রংতুলিমেয়ে থেকেই যুবকটি তাকে প্রথমে ডাকে চারু... ক্রমশ চারুবালা। প্রৌঢ়া, যুবকটির মা, নিঃসঙ্গ বারান্দায় বসে দেখেন, নিকট অথবা দূরবর্তী পথ, যতটুকু দেখেন তার চাইতেও প্রচুরগুণ আত্মবুঁদ... অন্তত বাইরে থেকে তাকে যা দেখা যায়, ফিনফিনে প্রৌঢ়ার বহির-ব্যক্তিত্বের কাঠিন্যের আড়ালে অহর্নিশি কী এক ভাবুক বেদনাতুর মুখ... মাথার ওপর ঝুলন্ত কুয়াশারা, প্রৌঢ়া অনেক দূর উল বুনে ফের কী একটা পিনসম ভুল অনুভব করায় টেনে টেনে খুলে ফেলছেন সেই সোয়েটার অথবা মাফলার হয়ে উঠতে চাওয়া বিষয়টির শরীর। যখন বুনছেন, ভারি চশমা, শরীরটা কিছুটা পেছনে হেলানো টান টান চোখ সামনের নির্জন পথে। দীর্ঘক্ষণ তিনি হাতের বস্তুটির দিকে তাকানোরই স্পৃহা বোধ করেন না, অথবা তার সমস্ত অস্তিত্বের মধ্যে এই দুটি কাঁটা, খোঁচাখুঁচি করে এক অর্থহীন নির্মাণ নির্মাণ ‘খেলা’ হয়ে থাকে।
আর যুবকটি যখন মধ্যরাত মাথায় নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, হাতের চাপে পিঁপড়ে মরে গেলেও যে দুঃখিত থাকে অনেকক্ষণ, এবং তার হাতের চাপে পড়ে মরে না গেলে পিঁপড়েটি তার মুখে খাদ্য নিয়ে চলা সারবাঁধা আত্মীয়দের সঙ্গে আরও কতদিন বাঁচতে পারতো, এই নিয়ে বিমর্ষবোধ করে, সে ক্ষণকালেও বিচলিত নয়, তার জন্য একজন প্রৌঢ়ার ঘণ্টা ঘণ্টা অপেক্ষা কিংবা দুশ্চিন্তার যন্ত্রণার কথা ভেবে।
একটা বেহালা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন না মাঝরাত্তিরের পথে, চারুবালা বলে, প্রথমে টহল পুলিশ এরপর শহর পেরোনো আপনার বাজনা শুনবে অরণ্যের জোনাক পোকা!
মানুষের যখন সকাল শুরু হয়, যুবকটির শুরু হয় রাত্তিরের, যুবক তখন যেন একই সঙ্গে বাংলাদেশ আর আমেরিকা থাকে, যখন এইখানে সূর্য অস্ত যাচ্ছে, যুবক তার চেতন অবচেতনের কোষে কোষে অনুভব করে, ফালি ফালি কুয়াশাকে ভস্ম করে দিয়ে উদিত হচ্ছে সূর্যের রক্তাক্ত চাউনি... প্রভাত হচ্ছে অনেক মাইক আজানের মধ্য দিয়ে, ঘাই দিয়ে উঠেছে ফেরিঅলা আর সবুজ বৃক্ষের নিচে প্রকাশ্য স্নান শেষে ক্রমশ ঘুমিয়ে পড়ছে পথ বারবনিতারা। যত রাত্রি বাড়ে, যুবকের অনুভূতিতে ততই দিনের টানে নিজেকে কক্ষবন্দি বোধ করে এক হাঁসফাঁস বোধ থেকে সে ছিটকে বেরিয়ে পড়ে আলো-আঁধার রাত্রির পথে।
না ঠিক বেহালা নয়, শিল্প নয়, শিল্পের স্বপ্ন থেকে সে বেরিয়ে পড়েছে কবে যখন ভার্সিটি জীবন, ভালো স্টুডেন্ট এবং উন্মাদ অনিয়ম সময়ের দ্বন্দ্ব, যখন দ্বিধাগ্রস্ত, অভিনেতা না লেখক না কণ্ঠশিল্পী হবো... এইসব কিছু উপকরণের অনেকটা অনেকটাই নিজের মধ্যে ছিল সবচাইতে জোরাল, অভিনেতা! রাজপুত্রসুলভ চেহারা লম্বা চুল নিয়ে দলও গঠিত হয়েছিল একটা... সেটা কবে ? কবে ? রাত্রির গাড়ির সামনের গ্লাস ঢেকে যেতে থাকে ঘন কুয়াশায়। নিজের নিঃসঙ্গতার নখর থেকে পালাতে সে ব্যাক গিয়ারে গাড়ি খানিকটা নিয়ে এমন এক বন্ধুর বাসায় নামে, বস্তাপচা রাজনীতি, সস্তা প্রেম, ধর্ম আর সেক্স নিয়ে যে অনেক বেশি সময় পার করেও একটি ভালো লাইন তৈরি করে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে না।
চারুবালা ক্যানভাসে কী আঁকে ? যুবক অবচেতনে ওর আঁকা মেঘপুঞ্জের মতো অবয়বগুলিতে কেবল নিজের ছায়াকেই মূর্ত দেখতে চায়। যদিও না মানুষ, না প্রকৃতি কিছুই মূর্ত নয়, তার পরও কোনো একটা ব্রাশআঁচড় দেখিয়ে চারুবালা যখন নির্ঘুম স্বপ্ন বালিকার মতো ঘোরকণ্ঠে বলে ওঠে, এ আপনার কণ্ঠ, যার ওপর স্থির প্রতিনিয়ত আপনার ব্যক্তিত্ব... যুবক যখন ভেতর বিলোড়িত অবাক, যে চারুবালা বিশ্বাস করে শিল্পীকে বলতে নেই, সে কি আঁকছে ? আসলে শিল্পী নিজেও জানে না সে কখন কি আঁকে, দর্শককে কোনো একটা বিশেষ ভাবনায় স্থির করে দিতে নেই। তাতে ছবি দর্শকেরও আবিস্কারের স্বপ্ন মরে যায়, তার সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হয়... সে আজ বলে দিচ্ছে ? তাও যুবকের কণ্ঠকে কেন্দ্র করে... ? যখন ভেতরে রোমাঞ্চ লোভ চিক চিক তখন সে যুবকের মুহূর্তকে অকস্মাৎ শোকাতুর করে চুল ঝাঁকিয়ে একে একে বলে যায় অন্য বন্ধুদের বৃত্তান্ত। এই লাল রেখাটা আমার ওই বন্ধুর হৃৎপিণ্ডের ক্রন্দন, আর এই যে নিচটায় কালো ছোপ যার ওপর কুচিকুচি মার্বেল পাথর আর ডিমের ভাঙ্গা খোসা বসাচ্ছি, এ আরেক বন্ধুর...। যুবক ক্রমশ নিভে আসতে থাকে যেমন, তেমন ঈর্ষাতুর যন্ত্রণার চিতায় ঢেউ খেতে খেতে আবিষ্কার করে, যে কোনো একটা বিষয়ে চারুবালাকে শনাক্ত করা যায় না বলেই সে প্রতিনিয়ত নতুন। তার প্রতি চারুবালার যে গভীর মনোযোগ, তাকে চারুবালা প্রায়ই অগ্রাহ্য করে অন্যপুরুষদের প্রশংসায় যখন মাঝেমধ্যেই মুখর হয়ে ওঠে। তখন যুবকের মনে চারুবালার সামনে নিজের সম্পূর্ণ সুন্দর প্রকাশের দুর্দান্ত লোভ কাজ করে।
কিন্তু নিজ স্বভাবের অন্তর্মুখিতা ক্রমশ নিজেকে থামিয়ে দেয়। প্রতিভোরেই তার মধ্যে এক অসহ্য নেশা কাজ করে, চারুবালার প্রভাতের গলা এত মাদকময়, সেই কণ্ঠ সবার আগে শুনতে চায় যুবক, মনে হয় সেই কণ্ঠনেশার আবেশ শরীরে ছড়িয়ে দিন শুরু হোক যুবকের সেই কণ্ঠ শোনার লোভে আজকাল যুবকের মধ্যরাতে ঘুমিয়েও প্রায়ই ভোরে ঘুম ভাঙ্গে কিন্তু কী এক বোধে পড়ে প্রায়শ সেই ফোন রিসিভ করে না চারুবালা। আর নিজের যন্ত্রণা অসুখ চেপে যে চারুবালা স্বপ্নের কথার মধ্যে ঢেউ খেতে পছন্দ করে, তাকে নিজের অজান্তেই প্রায়ই যুবক নিজের, পরিবারের জাগতিক অসুখ দুঃখের কথা বলে বলে হঠাৎ আবিষ্কার করে, দুঃসহ গ্লানির পাকে পড়ে সে সাধারণ হয়ে পড়ছে, ফলে পরক্ষণেই সে নিজের সহজাত বৃত্ত ভেঙ্গে আবার নাম্বার ঘোরায়, যুবক জানে, নিজের আকাঙক্ষার বিরুদ্ধে মানবিক হতে চাওয়া চারুবালা এক্ষণি যুবকের মাথায় যন্ত্রণার খোঁজ নিতে চাইবে... যুবক সেই কণ্ঠকে থামিয়ে দিয়ে ডেকে ওঠেÑ হেই নাইটিঙ্গেল! কিন্তু কি এক অসহ্যবোধে চারুবালা তখন কেবল যুবকের আর তার পরিবারের অসুস্থতা নিয়েই নানা রকম কথাবার্তা বলতে থাকে।
একাকী শয্যায় চারুবালা গোলাপি নাইটির ঘেরে কেবলই পেঁচাতে থাকে। প্রাণের মধ্যে সাঁওতালি নাচ ওঠে! নিদ্রাহীনতা কিংবা নিজেকে ক্রমাগত আবিষ্কার করতে না পারার বোধ তার ছকহীন মুহূর্তগুলো চেটে খেতে থাকে। ঘরের কোণের গনগনে হিটারে চোখ রেখে সে কামবোধ করে, তার সমস্ত দেহের শিরা-উপশিরায় যখন বুভুক্ষু তৃষ্ণার তাণ্ডবÑ তখন পালায়, সে-ও!
তিন লাফ দিয়ে যখন ইজেলের সামনে
ঝাঁক ঝাঁক কাশফুলের স্বপ্ন তার ভেতরটা শূন্য করে দেয়। এখন ক্যানভাসের একটাই আকুলতা কাশফুল খাব। চারুবালা বগলে রংতুলি নিয়ে শহরের আশপাশে অনেক ঘুরেছে। কিছু দৃশ্য দেখে চমকিত হয়ে যে-ই চোখ ইজেলে কাশফুলে ঢেকে যায় সব। শেষ রাতে সে ফোন করে যুবককে শরৎকালটায় বলুন তো আমি কোথায় ছিলাম ?
ঘুমজড়ানো যুবক বলে,ওই ছ’মাস আপনি অজানা রোগে বিছানায় পড়েছিলেন। অনেক চেক করেও ডাক্তার আপনার রোগ খুঁজে পায় নি। ফোন কেটে দেয় চারুবালা। তার শরীরের ওপর দু’বছর রাত রাত সাঁতার কাটা মানুষটির কথা মনে পড়ে। ওর সাথে সংসার করার সময়ই কি খেয়ালে জানি স্খলিত চারুবালা ওই রুদ্ধশ্বাস রুটিনে ক্লান্ত হয়ে তার প্রণয়প্রার্থী পাঁচজনের একজনকে এক স্যাঁতসেঁতে সন্ধ্যায় বলেছিল, আমাকে স্পর্শ কর তো ? দেখি তো, এক রকম কি-না!
ও একটু হামলেই ছিল, পঞ্চমজন, টসটসে চোখগুলো যেন গিলে ফেলতে থাকত মিনিট মিনিট চারু দেহ... বেচারা, মায়াও হচ্ছিল খানিকটা চারুবালার। বুকের বোতাম খুলে দিতেই ও যখন হাউমাউ টাল খেয়ে, কাঁপতে কাঁপতে স্তনভাঁজে হাত রেখেছে, দু’বছর সংসার করা স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ।
নাইটির ঘেরে ফের নিজেকে বাঁধতে বাঁধতে নাম্বার ঘোরায়, যুবকটি ফোন তুলে মহাঘুমের অতলান্ত থেকে এবং চারুবালা তাকে বলেÑ আজকে থেকে আমরা তুমি তুমি।
ওপাশ নিঃশব্দ... চারুবালাকে গ্রাস করে মফস্বলে বদলির চাকরি নিয়ে থাকা যুবকের স্ত্রী... হপ্তা, দুই হপ্তা পর সে এলে তার নগ্ন শরীরের ওপরে যুবকের নিজেকে উপুড় করে দেয়ার দৃশ্যাবলি এবং তাদের দুই যমজ শিশু অমল, ধবল!
ছায়া স্পষ্ট হয়। প্রৌঢ়ার চোখে আজকাল এত ঘুম! কেবলই মনে হয়, বিছানায়, মেঝেতে, ঘাসে শরীরটা বিছিয়ে দেয়।
প্রৌঢ়ার স্মৃতির মধ্যে রিনরিন করে প্রাচীন আভিজাত্য! এই বিকটাকার রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ির মধ্যে, জন্মের পর থেকে তিল তিল বেড়ে ওঠা পিতা প্রপিতামহের খানদানি আবহের মধ্যে তিনি রপ্ত করেছেন, সুশৃঙ্খল কৌশলে... জেদ আর অহঙ্কার প্রকাশের নান্দনিক কায়দা।
ফলে, চিরকাল ভয় পেয়েছে সবাই, সম্ভ্রম, ভক্তি করেছে, ভালোবেসেছে, কিন্তু তার তার শাড়ির পাড় স্পর্শ করেছে একমাত্র চারুবালা।
তিনি চমকে উঠেছেন, গলে উঠেছেন, ভেঙে উঠেছেনÑ কিন্তু জীবনে প্রথম তাকিয়েছেন নিজের অস্তিত্বের সবচাইতে দুর্বলতম দিকটির দিকে তার পুত্র... যুবক... যাকে ঘর, সংসার, প্রেম, যমজ শিশুর মায়া কিচ্ছু টানে না, তার দুঃখ কী, আদৌ কোনো দুঃখ আছে কি-না তিনি জানেন না এবং যার মাথায় সারাক্ষণ কি এক যন্ত্রণা যা-না, ব্যথা, না আঘাত... ভাষা দিয়ে যে তার মাথার মৃত্যুবোধকে ডাক্তারের কাছেও সনাক্ত করতে পারে না। অপূর্ব এক রাজকন্যা এসেছিল তার ছেলের জীবনে একদা, তাকে হাসিয়ে খেলিয়ে তার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছে দূর দেশে, যুবকের সাধারণ, প্র্যাকটিক্যাল স্ত্রীর সাধ্য কী সেই ঢেকে রাখা ক্ষতে হাত রাখে ?
প্রৌঢ়া ভাবেন, হাত বেয়ে উল গড়িয়ে... চাকা... গড়াও... গড়াও... যে স্ত্রী কি-না, এক নিঃশব্দ ভোর রাত্তিরে, প্রৌঢ়া নিজ কানে সন্তর্পণে শুনেছেন... ছেলের ঘন নিঃশ্বাসের মুখে উচ্চারণ করে উঠেছে... আহ্ এইভাবে নড়ছ কেন, চাদর নষ্ট হয়ে যাবে, সে কি করে।
চারুবালার দিকেই একমাত্র সরাসরি তাকাতে পারে না যুবক, নিজেকে ঢাকতে হাবিজাবি নানা কথা বলে... প্রৌঢ়ার ভ্রমর প্রাণ ওই যুবকের দেহে, তাকে বহুদিন পর সে নাড়াল, সে-ই তো সটান সালাম শেষে নির্দ্বিধায় হাত দিয়ে প্রৌঢ়ার ক্ষতবুক চেপে ধরার ক্ষমতা রাখে এবং শাড়ির পাড়। ওই তো হেঁটে আসছে চারুবালা... বোঁচা নাক... তীব্র চাউনি, গ্রীবা বাঁকিয়ে এত দ্রুত হাঁটা... প্রতিনিয়ত কেউ যেন ধাওয়া করছে পেছনে!
প্রাচীন বাড়ির খাঁজকাটা পথে হেঁটে হেঁটে প্রৌঢ়া চারুবালার হাত ধরেন... ভেতরে কৈশোরিক নাচ ওঠে... খিরো নদীর জলে উদ্দাম সাঁতারের স্মৃতি ওঠে... হায় খোলস বলেন, বুঝতেই পারছ এখন আমাদের ভোর...।
চারুবালা বলে, ওর গভীর রাত্রি, আমি জানি, ও ঘুমিয়ে আছে। অবশ্য প্রায়ই আমি ভোরে উঠি না। যাহোক আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
আসলে কি আমার কাছে মেয়ে ? মনে মনে ভেবে প্রৌঢ়া ওকে নিয়ে মোগলী কায়দায় বানানো দোতলা বিছানার ওপর সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে বসেন, আমাকে দেখা মানে, আমাকে পাওয়া মানে অনেকটাই ওকে পাওয়া, ওকে জয় করা। তোমার চোখই বলছে মেয়ে, এখনো কব্জা করতে পার নি আমার ছেলেটাকে, তুমি যে সেই লড়াকু, যে তোমার পায়ের কাছে আসন গেড়ে বসে থাকে তাকে নিয়ে খেলো, নয় তাকে পাওয়ার নেশায় উন্মাদ হও, যে সরলভাবেই তোমাকে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু আকাঙক্ষা না করে নিজ পথে হাঁটে... কিন্তু আমার ছেলে যে মেয়ে কোনো দলেই পড়ে না। ঘা খেয়েছে সে রাজকন্যার কাছ থেকে, এখন সে তোমার ভয়ে পালাচ্ছে... সে বুঝে গেছে তাকে ছাই দিয়ে ধরে না আছড়ানো পর্যন্ত তোমার শান্তি হবে না!
ছিঃ! কী ভাবছি আমি চারু সম্পর্কে; ধিক দেন নিজেকে প্রৌঢ়া, আমার ছেলের যদি ওর সান্নিধ্যে প্রাণের আরাম হয়... ?
চারু... মানে সাথে বালা... কার দেয়া নাম ? প্রৌঢ়ার এই প্রশ্নে চুল ঝাঁকিয়ে হেসে ওঠে মেয়ে, আপনার ছেলের!
চন্দ্রের স্তন থেকে খসে পড়ে হলুদ পীড়ন। আসমানে চাঁদ, তার মধ্যে মুখ, কখনো স্ত্রীর, মা’র, যমজ শিশুর... সরে যায়, কোথাও গাঁথে না মন... বরং ইচ্ছে হয় ওইখানে ক্রমশ স্থির হয়ে ওঠা চারুবালার মুখটাকে নামিয়ে দু’হাতের ভাঁজে রেখে কিছুক্ষণ নিভাঁজ চোখে দেখে... চন্দ্র... চন্দ্র... বুকের মধ্যে গুমরানো বেদনা দাবায়, ভার্সিটির শ্রেষ্ঠ সুন্দরী রাজকন্যা বলেছে যুবক চারুকে এই গল্প... হোস্টেল থেকে এসে ওদের নিঃশব্দ বাড়িতে পালিয়েছিল তিন রাত! তখন তো যুবক স্থিরপাগল, রাতভর আড্ডা, অভিনয়, মদ... সবুজ ঘাসে সটান শুয়ে পড়ে গান গাইতে থাকা। কন্যা এলে যেন ঠাসমিহিতে গেঁথেছিল যুবকের দেহ, কন্যার সাথে কথা বলতে ভয়, কন্যাকে ছুঁতে ভয়,অথচ একই ঘরে, কখনো এক বিছানায়, নারী বলেই হয়তো পুরুষের হাতটা আগে ধাবিত হোক চাইছিল, যে-সে মেয়ে হলে কথা ছিল, কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিতে, অথবা অকপট সরল হতে, অথবা শরীর আর মনের তপ্ত আগুন যা চাইছে, তা করতে সুবিধে হতো। এ-যে অনেকের আকাঙক্ষার চোখ ঝলসে দিয়ে আসা লীলাপটিয়সী, যুবক কী করে বোঝে ঠিক কোন ব্যবহারে নির্জন বাড়িতে আশ্রিতা কন্যার মস্তক থেকে আগুনের শিখা বেরোবে না ?
চোখে কটাক্ষ হেনে... ‘রূপসীদের যা রপ্ত থাকে’ সেই নারী সিঁড়ি বাইতে থাকে। অদ্ভুত স্নানঘর, ওপরে ছাউনি নেই, কেবল চন্দ্র ঢলের উদ্দাম মাখামাখি... মাথায় জল ঢেলে কন্যা একটানে উড়িয়ে দেয় শাড়ি, কুণ্ডুলি পাকায় ব্রা’র ঘ্রাণ পেছনে আসা বিমোহিত যুবক স্নায়ু দিয়ে বুঝে যায়, এই ডাক উপেক্ষা মানে এইবার দুইজন এক সাথে ঠকা। চন্দ্রের আগুনে দুটি স্নানভেজা শরীর পুড়তে থাকে।
প্রৌঢ়া বলেন চারুবালাকে, ছেলেবেলা থেকেই ও যেন কেমন! গভীর দায়িত্ববোধ আর শৃঙ্খলহীন বাইরের পৃথিবী ওর বুকে পাশাপাশি থাকে... বলতে বলতে প্রৌঢ়া দূরতম অতীতে কী জানি হাতড়ান, সেই চন্দ্রদৃশ্য স্মৃতি মনে করে চারুবালা অনুভব করে ঈর্ষায় ভেতরটা টনটন করছে, তাহলে কি প্রেমে পড়েছি ? আশঙ্কায় যখন ছটফট চারুবালা, দেয়ালে কোন সম্রাটের গোঁফের তলা থেকে ক্ষীণ হাসি ফুটতে থাকে... বাড়তে থাকে রোদ্দুর... আর তারই এক ফালি টুকরো প্রৌঢ়ার চোখ গ্লাসে বিছানা গড়িয়ে ফের উলের বল নাচতে নাচতে... প্রৌঢ়া বলেন, যুদ্ধের সময়, কতইবা বয়স ওর ? একটা ট্রাকে করে চলে গেল কোন অজানা ক্যাম্পে... যেন সেই ছেলেটি আর ফিরে আসে নিÑ এতকাল পরে প্রৌঢ়ার গলায় সেই হাহাকার... সারাদিন খোঁজ নেই, সারারাত খোঁজ নেই, হায়রে আমার প্রাণের ধন, তোকে যদি তখন খুঁজে না পেতাম, এই জীবন কাটাতাম কী করে ?
যুবকের অস্তিত্বের কোষে কোষে বেদনার প্রাচীন রশ্মি ক্রমশ পেঁচাতে থাকে। বিছানায় ঢেউ খেয়ে শচীন দেব বর্মণ শুনতে শুনতে সে ভয়ে চমকে ওঠে, টের পায়, চারুবালার ছবি আঁকা দেখতে দেখতে নিজের মধ্যে অক্ষম জেদ উঠছে, পৃথিবীতে কাউকে শুনিয়ে যা নিয়ে আফসোস করে নি তা-ই করেছে চারুর কাছেÑ অভিনয়টা যদি করতাম... কেন কর নি ? অন্যমনস্ক চারুর তুলিতে অবারিত রঙের স্বাচ্ছন্দ্য... ভার্সিটিতে আমাকে দেখে যখন সবাই হাততালি, সেই রূপসী কন্যা গভীর বিস্ময়ে বলেছিল, এইসব ক্লাউনেরা করে, তারা নানা ভঙ্গি করে হাততালি পায়... তুমি কি... ? প্রেম কী আজব অন্ধ চারু, আয়নায় নিজেকে সেইরাতে হাস্যকর মনে হয়েছিল।
চারুবালা তাক লাগিয়ে দিতে চায় যুবকটিকে। ক্যানভাসে ছবি এঁকে। চাঁদরাত্রি আর যুগল মনের মানবীকে নিয়ে কী দৃশ্য সে ভেতরে দেখতে পেয়েছে তার ভেতরচোখ কতটা গভীর কাশফুলকে দাবিয়ে রেখে সে একের পর এক ক্যানভাসে তুলির ছোবল বসায়।
প্রৌঢ়ার চোখ রাত পথের দিকে, আচম্বিতে মাকড়সা দোল খেলেও চমকানোÑ এসেছিস ? ঘর বহির্মুখী যুবক এর সেবায় ওর সেবায় নানা রকম ঘরে রাত্রি পার করে, সে সচেতন মানুষের শরীর এবং চিকিৎসা বিষয়ে। চারুবালা তুলিরঙের ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে যখন ফোনেÑ যুবক তাকে নিভিয়ে দিয়ে বলে, আমার পেসেন্টকে এই মুহূর্তে ওটিতে ঢুকিয়েছি... চারুবালার ভেতর ভয়, যে মানুষটাকে ঘর বাঁধতে পারে না, আমার স্বপ্ন তো তাকেই স্পর্শ করতে চায়, সেও যদি আকাশ আর নির্জন অরণ্যের গল্প না করে রাত রাত স্ত্রীর ঘেমো শরীরে এঁটে থাকা মানুষদের মতো সাধারণ গল্প করে। চারুবালার ভেতরে চলে ক্ষয় আর নির্মাণের যুদ্ধ... সে বলে, জান আজ চোখের সামনে একটা এক্সিডেন্ট দেখেছি, সেই থেকে যুবক তার সহজাত স্বভাবে, কোথায় ? না মানে জানতে চাইছি পান্থপথের ঠিক কোন সাইডটায়, রক্তাক্ত দেহের মধ্যে বুঁদ হয়ে থাকা চারু এরকম নানা লোকেশনজনিত, বা মূল বিষয়ের আশপাশে ঘুরে তাকে নানা প্রশ্নে জর্জরিত করা যুবকটির প্রতি ক্লান্তবোধ করে।
স্বপ্নাক্রান্ত চারুবালা নিজের চারপাশে ছড়াতে থাকে হাজার জোনাক। রূপসী সর্প পেঁচাতে থাকে কণ্ঠে, পেঙ্গুইনের মতো লাফাতে লাফাতে সে মেঘের মতো চুল উড়িয়ে দূরের ময়ূরাক্ষীর দিকে ছুটে যায়। ফের নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে সে যুবককে মহাকাশ থেকে ধপাস নিচে ফেলে, তখন এখানে সত্যি সত্যি দিন, মানে বিকেল, যুবক তিন ঘণ্টার জন্য বাবার ব্যবসার কাজ দেখে যে সময়টায়Ñ টেনে নিয়ে আসে সেখান থেকে তাকে... ইজেলটাকে ছাদে স্থাপন করে যুবককে চমকে দেয়ার নেশায় চারুবালার সারা অঙ্গে থর কাঁপুনি।
যুবক চেয়ে আছে, হঠাৎ প্রশ্ন করে, ক্যানভাসের নিচটায় হাত রেখে এটা কী ? চারুবালা বলে, পিরিয়ড রং!
লাল বলছ না কেন ? আসলে ইতস্তত চারুবালা নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে নিজে বোঝাতে খুবই অসহিষ্ণু যেহেতু, বলে আসলে এই লালটা, সম্পর্কের অবক্ষয় থেকে নেয়া, সম্পর্কটা থেকে শেষ অবধি বেদনার রং ঢেকে গেছে। যুবকটি যখন নিজেকে প্রতারিত বোধ করে এরপর তার জীবনে আসা যে কোনো নারীকে বিশ্বাস করতে গিয়ে ভয় পেয়েছে।
এইবার চারুবালার কম্পিত অঙ্গ জল! ছবির বিষয় থেকে সরে গিয়ে যুবক রাজকন্যার প্রসঙ্গে যায়, বলে, ওর একবার ডিপথেরিয়া হয়েছিল! আমার কী যে আতঙ্ক চারু! ডাক্তারের প্রশ্নে বলেছি, ও বিড়ালের ঠোঁট ও ছুঁতে যাবে কেন ? ও কেবল আমার ঠোঁট কামড়েছে।
বছরটা হেলান দেয়।
মাঝে মাঝে যুবকের কণ্ঠের কোরাস... কানে শব্দময়, আমি ভয় পাই তোমাকে, তাই মূল স্থান ছেড়ে নানাপথে হাঁটি। কখনও নিজেই স্ববিরোধী, নিজেই সব বোঝো? আগুনে পুড়ে এই অবধি এসেছি, ভয়ের সাধ্য নেই আমাকে ভয় দেখায়। তাহলে আর ডর কী ? চারুবালার প্রশ্ন এস, সমানে সমানে দাঁড়াও, আমি ক্লান্ত বোধ করে চলে গেলে নিছক কষ্টই তো পাবে!
রিং বাজতে থাকে।
প্রৌঢ়া পা ঘষটে ঘষটে রিসিভারে কান পাতেন। লাইন কেটে দেয় কেউ ওপাশে। গভীর রাতে চারুবালাকে চমকে দিয়ে যুবক বলল, তুমি ফোন করেছিলে ? মা বলল, তোমাকে করতে!
আমি তো কথা বলি নি! চারুবালা রক্তাভ । যুবক বলেÑ এ রকম ফোন করার আমার আর কেউ নেই। মা জানে।
চারুবালার অ্যাডমেয়াররা আসে। পত্রিকায় ছবি আঁকার কাজ ছেড়ে দিতে বলে, বলে এতে ক্রিয়েটিভিটি নষ্ট হয়।
তোমরা আমাকে খাওয়াবে ?
ওরা, যারা যারা এই ভার নিতে চায় তারা ঝলসে উঠতে থাকা চারুবালার চোখ এবং শরীরের দিকে তাকিয়ে অজানা বেদনায় চুপ হয়ে যায়।
ভোরে একজন ফোন করে, কণ্ঠ চেনে চারু, ফটোগ্রাফিতে ও সাংঘাতিক শাইন করেছেÑ তুমি কাল কেন বলেছিলে, আমার ভার যদি কেউ নিত ?
নেতিয়ে পড়ে চারুলতা, তোমাদের আড্ডায় ? না তো ? বলেছিলাম বুঝি ? জানি না তো।
যুবক মধ্যরাতে ফোন করে; পাখি, তুমি সেদিন রাতে কাঁদছিলে কেন ?
চারুবালা বলে, আমি ? আমি কাঁদছি না তো ?
আমি জানি, তুমি নিজেই জানো না কখন তুমি কেন কাঁদ, এই জন্যই তোমার স্বপ্ন থেকে বেরোতে পারি না।
হেই ঘুড্ডি... বিকেলে কাজে যাবে চারুবালা, ফোন, আরেকজনের, তুমি আমার সাথে পরশু হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলে নদীর একদম কিনার অবধি...।
জলের মধ্যে হাঁটছি দেখেও ডাকলে না কেন ? আহ্লাদি কণ্ঠ চারুর, আমার মাথায় কখন কী ভূত চাপে।
সেইজন বলে,আমার সঙ্গে যখন চলো, নাটাইটা আমার হাতে। তীরে দাঁড়িয়ে সেটা ধরে টানতে টানতে তো তোমাকে কাছে নিয়ে এসেছিলাম!
মোবাইলে ফোন করে আরও একজন স্বপ্ন, জান শরৎ এসেছে! ব্রহ্মপুত্রে এখন অনেক কাশফুল!
রাত্রি রাত্রি চারুবালার সারা চোখে কাশফুলের শাদা ওড়াউড়ি। তমস তমসতর গভীরে শরীরে নাইটির ঘের... পাখি... পাখি... পরদেশী... ঘুড্ডি... না কোনো ভাবনাই তপ্ত আগুনটাকে নেভাতে পারছে না, কারও চোখ... বাহু... আলিঙ্গনের স্বপ্ন না। কেবল দুর্মর এক যন্ত্রণা ওর, চাঁদরাত্রির নিচে চোখ যায়, জ্যোৎস্না চুইয়ে বৃষ্টিস্নাত দৃশ্যটার ওপর গনগনে শরীরটাকে পেতে যুবকের চোখে থেকে ওই স্মৃতিটাকে অন্ধকার করে দিতে হবে। কাঠশীতে মাথা কুটে মরে ভোর। সারাটা পথ আচ্ছন্নের মতো কাটে। ঘুড্ডি... স্বপ্ন... এইসব গল্প শুনে যুবক বলেছিল, আমি অপেক্ষা করে আজীবন জিতে এসেছি। ঘুরে আস দশপাক, তিন হাতের স্পর্শই না হয় নিলে শরীরে, শরীর কি সব! চারু, নষ্ট হয়ে যায় পাক খেলে ? ক্লান্ত হয়ে ঠিক যাতে বসতে পার আমার দুই আঁজলার নিচে, ছটফট না করে তারই জন্য না হয় বছর বছর দাঁড়িয়ে থাকি!
চারুবালা বলে, কেউ বলে আমার চোখ সুন্দর, এইতো কাল একজন বলল, এত সুন্দরের ভার আমি কী করে বইছি ? যুবক চেয়ে থাকে। সলজ্জ চারুবালা প্রশ্ন করে কী দেখছ গো অমন করে ? যুবকের চোখে ঘোর, দেখছি, সবাই যা বলে তা ঠিক কি-না!
ধেৎ! চারুবালা হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসে।
এ-ও কি তোমার অন্তরের তলা থেকে উৎসারিত ? এই মহানতা প্রেম মোহের বড়ো শত্র“, যুবক তুমিও জান। কে কখন আমার রূপের প্রশংসা করলো, আমার ফোন কার সান্নিধ্যে তখন ব্যস্ত থাকে, এটা জানতে চাওয়ার মুর্হুমুহ চাপা ঈর্ষায় যখন তুমি এক বিন্দু ব্যক্তিত্ব না খুইয়ে ছটফট কর, তখন নিজেকে ঢাকতে কেন এই মহানুভবতার শব্দ খেলা ? চারুবালা ভাবে, তুমি কি জান না তোমার উদারতা আমার রোমাঞ্চিত শরীরকে নিঃসাড় করে তোলে ? তবে পরাজিতরাই কি নিজেকে জয়ের মুখোশে ঢেকে ? চারুবালা যুবকের বাড়িতে নক করে।
দরজা খুলে প্রৌঢ়া চারুবালার চোখে কী যেন দেখে ঘুমন্ত যুবকটির ঘরের পর্দা সরিয়ে ভেতর দিকে হাঁটতে থাকেন। কোট খুলে স্লিভলেস চারুবালা নিজেকে ঢুকিয়ে দেয় যুবকের কম্বলের ওমে!
চমকে যুবক দেখে, মুখের ওপর চারু নয় সাপের ফণা ঝুলছে। বিমূঢ় বিস্ময় ঢেকুর তুলে সে হতাশ কণ্ঠে বলে চারুবালা, আমার শরীর মরে গেছে। দু’বাহু ওপরে তুলে আরও আরও নগ্ন চারু নান্দনিক কায়দায় ঢেউ খায়... মোহগ্রস্ত যুবক ওর খোঁপা থেকে শঙ্খকাঁটা খুলে ফেলে।
চারুবালা চলে যায় নগরের বাইরে, ন্যূনতম এক মাসের জন্য, ইজেল আর শিট ভর্তি করে কাশফুল নিয়ে আসবে। প্রৌঢ়ার ভেতর চলছিল তখন, যখন চারুবালার ফেনিয়ে উঠতে থাকা বিচ্ছুরিত আলোকণার শব্দ এপাশেও আসছিল, পাপবোধের সঙ্গে সন্তানের প্রতি মমতার যুদ্ধ। হা পুত্র! শান্ত হ! কতকাল আনন্দ কী জিনিস ভুলে গেছিস...! কিছুই শুনছি না আমি, প্রৌঢ়া তখন ভাবছিলেন, চারুবালা আসে নি বাড়িতে, ছিটকিনি খোলা হয় নি... প্রৌঢ়া জবুথবু হেঁটে রান্না ঘরে গিয়ে কইয়ের ঝোলের লবণ জিহ্বায় চাখেন। এদিকে সারারাত নগর চষে বেড়ানো যুবক কী এক কঠিন ব্যথায় অসাড় দেহে বিছানায় পড়ে থাকে চব্বিশ ঘণ্টা... চারুবালাকে সে ইস্টিশনে পৌঁছে দিয়েছে, বড় বেশি তরঙ্গের সঙ্গে মায়ার মিশ্রণ ওর মুঠোতেÑ ট্রেন ছেড়ে দিলে চারুবালা হাত নেড়ে বলেছে, অপেক্ষা কর, আমি তোমার জন্যই আসব।
আঙুল এখন নাভিচাঁদে। সত্যিই সব স্মৃতি আড়াল করে দাঁড়িয়েছে সেই ভোর। উঠতি যৌবনের নেশা তো কুঁজো নারীর বিকট শরীরেও তরঙ্গিত হয়, তার মধ্যে রাজকন্যা এখন যখন দিন গড়ান যুবক স্ত্রীর স্বাভাবিক শয্যায় প্রাকৃতিক জল ছেড়ে দিয়ে নিঃসাড় হওয়াটাকে সঙ্গমের রূপ নিয়েছে, সেই মিলনকে কি তুমুল ভুল বুঝে ঈর্ষায় খাক হয়ে সেখানে তাকে ভেঙেচুড়ে একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়ে তৈরি করার মতোই নিজ সম্মুখে দাঁড় করিয়েছে চারুবালা, আর ওর নেশা অথবা বিহ্বলতা কিংবা আচ্ছন্নতার মধ্যে পাক খেয়ে উঠতে থাকা দেহমনের অপ্রকাশ আকাঙক্ষার মুখে সে-ও জীবনের প্রথম পরত পরত কারও ভাঁজ খুলেছে, চোখের পাপড়ি থেকে নখের ডগা পর্যন্ত বিন্দু বিন্দু মিহি চুমু খেয়ে সব শেষে দস্যু হয়েছে।
চারু... চারু চলো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাই... এক্কেবারে ট্রেসলেস... তুমি পৃথিবীর ক্যানভাসে ছবি আঁকবে আর আমি দেখতে থাকবো প্রতিদিন শিল্প হয়ে ওঠা শিল্পীর এক ফালি ওড়নায় ঢাকা নগ্ন শরীরের বহুমাত্রিক মোচড়Ñ। চারুবালার ট্রেন ছেড়ে দিলে আবার সেই অশরীরী ভয়, চারুর মুখে ‘পুরুষের নারী শরীর’ জয়ের তৃপ্তি। যখন সে ঘন ঘন চারুবালাকে শয্যায়, সান্নিধ্যে পাওয়ার তৃষ্ণায় ছটফট... তখন চারুবালাকে দেখে মনে হচ্ছে, ওই একটি বেলার উত্তাপই ওর কাম্য ছিল।
যুবকের অন্তরাত্মায় মিহিক্রন্দন কি করিলে বলো পাইবো তোমারে, রাখিবো আঁখিতে আঁখিতে, এতো প্রেম আমি কোথায় পাবো নাথ তোমারে হৃদয়ে রাখিতে। হায়! যে যায়, সে সব ফেলেই যায়। তার সামনে নতুন বিষয়, নতুন কষ্ট, আনন্দের পৃথিবী। যাকে ফেলে যায়, রোম রোম স্মৃতির ভাঁজে পড়ে থাকা তার পৃথিবীটা কী ভয়াল এক চতুষ্কোণ কক্ষ!
হুস্স্... চারুবালা হাততালি দিয়ে উড়িয়ে দেয়া চড়ুই। ব্রহ্মপুত্রের কুয়াশা জলের ওপর বাতাসের ঝাপটা ক্যানভাস ভিজিয়ে দেয়। রংতুলি ফেলে কাশবনে শুয়ে থাকে চারু... ফিনফিনে মেঘের সঙ্গে উড়ে যায় কাশের ডগা... বাতাসের কুণ্ডুলিতে কাশডাঁটা উদোম শরীর দোলায়... কখনও যুবককে নিচে, কখনও নিচে চারুবালা... ভস্ম হতে থাকা দুটি... পাখি, কাল সন্ধ্যায় তুমি কাঁদছিলে কেন ? হেই হেই মেঘ... আমিও কশকন্যা... বুকের মধ্যে ধারাবাহিক ক্ষরণ...পরদিন খুব ভোরে আবার গিয়েছিল সে শুধুই প্রৌঢ়ার সঙ্গে দেখা করতে। দরজা খুলেছে এক অচেনা নারী! কী শীতল তার চোখ! যুবক, কেন তোমাকে জাগাতে এতো সেদিন আমার লীলা ? মহিলাকে দেখে চারুর নতুন অনুভব, কেন আমার খাঁজকাটা দেহের বিচ্ছুরিত আগুন দেখামাত্র কখনই তুমি জ্বলে ওঠো নি ? তবে কি যুবক এই সত্য ছিলো, অন্ধকারে তুমি যে তুমুল মাংসস্তূপে ডুবে জেগে উঠতে, তোমার সেই অভ্যাস সত্তা আমার দেহটাকে দর্শনীয় স্থান হিসেবেই দেখতে চেয়েছিল কেবল ?
হায় ! ভারসাম্যহীন স্ফীত যৌবনের কাছে কি চরমভাবেই না পরাস্ত হচ্ছিলো আমার কামার্ত সুন্দর, যদিনা আমি সে-ই ভোরেÑ। ভেতরে কুঁকড়ে ওঠা চারুবালা অঢেল অঢেল কাশফুলের একটা ডগায় চোখ রেখে বিমূঢ় একটি ডগায় দুটি যমজ কাশফুল। সেই দিন প্রৌঢ়ার উচ্ছল কোলেও দোল খাচ্ছিল দুটি শিশু... অমল, ধবল! চারুকে দেখাতেই কি-না, সেই নারী দুই পাহাড় স্তন খুলে দু’শিশুর মুখে তুলে দিয়েছিল!
মাথার ওপর দিয়ে কী উড়ে যায় ? খঞ্জনপক্ষী ? অসহ্য যন্ত্রণার ভারে চারুবালা অসাড় পড়ে থাকে কাশবনে। শেষ রাত্রির রক্তমাংস আহার করে দিন... পাশে জলের সঙ্গে শিশিরের লিরিক... ক্যানভাসে শিশিরের ফলা ঘাই খেয়ে চলে যায় দূরবর্তী পথে।
যুবক এলোমেলো ঘুরে কেবল নিজের কাছ থেকে পালাতে চায়। সে টের পায়, জীবনের প্রথম তার একটি পা শক্ত লোহার বেড়ি দিয়ে এঁটে গেছে কেউ। একমাত্র সে এসে না খুলে দিলে এই মৃত্যু যন্ত্রণার নিষ্কৃতি নেই। আর প্রৌঢ়া বয়সের ভারে কাঁপতে কাঁপতে কুণ্ডুলী পাকিয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে যুবককে বলেন, বেশি রাত হলে... টেবিলে খাবার দেয়াই থাকবে।
যুবকের স্ত্রীর শীতল চোখ দুটো খুলে নিয়ে যায় ব্রহ্মের জল। সময়ের সাথে সাথে চারুবালার চেতনায় ঝাপসা হতে থাকে নগরের ছায়া। না যুবক... না প্রৌঢ়া... কিচ্ছু তার মধ্যে তরঙ্গ তোলে না। কেবল যুবকের উচ্চারিত সেই প্রশ্ন পাখি সেদিন রাতে কাঁদছিলে কেন ? এই প্রশ্নের বিষ তাকে কুণ্ডুলীর মধ্যে পেঁচাতে থাকে। এই প্রথম দু’বছর সংসার করা মানুষটির চলে যেতে থাকা অবয়ব মনে করে নিঃসাড় পড়ে থাকা চারুবালা কেঁদে কেঁদে কাশবন ভিজিয়ে ফেলে।
কৃষ্ণপুঞ্জ মেঘ আসমানে। চারপাশে কাশের সঙ্গে বাতাস-কাস্তের শ্বেতাভ সঙ্গম! কুয়াশা ভিজে কঠিন হয়ে ওঠা ডাঁটার মতো চারুর দুই পা। মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ইজেল, সান্ধ্য আসমান রঙিন হচ্ছে ক্রমশ। যেন যুবক ছেনি হাতে খুঁড়তে থাকে চারুবালার আত্মা, ঝাঁক ঝাঁক কাশফুল সরিয়ে সে দেখতে চায় ভেতরে কী আছে। মাস যায়। মাটিতে গেঁথে যাচ্ছে ক্রমশ চারুবালার দেহের আঁটি। বাতাসের ঝাঁকানিতে তার শাদা চুল ওড়ে, পাগলের মতো... তার বুকের ওপর পড়ে থাকে যমজ কাশফুল।
ঝাঁক বেঁধে আসে পাখিরা, যারা এতদিন একজন মানুষকে দেখে বহু দূর পালিয়েছিল।
নাসরীন জাহান
No comments:
Post a Comment