Wednesday, September 2, 2026

আপন মানুষ

 

ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগের রাতে মরিয়ম নিজের কাপড়গুলো বিছানার ওপর সাজিয়ে রেখেছিল। পাঁচ বছরের সংসার - একটি মাঝারি আকারের ট্রলি ব্যাগে বেশ সুন্দরভাবে ধরে গেল।
বিষয়টি তাকে খানিকটা অবাক করল।
মানুষের জীবন থেকে পাঁচ বছর হারিয়ে গেলে তার ওজন কত হওয়া উচিত? এ নিয়ে কখনো কোনো গবেষণা হয়েছে কি? মরিয়ম জানে না। তবে তার পাঁচ বছরের ওজন খুব বেশি নয়, চারটি শাড়ি, দুটি সালোয়ার কামিজ, একটি পুরোনো স্মার্টফোন, ডায়াবেটিসের ওষুধের দুই পাতা, মৃত মায়ের একটি সাদাকালো ছবি এবং নীল রঙের প্লাস্টিকের কৌটায় জমানো ছেচল্লিশ হাজার টাকা।
টাকাগুলো সে সঙ্গে নিচ্ছে না। নিরাপত্তার ব্যাপার আছে। আগামী মাসে নাজমার বিয়ের খরচের জন্য ব্যাংকে জমা দেবে। সঙ্গে নিচ্ছে শুধু তিন হাজার। পথে লাগতে পারে।
পাশের ঘর থেকে বৃদ্ধ মানুষটির কণ্ঠ শোনা গেল, “রাশেদা! রাশেদা, আমার চশমাটা কোথায়?”
মরিয়ম দ্রুত উঠে গেল। অধ্যাপক আনিসুর রহমান বিছানার ওপর বসে আছেন। চোখে চশমা। তবু দুই হাত দিয়ে বালিশের নিচে, চাদরের ভাঁজে চশমা খুঁজছেন।
মরিয়ম সামনে গিয়ে বলল, “চশমা তো চোখেই আছে, স্যার।”
বৃদ্ধ মানুষটি সন্দেহের চোখে তার দিকে তাকালেন। তারপর চশমার কাচের ওপর দিয়ে আঙুল চালিয়ে বিস্মিত হলেন।
“ও! তা-ই তো।”
একটু পর নিচু গলায় জানতে চাইলেন, “তুমি কে?”
প্রশ্নটি মরিয়ম গত আড়াই বছরে অন্তত হাজারবার শুনেছে। প্রতিবারই সে একই উত্তর দেয়।
“আমি মরিয়ম।”
“মরিয়ম কে?”
“আপনার দেখাশোনা করি।”
আনিসুর রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শিশুর মতো সরল গলায় বললেন, “আমার রাশেদা কোথায়?”
রাশেদা ম্যাডাম সাত বছর আগে মারা গেছেন। প্রথম দিকে মরিয়ম সত্যি কথাটাই বলত। মানুষটি প্রতিবার নতুন করে স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ শুনে কাঁদতেন। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বলতেন, “কী বলো! রাশেদা মারা গেছে? আমাকে কেউ জানাল না কেন?”
একজন মানুষকে প্রতিদিন তার স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার মধ্যে একধরনের নিষ্ঠুরতা আছে। সেই নিষ্ঠুরতা মরিয়ম বেশিদিন করতে পারেনি। এখন সে বলে,
“ম্যাডাম বোনের বাসায় গেছেন। দু-এক দিনের মধ্যে আসবেন।”
অধ্যাপক সাহেব নিশ্চিন্ত হয়ে মাথা নাড়লেন।
“আচ্ছা। তুমি যাওয়ার সময় দরজাটা খুলে রেখো। রাশেদা এলে যেন ঢুকতে পারে।”
মরিয়ম দরজা খুলে রাখল।
আগামীকাল সে দেশে যাচ্ছে, এই কথাটি বৃদ্ধ মানুষটিকে আজ তিনবার বলা হয়েছে। তিনবারই তিনি দুঃখ পেয়েছেন। কিছুক্ষন পর ভুলে গেছেন। চতুর্থবার আর বলা হয়নি।
এ বাড়িতে মরিয়ম এসেছিল পাঁচ বছর তিন মাস আগে। তখন অধ্যাপক সাহেবের স্মৃতি কেবল ফুটো হতে শুরু করেছে। কখনো চাবি রেখে ভুলে যেতেন, কখনো দুপুরের খাবার খেয়ে আবার ভাত চাইতেন। একদিন পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় কলিংবেল বাজিয়ে বলেছিলেন, “আমার ঘরের লোকজন আমাকে বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করেছে।”
তাঁর একমাত্র ছেলে আরমান সাহেব কানাডায় থাকেন। বছরে একবার আসেন, কখনো দুবছরেও আসেন না। ভিডিও কলে বাবাকে দেখেন এবং প্রতিবারই বলেন, “বাবা, আমাকে চিনতে পারছেন?”
প্রশ্নটির মধ্যে এমন এক ধরনের আশাবাদ থাকে, যেন পৃথিবীর সব বিস্মৃতির বিরুদ্ধে একটি মোবাইল ফোনের পর্দাই যথেষ্ট।
অধ্যাপক সাহেব কখনো ছেলেকে চিনতে পারেন, কখনো পারেন না। যেদিন পারেন না, সেদিন আরমান সাহেব মরিয়মকে আলাদা করে ফোন করেন। বলেন, “আপা, বাবাকে একটু ভালো করে দেখবেন। টাকার ব্যাপারে চিন্তা করবেন না।”
টাকার ব্যাপারে সত্যিই কখনো চিন্তা করতে হয়নি। প্রতি মাসের পাঁচ তারিখে বেতন এসেছে। দুবার বেতন বেড়েছে। ঈদে বোনাস এসেছে। গ্রামের বাড়িতে টিনের ছাদ উঠেছে, নাজমার কলেজের বেতন হয়েছে, ছেলে সাগরের জন্য মোটরসাইকেল কেনা হয়েছে। স্বামী মতিনের কোমরের ব্যথার চিকিৎসা হয়েছে।
সবই হয়েছে।
শুধু মরিয়মের যাওয়া হয়নি।
প্রথম বছর যাওয়ার কথা ছিল কোরবানির ঈদে। তার আগের সপ্তাহে অধ্যাপক সাহেব বাথরুমে পড়ে কোমরে ব্যথা পেলেন। দ্বিতীয় বছর আরমান সাহেব দেশে এলেন এবং বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি শুরু হলো। তৃতীয় বছর করোনার পরের ঝামেলা। চতুর্থ বছর মতিন বলল, এখন এসে লাভ কী, নাজমার বিয়ের জন্য টাকা জমাও। পঞ্চম বছর এসে নাজমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। এবার যেতেই হবে।
মেয়ে প্রথমে ফোনে বলেছিল, “মা, তুমি না আসলে লোকে কী বলবে?”
কথাটা শোনার পর মরিয়ম অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।
"লোকে কী বলবে" এই চিন্তা থেকেই যেন পৃথিবীর অর্ধেক সম্পর্ক টিকে আছে। বাকি অর্ধেকটা ভেঙেছেও একই কারনে।
সকালে আরমান সাহেবের শ্যালিকা নীলা এলেন। মরিয়মের অনুপস্থিতিতে একজন নতুন লোক রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। মেয়েটির নাম ঝুমা। বয়স কুড়ির বেশি হবে না। চোখে কাজল, হাতে সস্তা স্মার্টফোন। সে এসে প্রথমেই ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড জানতে চাইল।
মরিয়ম তাকে ওষুধের বাক্স দেখাল। সকালের সাদা ট্যাবলেট, দুপুরের অর্ধেক হলুদ, রাতে ঘুমের আগে নীল। কোন ওষুধের পর কতটুকু পানি, কোনদিন গোসল করাতে হবে, শীতের মধ্যে মাথায় বেশি পানি দেওয়া যাবে না, সব বুঝিয়ে দিল।
ঝুমা অধৈর্য হয়ে বলল, “আমি আগেও রোগী দেখছি, খালা। বুঝি।”
‘খালা’ ডাকটি শুনে মরিয়মের অস্বস্তি হলো। আয়নায় নিজেকে দেখে সে কখনো নিজেকে খালা মনে করেনি। মাথার সামনের দিকে কিছু চুল সাদা হয়েছে, চোখের নিচে কালি পড়েছে। কিন্তু বয়স তো আয়নায় থেমে থাকে না, তা প্রকাশ পায় অন্য মানুষের সম্বোধনে।
দুপুরে নীলা একটা খাম এগিয়ে দিলেন।
“ভাবি পাঠিয়েছে। আপনার ছুটির বেতন, সঙ্গে কিছু বাড়তি। আপনি কিন্তু পনেরো দিনের বেশি থাকবেন না। ভাইয়া খুব টেনশনে আছে।”
মরিয়ম খামটি হাতে নিয়ে বলল, “মেয়ের বিয়ে শেষ হলেই চলে আসব।”
“অবশ্যই। আপনার মতো বিশ্বস্ত মানুষ এখন পাওয়া যায় না। আপনি তো আমাদের পরিবারের একজন।”
পরিবারের একজন!
কথাটি শুনে মরিয়মের ভালো লাগা উচিত ছিল। কিন্তু কেমন যেন হাসি পেল। পরিবারের একজন হয়েও তার জন্য আলাদা স্টিলের গ্লাস রাখা আছে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে। ডাইনিং টেবিলে বসে তাঁর খাওয়ার অনুমতি নেই। মেহমান এলে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় “বাবার কেয়ারগিভার” হিসেবে।
তবে নীলা খারাপ মানুষ নন। গত শীতে নিজের দুটি কার্ডিগান দিয়েছেন। একবার মরিয়মের জ্বর হলে ডাক্তার ডেকে এনেছেন। পৃথিবীতে মানুষকে ভালো কিংবা খারাপ এই দুই ভাগে ভাগ করা যায় না। অধিকাংশ মানুষই অন্যের জন্য যতখানি ভালো হওয়া তাদের সুবিধাজনক, ঠিক ততখানিই ভালো।
রওনা হওয়ার সময় অধ্যাপক সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মরিয়ম তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।
“স্যার, আমি বাড়ি যাইতেছি।”
“বাড়ি?” বৃদ্ধ মানুষটি ভ্রু কুঁচকে বললেন, “এটা তোমার বাড়ি না?”
মরিয়ম মাথা নিচু করে হাসল।
“আমার আরেকটা বাড়ি আছে।”
“আরেকটা?” তিনি বিস্মিত হলেন। “মানুষের কয়টা বাড়ি থাকে? বেঁচে থাকতে হলে কয়টা বাড়ির প্রয়োজন হয়?”
মরিয়ম উত্তর দিতে পারল না।
লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে দেখল, অধ্যাপক সাহেব ঝুমার দিকে তাকিয়ে বলছেন, “রাশেদা, আমার চশমাটা কোথায়?”
চশমাটি তাঁর চোখেই ছিল।
বাস ঢাকা ছাড়তেই মরিয়মের মনে হলো, শহরটা তাকে আটকানোর চেষ্টা করছে। মোহাম্মদপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত রাস্তায় এত যানজট ছিল যে দুই ঘণ্টায় বাস এগিয়েছে মাত্র সাত কিলোমিটার। রাস্তার দুই পাশে উড়ালসড়ক, বিলবোর্ড, শপিং মল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়। সবকিছু যেন মানুষের চেয়েও দ্রুত বাড়ছে।
মরিয়ম জানালার পাশে বসেনি। জানালার পাশের সিটের জন্য বাড়তি একশ টাকা লাগত। সে ভেতরের সিটে বসে পাশের যাত্রীর কাঁধের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল।
নাজমা বারবার ফোন করছে।
“মা, কোন জায়গায়?”
“এই তো, ঢাকা পার হই নাই।”
“তুমি যে শাড়িটার ছবি পাঠাইছিলাম, কিনছ?”
“কিনছি।”
“লালটা না, মেরুনটা?”
“মেরুন।”
“ব্লাউজ?”
“বানাইছি।”
“আমার স্যান্ডেল?”
“সব কিনছি। তুই এত চিন্তা করিস না।”
নাজমা যেন আরও কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। তারপর বলল, “আচ্ছা মা, সাবধানে আইসো।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর মরিয়মের বুকের ভেতর নরম একটা ব্যথা হলো। মেয়ের বয়স যখন এগারো, তখন সে ঢাকা এসেছিল। এখন মেয়ের ষোলো পেরিয়ে গেছে। পাঁচ বছরে ভিডিও কলের পর্দায় নাজমার মুখ বদলাতে দেখেছে সে, গোল মুখ লম্বা হয়েছে, সামনের দাঁতের ফাঁক কমেছে, চুল কোমর ছাড়িয়েছে। কিন্তু ফোনের পর্দায় কোনো গন্ধ পাওয়া যায় না। মেয়ের মাথার চুলে এখনো রোদে শুকানো ধানের গন্ধ আছে কি না মরিয়ম জানে না।
রাত সাড়ে দশটায় বাস যখন উপজেলা সদরে পৌঁছাল, মতিন সেখানে ছিল না। ছিল সাগর।
মরিয়ম প্রথমে ছেলেকে চিনতে পারেনি। লম্বা হয়েছে, মুখে পাতলা গোঁফ। পরনে জিনসের জ্যাকেট। হাতে সেই মোটরসাইকেলের চাবি, যেটি কেনার জন্য মরিয়ম ছয় মাসের বোনাস জমিয়েছিল।
সাগর দূর থেকে বলল, “ব্যাগ দাও।”
মরিয়ম দাঁড়িয়ে রইল। তার ইচ্ছা করছিল ছেলেকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে অনেক মানুষ। সাগরও কেমন অস্বস্তি নিয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে।
মরিয়ম বলল, “আমারে চিনছিস?”
সাগর হেসে ফেলল।
“চিনব না ক্যান? ফেসবুকে ছবি দেখি না?”
মরিয়মও হাসল। তারপর বলল, “তোর বাপ আসে নাই?”
“আব্বার একটু কাজ আছে। দোকানে মাল নামতেছে।”
“এই রাইতে?”
সাগর উত্তর দিল না। মোটরসাইকেলের পেছনে ট্রলি ব্যাগ বাঁধতে লাগল।
পথে মরিয়ম ছেলের কোমর ধরে বসতে চেয়েছিল। পারেনি। নিজের ছেলে এখন পরপুরুষের মতো বড় হয়ে গেছে। সে পেছনের লোহার হাতল শক্ত করে ধরে রইল। শীতের বাতাসে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
সাগর একবার ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ঠান্ডা লাগতেছে?”
মরিয়ম বলল, “না রে।”
সে যে কাঁদছে, ছেলেটা বুঝতে পারেনি।
বাড়ির উঠানে ঢুকে মরিয়ম প্রথমে টিনের নতুন ঘরটি দেখল। নীল রঙের টিন। সামনে ছোট বারান্দা। উঠানের একপাশে পাকা বাথরুম হয়েছে। কল চাপলে পানি ওঠে। এসবই সে ছবিতে দেখেছে, তবু সামনে দেখে মনে হলো অন্য কারও বাড়িতে এসেছে।
দরজায় নাজমা দাঁড়িয়ে ছিল।
মরিয়ম তাকে দেখে স্থির হয়ে গেল। মেয়ে নয়, যেন যুবতী সে স্বয়ং দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। একই চোখ, একই ভুরু, এমনকি ভয় পেলে নিচের ঠোঁট কামড়ানোর অভ্যাসটাও একই।
“মা!”
নাজমা দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
মরিয়ম মেয়ের মাথায় মুখ গুঁজে গভীর নিশ্বাস নিল। ধান কিংবা রোদের গন্ধ পেল না। পেল নারকেল তেল আর কোনো সস্তা শ্যাম্পুর মিষ্টি গন্ধ। সে শব্দ করে কেঁদে উঠল।
নাজমাও কাঁদছে। কিন্তু কাঁদতে কাঁদতেই বলল, “মা, ছাড়ো। সবাই দেখতেছে।”
উঠানে সত্যিই কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। মতিনের বড় বোন, পাশের বাড়ির জুলেখা, নাজমার দুই বান্ধবী। আর বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল একটি অল্পবয়সী নারী। তার কোলে ঘুমন্ত শিশু।
মরিয়ম মেয়েকে ছেড়ে নারীর দিকে তাকাল। নারীটি মাথায় ঘোমটা টেনে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। বয়স সাতাশ-আটাশ। গায়ের রং শ্যামলা, নাকের পাশে ছোট একটি কালো তিল।
সে নিচু হয়ে মরিয়মের পায়ে হাত দিতে গেল। মরিয়ম পিছিয়ে গেল।
“এ কে?”
উঠান হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল। শিশুটি ঘুমের মধ্যে নড়ে উঠল। দূরে কারও বাড়িতে টেলিভিশন চলছে। নাটকের কোনো নারী কাঁদতে কাঁদতে বলছে "আমি তোমাকে কোনোদিন ক্ষমা করব না।"
মতিনের বড় বোন দ্রুত বললেন, “ঘরে যাও আগে। এত রাইতে এইসব কথা উঠানে কইতে হয়?”
মরিয়ম কারও দিকে তাকাল না। আবার প্রশ্ন করল, “এইডা কে?”
নাজমা তার হাত ধরল।
“মা, তুমি আগে ঘরে চলো।”
মরিয়ম বুঝল, সবাই জানে। শুধু সে জানে না।
তখন মতিন এল। গায়ে সোয়েটার, মাথায় উলের টুপি। মরিয়মকে দেখে সে এমনভাবে হাসার চেষ্টা করল, যেন বহুদিনের কোনো পাওনাদার হঠাৎ সামনে এসে পড়েছে।
“আইছ?”
মরিয়ম তার দিকে তাকিয়ে রইল।
মতিন বলল, “বাসে কষ্ট হইছে?”
“এই মহিলা কে?”
মতিন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল।
“তুমি সবসময় এমন করো। আগে-পিছে কিছু বুঝবা না, মানুষের সামনে চিল্লাচিল্লি শুরু করবা।”
মরিয়ম তখনো চিৎকার করেনি। তার গলা বরং অস্বাভাবিক শান্ত।
“আমি কী করছি?”
কেউ জবাব দিল না।
কোলের শিশুটি হঠাৎ কেঁদে উঠল। নারীটি তাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে দোলাতে লাগল। মুখে অসহায় এক ধরনের লজ্জা। তাকে দেখে মরিয়মের রাগ হলো না। বরং ভয় হলো। নারীটির চোখে যে শংকা, সেই শংকা সে চেনে। পাঁচ বছর আগে ঢাকার ফ্ল্যাটে প্রথম দিন ঢোকার সময় তার নিজের চোখেও এমন ছিল।
মতিন বলল, “ওর নাম হালিমা।”
“তোমার কী হয়?”
“তুমি ঘরে চলো। বুঝায়া কই।”
“এইখানেই কও।”
মতিন চোয়াল শক্ত করল।
“বিয়া করছি।”
শব্দ দুটি উঠানের মাঝখানে পড়ে রইল। কেউ তুলল না।
মরিয়ম দীর্ঘ সময় কিছু বলল না। সে শুধু হালিমার কোলের শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইল। গোল মুখ, কপালে ঘাম, ছোট্ট হাত মায়ের কাপড় আঁকড়ে আছে।
“কতদিন?”
“দেড় বছর।”
“ছাওয়ালের বয়স?”
“আট মাস।”
মরিয়ম মাথা নাড়ল। হিসাব মিলল। ঢাকায় বসে সে যখন ঈদের বোনাস পাঠিয়েছিল, তখন হালিমা গর্ভবতী। মতিন ফোনে বলেছিল, দোকানে নতুন মাল তুলবে। সে যখন নিজের জন্য শীতের চাদর না কিনে টাকা পাঠিয়েছিল, তখন এই বাড়িতে শিশুর জন্য দোলনা কেনা হচ্ছিল।
মতিন বিরক্ত গলায় বলল, “তুমি পাঁচ বছর বাড়ি নাই। সংসার কি বাতাসে চলে? পোলাপান কে দেখছে? আমি অসুস্থ হইলে ভাত কে দিছে? গেরামে কি মানুষজন কথা কয় নাই? পরিস্থিতি বুঝবা না?”
মরিয়ম বলল, “আমারে জানাও নাই ক্যান?”
“জানাইলে কী করতা?”
এই প্রশ্নটির উত্তর তার জানা ছিল না।
সত্যিইতো, সে কী করত? চাকরি ছেড়ে চলে আসত? নাজমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। সাগরের মোটরসাইকেল হতো না। ঘরে টিন উঠত না। মতিনের দোকান হতো না।
তার পরিশ্রমে তৈরি সংসারে তার অনুপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
মরিয়মের জন্য যে ঘরটি রাখা হয়েছে, সেটি আগে তার নিজের ঘর ছিল। এখন সেখানে চালের বস্তা, দোকানের কার্টন, ভাঙা ফ্যান এবং মরিচা ধরা সেলাই মেশিন রাখা। একপাশে সরু একটি খাট পাতা হয়েছে। বিছানায় নতুন চাদর। ফুল আঁকা বালিশের কভার।
নাজমা বলল, “তুমি দশ পনেরো দিন এই ঘরেই থাকো মা। বিয়ার পরে আমরা গুছায়া দিব।”
“তুই কই ঘুমাস?”
“ওই ঘরে।”
“কার লগে?”
“ছোটমার লগে।”
‘ছোটমা’ শব্দটি নাজমার মুখ থেকে এমন স্বাভাবিকভাবে বের হলো যে মরিয়মের বুকের ভেতর কিছু একটা খুব ধীরে ভেঙে গেল। ভাঙার কোনো শব্দ হলো না।
সে ট্রলি ব্যাগ খুলতে খুলতে বলল, “হালিমা তোরে ভালোবাসে?”
নাজমা খানিকটা থমকে গেল।
“ভালোই।”
“মারে?”
“না।”
“খাওন দেয়?”
“দেয়।”
“অসুখ হইলে মাথায় পানি দেয়?”
নাজমা এবার মায়ের দিকে তাকাল। তারপর খুব আস্তে বলল, “দেয়।”
মরিয়ম মাথা নিচু করে কাপড় বের করতে লাগল।
“তাইলে ঠিক আছে।”
নাজমা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “তুমি রাগ করছ?”
“কার ওপর?”
“আমাদের ওপর।”
মরিয়ম একটি মেরুন শাড়ি মেয়ের হাতে দিল।
“এইটা দেখ তো, পছন্দ হইছে?”
নাজমা শাড়ি খুলে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। মেরুন জমিনে সোনালি কাজ। সঙ্গে মিলিয়ে ব্লাউজ। স্যান্ডেলের বাক্স খুলে পায়ে দিল। সামান্য বড় হয়েছে, তবু সে বলল একদম ঠিক।
মেয়ের আনন্দ দেখে মরিয়ম হাসল। হাসতে গিয়ে তার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে হালিমা তার ঘরে এল। শিশুটি কোলে। অনেকক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, “আপা, ভিতরে আসমু?”
মরিয়ম বস্তার পাশে রাখা মোড়াটি দেখিয়ে বলল, “বসো।”
হালিমা বসল না। দাঁড়িয়েই রইল।
“আমার কোনো দোষ নাই, আপা। আমার বাপ নাই। ভাইয়ের সংসারে ছিলাম। উনি কইছিলেন, আপনে ঢাকায় থাকবেন। আর ফিরবেন না।”
মরিয়ম শিশুটির দিকে তাকাল।
“ছাওয়ালের নাম কী?”
“মাহিন।”
“আমার ঘরে ঘুম আসে না?”
হালিমা বুঝতে না পেরে তাকাল।
মরিয়ম বলল, “তুমি আর আমার পোলাপান যে ঘরে ঘুমাও, ওই ঘরে।”
“আপা…”
“ওই ঘরের জানালার কাঠে একটা দাগ আছে। সাগর ছোট থাকতে বঁটি দিয়া কাটছিল। এখনো আছে?”
হালিমা মাথা নেড়ে বলল, “আছে।”
“বর্ষাকালে জানালা দিয়া পানি ঢোকে?”
“অল্প ঢোকে।”
“খাটের নিচে একটা টিনের বাক্স ছিল। আছে?”
“আছে। আমার কাপড় রাখি।”
মরিয়ম হাসল।
“ভালো করো।”
হালিমার চোখ ভিজে উঠল। সে শিশুটিকে আরও শক্ত করে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরল।
মরিয়ম বলল, “তোমার ভয় নাই। আমি তোমারে উঠায়া দিতে আসি নাই।”
“তাইলে?”
প্রশ্নটি শুনে মরিয়ম চমকে গেল। সত্যিই সে কেন এসেছে?
মেয়ের বিয়েতে? নিজের সংসার দেখতে? নাকি পাঁচ বছর ধরে যে ‘বাড়ি’ শব্দটি বলে সে অধ্যাপক সাহেবের বাসা থেকে ছুটি নিয়েছে, সেই শব্দটির সত্যতা যাচাই করতে?
সে কোনো উত্তর দিল না।
হালিমা বেরিয়ে যাওয়ার সময় মরিয়ম তাকে ডাকল।
“শোনো।”
“জি?”
মরিয়ম ট্রলি ব্যাগ থেকে একটি নীল রঙের শাল বের করল। নিজের জন্য কিনেছিল। নরম কাপড়, কিনারায় সূক্ষ্ম নকশা।
“এইটা নাও।”
হালিমা ভয় পেয়ে গেল।
“না আপা, আমি নিতে পারব না।”
“শীতে ছাওয়াল কোলে নিয়া উঠানে বসলে গায়ে দিও।”
“এইটা তো আপনের।”
মরিয়ম শালটি তার হাতে দিয়ে বলল "আমার জিনিসই তোমারে দিলাম।"
পরের দশ দিন বাড়িতে বিয়ের কোলাহল চলল।
আত্মীয়স্বজন এল। সবাই মরিয়মকে দেখে আহা-উহু করল। কেউ বলল, “ঢাকার পানি লাগছে, চেহারা খুলে গেছে।” কেউ বলল, “তুমি না থাকলে মতিনের সংসারটা ভাসত।” কেউ ফিসফিস করে বলল, “হালিমাও খারাপ না। দুই সতিন মিলেমিশে থাকলে সমস্যা কী?”
মানুষ অন্যের দুঃখের খুব সহজ সমাধান দিতে পারে।
মরিয়ম সারাদিন কাজ করল। চাল বাছল, মাংসে মসলা মাখাল, অতিথিদের চা দিল। হালিমা তার পাশে পাশে থাকল। প্রথম দুদিন তাকে ‘আপা’ বলেছে। তৃতীয় দিন অসাবধানে বলল, “বুবু, লবণটা কই?”
তারপর ভয় পেয়ে মুখের দিকে তাকাল। মরিয়ম লবণের কৌটা এগিয়ে দিল।
তাদের মধ্যে অদ্ভুত এক সম্পর্ক তৈরি হলো। এখানে ভালোবাসা নেই, শত্রুতাও নেই; আছে একই পুরুষের হাতে ভিন্ন সময়ে প্রতারিত দুই নারীর নীরব আত্মীয়তা।
মতিন প্রথম রাতে মরিয়মের ঘরে আসেনি। দ্বিতীয় রাতেও না। তৃতীয় রাতে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
“ঘুমাইছ?”
“না।”
“ভিতরে আসমু?”
মরিয়ম দরজা খুলল না।
মতিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “রাগ কইরা থেকো না। যা করছি সংসারের ভালোর জন্য করছি।”
ভেতর থেকে মরিয়ম বলল, “তুমি ভালোই করছ।”
“তাইলে দরজা খোলো।”
“এই ঘরে অনেক মালপত্র। তোমার বসার জায়গা নাই।”
মতিন আর কিছু বলল না।
তার পায়ের শব্দ সরে গেল। কিছুক্ষণ পর পাশের ঘরে শিশুর কান্না শোনা গেল। হালিমার কণ্ঠ, তারপর মতিনের বিরক্ত গলা। শব্দগুলো এত পরিচিত সংসারের মতো লাগল যে মরিয়ম বালিশে মুখ চেপে ধরল।
এই সংসার একসময় তার ছিল, এই দাবিটিই হঠাৎ অবিশ্বাস্য মনে হলো।
কোনো বাড়ি কি সত্যিই কারও হয়? নাকি মানুষ যতদিন সেখানে থাকে, ততদিনই বাড়িটি তাকে সহ্য করে?
নাজমার বিয়ের দিন মেয়েকে সাজানো হলো মরিয়মের কেনা শাড়িতে। চোখে কাজল, কপালে টিপ, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। আয়নায় মেয়েকে দেখে মরিয়মের নিজের বিয়ের দিনের কথা মনে পড়ল। সেদিন তার বয়স সতেরো। শাড়ি ছিল লাল, গায়ে হলুদের গন্ধ ছিল, আর মতিন সারাক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল।
এখন সেই মানুষটির মাথার চুলে পাক ধরেছে। পেট সামান্য বেরিয়েছে। অতিথিদের সামনে সে বেশ গম্ভীরভাবে চলাফেরা করছে। মেয়ের বাপ হিসেবে তার অনেক দায়িত্ব।
মরিয়মের দায়িত্ব রান্নাঘরে।
বরযাত্রীরা এলে হালিমা দৌড়ে এসে বলল, “বুবু, তাড়াতাড়ি আসেন। মেয়ে কান্দে।”
মরিয়ম নাজমার ঘরে ঢুকে দেখল, মেয়ে বিছানায় বসে কাঁদছে। তার চারপাশে বান্ধবীরা। মরিয়ম পাশে বসতেই নাজমা তাকে জড়িয়ে ধরল।
“মা, আমার ভয় লাগতেছে।”
মরিয়ম মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ভয়ের কিছু নাই।”
“আমি কি সুখী হমু?”
প্রশ্নটি শুনে মরিয়ম থেমে গেল।
ঘরে অনেক মানুষ, অনেক শব্দ। কেউ ফুলের মালা খুঁজছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ বলছে কাজল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই কোলাহলের মধ্যে মেয়েটি শুধু তার মায়ের কাছে সত্যি কথা জানতে চায়।
মরিয়ম কী বলবে?
বিয়ে করলে মানুষ সুখী হয়? সংসার করলে? সন্তান হলে? টাকা আয় করলে? নিজের ঘর বানালে? এসবের কোনোটিরই নিশ্চিত উত্তর তার জানা নেই।
সে মেয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “কেউ তোরে সুখী কইরা দিবে এই আশায় থাকিস না। নিজের জন্য একটু জায়গা রাখিস। খুব ছোট হইলেও। যে জায়গায় তুই ছাড়া আর কারও অধিকার থাকব না।”
নাজমা কান্নার মধ্যে বলল, “তোমার সেই জায়গা আছে?”
মরিয়ম উত্তর দিল না।
মেয়েকে বিদায় দেওয়ার সময় সে চিৎকার করে কাঁদল না। শুধু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। শেষ পর্যন্ত লোকজন ছাড়িয়ে নিল।
বরের গাড়ি উঠান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সবাই হালিমাকে সান্ত্বনা দিল। কারণ সে উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।
মরিয়ম তখন রান্নাঘরে। ব্যবহৃত প্লেটের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কলের পানি ছেড়ে রেখেছিল। পানি উপচে পড়ে মেঝে ভিজে যাচ্ছিল।
কেউ তাকে খুঁজতে আসেনি।
ঢাকায় ফিরে আসার কথা ছিল বিয়ের পরদিন। কিন্তু মরিয়ম আরও চার দিন রইল। নাজমা শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরবে, এই আশায়। মেয়ে ফিরল না। নতুন বউকে নাকি এত তাড়াতাড়ি বাপের বাড়িতে পাঠায় না।
চতুর্থ দিনের সকালে নীলা ফোন করলেন।
“আপা, আপনি কবে আসছেন? এখানে খুব সমস্যা হচ্ছে। নতুন মেয়েটা গতকাল চলে গেছে।”
“চলে গেছে ক্যান?”
“কে জানে! এখনকার মেয়েদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই। স্যার সারারাত আপনার নাম ধরে ডেকেছেন। আপনি কালই চলে আসেন।”
মরিয়ম অবাক হয়ে বলল, “আমার নাম মনে আছে?”
ওপাশে নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
“সব সময় না। মাঝে মাঝে।”
মরিয়ম ফোন রেখে দিল।
হালিমা উঠানে শিশুর কাপড় শুকাচ্ছিল। নীল শালটি গায়ে জড়ানো। মরিয়মকে দেখে বলল, “বুবু, চা দিমু?”
“দাও।”
“চিনি কম?”
“তুমি জানলা কেমনে?”
“উনি বলেছেন আপনে চিনি কম খান।”
মরিয়ম হেসে ফেলল। পাঁচ বছরে মতিন তার সম্পর্কে অন্তত একটি কথা মনে রেখেছে।
সেদিন দুপুরেই সে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত জানাল। মতিন অবাক হলো না। শুধু বলল, “আর কয়দিন থাকতা।”
“ওইখানে অসুবিধা।”
“তোমার চাকরি তো রাখতে হইব।”
“হ।”
“নাজমার বিয়েতে খরচ বেশি হইছে। সামনের দুই মাস টাকা একটু বেশি পাঠাইতে পারবা?”
মরিয়ম তার মুখের দিকে তাকাল। মানুষটি কথাটি খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছে। যেন পৃথিবীর কোথাও কিছু বদলায়নি।
“দেখি।”
“আর সাগরের মোটরসাইকেলের কিস্তিটাও আছে।”
“দেখি।”
মতিন কিছুক্ষণ পর অস্বস্তি নিয়ে বলল, “হালিমার উপর রাগ রাইখো না।”
মরিয়ম বলল, “ওর উপর রাগ নাই।”
“আমার উপর রাগ?”
মরিয়ম দীর্ঘ সময় ভেবে বলল, “ছিল। এখন নাই।”
মতিনের মুখে স্বস্তি ফুটল।
সে বুঝল না, ভালোবাসার বিপরীত রাগ নয়। রাগ থাকলে সম্পর্কের কোথাও এখনো আগুন থাকে। মরিয়মের ভেতরের আগুনটি এই কয়েক দিনে নিভে গেছে। পড়ে আছে ঠান্ডা ছাই, যা দিয়ে সংসারের চুলা জ্বলে না।
১০
যাওয়ার সকালে সাগর মোটরসাইকেল বের করল। হালিমা মুড়ি আর নারকেল দিয়ে খাবার বেঁধে দিল। মাহিনকে মরিয়মের কোলে দিয়ে বলল, “দোয়া কইরেন।”
মরিয়ম শিশুটির কপালে চুমু খেল।
মতিন দোকানে যাওয়ার কথা বলে আগেই বেরিয়ে গেছে। বিদায়ের সময় বলেছে, “পৌঁছাইয়া ফোন দিও।”
বাড়ির দরজা থেকে বেরিয়ে মরিয়ম একবার পেছনে তাকাল।
নীল টিনের ঘর। পাকা বাথরুম। উঠানে কাপড় শুকাচ্ছে। জানালার পাশে হালিমা দাঁড়িয়ে। এই বাড়ির প্রতিটি ইটে তার টাকা আছে, প্রতিটি ঘরে তার অনুপস্থিতি।
অথচ চলে যাওয়ার মুহূর্তে কেউ তাকে থাকতে বলল না।
বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে সাগর ব্যাগ নামিয়ে দিল।
“মা, টাকা আছে?”
“আছে।”
“আব্বা কইছে, মাসের শুরুতে পাঠাইবা।”
“হ।”
সাগর মোটরসাইকেলে উঠে আবার নামল। তারপর হঠাৎ মাকে জড়িয়ে ধরল। কাজটি এত দ্রুত করল যেন কেউ দেখে ফেললে লজ্জা হবে।
“আবার কবে আসবা?”
মরিয়ম ছেলের মাথায় হাত রাখল।
“জানি না।”
“নাজমার বাচ্চা হইলে আইসো।”
“আচ্ছা।”
সাগর চলে গেল।
বাসে উঠে মরিয়ম জানালার পাশের সিটে বসল। এবার সে বাড়তি একশ টাকা দিয়েছে। শীতের সকালের মাঠ পেছনে সরে যাচ্ছে। কুয়াশার ভেতর গাছপালা, ছোট ঘর, পুকুর সবকিছু আধা দেখা, আধা অদৃশ্য।
ফোন বেজে উঠল। ভিডিও কল। অধ্যাপক আনিসুর রহমান।
নীলা হয়তো ফোনটি তাঁর হাতে দিয়েছেন। পর্দায় বৃদ্ধ মানুষের মুখ দেখা গেল। তিনি অনেকক্ষণ মরিয়মের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“কে?”
মরিয়ম হাসল।
“আমি মরিয়ম।”
“মরিয়ম কে?”
“আপনার দেখাশোনা করি।”
বৃদ্ধ মানুষটি ভ্রু কুঁচকে কিছু মনে করার চেষ্টা করলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ও, তুমি! তুমি কোথায় গিয়েছিলে? আমি সারা বাড়ি খুঁজলাম।”
মরিয়মের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।
অধ্যাপক সাহেব শিশুর মতো অভিমানী গলায় বললেন, “তুমি বাড়ি আসবে না?”
মরিয়ম জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাস তখন তার গ্রাম ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দূরে নীল টিনের বাড়িটা আর দেখা যায় না।
সে বলল, “আসতেছি, স্যার।”
“কখন?”
“আজই।”
“রাশেদা আসবে?”
মরিয়ম চোখ মুছল।
“আসবে।”
অধ্যাপক সাহেব নিশ্চিন্ত হয়ে গেলেন।
“দরজাটা খোলা রেখো।”
কল কেটে যাওয়ার পর মরিয়ম ফোনটি কোলে রাখল। কিছুক্ষণ পর নাজমার একটি ম্যাসেজ এল,
"মা, পৌঁছাইলে জানাইও।"
তার নিচে নীলা লিখেছেন,
"আপা, তাড়াতাড়ি আসবেন। স্যার কিছু খাচ্ছেন না।"
দুটি বার্তা পাশাপাশি জ্বলছে। একদিকে যে সংসারে সে মা, অন্যদিকে যে সংসারে সে কাজের লোক। আশ্চর্য, তাকে বেশি প্রয়োজন দ্বিতীয় সংসারটিরই।
বাস গতি বাড়াল।
মরিয়ম মাথা জানালার কাচে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, আচ্ছা, মানুষ আসলে কোন বাড়ির সদস্য? যেখানে তার নামে একটি ঘর থাকে, সেই বাড়ির? নাকি যেখানে তার অনুপস্থিতি টের পাওয়া যায়, সেই বাড়ির?
বাসের জানালায় নিজের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মরিয়ম দেখল, একজন মাঝবয়সী নারী কুয়াশার ভেতর দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। তার কোলে কোনো শিশু নেই, পাশে স্বামী নেই, পেছনে নিজস্ব ঘর নেই। শুধু একটি ট্রলি ব্যাগ, কয়েকটি ওষুধ আর দুই সংসারের চাবি।
দুটির একটিও তার নয়। তবু দুটি দরজাই খুলবে তার হাতে।
মরিয়ম ফোনটি বন্ধ করে দিল। তারপর প্রথমবারের মতো জানালার কাচ পুরোটা সরিয়ে দিল। হিমেল বাতাসে তার আঁচল উড়তে লাগল।
রাস্তার পাশে একটি ছোট মেয়ে মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। দানবীয় বাসটি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটি হঠাৎ হাত নাড়ল। মরিয়মও হাত তুলল। মেয়েটি তাকে চেনে না; তবু যতক্ষণ দেখা গেল, হাত নাড়তেই থাকল।
মরিয়মও।
যেন তারা দুজনেই ভুল করে একে অন্যকে আপন মানুষ ভেবেছে।

কখনো কখনো ভুলটাই মানুষের শেষ আশ্রয়।

No comments:

Post a Comment