Friday, August 28, 2026

'শাখামুড়ি'

 



"রাতে আয়নার দিকে বেশিক্ষণ তাকাইস না। আয়নাও মনে রাখে।"

ঠাকুমা মারা যাওয়ার আগে আমাকে শেষ কথাটা এটাই বলেছিলেন। এটা আমি কাউকে বলিনি। বলিনি কারণ কথাটা এত সাধারণ আর এলোমেলো ছিল যে কেউ বিশ্বাসই করত না এটা কোন সাবধানবাণী।
এটা দশ বছরে আগের কথা, তখন আমার বয়স চোদ্দ।
আমাদের বাড়ি নেত্রকোনার একটা প্রত্যন্ত গ্রামে, নাম বলব না, কারণ এখনো সেখানে আমার আত্মীয়রা থাকেন, আর এই গল্প লেখার পরে তাদের কী হবে আমি জানি না। শুধু এটুকু বলি, গ্রামটা একটা নদীর ধারে, আর নদীর ওপারে একটা পুরনো শ্মশান আছে যেটা এখন আর ব্যবহার হয় না।
গল্পটা শুরু হয় আমার ছোট কাকিমা উমার বিয়ে দিয়ে।
উমা কাকিমা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন যখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। ছোট কাকা তখন সবে চাকরি পেয়েছেন উপজেলা অফিসে, আর উমা কাকিমা পাশের গ্রামের মেয়ে, ব্রাহ্মণ পরিবারের। বিয়েটা হয়েছিল পুরোহিত ডেকে, শুভ লগ্ন দেখে, সাত পাকে ঘুরে, সিঁদুরদান করে, খুব সাধারণ একটা অনুষ্ঠান, কোন জাঁকজমক ছিল না। কাকিমা মানুষ হিসেবে খুব চুপচাপ ছিলেন, কথা কম বলতেন, কিন্তু হাসিটা এত মিষ্টি ছিল যে বাড়ির সবাই তাকে পছন্দ করত। আমার মা প্রায়ই বলতেন, "মেয়েটা অনেক লক্ষ্মী।"
বিয়ের প্রায় দুই বছর পর উমা কাকিমা প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হন। পুরো বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ঠাকুমা নিজে হাতে কাকিমার জন্য নতুন শাখা-পলা কিনে আনেন বাজার থেকে, সাথে নতুন করে সিঁদুর, বলেন এটা নাকি বংশের নিয়ম, প্রথম সন্তান পেটে এলে নতুন শাখা পরতে হয়, সাধ-ভক্ষণের অনুষ্ঠানও হবে। কাকিমা সেই শাখা দুই হাতে পরে সারাদিন ঘুরে বেড়াতেন, খুশিতে ঝলমল করতেন, কপালে টকটকে সিঁদুরের টিপ নিয়ে।
কিন্তু সাত মাসের মাথায় একটা দুর্ঘটনা ঘটে।
একদিন সন্ধ্যায় কাকিমা কলসি নিয়ে পুকুরঘাটে গিয়েছিলেন, সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালানোর জন্য জল আনতে। কেউ জানে না ঠিক কী হয়েছিল, শুধু এটুকু জানা যায় যে ঘাটের কাছে পা পিছলে তিনি পড়ে যান, আর মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান পুকুরের পাড়ের একটা পাথরে। বাড়ির লোকজন যখন খুঁজতে খুঁজতে পুকুরে পৌঁছায়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কাকিমা আর নেই। আর পেটের বাচ্চাটাও বাঁচানো যায়নি।
এই পর্যন্ত গল্পটা একটা সাধারণ পারিবারিক দুর্ঘটনার গল্প। প্রতিটা গ্রামেই এমন গল্প শোনা যায়। কিন্তু এরপর যা ঘটে, সেটাই আসল গল্প।
কাকিমার সৎকারের পর বাড়িতে অদ্ভুত একটা নিয়ম চালু হয়ে যায়। কেউ ঠিক বলতে পারে না এটা কবে থেকে শুরু হলো, কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখা যায় বাড়ির সব আয়না কাপড় দিয়ে ঢাকা। বারান্দার ছোট আয়না, মায়ের ড্রেসিং টেবিলের আয়না, এমনকি বাথরুমের আয়নাটাও, ঠাকুরঘরের পাশের আয়নাটাও।
আমি একদিন ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "সব আয়না এমন করে ঢেকে রাখা কেন?"
ঠাকুমা শুধু বলেছিলেন, "নতুন প্রেত অশৌচ না কাটা পর্যন্ত বাড়ির আশেপাশে থাকে। আয়নায় যদি নিজের চেহারা দেখে ফেলে যে সে মরে গেছে, তাহলে সে আর যেতে চায় না। থেকে যায়।"
তখন এই কথাটা আমার কাছে গ্রামের হাজারটা কুসংস্কারের একটা মনে হয়েছিল। আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।
তেরো দিন পার হওয়ার পর, শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শেষ হলে, আয়নাগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়। পুরোহিত এসে পিণ্ডদান করালেন, শাঁখ বাজল, বাড়ি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করল। ছোট কাকা প্রথম কয়েক মাস খুব ভেঙে পড়েছিলেন, তারপর সময়ের সাথে সাথে একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে থাকেন। বাড়ির সবাই বলাবলি করত, "ছেলেটার বয়স কম, আবার বিয়ে করানো দরকার।"
কিন্তু এখানেই একটা জিনিস আমার চোখে পড়েছিল, যেটা তখন আমি পাত্তা দিইনি।
কাকিমা মারা যাওয়ার প্রায় তিন মাস পর, একদিন রাতে আমি জল খেতে উঠেছিলাম। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি ছোট কাকার ঘরের দরজা একটু ফাঁক করা, আর ভেতরে মিটমিট করে প্রদীপের আলো জ্বলছে। আমি উঁকি দিয়ে দেখি ছোট কাকা আয়নার সামনে বসে আছেন, একা, আর আয়নার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে কথা বলছেন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম উনি হয়তো কাকিমার স্মৃতিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তাই ফিরে গিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু এরপর থেকে এই ব্যাপারটা প্রায়ই ঘটতে থাকে। রাতের বেলা বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর, ছোট কাকা একা তার ঘরে বসে আয়নার সাথে কথা বলতেন। মাঝে মাঝে হাসতেন, মাঝে মাঝে কাঁদতেন। আমার মা একদিন এটা লক্ষ্য করে বাবাকে বলেছিলেন, বাবা বলেছিলেন, "শোকে মানুষ অনেক সময় অনেক পাগলামি করে, ঠিক হয়ে যাবে।"
কিন্তু ঠিক হয়নি। বরং জিনিসটা আরো বাড়তে থাকে।
প্রায় ছয় মাস পর একদিন সকালে গ্রামের মানুষ একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করে। পুকুরঘাটে, ঠিক যেখানে উমা কাকিমা পড়ে গিয়েছিলেন, সেখানে কেউ একজন প্রতিদিন রাতে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে যাচ্ছে, সাথে কয়েকটা ফুল, যেন কেউ তর্পণ করছে নিয়ম করে। প্রথমে সবাই ভেবেছিল এটা হয়তো কেউ কাকিমার আত্মার শান্তির জন্য করছে। কিন্তু কে করছে, কেউ জানত না, কারণ প্রদীপটা সবসময় ভোররাতে জ্বলত, আর সকাল হওয়ার আগেই নিভে যেত।
আমার বড় পিসিমা, যিনি পাশের গ্রামে থাকতেন, একদিন বেড়াতে এসে এই কথা শুনে খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি মাকে ডেকে বলেন, "বউদি, এটা ভালো লক্ষণ না। মরা মানুষ যদি বাড়ির মায়া ছাড়তে না পারে, তাহলে সে অন্য রূপে ফিরে আসে।"
মা জিজ্ঞেস করেন, "কী রূপে?"
পিসিমা ফিসফিস করে যা বলেছিলেন, সেটাই আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়ের গল্প। শাখামুড়ি।
আমাদের এলাকায় প্রচলিত বিশ্বাস, যে মেয়ে সধবা অবস্থায়, মানে বিবাহিত অবস্থায়, হাতে শাখা-পলা আর কপালে সিঁদুর পরা অবস্থায় অস্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করে, বিশেষ করে জলে ডুবে বা জলের কাছাকাছি কোন দুর্ঘটনায়, তার আত্মা অনেক সময় স্বাভাবিকভাবে মুক্তি পায় না, সদগতি হয় না। সে থেকে যায় জলের কাছে, আর ধীরে ধীরে তার আসল রূপ বদলে যায়। তার নখ বড় হতে থাকে, চোখ গর্তে ঢুকে যায়, আর সে রাতের বেলা মানুষের রূপ ধরে ফেরত আসতে শেখে। বিশেষ করে সে ফেরত আসে তার স্বামীর কাছে। প্রথমে শুধু ছায়া হয়ে, তারপর ধীরে ধীরে পুরোপুরি মানুষের রূপে।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, শাখামুড়ি যখন কারো রূপ ধরে ফেরত আসে, তখন সে হুবহু আগের মানুষটার মতোই দেখতে হয়। একই গলার স্বর, একই হাঁটাচলা, এমনকি একই পুরনো স্মৃতিও তার মনে থাকে। শুধু একটা জিনিস সে বদলাতে পারে না। তার প্রতিবিম্ব। আয়নায় তার আসল রূপ ধরা পড়ে যায়।
এই জন্যই গ্রামে নিয়ম আছে, নতুন মৃত মানুষের সামনে আয়না রাখতে নেই। কারণ যদি সে আয়নায় নিজেকে দেখে ফেলে, তাহলে সে বুঝে যায় কীভাবে আয়নাকে ফাঁকি দিতে হয়।
মা এই কথা শুনে চুপ করে বসে ছিলেন অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিলেন, "তেরো দিন তো আয়না ঢাকাই ছিল।"
পিসিমা বলেছিলেন, "তেরো দিন যথেষ্ট না, বউদি। যদি মৃত্যুটা অস্বাভাবিক হয়, যদি আত্মার মধ্যে রাগ বা অতৃপ্তি থেকে যায়, তাহলে শ্রাদ্ধ করলেও কিছু হয় না।"
এই কথোপকথনের পর থেকে আমি জিনিসগুলো অন্যভাবে লক্ষ্য করতে শুরু করি। প্রথম যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ে, সেটা হলো ছোট কাকার ঘরের আয়নাটা। আগে সেটা দেয়ালে টাঙানো ছিল, কিন্তু এখন সেটা মেঝেতে, একপাশে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে রাখা, উল্টো করে। মানে আয়নার পেছনের দিকটা সামনে, কাচের দিকটা দেয়ালের দিকে।
আমি একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "কাকার ঘরের আয়নাটা উল্টো কেন?"
মা প্রথমে অবাক হয়েছিলেন, বলেছিলেন, "কই, আমি তো খেয়াল করিনি।" তারপর একদিন নিজে গিয়ে দেখেন, সত্যিই আয়নাটা উল্টো করা। মা জিজ্ঞেস করেছিলেন ছোট কাকাকে, কাকা শুধু বলেছিলেন, "ভেঙে যাওয়ার ভয়ে সরিয়ে রেখেছি, ওদিকে বাতাস বেশি আসে।"
উত্তরটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল সবার কাছে। কিন্তু আমার কাছে না। কারণ আমি জানতাম, ওই ঘরের জানালা দিয়ে কখনো তেমন জোরে বাতাস আসে না।
এর কিছুদিন পর, গ্রামে একটা নতুন কথা রটে যায়। রাতের বেলা পুকুরঘাটে নাকি একজন মহিলাকে দেখা গেছে, লালপাড় সাদা শাড়ি পরা, চুল খোলা, হাতে শাখা-পলা, কপালে সিঁদুর। যে দেখেছে, সে বলেছে, মহিলাটা ঘাটে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল, আর যখন সে কাছে গিয়েছিল, মহিলাটা মুখ ফিরিয়ে তাকিয়েছিল, আর তার চোখ দুটো ছিল একদম সাদা, মণি ছিল না।
এই কথা শোনার পর বাড়ির মহিলারা সন্ধ্যার পর পুকুরের দিকে যাওয়া বন্ধ করে দেন। কিন্তু ছোট কাকা তখনো মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর বের হতেন, বলতেন হাঁটতে যাচ্ছেন। কোথায় যেতেন, কেউ জিজ্ঞেস করেনি।
আসল ঘটনাটা ঘটে কাকিমার মৃত্যুর প্রায় এক বছর এক মাস পর।
সেদিন ছিল খুব সাধারণ এক শনিবার। বাড়িতে মেহমান আসার কথা ছিল, তাই মা সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত। আমি বাড়ির উঠানে বসে পড়ছিলাম, তখন দেখি ছোট কাকা উঠানে এসে দাঁড়ালেন, আর তার পেছনে, আড়াল থেকে একজন মহিলা উঁকি দিচ্ছেন।
আমার প্রথম মনে হয়েছিল আমার চোখের ভুল। কারণ মহিলাটার চেহারা হুবহু উমা কাকিমার মতো। একই শাড়ি পরার ধরন, একই চুলের বেণী, এমনকি একই হাতের শাখা-পলা, একই কপালের সিঁদুরও।
আমি চিৎকার করে মাকে ডাকতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ততক্ষণে মহিলাটা ঘরে ঢুকে গেছেন। ছোট কাকা আমার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, "কী রে, চমকে গেলি নাকি? ও তো তোর নতুন কাকিমা। নাম মালতী। পাশের উপজেলার মেয়ে। গত মাসে বিয়ে হয়েছে, তোদের বলা হয়নি এখনো, চুপচাপ পুরোহিত ডেকে সেরে ফেলেছিলাম।"
আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছিল। চুপচাপ বিয়ে? বাড়ির কেউ জানত না? আমি দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়েছিলাম, সব বলেছিলাম। মা প্রথমে বিশ্বাস করেননি, তারপর নিজে গিয়ে দেখেন, সত্যিই ছোট কাকার ঘরে একজন নতুন বউ বসে আছেন।
মহিলাটা, মালতী, দেখতে সত্যিই খুব সুন্দর, খুব শান্ত স্বভাবের। কথা বলতেন কম, ঠিক উমা কাকিমার মতোই। বাড়ির সবাইকে প্রণাম করতেন, বড়দের সম্মান করতেন। প্রথম কয়েকদিন সবাই অবাক হলেও ধীরে ধীরে ব্যাপারটা মেনে নেয়। ছোট কাকা বলেছিলেন, বিয়েটা তাড়াহুড়ো করে করেছেন কারণ মেয়ের পরিবারে সমস্যা ছিল, তাই ঘরোয়াভাবে করে ফেলেছেন, কাউকে জানাননি।
গল্পটা এখানে শেষ হতে পারত। একটা সাধারণ গল্প, শোক কাটিয়ে নতুন জীবন শুরু করার গল্প। কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা কাঁটার মতো খচখচ করছিল সেই প্রথম মুহূর্তটা। সেই চোখদুটো। যখন মালতী কাকিমা প্রথম উঁকি দিয়েছিলেন, এক সেকেন্ডের জন্য তার চোখদুটো আমার চোখে পড়েছিল, আর সেই চোখদুটো ছিল একদম উমা কাকিমার চোখের মতো। এমনকি বাম ভুরুর ওপরে ছোট্ট একটা তিলও একই জায়গায় ছিল।
আমি এই কথা কাউকে বলিনি, কারণ কে বিশ্বাস করবে? কিন্তু আমি নিজে নিজে লক্ষ্য করা শুরু করি।
প্রথম যে জিনিসটা আমার চোখে পড়ে, সেটা হলো মালতী কাকিমা কখনো আয়নার সামনে দাঁড়াতেন না। বাড়ির অন্য মহিলারা যখন সাজগোজ করতেন, সিঁদুর পরতেন, চুল বাঁধতেন আয়নার সামনে বসে, মালতী কাকিমা সবসময় আয়না থেকে দূরে সরে থাকতেন। একবার আমার ছোট বোন তাকে ডেকেছিল আয়নার সামনে চুল বাঁধতে সাহায্য করার জন্য, কাকিমা হাসিমুখে বলেছিলেন, "তুই নিজে করে নে মা, আমার একটু কাজ আছে।"
দ্বিতীয় জিনিসটা আরো অদ্ভুত। মালতী কাকিমা কখনো রাতে খাওয়া-দাওয়ার সময় সবার সাথে বসতেন না। বলতেন তার শরীর ভালো না, রাতে নিজের ঘরে হালকা কিছু খেয়ে নেন। বাড়ির কেউ কখনো তাকে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে দেখেনি।
তৃতীয় জিনিসটা, যেটা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, সেটা ঘটেছিল বিয়ের প্রায় চার মাস পর। একদিন রাতে আমি জল খেতে উঠেছিলাম, আর হঠাৎ দেখি বাড়ির উঠানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক পুকুরের দিকে মুখ করে। আমি জানালার পর্দার আড়াল থেকে দেখি, সেটা মালতী কাকিমা। তিনি একা দাঁড়িয়ে ছিলেন, চাঁদের আলোয়, আর তার ছায়াটা মাটিতে পড়ছিল।
কিন্তু ছায়াটা তার শরীরের সাথে মিলছিল না।
কাকিমা সোজা দাঁড়িয়ে ছিলেন, দুই হাত পাশে ঝুলিয়ে। কিন্তু মাটিতে যে ছায়াটা পড়ছিল, সেটার মাথাটা একদিকে হেলে ছিল, ঠিক যেভাবে কারো ঘাড় ভেঙে গেলে মাথা ঝুলে থাকে। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি চোখ বন্ধ করে আবার খুললাম, ছায়াটা তখনো একই রকম ছিল।
আমি এতটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে চিৎকার করতে পারিনি, শুধু দৌড়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
পরদিন সকালে আমি ঠিক করি, এই কথা ঠাকুমাকে বলব। কিন্তু ঠাকুমা তখন অসুস্থ ছিলেন, কয়েকদিন ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারছিলেন না। আমি যখন তার ঘরে গেলাম, দেখি তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, যেন তিনি আগে থেকেই জানতেন আমি আসব।
ঠাকুমা আমাকে কাছে ডেকে বললেন, "তুই দেখেছিস, তাই না?"
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।
ঠাকুমা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, "যে জিনিসটা এখন এই বাড়িতে আছে, সেটা মালতী না, উমাও না। উমা অনেক আগেই চলে গেছে, তার সদগতি হয়নি। এই যে মেয়েটা এসেছে, ও উমার জায়গা নিতে এসেছে। আর একবার জায়গা নিয়ে ফেললে, ওকে তাড়ানো অনেক কঠিন।"
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করলাম, "তাহলে আমরা কী করব?"
ঠাকুমা আমার হাত শক্ত করে ধরে বললেন, "কিছু করার নেই এখন। অনির্বাণ নিজেই ওকে ঘরে তুলেছে, নিজের ইচ্ছায়। ও যতক্ষণ অনির্বাণের মনে জায়গা করে নিয়েছে, ততক্ষণ আমরা কিছু করলে উল্টো ক্ষতি হবে। শুধু একটা কথা মনে রাখিস। কখনো ওর সাথে একা রাতে থাকিস না। আর কখনো ওর সামনে আয়না নিয়ে যাবি না। যদি ও নিজে থেকে আয়না দেখে ফেলে, তাহলে ও বুঝে যাবে ও ধরা পড়ে গেছে। আর তখন ও যা করবে, সেটা অনেক ভয়ংকর হবে। আর রাতে আয়নার দিকে বেশিক্ষণ তাকাইস না। আয়নাও মনে রাখে।"
এই কথার তিনদিন পর ঠাকুমা মারা যান।
ঠাকুমার মৃত্যুর পর বাড়িতে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। সবাই শোকে ভেঙে পড়ে, কিন্তু আমি লক্ষ্য করি মালতী কাকিমা সেই শোকের মধ্যেও কেমন যেন অন্যরকম আচরণ করছিলেন। তিনি ঠাকুমার দেহের কাছে যাননি একবারও, বলেছিলেন তার শরীর খারাপ লাগছে। শ্মশানযাত্রার সময়ও তিনি ঘরের মধ্যে বসে ছিলেন, বাইরে আসেননি।
ঠাকুমার দাহকার্যের রাতে, বাড়ির রীতি অনুযায়ী সব আয়না আবার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। আমি নিজে হাতে আমাদের ঘরের আয়নাটা ঢেকেছিলাম, ঠাকুমার শেষ কথাটা মনে করে।
সেই রাতে আমার ঘুম আসছিল না। রাত তখন প্রায় দুইটা, হঠাৎ আমি একটা শব্দ শুনি, খুব আস্তে, যেন কেউ কাপড় সরাচ্ছে। আমি বিছানা থেকে উঠে আস্তে আস্তে জানালার কাছে গিয়ে দেখি, উঠানে মালতী কাকিমা দাঁড়িয়ে আছেন, আর তার হাতে ঠাকুমার ঘরের সেই ঢেকে রাখা আয়নাটা।
তিনি আয়নার কাপড়টা খুলে ফেলেছেন, আর নিজের দিকে তাকিয়ে আছেন।
আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখতে থাকি। চাঁদের আলোয় আমি দেখি, আয়নায় যে প্রতিবিম্বটা ফুটে উঠছে, সেটা মালতী কাকিমার মুখ না। সেটা একটা বিকৃত মুখ, চামড়া কুঁচকানো, চোখদুটো কোটরে ঢুকে গেছে, আর মুখের ভেতর থেকে যেন দাঁতগুলো অনেক বড় বড় বেরিয়ে আছে। কিন্তু মালতী কাকিমার আসল শরীরটা তখনো স্বাভাবিক মানুষের মতোই দেখাচ্ছিল।
তিনি আয়নার দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে হাসলেন। তারপর ফিসফিস করে কিছু একটা বললেন, যেটা আমি স্পষ্ট শুনতে পাইনি, কিন্তু মনে হয়েছিল তিনি বলছিলেন, "এবার তুই আমাকে চিনে গেছিস।"
তারপর তিনি ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে সোজা আমার জানালার দিকে তাকালেন।
আমি জানি তিনি অন্ধকারে আমাকে দেখতে পাননি, কারণ আমার ঘরে কোন আলো ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, তিনি ঠিক জানেন আমি সেখানে দাঁড়িয়ে আছি।
পরদিন সকালে আমি এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলিনি। কারণ আমি বুঝেছিলাম, ঠাকুমার কথাই ঠিক ছিল। এখন কিছু বলা মানে নিজের জন্য বিপদ ডেকে আনা।
কিন্তু এরপর থেকে বাড়ির পরিবেশ আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করে। ছোট কাকা আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ হয়ে যান, প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন, শরীর শুকিয়ে যাচ্ছিল দিন দিন। বাড়ির অন্য বয়স্ক মানুষরাও একে একে অসুস্থ হতে থাকেন, ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে, যেগুলোকে সবাই কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দিত। ঠাকুরঘরে প্রতিদিন পুজো দেওয়া হতো, কিন্তু কিছুতেই যেন কিছু ঠিক হচ্ছিল না।
আমি তখন কলেজে ভর্তি হয়ে শহরে চলে যাই, তাই বাড়িতে যাওয়া কমে যায়। কিন্তু প্রতিবার বাড়িতে গেলে দেখতাম, বাড়িটা যেন আরেকটু বেশি নিস্তেজ হয়ে গেছে, আরেকটু বেশি ঠান্ডা। মালতী কাকিমা সবসময় হাসিমুখেই থাকতেন, সবার সাথে ভালো ব্যবহার করতেন, কিন্তু তার চোখদুটোর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যেত না।
আজ থেকে দুই বছর আগে ছোট কাকা মারা যান। ডাক্তাররা বলেছিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বয়স তখন তার মাত্র সাঁইত্রিশ।
কাকার মৃত্যুর পর মালতী কাকিমা বাড়িতেই থেকে যান। বলেন, তার আর যাওয়ার জায়গা নেই, এই বাড়িই এখন তার ঘর। বাড়ির মুরুব্বিরা মায়া করে তাকে থাকতে দেন। তিনি এখনো সেখানেই আছেন, খুব ভালো ব্যবহার করেন সবার সাথে, বাড়ির সব কাজ নিজে হাতে করেন, ঠাকুরঘরের পুজোর আয়োজনও করেন নিয়মিত, আত্মীয়দের মধ্যে তার সুনাম আছে যে তিনি কত লক্ষ্মী একটা মেয়ে।
শুধু একটা জিনিস এখনো একই রকম আছে। বাড়ির যে ঘরে তিনি থাকেন, সেই ঘরে কোন আয়না নেই। কখনো ছিল না। আর গত মাসে যখন ছোট পিসির বিয়ে ঠিক হয়, নতুন বউয়ের জন্য যখন শাখা-পলা আর সিঁদুরকৌটা কেনার কথা ওঠে, মালতী কাকিমা নিজে থেকে বলেছিলেন, "আমি নিজে হাতে বেছে দেব, আমার এসব জিনিসের পছন্দ অনেক ভালো।"
কেউ কিছু মনে করেনি এই কথায়। শুধু আমি জানি, সেদিন রাতে তিনি যখন শাখা-পলার বাক্সটা হাতে নিয়ে একা একা বসে ছিলেন বারান্দায়, তার ঠোঁটে যে হাসিটা ছিল, সেটা কোন মানুষের হাসি ছিল না।
আমি এখন প্রতিবার বাড়িতে যাওয়ার আগে নিজের ঘরের আয়নাটা ব্যাগে ভরে নিয়ে যাই। ছোট, হাতে ধরা একটা আয়না। রাতে ঘুমানোর আগে সেটা বালিশের নিচে রাখি।
কারণ ঠাকুমা একটা কথা বলেননি আমাকে, সেটা আমি নিজে বুঝেছি অনেক পরে। শাখামুড়ি শুধু আয়নাকে ভয় পায় না। ও অপেক্ষা করে, কে তাকে আয়নায় ধরে ফেলেছে সেটা মনে রাখার জন্য।
আর আমি জানি, ও আমাকে মনে রেখেছে।
আজ রাতে, যখন এই লেখাটা লিখছি, আমার ঘরের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কেউ একজন খুব আস্তে করে বলছে, "তুই আয়নার দিকে বেশিক্ষণ তাকাস না, তাই না মা?"
আমার ঘরে কোন আয়না নেই আজ রাতে। আমি ব্যাগে ভরতে ভুলে গিয়েছিলাম।”

আফিফ ফারহান

বেঙ্গল নো চিচি লামান: ইট পাথরের ঢালাইয়ের মূর্তি নয়, অন্তরের মূর্তি বাঁচিয়ে রাখুন - আওয়ামী লীগের ভেতরের আসল গুপ্তদের নিয়ে সেই ২০২২ সালে লেখা


-
"যারা চিন্তাশীল, এ দুনিয়া তাদের কাছে একটি রঙ্গমঞ্চ, আর যারা আবেগ দিয়ে চলে তাদের কাছে সেটা ট্র্যাজেডি।” - বঙ্গবন্ধু (জেলের চিঠি)
বিশ্ববিখ্যাত জাপানী চিত্র পরিচালক নাগিসা ওসিমা ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবকে নিয়ে জাপানী ভাষায় একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন ‘বেঙ্গল নো চিচি লামান’ (দি ফাদার অব বেঙ্গল) নামে। সেই তথ্যচিত্রে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করা হয়েছিল “যখন এই দেশের পাকিস্থানের সাথে বিরোধ চলছিল তখন আপনি সারা দেশের জনগনকে একাত্ম করতে পেরেছিলেন, এখন সেই শত্রুর অস্তিত্ব আর নাই। এখনও জনগন নানা রকম সমস্যায় পড়বে এবং কিছু লোক আপনার সমালোচনা করবে। আপনার কি মনে হয় না আপনার জন্য কাজটা আরও বেশী কঠিন হয়ে পড়বে?”
একজন মামুলি চিত্র পরিচালক মনে হলেও নাগিসা ওসিমা জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল হিস্টোরিতে পড়াশোনা করা একজন রাজনৈতিক বোদ্ধা। অল্প বয়সেই তার বাম রাজনীতি সম্পর্কে মোহমুক্তি ঘটে যিনি আগে থেকেই ডান তথা পুঁজিবাদের পক্ষেও ছিলেন না। তার চোখের সামনেই ঘটে জাপানী সমাজতান্ত্রীক পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি ইনেজিরো আসানুমার নৃশংস হত্যাকান্ড যেটা জাপানের এনএইচকে টিভির স্টুডিওতে নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক বিতর্কের সময় ক্যামেরার সামনে সংঘটিত হয়।
১৯৬০ সালের ১২ই অক্টোবর ১৭ বছর বয়সী জাতীয়তাবাদী যুবক অটোয়য়া ইয়ামাগুচি এনএইচকের ক্যামেরা রোলিং অবস্থায় সবার সামনে মঞ্চে উঠে ইনেজিরো আসানুমার বাম পাঁজরে একটি সামুরাই সোর্ড ঢুকিয়ে দেয়।
ইনেজিরো আসানুমা প্রথম জীবনে অতি ডান (ফার রাইট) রাজনীতিতে থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিধারা মেনে না নিতে পারায় রাজনীতি ছেড়ে দেন। যুদ্ধের পরে তিনি কট্টোর মার্কিনবিরোধী হয়ে ওঠেন এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চীন-জাপানের শত্রু বলে ঘোষণা দেন। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর কাছে নাগিসা ওসিমার যে প্রশ্নটি ছিল সেটা নেহায়েতই স্ক্রিপ্টে লেখা প্রশ্ন ছিল না। ছিল একজন রাজনৈতিক ইতিহাসের ছাত্রের বাস্তব পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক জলন্ত সত্যের মুখোমুখি একটি প্রশ্ন যেটা হয়ত সে মানসচক্ষে দেখেছিল যে আশু ঘটতে যাচ্ছে।
প্রখ্যাত দার্শনিক হেগেল বলে গেছেন একটা রাষ্ট্র হচ্ছে দুনিয়ার বুকে ঈশ্বরের পদযাত্রা। সেই রাষ্ট্র যারা প্রতিষ্ঠা করে তাদের ঈশ্বরের মত গুণাবলী থাকতে হয়। তেমনই ঐশ্বরিক নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এখানে ঈশ্বরের মত বা ‘ঐশ্বরিক’ মানে ধর্মীয় ঈশ্বর নয়। এখানে ‘ঐশ্বরিক’ মানে সামগ্রিক মানবীয় আদর্শের যার মূল ভিত্তি, যোগুলো হল মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও সর্বপরি ন্যায়বিচারের গুণ। রাষ্ট্রের অর্থ হচ্ছে তার নাগরিকের সাথে একটি অলিখিত চুক্তি। যে চুক্তি হয় ঐশ্বরিক সংজ্ঞায় ও প্রতিজ্ঞায়।
হাজার হাজার বছর আগে বেদ উপনিষদ যারা লিখেছিলেন তারা খেয়াল করেছিলেন যে লোভ হিংসা ভয় তথা ইন্দ্রিয় প্রভাবমুক্ত একটি মন, যেটা বিদ্যালয়ের শিক্ষায় অশিক্ষিত ও আইন কানুন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হলেও, সেটা ন্যায় বিচার করতে পারে। বেদ-উপনিষদের ধারণায় সকল প্রাণের এই "ন্যায় বিচার" অংশটুকুর সমষ্টিই ঈশ্বর। মানুষের মন, মানুষের অবচেতন নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা মনোবিশ্লেষক কার্ল গুস্তভ ইয়ুং বলেছেন আমাদের মনের মধ্যে এমন কিছু আছে যেটা সার্বিক পর্যবেক্ষণে দক্ষ ও ন্যায্য বিচার করতে পারে। ন্যায় বিচারকে সর্বোচ্চে স্থান দেওয়া তাই মানসিক সুস্থতার লক্ষণ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলে গেছেন:
“সরকারী কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো, এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়। পাকিস্তানের কলোনি নয়। যে লোককে দেখবে, তার চেহারাটা তোমার বাবার মত, তোমার ভাইয়ের মত। ওরই পরিশ্রমের পয়সায় তুমি মাইনে পাও। ওরাই সম্মান বেশী পাবে। কারণ, ওরা নিজেরা কামাই করে খায়। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ঐ গরীব কৃষক। আপনার মাইনে দেয় ঐ গরীব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ঐ টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।”
একজন ঐশ্বরিক নেতার সাথে সমাজের নিম্নতম স্তরের মানুষের সেই আধ্যাত্মিক, আত্মিক যোগাযোগটা থাকে সবসময়। সে হয় সমাজের নিম্নতম স্তরের মানুষের প্রতিনিধি। এবং সেটা শুধু উন্নয়নে যোগাযোগ নয়, সেটা হল মানুষের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচারের অধিকারের যোগাযোগ। এমনকি সেটা শুধু জীবিত মানুষ নয়, মৃতদের আত্মার দায়িত্বও।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন:
“আজ এ’দিনে কেন বলছি একথা? অনেক বলেছি, এত বলার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার চোখের সামনে মানুষের মুখ ভাসে। আমার দেশের মানুষের রক্ত ভাসে। আমার চোখের সামনে ভাসে আমারই মানুষের আত্মা। আমার চোখের সামনে সে সমস্ত শহীদ ভাইয়েরা ভাসে, যারা ফুলের মত ঝরে গেল, শহীদ হল। রোজ কিয়ামতে তারা যখন বলবে, আমার রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করলাম, তোমরা স্বাধীনতা নস্যাৎ করছো, তোমরা রক্ষা করতে পার নাই, তখন তাদের আমি কী জবাব দেব?”
পঁচাত্তরে যারা বঙ্গবন্ধুকে খুন করেছিল তারা আজও ক্ষমা চায়নি। সেই খুনের পরবর্তী বিশ বছর তারা ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বা তার দল আওয়ামী লীগের স্লোগান “জয় বাংলা” উচ্চারণ, করলে চোখ রাঙানি দিয়েছে, মানুষকে তুলে নিয়ে গেছে, হেনস্থা করেছে। এই বিশ বছরেও তারা বঙ্গবন্ধুকে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি কেন? কারণ বঙ্গবন্ধুর ঐ হেগেলিয় ঐশ্বরিকতা যেটি প্রতিটি নিপিড়িত মানুষের হৃদয়ের অংশ। তারাই সেটা ধরে রেখেছিল।
প্লেটোর রিপাবলিকে সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলোর একটি হল গুহার উপমা (অ্যালিগোরি অব দ্যা কেভ), যেখানে প্লেটো একজন বন্দির গল্প বলেন যিনি একটি গুহায় বন্দি থাকাকালীন বাইরের দুনিয়ার কেবল ছায়া দেখতে পান এবং সেগুলোকেই বাস্তবতা বলে মনে করেন। কিন্তু যখন তিনি মুক্ত হন এবং বাইরে আসেন, তখন তিনি সত্যিকারের বাস্তবতা দেখতে পান। এই উপমা জ্ঞানের সন্ধানে মানুষের যাত্রার প্রতীক এবং প্লেটো বিশ্বাস করেন যে শিক্ষা মানুষকে ছায়া থেকে বাস্তব জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। এখানে শিক্ষা অর্থ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দর্শনের শিক্ষা যা শুধু পরিণত মানুষই অর্জন করতে পারে। বয়ঃসন্ধির অপরিণত মন থেকে মানুষ পরিণত মানুষ না হলে সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যায় না। নিজের মনের সেই গুহা থেকে সে বের হতে পারে না এবং বাস্তবতার বক্র, বিকৃত ছায়াগুলোকেই বাস্তবতা বলে মনে করে।
বর্তমান প্রজন্মের বয়ঃসন্ধির অপরিণত মনের গুহা মানবেরা আজ উপভোগ আর অর্থকে তাদের নতুন জীবনবোধ আর বাস্তবতা হিসাবে বেছে নিয়েছে আর এতে নেতৃত্ব দিচ্ছে সেই বঙ্গবন্ধুর নিজেরই দল। অর্থ ভোগবাদ আর ন্যায়বিচার একসাথে চলে না। তাই পর্দার আড়ালে নতুন আওয়ামী লিগে আবার ক্ষমতায়িত হয়েছে সেই পঁচাত্তর ঘটিয়েছে যারা তারাই তবে ভিন্ন ব্র্যান্ডে – যেটা হল “জয় বাংলা” ব্র্যান্ড। সেই কারণে আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় যারা ঐ গরীব কৃষক, আপনার মাইনে দেয় যারা ঐ গরীব শ্রমিক, আপনার সংসার চলে যাদের টাকায়, আমরা গাড়ি চড়ি যাদের টাকায় তাদের আর আমরা সম্মান করে কথা বলি না, ইজ্জত করে কথা বলি না। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চললেও ওরা আর মালিক না, ওরা দাস মাত্র। যারা কর দেবে আর বিসিএস ও প্যারেড করা নয়া সাহেবরা উন্নয়ন করবেন শুধুই বড় বড় প্রজেক্ট করে।
জনগনের সাথে এই ভাঁওতাবাজী বজায় রাখতে গেলে ডাক ঢোল পেটাতে হয় জোরে শোরে। বড় বড় মূর্তি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে হয়। অন্তরে ঈশ্বর না থাকলে বাইরে তার বড় বড় প্রতিমুর্তি তৈরী করতে হয়। আজকের আওয়ামিলীগ চেষ্টা করছে দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক মডেল অনুসরণ করতে যেখানে বড় একজন নেতার মূর্তি থাকবে, থাকবে বিশাল সব বস্তুগত আর অনুষ্ঠানের আড়ম্বর। তৈরী করা হবে এক ভয়ের রাজ্য। এই আড়ম্বরের বিরুদ্ধাচরণ করলেও ১৪ বছর জেল অথবা গুম-খুন। বাকি সবাই থাকবে প্রজা, সামন্ত, উন্নয়নের দাস যাদের কেন আত্মিক অধিকার নাই।
কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের মন দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার মানুষদের চেয়ে অনেক আলাদা। পেটে ভাত না থাকলেও আমরা অনেক বেশী দার্শনিক, হাতে সময় না থাকলেও অনেক দীর্ঘকাল নিয়ে আমরা চিন্তা করি। সহজ প্রাত্যহিক ভাল থাকা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের আধ্যাত্মিক সহায় দরকার। তাই অন্যায়ভাবে ভাল থাকলে আমরা কখনও সুখী হব না। আমরা আত্মঘাতী হব। সেই আত্মঘাতের গ্লানী থেকে বাঁচতে আমরা ধর্মক বেছে নিচ্ছি ঢাল হিসাবে এবং প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে।
আমাদের উপমহাদেশেই সূচনা হয়েছিল প্রাত্যহিক ভাল থাকার বহমান নদীর মত সরল বুদ্ধ ধর্ম, সেটা এখানে টেকেনি। কিন্তু সেটাই দক্ষিনপূর্ব এশিয়ায় বিস্তৃত হয়ে এখনও রাজত্ব করছে বৃহত্তম ধর্ম হিসাবে কারণ তারা বিশাল সব বস্তুগত সোনার মূর্তি আর অনুষ্ঠানের আড়ম্বরকেই ঈশ্বর ভেবে আনন্দিত। এর চেয়ে গভীরতর চিন্তা তারা না করলেও কোনরূপ আত্মগ্লানী তারা বোধ করে না।
খৃষ্টাব্দ প্রথম শতকে যখন বৌদ্ধ ধর্ম ভারত থেকে চীন দেশে গেল তখন সেটি রাজকীয় গুরুত্ব পায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশাল আয়োজনে মূর্তি, মন্দির, সংঘ তৈরী হয়। সংস্কৃত থেকে চীনা ভাষায় শ্লোকসমূহের অনুবাদ ও র্চচা, সেগুলো খোদাই, প্রদর্শন চলতে থাকে অনেকটা এলাহি কারবারের মত। পরবর্তী ৫০০ বছর এর প্রভাব বাধাহীনভাবে চলে।
এরপর ৫২০ খৃষ্টাব্দতে বোধিধর্ম নামে অনুসন্ধিৎসু কিন্তু দৃঢ়সংকল্পের এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এলেন চীনে ভ্রমণে। খবর পেয়ে তাকে সাথে সাথে চীনা সম্রাটের কাছে নিয়ে যাওয়া হল।
সম্রাট সেই ভারতীয় দরিদ্রবসন সন্ন্যাসীকে প্রশ্ন করলেন: “তাঁর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নানা উন্নয়ন ও আর্থিকভাবে রাজকীয় সহায়তা করে বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশে কতটা উৎকর্ষ এনেছেন বলে তার মনে হয়?”
বোধিধর্ম বললেন: “কিচ্ছু না”
সম্রাটের প্রশ্ন: “তার মানে কি?”
বোধিধর্ম বললেন: “এগুলো সবই নিকৃষ্ট কাজ। এই ধর্মীয় বস্তুগুলো নিছক ছায়া। একমাত্র যোগ্যতার কাজ হলে প্রজ্ঞা যা শুদ্ধ, সম্পূর্ণ ও রহস্যময়। ক্রিয়ার মাধ্যমে যাকে জয় করা যায় না।“
সম্রাটের প্রশ্ন: “তবে উচ্চতম অর্থে মহৎ সত্য কি?”
বোধিধর্ম বললেন: “এতে মহৎ বলে কিছু নেই”
সম্রাট বিরক্ত হচ্ছিলেন, বললেন: “আর আমাদের সামনে এই সন্ন্যাসীটি কে?”
বোধিধর্ম উত্তর দিলেন: “জানি না” তারপর তিনি প্রাসাদ ছেড়ে চলে এলেন।
এরপর বোধিধর্ম নিকটস্থ এক মঠে ফিরে গেলেন। এক শূন্য প্রাচীরের দিকে ফিরে তিনি নয় বছর নীরব নিঃশব্দ ধ্যানে মগ্ন রইলেন এটি বোঝাতে যে বৌদ্ধ ধর্ম কৃত সম্পন্ন করা, ধর্ম বানীর প্রচার প্রসার বা ধর্মীয় কার্য, বস্তু, এসবে সময় নষ্ট করা নয়।
যখন তিনি সেই মঠে ধ্যানে মগ্ন এমন সময় সেখানে এলেন এক কনফুশিয় পন্ডিত যার নাম হুই কো। শূন্য প্রাচীরের দিকে ফিরে নীরব নিঃশব্দ ধ্যানে মগ্ন বোধিধর্মের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাভরে অভিবাদন করলেন: “প্রভু”
বোধিধর্ম যেমন নীরব নিঃশব্দ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন তেমনই রইলেন। শোনার কোন লক্ষণ দেখা গেল না। হুই কো দাঁড়িয়ে থাকলেন সারা দিন। দিবা অস্ত গেল, তুষার পতিত হল অথচ অচল বোধিধর্ম।
এমন সময় শিষ্য হবার জন্য নিজের প্রত্যয় প্রমাণ করতে ডান হাতে তলোয়ারটি নিয়ে বাম হাতটি কেটে ফেলে প্রভুর পায়ের কাছে রাখলেন হুই কো। তখন ধ্যান ভেঙে বোধিধর্ম ফিরে দেখলেন কর্তিত হস্তের মালিককে।
তখন হুই কো বললেন: “আমায় বুদ্ধের পথে চলার শিক্ষা দিন”
বোধিধর্ম বললেন: “সেটা তো অন্যের মাধ্যমে পাওয়া যায় না”
হুই কো বললেন: “তাহলে দয়া করে আমার আত্মাকে প্রশমিত করুন”
বোধিধর্ম বললেন: “আত্মাকে হাজির কর, তখন আমি করে দেব”
হুই কো বললেন: “বহু বছর ধরে তার সন্ধান করেছি, কিন্তু খুঁজে পাই না”
বোধিধর্ম বললেন: “তাই? তাহলে ওটা শান্তিতে আছে, তাকে ছেড়ে দাও”
এরপর তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন শূন্য প্রাচীরের দিকে এবং নীরব নিঃশব্দ ধ্যানে মগ্ন হলেন আবার।
বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতি হীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনদিন একসাথে হয়ে দেশের কোন কাজে নামতে নেই। তাতে দেশ সেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়’ এবং ‘মানুষের যখন পতন আসে তখন পদে পদে ভুল হতে থাকে’।

Abm Sirajul Hossain

Stir-fried Chicken Breast with Oyster Sauce

 


【Ingredients】 (Serves 2)


Chicken breast: 1 piece


Sake: 1 tbsp


Salt: to taste


Potato starch: as needed


Salad oil: 1.5 tbsp


White part of a long onion (negi): 1 stalk


Garlic chives (nira): 1/2 bunch


Sake: 1 tbsp


Mirin: 2 tsp


Sugar: 2 tsp


Soy sauce: 2 tsp


Oyster sauce: 2 tsp


Sesame oil: a splash


【Preparation】


1. Slice the chicken breast diagonally into 1cm-thick pieces and pound them lightly with a rolling pin to flatten. Cut into bite-sized pieces and coat them in a bowl containing the mixed "seasoning base" ingredients.


If you have a meat mallet, please use it.

2. Thinly slice the white onion diagonally. Trim the root ends off the garlic chives and cut them into 3cm lengths. Mix together the "sauce ingredients."


【Instructions】


1. Lightly coat the chicken pieces with potato starch. Heat 1 tablespoon of salad oil in a frying pan over medium heat, cook the chicken until browned on both sides, then remove from the pan.

2. Wipe any residue from the pan with a paper towel, heat the remaining 1/2 tablespoon of salad oil, and sauté the white onion until softened.

3. Return the chicken to the pan, add the garlic chives and the mixed sauce ingredients, stir-fry everything together, and serve on a plate.