Saturday, March 14, 2026

প্রেম ভালোবাসা কত ঠুনকো ( অভিজ্ঞতা)

 


আমার আর মোল্লার প্রেম ছিলো একদিনের।

আমি গিয়েছিলাম খালার বাড়ি, আর সে এসেছিলো তার মামার বাড়ি। আর সেখানেই সে সারাদিন আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিলো। আর আমিও সেই লুকিয়ে দেখায় সাড়া দিয়েছিলাম।

তার পরদিন আমি বাড়ি চলে গিয়েছিলাম, আর সে আমার পিছু নিয়েছিলো। আর তার এক সপ্তাহ পরে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো।

দেখা হওয়ার ঠিক পনেরদিনের মাথায় আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।

তখন অনেকেই বলেছিলো, আমাদের যেন স্বপ্নের মতো বিয়ে হয়ে গেল, দুজন দুজনকে পছন্দ করেছি আমরা খুব সুখী হবো।

বিয়ের পরেও আমি ছয়মাস বাবার বাড়িতে ছিলাম। আমাকে তুলে আনেনি। শুধু মোল্লা যাতায়াত করতো।

কোনো কোনোদিন সে এক সপ্তাহ পর যেত আমাদের বাড়ি। আবার কখনও দুই সপ্তাহ পরে।

সেই সময়ে আমাদের কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিলো না। কে কাকে কতটা মিস করছি সেটা বলা হতো না।

ওই ছয়মাসে আমি কমপক্ষে একশোটা চিঠি লিখেছিলাম। কিন্তু একটা চিঠিও তাকে পাঠাইনি। আমার লেখা চিঠি আমি নিজেই পড়তাম।

আমি তখন খুব ভালো চিঠি লিখতে পারতাম। আমার লেখা চিঠি আমারই খুব পছন্দ হতো। আমি চিঠির সম্বোধনে লিখতাম, কুহেলির কুহকিনী।

যে সপ্তাহ সে আসতো না, আমি আমার ছোট ভাইবোনদের দিয়ে গোপনে সেই আধকিলো দুরে ভাঙ্গা ব্রিজে পাঠিয়ে দিতাম সে আসছে নাকি এটা দেখতে।

ওরা যেদিন দৌড়ে এসে বলতো, দুলাভাই আসছে, আমার হার্টবিট বেড়ে যেত। উচ্ছ্বাস লুকিয়ে রাখতে পারতাম না।

আমি যখন তাকে খুব বেশি মিস করতাম, তার একটা গায়ের পাঞ্জাবি ছিলো আমাদের বাসায় আমি সেটা গন্ধ শুঁকতাম। সেটাতে তার গায়ের গন্ধ পাওয়া যেত।

তারপর শ্বশুর বাড়ি গেলাম। পাঁচ ছয় বছরের মধ্যেই চারটে সন্তান জন্ম দিলাম। জীবনের নানা টানাপোড়েন ঝগড়া অশান্তি মোল্লার বহুগামিতার অসুখ সবকিছু মিলিয়ে আমার মনটা বিষিয়ে উঠলো।

আর তখন আস্তে আস্তে মোল্লার যৌনশক্তিও তখন থেকে কমতে শুরু করেছে। হয়ত আগেও কম ছিলো, কিন্তু আমার বয়স কম আর ব্যস্ততার কারণে খেয়াল করিনি। কিংবা সেক্সের ব্যাপারে আমার কোনও ধারণা ছিলো না। আমি এই জিনিসটা কখনও তার সাথে উপভোগ করিনি।

সে যখন যতটুকু করতো জোর করে। কখনও আমাকে খাটের স্ট্যান্ডের সাথে শাড়ির আঁচল দিয়ে বেঁধে করতো, কখনও দুইহাত একসাথে করে বেঁধে মুখে বালিস চাপা দিয়ে করতো, নাহয় হাত খোলা থাকলে আমি তাকে খামচাতাম, নয়তো চিৎকার করতাম।

এইসব নিয়ে আমি যখন খুব ডিপ্রেশনে ছিলাম তখন আমি মোবাইলে এক ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করি, তার সাথে গল্প করতাম, আমার কষ্টের কথা গুলো তাকে শেয়ার করতাম।

কিন্তু এটা আবার আমি নিজেই মোল্লাকে বলে দেই- কারণ তখন মনে হতো এটা মোল্লাকে না জানালে বুঝি তার সাথে প্রতারণা করা হবে। আমি তো ওই ছেলের সাথে প্রেম করছি না। আমরা শুধুই বন্ধু।

কিন্তু এটা জানার পরে জীবনে আরও বেশি দুঃখ নেমে এলো। সে সহজভাবে এটা নিতে পারলো না। আমার জীবনে ঝড় নেমে এলো। কালবৈশেখীর ঝড়।

আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে চলে গেলাম বাবার বাড়ি, সেখান থেকে ঢাকায়।

দু জায়গা মিলে থেকেছিলাম মাস দেড়েকের মতো। তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম নারীজীবন কি জিনিস। আমার তিনটা বাচ্চা নিয়ে এতবেশি ভয় পেয়ে গিয়েছিলো, সবাই প্রকাশ্য আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিলো।

তারপর একদিন অতিষ্ঠ হয়ে সেই মোল্লাকেই খবর দিলাম যেন সে এসে আমাকে নিয়ে যায়।

আমি গেলাম, কিন্তু শ্বশুর বাড়িরা আর আমায় মেনে নেবে না। ঘরে উঠতে দেবে না। অনেক অশান্তি করলো তারা, আমাদের ঘরের বাইরে থেকে সারারাত তালা দিয়ে আটকে রেখেছিলো।

তবু সেই এতসব গন্ডগোলের মাঝেও আমি যখন মোল্লার একটা হাতের উপর মাথা দিয়ে শুয়েছিলাম, তখন আমার কি শান্তি লেগেছিলো। মনে হয়েছিলো আমি যেন আমার নিরাপদ আশ্রয় ফিরে পেয়েছি।

আমি তখন ফিসফিস করে মোল্লার চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম, পৃথিবীতে এটাই একমাত্র আমার নিরাপদ জায়গা। আমার কথা শুনে সেও খুব খুশি হয়েছিলো।

কিন্তু তার কিছুদিন পর থেকেই দেখি তাকে আমার বিরক্ত লাগতে শুরু হয়েছে। তাকে আমি এড়িয়ে চলি। সেক্স করতে চাইলে নানান বাহানা করি। রাতে ঘুমাতে যাই দেরি করে।

এমন করতে করতে বিষয়টা এমন হয়ে গেল, দেখি সে যদি কখনও আমার শরীরে হাত দেয় আমি চিৎকার করে উঠি। তাকে গালাগালি করে উঠি। সে আমাকে ভয় পেতে থাকে। আমাকে খুব একটা বেশি ঘাটায় না। আমার মন জুগিয়ে চলার চেষ্টা করে। কিন্তু আমার মন আর নরম হয় না।

তারপর আমি ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় আসার মূলত একটাই উদ্দেশ্য ছিলো খাওয়া পরার ব্যবস্থা হলেই আমি তাকে তালাক দেব। তাকে আর আমি সহ্য করতে পারি না।

কিন্তু সেটা হয় না। জীবনের বাস্তবতা অনেক কঠিন। একজন অশিক্ষিত নারীর তিনজন সন্তানের ভরণপোষনের সামর্থ্য হয় না, তাকে তার  স্বামীর সহযোগীতা নিয়েই চলতে হয়।

অথচ জীবনের এমন একটা পর্যায়ে এসে দাড়িয়েছি, যেই মানুষটার এক সময়ে আমি জামার গন্ধ শুঁকে গায়ের ঘ্রাণ নিতাম। আজ সেই মানুষটার গায়ের জামা আমার হাত দিয়ে ধরতে অস্বস্তি লাগে। আর এই অস্বস্তির কারণে আমি আর তার কোনও কাপড়চোপড় ধুয়ে দেই না। সে যে বাথরুম ব্যবহার করে সেই বাথরুমে আমি কখনও যেতে পারি না। তার বাথরুম কখনও পরিস্কার করে দেই না। তার বিছানা কখনও ঠিক করে দেই না।

আর মাঝে মাঝে চিন্তা করি প্রেম ভালোবাসা কত ঠুনকো একটা জিনিস, আর কত কম সময়ের জন্য মানুষের জীবনে আসে। আর এই ঠুনকো প্রেম ভালোবাসা নিয়ে আমরা জীবনে কত বড় বড় সিদ্ধান্ত নেই, কত ভুল করি।



Khadiza Haque






No comments:

Post a Comment