আমাদের দেশে ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব চলে গেছে অশিক্ষিত হুজুরদের কাছে। আমি বলছি না, সব হুজুর অশিক্ষিত, কিন্তু তারা প্রায় সবাই ইসলামকে বিচ্ছিন্ন এক ধর্ম হিসেবে স্থাপন করেন। পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর সাথে এর গভীর বিবর্তনীয় সম্পর্ক অস্বীকার করেন। এই ধারণা আধুনিক, বড়জের দেড়- দুশো বছরের। প্রায় কোন মুসলমান জানেন না কালো পাথরের মহিমা বা কোরআনে গোটা এক সূরা নাযিল হয়েছে যার উপর, সেই মিরিয়াম কে! কিভাবে কোরআন তার আগের ধর্মগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষার সাথে সাথে নতুন ধর্মীয় প্রতীক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা হাজির করেছে, নানা মত এক করার চেষ্টা করেছে।
ধর্মীয় প্রতীক স্থির নয়; তারা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে নতুন ভাষা ও নতুন মতাদর্শে নিজেদের পুনর্গঠন করে। মিরিয়াম, আফ্রোদিতি এবং ব্ল্যাক স্টোন—এই তিনটি প্রতীককে একই ধারাবাহিকতায় স্থাপন করলে একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি দৃশ্যমান হয়, যা ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম—তিন সেমেটিক ধর্মের ভেতর ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হয়েছে।
ইহুদি ঐতিহ্যে মিরিয়াম কেবল মুসা ও হারুনের বোন নন; তিনি মরুভূমির পানির অলৌকিক উৎসের সঙ্গে যুক্ত এক জীবন-প্রতীক। তালমুদীয় কাহিনিতে তার পুণ্যের কারণে ইসরায়েলীয়রা পানির কূপ লাভ করে; তার মৃত্যুর সঙ্গে সেই উৎস লুপ্ত হয়। এখানে নারী ও পানির সম্পর্ক কেবল আখ্যান নয়, বরং জীবন ও ধারাবাহিকতার ধর্মতাত্ত্বিক রূপক। পাথর থেকে পানির উত্থান—মৃত বস্তু থেকে জীবনের আবির্ভাব—এই প্রতীকে নারীত্ব ও মন্দির-চেতনা মিলেমিশে যায়।
খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে এই নারী-প্রতীক নতুন মাত্রা লাভ করে। হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের মাতা, জীবন্ত মন্দির। মন্দির আর কেবল পাথর বা স্থাপত্য নয়; তা রূপ নেয় মানবদেহে। এই রূপান্তর ইহুদি “টেম্পল মাদার” ধারণার এক ধর্মতাত্ত্বিক পুনর্গঠন হিসেবে দেখা যেতে পারে। এখানে নারী-দেহই হয়ে ওঠে ঐশ্বরিক উপস্থিতির আবাস।
ইসলামে মরিয়ম চরিত্রটি আবার এক নতুন সমন্বয় রচনা করে। তাকে “হারুনের বোন” বলা হয়, যা ইহুদি স্মৃতিকে পুনরায় সক্রিয় করে। একই সঙ্গে তিনি অলৌকিক খাদ্য লাভ করেন, পবিত্রতার নিদর্শন হয়ে ওঠেন এবং উপাসনালয়ের পরিবেশে লালিত হন। ফলে তালমুদীয় মিরিয়াম ও গসপেলের মেরী—দুই ঐতিহ্য এক বয়ানে মিলিত হয়। এটি সরল ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নয়; বরং ধর্মীয় প্রতীকের পুনর্নির্মাণ।
এই প্রেক্ষাপটে বা কালো পাথর বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রাক-ইসলামি আরব থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই পাথরকে ইসলাম নতুন তাওহিদী অর্থে সংজ্ঞায়িত করে। তবে অষ্টম শতকে জন অব দামাস্কাস একে দেবী আফ্রোদিতির অবশেষ বলে সমালোচনা করেছিলেন। তার এই বক্তব্য যদিও বিতর্কমূলক, তবু তা একটি প্রাচীন স্মৃতির দিকে ইঙ্গিত করে—পাথর, দেবী ও মন্দিরের পারস্পরিক সম্পর্ক। মক্কাকে একটি ভ্রাম্যমাণ 'তাবরন্যাকল' (Tabernacle) বা পবিত্র তাবু হিসেবে দেখা হয়েছে। যেখানেই এই পবিত্র পাথরটি থাকতো, সেখানেই তাবরন্যাকল এবং মক্কা অবস্থিত হতো বলে এই তত্ত্বে উল্লেখ করা হয়েছে । ইহুদিরা যখন জেরুজালেমের মন্দিরে প্রবেশাধিকার পেত না, তখন তারা তাদের এই পবিত্র প্রতীকগুলো নিয়ে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হতো।
আফ্রোদিতি নিজেও বিচ্ছিন্ন কোনো চরিত্র নন; তিনি নিকটপ্রাচ্যের প্রাচীন দেবী-ঐতিহ্যের উত্তরসূরি, যেমন Ishtar বা Asherah। এরা সকলেই উর্বরতা, জীবন ও মন্দির-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। যদি মন্দির একসময় দেবীর প্রতীকী গর্ভ হয়ে থাকে, তবে পরবর্তী কালে সেই গর্ভ পাথরে, আখ্যান-নির্ভর নারীতে কিংবা পবিত্র বস্তুরূপে পুনরাবির্ভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই ধারাবাহিকতায় তিন সেমেটিক ধর্মকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সূচনা হিসেবে দেখা কঠিন। বরং প্রতীয়মান হয় যে, প্রতীকগুলো ভিন্ন ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে নিজেদের নতুন ভাষা অর্জন করেছে। ইহুদিতে মিরিয়াম জীবনদাত্রী কূপ; খ্রিস্টধর্মে মেরী জীবন্ত মন্দির; ইসলামে মরিয়ম পবিত্রতা ও ঐতিহ্যের সেতু। আর ব্ল্যাক স্টোন—সম্ভবত প্রাচীন পাথর-প্রতীকের একটি অবশেষ, যা একেশ্বরবাদী ভাষায় পুনর্ব্যাখ্যাত হয়েছে।
এই পাঠে ধর্মীয় ইতিহাস অলৌকিক বিচ্ছেদ নয়; বরং প্রতীকের বিবর্তন। একসময়ের দেবী-প্রতীক নিষিদ্ধ হয়, পুনর্নির্মিত হয়, আবার শুদ্ধ রূপে ফিরে আসে। মিরিয়াম, আফ্রোদিতি ও ব্ল্যাক স্টোন—এই তিনটি রূপান্তর সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির তিনটি স্তর মাত্র।
Anushirvan Khosrow