ক্ষমতা কেমন দেখতে? একজন রাজা সিংহাসনে বসে আছেন, তাঁর হাতে তরোয়াল। এই ছবিটা আমরা চিনি। কিন্তু ফ্রানৎস কাফকা (Franz Kafka) বললেন আধুনিক ক্ষমতা এরকম নয়। আধুনিক ক্ষমতার কোনো মুখ নেই, কোনো কেন্দ্র নেই, কোনো তরোয়াল নেই। সে আছে নিয়মের মধ্যে, ফর্মের মধ্যে, কর্মকর্তার মধ্যে, প্রক্রিয়ার মধ্যে। এবং এই ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রায় অসম্ভব, কারণ কাকে প্রশ্ন করবে তুমি জানো না।
এই ধারণাটাই কাফকার সমস্ত লেখার কেন্দ্রে। তিনি উপন্যাস লিখেছেন, দর্শন নয়। কিন্তু তাঁর উপন্যাসগুলো এমন একটি পৃথিবীর ছবি এঁকেছে যা আধুনিক ক্ষমতার সবচেয়ে সঠিক বর্ণনা। আলবেয়ার কামু (Albert Camus) বলেছিলেন কাফকার লেখা Absurd সাহিত্যের সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ। কিন্তু কাফকা শুধু Absurd-এর সাহিত্যিক প্রতিনিধি নন। তিনি ক্ষমতার এমন একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন যা মিশেল ফুকো (Michel Foucault) বা হান্নাহ আরেন্টের (Hannah Arendt) তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত।
*দ্য ট্রায়াল* উপন্যাসে জোসেফ কে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানল সে গ্রেপ্তার। কেন? সে জানে না। কী অভিযোগ? কেউ বলে না। কোন আদালতে বিচার হবে? অস্পষ্ট। সে বছরের পর বছর এই অদৃশ্য বিচার ব্যবস্থার মধ্যে ঘুরতে থাকে। প্রতিটি দরজা খুলে আরেকটি দরজা। প্রতিটি কর্মকর্তার পেছনে আরেকজন কর্মকর্তা। এবং শেষ পর্যন্ত সে মারা যায়, কোনো উত্তর না পেয়ে।
এই গল্পের মূল কথা হলো ক্ষমতা যখন নিজের মুখ লুকিয়ে রাখে, যখন বলা যায় না এই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে, এই অভিযোগ কে করেছে, তখন মানুষ প্রতিরোধ করতে পারে না। কারণ প্রতিরোধ করতে হলে শত্রুকে চিনতে হয়। জোসেফ কে নির্দোষ হতে পারে, কিন্তু সিস্টেম তাকে অপরাধী বলছে। এবং ধীরে ধীরে সে নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করে সে হয়তো সত্যিই কিছু একটা করেছে। এখানে ফুকোর Panopticon-এর সাথে কাফকার সংযোগ স্পষ্ট। ফুকো বলেছিলেন আধুনিক ক্ষমতা মানুষকে নিজেই নিজের পাহারাদার বানিয়ে দেয়। কাফকা দেখিয়েছেন এই প্রক্রিয়াটা কেমন দেখায় যখন একজন মানুষ তার শিকার হয়।
*দ্য মেটামরফোসিস* উপন্যাসে গ্রেগর সামসা একদিন পোকায় পরিণত হয়। এই রূপান্তরটা বোঝার চাবিকাঠি হলো গ্রেগর কী ছিল। সে ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। প্রতিদিন কাজে যেত, টাকা আনত, পরিবার চলত। পোকা হয়ে যাওয়া মানে কাজ করার ক্ষমতা হারানো। এবং যখন সে কাজ করতে পারল না, পরিবার তাকে বোঝা মনে করল। শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল এবং পরিবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
এই গল্পে কাফকা বলছেন আধুনিক সমাজে মানুষের মূল্য তার উৎপাদনশীলতায়। যখন সে উৎপাদন করতে পারে না, সে মানুষ থাকে না, পোকা হয়ে যায়। এটা কার্ল মার্ক্সের (Karl Marx) Alienation বা বিচ্ছিন্নতার ধারণার সাথে মিলে যায়। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ তার শ্রম থেকে, তার মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কাফকা এই বিচ্ছিন্নতাকে একটি পোকায় রূপান্তরের মাধ্যমে দেখালেন।
*দ্য ক্যাসেল* উপন্যাসে কে একটি গ্রামে আসে এবং দুর্গে প্রবেশ করতে চায় যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্র। কিন্তু সে কখনো পৌঁছাতে পারে না। দুর্গ সবসময় দূরে। ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানো অসম্ভব। এটাই কাফকার ক্ষমতার সবচেয়ে গভীর বর্ণনা। ক্ষমতা আছে, সবাই জানে আছে, কিন্তু কোথায় আছে তা কেউ জানে না। এবং যখন কোথায় আছে জানা যায় না, তখন প্রতিরোধও সম্ভব হয় না।
এখন কাফকা ও কামুর তুলনাটা করা যাক। কারণ এই দুজনকে একসাথে না পড়লে দুজনের কেউই সম্পূর্ণ হয় না।
দুজনই Absurd-এর প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেছেন। দুজনই দেখিয়েছেন পৃথিবী মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।
কামুর Absurd একটি সম্পর্ক। মানুষ অর্থ চায়, পৃথিবী নীরব থাকে। এই সংঘাতের মধ্যে কামু দেখেন বিদ্রোহের সম্ভাবনা। সিসিফাস পাথর তুলতে থাকে এবং সে সুখী। কারণ সে তার পরিস্থিতির মালিক। কামুর মানুষ সক্রিয়, সে বেছে নেয়, সে বিদ্রোহ করে।
কাফকার Absurd ভিন্ন। জোসেফ কে বিদ্রোহ করতে চায়, কিন্তু কার বিরুদ্ধে করবে? ক্ষমতার কোনো মুখ নেই। গ্রেগর সামসা পোকা হয়ে যায় এবং মারা যায়। কে দুর্গে পৌঁছাতে পারে না। কাফকার মানুষ নিষ্ক্রিয় নয়, কিন্তু তার প্রতিটি সক্রিয়তা ব্যর্থ হয়। কারণ সিস্টেম এতটাই জটিল যে তার মধ্যে ব্যক্তির কোনো জায়গা নেই।
কামু বলেছিলেন সিসিফাসকে সুখী কল্পনা করতে হবে। কাফকা বলতেন জোসেফ কে-কে সুখী কল্পনা করা সম্ভব নয়। কারণ সিসিফাস জানে তার শত্রু কে। দেবতারা তাকে শাস্তি দিয়েছে, এটা স্পষ্ট। কিন্তু জোসেফ কে জানে না তার শত্রু কে। এই না জানাটাই কাফকার পৃথিবীকে কামুর পৃথিবীর চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর করে।
কিন্তু দুজনের মধ্যে একটি গভীর মিলও আছে। দুজনই দেখিয়েছেন মানুষ যখন অর্থহীনতার মুখোমুখি হয়, তখন তার কাছে দুটি পথ থাকে। হয় সে আত্মসমর্পণ করে। নয়তো সে প্রশ্ন করতে থাকে, জানতে চাইতে থাকে, যদিও কোনো উত্তর না আসে। কামুর ভাষায় এটাই বিদ্রোহ। কাফকার ভাষায় এটাই টিকে থাকা।
কাফকায়েস্ক: যখন পৃথিবীটা উপন্যাসের মতো হয়ে যায়
--------------------------------------
কাফকার নাম একটি বিশেষণ হয়ে গেছে। কাফকায়েস্ক (Kafkaesque)। এই শব্দটা যখন মানুষ ব্যবহার করে, তখন সে বোঝাতে চায় এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে ক্ষমতা অদৃশ্য, নিয়ম অযৌক্তিক, এবং মানুষ সিস্টেমের মধ্যে হারিয়ে গেছে। এই শব্দটা তৈরি হয়েছে কারণ কাফকা যে পৃথিবী বর্ণনা করেছিলেন সেটা আজকের পৃথিবীর মতো।
একটি সাধারণ ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। তুমি একটি সরকারি অফিসে গেছ একটি সমস্যার সমাধান করতে। প্রথম কর্মকর্তা বলেন এটা তাঁর বিভাগের কাজ নয়, যাও পাশের বিভাগে। পাশের বিভাগ বলে এর জন্য আগে একটি ফর্ম পূরণ করতে হবে। ফর্ম পাওয়া যায় তৃতীয় বিভাগে। তৃতীয় বিভাগ বলে ফর্ম দেওয়া হয় শুধু সোমবার, আজ বুধবার। সোমবার এলে দেখা যায় ফর্মটা পূরণ করার আগে আরেকটি নথি দরকার যা পাওয়া যায় চতুর্থ বিভাগে। এই চক্র শেষ হয় না।
জোসেফ কে-এর অভিজ্ঞতার সাথে এর পার্থক্য কোথায়? কোনো পার্থক্য নেই। শুধু একটি পার্থক্য — জোসেফ কে-এর গল্পটা একটি উপন্যাস, তোমারটা বাস্তব জীবন।
কিন্তু কাফকায়েস্ক শুধু আমলাতন্ত্রের অভিজ্ঞতা নয়। কাফকার সবচেয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ছিল এই যে আধুনিক ক্ষমতার প্রতিটি অংশ যুক্তিসংগত, কিন্তু সামগ্রিকভাবে অযৌক্তিক। প্রতিটি নিয়মের একটি কারণ আছে। প্রতিটি প্রক্রিয়ার একটি উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু এই যুক্তিসংগত নিয়মগুলো একসাথে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে যা মানুষের জন্য সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। প্রতিটি অংশ সঠিক, কিন্তু পুরো ব্যবস্থাটা ভুল। এটাই কাফকায়েস্ক-এর সবচেয়ে গভীর দিক।
আজকের পৃথিবীতে এই অভিজ্ঞতা সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয় ডিজিটাল জগতে। তোমার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। কেন? একটি নোটিশ এসেছে, কমিউনিটি গাইডলাইন লঙ্ঘন। কোন গাইডলাইন? অস্পষ্ট। তুমি আপিল করলে। স্বয়ংক্রিয় উত্তর এলো, তোমার আবেদন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সপ্তাহ পার হলো, কোনো উত্তর নেই। কোনো মানুষের সাথে কথা বলার উপায় নেই। এটা জোসেফ কে-এর অভিজ্ঞতার ডিজিটাল সংস্করণ। একটি অভিযোগ আছে, কিন্তু কে করল জানা যায় না। একটি বিচার হচ্ছে, কিন্তু কোথায় হচ্ছে দেখা যায় না।
*দ্য মেটামরফোসিস*-এর গ্রেগর সামসার কথা মনে করুন। সে পোকা হয়ে গেল কারণ সে উৎপাদনশীল থাকতে পারল না। আজকের কর্মক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা ভিন্ন রূপে আসে। একজন কর্মী বছরের পর বছর কাজ করেছে। একদিন একটি ইমেইল এলো, তোমার পদ আর নেই, Artificial Intelligence এই কাজটা করবে। সে পোকা হয়ে যায়নি, কিন্তু সে গ্রেগর সামসার মতোই অনুভব করে। সিস্টেমের কাছে সে আর উপযোগী নয়।
কাফকায়েস্ক-এর আরেকটি মাত্রা আছে যা বাইরের ব্যবস্থার সাথে নয়, মানুষের ভেতরের অবস্থার সাথে সম্পর্কিত। জোসেফ কে শুধু একটি অযৌক্তিক বিচার ব্যবস্থার শিকার নয়। সে ধীরে ধীরে নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে হয়তো সত্যিই কিছু একটা করেছে। সিস্টেম তাকে অপরাধী বলছে। এবং যখন সিস্টেম বারবার একই কথা বলে, মানুষ নিজেই সন্দিহান হয়ে পড়ে।
আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে এই ভেতরের কারাগার আরও বড় হয়েছে। মানুষ জানে তার প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি সার্চ, প্রতিটি ক্লিক রেকর্ড হচ্ছে। কে দেখছে, কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সে জানে না। কিন্তু এই না জানার কারণেই সে সতর্ক হয়ে যায়। কিছু কথা বলে না। কিছু প্রশ্ন করে না। কিছু বিষয় সার্চ করে না। কেউ বলেনি করো না। কিন্তু সে নিজেই করে না। এটাই কাফকায়েস্ক আত্মসেন্সরশিপ।
কাফকার চিন্তার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। তাঁর পৃথিবীতে প্রতিরোধ প্রায় অসম্ভব মনে হয়। জোসেফ কে মারা যায়। কে দুর্গে পৌঁছাতে পারে না। গ্রেগর মারা যায়। কোনো মুক্তি নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি হতাশাবাদী হতে পারে। কিন্তু হয়তো এটাই কাফকার সততা। তিনি মিথ্যা আশা দেননি। তিনি শুধু দেখিয়েছেন পৃথিবীটা আসলে কেমন।
এবং এখানেই কাফকা ও কামুকে একসাথে পড়ার প্রয়োজনীয়তা। কাফকা দেখায় সিস্টেম কেমন। কামু বলে সেই সিস্টেমের মধ্যেও বিদ্রোহ সম্ভব। কাফকা বলেন জোসেফ কে মারা যায়। কামু বলেন সিসিফাস সুখী। দুটো সত্যই সত্য। সিস্টেম তোমাকে হারাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন করার ক্ষমতা তোমার।
কাফকা নিজে কখনো তাঁর লেখার ব্যাখ্যা দেননি। মৃত্যুর আগে বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে (Max Brod) বলেছিলেন সব পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিতে। ব্রড পোড়াননি। ফলে পৃথিবী কাফকাকে পেয়েছে। এই গল্পটাও কাফকায়েস্ক। নিজের লেখা সম্পর্কে নিজের ইচ্ছা পূরণ হয়নি। সিস্টেম, এবার বন্ধুত্বের সিস্টেম, তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গেছে। এবং সেই সিস্টেমের কারণেই আজ আমরা কাফকা পড়তে পারছি।
যখন কোনো অভিযোগ আসে এবং তুমি জানো না কেন এলো, যখন কোনো নিয়ম তোমাকে আটকে রাখে এবং তুমি জানো না কে তৈরি করেছে, যখন কোনো দরজা বন্ধ এবং তুমি জানো না কার কাছে চাবি, তখন দুটি পথ থাকে। কাফকার পথ, প্রশ্ন করতে থাকো, যদিও উত্তর নাও আসতে পারে। কামুর পথ, পাথর তুলতে থাকো, যদিও জানো পাথর আবার পড়বে। হয়তো দুটো পথ আসলে একটাই।
Kuloda Roy
---
**মূল সূত্র:**
কাফকার তিনটি মূল উপন্যাস *The Trial* (১৯২৫), *The Castle* (১৯২৬) এবং *The Metamorphosis* (১৯১৫) একসাথে পড়লে তাঁর চিন্তার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়। কামুর সাথে তুলনামূলক আলোচনার জন্য কামুর *The Myth of Sisyphus*-এ কাফকা-বিষয়ক অধ্যায়টি পড়া যেতে পারে। আধুনিক প্রেক্ষাপটে কাফকায়েস্ক বোঝার জন্য বিউং-চুল হানের (Byung-Chul Han) *In the Swarm* (২০১৭) এবং শোশানা জুবফের (Shoshana Zuboff) *The Age of Surveillance Capitalism* (২০১৯) পড়া যেতে পারে
No comments:
Post a Comment