Thursday, July 16, 2026

রথযাত্রা থেকে পাকিস্থানের সেনা এলিটদের বাংলা ঘৃণা - একটি নভোমন্ডলীয় সংযোগ

 



আজকে হিন্দু ধর্মের রথযাত্রা। যার উৎস শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার রথে আরোহণ করে শ্রীমন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দিরে গমন বলে বলা হয়ে থাকে।

আবার এই কাহিনিও আছে যে সত্যযুগে মালব দেশের যেটা ছিল প্রাচীন ওড়িশা রাজ্য, তার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন বিষ্ণুর পরম ভক্ত। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি সমুদ্রতীরে ভেসে আসা একটি নীলকাষ্ঠ বা দারু ব্রহ্ম দিয়ে জগন্নাথের মূর্তি নির্মাণ করাতে চান। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা মূর্তি তৈরি করতে করতে অর্ধসমাপ্ত মূর্তি রেখেই কোন কারণে অদৃশ্য হয়ে যান। নারদের পরামর্শে এই হাত-পা-বিহীন অসম্পূর্ণ মুর্তিরূপেই পূজা শুরু হয়। এটি জগন্নাথকে বিষ্ণু বা কৃষ্ণের স্বরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনী অনুসারে, এটি কৃষ্ণের দ্বারকা থেকে কুরুক্ষেত্রে যাওয়ার স্মৃতি। বৃন্দাবনের গোপী বা রাধা কৃষ্ণকে ফিরিয়ে নিতে চান। রথযাত্রায় ভক্তরা রথ টেনে এই বিরহ ও মিলনের অনুভূতি প্রকাশ করেন। চৈতন্য মহাপ্রভু এই উৎসবে অংশ নিয়ে ভক্তির উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিলেন।
অনেক লোকবিশ্বাসে রথযাত্রাকে কৃষ্ণের বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তন এবং রাধার সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিশেষত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধারায় এই ব্যাখ্যা অত্যন্ত জনপ্রিয়।
তবে কাহিনী যাই হোক, রথযাত্রা সর্বত্রই কৃষ্ণের দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী যাত্রা। এটি মূলত দেবতার গৃহত্যাগ, ভক্তকুলের কাছে, জনসমক্ষে আগমন, ভ্রমণ, আত্মীয় প্রিয়জন-পরিজনের সঙ্গে মিলন এবং পুনরাগমনের প্রতীক। ওড়িশার ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এটি আনন্দ, মঙ্গল, সমাগম এবং পুনর্মিলনের উৎসব।
রথযাত্রা ভারতীয় ঋতুচক্রের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয। এটি আষাঢ় মাসে হয়, অর্থাৎ যখন সূর্য কর্কটক্রান্তির (ট্রপিক অব ক্যান্সার) নিকটবর্তী অবস্থানে থাকে এবং শীঘ্রই দক্ষিণায়ন শুরু হয়। এটির সাথেই যুক্ত মানুষের অবস্থান, যে কোথায় দাঁড়ালে তার ছায়া উত্তরে পড়বে আর কোথায় দক্ষিনে।
রথের এই দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী যাত্রা কেন?
ভারতীয় তান্ত্রিক দর্শনে মানবদেহ, পৃথিবী ও মহাবিশ্বকে পরস্পরের প্রতিরূপ (দেহতত্ত্ব: মাইক্রোকসম–ম্যাক্রোকসম) হিসেবে কল্পনা করা হয়। দেহতত্ত্ব ও তান্ত্রিক ব্যাখ্যায় পৃথিবীর উত্তর দিককে 'মস্তক' বা চৈতন্যের দিক এবং দক্ষিণ দিককে 'নাভি' বা নিম্নকেন্দ্রের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কুণ্ডলিনীর জাগরণকে নিম্নকেন্দ্র থেকে ঊর্ধ্বমুখী চেতনার অভিযাত্রা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এই প্রতীকী ধারণা থেকেই উত্তরমুখী যাত্রাকে কখনও কখনও আধ্যাত্মিক উত্থান বা মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এর উৎস হলো নদীর উৎসের পবিত্রতা। নদীগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্বমুখে প্রবাহিত হয়ে মানুষের পাপ, অশুচিতা, মৃতদেহের ভস্ম, যজ্ঞের অবশেষ—সব বহন করে শেষ পর্যন্ত সাগরে মিশে যায়। এই কারণেই গঙ্গাকে "পাপহারিণী" বলা হয়।
ভারতের প্রধান পবিত্র নদীগুলোর উৎস—গঙ্গা, যমুনা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র (তিব্বত থেকে), শতদ্রু, অলকানন্দা, মন্দাকিনী—সবই হিমালয় অঞ্চলে। পুরাণে গঙ্গা স্বর্গ থেকে শিবের জটায় অবতীর্ণ হয়ে হিমালয় থেকে সমতলে প্রবাহিত হয়।
উত্তর (হিমালয়) ভারতীয় ধর্মচিন্তায় দেবলোকের নিকটবর্তী অঞ্চল। কৈলাস শিবের আবাস, বদ্রীনাথ, কেদারনাথ, অমরনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী—সবই হিমালয়ে। তাই উত্তরকে আধ্যাত্মিক উচ্চতা, তপস্যা ও শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
তান্ত্রিক প্রতীকবাদে কুণ্ডলিনীর নিম্নচক্র থেকে সহস্রার (মস্তক) পর্যন্ত আরোহণ যেমন আত্মার ঊর্ধ্বগমন, তেমনি ভারতের পবিত্র ভূগোলে উত্তরমুখী যাত্রা (কাশী থেকে কেদার, গঙ্গোত্রী, কৈলাস) আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই কারণে ভারতীয় ঐতিহ্যে প্রায়ই দেখা যায়:
তান্ত্রিক শরীরতত্ত্বে সহস্রার (মস্তক) → সর্বোচ্চ চেতনা, এর পর হৃদয় → জীবন এবং পরিশেষে মূলাধার (নাভি) → ভৌতিক জগৎ।
ভৌগোলিকভাবে:
উত্তর = দেবলোক, জ্ঞান, তপস্যা, মস্তক, হিমালয়
মধ্যভূমি = মানবজীবন
দক্ষিণ = সমুদ্র, যম, পূর্বপুরুষ, বিলয়
এই কারণে জাত বা আর্য ব্রাহ্মণরা এক সময় পদ্মা পার হয়ে (কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম) নিম্নবঙ্গে আসত না।
পাকিস্তানের সিন্ধ রাজ্যের প্রাক্তন গভর্নর এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগের রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ জুবায়ের উমরের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। তাঁর পিতা ছিলেন পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল গুলাম উমর। মেজর জেনারেল গুলাম উমর ছিলেন পাকিস্তানের সেনাশাসক ও রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর গঠিত পাকিস্তান নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য।
মুহাম্মদ জুবায়ের তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর পিতা জেনারেল গুলাম উমর তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে বদলি হয়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আসেন। তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে ইয়াহিয়া খান এবং অন্য সেনা কর্মকর্তাদের আলাপের সূত্র ধরে বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের নিম্নজাত বলে ঘৃণা করত। বাঙালিদের তারা চাকর-নফরের চেয়ে বেশি কিছু মনে করত না। এমনকি তারা এটাও চাইত যে এই নিম্নশ্রেণির মানুষদের অংশটি পবিত্র পাকিস্তান থেকে ঝেড়ে ফেলা হোক।
আমরা যারা মনোবিদ্যার ছাত্র, তারা জানি বিদ্যালয়ে আমরা যাই শিখি না কেন, ধর্ম, সামাজিকতা, রাষ্ট্র, সংবিধান বা আইন আমাদের যা-ই করতে নির্দেশ দিক না কেন, আমাদের মনে যে কোর বিলিফ বা গভীর বিশ্বাস প্রোথিত থাকে, আমরা সেখান থেকেই আমাদের মূল্যবোধ তৈরি করি।
ভারতীয় তান্ত্রিক শরীরতত্ত্ব যেখানে উত্তরকে মস্তক বা সর্বোচ্চ চেতনা, এরপর হৃদয়কে জীবন এবং পরিশেষে মূলাধার বা নাভিকে ভৌতিক জগত হিসেবে আধ্যাত্মিক রূপক হিসেবে দেখেছে, সেখানে আধ্যাত্মিকতায় অক্ষম পাকিস্তানের সেনা-এলিটদের মনে একই কোর বিলিফ রয়ে গেছে। কিন্তু আধ্যাত্মিকতাশূন্য মনে সেটি ভৌগোলিক বা আক্ষরিক রূপ নিয়েছে—যেন কর্কটক্রান্তির নিচের বাংলা মানেই মন্দ, অশুভ, অপবিত্র, ঘৃণিত।
সবাইকে রথযাত্রার আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পুনর্মিলনের উৎসবের শুভেচ্ছা।
সিরাজুল হোসেন

No comments:

Post a Comment