Saturday, August 1, 2026

কুমড়োর ছক্কা

 


বর্ষাকালে রাঁধুনিদের খুব কষ্ট।  বাজার যাওয়ার পুরো রাস্তা কাদাতে ভর্তি।  বাজারের সৌন্দর্য নষ্ট।  চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি বৃষ্টির জমা জলে পিঁয়াজের খোসা যত্রতত্র ভেসে বেড়াচ্ছে। কমলার আনা কই , ল্যাটা মহানন্দে ডিগবাজি খেয়ে জমা জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে ড্রেনের ভিতরে মুক্তি খুঁজতে যাচ্ছে।  ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে মুক্তি মাসিমার সামনের ঝুড়িতে রাখা হাঁসের ডিমের গায়ের ময়লা সাফ হয়ে ঝকঝকে হয়ে গেছে।  কদমফুলের পাপড়ি কাদার সঙ্গে মিশে গিয়ে কী যে একটা আনরোমান্টিক ব্যাপার ঘটাচ্ছে.... বলে বোঝানো যাবে না।

বৃষ্টিতে সবজির দর চড়েছে । বেশি দামে সবজি কিনেও লাভ হচ্ছে না। জলে ড্যাবডেবে সবজি দুদিনের মধ্যেই পচে যাচ্ছে।

রিমঝিম গিরে শাওনে একমাত্র ভরসা ঘরে মজুত করে রাখা বড়ি,পাঁপড়, পোস্ত, নানারকমের ডাল ইত্যাদি।

গ্রামের গেরস্ত বাড়িতে বেশ কয়েকটি মিষ্টি কুমড়ো রাখা থাকত ভাঁড়ারঘরে অথবা চৌকির তলায়।  বর্ষার কথা ভেবেই পাকা কুমড়ো মজুত থাকত। নিজের ক্ষেতের চাষ করা কুমড়ো অথবা বাড়ির চালে হওয়া কুমড়ো... সব কটিই খেয়ে ফেলা হতো না। জমির কুমড়ো হাটে বিক্রি করে দেয়া হতো। ট্যারাব্যাঁকা এবং আধপাকা কুমড়োগুলোকে ঘরে নিজেদের খাওয়ার জন্য যত্ন করে রেখে দেওয়া হতো। তবে ইঁদুরের নজর পড়লে রক্ষে ছিল না।

ইঁদুরে খুবলানো কুমড়ো কিছুটা বাদ দিয়ে দু তিনদিনের মধ্যে খেয়ে ফেলতে হতো।

যাদের ক্ষেতে বা ঘরের চালে কুমড়ো ফলত না,তাদের জন্য ছিল গাদামারা হাট।  হাটের দিন সকালবেলায় সেখানে কুমড়োর পর্বত গজিয়ে উঠত। ভীষণ সস্তা। অনেকগুলো কিনে এনে ঘরে মজুত করে রাখলে অবরেসবরে খাওয়া যেত। কুমড়ো এমন একটা সবজি.... সবের সঙ্গে খাওয়া যায়। প্রাকৃতিক চিনি।  যেকোনও সবজিতে একটু কুমড়ো দিলে তরকারিটা দারুণ মজে।

শ্রাবণমাসে যখন দু চারদিন ধরে একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে যেত,তখন কুমড়ো কাটা হতো। এক একটা কুমড়ো যেন কুমড়োপটাশ। কী সাইজ! বাড়িতে বট্ ঠাকুর না থাকলে সে কুমড়ো অর্ধচন্দ্রাকারে কাটা বিশাল ঝকমারি।  গৃহিণীরাই সেই কুমড়ো কষ্টেসৃষ্টে কাটতেন।

প্রতিবেশীরা কুমড়োর ভাগ পেত । পাড়ায় সেদিন কুমড়ো - উৎসব। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। 

কুমড়োর পাতলা পিস কেটে বেসন আর চালের গোলায় ডুবিয়ে ছাঁকা তেলে ভেজে খাওয়া হতো বর্ষার দিনে। পাঁচমিশালি তরকারিতে ডুমো ডুমো করে কুমড়ো কেটে দিলে ভাত রুটি ..... দুই ই দিয়ে চমৎকার খাওয়া যেত।  

বড় বড় টুকরো করে কাটা কুমড়োর সঙ্গে মাংস রান্না করলে সেটা একটা বিশেষ পদ হয়ে উঠত। তবে কষানোর সময় মশলার সঙ্গে আমের আচার না দিতে পারলে এই রান্না না করাই ভালো। কুমড়োর হালুয়া, কুমড়োর টক বানালে সেটাও বর্ষাদিনে রেখে রেখে খাওয়া যায়।

আর কুমড়োর ছক্কা.... সেটা ছাড়া তো কুমড়োর কুমড়োত্ব অসম্পূর্ণ।

কুমড়োর একটি শ্রেষ্ঠ নিরামিষ রান্না। আলু,কুমড়ো ডুমো ডুমো করে কেটে আলাদা আলাদা করে ভেজে নিতে হবে। সর্ষের তেল গরম হলে পাঁচফোড়ন, শুকনোলঙ্কা,তেজপাতা হিং পড়বে তেলে। তারপর ভেজানো ছোলা,আদা,কাঁচালঙ্কা, জিরেবাটা,অল্প নারকেল কোরা ভালো করে কষিয়ে নিয়ে আলু,কুমড়ো দিয়ে অল্প জল দিতে হবে। এর মধ্যে ধনে গুঁড়ো,হলুদগুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো,নুন,মিষ্টি দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢাকনা এঁটে দিলে ভালো হয়। আর একটু জল দিয়ে ফুটিয়ে নিয়ে ভাজা মশলা এবং চেরা কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিতে হবে। ভাজা মশলার মধ্যে থাকবে গোটা জিরে,মৌরি,গোটা ধনে এবং শুকনোলঙ্কা। তাওয়ায় সেঁকে গুঁড়িয়ে নিয়ে কুমড়োর মধ্যে ছড়িয়ে দিলেই হবে।


Sabina Yasmin Rinku

No comments:

Post a Comment