-
আধুনিক শিক্ষাই সমস্যা। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিতরা সন্তানকে সংস্কৃতিশূন্য করে বড় করে তোলে। সংস্কৃতিশূন্যতা যে ফাঁকা স্থান বা ভয়েড তৈরি করে, সেখানেই বাসা বাঁধে মৌলবাদ। সেটা ধর্মীয় হোক বা নাস্তিকতা অথবা আধুনিকতাবাদ। এর অর্থ এই নয় যে আমরা শিক্ষিত হব না। ভুলটা হচ্ছে বক্তৃতার মাধ্যমে শিক্ষা (education by preaching)।
পশ্চিমা জ্ঞান যখন হামাগুড়ি দেয়, ভারতীয় জ্ঞান তখন পরিপূর্ণ যুবক। আজও গীতা, উপনিষদ এমনই জ্ঞানের আধার যে জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারসহ আরও অনেক পণ্ডিত, টি. এস. এলিয়ট, ম্যাক্স মুলারের মতো লোক, এরভিন শ্রোয়েডিঙ্গারের মতো কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের জনকেরা এ থেকে শিক্ষা তো বটেই, সেগুলোর লিখিত বর্ণনাও করে গেছেন।
নিলস বোর, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের মতো বিজ্ঞানীরাও বেদ আর উপনিষদ থেকে ধারণা পেয়েছেন, যেগুলো তাঁদের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলে বলে তাঁরা লিখে গেছেন। পদার্থবিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ট্যালেন্ট হিসেবে যাকে মনে করা হয়, সেই রবার্ট ওপেনহাইমার ১৯৩৩ সালে সংস্কৃত শেখেন নিজে সংস্কৃত ভাষায় মৌলিক গীতা পড়ার জন্য।
সেই উপনিষদে বলা আছে, ছাত্র পরিণত না হলে তাকে শিক্ষার মতো ক্ষমতাশালী জিনিস দেওয়া যাবে না। দিলে সে অপপ্রয়োগ করবে। তাই ভারতীয় সনাতন শিক্ষাব্যবস্থায় বক্তৃতা দিয়ে শিক্ষা দেয়া নিষেধ ছিল। সেখানে শেখানোর পদ্ধতি ছিল - শিক্ষক নিজে জ্ঞান দেবেন না, তিনি ছাত্রের মনে আসা প্রশ্নের উত্তর দেবে মাত্র। ছাত্র যত পরিণত হবে, সে তত জটিল বাস্তবতার সম্মুখীন হবে। তখন ক্রমে তার বোধ জাগ্রত হবে এবং তার মনে প্রশ্নের উদয় হবে। তখন তার প্রশ্ন অনুযায়ী শিক্ষক তাকে জ্ঞান দেবেন এবং সেই জ্ঞন ও নিজের প্রস্তুতকৃত মনে আসা প্রশ্নের উত্তরের মিথস্ক্রিয়ায় প্রকৃত শিক্ষা সে পাবে। সেই শিক্ষা হবে তার সার্বিক মানসিক বৃদ্ধির সাথে সংযুক্ত ও পগ্রসরমান।
কিন্তু আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষা ঠিক তার বিপরীত। বক্তৃতার মাধ্যমে তারা শিক্ষা দেয় এমনভাবে, যে ছাত্রের মনে জ্ঞান সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয় মাত্র গুটিকয়েক আত্মসন্ধানী ছাত্র ব্যতিত। এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় দেয়া শিক্ষা প্রকৃতভাবে হল প্রশিক্ষণ বা ট্রেনিং। যখন প্রশিক্ষত বিষয়টি ছাড়া আর কিছু সে বোঝে না। বুঝলেই তাকে আর যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না। বাইবেল, ইসলামের শিক্ষাও একই - সেই বক্তৃতার মাধ্যমে শিক্ষা; রোমের প্রভাবেই যেগুলোর জন্ম ও প্রসার। মৌলবাদী দাস সমাজ তৈরির জন্য।
এই আত্মঘাতী শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের ফলে মাত্র একশ বছরেই মানব সমাজ শুধু নিজে নয়, সমস্ত প্রাণীকুলও বিপর্যয়ের পথে।
© সিরাজুল হোসেন
No comments:
Post a Comment