আমার বাবা কখন যে আমার বান্ধবীর প্রেমে নিজেকে উজাড় করে দিল বুঝতেই পারিনি!! আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে মায়ের কথা ভাবলে!! আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারি না।
আমার বাবা বেশ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। রাত্রি আমার প্রিয় বান্ধবী। বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম প্রথম থেকেই আমাদের ভাব হয়ে যায়। ও মফস্বল থেকে এসেছে। ও খুব সুন্দর গান গাইতে পারে।
আমার জন্মদিনের পার্টিতে গান গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। কিন্তু আমাদের পরিবারের প্রাচুর্য আর চাকচিক্য যে ওর মনে দাগ কেটেছিল তা বুঝতে পারেনি। প্রথমদিকে ও হলে সিট পায়নি তখন ছাত্রী হোস্টেলে ওঠে। ওর খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা দেখে আমার মায়া হয় তাই মাসে অন্তত চার পাঁচ দিন আমাদের বাসায় থাকতে শুরু করে। আমার মা একটা এনজিও প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার।
আমরা রাতে একসাথে খাওয়া দাওয়া করতাম। বাবা ঘুমানোর আগে ওর গান শুনত আর খুব প্রশংসা করত।
একদিন মা আর আমি বাসায় ছিলাম না। ফিরে দেখি ও আমাদের বাসায়!!
~ কিরে তুই কখন এলি
~ এই তো কিছুক্ষণ আগে, তোকে সারপ্রাইজ দিবো বলে বলিনি
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ্য করি সেই সময় বাবাও বাসায়। বাবা আগ বাড়িয়ে বলে,
~ তোকে না পেয়ে ও তো চলেই যাচ্ছিল, আমি বললাম থাকতে
যদিও তখন একটুর জন্য সন্দেহ করিনি। আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে বাসার দারোয়ানরা ওকে যখন তখন ঢুকতে দিত। এভাবে দিনের পর দিন সময় অসময়ে ও আসতে থাকে।
একদিন আমি মায়ের সাথে বড় খালামণির বাসায় যাই। সেদিন আমাদের দেরি করে বাসায় ফেরার কথা।
মা দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকেন। এরপর মায়ের বেডরুমে আমার সেই তথাকথিত প্রিয় বান্ধবী রাত্রি আর বাবা। মা জোরে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারান। আমি দৌড়ে যেতে যেতে ততক্ষনে দুজনেই নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে কোনমতে।
এরপর থেকে আমার মা যে মনমরা হয়ে গেল সেটা থেকে আর বেরোতে পারল না। আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর সাথে সিঙ্গাপুরে সেটেল। অপমান ঘৃণায় আমার মা তিলে তিলে ক্ষয়ে যেতে থাকে।
ঐদিন ওই ডাইনিটাকে আমি একটা চড় মারতে যাই তখনই বাবা আমার হাতটা ধরে বলে,
~ ভুলেও এই দুঃসাহস করবে না। তুমি জানো ও আমার কি!!!
আমি অপমানে আর ঘৃণায় স্তব্ধ হয়ে যাই। আমার ফুপি খালারা বাবাকে অনেক বুঝায় কিন্তু কোন লাভ হয়নি। বড় আপু বাবাকে ফোন দিয়ে এই পথ থেকে ফিরে আসতে বলে।
বাবা শুধু প্রতিউত্তরে বলে,
~ দেখো জীবনে শুধু কষ্টই করেছি। এখন একটু সুখ পেতে চাই। তোমাদের টাকাপয়সা আর কোন কিছুতেই তো অধিকারহীন করছি না। আর তোমার মাকেও ডিভোর্স দিব না যদি মেনে নেয়।
আমাদের সামনেই বাবা এসব ফোনে বলে। আমার ক্রোধে দুচোখ লাল হয়ে যায়। ইচ্ছে করতে থাকে দুজনকেই শেষ করে দিতে। মাকে বলি,
~ মা আমি ঠিক করে ফেলেছি এই দুইটাকে শেষ করে দিব নিজের হাতে।
আমার বাবা ৫৬ বছর বয়সে আমার ২১ বছর বয়সি বান্ধবীকে বিয়ে করে আর মাকে ডিভোর্স দেয়। আমি এখন মায়ের ফ্ল্যাটে থাকি। বাবা রাত্রিকে নিয়ে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ায়, বড় ব্যবসায়ীদের সাথে আর বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
একদিন বাসার দারোয়ানের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি বাবা মদ খাওয়া শুরু করেছে আর রাত্রি নাকি নিজ হাতে ঢেলে দেয়। বাসায় অসংখ্য অতিথিদের যাতায়াত। সবাই রাত্রির গান শুনতে আসে। নাকি অন্য কিছু এটাতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না!!
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু-বান্ধবী সবাই রাত্রিকে কটু কথা শোনায়। কিন্তু আমার প্রিয় গাড়িটিতে করে ক্যাম্পাসে রানীর বেশে আসে আর এসব ওর গায়েই লাগায় না। এরই মধ্যে এক বন্ধু বলে,
~ লিমা এইটাকে আমি একটা রেস্তোরায় দেখেছি ৫০ বছরের এক লোকের সাথে। তোর বাবা বোধ হয় জানেনা।
আমি ঠিক করি রাত্রি কি করছে, কেমন চলছে সেটা একটু খতিয়ে দেখব। এভাবে প্রায় দেড় মাস নিয়মিত পিছু নেয়ার পর সত্যটা সামনে আসে।
৫০ বছরের যে ভদ্রলোক তিনি আমার বাবার সাথে ব্যবসায়িক সূত্রে পরিচিত। সেভাবেই হয়তো রাত্রির সাথে কোন পার্টিতে পরিচয়। সেই লোকের বিদেশেও বিজনেস আছে। আমার বাবার চেয়ে তার অবস্থা আরো ভালো। অর্থাৎ রাত্রির এখন আমার বাবার স্ট্যাটাস জাহাঙ্গীর আংকেলের তুলনায় কম মনে হচ্ছে তাই ওনাকে ধরা!!
বন্ধুরা আমাকে অনেক ভাবে সাহায্য না করলে এসব বের করা সম্ভব হতো না!! এরপর আসে সেই কাঙ্খিত দিন।
আমার বন্ধু সাজ্জাদ রাত্রির পিছু নিয়ে একটা রিসোর্টে গিয়ে জাহাঙ্গির আঙ্কেলের সাথে রাত্রির অবস্থান নিশ্চিত করে। রিসোর্টটা ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। ও বলে আমি যেন বাবাকে নিয়ে দ্রুতই ওই স্থানে উপস্থিত হই। কিন্তু বাবা কি রাজি হবে?
~ হ্যালো বাবা তুমি কি আমার সাথে একটা রিসোর্টে যেতে পারবে?
~ কেন?
~ না মানে আমার এক বন্ধুকে কারা যেন আটকে রেখে ওখানে মারছে। ও অনেক কষ্টে ফোন দিয়ে আমার জরুরী সাহায্য চেয়েছে। বাবা প্লিজ আসো আমি তো এতদিন তোমার কাছে কিছু চাইনি!!
আমার বাবা এতদিন পর আমার ফোন পেয়ে বিশ মিনিটের মধ্যে চলে আসে। একসাথে সেই রিসোর্টে যাই। ওদের রুম আর অবস্থান বন্ধুরা আগেই মার্ক করে রেখেছে। তখন বিকাল পাঁচটা বাজে। ১১ নম্বর রুমে আমি আর বন্ধুরা নক করি। বাবাও পাশে। আর সৌভাগ্যক্রমে দরজা খুলে দেয় রাত্রি।
~ রাত্রি তুমি এখানে??
তখন ওর কি যে একটা চেহারা হয়!! আমার প্রচন্ড শান্তি লাগছিল অনেকদিন পর। এই দুই বছরে যত জ্বালা আর মায়ের চাপা আর্তনাদের যেন বিচার আমি পেয়েছি!!!
দরজা চাপিয়ে দিতে চায় রাত্রি। বাবাসহ আমরা জোর করে ঢুকি। জাহাঙ্গীর আঙ্কেল তখন ওয়াশরুমে ছিলেন। বের হয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান।
~ জাহাঙ্গীর তুমি আমার স্ত্রীর সাথে? তোমার স্ত্রী সন্তান আছে না???
~ ৫৮ বছর বয়সে তুমি কচি মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করবে, স্ত্রী সন্তান ছাড়বে আর আমি পারব না??
জাহাঙ্গীর আঙ্কেল তো ঠিকই বলেছে, কি উত্তর দিবে আমার বাবা?? উত্তর দিতে না পেরে মারামারি শুরু করে।
আমার বন্ধুরা রাত্রি আর জাহাঙ্গীর আঙ্কেলের ভিডিও ধারণ করে আর জাহাঙ্গীর আঙ্কেলের স্ত্রীর নম্বর নিয়ে পাঠিয়ে দেয়। রাত্রিকেও উত্তম মধ্যম দিতে ছাড়ে না।
দুজনকে রেখে আমরা চলে আসি। বাবা নিরব। হঠাৎ গাড়িতে কাঁদতে শুরু করে।
~ আমাকে মাফ করে দিবি? তোর মাকে আর তোদেরকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
~ বাবা এই দুই বছরে আমাদের কষ্ট দেখনি, আজ দেখলে? আর তোমার এত কষ্টবোধের কি আছে? এক রাত্রি গেছে, এরকম আরো হাজার রাত্রি চাইলেই পাবে!! তোমার এই তুমি যখন কিছুই ছিলে না তখন আমার মা ছিল তোমার পাশে, কতটুকু মূল্যায়ন করেছ তাকে???
বাবা বুঝতে পারে আমাদের হৃদয়ে তার আর জায়গা হবে না। একবার যদি ভেবে দেখতো একটা ২১ বছরের মেয়ে কেন ৫৫ বছর বয়সী একটা লোকের জন্য মরিয়া হবে??? কেন মেয়ের বয়সী আর মেয়ের বান্ধবী হয়েও একটা সুন্দর পরিবার ধ্বংস করবে।
বাবার চোখে আকাঙ্খার চশমাটা খান খান হয়ে ভেঙে গেছে আজ। এজন্য উপলব্ধি হয়েছে কিন্তু এখন তার এই উপলব্ধি আমাদের কোন কাজে আসবে না। আমার মাকে যে মূল্যায়ন করে নি সে আমাদের বাবা হতে পারে না।
ইশরাত জাহান এনি
