Sunday, October 4, 2026

বদনজর আর কালোনজরের মধ্যে পার্থক্য



বদনজর আর কালোনজরের মধ্যে পার্থক্যটা যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটাই কঠিন।
সহজ করে বললে, বদনজর হলো
মানুষের ভেতরের ঈর্ষা, হিংসা বা নেতিবাচক আকাঙ্ক্ষা ।

মানে,
একজন মানুষের ভেতরের ঈর্ষা, হিংসা বা নেতিবাচক আকাঙ্ক্ষা, যখন আরেকজন মানুষের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়।

যেম ন,

সে মানুষটা হয়তো আপনার ভালো থাকা দেখে কষ্ট পেয়েছে, আপনার টাকা দেখে হিংসে করেছে, আপনার সংসার দেখে জ্বলে উঠেছে,
কিংবা শুধু মনে মনে চেয়েছে - আপনার এই ভালোটা যেন আর না থাকে।

আর

কালোনজর বলতে এমন এক ধরনের বদনজরকে বোঝানো হয়, যেখানে ওই নেতিবাচক ইচ্ছাটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেওয়ার জন্য অশরীরী সত্তা বা জ্বিনের সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়।
আর এখানেই বিষয়টা ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

তবে সব ঘটনা না।
খারাপ বা দুষ্টু জ্বিনের ব্যাপারটা এমন -
জ্বিন সবার কাছে যায় না, আর সবাইও জ্বিনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। যখন কোনো মানুষ নিজের কোনো স্বার্থ, প্রতিশোধ কিংবা হিংসা চরিতার্থ করার জন্য অশুভ কিছু করতে চায়, তখনই সে জ্বিনের সাহায্য নিয়ে শয়'তানের সাথে চুক্তি করে!
ঘটনা্টা আমার অন্যর কাছ থেকে শু না।
মেহেদি তখন মেডিকেলের ছাত্র।
পড়াশোনায় অসম্ভব ভালো, কলেজে তার বেশ নাম-ডাক ছিল, আর নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি এতগুলো টিউশন করাতো যে মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার মতো আয় হয়ে যেত। ওর পরিবার যে খুব ধনী ছিল তা নয়, কিন্তু রাতুলের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের জীবনযাত্রায় বেশ পরিবর্তন এসেছিল; বাড়ির কাজেও হাত দিয়েছিল মেহেদি!
সমস্যা ছিল, এই ব্যাপারটা ওর আপন মামি কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতেন না। বাইরে থেকে হাসিমুখে কথা বললেও ভেতরে ভেতরে তিনি পছন্দ করতেন না, বরং পরিবারে কেউ প্রশংসা করলেই তার মুখটা শক্ত হয়ে যেত।
মেহেদির মা নাকি একবার মজা করে বলেছিলেন, “আমার ছেলেটার দিকে এত তাকিও না, বদনজর লাগবে।” কথাটা শুনে নানাবাড়ির আর সবার মতন মামিও হেসেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর যখন মেহেদি একে একে তার টিউশনগুলো ছেড়ে দিতে শুরু করল, তখন প্রথমবারের মতন বিষয়টা বেশ অস্বাভাবিক মনে হয়।
প্রথমে একটা টিউশন।
তারপর আরেকটা।
তারপর তিনটা।
কারণ হিসেবে সে কখনো বলতো, ছাত্র পড়তে চায় না, কখনো বলতো, ওর নিজের পড়াশোনার চাপ বেড়েছে, আবার কখনো বলতো পরিবারের কিছু কাজ আছে। অথচ বাস্তবে সে কোনো কাজই করছিল না। বরং দিনের পর দিন ঘরে বসে থাকতো, বই খুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতো, কিন্তু কী পড়েছে সেটা জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলতে পারত না।
এরপর পরিবর্তনটা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
সে রাতে ঘুমাতে পারতো না। প্রায় প্রতিদিন রাত তিনটা-চারটার দিকে তার ঘুম ভেঙে যেত, আর ঘুম ভাঙার পর সে অনুভব করতো, তার ঘরের দরজার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম দিকে সে ভেবেছিল পরিবারের কেউ হয়তো পানি খেতে উঠেছে। কিন্তু এক রাতে সে দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া দেখতে পায়।
ছায়াটা মানুষের পায়ের মতো না। তারপর সেটা আস্তে আস্তে দরজার নিচের ফাঁক পেরিয়ে তার ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।
কিন্তু রাতুল সেদিন কাউকে কিছুই বলেনি।
এরপর শুরু হলো মাথাব্যথা। তারপর বুক ধড়ফড় করা। তারপর হঠাৎ হঠাৎ মনে হওয়া, কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, ডাকটা সবসময় খুব পরিচিত কারও গলার মতো শোনাত, কিন্তু সে যখন ঘুরে তাকাতো, তখন কেউই থাকত না।
ঠিক এই সময়ই একটা একটা করে তার পরিবারের ওপরও অদ্ভুত ঘটনা শুরু হয়।
তার বাবা হঠাৎ ব্যবসায় টাকা লস করতে শুরু করলেন।
যে দোকান থেকে বছরের পর বছর মাল নিতেন, তারা একসঙ্গে সব টাকা চেয়ে বসল। ব্যাংকের একটা সমস্যা হলো, পুরোনো একটা দেনার কাগজ বের হলো, তারপর ধীরে ধীরে এমন আরো সমস্যা তৈরী হলো যার কারণে একের পর এক ঝামেলা তৈরি হতে থাকলো। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিবারটা বুঝে গেল, হাতের সমস্ত টাকা, সম্পত্তি যেন হাতছাড়া হতে শুরু করেছে!
তার ছোট বোন, যে কখনো খুব একটা অসুস্থ হতো না, হঠাৎ অদ্ভুত দুর্বলতায় ভুগতে শুরু করল। ডাক্তার দেখানো হলো, পরীক্ষা হলো, ওষুধ চলল, কিন্তু কোনো পরিষ্কার কারণ পাওয়া গেল না। মেয়েটা শুধু একটা কথা বারবার বলতো, রাতে তার মনে হয়, জানালার বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে।
আর মেহেদি?
সে তখন আর আগের সে মানুষটা নেই।
সে পড়াশোনা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল। টিউশন নেই। আয় নেই। মানুষের সঙ্গে কথা বলা কমে গেছে। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে বসে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আর রাত যত বাড়তো, সে তত বেশি জেগে থাকত। কয়েকবার তাকে ভোররাতে বাড়ির ছাদে পাওয়া গেছে, অথচ সে নাকি নিজেই জানতো না কখন ছাদে গিয়েছে।
একদিন তার মা রাতুলের ঘরের আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পান।
একটা ছোট কালো কাপড়ের পুঁটলি।
ভেতরে শুকনো কিছু গাছের অংশ ছিল, অচেনা অজানা ভাষা কিছু একটা লেখা ছিল, আর একটা কাগজে মেহেদির পুরো নাম।
নিচে তার জন্মতারিখ লেখা।
পরিবারের কেউ জানতো না এটা কোথা থেকে এলো। আর সেই রাতেই মেহেদি প্রথমবার তার মাকে একটা কথা বলে।
সে নাকি স্বপ্নে কাউকে দেখেছে।
লোকটা মানুষ ছিল না। মুখ দেখা যাচ্ছিল না। শুধু দাঁড়িয়ে ছিল। আর তার পাশে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন, যাকে দেখে রাতুলের মনে হচ্ছিল, তিনি যেন খুব পরিচিত।
স্বপ্নের কথা টা জানার পর থেকে মা ওর মামীকেই সন্দেহ করতে থাকেন, কিন্তু কোনো প্রমাণ ছিল না।
তাদের পরিবারে তখন একের পর এক বিপদ।
বাবার ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল। মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লেন। ছোট বোনকে অন্য শহরে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হলো। আর সে একদিন হঠাৎ সমস্ত টিউশনের পুরোনো ছাত্রদের ফোন করে বলল, সে আর পড়াবে না।
কেন?
কারণ তার কথায়, “ওরা আমাকে চিনে ফেলেছে।”
এই "ওরা" টা কে? -
কয়েকদিন পর মা তার ঘরে গিয়ে দেখেন, ছেলেটা খাতার ওপর একটা ছবি এঁকে বসে আছে। ছবিতে ছিল একটা বাড়ি, বাড়ির চারপাশে চারজন মানুষ, আর বাড়ির ঠিক পেছনে একটা কালো অবয়ব দাঁড়িয়ে।
মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, এটা কী।
সে নাকি শুধু বলেছিল, “ওরা সবাই আমাদের বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছে।”
এরপর যা ঘটেছিল, সেটাই এই কেইসটাকে আরো ভয়াবহ করে করে তোলে।
পরিবারের সবাই ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে।
অকারণ সন্দেহ, অকারণ ভয়, অকারণ ঝগড়া - যেন একই বাড়িতে থেকেও কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
পরিবারের মানুষগুলো একসঙ্গে বসলে অস্বস্তি হতো, রাতে কেউ একা ঘরে থাকতে পারত না, আর বাড়ির প্রতিটা সদস্যের মনে হতে শুরু করেছিল, অন্য কেউ হয়তো তাদের ক্ষতি করতে চাইছে।
কালোনজর যদি সত্যিই এখানে কোনো ভূমিকা রেখে থাকে, তাহলে সেটা শুধু শরীরের ওপর আঘাত করেনি।
এটা প্রথমে তাদের মন ভেঙেছে, তারপর সম্পর্ক, তারপর অর্থনৈতিক ভিত্তি, আর অবশেষে মনের মধ্যকার নিরাপত্তাবোধ।
একটা পরিবারকে শেষ করে দিতে সবসময় কাউকে মেরে ফেলতে হয় না। একটা পরিবারকে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাসী করে দিতে পারলেই অনেক সময় একটা বাড়ি ভেতর থেকে ধ্বংস হয়ে যায়।
তাদের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত প্রায় সেটাই হয়েছিল।
আজ তাদের সেই আগের বাড়ি নেই। বাবা ব্যবসায় নেই। বোন অন্য জায়গায় থাকে। মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। যে ছেলেটা একসময় মেডিকেলে পড়ে, মাসে লাখ টাকার বেশি আয় করত, পরিবারের স্বপ্ন ছিল তাকে ঘিরে - সে এখন স্বাভাবিক জীবনটায় ফিরতে পারবে কিনা, সেটাই অনিশ্চিত।
-
মেহেদির মামি আসলে মেহেদির একা টার্গেট করেননি। তিনি চেয়েছিলেন যে উন্নতি দেখে তার ভেতরে এতদিন ধরে আগুন জ্বলছিল, সেই আগুনটাই যেন ধীরে ধীরে তার পুরো পরিবারকে পুড়িয়ে দেয়।
মামির নিজেরও একটা ছেলে ছিল। ছেলেটা পড়াশোনায় খুব একটা ভালো ছিল না, আর পরিবারের মধ্যে যখনই কারও কথা উঠত, মেহেদির নামটাই আগে আসত। মেডিকেলে পড়ছে, নিজে টাকা আয় করছে, বাবা-মাকে সাহায্য করছে - এই কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে মামির কাছে প্রশংসা না হয়ে অপমানের মতো লাগতে শুরু করেছিল।
বিষয়টা আরও খারাপ হয় যখন মেহেদির মা এক আত্মীয়ের সামনে বলে বসেন, “আমার ছেলে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, আল্লাহ চাইলে সামনে আরও ভালো করবে।” কথাটা সাধারণ হলেও মামি নাকি সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। পরে তার এক পরিচিত মানুষকে বলেছিলেন, “ওর এত ভালো থাকার কী আছে?”
সেই “কী আছে” কথাটার মধ্যেই আসলে সবকিছু লুকিয়ে ছিল।
তবে মামি নিজে এসব করতে জানতেন না। তিনি প্রথমে একজনের কাছে যান, সেই লোক আবার তাকে আরেকজনের কাছে পাঠায়। শেষে তিনি এমন এক মহিলার ঠিকানা পান, যিনি মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা, তাবিজ-কবজ আর জ্বিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নানা কিছু পাইয়ে দিতেন - অবশ্য বিনিময়ে একটা বড় অংকের টাকাও নিতেন।
লোকালয়ে মহিলাটার নাম নিয়ে কেউ সরাসরি কথা বলত না। কেউ বলত তিনি “হুজুরানী”, কেউ বলত “জ্বিনের কাজ বোঝেন”, আবার কেউ বলত তিনি এমন কিছু করেন যা সাধারণ কবিরাজ বা তান্ত্রিকদের কাজেরও বাইরে। তার কাছে গিয়ে নাকি অনেকেই স্বামী-স্ত্রীর সমস্যা, ব্যবসার ক্ষতি কিংবা শত্রুর ক্ষতি করার ক্থাও বলত।
মামি প্রথমে মেহেদির নাম, ছবি আর কিছু ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার পর সেই মহিলা নাকি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যেগুলো শুনে মামির মনে হয়েছিল, এই মানুষটা বুঝি সত্যিই সব জানে।
কী বলেছিল?
“ছেলেটার চারপাশে আলো বেশি। একা ওকে নামানো কঠিন হবে।”
এই কথাটা শুনে মামি নাকি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।
এরপরই সেই মহিলা বলেন, এখানে শুধু মানুষের নজর দিয়ে কাজ হবে না। এর সাথে এমন কারো সাহায্য দরকার, যাকে মানুষ খালি চোখে দেখতে পায়না।
মামি নাকি এটাও চেয়েছিলেন, এই নজর যেন শুধু মেহেদির ওপর না থাকে - তার পরিবারের মানুষগুলোর ওপরও এর ছায়া পড়ে।
এখানেই কালোনজরের গল্পটা শুরু হয়।
কোনো জ্বিন যদি কালোনজরের দায়িত্ব নেয়, তখন সে মানুষের জীবনে অদৃশ্যভাবে অস্থিরতা তৈরি করা, ভয় বাড়ানো, স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটানো, একে অপরের প্রতি সন্দেহ তৈরি করা - এসবের মধ্য দিয়েই তার উপস্থিতির প্রকাশ ঘটায়!
যে ছেলে একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়তে পারত, সে বই খুলে বসে পাঁচ মিনিট পর উঠে যেত। টিউশনে গিয়ে হঠাৎ কিছু ভুলে যেত। ছাত্রদের সামনে অকারণে নার্ভাস হয়ে পড়ত। কখনো মনে হতো কেউ তাকে পেছন থেকে দেখছে, কখনো মনে হতো ক্লাসরুমে তার পাশে আরেকজন বসে আছে।
একদিন টিউশন শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় মেহেদি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রায় দশ মিনিট কারও সঙ্গে কথা বলেছিল।
সমস্যা হলো, সেখানে কেউ ছিল না।
বাড়িতে ফিরে সে বলেছিল, তার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ কথা বলেছে। বৃদ্ধ নাকি তাকে শুধু একটা কথাই বলেছে - “তুই যত উপরে উঠবি, তোর ঘর তত খালি হবে।”
কিন্তু কেউ তখনো কালোনজরের কথা ভাবেনি।
এরপর বাবার ওপর আঘাত আসে। তিনি যে ব্যবসাটা এতদিন ধরে করেছিলেন, সেখানে একের পর এক ভুল হতে থাকে। হিসাব মেলেনি, পরিচিত মানুষ টাকা আটকে দিল, পুরোনো এক পার্টনার হঠাৎ মামলা করার হুমকি দিল। এমন সব সমস্যা একসঙ্গে শুরু হলো, যেগুলো আলাদা করে দেখলে কাকতালীয় মনে হয়। কিন্তু আদতে তা ছিলনা। মা তখন ছেলের জন্য কান্না করতেন।
আর সেই কান্নার মধ্যেই নতুন একটা ব্যাপার শুরু হলো।
তিনি প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে শুনতেন, রান্নাঘরে কেউ হাঁটছে। বাসার সবাইকে ডাকতেন, কিন্তু কেউ গেলে কিছু পাওয়া যেত না। একদিন সকালে দেখলেন রান্নাঘরের দরজাটা ভেতর থেকে খোলা, অথচ রাতে তিনি নিজেই সেটা বন্ধ করেছিলেন!
তারপর ছোট বোন।
মেয়েটা মেহেদির খুব কাছের ছিল। ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কও ভালো ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে ভাইকে ভয় পেতে শুরু করল। বলত, ভাইয়ের ঘরের সামনে দিয়ে গেলে তার মাথা ধরে যায়, বুক ধড়ফড় করে, আর মনে হয় ভাইয়ের ঘরের ভেতর থেকে কেউ তাকে তাকিয়ে দেখছে।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভাই-বোন কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দেয়।
এভাবেই ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে শুরু করে, কারণ একটা পরিবারকে বাইরে থেকে ভাঙার চেয়ে ভেতর থেকে ভাঙা অনেক সহজ। মানুষ যখন একে অপরকে বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়, তখন বাইরের কোনো শত্রুর আর খুব বেশি কিছু করার থাকে না।
মা ভাবতেন, বাবা ছেলের সমস্যাটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। বাবা ভাবতেন, মেহেদি নিজের মানসিক চাপের কারণে সবাইকে বিপদে ফেলছে। ছোট বোন ভাবত, ভাই বদলে গেছে। আর তার মনে হতো, তার পরিবারের কেউ তাকে বিশ্বাসই করছে না।
একই ছাদের নিচে চারজন মানুষ ছিল।
কিন্তু চারজনের ভয় ছিল আলাদা।
এর মাঝেই মামি নিয়মিত ওই মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। পরে জানা যায়, তিনি বারবার জানতে চাইতেন, “কাজ হচ্ছে তো?”
উত্তর আসত, “সময় লাগবে।”
মামি নাকি বলতেন, “এত সময় কেন?”
তখন ওই মহিলা তাকে একটা কথা বলেছিলেন, যেটা শুনলে আজও আমার গায়ে কাঁটা দেয়।
“একজন মানুষকে নামানো সহজ। একটা ঘরকে নামাতে হলে ঘরের ভেতরের মানুষগুলোকে আগে আলাদা করতে হয়।”
সেই কথাটার পর থেকেই যেন মেহেদিদের পরিবারে ঘটনাগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে।
মেহেদির পড়াশোনা শেষের দিকে এসে থেমে যায়। মেডিকেলের যে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবার এত স্বপ্ন দেখেছিল, সেটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। যে ছেলে একসময় মাসে লাখ টাকার ওপর আয় করত, সে নিজের প্রয়োজনের টাকাও পরিবারের কাছে চাইতে শুরু করে।
বাবার ব্যবসা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।
মায়ের অসুস্থতা বাড়ে।
ছোট বোন পড়াশোনা ছেড়ে, অসুস্থ হয়ে অন্য এক আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যায়।
মূল কথা একটাই, ভালো কিছুকে খুব বেশি মানুষের সামনে দেখাতে যাবে না,
দূরের মানুষ না, ঘরের মানুষই আমাদেরকে বেশি ক্ষতি করে।]

Collected

No comments:

Post a Comment