Thursday, September 17, 2026

দেবী ষষ্ঠী ব্রত (চাপড়া)

 








বাংলার একটি জনপ্রিয় দেবী হলেন ষষ্ঠী। সারা বছর জুড়েই ষষ্ঠীর আরাধনা করা হয়। বারমাসের বারো ষষ্ঠীর অন্যতম ভাদ্র মাসের চাপড়া ষষ্ঠী। চলুন এই ষষ্ঠী পালনের কিছু ইতিহাস জেনে নিই। বাকি গুলোও কথা পরে জানাবো।
ভাদ্র মাসের শুক্ল পক্ষে এই ষষ্ঠীর ব্রত পালন করা হয়। মহিলারা হাতে চাপড়ে চাপড়ে চালের মন্ড (আমাদের পরিবারে ক্ষীরের চাপড়া )তৈরি করে সেগুলোর কয়েকটা নিজে খান এবং বাকি গুলো জলে ভাসিয়ে দিয়ে সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন এই চাপড়া ষষ্ঠীতে। কোথাও কোথাও পুকুর ঘাটে মথন কাঠ পুঁতে ষষ্ঠী রূপে পুজো করার রীতি রয়েছে।
এই চাপড়া ষষ্ঠী ব্রত সৃষ্টির পিছনে নানান গল্প শোনা যায় গ্রাম বাংলায়। তাদের মধ্যে একটি ছিল এরকম,
কোনো এক দেশের এক সওদাগরের তিন ছেলে। বড়ো ও মেজো ছেলের দুটি করে ও ছোটো ছেলের একটি সন্তান রয়েছে। ছোটো ছেলের পুত্র অর্থাৎ ছোটো নাতি ছিল তাদের অতি আদরের। সওদাগরের ঘরে কোনো কিছুরই অভাব ছিল না, শুধু এক খানা পুকুরের অভাবে ঘরের বধূদের বাইরে ষষ্ঠী পুজো করতে যেতে হয়। তাই সওদাগর ঘরেই একটি পুকুর খুঁড়লেন কিন্তু আশ্চর্য পুকুরে কিছুতেই জল উঠলো না। সওদাগরের মন খারাপ। রাত্রে দেবী ষষ্ঠীর স্বপ্নাদেশ পেলেন, যদি তাঁর সবচেয়ে আদরের নাতিকে ওই পুকুরে বলি দিতে পারেন তবেই পুকুরে জল উঠবে। সওদাগর ভীষণ বিপদে পড়লেন, কিন্তু দেবীর আদেশ মানতেই হবে। তাই সকালে উঠে পুজোর আয়োজন করে ছোটো নাতিকে এনে বলি দেওয়া হলো। কী আশ্চর্য! সঙ্গে সঙ্গে পুকুর জলে ভরে উঠলো। সওদাগর ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে দেখে বাড়ির বধূরা চাল গুঁড়োর মন্ড করে ও পুতুল বানিয়ে জলে ফেলতে লাগলো। সকলে একসাথে সুর করে কাতর আবেদন করলো,
"ও মা চালের পুতুল নে
আমার ছেলে ফিরে দে।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেটি জীবন্ত অবস্থায় ভেসে উঠলো। তারপর থেকে সওদাগর খুশিতে প্রত্যেক বছর ভাদ্র মাসে এই ষষ্ঠী পুজোর আয়োজন করতেন। সেই থেকে এখনও চাপড়া ষষ্ঠীর দিন চালের মন্ড জলে ফেলার রীতি রয়েছে।
আমাদের এই দিন প্রতি গৃহবধূদের নামে ৬ টি ফল
তথা: নারকেল, চাল কুমড়ো ,জিঙ্গে, কলা,শসা, ও অন্যকে কোনো ফল নিবেদিত হয় ।।
সাথে কাঠাল পাতা করে ৬ টি চাপরা ভাসাতে হয়।।

সাথে আমাদের বাড়ির কিছু ফটো চাপড়া ষষ্ঠীর।। এর পরে ষষ্ঠী হলো দুর্গা ষষ্ঠী।

ভাদ্রে মাসের সংক্রান্তি

 





ভাদরে রান্না
আশ্বিনে পান্না
মা আমার মনসা বুড়ি
রোয়ার শেষে মঙ্গলকারি।
উনভোগে সাজিয়ে দিলাম মা গো
রেখো বছরভর আনন্দে আহ্লাদে।।
ভাদ্রে মাসের সংক্রান্তির দিন বুড়ো রান্না অর্থাৎ অরন্ধনের প্রস্তুতি । বছরভর সংসারে উনুন জ্বলে। অন্ন যোগায় সংসারে।
তাকে পরিচ্ছন্ন করে, নিকিয়ে শাপলা আর ফনীমনসা দিয়ে সাজানো হয়। সংসারে খুব ব্যস্ততা সেদিন।
ভাদ্র মাস জুড়ে নানান অঞ্চলের মানুষ রান্নার পুজো পার্বণ করেন। কেউ শনি মঙ্গলবারে রান্না পুজো করে থাকেন, তাকে বলে ইচ্ছে পুজো। আবার ষষ্ঠীর দিন কেউ পালন করেন তাকে বলে চাপরা ষষ্ঠী বা ঝিঙে ষষ্ঠী,তাতেও ঠান্ডা ভাত, চাপরা আর ঝিঙের তেলানি খাওয়ার নিয়ম, কেউ ২৮ শে করেন অরন্ধন।
বর্ষার দিনে গ্রাম বাংলার চারিদিকে জলের বাড়ন্ত, আগাছা, ঘাস চর্তুদিকে, সাথে আছে সাপ, পোকামাকড় এর উপদ্রব। মা বিষহরি মনসাকে তুষ্ট করার ব্রত সংক্রান্তিতে, ঝাপান গান হয় রাত জেগে, ফরিদা মাসি আমায় শোনায় - একজন গায়, আরেকজন দুয়ার দেয়
বেহুলা কাঁদিস না গো কাঁদিস না।
তোর পতি গেলো নদীজলে।
বেহুলা জাগো, জাগো রে
কালনাগিনী ঢংশাইলো লোহার বাসর ঘরে....

উনুনের সামনে নিকিয়ে তাতে শালুকের মালা, ফনী মনসা গাছের ডাল সাজানো, সামনে পাথরের ঝিনাই বাটিতে দুধ, কলা। সাঁঝের বেলা বাড়ির মেয়েরা স্নান সেরে পায়ে আলতা পরে, পাটভাঙা শাড়ি পরে রান্না সারবেন, অনেক পদ রান্না,আজ বিষহরি মা কৃষিদেবীর মতো অধিষ্ঠিত। নানান বাড়ির নানান রান্না, ভাদ্রমাসীয় যা কিছু সবজি, শাকপাতা, ফল সব রেঁধে বেড়ে পদ হয় উনিশ থেকে আঠাশ রকমের, মায়ের নৈবদ্য সাজিয়ে দেওয়া হয়। ঠাকুরের কাছে নিবেদনের জন্য আলাদা মাটির হাঁড়িতে ভাত হয় সর্ব প্রথম, সেই ভাত নামিয়ে ঠান্ডা হলে তাতে জল ঢালা হবে, হবে নানান ভাজা, খেসারির ডাল, চাপ ডাল, নারকেল ভাজা, শাপলার ভেলা, কলার বড়া, কচুর শাক, সজনে পাতা ভাজা, ইলিশের অম্বল, কচু আর তেঁতুল দিয়ে চিংড়ির টক, চালতার সরষে নারকেল অম্বল, আমড়ার টক, দুধ নারকেলের নোনতা পায়েস আরো কত কি। যার যেমন সাধ্য তিনি তেমন আয়োজন করেন। কোনো কোনো বাড়িতে রাত থাকতে রান্না শুরু,সেই সূর্য ওঠার আগে অবধি রান্নার পালা, তারপর সব শেষ করে ঠাকুরের কাছে হাঁড়ি নিবেদন, পুজো হলে সবাই কলাপাতা কেটে তাতে খাওয়া-
আজ ইচ্ছে রান্না
কাল হবে পান্না
আখাপালনী,আখায় রোজ রান্না চড়ে, সে অন্ন যোগায় অন্ন, ধান সেদ্ধ হয় নাদা আখায়। সংক্রান্তির রান্না সেরে রাতে সবাই খায় দই, খই। আজ আমার ঘরে জোস্নাদিদির ছুটি, ঘর, উঠোন নিকিয়ে, উনুন, তুলসী তলায় আলপনা দেন দিদি, তাতে কলমিলতা, শুষনিপাতার ছবি আঁকেন, আঁকে শালুকের ফুল, সেদ্ধ করেন মুগ কলাই, গোটা মুসুরি, পরের দিন খাওয়া হবে মুড়ি দিয়ে, জমিয়ে রাখা ধান বালিতে দেয় দিদি, খই হয় , সেই খই, দুধ আর কলা দিয়ে উনুনের ধারে রাখেন দিদি, মা মনসার গান গুনগুন করেন, সংসারের মঙ্গল কামনায়,
ঘরে অন্ন থাকুক সারা বছর
আগুন থাকুক আখায়।
আজ তার বিশ্রাম, সংসারের বছরভর অন্ন যোগানো আখা আর মায়েদের বিশ্রাম।
আশ্চর্যের কথা চীন দেশের বিশ্বাসে এক অধিদেবতা রান্নাঘরে থাকেন, তার পুজোও হয় একটি নির্দিষ্ট দিনে, মনে করা হয় দেবতা সুরলোকে যাবেন গেরস্তালির ভালোমন্দ পৌঁছে দিতে পিতৃপুরুষের কাছে। রান্নাঘরের এই দেবতাই আগুনের প্রতীক। পাড়াপড়শি সবার নিমন্ত্রণ হয় এই পুজোয়, ঠিক যেমন এমনই এক ভাদ্র মাসের অরন্ধন তিথিকে বিভূতিভূষণের কুমী নেমত্তন্ন করেছিলো হীরুকে।
দেশ বদলায়, স্থান বদল হয়, রীতি অনুষ্ঠানের পালা বদল হয়, খাদ্য সংস্কৃতি বয়ে চলে মানুষের ইতিহাসে, সে ইতিহাস অন্নের, ফসলের, ধরিত্রীর।


Samita Gopal Halder

*"আত্মা রূপে কর্তা হরি, তারে চিনলে যায় চেনা।"*

 


শূন্যমন্ডলে যে আত্মার সাথে যে আত্মার পরিচয় হয়, দুনিয়াতে তার সাথেই প্রেম হয়...
এটা কোনো নতুন কথা না দরদী, এটা আদি কথা।
আল্লাহ যখন কোনো দেহ বানান নাই, কোনো জমিন বানান নাই, তখন আল্লাহ আত্মাগুলোকে এক ময়দানে জমা করেছিলেন। সেই ময়দানের নাম *আলমে আরওয়াহ - আত্মার জগত*।
ওইখানে সব আত্মা ছিল শূন্যে ভাসমান, নূরের বাতির মতো। ওইখানে তোমার আত্মা আমার আত্মাকে দেখেছিল, চিনেছিল, ভালোবেসেছিল। কোরআনে আল্লাহ বলেন, আমি সব আত্মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম - *আলাসতু বি রাব্বিকুম? আমি কি তোমাদের রব নই?* সবাই বলেছিল - হ্যাঁ।
ওই হ্যাঁ বলার সময় যে আত্মা যে আত্মার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, দুনিয়াতে এসে তারা আবার একে অপরকে খোঁজে।
*মারফতের বাণীতে বলে -*
> "দেহের মিলন জন্মে জন্মে হয়, কিন্তু আত্মার মিলন একবারই হয়।
> দেহ চেনে রূপ, আত্মা চেনে ঘ্রাণ।
> তাই দুনিয়াতে হাজার মানুষের ভিড়ে হঠাৎ একজনকে দেখে বুকটা কেঁপে ওঠে, মনে হয় - একে তো আমি চিনি, বহু জনম ধরে চিনি!"
দরদীরা বলে - এটা প্রেম না, এটা *চেনা*। নতুন করে প্রেম হয় না, পুরাতন প্রেম মনে পড়ে।
তাই তো লালন বলে -
*"আত্মা রূপে কর্তা হরি, তারে চিনলে যায় চেনা।"*
যার সাথে শূন্যমন্ডলে তোমার ওয়াদা হয়েছে, দুনিয়ার কোনো শক্তি তাকে তোমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। সে গাজীপুর থাকুক আর যশোর থাকুক, সে হাজার মাইল দূরে থাকুক, সময় হলে তার সাথে দেখা হবেই। কারণ এটা দুনিয়ার লেখা না, এটা রুহের লেখা।
আর যার সাথে শূন্যে পরিচয় হয় নাই, তার সাথে সারাজীবন এক বিছানায় থাকলেও মনের মিল হবে না।
তাই প্রেম খুঁজতে যেও না দরদী, *নিজের আত্মাকে চেনো*। তোমার আত্মা যাকে চিনে রেখেছে, সে একদিন ঠিক তোমার দরজায় এসে বলবে - "আমি এসেছি, তোমাকে নিতে এসেছি।"

*এটাই সত্য, এটাই মারফত।*