদান করে না। সুতরাং দুর্ভোগ সেই নামাজ আদায়কারীদের জন্য; যারা তাদের নামাজে অযত্নশীল। যারা লোক দেখানোর জন্য ওটা করে; এবং প্রয়োজনীয় গৃহসামগ্রী দানের ছোটখাটো সাহায্য করা থেকেও বিরত থাকে।" - সূরা আল-মাঊন (১০৭:১-৭)
এই সূরা নাজিল হয়েছে যে সব ব্যক্তিগণ নামাজ বা সালাতের ব্যাপারে অযত্নশীল, তাদের জন্য। এই অযত্নশীলতা মানে কিন্তু ঠিকভাবে হাত বাঁধা, রুকু-সিজদা বা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়া নয়। এই অযত্নশীলতা হল কোরানের শিক্ষাকে গ্রহণ এবং সেগুলোকে নিজের জীবনে প্রয়োগে ব্যর্থ হওয়া। এর সাথে তার কর্মফল বা পরকাল অবহেলা করা, অর্থাৎ নিজ জীবনে মন্দ কাজ করলে তার জন্য সাজা হবে না, এমন মনে করা। মুসলিম হিসেবে সামাজিক ত্যাগ ও দায়িত্ব অবহেলা করা। নামাজের প্রশ্নে এতিমদের অবজ্ঞা করা, অভাবগ্রস্তকে দানে অনীহা—এসব কথা বলা হয়েছে কেন? বলা হয়েছে এই কারণে যে নামাজ বা সালাতের প্রকৃত অর্থ কোরআনের শিক্ষা নিজ জীবনে প্রয়োগ করা। যারা উক্ত কাজগুলোতে অবহেলা করে, তারা নিশ্চয়ই শেষ বিচারের কর্মফলকে অবহেলা করে। যার অর্থ তারা পরাকালে বিশ্বাস করে না।
নামাজ বা সালাতের অর্থ দিনে কয়েকবার গৃহে বা মসজিদে গিয়ে সেই সব শিক্ষা কোরআন থেকে শেখা। সেখানে এটাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে আপনি কোন তরিকায় শিখবেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; আপনি সেটা প্রয়োগ করছেন কি না, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে কীভাবে নামাজ পড়তে হবে, সেই তরিকা কোরআনে নেই, কিন্তু নামাজ বা সালাতের লক্ষ্য কী এবং নিজ জীবনে কী প্রয়োগ করতে হবে, সেটা বিস্তারিত আছে। সেটাই আসলে নামাজ বা সালাত। প্রয়োগ না করলে শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। শিক্ষাটা না শিখে বা প্রয়োগের ধারে-কাছে না গিয়ে লোক দেখানো আড়ম্বরের শাস্তিও ঘোষিত হয়েছে।