আনন্দদায়ক সংবাদটি পড়ে ভালো লাগল৷ যুগপৎ আশাব্যঞ্জক এবং উদ্বেগজনকও৷
তথাপি, প্রিয় FEC কে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ৷ জাপানের ছায়া সরকার হিসেবে সবচেয়ে প্রভবাশালী সংগঠনটি যে আগ্রহ দেখিয়েছে এটা আসলে নতুন কিছু নয়৷ জাপান এবং অবিভক্ত বাংলার শতাধিক বছরের পরীক্ষিত পুরোনো মৈত্রীসম্পর্ক এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর জাপানকেন্দ্রিক ভূমিকার প্রেক্ষাপট বিদ্যমান, যা অস্বীকার করার কোনো পথ নেই৷ সাম্প্রদায়িক ভূ-রাজনীতির প্রভাবও বিদ্যমান৷
জাপান-বাংলার ইতিহাস খুঁজলে দুই জাতির সম্পর্ক যে কত সমৃদ্ধ এবং তাৎপর্যপূর্ণ তা অনুধাবন করা যায়৷ যা বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে জাপানের শক্তিকে কাজে লাগানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে৷
যদি ইতিহাসের পথে হাঁটি তাহলে দেখতে পাই যে, মধ্যযুগের এদো যুগ (১৬০৩-১৮৬৮) থেকেই পূর্ববঙ্গের সঙ্গে জাপানের পরোক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল৷ পূর্ববঙ্গ থেকে পাটের সুতো, মসলিন কাপড়, ছাপা সুতির কাপড়, খনিজ লাল রঙ (বেনগারা ইরো, ベンガラ色) ইত্যাদি পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ বণিকদের মাধ্যমে জাপানে আসত৷
আধুনিক মেইজি যুগে (১৮৬৮-১৯১২) এসে এই বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হয়৷ পূর্ববঙ্গ থেকে সিল্কসুতো আমদানির খবরও পাওয়া যায়৷ টোকিওর আসাকুসা শহরে মসলিনের সাম্রাজ্যই গড়ে উঠেছিল৷ এসবের প্রামাণ্য নিদর্শন টোকিও মেট্রোপলিটন জাদুঘরসহ বিভিন্ন জাদুঘরে রয়েছে৷ ভোঁতা বাংলাদেশিরা সেসব জানেও না, দেখতেও চায় না৷
শুধু কি বাণিজ্যিক সম্পর্ক? বিবাহের মতো ব্যক্তিগত কিন্তু ঐতিহাসিক সম্পর্কও তো বিদ্যমান, যা এশিয়ায় আর ঘটেনি৷ ১৯০৭ সালে ঢাকায় বিবাহ করেন একজন জাপানি সাবান প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবসায়ী কোওচি প্রদেশের নাগরিক তাকেদা উয়েমোন খিলগাঁও এর এক ব্রাহ্ম পরিবারের মেয়ে হরিপ্রভা মল্লিককে৷ ১৯১২ সালে হরিপ্রভা তাকেদা স্বামীর সঙ্গে প্রথম জাপান ভ্রমণ করেন৷ এরপর আরও দুবার ১৯২৪ এবং ১৯৪১ সালে৷ জাপানে নেতাজির সঙ্গে কাজ করেছেন হরিপ্রভা তাকেদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে৷
তাকেদার ছোটভাই তাকেদা সোয়েমোনও বিয়ে করেছেন ঢাকায়৷
১৯০৮ সালে বিখ্যাত বৌদ্ধপণ্ডিত কিমুরা রিউকান চট্টগ্রামে গিয়েছেন পালি ভাষা শেখার জন্য৷
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টোকিও মিলিটারি টাইব্যুনালে (১৯৪৬-১৯৪৮) অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন পূর্ববঙ্গের কুষ্টিয়ায় জন্ম ভারতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল৷ তিনি সুদীর্ঘ রায়ে তথাকথিত জাপানি যুদ্ধাপরাধীদেরকে সকল অভিযোগ থেকে খারিজ করে ভিন্নমত প্রদানের কারণে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখেন৷ আজও আলোচিত তিনি আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের আইন সভায়৷
জাতীয়তাবাদী জাপানি রাজনীতিবিদ এবং বিদগ্ধ সমাজ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁর দুটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেছেন কিয়োতো এবং টোকিওতে৷ কানাগাওয়া প্রদেশের হাকোনে উপশহরে রয়েছে "পাল-শিমোনাকা স্মৃতিজাদুঘর৷" এসব পরিদর্শন ও শ্রদ্ধা জানাতে ভারতীয় রাজনীতিক, আমলা, বুদ্ধিজীবী এবং রাষ্ট্রদূতরা গেলেও বাংলাদেশিরা যান বলে জানা নেই৷ এসব কি মূল্যবান ইতিহাস নয়? ইতিহাসকানা বাংলাদেশিদের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই৷
রবীন্দ্রনাথের যুগের জাপান-বাংলা সম্পর্ক এবং বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের প্রভাব কাজ করেছে পূর্ব পাকিস্তানে জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক একাধিক প্রকল্প, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জাপানের বিপুল সমর্থন ও আর্থিক সাহায্য এবং ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের @ঐতিহাসিক জাপান সফরের পেছনে৷ জাপান সরকার, বেসরকারি সাহায্য সংস্থা এবং প্রায় ১০০টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গভীর আগ্রহ নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিকল্পনা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি বঙ্গবন্ধু সরকারকে দিয়েছিল৷ সেই সময়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চিন, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের উন্নয়নের কোনো খবর নেই৷ দারিদ্রে জর্জরিত দেশ হিসেবে পরিচিত এবং জাপানি ODA নির্ভরশীল৷
কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, সেই অগ্রগতি থেমে গেল ১৯৭৫ সালে৷ পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ লাগাতার সামরিক স্বৈরশাসনে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান থাকায়৷ বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশভক্ত জাপানি রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেললেন৷ আর এই সুযোগে চিন, দক্ষিণ, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম জাপানি ODA সাহায্য, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিনিয়োগ এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় উন্নত ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হলো৷ অথচ পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের সঙ্গে ১০০বছরের গভীর অর্থপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও উঠে দাঁড়াতে পারেনি৷
জাপান যে পরিমাণ আর্থিক সাহায্য দিয়েছে বাংলাদেশকে তার নজির বিশ্বইতিহাসে নেই বললেই চলে!
আওয়ামী লীগ দুই আমল মিলিয়ে ২০ বছর রাজত্ব করলেও প্রত্যাশার তুলনায় জাপানের শক্তিকে কাজ লাগাতে পারেনি৷ সেই চেষ্টাই করেনি৷ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে যে-সকল জাঁদরেল জাপানি রাজনীতিবিদদের বন্ধুত্ব ছিল তাঁদেরকেও জানার চেষ্টা করেনি৷ বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রুদেশ চিনের দিকে ঝুঁকে গিয়ে শেখ হাসিনাকে গদিই হারাতে হয়েছে৷ একেই বলে "শিশুতোষ একগুঁয়ে রাজনীতি", রাজনৈতিক দূরদর্শিতা তার ছিল না৷ তাতে করে জাপানিদের বিরাগভাজন হয়েছেন দলটির সভানেত্রী তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ ইতিহাসকে অবজ্ঞা এবং অবহেলা করলে তার ফলাফল কী হতে পারে শেখ হাসিনার পতন সবচেয়ে বড় শিক্ষামূলক উদাহরণ বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্যও, বললে ভুল বলা হবে না৷
জাপানি ব্যবসায়ী ও পুঁজিপতিরা ইতিহাসকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন৷ সেই ইতিহাসকে বাংলাদেশ যদি মূল্যায়ন করতে শেখে তাহলে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে উন্নয়নখাতে৷ নতুবা নয়৷ শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রচেষ্টা দিয়ে জাপানকে প্রভাবিত বা প্ররোচিত করা যাবে না৷ জাতীয়তাবাদী চেতনাও জাপানি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদেরকে পরিচালিত করে৷ সেখানে আঘাত লাগলে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেরি করবে না৷ যেমন চিন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ক্রমশ জাপানের প্রত্যাহার তার উজ্জ্বল উদাহরণ৷
মোদ্দাকথা, বাংলাদেশ যদি উন্নয়নের গুরুদেশ হিসেবে জাপানকে ধরে নিয়ে কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাহলে সাফল্য আসতে সময় নেবে না৷ এবং আমেরিকাও যে নিয়ন্ত্রণে থাকবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ আমেরিকার ওপর জাপানের প্রভাব কতখানি গভীর তা চিন ও ভারত জানলেও বাংলাদেশ জানে না৷ তার জন্য ইতিহাস জানতে হবে এবং বিগত ১০০ বছরের ইতিহাস৷ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান পথপ্রদর্শক হলো ইতিহাসজ্ঞান। 
Probir Bikash Sarker
No comments:
Post a Comment