Tuesday, July 7, 2026

মার্কিন-পূর্ব পাকিস্তান যৌথ বাহিনীর ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর কী হবে?

 ১৯৭১ সালে পাক-মার্কিন বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার অন্তত ১০ বছর আগে থেকেই পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে লক্ষ লক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দুধর্মাবলম্বীদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বহিষ্কার বা বর্জনের নীলনকশা তৈরি করতে থাকে। আমেরিকা যেভাবে স্থানীয় রেড ইন্ডিয়ানদের প্রতি হেয়প্রতিপন্নতা ও ঘৃণা রোপণের জন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির মাধ্যমে একটি এলিট শাসকশ্রেণি তৈরি করেছিল, পাকিস্তানেও ক্যাডেট কলেজ, মডেল স্কুল-কলেজ ও সেনানিবাসগুলোকে একইভাবে হিন্দু ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা রোপণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে।

এইসব প্রক্রিয়া তৎকালীন বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ এবং সাংস্কৃতিক বোদ্ধাদের নজর এড়ায়নি। সেই কারণেই আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার পর পূর্ব পাকিস্তানের স্বল্পবুদ্ধি জনগণ মহা-উৎসাহী হয়ে উঠলেও বুদ্ধিমানদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ রক্ষার রাজনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৬৬-৬৭ সাল থেকেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ২ থেকে ৩ মিলিয়ন (২০ থেকে ৩০ লক্ষ) বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং হিন্দুধর্মাবলম্বীকে হত্যা অথবা বহিষ্কারের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে।
পাকিস্তানের সেনা জেনারেলরা ভেবেছিল কাজটা খুবই সহজ হবে। তারা ভেবেছিল দুই-তিন লাখ মানুষ হত্যা করলেই ভীতু বাঙালিরা তাদের হাত-পা চেটে বেঁচে থাকবে। তাদের এমনটা ভাবা অযৌক্তিক ছিল না। যত তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বাঙালি ছিল—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সেনাকর্মকর্তা—যারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারত, তাদের বেশিরভাগই তার আগেই পাক-মার্কিনদের হাত-পা চাটার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল। এর সঙ্গে ছিল জামাতি মিথ্যাচার এবং রাজাকার-আলবদরদের খর্ববুদ্ধি এবং ভুয়া হাদিসের ধর্মের প্রভাব।
কিন্তু দিন যত যেতে থাকে, ঘটনা তাদের পরিকল্পনার বাইরে চলে যেতে থাকে। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর মেজর জেনারেল খাদিম হুসেন রাজা তাঁর 'এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি: ইস্ট পাকিস্তান, ১৯৬৯-১৯৭১' বইতে অবাক বিস্ময়ে লিখেছেন যে, যতই দিন যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডে কোনো শৃঙ্খলা বা পরিকল্পনা নেই। অপরদিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেশে না থাকলেও তারা রাজনৈতিক কৌশল, জনসংযোগ এবং সমরকৌশলে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং চরম পেশাদার স্তরে সমন্বিত ও সুসংগঠিত।
এই বিচারে তিনি নিজ দলের এই করুণ অবস্থার জন্য দোষ দেন প্রথম সারির সেনা কর্মকর্তাদের, যেমন ইয়াহিয়া, নিয়াজি, টিক্কা, এবং ভুট্টোর মতো রাজনীতিবিদদের। তিনি নেতৃত্বস্থানীয় সেনা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত চরিত্রেরও অনেক দোষ-ত্রুটির কথা বলেন। এখানেই তিনি সেই ভুলটি করেন, যেটা যেকোনো সামরিক কর্মকর্তা করতে পারেন। কারণ, বর্ণান্ধদের মতো তাদেরও বেশ কিছু বোধ প্রশিক্ষণের সময় নষ্ট করে ফেলা হয়।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ ২০০০ সালে মার্কিন নেটওয়ার্ক পিবিএসের চার্লি রোজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেই বিশ্লেষণটি দিয়েছিলেন। লি কুয়ান ইউ বলেছিলেন:
‘আমেরিকা ও চীনের মধ্যে মৌলিক দর্শনে একটি গভীর পার্থক্য আছে, এবং এটি উভয়ের ইতিহাসের প্রতিফলন। ইংরেজরা মেফ্লাওয়ার জাহাজে করে আমেরিকা মহাদেশে এসেছিল ধর্মীয় স্বাধীনতার খোঁজে। কিন্তু চীনের ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বিস্তৃত; সেটা চার থেকে পাঁচ হাজার বছরের উত্থান-পতনের ইতিহাস, দীর্ঘ সময় ধরে যেখানে মূলত কখনো কোনো সরকার ছিল না—ছিল বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা। তবুও তারা কীভাবে টিকে আছে এই বিশৃঙ্খলা, দুর্যোগ, বন্যা ও দুর্ভিক্ষের মধ্যেও? কারণ সেখানে সরকারনির্ভরতার বাইরে একটি সামাজিক নেটওয়ার্ক ছিল। তা হলো পারিবারিক বন্ধন—নিকট পরিবার, বৃহত্তর পরিবার, বংশ বা গোত্র—যেখানে একে অপরের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল। এভাবেই তারা টিকে ছিল। আমরা আরও নিরাপদ থাকি যদি আমরা এই পারিবারিক বন্ধন, ঐতিহ্যগত জীবনরক্ষাকারী কাঠামোগুলো ধরে রাখি—যা রাষ্ট্রনির্ভর নয় এবং ব্যক্তিকে পরিবার বা রাষ্ট্রের চেয়ে প্রাধান্য দেয় না, যেটা আমেরিকান পদ্ধতি। তোমরা পেতে পারো বিল গেটসকে, বা ফোর্বস কিংবা ফরচুনে দেখা যায় এমন সবচেয়ে ধনী ও মেধাবী ৫০ জনকে। এটাই পশ্চিমাদের অভিজ্ঞতা। এটি চীনের অভিজ্ঞতা নয়। এটি আমাদের অভিজ্ঞতাও নয়।’
লি কুয়ান ইউ যা বলেছিলেন, সেটা বাংলাদেশের জন্যও খুবই সত্য। সনাতন যৌথ সমাজের রাজনীতি এবং যুদ্ধ একেবারেই ভিন্ন। এই সমাজে বিপদে পড়লে প্রতিটি মানুষের নিজের সতন্ত্র বিচারবুদ্ধি জাগ্রত হয়। সে নিজেই হয়ে যায় নিজের সেনাপতি, নিজের মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী। আর এই ঘটনাটি সবার মধ্যেই একই সঙ্গে এবং সমলয়ে ঘটে। যার ফলে তৈরি হয় এক অদৃশ্য সংযোগের বিশাল বাহিনী, যারা রাজনৈতিক কৌশল, জনসংযোগ এবং সমরকৌশলে অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং চরম পেশাদার স্তরে সমন্বিত ও সুসংগঠিত অর্গানিক সেনাদলে পরিণত হয়।
এই কারণেই ভিয়েতনামে হেরেছে মার্কিন বাহিনী, হেরেছে ইরাকে, আফগানিস্তানে; বাংলাদেশে হেরেছে পাকিস্তানিরা, আমেরিকা-ইসরায়েল হেরেছে ইরানে। সামনে পরাজয় অপেক্ষা করছে নয়া মার্কিন-পূর্ব পাকিস্তান যৌথ বাহিনীর। সেই পরাজয় হবে ভয়ানক। তখন আর ভারত থাকবে না ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে জেনেভা কনভেনশনের ধারায় রক্ষা করতে।
© সিরাজুল হোসেন

No comments:

Post a Comment