আজকে আমার যে বয়স, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে আমার মা ঠিক সেই বয়সে, দুটো মেয়েকে নিয়ে স্বামীহারা হয়েছিল। না, তার স্বামীর মৃত্যু হয়নি। বাড়ি ছেড়ে, সংসার ছেড়ে, স্ত্রী ও দুই মেয়ে ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে, কারণ তার সিম্পলি মনে হয়েছিল যে এই পরিবারটা তার যোগ্য নয়।
হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন।
কেন মনে হয়েছিল এরকম?
এক, তার স্ত্রী তার মনের মতো যথেষ্ট সুন্দরী ছিল না। যদিও সেই বিয়ে প্রেমের বিয়ে ছিল, তবুও তার চারপাশের শিক্ষিত, চাকরিরত, ড্যাশিং, স্মার্ট মহিলাদের দেখে বাড়ির গ্রাম্য, সাদাসিধে, হোমমেকার, গোবেচারা মহিলাটিকে তার আর মনে ধরেনি। এবং এই মনে না ধরার ব্যাপারটা তাদের বিয়ের ষোল বছর পর তার মনে হয়।
দুই, আমার জন্মদাতার ইচ্ছা ছিল যে আমি দাবায় সাংঘাতিক কিছু করব। এটা তার ধ্যানজ্ঞান ছিল, যেটার বোঝা আমাকে টেনে নিয়ে চলতে হয়েছিল পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়স অবধি।
বাড়িতে রিসোর্সের অভাব ছিল না, কোচের অভাব ছিল না। যেখানে আজকের দিনেও একজন দাবার গৃহশিক্ষক ন্যূনতম পাঁচশো টাকা প্রতি ক্লাসে ফি চাইলে অনেক পেরেন্টের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে এবং তারা নিরন্তর মাছ বাজারের মতো দরকষাকষি করে চলেন, পঞ্চাশ টাকা হলেও কমানোর জন্য, সেখানে আজ থেকে কুড়ি বছর আগেও আমার বাবা আমার দাবাশিক্ষককে ক্লাসপিছু হাজার টাকা অবধি দক্ষিণা দিয়েছেন। সাথে এলাহি খাওয়াদাওয়ার আয়োজনের প্রসঙ্গ নাহয় নাই তুললাম।
এহেন অবস্থায় আমার ওপর যে মারাত্মক প্রেশারটা তৈরি হতো, তার থেকে অনেক কম প্রেশারে আমি অনেক ছাত্রকে নিজেকে শেষ করে দিতে দেখেছি।
প্রেশারের একটা নমুনা দিলে বুঝতে সুবিধা হবে।
একটা ন্যাশনাল টুর্নামেন্টে আমি ভালো ফল করতে পারিনি বলে বাবা আমাকে টানা দুদিন ঘরে দরজা বন্ধ করে আটকে রেখে দিয়েছিল খাবার আর জল ছাড়া। যাতে আমি টাকার মূল্যটা বুঝতে শিখি, যাতে বুঝতে শিখি যে আমার ও আমাদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান যে জোগাড় করে, তার কষ্টটা কতখানি।
আমার দোল খেলার, বিসর্জনের প্রসেশনে বেরোনোর, লক্ষ্মীপুজোর দিন প্রসাদ বিলানোর, রথের দিন হইহই করে রথ টানতে বেরোনোর কোন ছুটি ছিল না। কারণ প্রিপারেশন নিতে হতো পরবর্তী টুর্নামেন্টের জন্য। যেখানে একটাদিনও ছুটি নেওয়া মানে খেলার ক্ষতি।
এই ছিল আমার মায়ের স্বামীর ফিলোসফি।
আমি সবরকমভাবে চেষ্টা করতাম ভালো খেলতে। কারণ আমি জানতাম, আমার খেলা খারাপ হলেই আমি বাবার হাতে যা মার খাবো, তা খাবো। উপরন্তু বাড়ি ফিরে বাবা মাকেও ছাড়বে না। চলবে অকথ্য গালিগালাজ, এবং আমার বাবার সেই কালজয়ী ডায়লগ, “ও আমার সন্তান হলে চ্যাম্পিয়ন হতো, তুমি নিশ্চয়ই অন্য কারোর সাথে শুয়ে এটাকে পেট থেকে বের করেছো।”
আমি সেই বয়সে এই কথার মানে ভালো জানতাম না। শুধু জানতাম, এই কথাটা কোনোভাবে আমার মাকে দুঃখ দেয়। তখন মা কাঁদে। তারপরই কথাকাটাকাটি হতে হতে মা হঠাৎ বাবার কাছে মার খায়।
আমার কাছে বাবার মনমতো হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় মোটিভেশন ছিল আমার মায়ের দুঃখ না পাওয়া। খেলায় ভালো রেজাল্ট করার চাপ ছিল, যাতে মাকে মার না খেতে হয়।
তিন, আমার বোনের জন্মগত কৃষ্ণ গাত্রবর্ণ নিয়ে আমার বাবার অসুবিধা। বোন হওয়ার পর আমার বাবা মায়ের ওপর ভীষণ ভীষণ সন্দেহ করতে শুরু করে। কারণ, মেয়ে কেন কালো? মেয়ের চোখমুখ, থুতনি, ভ্রু, এমনকি হাত-পায়ের আঙুলগুলো পর্যন্ত যে বাপের জেরক্স কপি, সেটা তার চোখে পড়ে না। পড়ে শুধু গায়ের রং।
বোন জন্মের পর থেকেই বাবার এতটাই চক্ষুশূল হয়ে যায় যে, ওর মাত্র ছয় মাস বয়সে, ও একদিন খুব চিৎকার করে কাঁদছিল বলে বাবা একটা লাথি দিয়ে ওকে ছিটকে টেবিলের নিচে ছুঁড়ে দেয়। বলা বাহুল্য, মা সেটা দেখে সহ্য করতে পারেনি। ফলাফল, কিছু পদাঘাত মায়ের কপালেও জোটে।
সন্দেহ একটা সময় এমন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে যে আমাকে আমার বাবা তার পার্সোনাল ফুড টেস্টার বানিয়ে ফেলে।
রোজ সকালটা আমার কাছে একটা দুঃস্বপ্ন ছিল।
সাড়ে সাতটা বাজলেই বাবা অফিস যাওয়ার আগে খেতে বসত। সে এক গ্রাস খাবারও মুখে তোলার আগে আমাকে সবকটা পদ চেখে তাকে দেখাতে হতো যে মা খাবারে কোনোরকম বিষপ্রয়োগ করেনি।
ব্যাপারটা একসময় আমার এমন সহ্যের সীমার বাইরে চলে যায় যে একদিন মাকে বলেও ফেলেছিলাম, “আজকে সত্যি সত্যি বিষটা দিয়েই দাও।” অবশ্যই সপাটে একটা চড় গালে পড়েছিল এই কথা বলার জন্য।
ওই যে বললাম, আমি কোনদিনও আমার মায়ের মতো হতে চাই না।
মায়ের জায়গায় আমি থাকলে বিষটা দিয়েই দিতাম। দিয়ে প্রমাণ করে দিতাম যে আসলেই খাবারে বিষ মেশালে ওসব টেস্ট করে কিস্যু হবে না। তীর ঠিক জায়গাতেই গিয়ে লাগবে।
একদিনের কথা মনে পড়ে।
হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা চলছিল। তার ফাঁকে স্কুলে বান্ধবীদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল, কার বাবা কেমন। সবারটা শুনছিলাম মন দিয়েই। তারপর যখন আমার পালা এলো, আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “জানি না, যা ইচ্ছে করুক, মরুক গে যাক।”
কথাটা বলামাত্রই ঘরে পিনড্রপ সাইলেন্স তৈরি হলো।
তারপরই যথারীতি বাকিরা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো,
“কেমন মেয়ে রে তুই!” “বাবা না থাকলে বুঝবি কী হয়!” ইত্যাদি ইত্যাদি।
শুধুমাত্র একজন ছাড়া।
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চুপ কর তোরা। ও হয়তো কোনো সমস্যার মধ্যে আছে। হয়তো ওর বাবা ভালো না। সেটা আমরা কী করে বুঝব?”
বাকিরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও চুপ করে গেল।
ওদের কী করে বলতাম, যে আগের দিন রাতে আমার পিরিয়ডস শুরু হয়েছিল। তখন সবে সবে ওসব হচ্ছে। ভীষণ পেটে ব্যথা করত, সাথে গা গোলানো, মাথাব্যথা। আগের রাতে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
সকালে উঠতে নটা বেজে গিয়েছিল বলে বাবা আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে, আমি কিছু বুঝে ওঠার আগে পেটে অ-গুনতি বার লাথি মেরেছিল।
ইচ্ছা ছিল যে আমাকে মেরেই ফেলবে। কারণ আমার খেলা দিন দিন খারাপ তো হচ্ছিলই, এবার পরীক্ষাটাও খারাপ হবে, সবকিছুই খারাপ হবে। তার চেয়ে আমার বেঁচে থেকেই লাভ ছিল না কোনো।
মা তখন রান্নাঘরে রান্না করছিল। আমার চিৎকারে ছুটে এসে আমাকে নিজের শরীর দিয়ে আগলে ধরে। ফলবশত, কয়েকটা প্রসাদ মায়ের কপালেও জোটে।
পুরো ব্যাপারটার মধ্যে সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার ছিল এই যে, তারপরেও মা রান্না করে বাবাকে খেতে দেয়। আমাকে টেস্টও করে দিতে হয় যে সেই খাবার বিষহীন। তারপর বাবা সেটা খেয়ে অফিস চলে যায়।
ওই যে বললাম, আমি আমার মায়ের মতো কোনোদিন হবো না।
যেদিন আবিরের বাবা আমাকে মারতে মারতে মেরেই ফেলছিল, আর আড়াই বছরের আবির এসে আমাকে আমার মায়ের মতোই ওর পুরো শরীর দিয়ে আগলে ধরেছিল, ফলবশত ওর বাবা ওকে ছুঁড়ে খাট থেকে ফেলে দেয়, সেদিন আমি আমার মায়ের মতো তাকে রান্না করে খাইয়ে সেবা করিনি।
অন দ্যা স্পট সিদ্ধান্ত নিয়ে আটকুুড়োর ব্যাটাকে ছেড়ে চলে আসি। আই উইশ, আমার মাও এটাই করত।
মায়ের সেদিনের বয়স আর আমার সেদিনের বয়স একই তো ছিল প্রায়!
আমার মা আমাদের মানুষ করার জন্য অকথ্য পরিশ্রম করেছে। ভোরবেলা বাড়ি থেকে দুটো বড় বড় ব্যাগভর্তি শাড়ি নিয়ে বিক্রি করতে বেরোত। তারপর দশটার মধ্যে ফিরে এসে আমাকে আর বোনকে স্কুলের রান্না, টিফিন বানানো, সব করে দিয়ে তারপর বোনকে স্কুলে দিয়ে আবার বেরোত। ঢুকত ওর স্কুলের ছুটির পর, ওকে বাড়ি নিয়ে।
বিকেল পাঁচটার আগে মা দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় পেত না। সেই যে সেই অভ্যাস তৈরি হয়েছিল মায়ের, তা তার মৃত্যুর দিন অবধি ছিল। তার এই অবেলায় চলে যাওয়ার একটা মস্ত বড় কারণ ওই অভ্যাস।
তবুও মা কষ্ট করে যেত।
যাতে আমরা মানুষ হতে পারি। যাতে আমাদের পড়াশোনা ছাড়তে না হয়। যাতে আমরা মুখ উঁচু করে বাঁচতে পারি।
মাকে কোনোদিন বলিনি যে, আমার তখনকার এক ক্লাসমেটের মা আমাকে তাদের বাড়িতে যেতে মানা করে দিয়েছিল, কারণ আমার মা ডিভোর্সি। বান্ধবীদের বিয়ের নেমন্তন্ন পাইনি, কারণ আমার বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেছে।
মাকে বলিনি যে, আমি বিয়ের পর রোজ গঞ্জনা শুনতাম যে আমার মা ডিভোর্সি। যে সে নাকি আমাকে বিয়ে করে “উদ্ধার” করেছিল। কারণ বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গেলে সেই মেয়ের বিয়ে হয় না সাধারণত।
মাকে বলিনি।
কারণ আমি মায়ের মতো হতে চাইনি।
মা ইউজুয়ালি কথায় কথায় কেঁদে ফেলত। আমি বহু বছর আগেই পণ করেছিলাম যে ওরকম কাঁদব না। নিজের কাছে নিজের কথা রেখেছি বইকি।
বাবাকে সংসারে ফিরিয়ে আনার জন্য মা সবরকম চেষ্টা করেছিল। যতরকম হয়। বাবার নতুন ভাড়া বাড়ি খুঁজে বের করে সেখানে গিয়ে তার পায়েও ধরেছিল, যাতে বাবা ফিরে আসে।
খালি একটাই অনুরোধ করেছিল, “মেয়েগুলোর কথা ভেবে অন্তত ফিরে চলো।” কাজ হয়নি সেই পাহাড় টলানো অনুরোধে।
আমি এই অন্যায় জীবনে করিনি।
কেউ আমাকে ছেড়ে যাবে, তার আগে আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি। “সন্তানের মুখ চেয়ে ফিরে চলো” বলা আমার ধাতে তৈরি হতেই দেয়নি আমার মা।
সন্তানকে নিয়ে এতদূরে চলে গিয়েছি যে, সেখান থেকে পায়ে ধরে বা দেওয়ালে মাথা কুটে প্রাণ দিলেও আমাদের ফেরানো যাবে না। যায়নি।
মা সমস্ত আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়েছিল সন্তানের মুখ চেয়ে। আমি মায়ের মতো হবই না। সন্তানের মুখ চেয়েই আমি এক ভগ্নাংশও আত্মসম্মান বিকোব না।
বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সূচ্যগ্র ধরণী।
আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে যে আমি ডিপ্রেশন কী জিনিস সেটা জানি কিনা, বলি, “না, জানি না সে কী জিনিস।” বলি না যে, আমি ডিপ্রেশন খেয়েছি, ডিপ্রেশনে স্নান করেছি, ডিপ্রেশনে ঘুমিয়েছি আর ডিপ্রেশনে জেগেছি।
বলিনা যে, অ্যাংজাইটি নিয়ে ছেলেখেলা করেছি জীবনে। খেলা খারাপ হলে বাড়ি ফিরে আসার থেকে মৃত্যু অধিক কাম্য ছিল। একটা সুতোর এদিকে ছিল বেঁচে থাকার অনিচ্ছা, ওদিকে ছিল একটা মরণঝাঁপ। সে ট্রেন থেকে হোক বা বাস থেকে, বা উঁচু বাড়ির ছাদ থেকে। বলি না যে, আমার মা আমাকে কোনোদিন সেই সুতোর কোন পাশে পড়তে দেয়নি। সযত্নে ধরে রেখেছিল আমাকে, যাতে ট্রাপিজের খেলা জারি থাকে।
বলিনা যে, এই সবকিছুর মধ্যে আমার মায়ের আর আমার কোনো দোষ ছিল না। মা আমার মতো হলেও পারত। বাকি সবকিছুর জন্য নিজের অস্তিত্বটাকে মা বিসর্জন না দিলেও পারত।
সেদিনের মা আর আজকের আমি, একই বয়সের।
আমি কোনদিনও আমার মায়ের মতো হতে চাই না।
~ মূল লেখা: মানবী চৌহান, কলকাতা।
No comments:
Post a Comment