বড়োমামীমা বলতেন মেয়েজোনাকির বুকের দিকে সুযোগ পেলেই নাকি ছেলে জোনাকি'রা তাকায়। জোনাকি হয়ে জন্মেছে বলে কী আর মেয়ে হওয়ার দুঃখ ঘোচে! হুবহু এই পৃথিবীর আর সকল নিরুপায় ডানাখসা জোনাকির মতন দেখতে ছিল আমার মামীমা'কে। হুবহু যেমন সত্যজিৎ এঁকেছিলেন বিভূতিবাবুর 'সর্বজয়া'কে। অন্যদিকে আমার মামা ছিলেন উন্মত্ত, উন্মাদ হরিহর। ন্যাংটা হাতে বিষধর সাপ ধরতে পারতেন বড়োমামা। কেউটে সাপের কপালে এঁকে দিতেন আলতো চুমু। না জানি কতবার খেয়েছিলেন রাজগোখরোর কামড়। কক্ষনো কিচ্ছুটি হয়নি। বাবা বলতেন মামা যেন সাক্ষাৎ নীলকন্ঠ! আর মামীমা যেন গেরস্থবাড়ির নিরুপায় অন্নপূর্ণা। শুনেছিলাম অল্প বয়সে কাকে একটা যেন খুব ভালোবাসতেন বড়োমামা। কোনো এক বড়লোক বাড়ির ছেলের বিবাহ প্রস্তাবে রাজি হয়ে মামাকে ছেড়ে গেছিলেন মামার প্রথম প্রেমিকা। চলে যাওয়ার আগে নাকি ঝাড়ফুঁক জাতীয় কীসব করেছিলেন মামার উপর। ভালোবাসার সেই পরম আশীর্বাদেই মামা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের মানসিক ভারসাম্য। জন্মের পর থেকে দেখতাম ঝাঁকড়া চুলের আমার মামা বসে রইতেন খাটিয়ার এককোণে। খাটিয়ার একধারে ঢিবি করে রাখা রইতো খুচরো পাতা। মামা তাতে অবিরাম লিখে চলেছেন কবিতা। দুইবেলা সময় করে মামীমা দিয়ে যাচ্ছেন থালায় করে ভাত। আমার জন্মের পর নাকি লালচে কোঁকড়ানো চুল ছিল মাথায়। আমায় তাই মামা ভালোবেসে সাহেব বলে ডাকতেন। পাড়ার লোকে মামাকে ডাকতো 'বামাখ্যাপা' বলে। কেউ কেউ ভালোবেসে থুথু ছেটাতো মামার গায়ে। মামা তেড়ে গেলে পরে খুব মারতো ওরা মামাকে। এমন দিনগুলোতে মামার মুখে রক্ত জমতো নরম হয়ে। মামা আমায় নানা রকমের ম্যাজিক দেখাতেন। তেঁতুল পাতা মুখে দিয়ে শিস কাটতে পারতেন মামা। একবার দুইটা ফাঁপা তালের মাঝে আমকাঠি ভরে আমায় গাড়ি বানিয়ে দিয়েছিলেন। মামা কবিতা লিখতে বসলে, আমি পাশে গিয়ে বসতাম। মামা আমায় শোনাতেন তাঁর স্বরচিত কবিতাবলী। মামা ভীষণ কবিতা ভালোবাসতেন। আর মামীমা ভালোবাসতেন তাঁর নিরুপায়, উন্মাদ হরিহর'কে...
আমাদের তখন সংসারে খড়ের দেওয়াল। আমার মামীমা ছিলেন যারপরনাই গরীব ঘরের মেয়ে। সামনের দুইখানা দাঁত উঁচু। উচ্চতায় বেশ খানিক খাটো। গাঁয়ের লোকের টিটকিরি আর শ-খানেক পাত্রপক্ষের নাক সিঁটকানি পেরিয়ে আমার আধপাগলা মামাকে বিয়ে করে মামীমা যখন আমাদের বাড়ি এলেন মায়ের তখন ক্লাস নাইন। কৈশোরে নাকি ভারী সুন্দর কাঁথা সেলাই করতে পারতেন মামীমা। শুনেছিলাম একটা ছন্নছাড়া সংসারকে নাকি আমার মামীমা পুনরায় বেঁধেছিলেন নকশিকাঁথার সুতো দিয়ে। আমার আধপাগলা মামাকে বেঁধেছিলেন স্নেহ, যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে। মামার মাথার অসুখ বাড়লে মামাকে শেকল পরিয়ে রাখতে হতো। আমরা মামাকে দেখলে পরে খুব ভয় পেতাম তখন। মামীমা কাঁদলে পরে চোখ বেয়ে ঝরতো কাবেরী নদী। সেই চোখের জলে ভাত মেখে মামাকে খাইয়ে দিতেন উঠোনের এককোণে বসে। মামা কেমন পোষ মানা সিংহের মতন চেয়ে রইতেন মামীর দিকে। অসুখ সামান্য সেরে গেলে পরে মামা তাল কুড়িয়ে আনতেন দীঘির পাড় থেকে। মামীমা আমাদের জন্য বানিয়ে দিতেন তালছেঁচকি। পৌষ মাসের সন্ধেবেলা মামীমা চাল বেঁটে বানাতেন নকশিপিঠা। আমি আর দিদি খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম মামীর কোলে। মামী আমাদের হিজলপাখি আর ঘুমপরীদের গল্প শোনাতেন। মামী বলতেন যে প্রত্যেক পূর্ণিমার রাতে নাকি পরীরা আকাশ পথে মাটিতে নেমে আসে। আমাদের পায়ের কাছে বসে মামা সেই গল্প শুনতেন হাঁ করে মামীর মুখের দিকে চেয়ে। নিজের মনে মনে কেমন যেন একটা খুশী হতেন। যেমন করে পুরোহিতের হাতে প্রসাদ দেখলে খুশী হয় মন্দিরের ভিখারি...
...
আমাদের বাড়িতে ছোটবেলায় তুলসীতলার পাশে একখানা ঘেঁটুফুলের গাছ ছিল। অঘ্রান মাস পেরোলে পরে সন্ধের দিকে তাতে একঝাঁক জোনাকি এসে জুটতো। মামীমা সন্ধে দিতে গেলে পরে আমি আর বড়দিদি মিলে জোনাকি ধরতুম। দিদি আমায় বড়ো আলতো হাতে জোনাকি ধরা শিখিয়েছিল। তুলসীতলার পাশে চাতালে বসে আলুথালু ঝিমোতেন বড়োমামা। দেখতুম তার মহাদেবের মতন উশকো-খুশকো চুলের উপর এসে বসত একঝাঁক জোনাকি। মামা ঘুমের ঘোরে মাথা চুলকোলে পরে হাতের আঙুলে জড়িয়ে পড়তো জোনাকিদের ডানা। মামীমা পুজো সেরে এসে পড়ে মামার মাথায় বুলিয়ে দিতেন প্রদীপের আগুনের ওম। তারপর দিতেন আমাদের মাথায়। সে যেন এক আদিম আশীর্বাদ! বছর দুয়েক আগের কথা। সেইবার হঠাৎ এক পৌষ উৎসবের রাত্তিরে মাঝরাতে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে মামা ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেলেন কোথায় একটা! ভোর রাতেও যখন ফিরলেন না তখন সবাই মিলে পৌষমেলার মাঠে ছুটলো খোঁজাখুঁজি করতে। তারই মাঝে বেলা তিন প্রহরে তুমুল বৃষ্টি নামলো গাঁয়ে। সবাই একে একে বাড়ি ফিরে গেলেও মামীমা সারাটা রাত গরুহারা রাখালের মতন খুঁজে গেলেন মামাকে। সারারাত জলে ভিজে মামাকে যখন এক বাউলের আখড়ায় খুঁজে পাওয়া গেল, মামার তখন এককপাল জ্বর। কোনো এক ভন্ড সাধু নাকি মামাকে জোর করে গাঁজা খাইয়ে দিয়েছিল। মামা ওখানেই আগুনের ধারে পড়েছিলেন রাতভর। সেই জ্বর মামাকে আর ছেড়ে যায়নি কোনোদিনই। হঠাৎ ফিরে পাওয়া পুরোনো প্রেমিকার মতন সেই জ্বরের হাত ধরে মামা ধীর পায়ে চলে গেছিলেন বহু বহু দূর। পাক্কা তিনদিন, তিনরাত মরণ জ্বরে ভুগে মামা যেদিন চোখে তুলসীপাতা নিলেন, পাড়ায় সেইদিন বড়দিন। খেলার মাঠের পাশে নতুন চার্চের তরফে ওরা রাস্তার উপর রকমারি আলোর চাঁদোয়া বেঁধেছিলো। মামার জন্য বাঁশ বাঁধা হয়েছিল সেই বাহারী আলোর নীচেই। মামীর চোখের জলে সেইবার চিকমিক করে উঠেছিল উৎসবের রোশনাই। চিতায় বেঁধে সেদিন তাই নিজের জীবনের যাবতীয় আলো শ্মশানপথে তুলে দিয়েছিলেন মামীমা। হরিহর রায়ের শবযাত্রার মতন আমার মামাও হরিধ্বনি সহযোগে শ্মশান গেলেন যখন আমার দুই হাতে তখন ঝুড়ি ভর্তি বিন্নি খই...
মহাকাশে চলতে চলতেও মানুষ একদিন কবিতা পড়বে, লিখেছিলেন ভাস্কর চক্রবর্তী। জানি না মামা এখন যেখানে থাকে সেখান তার কপালে কবিতা লেখার জন্য দোয়াত কলম জুটেছে কিনা! তবে মামা চলে যাওয়ার পর থেকে উঠোনের ঘেঁটুফুলের গাছটা ধীরে ধীরে মরে এসেছে কেমন! গাছেরাও কী বিয়োগযন্ত্রণায় শুকিয়ে যায় আমাদেরই মতন! জগদীশবাবু ভালো বলতে পারবেন। ইদানিং সন্ধেবেলা দেখি আর জোনাকির ঝাঁক আসে না তুলসীতলার কাছে। আমিও আজ বহুকাল বাদে মামাবাড়ি এলুম। আজও এই ঘর যেন অবিকল বিভূতিবাবুর ঘর, সত্যজিতের হাতে আঁকা। খেয়াল পড়লো আজ সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। তাই কী আজ আমাদের নিশ্চিন্দিপুরে এমন তুমুল কালবৈশাখী! সর্বজয়ার মতন মামীমার পরনেও সাদা থান। ঝড়ের মাঝেও দেখলুম অবিকল নিয়ম মতন পুজো শেষে আজও মামীমা এসে আমার কপালে বুলিয়ে দিলেন আগুনের ওম। এক লহমায় চোখের সামনে ভেসে এলো জোনাকিঘেরা আমার নিশ্চিন্দিপুরের শৈশব। দিদি বলতো জোনাকির মন নাকি বড্ডো নরম। শক্ত হাতে জোনাকি ধরলে খুব কষ্ট হয় তাদের। আমরা তাই আলতো হাতে জোনাকি ধরে রেখে দিতুম তালুর উপর। যার হাতে জোনাকি বসে রইতো অধিক সময়, আমরা ধারণা করে ফেলতুম সে নাকি জোনাকিদের কাছের মানুষ। আজ সেই জোনাকি'ও নেই। অধিকাংশ কাছের মানুষও নেই। বাবার ছবি, মামার ছবি, ঠাম্মার ছবি, দাদুর ছবি সাজিয়ে রাখা একখানা রংচটা দেওয়ালের উপর। কাছ থেকে দেখলে পরে মনে হয় যেন তাদের চোখের কোটরে জোনাকির আলো। আমি এসেছি বলে মামীমা আজ চাল বেঁটে নকশিপিঠা বানাতে বসেছেন রান্নাঘরে। রাত্তিরে তেলকই মাছের ঝোল। সাথে লাউয়ের ছেঁচকি। মামার নিশ্চয়ই হিংসে হবে খুব! উঠোনের পাশে তালগাছটায় খানকয়েক বাবুই পাখির বাসা হয়েছে দেখলুম। মনে পড়ে বাবা বলতেন বাবুই পাখি বাসার ভিতর গোবরের তাল রেখে তাতে জোনাকি ধরে এনে গুঁজে রাখে, যাতে ঘরময় আলো হয় তার। জোনাকির বুক পুড়ে আলো হয় বাবুইয়ের ঘর। কী অদ্ভুত মায়াজীবন জোনাকিদের! সহসা চোখ যায় রান্নাঘরের দিকে। জ্বলন্ত উনুনের পাশে বসে নকশিপিঠা বানাচ্ছেন আমার মামীমা। কথা বলার সময় তাঁর দুইচোখ দিয়ে ঝরে পরছে এক মায়াবী আলোর রেণু। ধীরে ধীরে যেন আলো হয়ে উঠছে সারা বাড়ি...
বাবা বলতেন আজীবন নিজের শরীর পুড়িয়ে অন্যের ঘর আলো করে রাখে জোনাকি। তবে কী এই নিরুপায় ধরণীর সমস্ত মায়েরাই আদতে দিন শেষে একরকমের জোনাকি! নাইলে মায়েদের চোখে কোথা হতে আসে এমন আকাশকুসুম আলো!

- Surya Surelia ...
আজীবন নিজের শরীর পুড়িয়ে অন্যের ঘর আলো করে রাখে জোনাকি।
ReplyDelete