Tuesday, July 14, 2026

আমার দুঃখ আমার কাছেই থাক।

 


অনেক খোঁজাখুঁজি করে ভদ্রলোকের বাসা আমি খুঁজে পেলাম। চল্লিশের মত বয়স। লম্বা ঢ্যাঙা দেখতে। মুখে খোঁচাখোঁচা কাঁচাপাকা দাড়ি। লুঙ্গি আর একটা গেঞ্জি গায়ে। বিরক্ত মুখে আমাকে দেখে বলল, কাকে চাই?

মোতালেব সাহেব আছেন?
মোতালেব, আবার সাহেব! তারচেয়ে ভাই কুত্তা বলেন! কুত্তা, বুঝলেন!
এরকম কিছুর জন্য আশা করিনি। একদম হকচকিয়ে গেলাম। বিব্রতভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম। কী যে বলি। ভদ্রলোক সরে গিয়ে বললেন, আসুন, ভেতরে আসুন।
একতলা একটা বাড়ি। বেশ পুরোনো। একচিলতে উঠোন আছে। অযত্নে কিছু ফুলের গাছ। কয়েকটাকে চিনলাম। জবা, রেইন লিলি, সন্ধা মালতি...। একটা পেয়ারা গাছ। গ্লিল লাগানো বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হয়। তিনি আমাকে বারান্দায় বসালেন। তখন বিকেল। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশে তখনো কালো মেঘ।
একটু গলা খাকড়ি দিয়ে বললাম, আমি আসলে এসেছি...
ভদ্রলোক আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, দুঃখ বিদায় করতে চান তাই তো?
হ্যাঁ, মানে আর পারছি না...
বুঝতে পারছি, নইলে এই বাদলা দিনে কেউ বের হয় নাকি। তা কতখানি দুঃখ?
চুপ করে রইলাম। কি বলবো?
শুনুন, এখানে এসে কাউকে দুঃখের কারণ বলতে হয় না। কেবল পরিমাণটা বলতে হয়। আচ্ছা আসুন আমার সঙ্গে...
ভদ্রলোক উঠে হাঁটতে লাগলেন। একপাশে যে একটা সিঁড়ি আছে আগে খেয়াল করিনি। ছাদে উঠার এই সিঁড়ি দিয়ে ভদ্রলোক উঠতে লাগলেন। আমি তার পিছু পিছু উঠতে লাগলাম।
চিলে কোঠার মত একটা ঘর ছাদের একপাশে। কোমড় থেকে চাবি বের করে তিনি দরজা খুললেন। তালা খুলে তিনি একটু সরে দাঁড়ালেন যেন আমি ভেতরটা দেখতে পাই।
চেয়ে তো আমার চোখ ছানাবড়া! ঘর ভর্তি বিড়াল!
একেক আকারের একেক রঙের বিড়াল! কম করে হলেও চল্লিশটা বিড়াল এই টুকু ঘরে!
পিটপিট করে বিড়ালগুলো আমাদের দেখছিল। আমার মুখে আর কোন কথা আসছিল না।
ভদ্রলোকই কথা বললেন। দেখুন কোন বিড়ালটা আপনার চাই।
বিড়াল? আমি তো অবাক। কে চাইছে তার কাছে বিড়াল? অদ্ভূত তো, আমি তো বিড়াল কিনতে আসিনি।
ভদ্রলোক বুঝলেন আমি তার কথা বুঝতে পারিনি।
তিনি বললেন, দুঃখকে বিদায় করতে আসছেন তো? তা সেটা কিভাবে বিদায় করবেন? বললেই তো আর দুঃখ বিদায় নিবে না।
আমি তখনো কিছু বুঝিনি। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম।
শুনেন মিয়া, বিড়াল খেদানোর বিষয়টা জানেন তো?
তা জানি।
বিড়ালকে বস্তায় ভরে অচেনায় জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আসতে হয়। এমন জায়গায় যেন সে পথ চিনে আসতে না পারে। আপনার দুঃখ এই বিড়ালগুলির কোন একটার সঙ্গে বেধে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যেন পথ চিনে আসতে না পারে। ব্যস, আপনার দুঃখ একটা কমলো।
বিস্মিত আমি লোকটির দিকে চেয়ে রইলাম। এভাবেও দুঃখকে খেদানো যায়?
যাবে না কেন? দুঃখ দূর করতে আসছেন আর বিড়ালের কথা শুনে অবাক হচ্ছেন?
তাও বটে! আমিই তো দুঃখ দূর করতে ভদ্রলোকের খোঁজে এসেছি। তাহলে এত অবাক হওয়ার কী আছে!
আমার দুঃখটার ওজন শুনে তিনি একটা সাদার সঙ্গে কালো ছোপের বিড়াল হাতে নিলেন। এর একটা চোখ কালো ছোপের মধ্যে পড়ায় দেখতে একটু রহস্যময় লাগছে। যাই হোক, বিড়াল পছন্দের কিছু নেই। এ বিড়াল আমি পালবো না। আসল জিনিস হচ্ছে দুঃখের ওজন।
দরাদরি করতে হলো একটু। লোকটা রেগে গিয়ে বলল, এই জন্যই আপনাদের দুঃখ যায় না বুঝলেন! সব সময় টাকার কথাই চিন্তা করেন!
থতমত খেয়ে তার দরেই কিনতে হলো (বিড়াল?)। একটা চটের ব্যাগে বিড়ালটা ভরে আমার হাতে দিলেন। তারপর নিজেও দেখি একটা চটের ব্যাগ নিয়ে একটা বিড়াল বেছে নিলেন।
এটা কার জন্য?
আর কার জন্য ভাই, আমার জন্য!
আপনারও দুঃখ ছেড়ে দিয়ে আসতে হয়?
আজব কথা! দুঃখের বিজনেস করি বলে কি আমার দুঃখ থাকবে না? এই আপনি আসার একটু আগেই একচোট হয়ে গেছে। মানে আমার স্ত্রীর সঙ্গে। কী জিনিসের সঙ্গে যে ভাই বাস করছি!
সন্ধ্যার একটু আগে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। আকাশে মেঘ। বৃষ্টি নামবে বলে মনে হচ্ছে।
ভদ্রলোক বললেন, চলুন, বিড়াল ছেড়ে দিয়ে আসি। যদি আপনার নিজের কোন পছন্দের জায়গা থাকে তো সেখানে যেতে পারেন।
না, না, আমার বিশেষ কোন জায়গা নেই। চলুন আপনার সঙ্গেই যাই।
ব্যাগের ভেতর বিড়াল নড়ছে। নখ দিয়ে চটে আঁচড় কাটছে। ভদ্রলোকের বাড়িটা শহরতলীর দিকে। সেখান থেকে যত ভেতরে যাচ্ছি গ্রামীণ পরিবেশের ছবি ফুটে উঠছে। ইট বিছানো কাঁচা রাস্তা। দু’পাশে গাছের সাড়ি। পথ যত এগুচ্ছে জনবিরল হয়ে পড়ছে। এভাবে ঘন্টা দেড় হাঁটার পর একদম জনমানুষ শূন্য একটা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম।
ঘেমেনেয়ে গিয়েছিলাম। বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরম ছিল। আকাশে মেঘ স্থীর হয়ে আছে। পুরো পথটা একটা নদীর পারে এসে থেমে গেছে। নদীর ওপার বলতে কিছু নেই। যতদূর চোখ যায় কেবল জল।
ভদ্রলোক আমার দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বললেন, দেখেন!
একটা ঝোঁপের আড়াল থেকে তিনি চোখ দিয়ে আমাকে ইশারা করলেন। চেয়ে দেখি নদীর পাড়ে কয়েক হাজার বিড়াল হেঁটে বেড়াচ্ছে! কেউ গা চুলকাচ্ছে। কেউ অলসভাবে শুয়ে আছে। বাহারী রঙের বিভিন্ন সাইজের সব বিড়াল!
আমিও ফিসফিস করে বললাম, এত বিড়াল? কি করছে এখানে?
ওগুলো বিড়াল নয়। সব দুঃখ। ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিলাম। যদি একবার পথ চিনতে পারে তাহলে আবার ফিরে আসবে। তাই বেশি কাছে যাওয়া যাবে না। বাতাসে আমাদের গায়ে গন্ধ পেলে দুঃখগুলো মানে বিড়ালগুলো আবার আমাদের পিছু নিবে। তাই খুব সাবধান। বুঝলেন?
কিছু না বুঝেই মাথা নাড়লাম। ভদ্রলোক চোখ পিটিপিট করে আমাকে ইশারায় বুঝালেন সময় হয়ে গেছে। বিড়াল ছাড়তে হবে। তিনি দেখিয়ে দিবেন কিভাবে কাজটা করতে হবে।
ব্যাগের গিঁটটা খুলে মুচড়ে নিয়ে এক টানে ছুড়ে মারবেন ঔখানে। বুঝলেন তো? ঠিক মত ছুড়তে না পারলে ব্যাটা যদি আমাদের গায়ের গন্ধ পায় তো আমাদের পিছু নিবে। মনে রাখবেন যার দুঃখ তাকেই ছুড়তে হবে। আমি ছুড়লে আমার দুঃখ পালাবে। ঠিক আছে?
ভদ্রলোক খুব কায়দা করে অভিজ্ঞ হাতে একটা টানে ব্যাগটা ছুড়ে মারলেন। একদম টিপ মত ব্যাগটা উড়ে গিয়ে নদীর পাড়ে যেখানে বিড়ালগুলো হাঁটছিল সেখানে গিয়ে পড়ল। চটের ব্যাগ থেকে একটা বিড়াল বেরিয়ে মাথা ঝাঁকা দিয়ে এদিক ওদিক তাকালো। বাকী বিড়ালরা তার দিকে ফিরেও তাকালো না।
এবার আমার পালা। আমি ঢোগ গিলে ব্যাগটা উপড় করে ধরে এক টানে যেই মারতে গেছি অনভিজ্ঞতায় ব্যাগটা ঠিক মত গিয়ে পড়লো না। ঝোঁপ থেকে হাত দশেক দুরে পড়েই মুখটা খুলে গেলো। আমি হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ভদ্রলোক শুধু মুখ দিয়ে শিস বের করার মত শব্দ করে বুঝালেন সর্বনাশ হয়ে গেছে!
আমাকে ছোঁ মরে নিয়ে তিনি দৌড় শুরু করলেন। ফিসফিস করে ভত্সনা করে বলতে লাগলেন, একটা দুঃখ ঠিক মরতে ছুড়ে মারতে পারলেন না! এখন বিপদ দেখছেন! ওরা আমাদের গায়ের গন্ধটা পেয়ে গেছে। আপনার বিড়াল বাকীদের সঙ্কেত দিয়েছে। সবগুলো এখন আমাদের তাড়া করছে! আপনি আসলে কোন কর্মের না!...
এই কথা খুব সত্যি। তাই কোন প্রতিবাদ করলাম না।
সন্ধ্যে নেমে গেছে। ঝোঁপঝার বনবাদার দিয়ে এলোপাথারি দৌড়াতে লাগলাম। আকাশে কালোমেঘ সন্ধ্যাটাকে আরো ঘন করে দিয়েছিল। অচেনা রাস্তায় দৌড়াতে গিয়ে বারবার পথের বাঁক চিনতে ভুল হচ্ছিল আর আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলাম। একবার পিছন ফিরে দেখি সবুজ জোনাকীর আলোর মত জোড়া জোড়া চোখ ধেয়ে আসছে। এইসব দুঃখগুলো তো আমার নয়। অন্যের দুঃখের বোঝা কি এখন আমাকে নিতে হবে? এটা তো অন্যায়!
ভদ্রলোক ধমক দিয়ে বললেন, ন্যায় অন্যায়ের বিচার করতে কে বসেছে বলেন তো পৃথিবীতে? অন্যের দুঃখই শুধু নয়, অন্যের কর্মফলও মানুষ ভোগ করে। এখন যদি ঠিক মত পালাতে না পারেন তো এইসব দুঃখ আমাদের দুজনকেই বহন করতে হবে। তাই পালান! চোখ বন্ধ করে পালান...
কিন্তু পালাবো কোথায়? এখানে কয়েক হাজার দুঃখ যদি আমার ঘাড়ে এসে না পড়েও তবু কি নিস্তার আছে? আবার কি এই ভদ্রলোকের কাছ থেকে আমাকে দুঃখ কিনে খেদাতে বের হতে হবে না?
ভদ্রলোক থেমে গিয়ে বলল, কি করতে চান কি আপনি বলেন তো?
আমার দুঃখ আমার কাছেই থাক।
মানে?
বিড়ালটা ততক্ষণে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমার দিকে চেয়ে মিউ মিউ করছে। আদুরে স্বরে আমার দুঃখ আমার দিকে চেয়ে আছে। এমন মায়া হলো আমার। ওকে কোলে তুলে নিলাম।
বাকী বিড়ালগুলো আমাদের সামনে এসে ঘুরঘুর করে গন্ধ শোঁকার মত করে থেমে গেলো। এমনকি ভদ্রলোকের ছেড়ে দেয়া বিড়ালটাও আর ফিরে আসলো না। ওরা নদীর দিকে পা বাড়ালো।
ভদ্রলোক কাঁধ ঝাঁকালো। বিরক্ত হয়ে বলল, যা ভালো মনে করেন করুন! বলেই তিনি আমাকে ফেলে একা হনহন করে হাঁটতে লাগলেন।
আকাশে মেঘের গর্জন হলো। বৃষ্টি নামবে। আমি কেবল একা আমার বিড়াল নিয়ে ফিরে এলাম।
-সুষুপ্ত পাঠক

No comments:

Post a Comment