একটি সমাজের সংস্কৃতি শুধু পোশাক, গান, উৎসব বা খাদ্যাভ্যাসের সমষ্টি নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেই সমাজের ইতিহাস, স্মৃতি, ভাষা, নান্দনিকতা, জীবনযাপন এবং মানুষের নিজস্ব পরিচয়। তাই কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শের নামে যখন মানুষের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা, নির্দিষ্ট পোশাক চাপিয়ে দেওয়া, নারীর চলাফেরা ও চেহারা নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা কিংবা শিল্প-সংগীত ও উৎসবকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়; এটি একটি সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপরও আঘাত।
বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও রাজনৈতিক ইসলামবাদের উত্থানের সঙ্গে সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের নানা রূপ দেখা যায়। কোথাও রাষ্ট্র সরাসরি কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কোথাও রাজনৈতিক ইসলাম ও সামাজিক রক্ষণশীলতা জনজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে উগ্রপন্থীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়েছে, আবার কোথাও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রয়েছে, তবে এর সংখ্যা কম।
আফগানিস্তানে— তালেবান ক্ষমতায় আসার পর নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, পোশাক এবং জনপরিসরে উপস্থিতির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে আফগান নারীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা যেমন সংকুচিত হয়েছে, তেমনি সমাজের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক জীবনও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তালেবানরা নিজস্ব আফগান সংস্কৃতিকে পুরোপুরি মুছে ফেলার সাথে যুক্ত। বাঙলাদেশেও একই পরিকল্পনা চলমান। ধীরেধীরে সকল সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ওপর আক্রমণ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজনৈতিক ইসলাম ফ্যাসিবাদ হিসেবে রূপান্তর হচ্ছে।
ইরানেও ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় বিধিবিধানকে জনজীবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। বিশেষ করে নারীদের পোশাক ও আচরণের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিরাজমান। ইসলামিস্ট নারীরা কী পরিমাণ ভয়ংকর ও হিংস্র— তা ইরানের কট্টরপন্থী নারীদের কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে একাধিকবার। অথচ ইরানের ইতিহাসে পারস্যের সমৃদ্ধ শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, পোশাক ও সামাজিক জীবনের বহুমাত্রিক উপস্থিতি ছিল। এখন সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার কথা তুললেই ফাঁসি আর জেলভর্তি।
পাকিস্তানের ইতিহাস বেঈমানের ইতিহাস— তাদের দেশ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সেনা ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ইসলামের সাথে যে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা পাকিস্তানিরা মূলত বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজেদের কর্মকাণ্ডে ও সিদ্ধান্তে— তাদের নীতিগত ও আদর্শগতভাবে অনুসরণ করে বাঙলাদেশের একটি বিরাট ইসলামিক গোষ্ঠী, তাদের চাওয়া পাওয়া স্বপ্ন সবই পাকিস্তানের সেনাদের মতই। অথচ পাকিস্তানের নিজস্ব দুর্দান্ত সংস্কৃতি আছে, সেটি ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায়—সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বেলুচ, পশতু ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্কৃতির রয়েছে নিজস্ব ভাষা, পোশাক, সংগীত ও ঐতিহ্য।
বাঙলাদেশের ক্ষেত্রে তাই সতর্ক হওয়া জরুরি। বাঙলাদেশের সংস্কৃতি আরব উপদ্বীপ থেকে আমদানি করা কোনো একরৈখিক সংস্কৃতি নয়। এটি বাঙলা ভাষা, বাউল, ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকশিল্প, বৈশাখী ঐতিহ্য, শাড়ি, লুঙ্গি, গ্রামীণ উৎসব, নদী ও কৃষিনির্ভর জীবন এবং হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-নাস্তিকসহ বহু সম্প্রদায়ের দীর্ঘ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানকে কট্টরপন্থীরা শত্রু মনে করে, যার ফলে তারা নিজস্ব ভাবনাকে সকলের ওপর চাপিয়ে দেয়। সংস্কৃতি থাকলে ধর্ম থাকবে না— এটা সংস্কৃতিবাদীরা মনে করে না, কিন্তু কট্টরপন্থীরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে— ধর্ম যেখানে থাকবে, সেখানে নিজস্ব সংস্কৃতি থাকতে পারবে না। ধর্মের আগ্রাসন যেখানে শুরু হয়, সেখানে ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, সেখানে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা লোপ পায়।
সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা জীবনধারাকে বাধ্যতামূলকভাবে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। একজন মানুষ যেন নিজের পছন্দের পোশাক পরতে পারেন, একজন নারী যেন নিজের চুল খোলা রেখে রাস্তায় হাঁটতে পারেন, মানুষ যেন গান শুনতে, সিনেমা দেখতে, নাচতে, উৎসব করতে এবং নিজের ঐতিহ্য অনুসরণ করতে পারেন—এর জন্য অন্যের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অনুমতির অপেক্ষার প্রয়োজন নেই।
যখন কোনো একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা হয়, তখন ভিন্নভাবে জীবনযাপন করা মানুষকে নৈতিকভাবে নিকৃষ্ট, পাপী কিংবা সমাজের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখন আর মানুষের স্বাভাবিক সৃষ্টিশীল বিকাশের ক্ষেত্র থাকে না; সেটি পরিণত হয় নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ারে।
একসময় যে পোশাক, চুলের বাঁধুনি, গান, নৃত্য, উৎসব বা সামাজিক আচরণ একটি দেশের মানুষের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক ছিল, দীর্ঘদিনের সামাজিক চাপ ও নৈতিক পুলিশিংয়ের ফলে সেটিই মানুষের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, মিশর, ইরান, লিবিয়া, জর্ডান, উজবেকিস্তান, সুদান, আলজেরিয়া, তিউনেশিয়া উদাহরণ।
এই নিয়ন্ত্রণ যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন মানুষ নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতিকে অশালী’, অশ্লীল, অগ্রহণযোগ্য, বিদেশি বলে ভাবতে শুরু করে, তখন সাংস্কৃতিক মুছে যাওয়া আর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না; মানুষ নিজেরাই সেই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়।
বাঙলাদেশে একই পরিস্থিতি চলছে; চোখ থাকা স্বত্বেও অন্ধ হয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা বিপুল ......
Ananya Azad