অর্জুন (গম্ভীর চোখে): "হে মাধব... যার আছে, তুমি তাকে আরও উজাড় করে দিচ্ছো আর যার কিছুই নেই, তার বুক থেকে শেষ খড়কুটোটুকুও তুমি কেড়ে নিচ্ছো । এ কেমন লীলা সখা? দরিদ্র আরও দরিদ্র হচ্ছে, শোকার্ত আরও বেশি শোক পাচ্ছে, আর সুখী মানুষ আরও সুখে ভাসছে। ঈশ্বর কি তবে পক্ষপাতদুষ্ট?"
শ্রীকৃষ্ণ (মৃদু হেসে ): "পার্থ, তুমি সৃষ্টির নিয়মকে বাইরের পার্থিব চোখ দিয়ে পরিমাপ করছ, তাই একে অবিচার মনে হচ্ছে। আমি কাউকে কেড়ে নিই না, আর কাউকে আলাদা করে উপচে দিই না। আমি কেবল মানুষের ভেতরের 'চেতনা'র দর্পণ মাত্র।
তুমি কি কখনো খেয়াল করেছ যে মাটি উর্বর ও সজল, মেঘ সেখানে অবলীলায় আরও সজল হয়ে বৃষ্টি ঝরায়? আর যে মাটি তপ্ত মরুভূমি, মেঘ সেখানে এক ফোঁটা জল দিতেও কুণ্ঠিত হয় । মরুভূমির ওপর কি মেঘের কোনো আক্রোশ আছে পার্থ? না নেই ।
আসল রহস্য নিহিত রয়েছে 'ধারণ ক্ষমতা' আর 'চিত্তের অবস্থা'র মাঝে।"
এটা বুঝতে হলে তোমাকে মাটির অন্ধকারে শুয়ে থাকা 'দুটি বীজের' গল্পটা শুনতে হবে।"
শ্রীকৃষ্ণ: "এক চাষী শরৎকালের এক সকালে একখণ্ড জমিতে পাশাপাশি দুটি বীজ বপন করল। দুটি বীজই একই রকম মাটির নিচে, একই অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল।
প্রথম বীজটি মাটির নিচে গিয়ে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। সে ক্ষোভে ও অভিমানে ছটফট করে বলতে লাগল, 'হায়! এ আমার কেমন ভাগ্য! আমাকে এভাবে কুৎসিত কালো মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হলো? আমার ওপর কত ভারী ধুলো! আমি আমার সুন্দর নিটোল রূপটি হারিয়ে ফেললাম। আমার বলতে আজ কিছুই অবশিষ্ট নেই।'
সে তার ক্ষোভ আর না পাওয়ার চেতনার কারণে চারপাশের মাটির রস গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। সে তার শক্ত খোলসটিকে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখল। নিজের ভেতরের এই মানসিকতার কারণে সে একসময় মাটির নিচেই পচে গেল। তার ভেতরে যে প্রাণের স্পন্দনটুকু ছিল, তাও ধ্বংস হয়ে গেল। তার যা ছিল, তাও কেড়ে নেওয়া হলো।
আর দ্বিতীয় বীজটি? সেও কিন্তু একই অন্ধকারে, একই মাটির নিচে চাপা পড়েছিল। কিন্তু সে চোখ মেলে বলল, 'ধন্যবাদ ধরিত্রী মা, তুমি আমাকে এত নরম করে নিজের বুকে লুকিয়ে রেখেছ। ধন্যবাদ এই অন্ধকারের উষ্ণতার জন্য, ধন্যবাদ এই সজল মাটির স্পর্শের জন্য।'
সে কৃতজ্ঞচিত্তে তার খোলসটিকে আলতো করে খুলে দিল। মাটির রসকে পরম মায়ায় নিজের শরীরে গ্রহণ করল। আর দেখতে দেখতে কী কাণ্ড ঘটল জানো পার্থ?
মাটি তাকে আরও রস দিল, মেঘ তাকে জল দিল, আর সূর্য তাকে ওপরের দিকে টেনে নিল। কিছুদিন পর সে মাটির বুক চিরে এক অপূর্ব সুন্দর চারাগাছ হয়ে আকাশে মাথা তুলল। বসন্তে তার ডালে হাজারো ফুল ফুটল, পাখিরা বাসা বাঁধল। প্রকৃতি তাকে আরও বেশি রূপ, সুবাস আর প্রাচুর্য দিয়ে ভরিয়ে দিল।"
অর্জুন (রুদ্ধকণ্ঠে): "এ তো অতি চমৎকার ও মন ছুঁয়ে যাওয়া সত্য সখা! প্রথম বীজটি যা ছিল তাও হারিয়ে ফেলল নিজের ক্ষোভের কারণে, আর দ্বিতীয় বীজটি কৃতজ্ঞতার জোরে শূন্য থেকে এক বৃক্ষ হয়ে উঠল। কিন্তু সখা, মানুষ যখন জীবনের চরম সংকটে পড়ে, তখন তার
পক্ষে প্রথম বীজটির মতো ক্ষুব্ধ না হয়ে, দ্বিতীয় বীজটির মতো কৃতজ্ঞ থাকা কীভাবে সম্ভব? যন্ত্রণার মাঝে ধন্যবাদ জানানোর শক্তি মানুষ কোথা থেকে পাবে?"
শ্রীকৃষ্ণ: "পার্থ, শক্তি বাইরে থেকে আসে না, শক্তি আসে ভেতরের গভীর বিশ্বাস থেকে।
যখন তুমি সংকটে পড়বে, তখন ভেবো না যে ঈশ্বর তোমাকে মাটির নিচে পিষে মারার জন্য চাপা দিয়েছেন। বরং ভেবো ঈশ্বর তোমাকে মাটির নিচে রোপণ করেছেন, যাতে তুমি এক নতুন ও মহৎ জীবন নিয়ে জন্ম নিতে পারো।
রোপণ করা আর পিষে ফেলার মাঝে তফাতটা কেবলই তোমার দৃষ্টিভঙ্গির।
যে মানুষটি সংকটের মাঝেও ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস রেখে ধন্যবাদ জানায়, সে আসলে রোপণ হওয়া বীজের মতো একদিন সমস্ত ঝড় পেরিয়ে আকাশে মাথা তোলে। আর যে কেবল অভিযোগ করে, সে নিজেকে পিষ্ট মনে করে ধুলোয় মিশে যায়।
অর্জুন (ভ্রুকুটি করে): "আচ্ছা মাধব। যার অভাব, তার তো আরও বেশি পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় কেন? এই নিদারুণ নিয়মের পেছনের সত্যটা কী?"
শ্রীকৃষ্ণ (অর্জুনের হাতের দিকে চেয়ে বললেন): "পার্থ, তোমার এই হাতের অঞ্জলিটির কথাই ধরো। তুমি যদি অঞ্জলি ভরে জল নিতে চাও, তবে তোমার হাত দুটিকে একসাথে জোড় করে উন্মুখ রাখতে হবে। কিন্তু তোমার হাত যদি উল্টো করে রাখা থাকে, তবে আমি অনন্ত গঙ্গা
ঢেলে দিলেও কি এক ফোঁটা জল তোমার হাতে আটকাবে?
যে মানুষটির মন সবসময় 'অভাব', 'ক্ষোভ' আর 'অভিমান' দিয়ে উল্টো হয়ে আছে, সে আসলে এক
ফাটল ধরা পাত্রের মতো। আমি তাকে জগতের সমস্ত সুখ এনে দিলেও, তার ভেতরের অকৃতজ্ঞতার ফাটল দিয়ে সেই সুখটুকু চুইয়ে বেরিয়ে যাবে। সে তার নিজের ভেতরের দারিদ্র্যের কারণে তার কাছে থাকা শেষ শান্তিটুকুও একসময় হারিয়ে ফেলে। এটাই হলো 'যার নেই, তার কেড়ে নেওয়া'র আসল অর্থ। কেড়ে আমি নিই না পার্থ, তার নিজের ভেতরের নেতিবাচক চেতনা তার
চারপাশের সমস্ত ভালো জিনিসকে নষ্ট করে দেয়।"
অর্জুন (কিছুটা স্তব্ধ হয়ে): "আর 'যার আছে, তাকে আরও দেওয়া'?"
শ্রীকৃষ্ণ (অনন্ত গভীর চোখে চেয়ে): "যার চিত্তে 'কৃতজ্ঞতা' আছে, যে তার জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তিগুলোকে পরম আনন্দে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানায়, তার চিত্তের পাত্রটি সবসময় সোজা আর অক্ষত থাকে। সে অল্পতেই পরম পূর্ণতা খুঁজে পায়। আর তার এই ইতিবাচক স্পন্দন মহাবিশ্ব থেকে আরও বেশি আনন্দ, শান্তি আর প্রাচুর্যকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে।
তোমার খোলসটি ভেঙে যেতে দাও পার্থ। দুঃখের মাটিকে ভয় পেও না। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, কৃতজ্ঞ হৃদয়ে হাত দুটি জোড় করো, দেখবে তোমার এই অন্ধকারের গর্ভ থেকেই একদিন অমৃতের জন্ম হচ্ছে।"
তাই জগতের অভাবী মানুষেরা আসলে সম্পদের অভাবে দরিদ্র নয় পার্থ, তারা দরিদ্র তাদের 'চিত্তের অভাবে'। তারা যা পায়নি তার জন্য কেঁদেই তাদের জীবনের অবশিষ্ট ভালো জিনিসগুলোকেও অবহেলায় নষ্ট করে ফেলে। আর যারা যা পেয়েছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকে, তারা দিন দিন আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
নিজের পাত্রটিকে সোজা করতে শেখো পার্থ। ক্ষোভের ফাটলগুলোকে কৃতজ্ঞতা দিয়ে বুজিয়ে দাও। দেখবে, তখন এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত প্রাচুর্য নিজে থেকেই তোমার দিকে ধাবিত হচ্ছে।"
আমি তাকে নিজে থেকে দিই না পার্থ, তার নিজের কৃতজ্ঞ মন আমার পরম আশীর্বাদকে তার দিকে টেনে আনে
No comments:
Post a Comment