আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রতিদিনের মতো আজও তার মনে কোনো দ্বিধা নেই—এটাই সে। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই প্রশ্ন জাগে, সত্যিই কি তাই? দশ বছর আগে তার মুখ এমন ছিল না। শরীরের অসংখ্য কোষ বদলে গেছে। স্মৃতি বদলেছে, বিশ্বাস বদলেছে, ভাষা বদলেছে, সম্পর্ক বদলেছে। যে মানুষটি একসময় একটি ঘটনার জন্য গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিল, আজ হয়তো সেই ঘটনাটির গুরুত্বই অনুভব করে না। তবু সে বলে, "আমি একই মানুষ।" এই "একই" কথাটির অর্থ কী? কোথায় সেই স্থির সত্তা, যা এত পরিবর্তনের মধ্যেও অপরিবর্তিত থেকে যায়?
মানুষের চিন্তার ইতিহাসে খুব কম দার্শনিকই এই প্রশ্নটিকে নাগার্জুনের মতো এত দূর পর্যন্ত অনুসরণ করেছেন। দ্বিতীয় শতাব্দীর এই ভারতীয় দার্শনিক পৃথিবীকে অস্বীকার করেননি, আবার তাকে সহজও করে দেখেননি। তিনি শুধু জানতে চেয়েছিলেন, আমরা যে পৃথিবীকে এত স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, তাকে কি সত্যিই বুঝেছি? আমরা যে জিনিসগুলোকে আলাদা আলাদা বস্তু বলে দেখি, সেগুলো কি সত্যিই নিজেদের জোরে অস্তিত্বশীল, নাকি আমরা সেভাবেই ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি?
নাগার্জুন মহাযান বৌদ্ধধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এবং মধ্যমক দর্শনের প্রধান নির্মাতা। কিন্তু তাঁর গুরুত্ব কেবল একটি দর্শনশাস্ত্র গড়ে তোলার মধ্যে নয়। তিনি মানুষের এমন এক বৌদ্ধিক অভ্যাসকে প্রশ্ন করেছিলেন, যা আমরা প্রায় কখনোই লক্ষ্য করি না। আমরা মনে করি, প্রতিটি জিনিসের একটি নিজস্ব প্রকৃতি আছে। একটি গাছ গাছ, একটি পাথর পাথর, একটি নদী নদী, একটি মানুষ মানুষ—কারণ তাদের প্রত্যেকের ভেতরে যেন এমন একটি স্থির, স্বাধীন ও অপরিবর্তনীয় সত্তা আছে, যা তাকে সে-ই করে তোলে। ভারতীয় দর্শনের ভাষায় এই ধারণার নাম স্বভাব (Svabhāva)। নাগার্জুনের সমগ্র দর্শনকে এক অর্থে এই ধারণারই দীর্ঘ ও গভীর সমালোচনা বলা যায়।
ধরা যাক, একটি গাছের কথা। আমরা বলি, "ওটা একটি গাছ।" কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, গাছটি কি সত্যিই শুধু গাছ? মাটি ছাড়া কি গাছ সম্ভব? জল ছাড়া? সূর্যের আলো, বায়ু, ঋতুর পরিবর্তন, সময়, অণুজীব, ছত্রাক, পরাগবাহী পোকা—এসবের একটিও যদি না থাকত, তাহলে কি গাছটি থাকত? আমরা যে গাছটিকে একটি একক বস্তু বলে দেখি, তা আসলে অসংখ্য সম্পর্কের মিলিত ফল। গাছটি কোথায় শেষ হয় আর পৃথিবী কোথায় শুরু হয়—এই সীমারেখা টানা এত সহজ নয়।
একই প্রশ্ন মানুষকেও ঘিরে ধরে। আমরা বলি, "আমি"। কিন্তু এই "আমি" কোথায়? শুধু শরীরে? শরীর তো বদলে যায়। শুধু স্মৃতিতে? স্মৃতিও ভেঙে যায়, মুছে যায়। ভাষায়? সম্পর্কে? অভিজ্ঞতায়? যদি এদের একে একে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কি এমন কোনো স্থির কেন্দ্র অবশিষ্ট থাকে, যাকে নিঃসন্দেহে "আমি" বলা যায়? নাগার্জুন মনে করতেন, আমরা যে স্থায়ী আত্মপরিচয়ের ধারণাকে এত সহজে মেনে নিই, সেটিও পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
এই প্রশ্নগুলো কোনো কৌতূহলের খেলা নয়। এগুলো আমাদের চিন্তার ভিত্তিকেই স্পর্শ করে। কারণ যদি কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করে, তাহলে তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলা যায় কীভাবে? আবার যদি সত্যিই কোনো কিছু সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়, তাহলে তার বদলানোর কথাই বা কেন? যা নিজের জোরে সম্পূর্ণ, তার তো অন্য কিছুর প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পৃথিবীতে আমরা যা দেখি, সবই পরিবর্তনশীল। একটি বীজ গাছে পরিণত হয়, গাছ শুকিয়ে যায়, কাঠ হয়, আগুনে পুড়ে ছাই হয়, সেই ছাই আবার মাটির অংশ হয়ে যায়। পরিবর্তনই যদি বাস্তবতার স্বাভাবিক রূপ হয়, তাহলে অপরিবর্তনীয় স্বভাবের ধারণা কোথা থেকে এল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই নাগার্জুন বুদ্ধের একটি মৌলিক ধারণাকে নতুন গভীরতা দেন। বুদ্ধ বলেছিলেন, কোনো কিছুই একা জন্মায় না; সবকিছুই কারণ ও শর্তের ওপর নির্ভর করে উদ্ভূত হয়। এই ধারণার নাম প্রতীত্যসমুৎপাদ। নাগার্জুন বললেন, যদি কোনো কিছুর অস্তিত্বই অন্য কিছুর ওপর নির্ভর করে, তাহলে তার নিজের বলে কোনো স্বাধীন স্বভাব থাকতে পারে না। নির্ভরশীল হওয়া এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন হওয়া একই সঙ্গে সম্ভব নয়।
এই যুক্তি থেকেই তিনি এমন একটি ধারণায় পৌঁছান, যা বৌদ্ধ দর্শনের ইতিহাসে যেমন প্রভাবশালী, তেমনি সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা ধারণাগুলোর একটি—শূন্যতা (Śūnyatā)। অনেকেই মনে করেন, শূন্যতা মানে কিছুই নেই। যেন পৃথিবী অর্থহীন, সবকিছুই মায়া। কিন্তু নাগার্জুনের বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি পৃথিবীকে অস্বীকার করেননি; তিনি অস্বীকার করেছিলেন পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের সেই ধারণাকে, যেখানে প্রতিটি বস্তু যেন নিজের ভেতরে একটি চিরস্থায়ী সারবস্তু বহন করে। শূন্যতা মানে অস্তিত্বহীনতা নয়; স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অপরিবর্তনীয় স্বভাব থেকে শূন্য হওয়া।
এই উপলব্ধির পর পৃথিবীকে আগের মতো দেখা কঠিন হয়ে যায়। একটি ফুল তখন আর শুধু একটি ফুল থাকে না; তার ভেতরে মাটি, বৃষ্টি, সূর্যের আলো, ঋতু, সময় এবং অসংখ্য জীবনের স্পর্শ দেখা যায়। একজন মানুষ তখন আর একটি মাত্র পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার ভেতরে ইতিহাস, ভাষা, সম্পর্ক, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার দীর্ঘ প্রবাহকে দেখা যায়। এমনকি নিজের "আমি"-কেও তখন একটি বিচ্ছিন্ন সত্তা বলে মনে হয় না; বরং মনে হয়, সেটিও অসংখ্য সম্পর্কের বোনা এক চলমান বাস্তবতা।
সম্ভবত এটাই নাগার্জুনের দর্শনের প্রথম শিক্ষা। তিনি আমাদের বলেন না যে পৃথিবী নেই; তিনি আমাদের শেখান, পৃথিবীকে এমনভাবে দেখতে, যেখানে কোনো কিছুই একা নয়। আমরা যাকে আলাদা বস্তু বলে দেখি, তা হয়তো সম্পর্কের একটি সাময়িক বিন্যাস মাত্র। আর এই প্রশ্নটি একবার সত্যিই মনে জেগে উঠলে, পৃথিবীকে আগের মতো করে দেখা আর সহজ থাকে না।
শূন্যতা: কিছুই নেই, নাকি সবকিছু সম্পর্কের মধ্যে আছে?
--------------------------------------------------
শূন্যতা—নাগার্জুনের দর্শনের এই শব্দটি যতবার উচ্চারিত হয়েছে, সম্ভবত ততবারই ভুল বোঝা হয়েছে। আজও অনেকের ধারণা, শূন্যতা মানে পৃথিবীতে কিছুই নেই; সবই মায়া, সবই অর্থহীন। এই ভুল ধারণার কারণে নাগার্জুনকে কখনও কখনও নৈরাশ্যবাদী বলেও মনে করা হয়েছে। অথচ তাঁর দর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তিই হলো, তিনি এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছান না যা আমাদের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে। বরং তিনি এমনভাবে পৃথিবীর দিকে তাকাতে শেখান, যাতে আমরা প্রথমবারের মতো দেখতে পাই—আমরা কোনো দিনই একা ছিলাম না।
একটি কাগজের দিকে তাকান। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ বস্তু। কিন্তু একটু ধীরে ভাবতে শুরু করলে দেখা যায়, কাগজটি কেবল কাগজ নয়। এর ভেতরে একটি গাছ আছে। আছে মাটি, বৃষ্টি, সূর্যের আলো, বাতাস ও ঋতুর পরিবর্তন। আছে সেই মানুষের শ্রম, যিনি গাছটি কেটেছেন; সেই কারখানার শ্রমিক, যিনি কাঠকে কাগজে রূপ দিয়েছেন; সেই চালক, যিনি এটি বহন করেছেন; সেই দোকান, যেখান থেকে এটি আপনার হাতে এসেছে। এমনকি আপনি নিজেও এই কাগজের অংশ। কারণ পড়ার বা লেখার কেউ না থাকলে এই কাগজের অর্থও বদলে যায়। আমরা যাকে একটি বস্তু বলে দেখি, তার ভেতরে আসলে অগণিত সম্পর্ক, কারণ ও ঘটনার স্তর জমা হয়ে আছে।
নাগার্জুন বলছেন না যে কাগজ নেই। তিনি বলছেন, কাগজকে তার সম্পর্কগুলো থেকে আলাদা করে দেখার অভ্যাসই আমাদের বিভ্রান্ত করে। আমরা একটি নাম দিই—"কাগজ"—তারপর মনে করতে শুরু করি, এই নামের আড়ালে নিশ্চয়ই এমন একটি স্বাধীন সত্তা আছে, যা অন্য সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু কোথায় সেই স্বাধীন সত্তা? গাছকে সরিয়ে দিলে? জলকে সরিয়ে দিলে? শ্রমকে সরিয়ে দিলে? সময়কে সরিয়ে দিলে? কোন বিন্দুতে এসে আমরা বলব, "এটাই কাগজের নিজের স্বভাব"?
এই প্রশ্নটি শুধু কাগজের নয়; পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটি নদী কোথায়? তার জলে? কিন্তু আজকের জল তো আগামীকাল আর থাকবে না। তার তীরে? তীরও বদলায়। তার প্রবাহে? প্রবাহ তো প্রতি মুহূর্তে নতুন। তবু আমরা একটি নাম দিয়ে তাকে একই নদী বলে ডাকি। নামটি ভুল নয়; নাম ছাড়া আমাদের জীবন চলবে না। কিন্তু নামটি যদি আমাদের বিশ্বাস করিয়ে দেয় যে নদীর ভেতরে কোথাও একটি অপরিবর্তনীয় সারবস্তু লুকিয়ে আছে, তখনই ভুল শুরু হয়।
এইখানেই নাগার্জুনের দর্শন ভাষার সমালোচনায় পৌঁছে যায়। মানুষ ভাষার সাহায্যে পৃথিবীকে বোঝে। আমরা বলি—গাছ, নদী, দেশ, ধর্ম, জাতি, বন্ধু, শত্রু, আমি। এই শব্দগুলো ছাড়া চিন্তা করাও কঠিন। কিন্তু ভাষার সুবিধাই ধীরে ধীরে আমাদের ফাঁদে ফেলে। আমরা শব্দকে ব্যবহার করতে করতে একসময় ভাবতে শুরু করি, শব্দের মধ্যেই যেন বাস্তবতার শেষ সত্য লুকিয়ে আছে। নাগার্জুন আমাদের সেই ঘোর কাটাতে চান। তিনি ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করেন না; বরং মনে করিয়ে দেন, ভাষা একটি মানচিত্র, পৃথিবী নয়। মানচিত্র পথ দেখায়, কিন্তু মানচিত্র কখনোই পুরো ভূখণ্ড হয়ে ওঠে না।
এই কারণেই তিনি বলেন, কোনো কিছুর নিজস্ব, স্বাধীন স্বভাব নেই। এই বক্তব্যের অর্থ পৃথিবী শূন্য নয়; বরং পৃথিবীর কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়। একটি ফুলকে আপনি যদি সত্যিই দেখতে চান, তাহলে কেবল তার পাপড়ির দিকে তাকালে হবে না। তার ভেতরে মাটিকে দেখতে হবে, বৃষ্টিকে দেখতে হবে, সূর্যের আলোকে দেখতে হবে, মৌমাছির উড়ানকে দেখতে হবে, ঋতুর পরিবর্তনকে দেখতে হবে। ফুলটি একা নয়; অসংখ্য সম্পর্কের মধ্যেই তার জন্ম।
একই কথা মানুষের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা খুব সহজে একজন মানুষকে একটি পরিচয়ে বেঁধে ফেলি। বলি, সে ভালো, সে খারাপ, সে সফল, সে ব্যর্থ। যেন একটি শব্দই তার সম্পূর্ণ পরিচয়। কিন্তু মানুষ কি সত্যিই এত সরল? একজন মানুষের ভেতরে থাকে তার শৈশব, পরিবার, শিক্ষা, ভাষা, সমাজ, প্রেম, ভয়, ব্যর্থতা, আশা, স্মৃতি এবং প্রতিদিনের পরিবর্তন। তাকে একটি মাত্র শব্দে ধরে ফেলতে চাওয়া মানে একটি বিশাল নদীকে এক মুঠো জলে মাপতে চাওয়া।
এই দৃষ্টিভঙ্গি নৈতিকতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমি বুঝতে পারি যে আমার অস্তিত্ব অন্যদের শ্রম, ভালোবাসা ও সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে অহংকারের জায়গা ছোট হয়ে আসে। যদি বুঝতে পারি যে অন্য মানুষের জীবনও অসংখ্য কারণ ও শর্তের দ্বারা গঠিত, তাহলে বিচার করার আগে বোঝার ইচ্ছা জন্মায়। এর অর্থ এই নয় যে অন্যায়কে ক্ষমা করে দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, মানুষের কাজের দায় স্বীকার করার পাশাপাশি সেই কাজের পেছনের জটিল বাস্তবতাকেও দেখতে শেখা।
এই কারণেই শূন্যতার দর্শন নৈরাশ্যের নয়; এটি গভীর দায়িত্ববোধের দর্শন। আমরা কেউই আলাদা দ্বীপ নই। আমরা প্রত্যেকেই অন্যদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। আমাদের সিদ্ধান্ত অন্যের জীবনে প্রভাব ফেলে, অন্যের সিদ্ধান্ত আমাদের জীবনে। এই আন্তঃনির্ভরতার সত্যটি বুঝতে পারলে পৃথিবীকে আর আগের মতো দেখা যায় না।
সম্ভবত নাগার্জুনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। তিনি আমাদের বলেন না যে সবকিছু ছেড়ে দিতে হবে, কিংবা পৃথিবী অর্থহীন। তিনি বলেন, পৃথিবীকে এমনভাবে দেখো, যাতে তার সম্পর্কগুলো তোমার চোখ এড়িয়ে না যায়। আমরা যেসব পরিচয়, ধারণা এবং শব্দকে চূড়ান্ত বলে মনে করি, সেগুলো আসলে চলমান বাস্তবতার ওপর মানুষের তৈরি সাময়িক চিহ্ন। সেই চিহ্নগুলো দরকার, কিন্তু সেগুলোকেই যদি বাস্তবতা মনে করি, তাহলে আমরা পৃথিবীকে নয়, পৃথিবী সম্পর্কে নিজেদের ধারণাকেই দেখতে থাকি।
শূন্যতার দর্শন তাই কোনো শূন্যতার দর্শন নয়। এটি এমন এক পূর্ণতার দর্শন, যেখানে প্রতিটি অস্তিত্ব অন্য সব অস্তিত্বের সঙ্গে অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। সেই সুতোকে একবার দেখতে শেখা গেলে, গাছ, নদী, মানুষ কিংবা নিজের জীবন—কোনোটিই আর আগের মতো মনে হয় না।
নাগার্জুন: এক প্রাচীন দার্শনিক, নাকি আমাদের সমসাময়িক?
-----------------------------------------------------
প্রায় আঠারো শতক আগে একজন ভারতীয় দার্শনিক এমন একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যা আজও দর্শনের ইতিহাসে প্রতিধ্বনিত হয়—কোনো কিছুর কি নিজের বলে একটি স্বাধীন, অপরিবর্তনীয় স্বভাব আছে? এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ আমরা প্রায় সবাই এমন একটি পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে জিনিস, মানুষ, পরিচয়, এমনকি নিজের "আমি"-কেও স্থির বলে ধরে নিতে স্বস্তি বোধ করি। নাগার্জুন সেই স্বস্তির জায়গাটিকেই নাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
তাঁর দর্শনের বিরুদ্ধে তাই আপত্তিও কম ওঠেনি। ভারতীয় দর্শনের ন্যায়, বৈশেষিক এবং বেদান্তের বহু দার্শনিক মনে করেছিলেন, যদি কোনো কিছুর নিজস্ব স্বভাবই না থাকে, তাহলে জ্ঞান কীভাবে সম্ভব? আমরা কীভাবে একই মানুষকে চিনতে পারি, একই ভাষায় কথা বলতে পারি, একই পৃথিবীকে প্রতিদিন নতুন করে চিনতে পারি? যদি সবকিছুই কেবল সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বিন্যাস হয়, তাহলে স্থায়িত্বের অভিজ্ঞতা আসে কোথা থেকে?
এই আপত্তির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনই ধারাবাহিকতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিজ্ঞান নিয়ম খোঁজে, আইন পরিচয় ধরে, ইতিহাস ঘটনার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, যদি সবকিছুই পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে এই স্থিতির অনুভূতি কোথা থেকে আসে?
নাগার্জুনের উত্তর ছিল, পরিবর্তন আর ধারাবাহিকতা একে অপরের শত্রু নয়। একটি নদী প্রতিক্ষণ বদলায়, কিন্তু আমরা তাকে একই নদী বলি। একটি ভাষা শত শত বছরে রূপ বদলায়, তবু তার একটি পরিচয় থাকে। অর্থাৎ ধারাবাহিকতা বাস্তব, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতার জন্য কোনো চিরস্থায়ী সারবস্তুর প্রয়োজন নেই। সম্পর্কের ধারাবাহিকতাই আমাদের স্থায়িত্বের অনুভূতি দেয়।
আধুনিক সময়েও তাঁর দর্শন নতুনভাবে সমালোচিত হয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, যদি সব পরিচয়ই সম্পর্কনির্ভর হয়, তাহলে কি সত্য বলে কিছু থাকবে? যদি সব ধারণাই পরিবর্তনশীল হয়, তাহলে নৈতিকতার ভিত্তি কোথায়? অন্যায়কে অন্যায় বলব কীভাবে? এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শূন্যতার ধারণাকে ভুলভাবে বোঝা হলে মনে হতে পারে, সব মতই সমান, সব সত্যই আপেক্ষিক।
কিন্তু নাগার্জুনের বক্তব্য ছিল অন্যরকম। তিনি সত্যকে অস্বীকার করেননি; তিনি অস্বীকার করেছিলেন সেই অহংকারকে, যেখানে কেউ দাবি করে—আমার সত্যই শেষ সত্য। তাঁর দর্শন আমাদের জ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় না; বরং জ্ঞানের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, কোনো ধারণাই বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিকল্প নয়। ধারণা দরকার, ভাষা দরকার, তত্ত্ব দরকার—কিন্তু এগুলো সবই বাস্তবতাকে বোঝার উপায়, বাস্তবতা নিজে নয়।
এই কারণেই বিংশ শতাব্দীতে অনেক গবেষক নতুন করে নাগার্জুনকে পড়তে শুরু করেন। তাঁদের বিস্ময় ছিল, পৃথিবীর একেবারে ভিন্ন প্রান্তে, ভিন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্যের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকও এমন কিছু প্রশ্ন তুলেছেন, যা নাগার্জুনের চিন্তার সঙ্গে আশ্চর্যজনক সংলাপ তৈরি করে।
লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন দেখিয়েছিলেন, অনেক দার্শনিক সমস্যা আসলে ভাষার বিভ্রান্তি থেকে জন্ম নেয়। আমরা শব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করি, যেন প্রতিটি শব্দের আড়ালে একটি স্থির সারবস্তু লুকিয়ে আছে। কিন্তু শব্দের অর্থ তৈরি হয় তার ব্যবহারের মধ্যে। নাগার্জুনও ভাষার বিরুদ্ধে ছিলেন না; তিনি সতর্ক করেছিলেন, ভাষা দিয়ে তৈরি ধারণাগুলোকেই যদি আমরা স্বাধীন বাস্তবতা বলে ধরে নিই, তাহলে বিভ্রান্তি অবশ্যম্ভাবী।
জাক দেরিদা আবার দেখিয়েছিলেন, কোনো পাঠের অর্থ এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে না। অর্থ সবসময় সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠে, পরিবর্তিত হয়। পশ্চিমা দর্শনের যে ঐতিহ্য একটি চূড়ান্ত ভিত্তি বা স্থির কেন্দ্র খুঁজে ফিরেছে, দেরিদা তার সমালোচনা করেছিলেন। নাগার্জুনও স্বাধীন ও অপরিবর্তনীয় স্বভাবের ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন। তবে দুজনকে এক করে দেখলে ভুল হবে। দেরিদার কাজ মূলত ভাষা ও পাঠের বিশ্লেষণ; নাগার্জুনের চিন্তা একই সঙ্গে অস্তিত্ব, কারণ, দুঃখ এবং মুক্তির প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
ডেভিড হিউম যখন নিজের ভেতরে একটি স্থায়ী আত্মাকে খুঁজতে গেলেন, তখন তিনি বললেন, তিনি কোনো অপরিবর্তনীয় আত্মা দেখতে পান না; দেখতে পান অনুভূতি, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার একটানা প্রবাহ। এই পর্যবেক্ষণও নাগার্জুনের সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য তৈরি করে। দুজনের পথ আলাদা, যুক্তির ভিত্তি আলাদা, তবু তাঁরা দুজনেই মানুষের স্থির আত্মপরিচয়ের ধারণাকে প্রশ্ন করেন।
এই তুলনাগুলোর অর্থ এই নয় যে ভিটগেনস্টাইন, দেরিদা বা হিউম নাগার্জুনের উত্তরসূরি, কিংবা নাগার্জুন তাঁদের পূর্বসূরি। এমন কোনো ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রমাণ নেই। কিন্তু এই মিল আমাদের একটি বড় সত্যের দিকে নিয়ে যায়। পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা, ভাষা ও সময়ে দাঁড়িয়েও মানুষ বারবার একই ধরনের মৌলিক প্রশ্নে ফিরে এসেছে। কোনো কিছুর কি নিজের বলে একটি সারবস্তু আছে? ভাষা কি বাস্তবতাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে? মানুষ কি একটি স্থির সত্তা, নাকি একটি চলমান প্রক্রিয়া? এই প্রশ্নগুলোই নাগার্জুনকে কেবল ভারতীয় নয়, বিশ্বদর্শনের একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তকে পরিণত করেছে।
সম্ভবত এই কারণেই আজকের পৃথিবীতে নাগার্জুনকে নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আছে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষকে খুব দ্রুত একটি পরিচয়ে আটকে ফেলা হয়। কেউ উদারপন্থী, কেউ রক্ষণশীল; কেউ অভিবাসী, কেউ দেশপ্রেমিক; কেউ বিশ্বাসী, কেউ অবিশ্বাসী। একটি শব্দই যেন একটি জীবনের সমার্থক হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং পরিচয়ের রাজনীতি এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। আমরা মানুষকে বোঝার আগে তাকে একটি লেবেল দিই।
নাগার্জুন এই তাড়াহুড়ো থেকে আমাদের বিরত করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, কোনো মানুষই একটি মাত্র পরিচয়ে শেষ হয়ে যায় না। প্রত্যেক মানুষই সম্পর্ক, ইতিহাস, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, ব্যর্থতা, ভালোবাসা এবং পরিবর্তনের সমষ্টি। একটি শব্দ তাকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে না।
একই কথা আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা প্রায়ই বলি, "আমি এমনই", "আমার স্বভাবই এই", "আমি বদলাব না।" এই বাক্যগুলোর মধ্যেও যেন একটি স্থির আত্মপরিচয়ের বিশ্বাস কাজ করে। নাগার্জুন সেই বিশ্বাসকে আলগা করে দেন। যদি আমাদের অস্তিত্বও সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠে, তাহলে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও সবসময় খোলা থাকে। আমরা কেবল অতীতের তৈরি নই; প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত আমাদের নতুন করে তৈরি করে।
সম্ভবত এটাই নাগার্জুনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। তিনি আমাদের নতুন কোনো মতবাদ দিয়ে যাননি। তিনি আমাদের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছেন, যা দিয়ে আমরা নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে পারি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, দর্শনের কাজ সবসময় উত্তর দেওয়া নয়; কখনও কখনও দর্শনের কাজ হলো এমন প্রশ্ন করা, যার পরে পৃথিবীকে আর আগের মতো দেখা যায় না।
আর হয়তো সেই কারণেই নাগার্জুন আজও আমাদের সমসাময়িক। তিনি শুধু প্রাচীন ভারতের একজন বৌদ্ধ দার্শনিক নন; তিনি এমন একজন চিন্তক, যিনি আজও আমাদের সতর্ক করে দেন—যে মুহূর্তে আমরা কোনো ধারণা, কোনো পরিচয় বা কোনো সত্যকে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা করি, সেই মুহূর্তেই আমরা বাস্তবতার জটিলতাকে হারিয়ে ফেলতে শুরু করি। দর্শন তখন নতুন কোনো উত্তর দেয় না; বরং আমাদের চোখ খুলে দেয়, যাতে আমরা আবারও পৃথিবীকে দেখতে শিখি।
Kuloda Roy
No comments:
Post a Comment