Saturday, August 29, 2026

আগামী ১৫ বছরে বাঙলাদেশের চিত্র কেমন হতে পারে?

 



একটি সমাজের সংস্কৃতি শুধু পোশাক, গান, উৎসব বা খাদ্যাভ্যাসের সমষ্টি নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সেই সমাজের ইতিহাস, স্মৃতি, ভাষা, নান্দনিকতা, জীবনযাপন এবং মানুষের নিজস্ব পরিচয়। তাই কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শের নামে যখন মানুষের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা, নির্দিষ্ট পোশাক চাপিয়ে দেওয়া, নারীর চলাফেরা ও চেহারা নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা কিংবা শিল্প-সংগীত ও উৎসবকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়; এটি একটি সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপরও আঘাত।
বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও রাজনৈতিক ইসলামবাদের উত্থানের সঙ্গে সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের নানা রূপ দেখা যায়। কোথাও রাষ্ট্র সরাসরি কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, কোথাও রাজনৈতিক ইসলাম ও সামাজিক রক্ষণশীলতা জনজীবনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে উগ্রপন্থীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়েছে, আবার কোথাও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রয়েছে, তবে এর সংখ্যা কম।
আফগানিস্তানে— তালেবান ক্ষমতায় আসার পর নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চলাফেরা, পোশাক এবং জনপরিসরে উপস্থিতির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে আফগান নারীদের ব্যক্তিস্বাধীনতা যেমন সংকুচিত হয়েছে, তেমনি সমাজের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক জীবনও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তালেবানরা নিজস্ব আফগান সংস্কৃতিকে পুরোপুরি মুছে ফেলার সাথে যুক্ত। বাঙলাদেশেও একই পরিকল্পনা চলমান। ধীরেধীরে সকল সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের ওপর আক্রমণ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে রাজনৈতিক ইসলাম ফ্যাসিবাদ হিসেবে রূপান্তর হচ্ছে।
ইরানেও ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় বিধিবিধানকে জনজীবনের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। বিশেষ করে নারীদের পোশাক ও আচরণের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিরাজমান। ইসলামিস্ট নারীরা কী পরিমাণ ভয়ংকর ও হিংস্র— তা ইরানের কট্টরপন্থী নারীদের কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে একাধিকবার। অথচ ইরানের ইতিহাসে পারস্যের সমৃদ্ধ শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, পোশাক ও সামাজিক জীবনের বহুমাত্রিক উপস্থিতি ছিল। এখন সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার কথা তুললেই ফাঁসি আর জেলভর্তি।
পাকিস্তানের ইতিহাস বেঈমানের ইতিহাস— তাদের দেশ ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সেনা ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। ইসলামের সাথে যে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা পাকিস্তানিরা মূলত বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে নিজেদের কর্মকাণ্ডে ও সিদ্ধান্তে— তাদের নীতিগত ও আদর্শগতভাবে অনুসরণ করে বাঙলাদেশের একটি বিরাট ইসলামিক গোষ্ঠী, তাদের চাওয়া পাওয়া স্বপ্ন সবই পাকিস্তানের সেনাদের মতই। অথচ পাকিস্তানের নিজস্ব দুর্দান্ত সংস্কৃতি আছে, সেটি ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায়—সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বেলুচ, পশতু ও অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্কৃতির রয়েছে নিজস্ব ভাষা, পোশাক, সংগীত ও ঐতিহ্য।
বাঙলাদেশের ক্ষেত্রে তাই সতর্ক হওয়া জরুরি। বাঙলাদেশের সংস্কৃতি আরব উপদ্বীপ থেকে আমদানি করা কোনো একরৈখিক সংস্কৃতি নয়। এটি বাঙলা ভাষা, বাউল, ভাটিয়ালি, পল্লিগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, লোকশিল্প, বৈশাখী ঐতিহ্য, শাড়ি, লুঙ্গি, গ্রামীণ উৎসব, নদী ও কৃষিনির্ভর জীবন এবং হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-নাস্তিকসহ বহু সম্প্রদায়ের দীর্ঘ সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।
সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানকে কট্টরপন্থীরা শত্রু মনে করে, যার ফলে তারা নিজস্ব ভাবনাকে সকলের ওপর চাপিয়ে দেয়। সংস্কৃতি থাকলে ধর্ম থাকবে না— এটা সংস্কৃতিবাদীরা মনে করে না, কিন্তু কট্টরপন্থীরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে— ধর্ম যেখানে থাকবে, সেখানে নিজস্ব সংস্কৃতি থাকতে পারবে না। ধর্মের আগ্রাসন যেখানে শুরু হয়, সেখানে ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, সেখানে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা লোপ পায়।
সুতরাং কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা জীবনধারাকে বাধ্যতামূলকভাবে সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক নয়। একজন মানুষ যেন নিজের পছন্দের পোশাক পরতে পারেন, একজন নারী যেন নিজের চুল খোলা রেখে রাস্তায় হাঁটতে পারেন, মানুষ যেন গান শুনতে, সিনেমা দেখতে, নাচতে, উৎসব করতে এবং নিজের ঐতিহ্য অনুসরণ করতে পারেন—এর জন্য অন্যের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অনুমতির অপেক্ষার প্রয়োজন নেই।
যখন কোনো একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত করা হয়, তখন ভিন্নভাবে জীবনযাপন করা মানুষকে নৈতিকভাবে নিকৃষ্ট, পাপী কিংবা সমাজের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখন আর মানুষের স্বাভাবিক সৃষ্টিশীল বিকাশের ক্ষেত্র থাকে না; সেটি পরিণত হয় নিয়ন্ত্রণের একটি হাতিয়ারে।
একসময় যে পোশাক, চুলের বাঁধুনি, গান, নৃত্য, উৎসব বা সামাজিক আচরণ একটি দেশের মানুষের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক ছিল, দীর্ঘদিনের সামাজিক চাপ ও নৈতিক পুলিশিংয়ের ফলে সেটিই মানুষের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, মিশর, ইরান, লিবিয়া, জর্ডান, উজবেকিস্তান, সুদান, আলজেরিয়া, তিউনেশিয়া উদাহরণ।
এই নিয়ন্ত্রণ যখন দীর্ঘস্থায়ী হয় তখন মানুষ নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতিকে অশালী’, অশ্লীল, অগ্রহণযোগ্য, বিদেশি বলে ভাবতে শুরু করে, তখন সাংস্কৃতিক মুছে যাওয়া আর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না; মানুষ নিজেরাই সেই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়।
বাঙলাদেশে একই পরিস্থিতি চলছে; চোখ থাকা স্বত্বেও অন্ধ হয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা বিপুল ......
Ananya Azad

পুনরাবৃত্তি

 


প্রাক্তন স্বামীর উপর আমার কোন রাগ নেই, ভুলটা আমারই। ডিভোর্স হয়েছে বছর চারেক। আদনানের সাথে কাটানো সেই দুই বছর তিন মাসের স্মৃতিগুলো এখন ঝাপসা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেগুলো প্রতি রাতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ফিরে আসে।

​মুমু পাশের ঘরে ছবি আঁকছে। পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটা দেখতে হুবহু ওর বাবার মতো হয়েছে। আদনান নিয়মিত ব্যাংক মারফত মুমুর খরচ পাঠিয়ে দেয়। আমার দেনমোহরের সাত লক্ষ টাকাও সে শোধ করে দিয়েছে। আমি ওকে ভালোবাসি, প্রচণ্ড ভালোবাসি। কিন্তু আদনানের চোখে শেষের দিকে আমি আমার ছায়া আর দেখি নি। সেখানে কেবল একরাশ ক্লান্তি আর আতঙ্ক।
আমি কিন্তু সংসারটা মনপ্রাণ দিয়েই করতে চেয়েছিলাম, আদনান নিজেও। কিন্তু আমার ভেতরের এক আদিম অন্ধকার বারবার সব তছনছ করে দিয়েছে।
​আমার ট্রমার শুরুটা ছিল এক যৌথ পরিবারের ঘুপচি ঘরে। ছয় কি সাত বছর বয়স তখন। এক রাতে বিকট চিৎকার-চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছিল ভাঙচুরের শব্দ। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে যা দেখলাম, তা আজও আমার স্বপ্নে হানা দেয়।
​আব্বা পাগলের মতো ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে ধারালো বঁটিটা নিয়ে এলেন। তারপর আম্মার গলার কাছে ওটা চেপে ধরে গর্জন করে উঠলেন,
-আজ তোকে শেষ করেই ছাড়ব, অনেক সয়েছি আমি।
​আমি চিৎকার করে ফুপিকে জাপ্টে ধরলাম। বড় চাচী আর দাদী মিলে আব্বাকে পেছন থেকে শক্ত হাতে টেনে সরাচ্ছিলেন। দাদী ফিসফিস করে বলছিলেন,
-পারু, তুমি ঘরে যাও। লক্ষ্মী মা আমার, ঘরে যাও।
​কিন্তু আম্মা সরেননি। তিনি রক্তবর্ণ চোখ করে ঘাড় বেঁকিয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেই চাহনিতে ভয় ছিল না, ছিল এক পৈশাচিক চ্যালেঞ্জ। আশ্চর্যের বিষয় হলো যেই দৃশ্য দেখে আমি এতটা ভয় পেয়েছিলাম বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় একই কাজ আমিও করেছিলাম।
​আদনানের সাথে সেদিন তুচ্ছ এক ঝগড়া হয়েছিল। কিন্তু এতোটুকুই যেন যথেষ্ট ছিল। আমার কানে তখন শুধুমাত্র আদনানের শান্ত স্বরে পাল্টা জবাব দেওয়া ঢুকছিল না বরং কানে বাজছিল শৈশবের সেই রণহুঙ্কার। অবচেতনে আমি দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম। বঁটি নিয়ে আদনানের দিকে তেড়ে যেতেই আমার শাশুড়ি আর ননদ রিনা আমাকে জাপ্টে ধরল। আদনান অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেছিল,
-এ তুমি কি করছো অহনা!
​আমি সেদিন জবাব দিতে পারিনি। আমি নিজেও জানতাম না, আমার হাতের বঁটিটা আসলে আদনানের জন্য ছিল না। ওটা ছিল আমার আব্বার প্রতি জমানো হাজারো ক্ষোভের এক বিস্ফোরণ।
​যখন ক্লাস ফাইভের বৃত্তির কোচিংয়ের জন্য রেডি হচ্ছিলাম, তখন আব্বা-আম্মার মধ্যে কি নিয়ে যেন প্রচণ্ড ঝগড়া হলো। আম্মা চিৎকার করে বলছিলেন,
-করলাম না তোর এই সংসার। আজকে আমি ম*রব আর তোদের সবকটাকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়ব।
​আম্মা সজোরে ঘরের দরজা বন্ধ করে খিল তুলে দিলেন। আব্বা কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে আমাকে বললেন,
-তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে অহনা, চল তোকে আগে দিয়ে আসি।
আমি কাঁদো কাঁদো সুরে বলেছিলাম,
-আগে আম্মাকে বের করো...
-ম*রলে ম*রুক। জীবনটা আমার বিষ করে দিল। চল তুই আমার সাথে।
​আব্বার সেই রাগী দৃষ্টি উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না। কোচিংয়ে বসে কলম চলেনি আমার। আমি শুধু ভাবছিলাম, বাড়ি গিয়ে আম্মার ঝুলে থাকা লা*শ দেখতে হবে। বাসায় ফিরে দেখি বড় চাচি আর ফুপি মিলে আম্মার মাথায় জল ঢালছে। আম্মা বেঁচে আছে, এই স্বস্তিটুকু পেলেও আমার ভেতরে এক গভীর ভীতি বাসা বেঁধেছিল। রাতের পর রাত কেউ জোরে দরজা বন্ধ করলেই ভয়ে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠত।
কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে ​একই কাজ আমি করেছিলাম আমার প্রিয় সংসারে। ননদ রিনার সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল আমার। আমি সরাসরি আদনানকে বিচার দিলাম। ও নিরপেক্ষ থাকতে গিয়ে বলল,
-অহনা, তোমার কাছে যেটা ছয় আমার কাছে সেটা নয় হতেই পারে। প্রত্যেকের ভিউ সমান হয় না। তোমার কাছ থেকে শুনলাম এখন রিনার কাছ থেকে শুনবো তারপরে আমি কথা বলব।
​আমার প্রচণ্ড রাগ উঠে গেল। আমার মনে হলো ও আমাকে বিশ্বাস করছে না, আমাকে মিথ্যেবাদী ভাবছে। ঠিক যেমন আব্বা আম্মাকে কোনোদিন বিশ্বাস করতেন না। আমি দৌড়ে ঘরে গিয়ে সজোরে দরজা আটকে দিলাম। আদনান বাইরে থেকে চিৎকার করছিল দরজা খোলার জন্য। কিন্তু আমার কানে তখন আব্বার সেই কণ্ঠস্বর বাজছে "ম*রলে ম*রুক!"
​আমি ড্রয়ার থেকে ব্লেড বের করলাম। আমি তখন গর্ভবতী। পেটে মুমু। তবুও আমি ভাবলাম না। এক টানে হাতের শিরাটা চিরে ফেললাম। আমি চেয়েছিলাম আদনানকে অপরাধী করতে, ঠিক যেভাবে আম্মা আব্বাকে করতে চেয়েছিলেন। যখন জ্ঞান ফিরল, আমি হাসপাতালে। আদনান পাশে বসে অঝোরে কাঁদছিল। ও শুধু বলেছিল,
-কেন করলে এটা অহনা? আমাদের বাচ্চাটার কথা একবারও ভাবলে না?
​আমি তখন ভার্সিটিতে পড়ি। ততদিনে যৌথ পরিবার ভেঙে গেছে। আম্মা আর আমি শপিং থেকে ফিরেছি। বেল বাজানোর আগেই হেল্পিং হ্যান্ড রুনা দরজা খুলে দিল। সে জানালা দিয়ে আমাদের দেখেছে। ভেতরে ঢুকতেই বেডরুম থেকে আব্বার কণ্ঠস্বর ভেসে এল। আম্মা আমার হাত চেপে ধরে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ করতে বললেন। আব্বা ফোনে বলছিলেন,
-হ্যাঁ সুরাইয়া, আমি তো গিয়েছিলাম, তুমি এলে না কেন? আমি আর কতক্ষণ অপেক্ষা করব?
​আম্মা অনেকদিন ধরেই বলছিলেন আব্বার চরিত্রের সমস্যার কথা। আমি হেসেই উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু সেদিন নিজের কানে শুনে আমি পাথরের মতো জমে গেলাম। এরপর যা ঘটেছিল তা কেবল ঝগড়া নয়, ছিল এক ঝড়। পাড়ার মোড় পর্যন্ত সেই ঝগড়া গড়িয়েছিল।
​বিয়ের পর আদনান একদিন অফিস থেকে ফিরতে লেট করছিল। ফোনটাও বন্ধ ছিল। আদনান ঘরে ঢুকতেই আমি তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করলাম,
-কোথায় ছিলে? কার সাথে চক্কর চলছে তোমার?
আদানন অবাক হয়ে বলল,
-অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম অহনা, কথা তো হলো তোমার সাথে। আর আসার পথে জ্যামে পড়ে গেলাম । তোমাকে তো শেষবার কথা বলার সময়ই বলেছিলাম যে ফোনের চার্জ প্রায় শেষ তাই দেখো ফোনটা এখন বন্ধ হয়ে গেছে।
-মিথ্যে বলবে না! কোন মেয়ের সাথে ছিলে বলো? নিশ্চয়ই কোনো মেয়ের সাথে তোমার চক্কর চলছে।
​আমি কুৎসিত সব কথা বলতে শুরু করলাম। আমি ওর শার্টের গন্ধ শুঁকছিলাম, পকেট চেক করছিলাম। আদনান নিজেকে সামলাতে না পেরে আমাকে প্রায় থাপ্পড় মারতে উদ্যত হয়েছিল। শাশুড়ি এসে ওকে একটা চড় মেরে ঘর থেকে বের করে দিলেন। আমি তখন রাগে ফুঁসছিলাম। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম না যে, আদনান আসলে আমার আব্বার মতো না। আদনান আমাকে সত্যিই ভালোবাসত। কিন্তু আমি ওর মধ্যে সারাক্ষণ আমার আব্বার স্বত্বা খুঁজতাম।
​ছোটবেলায় একবার দেখেছি, আব্বা ডিনার টেবিলে বসে ভাতের থালা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন কারণ তরকারিটা একটু ঝাল হয়েছিল। আম্মা সেই রাগ ঝাড়তে টেবিলের সব তরকারি মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলেন। সবাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আব্বা সেদিন আম্মাকে ধরে প্রচন্ড মার দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেছিলেন। আর আম্মা পরে ঠাটিয়ে থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়েছিলেন ফুপির গালে। সেই হুলস্থুল রাতটা আজও আমার রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
​একবার আদনান অফিস থেকে খুব ক্লান্ত হয়ে ফিরেছিল। আমি তখন সারাদিন মুমুর সাথে একা সামলাতে গিয়ে বিরক্ত। ও ডাইনিং টেবিলে বসে বলল,
-অহনা, একটু পানি দাও তো।
আমি খিটখিট করে বললাম,
-নিজে নিয়ে খেতে পারো না? আমি কি তোমার চাকর?
আদনান অবাক হয়ে বলল,
-আমি তো জাস্ট পানি চেয়েছি, জগটা খালি।
-জানি তো,পানির বাহানায় তুমি আসলে আমাকে চাকরানী বানাচ্ছো। বলে আমি ডিনার টেবিলের সব গ্লাস-প্লেট ঝনঝন করে ফেলে ভেঙে দিলাম। মুমু ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
​আদনান সেদিন আর রাগ করেনি। ও শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলে পড়ে থাকা ভাঙা কাঁচগুলো পরিষ্কার করতে শুরু করল। ও বলেছিল,
-অহনা, তুমি আসলে সুখী হতে জানো না। তুমি অশান্তি তৈরি না করলে শান্তি পাও না।
​আদনান যখন ডিভোর্স লেটার পাঠাল, আমি ওর অফিসে গিয়েছিলাম। ওর হাত ধরে পায়ে ধরেছিলাম।
-আদনান, আমি বদলে যাব। প্রমিজ করছি। তুমি ফিরে এসো।
আদনান শান্তভাবে আমার হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, -অহনা, তুমি বদলে যাওয়ার কথা এর আগেও দশবার বলেছ। তুমি আসলে নিজের ট্রমার মধ্যে আটকে আছ। কতবার তোমাকে বলেছি সাইকিয়াট্রিক কাউন্সেলিং এর কথা, কিন্ত তুমি তোমার কথাতেই অবিচল। তুমি হয়তো আমাকে ভালোবাসো কিন্তু সেই ভালোবাসাটা বিষাক্ত। আমি তোমার পাশে থাকতে গিয়ে আমার নিজের সুস্থ মানসিকতা হারিয়ে ফেলছি।
​আজ চার বছর পর আমি উপলব্ধি করি, বাবা-মায়ের সেই রক্তবর্ণ চোখ, সেই বঁটি, সেই অবিশ্বাসের শব্দগুলো আসলে আমার অবচেতনে গেঁথে গিয়েছিল। আমি আমার সাজানো ঘরটা নিজ হাতে ভেঙেছি।
​আদনান অসম্ভব ভালো একটা মানুষ। তাই তো সে আজও মুমুর জন্মদিনে সবার আগে উইশ করে। কিন্তু সে আমার ছায়াও সহ্য করতে পারে না। আমি এখন থেরাপিস্টের কাছে যাই। আমি শিখছি কিভাবে সেই শৈশবের স্মৃতিগুলো মাথা থেকে মুছে ফেলতে হয়। ​আমি চাই না মুমু কোনোদিন জোরে দরজা বন্ধ করার শব্দ শুনে আঁতকে উঠুক। আমি চাই না ও কোনোদিন ওর স্বামীর দিকে বঁটি নিয়ে তেড়ে যাক। বাবা-মায়ের সম্পর্কের বিষ যেন আমার মেয়ের ধমনীতে না পৌঁছায়, এটাই এখন আমার একমাত্র লড়াই।
আমি এখনো আদনানকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি এখন জানি, সুস্থ না হয়ে কাউকে ভালোবাসা যায় না, কেবল আঁকড়ে ধরে রাখলে তাকেও শুধু ডুবিয়েই দেয়া যায়।
(গল্প ভালো লাগলে লাইক,কমেন্ট,শেয়ার করে পেইজটা ফলো করে পাশে থাকবেন আর হ্যাঁ প্লিজ কপি করবেন না)

কলমে:সুবর্না শারমিন নিশী

No-Mold . Pan-Seared Rice Balls

 


[Ingredients (Serves 2)]

Warm cooked rice: 400g

Soy sauce: 1 tbsp

Mirin: 1 tbsp

Granulated Japanese-style dashi stock: 1/2 tsp

Sesame oil: 1 tbsp

White sesame seeds: To taste

[Instructions]

(1) Mix the soy sauce, mirin, and granulated Japanese-style dashi stock into the warm rice.




(2) Heat the sesame oil in a frying pan (20cm size) and add the rice mixture from step (1). Spread it out to fill the pan, pressing down with a spatula. Cook over medium heat for 4–5 minutes; once it has browned nicely, place a large plate over the pan, flip the pan over to transfer the rice onto the plate, and then slide it back into the pan. Cook for another 3–4 minutes until both sides are fragrant and browned.




(3) Use a spatula to cut it into bite-sized pieces.