সকাল আটটা। রোদের টুকরোটা বারান্দার গ্রিল গলে এসে পড়েছে নেহার লাল শাড়ির আঁচলে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল সে। তার বিয়ে হয়েছে মাত্র পনেরো দিন। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, অচেনা একটা শহরের সকাল,সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে নিজের চেনা বৃত্তে বন্দি হয়ে আসছে।
পেছন থেকে মৃদু পায়ের শব্দ। অর্ণব এসে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। গলাটা একটু নিচু করে বলল,
-আজ বিকেলে বাড়ি যাব। মা দু'দিন ধরে ফোন করছে, না গেলে খারাপ দেখা যায়।
নেহা মিষ্টি হেসে ঘুরে দাঁড়াল।
-আচ্ছা। আমি কি মায়ের জন্য কিছু নিয়ে যাব? বিয়ের পর তো কাউকেই কিছু দেয়া হয়নি?
অর্ণবের মুখটা মুহূর্তেই মেঘলা হয়ে গেল। চওড়া কপাল কুঁচকে সে শক্ত গলায় বলল,
-না, কিচ্ছু লাগবে না। যাওয়ার দরকার নেই।
নেহা একটু অবাক হলো। গত পনেরো দিনের ছিমছাম সংসারে সে অর্ণবের একটা বিশেষ দিক খুব ভালো করে লক্ষ্য করেছে। অর্ণব তাকে অসম্ভব ভালোবাসে, যত্নে আগলে রাখে। সে রান্নাঘরে ঢুকলে পিছু পিছু এসে সাহায্য করে , ভারী কোনো কাজ করতে দেয় না, অফিস থেকে ফেরার সময় নিয়মিত জানতে চায় তার কি খেতে ইচ্ছে করছে। এত যত্নশীল একটা মানুষ, অথচ নিজের বাবা-মা বা পরিবারের প্রসঙ্গ উঠলেই কেমন যেন পাথরের মতো কঠিন হয়ে যায়। মানুষটা যেন পলকেই অন্য কেউ হয়ে ওঠে।
নেহার বোঝানোতে অবশেষে বিকেলে তারা অর্ণবদের বাড়িতে পৌঁছাল।
অর্ণব পুরোটা সময় নেহার হাত শক্ত করে ধরে রাখল, যেন এক মুহূর্তের জন্যও তাকে নিজের পাশ থেকে এক ইঞ্চি নড়তে দেবে না।
ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সেলিনা বেগম এগিয়ে এলেন। মুখে এক চিলতে হাসি।
-নেহা, এসো মা। অর্ণব এখানেই বসুক। তুমি আমার সঙ্গে একটু ভেতরে এসো। বিয়ের পর তোমাকে কিছু দেয়া হয়নি, তোমার জন্য দুটো সুন্দর শাড়ি কিনে রেখেছি।
কথাটা শেষ হতে না হতেই অর্ণব তার স্বভাববিরুদ্ধ কঠোরতায় বাঁধা দিল।
-মা, ও কোথাও যাবে না। ও এখানে আমার সামনে থাকবে। তোমার যদি কিছু দেয়ার থাকে তাহলে এখানে এনে দাও। অথবা আমি ওর সাথে ভেতরে যাব।
সবাই একটু থমকে গেল। ঘরের কোণ থেকে অর্ণবের ছোট বোন শারমিন ঠোঁট বাঁকিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করে বলে উঠল,
-ভাইয়া, আমরা কি তোমার বউকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবো নাকি? এত আগলে রাখছ কেন? আলাদাভাবে একটু মায়ের সাথে কথা বললে এমনকি সর্বনাশ হয়ে যাবে শুনি?
অর্ণব বরফশীতল গলায় বলল,
-আমি যা বলেছি, সেটাই হবে। এখানে আর কথা বাড়াবি না।
সেদিনের সেই অস্বস্তিকর পরিবেশে আধা ঘণ্টা কাটিয়েই তারা ফিরে এল। ফেরার পথে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে অর্ণব সামনের স্টিয়ারিংয়ের দিকে তাকিয়ে একদৃষ্টিতে রইল। নেহার বুকটা তখন অজানা এক কষ্টে দুরুদুরু করছে। সে আর চুপ থাকতে পারল না।
-তুমি আজ সবার সামনে এমন করলে কেন, বলো তো? মা তো শুধু আমাকে ভেতরের ঘরে ডাকছিলেন। তুমি কেন এমন ব্যবহার করলে? সে প্রায় কেঁদে ফেললো।
অর্ণব চোখের পলক না ফেলে ড্রাইভ করতে করতেই বলল,
- কারণ আমি জানি, কোন কথার পেছনে ঠিক কিসের বিষ লুকিয়ে থাকে। কখন কোন চাল চালতে হয়, সেটা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
-আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না অর্ণব।
অর্ণব ঠান্ডা গলায় বলল,
-তোমার সব কিছু বুঝতে হবে না নেহা। শুধু জেনে রাখো আমি যা বলছি তুমি তাই করবে আর এতে তোমারই ভালো হবে। আমাকে দয়া করে ভুল বুঝো না।
সেই সন্ধ্যার পর থেকেই নেহার জীবনে অদ্ভুত সব নিয়ম আর শৃঙ্খলার জাল বুনতে শুরু করল। অর্ণব সরাসরি নিষেধ করল না বটে, কিন্তু তার মুখের ছোট ছোট অনুরোধগুলোই যেন হয়ে দাঁড়াল অলঙ্ঘনীয় দেয়াল।
অর্ণব একদিন কফি কাপে চুমুক দিতে দিতে গম্ভীর মুখে বলল,
-নেহা, একটা কথা তোমাকে পরিষ্কার বলে দিই। মা, বাবা কিংবা শারমিন যদি কখনো ফোন করে, আমার সামনেই রিসিভ করবে এবং আমার সামনেই কথা বলবে। একা একা কথা বলার দরকার নেই।
নেহা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার গলায় কিছুটা ক্ষোভের সুর ভেসে উঠল।
-কেন! আজ তোমাকে বলতেই হবে কি সমস্যা তোমার?
অর্ণব লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখদুটো কেমন যেন ভিজে উঠল পলকের জন্য। সে নেহার হাত দুটো নিজের মুঠোয় তুলে নিয়ে খুব আকুলভাবে বলল,
-বিশ্বাস করো নেহা, এখন তুমিই আমার একমাত্র পৃথিবী। আর এই পৃথিবীটা ভেঙ্গেচুরে যাক, ধ্বংস হয়ে যাক সেটা আমি একেবারেই চাই না। তোমাকে আমি নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করি। কিন্তু... কিন্তু ওই মানুষগুলোকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না।
নেহা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। অর্ণবের কি কোন সমস্যা আছে? নিজের পরিবারকে বিশ্বাস করে না যেই ছেলে সেই ছেলে আবার বলছে তাকে অসম্ভব বিশ্বাস করে! ব্যাপারটা ভীষণ অদ্ভুত। একদিকে অর্ণবের অগাধ ভালোবাসা, অন্যদিকে তার পরিবারের প্রতি এই লাগামহীন অনীহা ও পাহারা এই দুটো যেন কোনোভাবেই নেহা মেলাতে পারেনা।
দিনগুলো গড়িয়ে চলতে লাগল। এক অলস দুপুরে ফ্ল্যাটে একাই ছিল নেহা, অর্ণব অফিসে । ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই নেহার গলার কাছে কি যেন আটকে গেল।
তার শাশুড়ি মা।
ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল এক অপূর্ব মায়াময় স্নিগ্ধ কণ্ঠ।
-কেমন আছো মা? অনেকদিন দেখিনি তোমায়। মনটা বড় ছটফট করছে।
নেহা নিজেকে সামলে নিয়ে খুব বিনয়ের সাথে বললো,
-ভালো আছি, আম্মা। আপনি কেমন আছেন?
কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক সাধারণ কুশল বিনিময়ের পর সেলিনা বেগম হঠাৎ সুর নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
-শোনো মা, একটা কথা তোমাকে বলছি। এটা যেন ভুলেও অর্ণবকে বলো না। ও আবার ক্ষেপে যাবে।
নেহার বুকটা ধক করে উঠল। সে আমতা আমতা করে বলল,
-জি বলুন, কি কথা?
-আর কতকাল নিজেদের বাড়ি রেখে এমন ভাড়াবাড়িতে থাকবে বলোতো? তুমি বুদ্ধিমতী মেয়ে, অর্ণবকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এই বাড়িতে চলে আসো। আমার ছেলেটা বরাবরই অন্যরকম। দেখলেই তো বিয়ের পর দিনই তোমাকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে চলে গেল। মানুষ এসব দেখে কি বলে বলোতো মা। আমাদের মান সম্মান আর থাকছে না। তুমিই একমাত্র পারবে ওকে সঠিক পথে আনতে।
একটু থেমে সেলিনা বেগম যোগ করলেন,
-আর হ্যাঁ, একটা কথা বলে রাখি,অর্ণব কিন্তু বেশ বদমেজাজি। ও রেগে গেলে একটু সহ্য করে নিও মা। পুরুষ মানুষ তো অমন একটু আধটু হবেই, সংসার করতে গেলে মানিয়ে নিতে হয়।
কথাগুলো খুব সাধারণ এক ধরনের উপদেশ কিন্তু নেহার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি ও হাড়হিম করা ভয় জেগে উঠলো। কি কারনে কে জানে?
সেদিন রাতে অর্ণব অফিস থেকে ফেরার পর নেহা অনেক চিন্তাভাবনা করে নিজের ভেতরের সব দ্বিধা কাটিয়ে পুরো ফোনালাপটা আদ্যোপান্ত খুলে বললো।
অর্ণব এক বিন্দুও অবাক হলো না। সে চুপ করে সোফায় বসে রইল। অনেকক্ষণ ধরে ঘরের সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে বললো,
-নেহা, তুমি তো জানোই আমার আগেও একবার বিয়ে হয়েছিল।
অর্ণবকে থামিয়ে দিয়ে নেহা বললো,
-কিন্তু আমরা বিয়ের রাতেই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করব না।
-আমিও তাই চেয়েছিলাম কিন্তু বোধহয় সেই প্রতিজ্ঞা আমাকে ভাঙতে হবে। ওর নাম ছিল ঈশিতা, আমার প্রথম স্ত্রী।
-আমি এসব জানতে চাই না অর্ণব। খানিকটা রেগে গিয়েই নেহা বলে উঠলো। সে সুন্দরী, মেধাবী, মাত্র একুশ বছর বয়সের একটা মেয়ে কিন্তু তার চাচা চাচি তাকে বিয়ে দিয়েছে একজন দোজবর মানুষের সঙ্গে। হ্যাঁ ভাগ্যক্রমে মানুষটা অনেক ভালো। কিন্তু একজন এত ভালো মানুষের ডিভোর্স কেন হলো? আজ যদি তার বাবা-মা বেঁচে থাকত তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে তাকে গছিয়ে দিত না। তাই বিয়ের দিনই সে অর্ণব কে বলেছিল পুরনো কথা তারা কখনো তুলবে না।
অর্ণব খুব ধীরেসুস্থে, ভারী গলায় বলা শুরু করল, যেন প্রতিটি শব্দ তার বুকের ভেতর থেকে খসে পড়ছে।
-বিয়ের পর, মানে আমার প্রথম বিয়ের পর থেকেই মা প্রতিদিন আমার কানে বিষ ঢালতেন। বলতেন, ঈশিতা নাকি তাদেরকে ঠিকমতো সম্মান করে না, মুরুব্বিদের মুখে মুখে কথা বলে। শারমিন এসে বলত, ও নাকি আমাদের এই সুখের পরিবারটাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে আলাদা করে দিতে চায়। বাবা বলতেন, ওর চালচলন এবং চরিত্রে সমস্যা আছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন নতুন অভিযোগের পাহাড় আমার সামনে জমা হতো।
অর্ণব একটা তিক্ত, অর্থহীন হাসি হাসল।
-আমি বোকার মতো বিশ্বাস করতাম। আমি একবারের জন্যও ভাবিনি, সবাই যদি এক সুরে একই কথা বলে তবুও সেটা সত্যি হয়ে যায় না। অবশ্যই সেটা যাচাই করা উচিত কিন্তু তখন তা আমার মাথায় একেবারেই আসেনি। আমার মনে হতো ওরা তো আমার নিজের রক্ত। আমার মা,আমার বাবা, আমার বোন নিশ্চয়ই আমার ক্ষতি চাইবে না। অতএব সমস্যাটা সত্যিই সেই স্বল্প পরিচিত মেয়েটার মধ্যেই আছে। অর্থাৎ আমি ধরেই নিয়েছিলাম সমস্ত সমস্যা ঈশিতার। এই অন্ধবিশ্বাসই আমার সবচেয়ে বড় কাল হয়েছিল।
অর্ণবের কণ্ঠস্বর এবার ভেঙে এল।
-অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে আমি উল্টে ঈশিতার ওপর চোটপাট করতাম, ঝগড়া করতাম। ও নিষ্পাপ চোখের জল ফেলতো। কিন্তু সেই চোখের জলের মূল্য আমি দিতে পারিনি অথবা হয়তো দিতে চাইনি। ওর একটা কথাও আমার কানে ঢুকতো না। শেষ পর্যন্ত একদিন ও আর সহ্য করতে না পেরে আমার মুখের ওপর সাফ জানিয়ে দিল, "তুমি আমাকে না, শুধু তোমার পরিবারের সবার মিথ্যা কথাগুলো বিশ্বাস করো। একবারও আমার কথা শুনতে চাও না।আমার পক্ষে এই নরকে আর থাকা সম্ভব নয়।"
আমি তখন পৌরুষের অহংকারে অন্ধ হয়ে রাগের মাথায় ডিভোর্স দিয়ে দিলাম।
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। অর্ণব জানালার অন্ধকার কাচের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-ডিভোর্সের পর আমি ভেঙে পড়েছিলাম যদিও আমিই সেই পথ বেছে নিয়েছিলাম। তারপর আমি নিজেই একটা একটা করে ঘটনা মেলাতে শুরু করলাম। আমার চোখের সামনে এমন কিছু ঘটনা ঘটলো যা আমার সব পর্দা সরিয়ে দিল।
নেহা উৎসুক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
-আমি খেয়াল করলাম মা আর শারমিনের কথা বলার ধরণটা। ঠিক যেভাবে অতীতে ঈশিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হতো, অবিকল একইভাবে তারা অন্য মানুষদের বিরুদ্ধেও গল্প বানিয়ে অন্যদের বলতো, যেটা হয়তো আমার সামনে আগেও অনেকবার ঘটেছে কিন্তু আমি খেয়াল করিনি। তাছাড়া ঈশিতা চলে যাওয়ার পরে আমার মানসিক ভাঙ্গন দেখেও আমার পরিবারের মনে যে এক প্রকারের উল্লাস চলছিল তা আমি ভুলতে পারিনি। আমার দিন কাটে তখন সিগারেটের ধোঁয়ায়। আমাদের কাজের খালা যিনি প্রায় পঁচিশ বছর ধরে আমাদের বাড়িতে আছেন তিনিই একদিন আমাকে আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঘরের ভেতরের আসল অশান্তি টা কারা তৈরি করতো।
-তুমি কি তাদের কাছে কিছু জানতে চাওনি?
-চেয়েছিলাম। সব অস্বীকার করেছে। ঈশিতার কাছেও গিয়েছিলাম, সে আমার চেহারাও দেখতে চায়নি। তবে ওর বাবা অনেকক্ষণ আমার সাথে কথা বলেছিলেন। অমায়িক এই ভদ্রলোকের একমাত্র আদরের রাজকন্যা আমার ঘরে এসে কি পরিমান নিষ্পেষিত নির্যাতিত হয়েছে তা আমি উনার কথার প্রত্যেকটা অক্ষরে অক্ষরে বুঝতে পেরেছিলাম। এক বুক আফসোস নিয়ে আমি ফিরে এসেছিলাম।
নেহা অর্ণবের কাঁধে হাত রাখল, সেই হাতটা ছিল বিশ্বাসের-ভরসার।
-নেহা, আমি চাইনা তোমার সাথে এরকম কিছু ঘটুক। কারণ মানুষের স্বভাব বেশিরভাগ সময় পরিবর্তন হয় না।
নেহা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, সে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
-তাই তুমি আমাকে কখনো ও বাড়িতে এক মুহূর্তের জন্য একা কোথাও যেতে দাও না, তাই না? আমাকে ক্ষমা করো অর্ণব, আমি ভুল বুঝেছিলাম তোমাকে।
রাত তখন গভীর। অর্ণবের বুকে মাথা রেখে নেহা পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো। অর্ণব তখনো জেগে।
নেহা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণবের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত, শীতল এবং অচেনা হাসি। এক পলকের জন্য তার মুখের সেই ব্যথাতুর, অনুশোচনায় ভাঙা মুখোশটা যেন হড়কে পড়লো।
মেয়েটা কি অসম্ভব রকম বোকা, তার সমস্ত কথা সে বিশ্বাস করেছে। নিজের মনেই বলতে থাকে অর্ণব।
"আরে ওই ফকিন্নি ঈশিতাকে বিয়ে করেছিলাম তো শুধুমাত্র রূপ দেখে। না ছিল শিক্ষা দীক্ষা, না ছিল বাবার টাকা। একেবারেই নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়ে। তবুও বিয়ের কয়েক মাস পরেই জানতে পারলাম হা*রা*মজাদির নাকি আবার একটা বয়ফ্রেন্ড ছিল। হ্যাঁ সেই সম্পর্ক বিয়ের দুই বছর আগেই ভেঙে গিয়েছিল কিন্তু তাতে কি অন্যের ছেড়ে দেওয়া জিনিস আমি কেন নিব? কেন আমাকে জানানো হয়নি? প্রতিদিনই মারধর করতাম, ওকে দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যেত। মারধরের শেষে ওর সাথে রাতের আয়েশ টা সেরে নিতাম, যত কিছুই হোক বউ আমার। এই অধিকার তো আমার আছে। কিন্তু কে জানতো একদিন মার খাওয়ার পরে একেবারে ম*রেই যাবে। মাত্র বিছানায় ফেলেছি ঠিক সেই সময়ই শেষ দমটা ছেড়ে দিল। অসহ্য.. বিরক্তিকর..
লা*শটা গুম করা কোন ব্যাপারই ছিল না, আর ওর বাপ মা, হাহ.. লাখ দুয়েক টাকা ছুঁড়ে দিলাম আর তারা মুখে একদম স্কচটেপ লাগিয়ে নিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার পরিবার, তারা কোনদিন মানতেই পারেনি। আমি ঠিক জানি কখনো না কখনো তারা নেহাকে সত্যিটা বলে দেয়ার চেষ্টা করবে, ঠিক বলে দেবে ঈশিতাকে আমি ডিভোর্স দেইনি বরং ও এখন মাটির নিচে, তাইতো এত সতর্কতা। এই মেয়েটি সুন্দরী, শিক্ষিত তার ওপর এর কোন অতীত নেই। এই মেয়ে যতক্ষণ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে ততক্ষণ একে আমার সাথে রাখব। আর যদি কথার হেরফের করে..."
অন্ধকারের গহ্বরে অর্ণবের সেই ক্রূর, বিকৃত হাসিটা আরও গাঢ় হয়ে মিশে গেল। বাইরে তখন রাতের অন্ধকার আরও গভীরতর হচ্ছে, আর এক নির্মম ফাঁদে আটকা পড়া নেহার ভবিষ্যৎ ডুবে রইল এক অতল অনিশ্চয়তায়।
সুবর্না শারমিন নিশী