নারী নাচলে সমস্যা। নারী গান গাইলে সমস্যা। নারী শাড়ি পরলে সমস্যা। শাড়ির সঙ্গে সানগ্লাস পরলে সমস্যা। কপালে টিপ পরলে সমস্যা। নারী হাসলে সমস্যা। নারী আনন্দ করলে সমস্যা। অর্থাৎ নারী মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকলেই সমস্যা!
এদেশের একশ্রেণির উগ্র-নির্বোধ জনগোষ্ঠীর মস্তিষ্কে নীতি-নৈতিকতা নামে যে জিনিসটি আছে, সেটি শুধু নারীর পোশাক, শরীর, গান, নাচ ও আনন্দ দেখলেই সক্রিয় হয়। তখন তাদের চেতনা জেগে ওঠে, সংস্কৃতি বিপন্ন হয়ে যায়, সমাজ ধ্বংসের ঘণ্টা বাজতে থাকে!
কিন্তু দুর্নীতি হলে? চুরি হলে? ধর্ষণ হলে? নারী নির্যাতন হলে? যৌতুকের জন্য পুড়িয়ে মারা হলে? বাল্যবিবাহ হলে? ধর্মের নামে ভণ্ডামি হলে? ক্ষমতাবানরা লুটপাট করলে? তখন নৈতিকতার দণ্ড জেগে ওঠে না।
আসলে তাদের সমস্যা নীতি-নৈতিকতা নয়। সমস্যা হলো নারীর স্বাধীনতা। তারা এমন নারী চায়, যে তাদের অনুমতি নিয়ে হাসবে, অনুমতি নিয়ে সাজবে, অনুমতি নিয়ে গান গাইবে, অনুমতি নিয়ে বাইরে যাবে এবং অনুমতি নিয়ে বাঁচবে। নারী নিজের আনন্দের মালিক হবে, এটা তারা মেনে নিতে পারে না।
কারণ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা নারীকে মানুষ হিসেবে দেখে না। নারী তাদের কাছে কখনো মা, কখনো বোন, কখনো স্ত্রী, কখনো কন্যা, কিন্তু একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে? সেখানে তাদের মস্তিষ্কে শর্ট সার্কিট হয়ে যায়।
একজন নারী নাচছে, একজন সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ সেখানে শিল্প, প্রতিভা ও আনন্দ দেখতে পারে। কিন্তু বিকৃত মানসিকতার নির্বোধ জনগোষ্ঠী সেখানে শুধু শরীর দেখে। তারপর নিজেদের বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গির দায়ও নারীর ওপর চাপিয়ে বলে– “নারী এমন পোশাক পরেছে কেন?” এটা অনেকটা নিজের ক্ষুধার জন্য খাবারকে দোষ দেওয়ার মতো।
তুমি একজন নারীকে দেখে কী ভাববে, সেটা তোমার মস্তিষ্কের সমস্যা, নারীর পোশাকের নয়।
একজন নারী গান গাইলে সমাজ ধ্বংস হয় না। একজন নারী নাচলে সভ্যতা শেষ হয়ে যায় না। একজন নারী টিপ পরলে সংস্কৃতি বিলীন হয়ে যায় না। সমাজ ধ্বংস হয় অজ্ঞতায়, দুর্নীতিতে, অন্যায় বিচারে, সহিংসতায়, বৈষম্যে, শিক্ষার অবক্ষয়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন। তাই সহজ শত্রু দরকার। আর সেই সহজ শত্রু হলো নারী।
নারী হাসছে? সমাজ শেষ! নারী নাচছে? সংস্কৃতি শেষ! নারী নিজের পোশাক নিজে বেছে নিচ্ছে? সভ্যতা শেষ! অথচ যে সমাজ একটি টিপ, একটি গান, একটি নাচ বা একটি শাড়ি দেখে কেঁপে ওঠে, সেই সমাজের সংস্কৃতি এতোটাই দুর্বল যে, তাকে রক্ষা করার জন্য নারীর স্বাধীনতা ধ্বংস করতে হয়!
উগ্র-নির্বোধ জনগোষ্ঠী সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায় না। এরা নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করতে চায়। এরা নৈতিকতা রক্ষা করতে চায় না। এরা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা রক্ষা করতে চায়। এরা সমাজ বাঁচাতে চায় না। এরা নিজেদের অস্বস্তি থেকে নারীকে বাঁচতে দিতে চায় না।
একজন নারী কী পরবে, কীভাবে হাসবে, কী গান গাইবে, কীভাবে নাচবে, এগুলো তার স্বাধীনতার বিষয়। তোমার অস্বস্তি তার অপরাধ নয়। তোমার বিকৃত দৃষ্টি তার দায় নয়। তোমার দুর্বল নৈতিকতা সামলানোর দায়িত্ব কোনো নারীর নয়। নারীর আনন্দ দেখে যদি তোমার শরীরে জ্বালাপোড়া শুরু হয়, তাহলে সমাজ সংস্কারের আগে নিজের মস্তিষ্কটা একটু সংস্কার করো।
কারণ সমাজ নারীর নাচে ধ্বংস হয় না। সমাজ ধ্বংস হয় তখনই, যখন নির্বোধরা নৈতিকতার পাহারাদার সেজে স্বাধীন মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
অনিন্দ্য জয়
No comments:
Post a Comment