আমেরিকা নিজেকে চিরকাল একটি ‘মেল্টিং পট’ বা গলনপাত্র বলে দাবি করে এসেছে। যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এসে গলে-মিশে একাকার হয়ে যায়। নিজের পুরনো পরিচয় ছেড়ে নতুন এক জাতিসত্তায় রূপান্তরিত হয়। কিন্তু এই আখ্যানের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক প্রশ্ন, যা বহু দশক ধরে আমেরিকান রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের অন্দরমহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। গলে যাওয়ার শর্তটা ঠিক কী, আর সেই শর্ত কে ঠিক করে দেয়?
গত শুক্রবার এইচবিও-র জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘রিয়েল টাইম’-এ কৌতুকাভিনেতা ও উপস্থাপক বিল মাহার এই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে টেনে আনলেন। তবে তাঁর নিজস্ব রুক্ষ ও ক্ষুরধার ভঙ্গিতে। মাহারের অভিযোগ, অভিবাসন নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই পক্ষই বাড়াবাড়ি করেছে। বাইডেন প্রশাসনের ‘খোলা দরজা’ নীতি এবং ট্রাম্পের ‘ভাঙা জানালা’ নীতি—দুটোকেই তিনি একহাত নিয়েছেন। ফিরে যেতে চেয়েছেন এমন এক আমেরিকার কাছে, যে দেশ একসময় পৃথিবীর মেধাবী ও পরিশ্রমী মানুষদের নিজের করে নিতে জানত।
কিন্তু মাহারের মূল বার্তা ছিল অন্যত্র। তাঁর মতে, অভিবাসীদের একাংশের মানসিকতায় বদল এসেছে।তারা আর সেই পুরনো অর্থে আমেরিকান মূল্যবোধে মিশে যেতে রাজি নয়। কৌতুকের মোড়কে তিনি বলেন, বেশিরভাগ অভিবাসী এখনও একাত্ম হতে চান। তবে কারও কারও মধ্যে এক নতুন জেদ দেখা যাচ্ছে—গলনপাত্রে গলতে অস্বীকৃতি। তবে সঙ্গে সঙ্গে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, নিজের ভাষা, খাবার বা ধর্মীয় উৎসব ধরে রাখায় আমেরিকার কোনো আপত্তি নেই।আপত্তি সেখানে, যেখানে সাংস্কৃতিক চর্চা পশ্চিমা উদারনৈতিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
মাহার একে একে তুলে ধরেন সম্মানজনিত হত্যা, নারীর মুখ ঢেকে রাখার বাধ্যবাধকতা, বহুবিবাহ কিংবা নারী খৎনার মতো প্রথার প্রসঙ্গ। জোর দিয়ে বলেন—এসব বিষয়ে কোনো আপস চলবে না। তাঁর দাবি, এই মূল্যবোধগুলো ‘শ্বেতাঙ্গ মূল্যবোধ’ নয়, বরং উদারনৈতিক মূল্যবোধ, যার জন্য মানুষ লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে।
তবে মাহারের এই যুক্তির বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিকোল ক্রাইসবার্গ। ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, মাহার আসলে ইতিহাসকে উল্টো করে দেখছেন। তাঁর ভাষ্যে, আমেরিকার ভিত্তি কখনোই ‘গলনপাত্র’ ছিল না। বরং ছিল এক কঠোর আত্তীকরণের সংস্কৃতি—হয় গলে যাও, নয়তো এসো না। ক্রাইসবার্গের মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোই বরাবর অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করেছে নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখতে। সরকারি পরিসরে মাতৃভাষায় কথা বললে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বহু মানুষকে। পেশাগত উন্নতির শর্ত হিসেবে ইংরেজি রপ্ত করাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে অলিখিত নিয়ম।
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন ক্রাইসবার্গ—ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীরা ঐতিহাসিকভাবে যতটা সহজে আত্তীকৃত হতে পেরেছেন, বর্ণবিদ্বেষী কাঠামোর কারণে অন্য অভিবাসীদের জন্য সেই পথ ততটা মসৃণ ছিল না। আইরিশ কিংবা ইতালীয়রা এক সময় বহিরাগত বিবেচিত হলেও শেষ পর্যন্ত ‘শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান’ পরিচয়ে মিশে যেতে পেরেছেন। কিন্তু আজকের অভিবাসীদের—যেমন চীনা বংশোদ্ভূতদের—ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত। কারণ ত্বকের রঙের কারণে বৈষম্য তাড়া করে ফেরে, যতই তাঁরা আত্তীকরণের চেষ্টা করুন না কেন।
আলোচনা এখানেই থামেনি। মাহার প্রশ্ন তোলেন সমকামী অধিকারকে ঘিরে। উদাহরণ টানেন ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কংগ্রেসনাল প্রার্থী মেলিসা চৌধুরীর, যিনি দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি অ্যাডাম স্মিথের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট হিসেবে লড়ছেন। চৌধুরী তাঁর প্রচারণার ওয়েবসাইটে এলজিবিটিকিউ অধিকারের প্রসঙ্গ না রাখার কারণ হিসেবে নাকি বলেছিলেন, মুসলিম ভোটারদের একাংশ এই বিষয়ে স্বচ্ছন্দ নন। মাহার এই অবস্থানকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন।প্রশ্ন তোলেন প্রগতিশীল রাজনীতির অগ্রাধিকার নিয়ে।নিপীড়ক-নিপীড়িতের যে বাইনারি এখন প্রচলিত, তাতে প্রকৃত নিপীড়নকারী শনাক্ত করার সামর্থ্যই যেন হারিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর আক্ষেপ।
কর্মী লিন্ডা সারসোরের একটি মন্তব্যকেও তিনি নিশানা করেন।যেখানে সারসোর বলেছিলেন তাঁদের অগ্রাধিকার সম্প্রদায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা, আত্তীকরণ নয়। মাহার কটাক্ষ করে বলেন, অভিবাসনের নিয়ম আসলে এভাবে কাজ করে না। কেউ জাপানে গিয়ে সে দেশের সামাজিক রীতিনীতি নিজের শর্তে বদলে দিতে পারে না।
নিজের বক্তব্যের শেষে মাহার একে ইসলামভীতির অভিযোগ থেকে দূরে সরিয়ে বলে, তাঁর আপত্তি বর্ণ বা ধর্মের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নয়। বরং উদারনৈতিক মূল্যবোধ ক্রমশ অনুদার মূল্যবোধ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে।
মাহারের এই অবস্থান নতুন নয়।পশ্চিমা সভ্যতার প্রশ্নে তিনি এর আগেও একাধিকবার একই সুরে কথা বলেছেন। এমনকি সিনেটর জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনেও পশ্চিমা মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু ক্রাইসবার্গের মতো গবেষকদের প্রতিক্রিয়া মনে করিয়ে দেয়, ‘আত্তীকরণ’ শব্দটি যত সহজ শোনায়, তার ইতিহাস তত সরল নয়। কে কত সহজে ‘আমেরিকান’ হতে পারবে, তা নির্ধারণ করে দিয়েছে চামড়ার রং, উচ্চারণের টান, আর কখনো কখনো নিছক ভাগ্য।
অভিবাসনের এই বিতর্কতে জড়িয়ে আছে ক্ষমতার হিসাব, ইতিহাসের পক্ষপাত, আর কে ঠিক করে দেয় ‘আমেরিকান হওয়া’ মানে ঠিক কী, সেই পুরনো, অমীমাংসিত লড়াই।
Ibrahim Chowdhury