আজ যেখানে কেওড়া-গরান-সুন্দরী গাছের অরণ্য, যেখানে জোয়ারের পানিতে ভেসে যায় নদীর বুক, সেই সুন্দরবনের বুকেই একদিন ছিল জনপদ, বন্দর, বাজার আর মানুষের বসতি। ইতিহাসের পুরোনো মানচিত্রে এমনই এক হারিয়ে যাওয়া নগরের নাম—নলদী (Noldy)।
পর্তুগিজ ও ওলন্দাজদের প্রাচীন মানচিত্রে সুন্দরবন অঞ্চলের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নগর বা বন্দরনগরের উল্লেখ পাওয়া যায়—Pacaculi, Cuipitavaz, Noldy, Dipuria এবং Tiparia। পরবর্তী গবেষকেরা এগুলোর কয়েকটির সঙ্গে বাংলার পরিচিত ঐতিহাসিক স্থানকে মিলিয়ে দেখেছেন। নলদী তাদের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময়।
সতীশচন্দ্র মিত্র তাঁর অমূল্য গ্রন্থ যশোহর-খুলনার ইতিহাস-এর প্রথম খণ্ডে ‘সুন্দরবনের বিনষ্টনগর নলদী’ নামে একটি পরিশিষ্ট লিখেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগনার নলুয়া নদীর তীরের নলুয়া হয়তো সেই প্রাচীন নলদীর স্থান। তবে তিনি নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন—ঠিক সেই স্থানটিই যে নলদী, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
মিত্রের বর্ণনায়, ১৮৭০ সালে খুলনার পণ্ডিত রেণী সাহেব ফরাসি পণ্ডিত কার্টামবার্ডের কাছ থেকে তিনটি প্রাচীন মানচিত্রের প্রতিলিপি সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে N. Sanson-এর ১৬৫২ সালের মানচিত্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেই মানচিত্রে নলদীর অবস্থান চিহ্নিত ছিল। নলদীর উত্তরে ছিল বিস্তৃত বুড়ন পরগনা। এই মানচিত্রের ভিত্তিতে মিত্র অনুমান করেন, ভাগীরথী ও মধুমতীর মোহনার মধ্যবর্তী সুন্দরবনের কোনো বিস্তীর্ণ দ্বীপে একসময় নলদী নামের শহর ছিল।
মিত্রের কল্পনায় নয়, তাঁর বক্তব্যের পেছনে ছিল পুরোনো ইউরোপীয় মানচিত্রের সাক্ষ্য। ১৬৫২ সালের Sanson-এর মানচিত্রটি তাই নলদীর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
কিন্তু এখানেই ইতিহাসের আরেকটি আকর্ষণীয় বাঁক।
উনিশ শতকের আরেক গবেষক এইচ. ব্লকম্যান নলদীর অবস্থান নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছিলেন। তাঁর Contributions to the Geography and History of Bengal গ্রন্থে তিনি লিখেছেন—
“Noldy is the town and mahal of Noldi (Naldi) on the Noboganga, east of Jessore, near the Madhumati.”
অর্থাৎ ব্লকম্যানের মতে, Noldy কোনো হারিয়ে যাওয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনার শহর নয়; বরং এটি ছিল নবগঙ্গার তীরে, যশোরের পূর্বদিকে, মধুমতীর কাছাকাছি অবস্থিত নলদী বা নলদি।
এখানেই নলদীর রহস্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।
কারণ পুরোনো মানচিত্রে নদীর গতিপথ আজকের মতো ছিল না। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের নদীগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গতিপথ পরিবর্তন করেছে। কোথাও নদী ভেঙেছে, কোথাও নতুন চর জেগেছে, কোথাও পুরোনো নদী শুকিয়ে গেছে। ফলে কয়েকশ বছর আগের একটি শহরকে বর্তমান মানচিত্রে হুবহু খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
সতীশচন্দ্র মিত্রও তাঁর যশোহর-খুলনার ইতিহাস-এর ভূমিকায় সুন্দরবনের ইতিহাসের এই বিপন্নতার কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, “ঝড়-ঝাপটা, প্লাবন ও অবনমন” সুন্দরবনের বহু প্রাচীন নিদর্শনকে বিলীন করে দিয়েছে। এমনকি এককালে খরস্রোতা নদীর সঙ্গমে গড়ে ওঠা নলদী ও ধূমঘাটের মতো বিশাল জনপদের চিহ্নও পরে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো—নলদীকে শুধু একটি শহর হিসেবে নয়, একটি ‘মহাল’ বা প্রশাসনিক ভূখণ্ড হিসেবেও উল্লেখ করেছেন ব্লকম্যান। অর্থাৎ নামটি নিছক কোনো ছোট নদীতীরবর্তী বসতির নাম ছিল না—একটি বৃহত্তর প্রশাসনিক বা অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গেও এর সম্পর্ক ছিল বলে অনুমান করা যায়।
তাহলে নলদী কি ছিল বন্দর?
পুরোনো পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ মানচিত্রে Noldy-কে সুন্দরবন অঞ্চলের পাঁচটি উল্লেখযোগ্য শহর/বন্দরের অন্যতম হিসেবে দেখানো হয়েছে। পরবর্তী গবেষণায় অবশ্য এসব মানচিত্রের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। ব্লকম্যান মনে করেছিলেন, পুরোনো ইউরোপীয় মানচিত্রগুলো সুন্দরবনের সমগ্র অঞ্চল একসময় সমৃদ্ধ নগরসভ্যতায় পূর্ণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ দেয় না। তাঁর মতে, পুরোনো মানচিত্রে উল্লিখিত Noldy-কে বরং পরিচিত নলদী-র সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়।
অন্যদিকে সতীশচন্দ্র মিত্র মনে করেছিলেন, মানচিত্রকাররা কোনো কোনো স্থানের নাম ভুল উচ্চারণ বা বানানে লিখতে পারেন, কিন্তু সম্পূর্ণ কাল্পনিক শহর বানিয়ে মানচিত্রে বসিয়ে দেবেন—এটা সহজে বিশ্বাস করা যায় না। তাই তিনি সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া নগরগুলোর অস্তিত্বকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
আজকের সুন্দরবনের দিকে তাকালে প্রশ্নটি তাই আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে—কোথায় গেল নলদী?
কোনো একসময় সেখানে হয়তো নদীর ঘাটে নোঙর করত বাণিজ্যতরী। বাজারে উঠত লবণ, ধান, মোম, মধু, কাঠ কিংবা অন্যান্য পণ্য। নদীর তীরে ছিল মানুষের বসতি। হয়তো ছিল মসজিদ, মন্দির, বাজার, ঘাট ও প্রশাসনিক স্থাপনা। তারপর নদী বদলেছে। ভূমি বসে গেছে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বদলেছে ভূপ্রকৃতি। একদিন মানুষের কোলাহল থেমে গেছে। শহরের ওপর নেমে এসেছে সুন্দরবনের সবুজ অন্ধকার।
আজ তার নামটুকু বেঁচে আছে কয়েকশ বছরের পুরোনো মানচিত্রে—NOLDY।
হয়তো কোনোদিন সুন্দরবনের কোনো মাটির নিচে, কোনো পুরোনো নদীর শুকনো খাতে, কিংবা কোনো উঁচু ঢিবির নিচে মিলবে সেই হারিয়ে যাওয়া শহরের চিহ্ন।
তখন হয়তো প্রমাণ হবে—সুন্দরবনের গভীর সবুজের নিচে সত্যিই ঘুমিয়ে আছে নলদী নামের এক প্রাচীন নগর।
সূত্র ও পাঠযোগ্য প্রমাণ
১. সতীশচন্দ্র মিত্র, যশোহর-খুলনার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পরিশিষ্ট-ক, ‘সুন্দরবনের বিনষ্টনগর নলদী’, পৃ. ৮৫। এই অংশেই নলুয়া নদীর তীরের নলুয়াকে নলদীর সম্ভাব্য স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৬৫২ সালের Sanson-এর মানচিত্রের কথা বলা হয়েছে।
২. H. Blochmann, Contributions to the Geography and History of Bengal, Part I, ‘Geographical’, pp. 23–25. এখানে Noldy-কে Noldi/Naldi on the Noboganga, east of Jessore, near the Madhumati হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
৩. The Indian Antiquary, Vol. III (1874), সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ/আলোচনা। এখানে Blochmann-এর নলদী-সংক্রান্ত মত এবং পুরোনো পর্তুগিজ-ওলন্দাজ মানচিত্রের পাঁচটি নগরের আলোচনা পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।
৪. ১৬৫২ সালের Nicolas Sanson-এর মানচিত্র—Empire du Grand Mogol। সতীশচন্দ্র মিত্র যে মানচিত্রের প্রতিলিপির কথা বলেছেন, সেটিই নলদীর অবস্থান নিয়ে আলোচনার অন্যতম প্রধান প্রাচীন কার্টোগ্রাফিক সূত্র।
সাজেদ রহমান
No comments:
Post a Comment