Friday, July 31, 2026

Potato Pancakes with Edamame and Ham

 


Ingredients (Serves 2)

Potatoes: 2 (250–300g)


[A] Consommé granules: 1/2 tsp


[A] Salt: 1/5 tsp


[A] Pepper: To taste


[B] Loin ham (cut into 1cm cubes): 3 slices


[B] Shelled edamame: 30g


[B] Pizza cheese (shredded cheese): 20g


[B] Potato starch: 2 tbsp


Butter: 10g


Instructions


① Peel the potatoes and cut them into bite-sized pieces. Place them in a heat-resistant bowl, cover loosely with plastic wrap, and microwave at 600W for 4 1/2 minutes.


② While the potatoes are still hot, add [A] and mash them using a fork or similar tool.


③ Once the mixture has cooled slightly, add [B] and mix well. Divide into 6 portions and shape each into a ball.


④ Heat the butter in a frying pan over medium heat and arrange the potato balls in the pan. Cook until both sides are nicely browned and heated through to the center—then it's ready to serve!

Monday, July 27, 2026

আমার কৈফিয়ৎ

 

-
আমার সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে দুটো বিষয় নিয়ে অনেক পাঠক মন্তব্য এবং মেসেঞ্জারে কৈফিয়ত চেয়েছেন। একটি হলো, আমি কেন বলছি বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া ইয়াহিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো, এটা আমি কেন বলেছি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ক্যাডেট কলেজগুলো বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী—এটা আমি কেন বলেছি।
প্রথমেই বলে রাখি, যারা এইসব প্রশ্ন করছেন তারা শয়তানবাদের প্রভাবে প্রবেশ করেছেন। শয়তান তাদেরই প্রভাবিত করে, যাদের মন সবসময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে এবং যাদের সুন্দর করে পরিবেশন করে যেকোনো কিছু বিশ্বাস করানো যায়। এরাই কোনো দল, মত বা ধর্মের সবচেয়ে বড় সমর্থক হয়ে ওঠে যখন তারা দেখে সেই দল, মত বা ধর্ম ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসবে। কিন্তু যখন সেই দল, মত বা ধর্ম বিপদে পড়ে, তারাই প্রথম কেটে পড়ে এবং নিজ স্বার্থ ও পাওনাটাকে প্রাধান্য দিয়ে অন্য দল বা সংস্কারপন্থী হয়ে যায়।
এদের চেনার উপায় হলো, সুসময়ে এরা নেতার চেয়েও বড় নেতা, নবীর চেয়েও বড় মুসলমান-এ পরিণত হয়। তার চেয়েও বড় বিপজ্জনক হলো, এরা সত্য যারা বলে তাদের হত্যা করতে চায়। ফরাসি আলজেরীয় লেখক আলবেয়ার কাম্যু যেমন বলেছেন, ইতিহাসে এমন সময় আসে—দুই যোগ দুই চার যারা বলে, তাদের হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া ইয়াহিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ যে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো, এটা তো আমি বলিনি, এটা বলে গেছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু, যেটা সেই ১৯৭২ সালে নিউজউইক পত্রিকাকে তিনি তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন। যেটি পুনঃপ্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ সংখ্যায়। যে পোস্টটি এখনও নিউইয়র্ক টাইমসের ওয়েবসাইটে আছে। মনে রাখতে হবে, এটি প্রকাশিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সেই ক্ষতবিক্ষত সময়ে, ৩০ লক্ষ প্রাণ হারানোর স্মৃতি যখন সবার মনে জলন্ত আগুনের মতো জাগ্রত। সত্য না হলে এটি কোনোভাবেই প্রকাশিত হতো না। নিউইয়র্ক টাইমস ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ সংখ্যার সেই রিপোর্টটি:
"মুজিবের বক্তব্য: ইয়াহিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ভেস্তে দিয়েছিলেন ভুট্টো"
১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২
"শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ করেছেন যে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যে আদেশ হয়েছিল, তা জুলফিকার আলী ভুট্টোর হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হয়। ভুট্টো তাঁকে এমন একটি কারাগার থেকে গোপনে বের করে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে তিনি দীর্ঘ নয় মাস একাকী বন্দী ছিলেন। সেই সময় পর্যন্ত ভুট্টো জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে সরিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেননি।
ঢাকায় ফিরে আসার পর তিনি নিউজউইক পত্রিকাকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন—এটি ছিল তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকার—সেখানে সদ্য ঘোষিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বন্দিজীবনের দুর্ভোগের বর্ণনা দেন। তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁর বিচারকে “একটি প্রহসন” বলে অভিহিত করেন এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ থেকে শেষ মুহূর্তে তাঁর রক্ষা পাওয়ার ঘটনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
শেখ মুজিবকে উদ্ধৃত করে বলা হয়:
“যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং ভুট্টো ক্ষমতায় আসছেন, তখন ইয়াহিয়া বলেছিলেন যে তিনি বাংলার পতনের দিনই শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দিতে চান।”
তিনি আরও বলেন:
“এক রাতে, ভুট্টো ইয়াহিয়াকে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও, কারাগারের ভেতরেই আমাকে হত্যা করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ভুট্টো আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সুপারকে আমাকে সেখান থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা করতে বলেন।”
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে বাঙালি সংস্কৃতি ও আওয়ামী-ভারতবিরোধী ছিল, এটা বলে গেছেন স্বয়ং জিয়াউর রহমান তাঁর “একটি জাতির জন্ম” প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের লেখা হিসাবে প্রথম প্রকাশিত হয়। ২৬ মার্চ, ১৯৭৪ তারিখে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হয়।
সেই প্রবন্ধে পাকিস্তানের সেনা প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলো সম্পর্কে জিয়াউর রহমান লেখেন:
“আমাদের ওরা দাবিয়ে রাখতো, অবহেলা করতো, অসম্মান করতো। দক্ষ ও যোগ্য বাঙালি অফিসার আর সৈনিকদের ভাগ্যে জুটতো না কোনো স্বীকৃতি বা পারিতোষিক। জুটতো শুধু অবহেলা আর অবজ্ঞা। আখ্যায়িত করতো আমাদের আওয়ামী লীগের দালাল বলে। একাডেমির ক্লাসগুলোতেও সব সময় বোঝানো হতো, আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতের দালাল। পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করতেই আওয়ামী লীগ সচেষ্ট। এমনকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।”
তিনি আরও লিখেছেন:
“সামরিক একাডেমিতে থাকাকালে আমি সম্মুখীন হয়েছি শুধু নিকৃষ্ট অভিজ্ঞতার। সেখানে দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের প্রতি পাকিস্তানিদের একই অজ্ঞতার ঐতিহ্যবাহী প্রতিচ্ছবি। অবৈধ উপায়ে পাকিস্তানিদের দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের কোনঠাসা করতে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন যেমন, আমি যখন শিক্ষক হলাম তখনো তেমনিভাবেই বাঙালি ক্যাডেটদের ভাগ্যে জুটতো শুধু অবহেলা, অবজ্ঞা আর ঘৃণা। আন্তঃসার্ভিস নির্বাচনী বোর্ডে গ্রহণ করা হতো নিম্নমানের বাঙালি ছেলেদের, ভালো ছেলেদের নেওয়া হতো না ক্যাডেটরূপে। রাজনৈতিক মতাদর্শ আর দরিদ্র পরিবারের নামে প্রত্যাখ্যান করা হতো তাদের। এর সবকিছুই আমাকে ব্যথিত করতো।”
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজগুলো সামরিক ক্যাডেট তৈরির লক্ষ্যেই তৈরি। সেনা প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলোতে যে মানসিকতা প্রচার হয়, সেগুলোই যে আরও অল্প বয়স থেকে ক্যাডেট কলেজগুলোতে প্রয়োগ করা হবে, সেটা শিশু বা পাগল না হলে সহজেই বোঝার কথা। ক্যাডেট কলেজগুলো যে টোটাল ইনস্টিটিউশন এবং সেগুলো যে ইঙ্গ-মার্কিন সেনা এলিট মানসিকতা তৈরির একটি মগজধোলাই কেন্দ্র, সেটা আমি আগেই লিখেছি। এবং পাকিস্তানে সেনাশাসন আসার পর স্থানীয় সংস্কৃতির রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ঘৃণা তৈরিই যে তাদের মার্কিন স্থানীয় সংস্কৃতি উৎপাটন মডেলে হয়েছে, সেটাও আমি অন্যত্র লিখেছি। বাংলাদেশ স্বাধীর হবার পর সেটা পরিবর্তনের আগেই ঘটে ১৯৭৫ এর সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও বাংলাদেশকে পুনরায় নতুন নামে পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত করার ঘটনা। ক্যাডেট কলেজগুলো সেই বাঙালী সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তানী মগজধোলাই কেন্দ্র হিসাবেই রয়ে যায় পাক মার্কিন ভূরাজনৈতিক প্রভাবে।
মনোবিদ্যার দৃষ্টিকোন থেকে আলবেয়ার কাম্যু যে সময়ের কথা বলেছেন, সেই সময়গুলোতে দেখা যায় অতিরঞ্জিত আড়ম্বরপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। যারা মনোবিদ্যার কালো ত্রয়ী বা ডার্ক ট্রায়াড সাইকোলজির ব্যক্তিত্ব। বাস্তবতাবোধ হারিয়ে যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার, জিয়াউর রহমানের চেয়েও বড় বিএনপি এবং নবী মুহম্মদের চেয়েও বড় মুসলিম বনে যায়। কোরানে এদের নিয়েই সাবধান করা আছে যারাই হল ভুয়া হাদিসের মুসলমান। যাদের লক্ষ্য সত্যকে হত্যা করা।
সত্য বলা লেখককে ধ্বংস করা, হত্যা করা, তাকে নিঃশেষ করে দেওয়া পৃথিবীতে নতুন নয়। আমার নানা লেখা পড়ে অনেকে আবার মহা চিন্তায় পড়ে গেছেন, আমি আসলে কোন দলের। কেউ ভাবছেন আমি জামাত, কেউ ভাবছেন আমি রাশিয়ান, কেউ ভাবছেন আমি ইরানী, কেউ ভাবছেন আমি সুফি দরবেশ। অনেকে আবার ভাবছেন, আমি হয়তো নেতা হতে চাইছি। সত্য বলা কবি নজরুল “আমার কৈফিয়ৎ” কবিতায় যেন আমার কথাই লিখে গেছেন। কবিতাটি ১৩৩২ সালে ‘বিজলী’ পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরে ৮২ পংক্তির এই কবিতাটি ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করে ১৯২৬ সালে প্রকাশ করা হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের আমার কৈফিয়ৎ কবিতাটি অংশবিশেষ:
“বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,
দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!
---
আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!”
© সিরাজুল হোসেন

Saturday, July 25, 2026

বিবর্তন আমাদের শেখায়,

 


"পরকীয়া অত্যন্ত জরুরি জিনিস” - এই মর্মে একটি ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে জেনেটিক্স ও প্রাণী আচরণের নামে এমন কিছু দাবি করা হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আংশিক ও খণ্ডিত উপস্থাপনা মাত্র।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। “পরকীয়া” মূলত একটি আইনগত ও সামাজিক পরিভাষা, যা বৈধ বিবাহ বা বৈবাহিক চুক্তি ভঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক চুক্তি ভঙ্গকে কখনোই “অত্যন্ত জরুরি জিনিস” বলা যায় না।
হয়তো বক্তা এখানে পরকীয়া বলতে বহুগামিতা (পলিগামি) বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু জিনবিদ্যা বা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান কোথাও বলে না যে বহুগামিতা মানুষের জন্য অপরিহার্য বা সর্বোত্তম প্রজনন কৌশল।
অনেকে দাবি করেন, “বহুগামিতা জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ায়, তাই এটি ভালো” এবং “প্রাণীজগতেও তো এমনটাই দেখা যায়।” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল ও একমাত্রিক নয়। জিনগত বৈচিত্র্য, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানুষের মানসিক দক্ষতা এবং প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য কাজ করে।
প্রথম সমস্যা হলো, মানব সমাজে বহুগামিতা সাধারণত সমানভাবে বিস্তৃত হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা শারীরিকভাবে প্রভাবশালী পুরুষ এবং তুলনামূলকভাবে অধিক আকর্ষণীয় নারীদের মধ্যেই এটি কেন্দ্রীভূত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিক স্বাধীন পশ্চিমা সমাজগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বহু যৌনসঙ্গী থাকার প্রবণতা পুরো জনগোষ্ঠীতে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে না; বরং একটি অপেক্ষাকৃত ছোট অংশের মধ্যেই তা কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে বহুগামিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করে - এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
জিনগত বৈচিত্র্য অবশ্যই একটি প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি নতুন পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন বা নতুন রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অভিযোজনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে তাই বলে বৈচিত্র্য যত বেশি, ততই ভালো - এমন ধারণাও সঠিক নয়। যেমন আত্মীয়দের মধ্যে প্রজননের ফলে ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন যেমন হতে পারে, তেমনি অত্যন্ত দূরবর্তী জিনগত মিশ্রণেও আউটব্রিডিং ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি এখানে ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করে।
প্রাণীজগতে বহুগামিতা যেমন প্রচলিত, তেমনি বহু প্রজাতিতে একগামিতাও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত। উল্লুক, বহু প্রজাতির পাখি এবং কিছু কুকুরজাতীয় প্রাণী দীর্ঘমেয়াদি যুগল-বন্ধন গড়ে তোলে। এটি প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট পরিবেশে একগামিতাও একটি সফল বিবর্তনীয় কৌশল হতে পারে।
মূল বিষয় হলো, জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ানোর জন্য বহুগামিতা একমাত্র বা সর্বোত্তম উপায় নয়। জনসংখ্যার মধ্যে অভিবাসন, জিন-প্রবাহ (gene flow) এবং সময়ে সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃপ্রজননও একই ভূমিকা পালন করে।
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের মিলন কৌশলও একমাত্রিক নয়। মানুষ একটি মিশ্র প্রজনন কৌশল অনুসরণকারী প্রজাতি। পুরুষের ক্ষেত্রে কিছু মাত্রায় বহুগামিতার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ পুরুষের প্রজনন সাফল্যের তারতম্য সাধারণত নারীর তুলনায় বেশি।
মানুষের সন্তানের আছে দীর্ঘতম শিশুকাল। যা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পরিচর্যানির্ভর সন্তান লালন পালনের উদাহরণ। তাকে বড় করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, শিক্ষা ও সম্পদের প্রয়োজন হয়। ফলে পরিবারে পিতার বিনিয়োগও বিবর্তনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই সামাজিক একবিবাহ বা স্থিতিশীল যুগল-বন্ধন একটি শক্তিশালী অভিযোজন হিসেবে গড়ে উঠেছে। অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্রেসিনের মতো যুগল-বন্ধনকারী হরমোন এবং সামাজিক নিয়ম—উভয়ই এই বন্ধনকে শক্তিশালী করে।
প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ভারসাম্য। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত জিনগত বৈচিত্র্য, সংক্রামক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি হ্রাস, সন্তানের কার্যকর লালন-পালন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। শুধু একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্যগুলোকে উপেক্ষা করলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এই কারণেই প্রকৃতিতে কোনো একক প্রজনন কৌশল সর্বজনীনভাবে বিজয়ী নয়। কোথাও বহুগামিতা, কোথাও একগামিতা, আবার কোথাও পরিবেশভেদে নমনীয় কৌশল দেখা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু সমাজে একবিবাহ শুধু নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে নয়, বরং রোগ নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের তুলনামূলক সুষম বণ্টন এবং সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি লালন-পালনের জন্য একটি কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় শুধু জিনগত বৈচিত্র্যই যথেষ্ট নয়। মানুষের শিশুর শৈশব অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক দীর্ঘ। একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে পরিণত হতে প্রায় ১৫–২০ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে সে ভাষা, সহযোগিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিয়ম, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বন্দ্ব মোকাবিলার মতো দক্ষতা মূলত পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেই শেখে। এর কারণ হল মানুষ কগনিটিভ প্রাণী। অর্থাৎ তার বেঁচে থাকায় জিনের সমান গুরুত্বপূর্ণ হল তার চিন্তা ও আচরণগত শিক্ষা যেটা সে দীর্ঘ শিশুকালে শেখে। প্রাণীজগতে উল্লুকেরও আছে মানুষের কাছাকাছি শিশুকাল। এটা আশ্চর্য নয় যে প্রকৃতিতে তারাও একাগামী জীবন যাপন করে।
মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংগ্রামের চেয়ে সামাজিক দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই দক্ষতাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে বিকশিত হয় একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং ধারাবাহিক পারিবারিক পরিবেশে। ঘন ঘন সম্পর্ক পরিবর্তন, পরিবার ভাঙন বা অস্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ এই শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির **অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্ব** অনুযায়ী, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর সঙ্গে প্রধান পরিচর্যাকারীর নিরাপদ ও ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা তার মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। এই নিরাপদ সংযুক্তি থেকেই শিশুর নিরাপত্তাবোধ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক গড়ার সক্ষমতা জন্ম নেয়। এই সম্পর্কের জন্য ধারাবাহিক উপস্থিতি, পরিকল্পিত পরিচর্যা এবং মানসিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে পিতার ভূমিকাও কেবল অর্থনৈতিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা যায়, একজন সক্রিয় ও স্থিতিশীল পিতৃচরিত্র শিশুর আত্মবিশ্বাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা, অধ্যবসায়, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষাগত সাফল্যের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। পিতা অনেক সময় শিশুকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করেন। বিপরীতে, পিতার দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি বা অস্থিতিশীল উপস্থিতি এসব বিকাশকে দুর্বল করতে পারে।
এই কারণেই মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসে সামাজিক একগামিতা বা স্থিতিশীল যুগল-বন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও মানুষের মধ্যে বহুগামিতার জৈবিক প্রবণতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
সবশেষে বলা যায়, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য শুধু জিনগত বৈচিত্র্যই যথেষ্ট নয়। সমানভাবে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা পরবর্তী প্রজন্মকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল, সামাজিকভাবে দক্ষ, সহযোগিতাপূর্ণ এবং প্রতিকূলতার মুখে সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। বিবর্তন আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল কোনো চরমপন্থা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য।

© সিরাজুল হোসেন

Simmered Flounder

 


Ingredients (Serves 2)

Flounder: 2 fillets


Okra: 4 pods


<Seasonings>


Sake: 4 tbsp


Mirin: 2 tbsp


Sugar: 1 tbsp


Soy sauce: 2 tbsp


Water: 100 ml


Ginger: 1 slice (thinly sliced)



[Preparation]


Rinse the flounder and pat dry with paper towels. Rub the okra with salt (not included in the ingredient list), briefly blanch in boiling water, transfer to cold water to cool, and drain.

If the fillets will be served skin-side up, make a shallow cut in the skin.



[Instructions]

1. Combine the <Seasonings> ingredients in a pot and bring to a boil over high heat. Once boiling, add the flounder fillets, ensuring they do not overlap. Place a drop-lid (*otoshibuta*) directly over the fish and simmer over medium heat for 8–10 minutes.


2. Remove the drop-lid and add the okra. Simmer while occasionally spooning the cooking liquid over the fish and okra until the liquid thickens. Turn off the heat and let it sit for a while to allow the flavors to meld before serving.

Baked Bell Peppers with Ham, Egg, and Cheese

 


Ingredients (Serves 2)

3 green bell peppers


2 hard-boiled eggs


[A] 3 slices loin ham (cut into 5mm cubes)


[A] 1 1/2 tbsp mayonnaise


[A] 1/6 tsp salt


[A] Pepper to taste


20g pizza cheese (shredded cheese)


Instructions

① Remove the stems and seeds from the green bell peppers and cut them in half lengthwise.


② Place the hard-boiled eggs in a bowl and mash them with a fork; add [A] and 10g of the pizza cheese, then mix well.


③ Stuff the mixture from step ② into the bell pepper halves from step ①.


④ Arrange the stuffed peppers on a baking sheet lined with aluminum foil and sprinkle with the remaining pizza cheese. Toast in a toaster oven for about 5 minutes, or until the cheese is nicely browned, and it's ready!


Sprinkle with dried parsley if desired before serving.


চিপস মাখানো

 


উপকরণ

  • আলুর চিপস ১ প্যাকেট

  • পেঁয়াজকুচি ২ টেবিল চামচ

  • কাঁচা মরিচকুচি ১-২টি

  • ধনেপাতাকুচি ২ টেবিল চামচ

  • বিট লবণ আধা চা-চামচ

  • ভাজা জিরাগুঁড়া আধা চা-চামচ

  • চাট মসলা আধা চা-চামচ (ঐচ্ছিক)

  • লাল মরিচের গুঁড়া বা চিলি ফ্লেক্স স্বাদমতো

  • লেবুর রস ১-২ চা-চামচ

  • শর্ষের তেল আধা চা-চামচ (ঐচ্ছিক)

  • টমেটোকুচি (বীজ ফেলে)

  • সেদ্ধ ছোলা

    • ভাজা চিনাবাদাম

    • ঝুরা চিজ বা বিভিন্ন ধরনের চিপস

    • প্রণালি

      • একটি বড় বাটিতে পেঁয়াজকুচি, কাঁচা মরিচকুচি, ধনেপাতাকুচি, বিট লবণ, ভাজা জিরাগুঁড়া, চাট মসলা, লাল মরিচের গুঁড়া বা চিলি ফ্লেক্স এবং লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে নিন।

      • চাইলে সামান্য শর্ষের তেল যোগ করুন।

      • এরপর আলুর চিপস দিয়ে খুব আলতো হাতে মাখিয়ে নিন।

      • ইচ্ছা হলে টমেটোকুচি, সেদ্ধ ছোলা, ভাজা চিনাবাদাম, ঝুরা চিজ বা বিভিন্ন ধরনের চিপস যোগ করে আরও মজাদার করতে পারেন।

      • মাখানো হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশন করুন।

সমাজ নারীর নাচে ধ্বংস হয় না।

 


নারী নাচলে সমস্যা। নারী গান গাইলে সমস্যা। নারী শাড়ি পরলে সমস্যা। শাড়ির সঙ্গে সানগ্লাস পরলে সমস্যা। কপালে টিপ পরলে সমস্যা। নারী হাসলে সমস্যা। নারী আনন্দ করলে সমস্যা। অর্থাৎ নারী মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকলেই সমস্যা!

এদেশের একশ্রেণির উগ্র-নির্বোধ জনগোষ্ঠীর মস্তিষ্কে নীতি-নৈতিকতা নামে যে জিনিসটি আছে, সেটি শুধু নারীর পোশাক, শরীর, গান, নাচ ও আনন্দ দেখলেই সক্রিয় হয়। তখন তাদের চেতনা জেগে ওঠে, সংস্কৃতি বিপন্ন হয়ে যায়, সমাজ ধ্বংসের ঘণ্টা বাজতে থাকে!
কিন্তু দুর্নীতি হলে? চুরি হলে? ধর্ষণ হলে? নারী নির্যাতন হলে? যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মারা হলে? বাল্যবিবাহ হলে? ধর্মের নামে ভণ্ডামি হলে? ক্ষমতাবানরা লুটপাট করলে? তখন নৈতিকতার দণ্ড জেগে ওঠে না।
আসলে তাদের সমস্যা নীতি-নৈতিকতা নয়। সমস্যা হলো নারীর স্বাধীনতা। তারা এমন নারী চায়, যে তাদের অনুমতি নিয়ে হাসবে, অনুমতি নিয়ে সাজবে, অনুমতি নিয়ে গান গাইবে, অনুমতি নিয়ে বাইরে যাবে এবং অনুমতি নিয়ে বাঁচবে। নারী নিজের আনন্দের মালিক হবে, এটা তারা মেনে নিতে পারে না।
কারণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখে না। নারী তাদের কাছে কখনো মা, কখনো বোন, কখনো স্ত্রী, কখনো কন্যা, কিন্তু একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে? সেখানে তাদের মস্তিষ্কে শর্ট সার্কিট হয়ে যায়।
একজন নারী নাচছে, একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ সেখানে শিল্প, প্রতিভা ও আনন্দ দেখতে পারে। কিন্তু বিকৃত মানসিকতার নির্বোধ জনগোষ্ঠী সেখানে শুধু শরীর দেখে। তারপর নিজেদের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির দায়ও নারীর ওপর চাপিয়ে বলে– “নারী এমন পোশাক পরেছে কেন?” এটা অনেকটা নিজের ক্ষুধার জন্য খাবারকে দোষ দেওয়ার মতো।
তুমি একজন নারীকে দেখে কী ভাববে, সেটা তোমার মস্তিষ্কের সমস্যা, নারীর পোশাকের নয়।
একজন নারী গান গাইলে সমাজ ধ্বংস হয় না। একজন নারী নাচলে সভ্যতা শেষ হয়ে যায় না। একজন নারী টিপ পরলে সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যায় না। সমাজ ধ্বংস হয় অজ্ঞতায়, দুর্নীতিতে, অন্যায় বিচারে, সহিংসতায়, বৈষম্যে, শিক্ষার অবক্ষয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন। তাই সহজ শত্রু দরকার। আর সেই সহজ শত্রু হলো নারী।
নারী হাসছে? সমাজ শেষ! নারী নাচছে? সংস্কৃতি শেষ! নারী নিজের পোশাক নিজে বেছে নিচ্ছে? সভ্যতা শেষ! অথচ যে সমাজ একটি টিপ, একটি গান, একটি নাচ বা একটি শাড়ি দেখে কেঁপে ওঠে, সেই সমাজের সংস্কৃতি এতোটাই দুর্বল যে, তাকে রক্ষা করার জন্য নারীর স্বাধীনতা ধ্বংস করতে হয়!
উগ্র-নির্বোধ জনগোষ্ঠী সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায় না। এরা নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে চায়। এরা নৈতিকতা রক্ষা করতে চায় না। এরা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা রক্ষা করতে চায়। এরা সমাজ বাঁচাতে চায় না। এরা নিজেদের অস্বস্তি থেকে নারীকে বাঁচতে দিতে চায় না।
একজন নারী কী পরবে, কীভাবে হাসবে, কী গান গাইবে, কীভাবে নাচবে, এগুলো তার স্বাধীনতার বিষয়। তোমার অস্বস্তি তার অপরাধ নয়। তোমার বিকৃত দৃষ্টি তার দায় নয়। তোমার দুর্বল নৈতিকতা সামলানোর দায়িত্ব কোনো নারীর নয়। নারীর আনন্দ দেখে যদি তোমার শরীরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়, তাহলে সমাজ সংস্কারের আগে নিজের মস্তিষ্কটা একটু সংস্কার করো।
কারণ সমাজ নারীর নাচে ধ্বংস হয় না। সমাজ ধ্বংস হয় তখনই, যখন নির্বোধরা নৈতিকতার পাহারাদার সেজে স্বাধীন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

অনিন্দ্য জয়

Friday, July 24, 2026

ব্যবধান

 

আমার আব্বা যেদিন দ্বিতীয় বিয়ে করে আনলেন আমার মা তেড়ে গিয়ে নতুন বউয়ের চুল মুঠি করে ধরলেন। অগ্নিচক্ষু নিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে বললেন, হারামজাদী আমার সংসার খাইতে আইছে।

বাবা কোত্থেকে চিলের মত উড়ে এসে আমার মায়ের গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। ফর্সা গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে গেল। টেনে হিঁচড়ে অন্য ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, এই পাগল মহিলারে ঘর থেইকা বাইর করছে কে?
ঘর থেকে বের করেছিলেন আমার দাদী। দাদী এই কথা বাবার সামনে বললেন না।
আমার মায়ের মাথা খারাপ সুতরাং এই পাগল মহিলা নিয়ে সংসার করা যাবে না ঘোষণা দিয়ে দাদী নতুন ছেলের বউ নিজে পছন্দ করে আনলেন।
আমার মা সব সময় পাগলামি করেন এমন নয়। মাঝে মাঝে দেখে মনে হবে পুরোপুরি সুস্থ মানুষ। ঠিকঠাক খাচ্ছে,রান্না-বান্না করছে, ঘরের সব কাজ একা করছে। আবার কিছু সময় থাকে তখন মন চাইলে সারারাত কেঁদে পার করে, কখনও পুকুরে ডুবে বসে থাকে। কেউ তুলতে গেলে চেঁচিয়ে বলবে, শরীর জ্বালা করতাছে। যাও এইখান থেইকা । আইজ সারাদিন এইখানে থাকমু।
আমার দাদী বসে বসে কপাল চাপড়াতেন আহারে এত সুস্থ সবল বউ হঠাৎ এমন পাগল হয়ে গেল কেন? জ্বিনে ধরেছে এই ঘোষণা দিয়ে বিশু কবিরাজকে আনা হলো। ঝাড়ু পেটা, শুকনা মরিচ নাক দিয়ে ঢুকানো ছাড়া আরও অনেক কারসাজি করা হলো বদ জ্বিনের আছর থেকে মুক্ত করতে। শেষমেশ লাভ কিছুই হলো না।
একদিন মাথায় রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে পাওয়া গেল পুকুর পাড়ে। সবাই বললো জ্বিন আঘাত করেছে। শতবর্ষী পুরনো পুকুর। কথিত আছে সোনার থালা -বাসন পাওয়া যেত এই পুকুরে। কতবার মানুষ জ্বিন দেখেছে এই পুকুরে। এই জ্বিন কোনোমতেই মায়ের ঘাড় থেকে নামবে না তা বুঝে গিয়েছিল সবাই।
দাদী বড় ঘর দেখে বাবাকে নতুন করে বিয়ে করালেন। দাদীর মুখে অফুরন্ত খুশির ঝিলিক। আমার মায়ের মাথা আগের চেয়ে আরও খারাপ হওয়া শুরু করলো। কাছে গেলে হাত কামড়ে ধরতেন,আঘাত করতেন। বাধ্য হয়ে মাকে ঘরে বন্দী করা হলো।
মা জানালা দিয়েই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে মা আমাকে কিছু বলতো না। আঁচলের খুট থেকে দুই/পাঁচ পয়সা আমাকে দিতো।
সুযোগ পেলেই জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বলতো, আমার কাছে একটু আহো মা তোমারে আদর কইরা দেই।
আমি নির্ভয়ে মায়ের কাছে যেতাম।
মা ছাড়া আমার আর কোনো নিরাপদ আশ্রয় ছিল না। দুনিয়ায় থেকে আমিই জাহান্নামে চলে গেলাম। পান থেকে চুন খসলে সৎ মায়ের গালিগালাজ, মারধোর শুরু হয়। বাবার কাছে গিয়ে বানিয়ে বানিয়ে কথা বললেও বাবাও ছাড়তো না। তবে সৎ ভাইটা কেন যেন আমাকে ভীষণ ভালোবাসতো।
আমি হাপুস নয়নে কাঁদলে ও কোত্থেকে আচারের প্যাকেট এনে দিয়ে বলতো, আপা বেশি ব্যথা পাইছো? আমি টলমল চোখে ওর চুলে হাত বুলিয়ে বলতাম, না পাই নাই।
আমার শৈশব কাটলো এই অসুস্থ পরিবেশে। গালি গালাজ,ঝগড়া ঝাটি, মারামারি দেখে আমর ছোট্ট মন বিষিয়ে গেল। আমার মন মগজে থিতু হয়ে গেল বিয়ে মানেই একটা অশান্তির জায়গা। পড়ালেখাও হলো না ঠিকঠাক। মোটামুটি জিপিএ নিয়ে এস.এস.সি পাস করলাম।
আমার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু হলো। না ছিল সৌন্দর্যের বাহার আর না ছিল বিদ্যাবুদ্ধি। বাবার মুখের উপর কিছু বলব সেই সাহসও ছিল না। যেদিন আমাকে প্রথম দেখতে এলো চোখের জলে সব ঝাপসা হয়ে গেল। কেন যেন মনে হচ্ছিলো আমার ভাগ্য আমার মায়ের মত হবে।
ছেলের ধান পাটের ব্যবসা আছে, শহরে মুরগির দোকান আছে। মোটামুটি অবস্থা সম্পন্ন আমার বাবা খুশিতে ডগমগ হয়ে রাজি হয়ে গেলেন। সৎ মা পাত্রপক্ষের সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এ আমার নিজের মাইয়ার মতই। একটা ফুলের টোকা জীবনে দেই নাই।
মোটামুটি ধুমধাম করে আমার বিয়ে হলো। আমার স্বামীকে আমি অকারণে ভয় পেতে শুরু করলাম। আমার মনে হতে থাকলো সুযোগ পেলেই সে আমার গলা টিপে ধরবে। জ্বলন্ত কাঠ দিয়ে হাতে ছ্যাঁকা দিয়ে দিবে।
বিয়ের পাঁচদিন পরের ঘটনা, মনির আমাকে এক গ্লাস পানি আনতে বললো। পানির গ্লাস এগিয়ে দিতে গিয়ে আমার হাত ঠকঠক করে কাঁপছিল।
মনির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, রেণু কী হইছে তোমার? তুমি আমারে ডরাও ক্যান?
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমি দিতে পারলাম না। অপ্রেমে যার বেড়ে উঠা প্রেম তার সহ্য হবে কেন?
সেদিন রাতেই মনির আমাকে কাছে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি আরও পড়তে চাও? তোমার বান্ধবী
নাহাররে সেদিন দেখলাম কলেজে যাইতেছে। তোমার কথা জিগাইলো। তুমি যদি পড়তে চাও আমার কোনো অসুবিধা নাই। আমার অনেক পড়ার ইচ্ছা ছিল আব্বা মরার পর আর উপায় ছিল না। ইন্টার পাসের পর আর হইলো না কিছু।
বলতে গেলে মনিরের ইচ্ছেতেই আমি কলেজে ভর্তি হলাম। আমার শ্বাশুড়িরও কোনো আপত্তি ছিল না। আমি কলেজ থেকে ফিরে দেখতাম সে বাড়ির সব কাজ করে রেখেছে। গরম ভাতের প্লেট সামনে এগিয়ে দিতেই আমার ভেতরটা ঝলমল করে উঠতো।
সময়ে অসময়ে আমি শ্বাশুড়ির কোলে মাথা রেখে বলতাম, আমার মাথা ব্যথা করতাছে। একটু দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দ্যান।
আম্মা চুলে বিলি কেটে দিতেন আমার চোখ জলে ভরে যেত। আম্মা টের পেয়ে জিজ্ঞেস করতেন,কানতাছো ক্যান গো মা?
আমি সেই কান্নার কারণ বলতে পারতাম না শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতাম, আমারে কোনোদিন পর কইরা দিয়েন না৷ আপনার পায়ে একটু জায়গা দিয়েন।
সে আমাকে পায়ে নয় আজীবন বুকে আগলে রেখেছিলেন। আমি ভালো রেজাল্ট নিয়ে ইন্টার পাস করলাম এবং আশ্চর্যজনকভাবে আমার চান্স হলো ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে।
মনির আর আমার শ্বাশুড়ি পাড়া সুদ্ধো মানুষকে মিষ্টি খাইয়ে বেড়ালেন। মনির আমার হাত ধরে বলল,রেণু তুমি কী চাও কও। যা চাইবা তাই দিব।
আমি মনিরকে জড়িয়ে ধরে বললাম,সব আমার পাওয়া হয়ে গেছে।
একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হিসেবে আমাকে সবাই চেনে। ছাত্র ছাত্রীদের সামনে আমার জীবন কাহিনী বলতে গিয়ে কখন চোখ ভিজে গেছে টের পাইনি। মনির আর ক্ষুদে ব্যবসায়ী নেই। একজন নামকরা ব্যবসায়ী হয়েছে। শ্বাশুড়ি মা আর আমার নিজের মানসিক অসুস্থ মা দুজনেই আমাদের কাছে থাকেন। রিহানের দেখাশোনা নিয়ে আমাকে আর চিন্তা করতে হয়নি।
দাদী মরণাপন্ন, লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত৷ আজকাল তার দোযখের ভয় তাড়িয়ে বেড়ায়। আমার পাগলী মায়ের পা ধরে কেঁদে বুক ভাসিয়ে ফেলেছে। আমার মা মাফ না করলে নাকি আল্লাহও মাফ করবেন না। আবার বাবা মাথা নিচু করে থাকেন। মা, ছেলে মিলে কী এমন অন্যায় করেছিল সবার মনে এক প্রশ্ন।
সেই প্রশ্নের উত্তর আমি অনেক আগেই জানতাম। কোনো অশরীরী আত্মা এসে আমার মাকে আঘাত করে যায়নি। রক্তে মাংসে গড়া মানুষেরা এর চেয়েও ভয়ঙ্কর। সে আঘাত করে তার সবচেয়ে কাছের মানুষকেই। যদি আঘাত না করে আগলে রাখে তবে আমার মত মানুষের জীবনটা স্বর্গ হয়ে উঠে। ভাগ্যিস সেই স্বর্গ দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবি একই পৃথিবীতে একই পরিবারে থেকে দুজন মানুষের নিয়তির কত ব্যবধান!

তুফফাহুল জান্নাত মারিয়া

রাজনীতিতে ক্রিটিক্যাল থিংকিং

 


সদ্য পদত্যাগ করা প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধানকে নিয়ে একটা পোস্ট দিয়েছিলাম আজ। সেটাতে লিখেছি যে ভুট্টো কীভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। সেটা শুনেই কিছু প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিতে মূর্খ আমাকে ভেবেছে আমি গুপ্ত শিবির। এর আর একটা কারন আমি মার্কিন-ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদও যুদ্ধে ইরানকে সমর্থন করেছি। তার ফলেই তাদের ধারণা আমি গুপ্ত শিবির। অনেকেই দেখি আবার সন্দেহের দোটানায় দুলছে। তাদের সকলকে বলি আমার থেকে দূরে থাকুন। ভুট্টো কীভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন সোি পোস্টটি আবার দিলাম।
-
রাজনীতি সাদাকালো নয়: কেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বেঁচে ফিরে এসেছিলেন ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২? ভুট্টো না বাঁচালে মুজিব হত্যা ও জেল হত্যা দুটোই ৭১-এ হতো, ৭৫-এ নয়!!
রাজনীতি বুঝতে গেলে আপনাকে একই ঘটনা বা একই মানুষকে নানা প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করতে হবে। কোনো একটি দিক থেকে একটি মাত্র প্রেক্ষাপটে কাউকে বিচার করে যদি তাকে আপনি ভক্তির আসনে বা ঘৃণার আসনে বসিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনি ভক্তিবাদী, রাজনৈতিক বোদ্ধা নন। ভক্তিবাদীর রাজনৈতিক আচরণ শুরুতে বিপ্লবী মনে হলেও পরিশেষে সবসময়ই সাম্প্রদায়িক। আমেরিকানরাও সেই সাম্প্রদায়িক আচরণই করে, যখন তারা ভাবে যে ওসামা বিন লাদেন সন্ত্রাস করেছে, সে যেহেতু মুসলিম ছিল, তাই সব মুসলিম সন্ত্রাসী; তাদের খতম কর।
আমাদের নিজেদের বোঝার জন্য এবং গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য ৭১-এর আগে-পরে পাকিস্তানে কী হয়েছিল, সেটা বোঝা খুব জরুরি। সেটা না বুঝে শুধু ঘৃণা করা সেই একই ভক্তিবাদ বা ঘৃণাবাদ। ৭১-এর কারণে পাকিস্তানের সবকিছু ঘৃণা কর, সেটাও তেমন। ব্যক্তি মানুষকে সূক্ষ্ম বিচার না করে তাকে মন্দ কিছুর সঙ্গে ট্যাগ করা এবং হেয় করা একপ্রকার দলগত বুলি, যেটা ফৌজদারি অপরাধ।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভারত থেকে ভাগ হওয়ার দশ বছর যেতে না যেতেই ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তখনকার সামরিক প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান সদ্যপ্রসূত শিশু গণতন্ত্রকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান স্বাধীন হলেও সেটা ২৩শে মার্চ ১৯৫৬ পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে নিয়োগকৃত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, খাজা নাজিমুদ্দিন, গোলাম মোহাম্মদ ও ইসকান্দার মির্জা—এই চারজন গভর্নর জেনারেলের শাসনে ছিল। এই সময় পাকিস্তানের নাম ছিল ডোমিনিয়ন অব পাকিস্তান, যা ছিল একটি ব্রিটিশ কমনওয়েলথ রাজ্য। ২৩শে মার্চ ১৯৫৬-তে সংবিধান রচনার মাধ্যমে সেটা ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান নামে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে জন্মগ্রহণ করে।
এর দুই বছরের মধ্যেই আইয়ুব খান অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসন জারি করেন। এর পর থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে সামরিক শাসন চলে, যার শেষ দুই বছর ছিল জুলফিকার আলী ভুট্টোর অধীনে (বেসামরিক হওয়া সত্ত্বেও)। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৭ পর্যন্ত ভুট্টো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং ১৯৭৭-এর নির্বাচনে তার দল জিতলেও ১৯৭৭ সালে সামরিক প্রধান জিয়াউল হক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবার ক্ষমতা দখল করেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই পাকিস্তানের জনগণ পাকিস্তানের ক্ষমতালোভী সামরিক জান্তাদের গুতোগুতিতে নিষ্পেষিত ছিল। সামরিক নেতৃত্বের ইসলামিক সামরিক আদর্শের বাঙালি-ঘৃণার কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন দানা বেঁধেছিল এবং ঘটেছিল ৭১-এর নৃশংসতা। তারা বাঙালি সংস্কৃতিকে হিন্দু আচার বলে মনে করে ঘৃণা করত। এই ঘৃণা বিভাজন তৈরির জন্য তাদের মনে পদ্ধতিগতভাবে উৎপাদন করা হয়েছিল। যদিও পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অনেক কর্মকর্তা ঢাকায় মার্চের সামরিক হামলার পক্ষে ছিলেন না। ১৯৭১ সালের শুরুতে পদত্যাগ করেন তিনজন মোস্ট সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা। তারা চাননি সামরিক অপারেশন হোক।
পাকিস্তানে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমনের জন্য সামরিক অভিযান চালানোর আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি মনে করতেন যে, সামরিক শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন। তার এই অবস্থান মূলত রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল। তার অস্বীকৃতির পর তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রত্যাহার করা হয় এবং তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে, যিনি পরবর্তীতে নতুন সামরিক কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের মার্চে, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস-অ্যাডমিরাল সৈয়দ মোহাম্মদ আহসান ও ঢাকায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান, এয়ার কমোডর মুহাম্মদ জাফর মাসুদ জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা উভয়েই মার্চের শুরুতে পদত্যাগ করেন।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ যেমন তখনকার অপশাসনে নিষ্পেষিত ছিল, পাকিস্তানের সিভিল সোসাইটি এবং মুক্তমনের মানুষরাও তেমনি ছিল এবং তারা এখনও আছে। যারা এখনও পাকিস্তানে নানা কায়দায় সামরিক ও খুনখারাবির রাজনীতির শিকার। অবশ্যই ৭১-এর নৃশংসতার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তান দায়ী, কিন্তু পাকিস্তানের অভ্যন্তরের শাসনযন্ত্রকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি তার আগে থেকেই সামরিক অলিগার্ক বা ছোট দলের অপশক্তির দখলে। সেই কারণে পাকিস্তানের অপকর্মের জন্য পাকিস্তানের সকল জনগণকে ৭১-এর জন্য দায়ী করা যায় না।
কেন দায়ী করা যায় না, তার উদাহরণ বঙ্গবন্ধু নিজেই রেখে গেছেন। জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঘাড়ে হাত দিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাস্যরসের ছবিটি খুব সম্ভবত ১৯৭৪ সালে ওআইসি সম্মেলনের সময় তোলা। যদি পাকিস্তানের সকলেই দায়ী হয়, তাহলে ৭১-এর গণহত্যার তিন বছরের মধ্যেই কেন প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনে বঙ্গবন্ধু এমন আচরণ করলেন ভুট্টোর সঙ্গে, যে ভুট্টো ৭১ সালে হানাদার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন? রাজনীতি ধর্ম নয়। ধর্মে যেমন ধর্মগুরু বা প্রফেটের কাছে অতিমানবীয় শুদ্ধ চরিত্রের আশা করা হয়, রাজনীতি তেমন নয়।
রাজনীতিতে ব্যক্তি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ তার কৃতকর্ম বা বিশ্বাসযোগ্যতার বর্তমান অবস্থান। একজন মুক্তিযোদ্ধা পরে মৌলবাদী বা রাষ্ট্রবিরোধী হয়ে যেতে পারে (যেমন মেজর জিয়া এবং আরও অনেক সামরিক কর্মকর্তা)। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অনেক ব্যক্তি, বেশিরভাগ উচ্চশিক্ষিত প্রফেশনাল পিএইচডিধারী প্রফেসর, পাকিস্তানপন্থী ছিলেন; কিন্তু কিছুদিন পর তারা যখন নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তখন তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এসেছেন।
১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর যখন পাকিস্তানের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে, তখন ইয়াহিয়া ও তার নিকটস্থ জেনারেলরা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। সেই হতাশা থেকেই ক্ষোভে এবং বাংলাদেশ যাতে কোনোদিন মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে, সেই কারণে তারা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা বাস্তবায়ন করে। সেই নীলনকশার প্রথমে কার নাম থাকার কথা? শেখ মুজিব নয় কি? হ্যাঁ, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পরপর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সময় শেখ মুজিবকে হত্যা চূড়ান্ত করে ফেলে খুনি ইয়াহিয়া। কিন্তু এতে বাধা দেন স্বয়ং ভুট্টো। তিনি প্রথমে ইয়াহিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এটা করা ঠিক হবে না।
কিন্তু ইয়াহিয়া সেটা মানে না। বিজয়ের দিন ভোরেই মুজিবকে জেলখানায় হত্যা করার জন্য আদেশ হয়ে যায়। সেই সময় সলিটারি সেলে বন্দি মুজিবকে জেলখানায় রাত তিনটায় ডেকে তোলেন তখনকার পুলিশ সুপার। রাত তিনটায় মুজিবকে জেলখানা থেকে বের করে সেই পুলিশ সুপার গোপনে তার বাসায় দুই দিন লুকিয়ে রাখেন। মুজিবকে হত্যা করতে আসা সামরিক নির্দেশপ্রাপ্ত লোকেরা তাকে খুঁজে পায় না। মুজিবের প্রাণ রক্ষার এই ব্যবস্থাটা করেছিলেন ভুট্টো নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে। ২০শে ডিসেম্বর ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হলে ৮ই জানুয়ারি ১৯৭২ সালে তিনি শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন। [সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস, ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২]
চীনের এক গ্রামে বাস করতেন একজন সৎ কৃষক। খুবই নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। এক কথায় গ্রামের সবাই তাকে ভালো বলেই জানত। সহজ-সরল এ কৃষকের সম্পদের মধ্যে ছিল একখণ্ড চাষের জমি আর একটা ঘোড়া। ঘোড়াটা কৃষিকাজে সে ব্যবহার করত। সেই কৃষকের ছিল একটা মাত্র ছেলে। ছেলেটাও বেশ ভদ্র। গ্রামের সবাই ছেলেটাকে অনেক ভালোবাসত। কৃষক বাবার সে ছিল একমাত্র সহযোগী। হঠাৎ একদিন কৃষকের ঘোড়াটা হারিয়ে গেল। সকলে ভাবল, কী সর্বনাশ! এত ভালো একটা মানুষের এত বড় বিপদ? গ্রামের প্রায় সব মানুষ সহমর্মিতা জানানোর জন্য ছুটে এলো কৃষকের কাছে।
তারা বলতে লাগল, “আহারে, এত ভালো একজন মানুষের এত বড় বিপদ? কত ক্ষতিই না হয়ে গেল!” এমনই আরও অনেক কিছু বলাবলি করতে লাগল তারা। এসব শুনে কৃষক একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “আচ্ছা, তোমরা যেটাকে আমার জন্য অকল্যাণ মনে করছ, সেটা যে কল্যাণ নয়, তা তোমরা কীভাবে জান?” উপস্থিত লোকজন তো অবাক! কতই না সরল আর বোকা এই লোক? একটা মাত্র ঘোড়া, সেটাই হারিয়ে গেল, আর সে কিনা ভাবছে এটার মধ্যে কল্যাণও থাকতে পারে? বেকুব লোক একটা। তিরস্কার করতে করতে তারা চলে গেল।
এর কয়েকদিন পরে কৃষকের ঘোড়াটা একটা ঘুঁড়িসহ (মাদী ঘোড়া) ফিরে এলো। খবরটা জেনে গেল গ্রামবাসীরা। সবাই তো খুবই খুশি। সৎ কৃষককে কীভাবেই না পুরস্কৃত করলেন তার সৃষ্টিকর্তা। আনন্দের সংবাদ ভাগাভাগি করতে আবারও গ্রামবাসীরা ছুটে এলো কৃষকের বাড়ি। কত কথাই না বলল তারা। সবাইকে থামিয়ে কৃষক বললেন, “আচ্ছা, তোমরা যাকে কল্যাণ মনে করছ, সেটা তো আমার জন্য কল্যাণ নাও হতে পারে।” সবাই তো চুপ। বলে কী বোকা লোক? একটা ঘোড়া পেল, আর কী না বলে যে এটা তার জন্য কল্যাণ নয়? তিরস্কার করতে করতে চলে গেল সবাই।
পরদিন সকালে কৃষকের একমাত্র ছেলেটা গেল ঘোড়ার খাবার দিতে। ঘোড়াটা যেহেতু ছেলেটাকে চেনে, তাই কিছুই বলল না। কিন্তু যেই না ঘুঁড়িটাকে খাবার দিতে গেল, অমনি অপরিচিত লোক ভেবে দিল এক লাথি। ভেঙে গেল ছেলেটির পা। আহত হয়ে সে পড়ে রইল বিছানায়। “আহারে! এমন বিপদ এই ভালো লোকটার। সত্যিই তো এই ঘোড়াটা কৃষকের জন্য কোনো কল্যাণ নিয়ে আসেনি। কৃষক তো ঠিকই বলেছিল। কত বিপদই না হচ্ছে ভালো মানুষটার।” আবারও ছুটে এলো তারা কৃষকের বাড়িতে। কতভাবেই না তারা দুঃখ প্রকাশ করার চেষ্টা করল। সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল কৃষককে।
কৃষক আবার একটু বিরক্তই হলেন। বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বললেন, “আচ্ছা, আমার ছেলের পা ভেঙে গেছে, এটা তো অকল্যাণ না হয়ে কোনো কল্যাণও বয়ে নিয়ে আসতে পারে।” গ্রামের লোকেরা আবারও তিরস্কার করতে করতে চলে গেল। এত বোকা লোক তো তারা কখনই দেখেনি! আহারে বেকুব লোকটা। কয়েকদিন পরে শুরু হলো যুদ্ধ। দেশের প্রত্যেক যুবককে বাধ্যতামূলক যুদ্ধে যেতে হবে। পা-ভাঙা ছেলেকে তো আর যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া যায় না, তাই তাকে তারা রেখে গেল।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে, ওই গ্রামের সবাই যুদ্ধে নিহত হলো। এভাবে কৃষকের ছেলেটা বেঁচে গেল। কয়েকদিন পরে তার পাটাও ভালো হয়ে গেল। কত আশ্চর্যই না হলো সবাই। সবাই দেখল, পা ভাঙার কারণেই যুদ্ধে যাওয়া লাগল না। আর এভাবেই কৃষককে তার একমাত্র ছেলেটাকে হারাতে হলো না। অথচ গ্রামের সব ছেলেরাই আজ মৃত। রাজনীতি শুধু নয়, মানুষের জীবনে ভালো-মন্দ বিচার কখনই পরম নয়। সেই কারণেই মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং বলেছেন, “মানুষের মনে দ্বিধার যে দোলকটা দোলে, সেটা কোনো কিছু ভালো বা মন্দ সেটা নিয়ে নয়, কোনো কিছু অর্থহীন না কি অর্থপূর্ণ, সেটা নির্ণয়ে।”
আসুন, ভালো-মন্দ বিচার নয়, আমরা প্রতিটি কাজ অর্থপূর্ণ না কি অর্থহীন—এটা দিয়ে মানুষকে বিচার করি। এটাই রাজনীতিতে ক্রিটিক্যাল থিংকিং।

সিরাজুল হোসেন