Thursday, July 16, 2026

ভূত-ভগবান-শয়তান বনাম DNA : ১৬ লেখক : সুব্রত ঘোষ

 


পঞ্চাশ হাজার বছর আগের একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। ইউরেশিয়ার কোনো এক পাহাড়ের গায়ে দুটো দল মুখোমুখি। একদিকে নেয়ান্ডার্থাল — বিশাল চোয়াল, পুরু হাড়, বরফের মধ্যে লক্ষ বছর টিকে থাকা একটা প্রজাতি। অন্যদিকে হোমো সেপিয়েন্স — সরু হাড়, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, আফ্রিকা থেকে সবে এসেছে।
একটা ভয়ঙ্কর রণাঙ্গনে দুই দলের পুরুষরা হাতে পাথর তুলে নিয়েছে।‌
এটাই ছিল স্বাভাবিক। লক্ষ বছরের বিবর্তন পুরুষের শরীরে একটাই সংকেত দিয়েছে — অপরিচিত মানেই বিপদ, বিপদ মানেই আঘাত। ডাচ মনোবিজ্ঞানী মার্ক ভ্যান ভাগ্টে এই প্রবণতাকে বলেছেন male warrior hypothesis। ভ্যান ভাগ্টের মতে, মানব ইতিহাসের দীর্ঘ সময় জুড়ে বিভিন্ন ছোট ছোট দলের মধ্যে সম্পদের (খাদ্য, এলাকা, নারী) দখল নিয়ে লড়াই চলত। যারা এই লড়াইয়ে জিতত, তারাই টিকে থাকত। এই লড়াইয়ে পুরুষরাই মূলত অগ্রণী ভূমিকা পালন করত কারণ তাদের শারীরিক গঠন এবং টেস্টোস্টেরন হরমোন ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ের জন্য বেশি উপযুক্ত ছিল। পুরুষ দলবদ্ধ আগ্রাসনে বিশেষভাবে সক্ষম — কারণ হাজার হাজার বছর ধরে যে পুরুষ এলাকা রক্ষা করতে পারেনি, তার বংশ টেকেনি। সেই driver জিন আজও আমাদের শরীরে আছে।
কিন্তু সেদিন সেই পঞ্চাশ হাজার বছর আগের যুদ্ধে শুধুই পাথর ছোঁড়া হয়নি।
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে — আমাদের শরীরে আজ ২% নেয়ান্ডার্থাল জিন আছে। মানে দুটো প্রজাতির মিলন হয়েছিল। শুধু যুদ্ধ নয়, সংযোগও হয়েছিল। কিন্তু কীভাবে?
এখানে একটা বৈজ্ঞানিক রহস্য আছে।
আমাদের মাইটোকন্ড্রিয়াল DNA শুধু মায়ের কাছ থেকে আসে। বিজ্ঞানীরা হাজার হাজার মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াল DNA পরীক্ষা করেছেন — কোথাও নেয়ান্ডার্থাল মায়ের চিহ্ন নেই। মানে আমাদের আদিম মায়েরা ছিলেন সেপিয়েন্স। তাহলে এই ২% এলো কোথা থেকে? গবেষণার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বলছে সেপিয়েন্স নারী এবং নেয়ান্ডার্থাল পুরুষের মিলন থেকে। যেখানে দুই দলের পুরুষরা পাথর তুলেছিল, সেখানে সেপিয়েন্স নারী হাত বাড়িয়েছিলেন।
মনোবিজ্ঞানী শেলি টেলরের ভাষায শুধু যুদ্ধ নয়, সংযোগও ঘটেছিল। তিনি এই প্রবণতাকে বলেছেন ‘tend-and-befriend’—বিপদের মুখে পুরুষ যেখানে লড়াই বা পলায়নের দিকে ঝোঁকে, সেখানে নারী প্রায়ই সম্পর্ক তৈরি করে, জোট গড়ে। সেই হাত বাড়ানোর ফলেই আজ আমাদের শরীরে নেয়ান্ডার্থালের জিন বয়ে চলেছে।
সেই হাত বাড়ানোর ফলেই আজ আমাদের রক্তে নেয়ান্ডার্থালের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। সেই আদিম মায়েদের জৈবিক কূটনীতি টিকিয়ে রেখেছে মানবজাতিকে।
এবং এই কূটনৈতিক অবস্থানের পেছনেও আছে বিবর্তনের ধারাবাহিকতা। আদিম প্রবৃত্তিকে সামাল দিতে বিবর্তন আমাদের মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত রক্ষাকবচ দিয়েছে—তার নাম Prefrontal Cortex (PFC)। কুড়ি লক্ষ বছর বিবর্তনের পথ পেরিয়ে আমরা পেয়েছি শেষ দু তিন লক্ষ বছরে। মানে সদ্য সদ্যই বলা যায়।
মস্তিষ্কের গভীরে থাকা Amygdala যখন ভয়ে বা রাগে চিৎকার করে বলে—"পাথর ছোঁড়ো", ঠিক তখন কপালের ঠিক পেছনে থাকা এই Prefrontal Cortex বা আমাদের ‘আধুনিক বিবেক’ তাকে শাসন করে। সে তাৎক্ষণিক উত্তেজনাকে দমন করে যুক্তি আর সহমর্মিতার ফিল্টার বসায়। এই PFC-ই মানুষকে শিখিয়েছে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি ত্যাগ করতে, ভবিষ্যতের কথা ভাবতে এবং অপরিচিতের সঙ্গেও বিনিময় বা চুক্তিতে আসতে। সভ্যতা মানে আসলে আদিম প্রবৃত্তির ওপর আমাদের এই প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্সের এক নিরন্তর জয়।
এই PFC কি সেপিয়েন্স মায়েদের অতিরিক্ত সাহায্য করেছিল হাত বাড়িয়ে দিতে? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে—হ্যাঁ। যখন দুই দলের পুরুষরা যুদ্ধের জন্য পাথর তুলেছিল, তখন সেপিয়েন্স মায়েদের মস্তিষ্কের এই উন্নত অংশটিই হয়তো তাদের বলেছিল যে, যুদ্ধের চেয়ে ‘সংযোগ’ বেশি লাভজনক। পুরুষ যেখানে বিবর্তনের তাড়নায় ‘Fight-or-Flight’-এর দিকে ঝুঁকেছিল, নারীরা তাদের প্রখর Prefrontal Cortex ব্যবহার করে অন্যের কষ্ট বা আবেগ বুঝতে পেরেছিলেন (যাকে বিজ্ঞানে বলা হয় Theory of Mind)। এই মানসিক ক্ষমতাই তাদের সেই ‘জৈবিক কূটনীতি’ বা সংযোগ স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। অর্থাৎ, মানুষের টিকে থাকার ইতিহাসে এই হাত বাড়ানো কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল আমাদের উন্নত মস্তিষ্কের এক সুপরিকল্পিত বিজয়।
তবে বিজ্ঞান এখানে একটু সতর্ক করে দেয়। ২০২৩ সালের গবেষণা বলছে, উল্টো দিকেও মিলন ঘটেছিল — নেয়ান্ডার্থাল মা আর সেপিয়েন্স বাবার সন্তানও জন্মেছিল। আর নেয়ান্ডার্থাল মায়ের চিহ্ন আমাদের DNA-তে না থাকার কারণ অন্যও হতে পারে — সেই মিশ্র বংশধরের সংখ্যা এতটাই কম ছিল যে কালক্রমে সেই রেখা হারিয়ে গেছে। তাহলে কি সত্যিই শুধু সেপিয়েন্স নারীই হাত বাড়িয়েছিলেন? হয়তো। কিন্তু প্রমাণ এখনও সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
৫০,০০০ বছর আগের সেই আদিম মায়েরা যখন কোনো নেয়ান্ডার্থাল শিশুকে নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন বা নেয়ান্ডার্থাল পুরুষের সাথে ঘর বেঁধেছিলেন, তাঁরা কি জানতেন যে তাঁরা মানবজাতির ভবিষৎ বদলে দিচ্ছেন?
কিন্তু পুরুষের সেই driver জিন — সেটার কী হলো? testosterone আজও আছে। দলবদ্ধ আগ্রাসনের প্রবৃত্তি আজও আছে। প্রতিযোগিতা, এলাকা দখল, প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরানো — এই সংকেতগুলো লক্ষ বছরের বিবর্তনে শরীরে গেঁথে গেছে। কিন্তু সভ্যতায় এই জিন বিপজ্জনক। শিকারি সংগ্রাহকের জন্য যা কাজের, কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপনের পর সেটাই ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠছিল। তাহলে কে এই জিনকে সামাল দিল? সামাল দিল সেই আধুনিক বিবেক বা PFC। সেই গত পঞ্চাশ হাজার বছর বা তারও বেশি সময় নিয়ে জন্ম দিয়েছে ধর্মের। রবিন ডানবার বা স্কট অ্যারান-এর মতো গবেষকরা মনে করেন, পিএফসি-র বিবর্তনই মানুষকে দলবদ্ধভাবে থাকতে এবং যৌথ বিশ্বাস বা 'Communitas' তৈরি করতে সাহায্য করেছে, যা ধর্মের অন্যতম মূল ভিত্তি।
ধর্ম নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা “জিন” বানায়নি, কিন্তু একই মানবিক প্রবৃত্তিকে দুটি ভিন্ন পথে পরিচালিত করেছে। কারণ বিবর্তনের ইতিহাসে নারী ও পুরুষের ঝুঁকি, দায়, এবং সামাজিক ভূমিকা এক ছিল না। ফলে ধর্ম যখন “costly signal” বা ত্যাগের মাধ্যমে গোষ্ঠীকে বেঁধে রাখতে চেয়েছে, তখন সেই কষ্টের ধরনও নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে অনেক সময় আলাদা হয়ে গেছে।
পুরুষের ক্ষেত্রে গোষ্ঠীবদ্ধ আগ্রাসন, ঝুঁকি নেওয়া, এবং বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রবণতা বেশি দৃশ্যমান ছিল। তাই ধর্ম সেই শক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে—“তুমি লড়তে পারো? আগে নিজের শরীরকে জয় করো।” এখান থেকেই আসে কঠোর তপস্যা, উপবাস, দেহনিগ্রহ, এমনকি সন্ন্যাস। এখানে কষ্টটা দৃশ্যমান, শারীরিক এবং নাটকীয়—কারণ সেই শরীরটাই এতদিন ছিল যুদ্ধের হাতিয়ার। ধর্ম সেই হাতিয়ারটাকেই ঘুরিয়ে দেয় ভেতরের দিকে। ফলে পুরুষের ক্ষেত্রে costly signaling হয় শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রদর্শন—আমি আঘাত করতে পারি, কিন্তু নিজেকে আটকে রাখছি।
নারীর ক্ষেত্রে চিত্রটা হয় আলাদা। বিবর্তনের দিক থেকে নারীর প্রধান শক্তি ছিল সম্পর্ক, ধারাবাহিকতা, এবং যত্ন—বিশেষ করে সন্তান ধারণ ও লালন পালন। ফলে নারীর ক্ষেত্রে শারীরিক ঝুঁকিপূর্ণ আচার পালনে অনেক বেশি সামাজিক মূল্য চোকাতে হতো। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ম তাকে এমন পথে রাখে, যেখানে কষ্ট আছে—কিন্তু তা শরীর ভাঙার নয়, বরং শরীরকে ধরে রাখার। ব্রত, উপবাস, নির্দিষ্ট নিয়ম মানা, প্রার্থনা—এসবই একধরনের costly signal, কিন্তু তা relational। এখানে বার্তা হয়—“আমি পরিবারের, সন্তানের, গোষ্ঠীর জন্য নিজেকে সংযত রাখতে পারি, নিয়ম মানতে পারি, অপেক্ষা করতে পারি।
তাই দেখা যায়, পুরুষের ক্ষেত্রে ধর্ম প্রায়ই “বাইরের জীবন ছেড়ে দাও”—এই আহ্বান আনে (সন্ন্যাস, তপস্যা), আর নারীর ক্ষেত্রে বলে—“এই জীবনটাকেই নিয়মে বেঁধে রাখো”—(ব্রত, উপবাস, সংসারকেন্দ্রিক ধর্মাচরণ)। তবে এটাকে কঠোর বিভাজন হিসেবে দেখা ভুল হবে। নারীর মধ্যেও তপস্যা আছে, পুরুষের মধ্যেও সম্পর্কের ধর্ম আছে।
কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে ধর্ম যে গড়পড়তা পথ তৈরি করেছে, তা দ্বিমুখী—
একদিকে শরীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ,
অন্যদিকে শরীর ও সম্পর্ককে ধরে রাখার শৃঙ্খলা। লেখায় ব্যবহৃত এই বছরের গাজনের ছবিটা দেখুন। এমন দৃশ্য আমরা দেখেই থাকি। দেবতার মন্দিরকে ঘিরে বা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করতে করতে অতিক্রম করা। এই আচারের নাম দণ্ডী কাটা । ঝাঁপ বা চড়কগাছে পাক খাওয়ার সঙ্গে এর তুলনা চলে না।
তার মানে গাজনের মাঠে একটা অন্যকিছু হচ্ছে — পুরুষের driver জিনকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে । বাইরের শত্রুকে আঘাত করার যে শক্তি, সেই শক্তি নিজের শরীরের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধকে তপস্যায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। রক্তপাতকে আচারে পরিণত করা হচ্ছে।
আর এটা শুধু বাংলার গাজনে নয়।
শিয়া মুসলমানের মাতমে শরীর রক্তাক্ত করে ঐতিহাসিক শোককে আত্মস্থ করা হয়। নেটিভ আমেরিকানের Sun Dance-এ শরীরকে সর্বোচ্চ উপহার হিসেবে অর্পণ করা হয়। তামিল কাভাদি আট্টমে হুক গেঁথে অন্য জগতে পৌঁছানো হয়।
আলাদা আলাদা সংস্কৃতি, আলাদা আলাদা দেবতা — কিন্তু পুরুষের শরীর একইভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একটা নিরাপদ চ্যানেলে বের করা হচ্ছে আদিম প্রবৃত্তি। ধর্ম এই আগ্রাসনকে দমন করেনি। ধর্ম তাকে নতুন দিক দেখিয়েছে। অর্থাৎ, Aggression-কে Self-discipline-এ রূপান্তরিত করতে চেয়েছে।
কিন্তু এই রূপান্তর সবসময় যে ঘটেই এমন নয়।
গাজনের সন্ন্যাসী যখন চৈত্রের খরতাপে দ্বগ্ধ পিচে শুয়ে পড়েন, তাঁর চোখ থাকে বন্ধ বা অর্ধনিমীলিত। ভিড় তাঁর কাছে মুখ্য নয়। তিনি যুদ্ধ করেন ভেতরে ভেতরে, নিজের শরীরের সঙ্গে। সেই যন্ত্রণায় অহং গলে যায়। driver জিন শান্ত হয়।
পঞ্চাশ হাজার বছর আগে নেয়ান্ডার্থাল পুরুষ পাথর তুলেছিল। সেপিয়েন্স পুরুষও পাথর তুলেছিল। সেই একই পুরুষ আজ গাজনের মাঠে বাণ বিঁধাচ্ছে। ঈদে উপবাস করছে। একটাই শরীর। একটাই জিন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই আদিম পাথরটি সে আজ আর নিজের ভেতরের রিপুকে দমনে ব্যবহার করছে না, বরং অন্যের দিকে ছুঁড়ছে। সেই DNÀর ভূত তখন আরও সক্রিয় । এলাকা দখলের প্রবৃত্তি জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। ধর্ম তখন ধর্ম থাকছে না। সেটা হয়ে যাচ্ছে tribal display।
পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সেপিয়েন্স নারী নেয়ান্ডার্থাল পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। সেই সংমিশ্রণই আমাদের শরীরে নতুন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এনেছে—মানবজাতির টিকে থাকার ইতিহাসে যার গুরুত্ব অপরিসীম।
এই ঘটনাটা একবারের নয়। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে—দুটো আলাদা গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ-সংযোগ আসলে একই কাজ করেছে। মোগল-রাজপুত জোট, বাংলার হিন্দু-মুসলমান পরিবারের সম্পর্ক—দুটো গ্রাম, দুটো জাত, দুটো ধর্ম—কিন্তু বিবাহের সুতোয় বাঁধা।
এটা শুধু সামাজিক ঘটনা নয়, এর জৈবিক ভিত্তিও আছে। Genetic diversity বাড়ে, নতুন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ—tribal ভয় কমে যায়। কারণ “ওরা” আর পুরোপুরি “ওরা” থাকে না—“ওরা”-র কেউ আমার পরিবারের অংশ হয়ে যায়।
আমরা ইতিহাস লিখতে গিয়ে রাজা, যুদ্ধ, ধর্মগুরুদের কথা বলি। কিন্তু সেই অগণিত নারীদের কথা বলি না—যারা সম্পর্কের মাধ্যমে, দেহের মাধ্যমে, পরিবার গড়ে—গোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অনেক সময় সেই হাত বাড়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় কূটনীতি।
হয়তো সেই কারণেই লোককথা আর রূপকথায় বারবার ফিরে আসে সেই অদ্ভুত গল্প—কদর্য, অচেনা, প্রায় ভয়ংকর এক পুরুষ, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক সুন্দরী রাজকন্যা। প্রথমে ভয়, ঘৃণা, দূরত্ব—তারপর ধীরে ধীরে সম্পর্ক, গ্রহণ, এমনকি ভালোবাসা। আমরা গল্পটাকে প্রেমের গল্প হিসেবে শুনি, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে আরও প্রাচীন এক সুর।
অপরিচিতকে শুধু শত্রু হিসেবে না দেখে, সম্ভাব্য সঙ্গী হিসেবে দেখার সেই জৈবিক সাহস—যা হয়তো একসময় আমাদের টিকিয়ে রেখেছিল। যেখানে পুরুষের হাত উঠেছিল আঘাতের জন্য, সেখানে নারীর হাত উঠেছিল সংযোগের জন্য। সেই দুই হাতের টানাপোড়েনই হয়তো গল্প হয়ে বেঁচে আছে—কখনো রূপকথায়, কখনো ইতিহাসের আড়ালে।
কিন্তু এই গল্পগুলোর একটা সীমাবদ্ধতাও আছে। সেখানে নারীর ভূমিকা প্রায়ই নীরব, গ্রহণকারী—যেন সে শুধু ভালোবাসে, বদলে দেয়, রক্ষা করে। অথচ বাস্তব ইতিহাসে এই সম্পর্ক ছিল অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি কৌশলপূর্ণ। সেখানে নারী শুধু প্রেমিকা নয়—সে মধ্যস্থতাকারী, সে সেতু, সে এক ধরনের জৈবিক কূটনীতিক। তার সিদ্ধান্ত, তার সম্পর্ক, তার শরীর—এই সবকিছু মিলেই অনেক সময় গোষ্ঠীকে টিকিয়ে রেখেছে।
তাই হয়তো রূপকথার সেই রাজকন্যা কেবল প্রেমের প্রতীক নয়—সে এক প্রাচীন স্মৃতির ধারক। এক সময়ের, যখন “ওরা” আর “আমরা”-র মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেউ একজন হাত বাড়িয়েছিল। আর সেই হাতই হয়তো প্রথমবার শিখিয়েছিল—পাথর না ছুঁড়েও বেঁচে থাকা যায়।
হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের মাঝখানে কি নারীরা কোনোভাবে সেতুর ভূমিকা নিয়েছেন? ইতিহাসের বড় নথিতে হয়তো এর স্পষ্ট উল্লেখ কম, কারণ ইতিহাস সাধারণত রাজা, ধর্মগুরু, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু লোকসংস্কৃতি, গ্রামীণ সমাজ, এবং আচার-অনুষ্ঠানের স্তরে তাকালে আমরা অন্য ছবি দেখি। বহু ethnographic পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নারীরাই প্রায়শই প্রথম এগিয়ে যান—মানত করতে, প্রার্থনা করতে, সন্তানের মঙ্গল কামনায় ভিন্ন ধর্মীয় স্থানে যেতে। এই যাওয়াটা সবসময় সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একধরনের প্রয়োজনে তৈরি হওয়া বিশ্বাস—“যেখানে কাজ হয়, সেখানে যাওয়া যায়।”
এই “যাওয়া” ধীরে ধীরে সীমানা ভেঙে দেয়। যখন একজন হিন্দু নারী নিয়মিত একটি মুসলিম পীরের দরগায় যান, বা একজন মুসলিম নারী কোনো হিন্দু আচার পালন করেন, তখন তারা অজান্তেই একটি shared sacred space তৈরি করেন। এই shared space-ই দ্বন্দ্বের মধ্যে একটি নরম অঞ্চল—যেখানে পরিচয় কঠোর নয়, বরং প্রবাহমান। এখানে “আমরা” এবং “ওরা”-র মাঝখানে তৈরি হয় একটি তৃতীয় জায়গা।
তবে এটাকে রোমান্টিক করে দেখাও ঠিক নয়। এই জায়গায় আমাদের একটু থামতে হয়। মানুষের শরীর—বিশেষ করে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম—খুব দ্রুত বদলায় না। ভয়, গোষ্ঠীবোধ, আকর্ষণ, সন্দেহ—এই প্রতিক্রিয়াগুলোর অনেকটাই বহু হাজার বছরের বিবর্তনের ফল। সেই অর্থে আমরা যখন আজকের ২০–৫০ বছরের বিতর্কে আটকে যাই, তখন অনেক সময় আমরা গভীর সময়ের এই দীর্ঘ ইতিহাসটা ভুলে যাই। প্রকৃতি কোনো তাড়াহুড়ো করে না। সে পরীক্ষানিরীক্ষা করে হাজার হাজার বছরে—যেখানে বেঁচে থাকা আর বাঁচিয়ে রাখা—এই দুইটাই মূল চালিকা শক্তি।
কিন্তু এখানে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা আছে। প্রকৃতি অন্ধ—সে নৈতিক নয়, সে কৌশলীও নয় মানুষের অর্থে। সে শুধু যা টিকে থাকে, তাকে রেখে দেয়। তাই পঞ্চাশ হাজার বছর আগে যা ঘটেছিল—তা “ঠিক” ছিল বলে নয়, তা ঘটেছিল কারণ সেটি সম্ভব হয়েছিল। আর আজ যা ঘটছে, সেটাও সেই একই ধারার অংশ—কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন স্তর: রাজনীতি, ক্ষমতা, মতাদর্শ, মিডিয়া।
তাই সেতুবন্ধন সবসময় সংঘাত থামায় না, সবসময় সফলও হয় না। কিন্তু এটুকু বলা যায়—এই নীরব, দৈনন্দিন সংযোগগুলো না থাকলে সমাজের বিভাজন আরও কঠিন হতো। যে জায়গায় রাজনীতি দেয়াল তোলে, সেখানে অনেক সময় সম্পর্ক ছোট ছোট দরজা খুলে দেয়।
আধুনিক 'Tribal Display' থেকে বাঁচতে আমাদের আবার কি সেই 'কানেকশন' বা 'Befriend' কৌশলে ফিরে যাওয়া দরকার? সেপিয়েন্স মায়েরা কি পারবে আবার হাতের উপর হাত রাখতে?

No comments:

Post a Comment