Saturday, April 18, 2026

শরীর কি কেবল জিনের ভাষায় কথা বলে? নাকি যা আমরা রোজ খাই, তার ভেতরেও কোনো ভূত লুকিয়ে আছে

 বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম গবেষণা বলছে আমাদের অন্ত্রে বাস করা কয়েক ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া — Microbiome — আমাদের মস্তিষ্ক ও অনুভূতিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের পেটের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক সব মিলিয়ে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন অণুজীব বাস করে। এদের সামগ্রিক নাম মাইক্রোবাইম। এরা আপনার শত্রু নয়, বরং আপনার দেহের বাসিন্দা। ভাড়াটে নয়, অংশীদার। মজার তথ্য হলো আপনার শরীরে যত কোষ আছে, তার সমসংখ্যক এই অণুজীব আছে। আমাদের আনন্দের হরমোন সেরোটোনিনের ৯৫ শতাংশ তৈরি হয় এই অন্ত্রে। অর্থাৎ, আমি কী ভাবছি বা কেমন বোধ করছি, তা অনেকটা নির্ভর করে আমার পেটের ভেতরের সেই অদৃশ্য অনুজীবদের মর্জির ওপর।

ভাবুন একবার। আপনার মন খারাপ। আপনি ভাবছেন কারণটা হয়তো অফিস, সম্পর্ক, একাকীত্ব। কিন্তু হয়তো কারণটা আরো গভীরে। আপনার অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বদলে গেছে। তারা আর সেই রাসায়নিক সংকেত তৈরি করছে না, যা স্নায়ুর পথে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। আপনি জানেনও না। শুধু বোধ করছেন একটা ভাষাহীন ভার।
এই অন্ত্র আর মস্তিষ্কের সংযোগকে বিজ্ঞানীরা বলছেন Gut-Brain Axis। আর এই অক্ষটি কেবল রাসায়নিক নয়, স্নায়বিকও। কলেজজীবনে ট্রেনে যাতায়াত করতাম, এক হকার হজমি গুলি বিক্রির সময় বলতেন — পেট ভালো যার, মন ভালো তার। আমরা ফ্রি হজমি গুলি খেয়ে হাসতাম। এখন বিজ্ঞান বলছে, লোকটা ঠিকই বলেছিলেন। Vagus Nerve — শরীরের দীর্ঘতম স্নায়ু — সরাসরি অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। অর্থাৎ পেট থেকে মাথায় একটা সরাসরি তার টানা আছে। এবং সেই তারে কী বার্তা যাচ্ছে, তা নির্ভর করছে আপনার পেটের ভেতরের সেই অদৃশ্য জগতের ওপর।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ যখন একসাথে বসে একই থালায় খাবার ভাগ করে খেত, তখন শুধু পুষ্টি নয়, বিনিময় হতো অন্যের শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলোও। এটাকে বলা যায় জৈবিক গণতন্ত্র।
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস আসলে একসাথে খাওয়ার ইতিহাস। নবজাতকের নামকরণ উপলক্ষে পাড়ার লোককে খাওয়ায় মানুষ । বিয়েতে ভোজ না হলে তো বিয়েই হয় না। এমনকি শ্রাদ্ধের দিনেও পাত পড়ে — যেন মৃত্যুর শোককেও হজম করতে হয় একসাথে বসে। দুর্গা পুজো, ঈদ, বড়দিন, বাদনা পরব — প্রতিটি উৎসবের কেন্দ্রে একটাই দৃশ্য: মানুষ গোল হয়ে বসে খাচ্ছে।
এটা কি কেবল সংস্কৃতি? নাকি শরীরের কোনো গভীর প্রয়োজন?
Oxford-এর বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী Robin Dunbar একটাই প্রশ্ন নিয়ে বছরের পর বছর ঘুরেছেন — মানুষ একসাথে খায় কেন? শুধু পেট ভরাতে? ২০১৭ সালে হাজারো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখালেন, যারা নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে বসে খায় তারা বেশি সুখী, জীবনে বেশি সন্তুষ্ট, এবং বিপদে পাশে থাকার মতো বন্ধু তাদের বেশি। Dunbar-এর সিদ্ধান্ত ছিল, একসাথে খাওয়া আসলে মানুষের সামাজিক বন্ধন তৈরির একটি বিবর্তনীয় পদ্ধতি হিসেবে গড়ে উঠেছে। কেবল খাদ্যগুণের কারণে নয়। একসাথে খাওয়ার সময় শরীরে Oxytocin ক্ষরণ হয় — যে হরমোনকে বলা হয় বন্ধনের হরমোন। একই থালায় হাত পড়লে শরীর বুঝে নেয়, এরা আমার দল।
আর মাইক্রোবাইমের দিক থেকে দেখলে ছবিটা আরো রহস্যময়। একই ধরনের খাবার ধীরে ধীরে তাদের অন্ত্রের জগতের মধ্যে কিছু মিল তৈরি করে, তখন তাদের চিন্তার ধরন, বিপদের প্রতি প্রতিক্রিয়া, এমনকি আবেগের বহিঃপ্রকাশেও এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য তৈরি হয়। প্রাচীন গোষ্ঠীর সেই দৃঢ় আনুগত্যের গোপন কারিগর ছিল হয়তো তাদের অভিন্ন খাদ্যাভ্যাস। একসাথে খাওয়া মানে একটি সামষ্টিক জৈবিক মন তৈরি করা।
এই কারণেই মানুষ ছোটে।
বিয়েবাড়িতে খাওয়া না হলে মন ভরে না। ঈদের সেমাই পাড়ার সবাই মিলে না খেলে স্বাদ লাগে না, যদিও রেসিপি একই। শ্রাদ্ধের ভাত খেতে দূর থেকে আসা মানুষ — তারা আসলে জানে না কেন আসছে। আসলে শরীর টানছে ভেতর থেকে।
এই টানটা শুধু সংস্কৃতি নয়। এটা বিবর্তন।
লক্ষ বছর ধরে যে মানুষ দল বেঁধে খেয়েছে, সে বেঁচেছে। একা একা খাওয়া মানুষ দুর্বল হয়েছে — শুধু পুষ্টিতে নয়, Microbiome-এ, Oxytocin-এ, সামষ্টিক বন্ধনে। সেই স্মৃতি আজও শরীরে উপস্থিত আছে বলেই ভোজের টেবিল দেখলে পেটের ভূত জেগে ওঠে।
নৃতত্ত্ববিদ Marshall Sahlins দেখিয়েছেন, শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে খাবার ছিল সামষ্টিক। কেউ একা খেত না। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজ এলো, জমি এলো, পরিবার এলো, ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তি হলো, বাড়ি ঘিরে বেড়া উঠলো — মানুষ প্রথমবার আলাদা উঠোনে বসে আলাদা হাঁড়িতে রান্না করতে শুরু করল। সেই প্রথম জন্ম নিল বিচ্ছিন্নতা।
ঠিক তখনই মন্দির এলো।
দেবতার ভোগ, প্রসাদ, লঙ্গরখানা, ইফতার মাহফিল, গুরুদ্বারের লঙ্গর — এগুলো ধর্মের আবিষ্কার নয়। এগুলো শরীরের পুরনো প্রয়োজনকে নতুন কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। দেবতা একটা অজুহাত। আসল কাজটা হলো হাজার মানুষের Microbiome এক জায়গায় মেলানো, Oxytocin ছাড়ানো, সামষ্টিক জৈবিক সুর ফেরানো। মানুষ যখন ছোট পরিবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, শুধু সম্পর্ক নয়, Microbiome-ও আলাদা হয়ে গেল। প্রতিটি উঠোনে আলাদা হাঁড়ি, আলাদা অণুজীব, আলাদা জৈবিক সুর। শরীর অনুভব করল একটা অভাব — যেটার নাম সে জানত না।
ধর্মীয় স্থানে বাৎসরিক মেলা সেই অভাব পূরণ করতে এলো। হাজার মানুষ একজায়গায় — একই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, একই রান্নায় হাত দিচ্ছে, গায়ে গা লাগিয়ে বসছে। Microbiome আবার মিলছে। সামষ্টিক জৈবিক সুর ফিরছে। শরীর চিনতে পারছে — এরা আমার দল। দেবতা সেখানে নিমিত্তমাত্র। আসল যজ্ঞটা অণুজীবের।
প্রথমত একসাথে বসে কথা বললে, হাসলে, শ্বাস নিলে — মুখের অণুজীব বাতাসে মেশে। পাশের মানুষ সেটা গ্রহণ করে। দ্বিতীয় দফায় স্পর্শের মাধ্যমে । হাত মেলানো, কোলাকুলি, একই জিনিষপত্র ধরাধরি করলে ত্বকের অণুজীব সরাসরি যায়। আর তৃতীয় উপায় একই খাবার ভাগ করে খাওয়া। একই রান্না, একই মশলা, একই জলের উৎস — পেটের ভেতরে একই ধরনের অণুজীব টিকে থাকার সুযোগ পায়। সরাসরি বিনিময় না হলেও ভেতরের জগৎ কাছাকাছি হয়। তিনটের মধ্যে তৃতীয়টা সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে কম রোমান্টিক। একসাথে না বসলেও, শুধু একই রান্নাঘরের খাবার খেলেই অনেকটা কাজ হয়।
WHO বলছে করোনার প্রথম বছরে বিশ্বজুড়ে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে দীর্ঘ একাকীত্বে Cortisol বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্যটা হলো — ঐ দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় Microbiome-এও আঘাত লেগেছিল। মানুষ একা খাচ্ছে, আলাদা রান্না করছে, স্পর্শ নেই, ভিড়ে হাঁটাহাঁটি নেই ফলে পেটের অণুজীবের বৈচিত্র্য কমে গেছে। বিজ্ঞানীরা অনেকে এটাকে বললেন Microbiome diversity loss।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো লকডাউন উঠে যাওয়ার পর মানুষ প্রথমে কী করেছিল। রেস্তোরাঁয় গেছে। আত্মীয়ের বাড়িতে গেছে। উৎসবে ছুটেছে। একসাথে খেতে চেয়েছে।
ভ্যাকসিন নয়, খাবারের টেবিল খুঁজেছিল আগে। শরীর জানত তার কী দরকার।
আধুনিক যুগে আমরা যখন আলাদা আলাদা প্যাকেজড ফুড বা বিচ্ছিন্ন ডায়েটে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, তখন সেই সামষ্টিক জৈবিক সুরটি কেটে যাচ্ছে। একই ছাদের তলায় থেকেও আমাদের ভেতরের ব্যাকটেরিয়াল ভূতগুলো এখন আলাদা আলাদা ভাষায় কথা বলছে।
পরিবারের চারজন চারটি ডায়েটে। একজন হোস্টেলে, একজন ভিনদেশে কাজে গেছে, একজন Intermittent Fasting, একজন Vegan। ফলে পেটের ভেতরের জগৎ আলাদা। সেরোটোনিনের মাত্রা আলাদা। প্রতিক্রিয়ার ধরন আলাদা। একই ঘরে বাস করেও তারা ক্রমশ আলাদা জৈবিক সত্তা হয়ে উঠছে।
এই বিচ্ছিন্নতা কোনো পারফিউম বা দামী উপহার দিয়ে ভরাট করা সম্ভব নয়। কারণ শূন্যতাটা সম্পর্কের নয়, শরীরের ভেতরের।
তাহলে কি উত্তর হলো একসাথে খাওয়া?
এত সহজ নয়। কারণ শুধু একসাথে বসলেই হয় না। প্রত্যেকে ফোনে মুখ গুঁজে একসাথে বসে থাকলে Oxytocin ক্ষরণ হয় না, Microbiome বিনিময় হয় না। শরীর একে অপরকে স্পর্শ করে না।
যে উৎসবে মানুষ সত্যিকারের হাসে, চোখে চোখ রাখে, একই পাত্রে হাত দেয় — কেবল সেখানেই পেটের ভূত জেগে ওঠে। সে ভূত প্রাচীন। সে জানে তার কী দরকার।
আমাদের DNA যেমন পূর্বপুরুষের ভয় বহন করে, তেমনি আমাদের Microbiome বহন করে পূর্বপুরুষের সংযোগের স্মৃতি। একটা ভূত আমাদের সতর্ক রাখে, আরেকটা ভূত আমাদের একসাথে রাখতে চায়।
দুটো ভূতই এখন অনাহারে ।

আমি তোমাকে আরও কাছে পেতে চাই

 

সর্বগাত্রেণ সংস্পর্শং নিত্যালিঙ্গণ বিভ্রমম—
আমি তোমাকে আরও কাছে পেতে চাই! এমন দূরে, আলাদা করে নয়। নিত্য আলিঙ্গনে, ছায়ার মতো তোমার অঙ্গের সমস্ত পরমাণুর স্পর্শ চাই আমি। — কালিকাপুরাণ
প্রকৃতির এই চিরন্তন আকুলতায় সাড়া দিল পুরুষ। জন্ম ও মৃত্যুর মতো, অন্ধকার ও আলোর মতো, ধ্বংস ও সৃষ্টির মতো, মিথ্যা ও সত্যের মতো একই দেহে সমাহিত হলো নারী ও নর। বসন্তকালে মহাবিষুবের লগ্নে, যেদিন সমস্ত পৃথিবীতে রাত আর দিনের দৈর্ঘ্য সমান, হরগৌরি আবির্ভূত হলেন অর্ধনারীশ্বর রূপে। প্রেমে, সমতায়, ভারসাম্যে........
ভারসাম্যের এই লীলা কেবল ভারতেই নয়, প্রচলিত চীনেও। মহাবিষুবের দিন মসৃণ তলের ওপর একটি ডিমকে সোজা দাঁড় করাতে হবে। আসন্ন গ্রীষ্মে যেন বৃষ্টি ও রোদের, ঝড় ও বাতাসের ভারসাম্য বজায় থাকে। বন্যা ও খরা দুইই তো দরকার সমান সমান। পলিমাটিও দরকার, ধান শুকানোও দরকার।
বিষুব সংক্রান্তি— বছরে দুবার আসে। শরতের জলবিষুব আনে জলবাহিত রোগ। আর বসন্তে বিষুবের পর বছরের শুরু, চৈতালী হাওয়ায় গুটিবসন্তের প্রকোপ। গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। তখন ঔষধি জ্ঞানের পরম্পরায়, মাটি খুঁড়ে আমাদের পূর্বনারীরা আবাহন করেন দূর্গতিনাশিনীকে—
দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।।
দুর্গা— বসন্তকালের দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ ও ভয় নাশ করেন। যার গায়ের রঙ হলুদ। রান্নাঘরের কৌটোয় বন্দী হলুদেরও আরেক নাম দূর্গা। বাসন্তী পূজার দশমীতে যেদিন রাত ও দিন সমান, সেদিন নীল আর নীলাবতীর বিয়ে। তাই ঘিরে বসন্তকালের গাজন, চড়ক আর নীল পূজা। সূর্যের সঙ্গে পৃথিবীর, শিবের সঙ্গে পার্বতীর বিয়ের উৎসব। গাজনের গানে আর নীল ষষ্ঠীর ব্রতকথায় মঙ্গলময় সংসার রচনা করেন মাতৃকুল। এর পর বঙ্গদেশে বছরের শুরু— শিব হাল ধরেন, অন্নপূর্ণা দেন কামদ বীজ, কৃষি শুরু হয়, রচিত হয় সংসার...
শিব চললো বিয়ের বেশে
নারদ বাজায় বীণে,
পাড়াপড়শীর ঘুম নাইকো
বিয়ের কথা শুনে।
বিষুব- বৈসুক, বৈশাখ, বর্ষ, বিসু, বিষু, বিহু, বৈসু, বিজু, বিঝু
সংক্রান্তি- সংক্রান, সাংক্রান, চাংক্রান, থিংয়ান, য়াওশাঙ, সাংগ্রাই, সাংলান
মানুষের ধর্মে, সংস্কৃতিতে, বিশ্বাসে কিংবা আচারের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিন। শব্দের বিবর্তনে লুকিয়ে আছে সূর্যের আলোর উৎসব। বিহু ফুল, দাদমর্দন, নতুন কুঁড়ি আর কচি পাতারা এখনো ঠিকঠাক সময়েই চলে আসে। আমরা কেবল গুনতে দেরি করে ফেলি একটু।
চৈত্রের শুরুতে মহুয়া ও শালফুলে ছেয়ে ওঠে বন। বাহা পরবের তোড়জোড় চলে তখন। ঘর-দুয়ার পরিচ্ছন্ন করে, নতুন কাপড় পরে, খোঁপায় ফুল গুঁজে জাহের থানে জড়ো হন সাঁওতালরা। ফুল দিয়ে, জল দিয়ে দেবতা মাড়কো, মারাঙ বুরু, বোঙ্গার কাছে প্রার্থনা করেন ভারসাম্য ও সমৃদ্ধির। চম্পা, চামেলী ফুলের শৃঙ্গারে আসামের মানুষ বহাগ বিহুর দিন প্রজননের সঙ্গী খুঁজে ফেরেন। অস্ট্রালয়েড পূর্বজদের হাত ধরেই বসন্তের এই রঙ, ফুল, প্রেম ও আনন্দগাথা বয়ে চলেছি আমরাও।
সেই বহমান ধারারই নাম দোল কিংবা হোলী— চৈত্র মাসে অশোক ফুলের সুপ্রচুর বর্ষণের নীচে উৎপাদন-কামনায় নরবলি ও যৌন লীলাময় নৃত্যগীত। ভারতে মুসলমান রাজা এবং হারেমের নারীরা হোলী উৎসবের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হোলীর আগুন এখনও ভারতের অস্পৃশ্য জাতিদের ঘর থেকে আনতে হয়। মণিপুরিরাও জলকেলি ও রঙের সমারোহে পুরোনো বছরকে বিদায় দেন। তার নাম য়াওশাঙ। থাবাল-চোঙবা নাচে মেতে ওঠে সিলেটের নানা এলাকা। সারাবছর যেন উর্বর থাকে মাটি ও মানুষ।
কামদেবের পঞ্চশরের অশোক ফুল ফোটে বসন্তে। গাছে গাছে কোকিল, বেনে বউ সেই কাম, প্রেম আর প্রজনননের সুর গেয়ে চলে। কাঞ্চন, ভাঁট, আকন্দ ফুলে দুলে ওঠে বাংলার ঝোপঝাড়। জাপান ছেয়ে যায় চেরি ফুলের সুবাসে। দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং কর্ণাটক রাজ্যে পালিত হয় উগাদি। তেঁতুল, গুড়, আম, নিমফুল মিশিয়ে তৈরি হয় পাচাদি শরবত। নতুন বছরের আলো-বাতাসের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে তা শরীরকে প্রস্তুত করে তোলে।
গমের ছাতু, দই ও পাকা বেলের শরবত খেয়ে বসন্তের শরীর রক্ষা করেন বাংলার মানুষ। গ্রামের পুরুষেরা খোলা মাঠে কিংবা ফসল কাটা খেতের প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে নববর্ষের নামাজ আদায় করেন। সেখানেও প্রার্থনা ভারসাম্যের। সারা শীত রস দানকারী খেজুর গাছের গোড়ায় দুধ এবং ডাবের জল ঢেলে কৃতজ্ঞতা জানান গৃহলক্ষী। তারপর ঘরের আশপাশ থেকে শাক খুঁজতে বের হন তারা। কমপক্ষে ১৪টি শাক পাওয়া গেলে নারী সন্তুষ্ট হন যে— সারাবছর চাষবাসে প্রকৃতির যত্ন করেছে পুরুষ।
বরফে ডানা জমে মরে যাচ্ছিল একটা পাখি। তাকে খরগোশে পরিণত করেন ওসতারা। সেই খরগোশ, যে পাখির মতো ডিম পাড়ে; হয়ে ওঠে উর্বরতা আর প্রাচুর্য্যের প্রতীক। মৃত্যুর মুখ থেকে যে ফিরে আসে জীবনের কাছে। ব্রহ্মাণ্ড কিংবা গর্ভাশয়— জন্মের সম্ভাবনা নিয়ে নিষেকের অপেক্ষার প্রতীক—ডিম। মৃত্যুর মতো শীতের শেষে বসন্তের নতুন প্রাণের উৎসব— ইস্টার, পালিত হয় বসন্তের দেবী ওসতারার স্মরণে। তিরুবন্তপুরমের পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের ঠিক মাঝ বরাবর কেটে রাখা জানালা দিয়ে আলো ফেলে ২০ মার্চের অস্তমান সূর্য। স্টোনহেঞ্জের মানমন্দিরে জড়ো হয়ে গান গায় মানুষ। আর গ্রামে গ্রামে মটরের খেতে আসে খরগোশের দল।
ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক নানা পরিবর্তনকে ব্যাখ্যার জন্য পৃথিবীর ওপর বেশ কিছু রেখা কল্পনা করেছে মানুষ। তার একটি হলো বিষুবরেখা। সারাবছর নিজ অক্ষে ঘুরতে ঘুরতে ১৯, ২০ অথবা ২১ মার্চ পৃথিবী এমন বিন্দুতে আসে যেখানে বিষুব রেখায় লম্বভাবে সূর্যের আলো পড়ে। ফলে দিন ও রাত সমান হয়। এর নাম মহাবিষুব বা বিষুব সংক্রান্তি বা বসন্ত বিষুব। এই সময় উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। এই বছর ২০ মার্চ দিন ও রাত সমান ছিল। অর্থাৎ উত্তর গোলার্ধের বাসিন্দা হিসেবে এবার আমাদের নতুন বছর শুরু হয়েছে ২১ মার্চ থেকে। আরেকটি হিসাব মতে, সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি রাশিতে। মীন ছেড়ে মেষ রাশিতে সূর্যের সংক্রমণের দিন থেকে দেশে দেশে বছর গণনা শুরু করার চল।
এক সময় পঞ্জিকা গণণায় ক্রমশ পরিবর্তনশীল সূর্যের আলোকে ঠিকঠাক ধরতে পারতেন প্রাচীনেরা। সভ্যতার গ্রাসে প্রকৃতি পাঠের সেই জ্ঞান আমরা অনেকটাই হারিয়েছি। ফলে মহাবিষুবের দিন থেকে প্রায় ২৩/২৪ দিন পিছিয়ে গেছে আমাদের পঞ্জিকার নতুন বছর। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও জাতির পঞ্জিকাতেই সংক্রান্তি, বিষুব ও নববর্ষের গণনায় এই বিচ্যুতি দেখা যায়। ঔপনিবেশিক শাসন ও বিশ্বায়নের ফলে দক্ষিণ গোলার্ধের সৌর পঞ্জিকার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে গিয়ে আমাদের নিজেদের ঋতু, পরবের হিসেবটা গুলিয়ে গেছে। তবে এখনো চৈত্র থেকে বৈশাখ অবধি উত্তর গোলার্ধের সকলেই নানান নামে, জেনে কিংবা না জেনে পালন করছে মহা বিষুব সংক্রান্তি বা বসন্ত বিষুব। প্রার্থনা করছে ভারসাম্যের।
ইরান, আফগানিস্তান, আজারবাইজান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্কের কুর্দিরাও এই সময়েই পালন করেন নতুন দিন বা নওরোজ উৎসব। সাবজি–সামানু–সেনজেদ–সির–সিব–সেরকে–সুমাক — এই সাত খাবার দিয়ে ভালবাসা, জ্ঞান, প্রাণশক্তি, ধৈর্য্য ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা হয় ঘরে ঘরে। আগুন জ্বালিয়ে, নতুন পোশাক পরে ও বসতবাড়ি পরিষ্কার করে বৎসরের আবর্জনাকে দূরে তাড়ানো হয়। হাফত সিন বা সাতটি ‘স’ এর এই প্রথা আজও বয়ে চলেছে টাইগ্রিস–ইঊফ্রেতিসের ধারায়।
উর্বর জমি, ঐশ্বরিক বীজ, বৃষ্টির জন্য রহস্যময় গান এবং শরীর শীতল করতে স্বর্গীয় থানাকা গুঁড়া— সুবর্ণভূমির মানুষকে এই বর দিয়েছিল পৃথিবী মাতা সিরি। থানাকা মেখে তারা জমিতে চাষ দিলেন। গান গেয়ে বীজ বুনলেন কৃষাণীরা। মেষ রাশিতে সূর্যের সংক্রমণের দিন ফসলে ঝলমল করে উঠলো সুবর্ণভূমি। সেই থেকে থাইল্যান্ডের মানুষ পালন করেন সাংক্রান। মহাবিষুবের পরের নতুন চাঁদের আলোয় মর্তলোক থেকে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন যুদ্ধ ও প্রেমের দেবী ইনানা। কৃষি দেবতা তাম্মুজের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এরপর ছয় মাস উর্বর থাকে মেসোপটেমিয়ার মাটি। আরব কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জাতি বসন্ত বিষুবকে ঘিরে মাতৃত্বকে উদযাপন ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
বৈসাবি নামে কিছু নেই। চিম্বুকের ম্রোরা পালন করে চাংক্রান। মালয়েশিয়ার সিয়ামিজ জাতিতে পালিত হয় সংক্রান। মায়ানমারে থিংয়ান। উড়িষ্যায় পনা সংক্রান্তি। মিশরে শাম–এ–নেসিম। প্রেমের ফুলে, আনন্দের রঙে, জলের কামনায় আর ভারসাম্যের প্রার্থনায় এই উৎসব আমাদের পূর্ব নারীদের পরম্পরা। আমাদের সহাবস্থানের জ্ঞান। আমাদের অর্ধেক পৃথিবীর উত্তরাধিকার।
আমাদের আগে যারা মাটি ছুঁয়ে গেছে তারা শিখিয়ে গেছে— বছরের শুরু হয় ভারসাম্যে, প্রেমে, উর্বরতায়। শিখিয়ে গেছে— প্রাণের প্রজননশক্তিই আমাদের রক্ষাকবচ। আর বলে গেছে— আমরা কেউই একা নই। অনেকে ছিল, তাই আমরা আছি। সকলে আছে, তাই আমিও আছি।

লেখক: নুসরাত জাহান

কফি-দুধের স্মুদি

 


গরমের দিনে একটু প্রশান্তির খোঁজে অনেকেই ঠান্ডা পানীয়ের দিকে ঝুঁকেন। ঘরেই সহজ উপকরণে তৈরি করা যায় এমন এক ভিন্ন স্বাদের পানীয় হলো কফি-দুধের স্মুদি। কফির হালকা তেতো স্বাদের সঙ্গে দুধের মোলায়েম মিষ্টতা মিলে এটি হয়ে ওঠে সতেজ ও সুস্বাদু এক পানীয়।


যেভাবে তৈরি করবেন

এই স্মুদি তৈরির জন্য এক লিটার দুধের সঙ্গে এক চামচ কফি পাউডার, এক কাপ আইসক্রিম, পরিমাণমতো গুঁড়ো দুধ, কয়েকটি বাদাম ও স্বাদমতো চিনি নিতে হবে। এরপর সব উপকরণ একসঙ্গে ব্লেন্ড করে মসৃণ মিশ্রণ তৈরি করতে হবে।

পরিবেশন

পরিবেশনের সময় গ্লাসে কয়েকটি বরফের টুকরো দিয়ে তাতে স্মুদি ঢেলে নিন। ওপরে আইসক্রিম, বাদাম কুচি, সামান্য গুঁড়ো দুধ ও কফি পাউডার ছিটিয়ে দিলে স্বাদ ও সৌন্দর্য—দুটিই বাড়বে।