Sunday, July 12, 2026

গন্ধ

 


আমার মায়ের গায়ে মাছের গন্ধ ছিল।

কাঁচা মাছের গন্ধ না। কাঁচা মাছের গন্ধ আমার বরং ভালো লাগে। বাজারে গেলে এখনও মাছের সারির সামনে দাঁড়িয়ে গভীর করে শ্বাস নিই আমি। রুইয়ের আঁশ, কাতলার কানকো, বোয়ালের পিচ্ছিল শরীর আর বরফগলা পানির সঙ্গে মিশে থাকা যে একটা আদিম নদীগন্ধ—ওই গন্ধে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার সমস্যা ছিল মায়ের গায়ের গন্ধে।
মায়ের গায়ে ছিল শুকনো মাছ, পোড়া তেল, ঘাম আর রোদের একটা অদ্ভুত মিশ্র গন্ধ। ওই গন্ধের আলাদা কোনো নাম নেই। পৃথিবীর বড়ো বড়ো সুগন্ধি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার গন্ধের নাম রেখেছে। ওশান ব্রিজ। মিডনাইট রোজ। হোয়াইট মাস্ক। ভ্যানিলা স্কাই। কেউ কোনোদিন আমার মায়ের গায়ের গন্ধটার নাম রাখেনি। আমি নিজে রেখেছিলাম—দারিদ্র্য।
আমার বয়স যখন এগারো, তখন প্রথম বুঝতে পারি, মানুষের গন্ধ দিয়েও তার অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝা যায়। ওই বছর আমাকে শহরের একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করানো হলো। ভালো স্কুল বলতে যে স্কুলের ছেলেমেয়েদের বাবারা স্কুল ছুটির সময় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মায়েরা চোখে কালো চশমা পরে আসে, আর বাচ্চাদের পানির বোতলের গায়ে ইংরেজিতে নাম লেখা থাকে।
আমার পানির বোতল ছিল একটা পুরনো সেভেন আপের বোতল। মা বোতলটার সবুজ কাগজ তুলে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। পুরোটা ওঠেনি। মাঝখানে ‘UP’ শব্দটা রয়ে গিয়েছিল। ফলে স্কুলে প্রথম দিন তানভীর আমার বোতল দেখে বলেছিল, ‘তুই পানি খাস, না সেভেন আপ?’
ক্লাসের সবাই হাসল। আমিও হাসলাম। মানুষের সঙ্গে হাসলে মানুষ সাধারণত বুঝতে পারে না, আপনি আসলে তাদের সঙ্গে হাসছেন, না নিজের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। এই বিদ্যাটা আমি এগারো বছর বয়সেই শিখে ফেলেছিলাম।
আমার মা শহরের বড়ো বাজারটার পেছনে একটা হোটেলে কাজ করতেন। হোটেল বললে ভুল হবে। সামনে টিনের চালা, নিচে তিনটে বেঞ্চ, ভেতরে কালো হয়ে যাওয়া দেয়াল। সকালবেলা পরোটা, দুপুরে ভাত, রাতে খিচুড়ি বিক্রি হতো। মায়ের কাজ ছিল মাছ কাটা, পেঁয়াজ কাটা, বাসন ধোয়া এবং প্রয়োজনমতো অন্য সব কাজ করা।
‘প্রয়োজনমতো অন্য সব কাজ’ কথাটা খুব সুন্দর। এই তিনটা শব্দের মধ্যে আপনি একটা আস্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবন ঢুকিয়ে দিতে পারবেন। মেঝে মোছা প্রয়োজনমতো অন্য কাজ। মালিকের বাচ্চাকে কোলে রাখা প্রয়োজনমতো অন্য কাজ। রাঁধুনি না এলে চুলার সামনে দাঁড়ানো প্রয়োজনমতো অন্য কাজ। রাত দশটায় বাড়ি ফেরা প্রয়োজনমতো অন্য কাজ। এবং মাস শেষে বেতন কম পেয়ে চুপ করে থাকা অবশ্যই প্রয়োজনমতো অন্য কাজ।
মা সব কাজ করতেন। শুধু একটা কাজ করতেন না—অভিযোগ।
আমার মা কোনোদিন অভিযোগ করেননি। এই ব্যাপারটা নিয়ে ছোটোবেলায় আমার ভীষণ রাগ হতো। আমার ধারণা ছিল, পৃথিবীতে যারা অভিযোগ করে না, তাদের বুদ্ধিশুদ্ধি কম। হোটেলের মালিক মাসের বেতন সাত দিন পরে দিয়েছে? চিৎকার করো। কেউ তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে? গালি দাও। তোমার একমাত্র ছেলে পুরনো সেভেন আপের বোতলে পানি নিয়ে স্কুলে যায়? কিছু একটা করো।
মা কিছুই করতেন না। তিনি রাত দশটায় বাড়ি ফিরে উঠানে বসে পা ধুতেন। তারপর শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছে আমাকে ডাকতেন, ‘বাবু, খাইছিস?’
আমার নাম বাবু নয়। আমার নাম ইশতিয়াক। মা সম্ভবত আমার আসল নামটা খুব বেশি ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। আমি তার কাছে জন্মের পর থেকেই বাবু এবং পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার আগপর্যন্ত বাবুই থাকতাম।
আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম, ‘খাইছি।’
‘কী দিয়া?’
‘জানি না।’
মা হাসতেন। ‘কী দিয়া খাইছস জানস না?’
‘ভুলে গেছি।’
মা আমার মাথায় হাত দিতে আসতেন। আমি সরে যেতাম। কারণ ওই হাতেও গন্ধ ছিল। মাছের। পেঁয়াজের। হলুদের। এবং দারিদ্র্যের।
আমাদের ক্লাসে একটা ছেলে ছিল। নাম রাহাত। রাহাতের বাবা সৌদি আরবে থাকতেন। তার মা প্রতি মাসে একবার ঢাকায় যেতেন এবং ফেরার সময় রাহাতের জন্য নানারকম জিনিস নিয়ে আসতেন। রাহাতের গায়ে সবসময় সুন্দর গন্ধ ছিল।
আমি একদিন খুব সাবধানে তার পাশে বসে গন্ধটা শুঁকেছিলাম। রাহাত খেয়াল করে ফেলল।
‘কী করিস?’
আমি বললাম, ‘কিছু না।’
‘পারফিউমের গন্ধ শুঁকতেছিস?’
আমি লজ্জা পেলাম। রাহাত ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট নীল বোতল বের করল। বলল, ‘লাগাবি?’
আমি মাথা নাড়লাম। রাহাত আমার শার্টে দুইবার স্প্রে করে দিল।
ওইদিন সারাদিন আমি নিজের শার্টের কলারের কাছে নাক নিয়ে ঘুরেছি। আমার মনে হচ্ছিল, আমি আর আমি নেই। আমি অন্য কেউ। আমার বাবা বিদেশে থাকেন। আমার মা চোখে কালো চশমা পরে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার পানির বোতলে ইংরেজিতে নাম লেখা। স্কুল ছুটির পর আমি গাড়িতে উঠব। গাড়ির ভেতরও এই গন্ধ থাকবে। বাড়িতেও। আমার বিছানায়। বালিশে।
আমি বাড়ি ফিরলাম সন্ধ্যার দিকে। মা তখনও ফেরেননি। ঘরে ঢুকে শার্ট খুললাম না। সাধারণত স্কুল থেকে ফিরেই শার্ট খুলে ফেলি। ওইদিন পরেই রইলাম। রাত দশটার দিকে মা ফিরলেন। আমি বই নিয়ে বসে ছিলাম।
মা ঘরে ঢুকেই থমকে গেলেন। তারপর নাক টেনে বললেন, ‘ঘরে কিসের জানি সুন্দর গন্ধ!’
আমি চুপ করে রইলাম। মা এদিক-ওদিক তাকালেন। জানালার পাশে গেলেন। আমার বিছানার কাছে গেলেন। তারপর আমার পাশে এসে দাঁড়াতেই বুঝলেন।
‘তোর গায়ে?’
আমি কিছু বললাম না। মা আমার শার্টের কাছে নাক এনে শিশুদের মতো শব্দ করে শুঁকলেন। ‘ও মা! কী সুন্দর!’
আমার ভীষণ বিরক্তি হলো। মনে হলো, মায়ের নাক থেকে তার গায়ের মাছের গন্ধটা আমার শার্টে লেগে যাচ্ছে। আমি ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলাম। খুব জোরে না। আবার খুব আস্তেও না। মা দুই কদম পিছিয়ে গেলেন।
আমি বললাম, ‘আমার কাছে আসবা না তো!’
মা অবাক হলেন। ‘ক্যান?’
এগারো বছর বয়সী বাচ্চারা নিষ্ঠুর হয়। কারণ নিষ্ঠুরতার পরিণতি বোঝার মতো যথেষ্ট বড়ো তারা নয়, কিন্তু মানুষকে কোথায় আঘাত করলে সবচেয়ে বেশি ব্যথা লাগে, সেটা বোঝার মতো যথেষ্ট বড়ো।
আমি বললাম, ‘তোমার গায়ে গন্ধ।’
মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নিজের শাড়ির আঁচল নাকের কাছে নিয়ে শুঁকলেন। একবার। দুইবার।
বললেন, ‘মাছের গন্ধ?’
আমি বললাম, ‘বিশ্রী গন্ধ।’
মা আবার আঁচল শুঁকলেন। তারপর খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘সারাদিন মাছ কাটি তো। তাই।’
আমি বললাম, ‘তুমি আমার স্কুলে কোনোদিন আসবা না।’
মা এবার আমার দিকে তাকালেন। ‘ক্যান?’
‘এমনি।’
‘তোর স্কুলে আমি ক্যান যাব?’
‘যদি কোনোদিন যেতে হয়, যাইবা না।’
‘আচ্ছা।’
‘কাউরে বলবাও না তুমি হোটেলে কাজ করো।’
‘আচ্ছা।’
মা আর কিছু বলেননি। উঠানে চলে গেলেন। আমি বইয়ে মুখ নামালাম। কিছুক্ষণ পর পানির শব্দ শুনলাম।
মা গোসল করছেন।
রাত তখন প্রায় এগারোটা। শীতকাল। আমাদের বাড়ির গোসলখানা বলতে উঠানের এক কোণে টিন দিয়ে ঘেরা জায়গা। ওপরে ছাদ নেই। পৌষ মাসের ঠান্ডা বাতাস সরাসরি শরীরে নামে। মা অনেকক্ষণ ধরে গোসল করলেন। সাবান ঘষলেন। পানি ঢাললেন। আবার সাবান ঘষলেন। আবার পানি।
আমি ঘরে বসে পানির শব্দ শুনলাম।
ঝপ। ঝপ। ঝপ।
একসময় শব্দ থামল। মা ঘরে এলেন ভেজা চুলে। আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন না। দূর থেকে বললেন, ‘এখনও গন্ধ আসে?’
আমি নাক টানলাম না। তার দিকে তাকালামও না। বললাম, ‘জানি না।’
মা সেদিন থেকে প্রতিদিন হোটেল থেকে ফিরে গোসল করতেন। শীত। গ্রীষ্ম। বর্ষা। জ্বর। কাশি। কিছুতেই ওই গোসল বন্ধ হয়নি।
একসময় আমি শহর ছেড়ে চলে গেলাম। প্রথমে কলেজ। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়। তারপর চাকরি। মানুষের জীবন যখন ভালো হতে শুরু করে, তখন খুব আশ্চর্য একটা ঘটনা ঘটে। সে তার খারাপ দিনগুলোর গল্প বলতে ভালোবাসে, কিন্তু খারাপ দিনগুলোর মানুষদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বস্তি বোধ করে।
আমি বন্ধুদের বলতাম, ‘আমি খুব স্ট্রাগল করে বড়ো হয়েছি।’ ওরা মুগ্ধ হতো। আমি বলতাম, ‘মাই মাদার ইজ আ ভেরি স্ট্রং ওম্যান।’ ওরা আরও মুগ্ধ হতো।
কেউ জিজ্ঞেস করলে মা কী করতেন, আমি বলতাম, ‘শি ওয়ার্কড ইন দ্য ফুড ইন্ডাস্ট্রি।’
ইংরেজি ভাষার প্রতি আমার অসীম কৃতজ্ঞতা। এই ভাষায় একটা হোটেলের মাছ কাটার কাজকেও যথেষ্ট সম্মানজনক শোনানো যায়।
আমার চাকরি হলো একটা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। প্রথম বেতন পেয়ে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনলাম। দ্বিতীয় বেতনে একটা মোবাইল। তৃতীয় বেতনে টাকা পাঠালাম। মা প্রতিবারই ফোন করে বলতেন, ‘এত টাকা পাঠাস ক্যান?’
আমি বিরক্ত হতাম। ‘লাগবে তোমার।’
‘আমার কী লাগে?’
এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা ছিল না। মানুষের কী লাগে? একটা ভালো ঘর? আমি বানিয়ে দিতে পারি। কাপড়? কিনে দিতে পারি। খাবার? টাকা পাঠাতে পারি। মানুষের আর কী লাগে? এই প্রশ্নটা আমি খুব বেশি ভাবিনি।
আমার বিয়ে হলো তেত্রিশ বছর বয়সে। আমার স্ত্রীর নাম মিথিলা। মিথিলা খুব সুন্দর করে ঘর সাজায়। আমাদের বাসায় ঢুকলে একটা মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। সে বিভিন্ন জায়গায় সুগন্ধি মোমবাতি রাখে। বসার ঘরে ল্যাভেন্ডার। শোবার ঘরে ভ্যানিলা। বাথরুমে লেমনগ্রাস। আমাদের ঘরের প্রতিটা কামরার আলাদা গন্ধ।
শুধু কোনো কামরাতেই মাছের গন্ধ নেই।
বিয়ের দুই বছর পর আমাদের একটা ছেলে হলো। ছেলের নাম রাখলাম ইহান। ইহানের বয়স যখন তিন মাস, মা প্রথম আমাদের বাসায় এলেন। ততদিনে তার বয়স প্রায় ষাট। মায়ের মাথার চুলের অধিকাংশ সাদা। শরীর ছোটো হয়ে গেছে। আমার ছোটোবেলায় মাকে বেশ লম্বা মনে হতো। এখন দেখি, তিনি মিথিলার চেয়েও খাটো।
মানুষ কি বয়সের সঙ্গে খাটো হয়? নাকি আমরা বড়ো হয়ে যাই বলে মা-বাবাকে ছোটো লাগে?
মা বাসায় ঢুকেই ইহানকে কোলে নিলেন। তারপর অদ্ভুত একটা কাজ করলেন। ইহানের মাথা শুঁকলেন। গভীর করে। চোখ বন্ধ করে।
তারপর বললেন, ‘বাবু, তোর ছেলের গায়ে দুধের গন্ধ।’
আমি হাসলাম। ‘বাচ্চাদের গায়ে দুধের গন্ধই থাকে।’
মা অবাক হয়ে বললেন, ‘তোর গায়েও ছিল।’
আমি থমকে গেলাম। মা ইহানকে শুঁকতে শুঁকতে বললেন, ‘তুই ছোট থাকতে তোর মাথার এইখানে দুধের গন্ধ আছিল।’ তিনি ইহানের মাথার ঠিক মাঝখানে চুমু খেলেন। ‘আমি সারাদিন কাম করতাম। রাইতে আইসা তোর মাথা শুকতাম।’
মিথিলা হাসল। ‘কেন মা?’
মা খুব স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘আমার গায়ের মাছের গন্ধটা যাইত।’
আমার বুকের ভেতর কেউ যেন খুব ধীরে একটা দরজা খুলল। পুরনো দরজা। জং ধরা।
আমি স্পষ্ট শুনলাম—ঝপ। ঝপ। ঝপ।
পৌষ মাসের রাত। খোলা আকাশের নিচে টিনঘেরা গোসলখানা। একজন নারী বারবার শরীরে পানি ঢালছেন। তার বয়স ত্রিশও হয়নি। সারাদিন কাজ করে তার দুই হাত ফুলে আছে। আঙুলে মাছের আঁশ লেগে আছে। তিনি সাবান ঘষছেন। পানি ঢালছেন। আবার সাবান।
কারণ তার এগারো বছরের ছেলে বলেছে, তার গায়ে বিশ্রী গন্ধ।
মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী হইছে?’
আমি বললাম, ‘কিছু না।’
‘চুপ হইয়া গেলি ক্যান?’
‘এমনি।’
মানুষ বড়ো হলে কাঁদতে ভুলে যায় না। মানুষ শুধু কোথায় কাঁদতে হবে, সেটা শিখে যায়।
আমি উঠে বাথরুমে গেলাম। দরজা বন্ধ করলাম। কল ছেড়ে দিলাম। পানির শব্দ হলো। ঝপঝপ নয়। আমাদের আধুনিক শাওয়ার থেকে পানি পড়ে হিসহিস শব্দে।
আমি কমোডের ঢাকনার ওপর বসে রইলাম। আমার কান্না পেল না। বুক ভার হলো না। চোখেও পানি এলো না। আমি শুধু জীবনে প্রথমবার বোঝার চেষ্টা করলাম, একটা গন্ধ কত বছর বাঁচে।
পারফিউমের বোতলে লেখা থাকে—ইউ ডি পারফাম। লং লাস্টিং। টুয়েলভ আওয়ার্স। চব্বিশ ঘণ্টা। আটচল্লিশ ঘণ্টা। কোনো কোম্পানি ষোলো বছর স্থায়ী গন্ধ বানাতে পারেনি।
আমার মা পেরেছিলেন।
মা আমাদের বাসায় ছিলেন সাত দিন। অষ্টম দিনে চলে যাবেন। যাওয়ার আগের রাতে আমি অফিস থেকে ফিরলাম প্রায় এগারোটায়। মিথিলা ঘুমিয়ে গেছে। ইহানও। বসার ঘরের বাতি নেভানো। শুধু রান্নাঘরে আলো।
আমি জুতা খুলে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মা মাছ কাটছেন। মিথিলা সম্ভবত মাছ কিনে রেখেছিল। মা পরদিন যাওয়ার আগে সব মাছ কেটে, ধুয়ে, আলাদা আলাদা প্যাকেটে রেখে যেতে চান।
আমি দরজায় দাঁড়িয়ে রইলাম।
মা বললেন, ‘আইছস?’
‘হুঁ।’
‘খাইছস?’
‘হুঁ।’
‘কী দিয়া?’
আমি হাসলাম। ‘জানি না।’
মা হেসে ফেললেন। ‘এত বড়ো হইছস। এখনও কী দিয়া ভাত খাস জানস না?’
আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। মায়ের পাশে দাঁড়ালাম। তার হাত চলছে। ছুরির নিচে মাছের শরীর আলাদা হচ্ছে নিখুঁতভাবে। মায়ের আঙুল কুঁচকে গেছে। নখের পাশে হলুদের দাগ।
আমি হঠাৎ মায়ের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মা অবাক হয়ে তাকালেন।
‘কী?’
আমি তার কাঁধে মুখ রাখলাম। তারপর শুঁকলাম। গভীর করে।
মা স্থির হয়ে গেলেন।
আমার নাকে মাছের গন্ধ এলো। কাঁচা পেঁয়াজ। হলুদ। সরিষার তেল। আর খুব হালকা একটা সাবানের গন্ধ।
মা এখনও গোসল করেন।
কত বছর হয়ে গেছে। মা এখনও গোসল করেন।
আমি মায়ের কাঁধে মুখ রেখেই বললাম, ‘মা।’
‘হুঁ?’
‘তুমি হোটেলের কাজটা ছাড়ছিলা কবে?’
‘তুই ইউনিভার্সিটিতে ওঠার পর।’
‘কেন?’
মা হাসলেন। ‘বয়স হইছিল।’
‘তোমার গায়ে এখনও মাছের গন্ধ কেন?’
মায়ের শরীর শক্ত হয়ে গেল। আমি টের পেলাম। তিনি খুব আস্তে আমাকে সরিয়ে দিলেন। তারপর নিজের আঁচল নাকের কাছে নিলেন। সেই পুরনো ভঙ্গি। একবার শুঁকলেন। দুইবার। তার মুখটা কেমন ছোটো হয়ে গেল।
‘গন্ধ আসে?’
আমার বয়স তেতাল্লিশ। পৃথিবীর অনেক জায়গায় গিয়েছি আমি। বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। ইংরেজিতে মিটিং করেছি। পাওয়ারপয়েন্টে প্রেজেন্টেশন দিয়েছি। কঠিন কঠিন শব্দ জানি। আমার বাড়ির প্রতিটা ঘরের জন্য আলাদা সুগন্ধি কিনে দিতে পারি।
কিন্তু ওই মুহূর্তে এগারো বছরের একটা ছেলের বলা তিনটে শব্দ ফেরত নেওয়ার জন্য সঠিক তিনটে শব্দ খুঁজে পেলাম না আমি।
ফলে আমি যা করলাম, তা ভাষার চেয়ে সহজ। আমি আবার মাকে জড়িয়ে ধরলাম। নাক ডুবিয়ে দিলাম তার কাঁধে।
বললাম, ‘আসে।’
মা চুপ।
‘খুব আসে।’
মা আরও চুপ।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। ‘এই গন্ধটা আমার খুব পছন্দ, মা।’
আমার মা প্রথমে বিশ্বাস করলেন না। মায়েরা সন্তানের মিথ্যা খুব সহজে ধরে ফেলে। তিনি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি ছাড়লাম না। কিছুক্ষণ পর টের পেলাম, মায়ের হাতটা আমার পিঠে উঠেছে। তিনি হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
তার মাছের গন্ধমাখা আঙুল আমার দামি অফিসের শার্টে ঘুরছে। আগামীকাল শার্টটা ড্রাই ক্লিনে দিতে হবে।
অথবা হবে না।
কিছু গন্ধ ধুয়ে ফেলতে নেই। কিছু গন্ধ রেখে দিতে হয়। কারণ পৃথিবীর সমস্ত মানুষ আতর, গোলাপ কিংবা ভ্যানিলার গন্ধে আমাদের ভালোবাসে না। কেউ কেউ সারাজীবন মাছ কাটে। পেঁয়াজ কাটে। পোড়া তেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর পৌষ মাসের গভীর রাতে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বারবার সাবান ঘষে।
শুধু তার সন্তানের পৃথিবীটা যেন একটু সুগন্ধি হয়।
আমি মায়ের কাঁধে মুখ রেখে গভীর করে শ্বাস নিই। আমার ফুসফুস ভরে যায় দারিদ্র্যের গন্ধে।
জীবনে প্রথমবার আমার মনে হয়—আমি কোনোদিন এত সুন্দর গন্ধ পাইনি

Nabila Noshin Shejuti

গারো সম্প্রদায়ের এক বিশেষ রান্না

 গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় এক ফোঁটা তেল লাগে না। কেবল মশলা ‌আর জলের মিশেলে সুস্বাদু এক পদ রেঁধে খেতে পারেন গরম ভাতের সঙ্গে।



উপকরণ

৪ টুকরো পোনা মাছ

৭টি সিদল শুঁটকি (টুকরো করা)

১টি পেঁয়াজের কুচি

১ চা চামচ রসুনবাটা

১ চা চামচ হলুদগুঁড়ো

১ চা চামচ লঙ্কাগুঁড়ো

১ আঁটি কচুর লতি

স্বাদমতো নুন

অল্প জল


প্রণালী

একটি বড় কড়াইয়ে পোনা মাছ, শুঁটকি, রসুনবাটা, লঙ্কাগুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো, পেঁয়াজকুচি, লঙ্কা একসঙ্গে মিশিয়ে মাখিয়ে নিন। এ বার তাতে কচুর লতিগুলি ঢেলে দিন। সব উপকরণ ভাল করে একে অপরের সঙ্গে যেন মিশে যায়, সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। ভাল করে নাড়াচাড়া করে তার পর তাতে অল্প জল ঢেলে দিন।

এ বার গ্যাস জ্বালিয়ে মাঝারি আঁচে রান্না করুন। মাঝেমধ্যে নাড়াচাড়া করতে হবে। জল ধীরে ধীরে শুকিয়ে এলে আঁচ বন্ধ করে দিন। চাইলে উপর দিয়ে অল্প ধনেপাতাও ছড়িয়ে দিতে পারেন।

যদি শুঁটকির গন্ধ দূর করতে চান, তা হলে রসুনের পরিমাণ খানিক বাড়িয়ে দিতে পারেন। তা ছাড়া ধনেপাতাও শুঁটকির গন্ধ দূর করবে। এই রান্নায় খাটনিও কম, আবার তেল নেই বলে পুষ্টিকরও বটে। গরম ভাতের সঙ্গে মাখা মাখা এই রান্না দুর্দান্ত লাগতে পারে শুঁটকিপ্রেমীদের।

Marinated and Grilled Chicken Tenderloin

 


Ingredients

Chicken tenderloins: 4 pieces (approx. 240g)


・Soy sauce: 1 1/2 tbsp


・Oyster sauce: 1/2 tbsp (Lee Kum Kee Oyster Sauce)


・Sugar: 1 1/2 tsp


・Ajinomoto seasoning: 4 shakes (Ajinomoto)


・Shichimi (Japanese seven-spice blend): To taste


・Mayonnaise: To taste (Kewpie Zero Non-Cholesterol)


・Salad oil: To taste (Nisshin Oillio Nisshin Healthy Off)


Instructions

1. Marinate the chicken tenderloins

Pierce both sides of the tenderloins with a fork; there is no need to remove the tendons—leaving them in is fine.

Add soy sauce, oyster sauce, sugar, and Ajinomoto (MSG seasoning), and massage the mixture thoroughly into the meat.

Place the chicken in the refrigerator for about an hour, uncovered. It might seem counterintuitive, but allowing the surface to dry out reportedly concentrates the flavor.

2. Cook in a frying pan to finish

Heat some vegetable oil in a frying pan and cook the marinated tenderloins. Cover with a lid and cook thoroughly, flipping occasionally. A good sign that they are fully cooked is when they no longer feel squishy or soft to the touch.

Cut into bite-sized pieces and serve with a side of shichimi mayonnaise.