Friday, July 31, 2026

Potato Pancakes with Edamame and Ham

 


Ingredients (Serves 2)

Potatoes: 2 (250–300g)


[A] Consommé granules: 1/2 tsp


[A] Salt: 1/5 tsp


[A] Pepper: To taste


[B] Loin ham (cut into 1cm cubes): 3 slices


[B] Shelled edamame: 30g


[B] Pizza cheese (shredded cheese): 20g


[B] Potato starch: 2 tbsp


Butter: 10g


Instructions


① Peel the potatoes and cut them into bite-sized pieces. Place them in a heat-resistant bowl, cover loosely with plastic wrap, and microwave at 600W for 4 1/2 minutes.


② While the potatoes are still hot, add [A] and mash them using a fork or similar tool.


③ Once the mixture has cooled slightly, add [B] and mix well. Divide into 6 portions and shape each into a ball.


④ Heat the butter in a frying pan over medium heat and arrange the potato balls in the pan. Cook until both sides are nicely browned and heated through to the center—then it's ready to serve!

Monday, July 27, 2026

আমার কৈফিয়ৎ

 

-
আমার সাম্প্রতিক লেখাগুলোতে দুটো বিষয় নিয়ে অনেক পাঠক মন্তব্য এবং মেসেঞ্জারে কৈফিয়ত চেয়েছেন। একটি হলো, আমি কেন বলছি বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া ইয়াহিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো, এটা আমি কেন বলেছি। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ক্যাডেট কলেজগুলো বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী—এটা আমি কেন বলেছি।
প্রথমেই বলে রাখি, যারা এইসব প্রশ্ন করছেন তারা শয়তানবাদের প্রভাবে প্রবেশ করেছেন। শয়তান তাদেরই প্রভাবিত করে, যাদের মন সবসময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে এবং যাদের সুন্দর করে পরিবেশন করে যেকোনো কিছু বিশ্বাস করানো যায়। এরাই কোনো দল, মত বা ধর্মের সবচেয়ে বড় সমর্থক হয়ে ওঠে যখন তারা দেখে সেই দল, মত বা ধর্ম ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসবে। কিন্তু যখন সেই দল, মত বা ধর্ম বিপদে পড়ে, তারাই প্রথম কেটে পড়ে এবং নিজ স্বার্থ ও পাওনাটাকে প্রাধান্য দিয়ে অন্য দল বা সংস্কারপন্থী হয়ে যায়।
এদের চেনার উপায় হলো, সুসময়ে এরা নেতার চেয়েও বড় নেতা, নবীর চেয়েও বড় মুসলমান-এ পরিণত হয়। তার চেয়েও বড় বিপজ্জনক হলো, এরা সত্য যারা বলে তাদের হত্যা করতে চায়। ফরাসি আলজেরীয় লেখক আলবেয়ার কাম্যু যেমন বলেছেন, ইতিহাসে এমন সময় আসে—দুই যোগ দুই চার যারা বলে, তাদের হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া ইয়াহিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ যে ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো, এটা তো আমি বলিনি, এটা বলে গেছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু, যেটা সেই ১৯৭২ সালে নিউজউইক পত্রিকাকে তিনি তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারে বলে গেছেন। যেটি পুনঃপ্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ সংখ্যায়। যে পোস্টটি এখনও নিউইয়র্ক টাইমসের ওয়েবসাইটে আছে। মনে রাখতে হবে, এটি প্রকাশিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সেই ক্ষতবিক্ষত সময়ে, ৩০ লক্ষ প্রাণ হারানোর স্মৃতি যখন সবার মনে জলন্ত আগুনের মতো জাগ্রত। সত্য না হলে এটি কোনোভাবেই প্রকাশিত হতো না। নিউইয়র্ক টাইমস ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ সংখ্যার সেই রিপোর্টটি:
"মুজিবের বক্তব্য: ইয়াহিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ভেস্তে দিয়েছিলেন ভুট্টো"
১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২
"শেখ মুজিবুর রহমান প্রকাশ করেছেন যে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যে আদেশ হয়েছিল, তা জুলফিকার আলী ভুট্টোর হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হয়। ভুট্টো তাঁকে এমন একটি কারাগার থেকে গোপনে বের করে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে তিনি দীর্ঘ নয় মাস একাকী বন্দী ছিলেন। সেই সময় পর্যন্ত ভুট্টো জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে সরিয়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করেননি।
ঢাকায় ফিরে আসার পর তিনি নিউজউইক পত্রিকাকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন—এটি ছিল তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকার—সেখানে সদ্য ঘোষিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বন্দিজীবনের দুর্ভোগের বর্ণনা দেন। তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁর বিচারকে “একটি প্রহসন” বলে অভিহিত করেন এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ থেকে শেষ মুহূর্তে তাঁর রক্ষা পাওয়ার ঘটনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
শেখ মুজিবকে উদ্ধৃত করে বলা হয়:
“যুদ্ধ যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবং ভুট্টো ক্ষমতায় আসছেন, তখন ইয়াহিয়া বলেছিলেন যে তিনি বাংলার পতনের দিনই শেখ মুজিবুর রহমানকে ফাঁসি দিতে চান।”
তিনি আরও বলেন:
“এক রাতে, ভুট্টো ইয়াহিয়াকে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা সত্ত্বেও, কারাগারের ভেতরেই আমাকে হত্যা করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন ভুট্টো আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সুপারকে আমাকে সেখান থেকে বের করে আনার ব্যবস্থা করতে বলেন।”
পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে বাঙালি সংস্কৃতি ও আওয়ামী-ভারতবিরোধী ছিল, এটা বলে গেছেন স্বয়ং জিয়াউর রহমান তাঁর “একটি জাতির জন্ম” প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি দৈনিক বাংলা পত্রিকার ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সংখ্যায় সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের লেখা হিসাবে প্রথম প্রকাশিত হয়। ২৬ মার্চ, ১৯৭৪ তারিখে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হয়।
সেই প্রবন্ধে পাকিস্তানের সেনা প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলো সম্পর্কে জিয়াউর রহমান লেখেন:
“আমাদের ওরা দাবিয়ে রাখতো, অবহেলা করতো, অসম্মান করতো। দক্ষ ও যোগ্য বাঙালি অফিসার আর সৈনিকদের ভাগ্যে জুটতো না কোনো স্বীকৃতি বা পারিতোষিক। জুটতো শুধু অবহেলা আর অবজ্ঞা। আখ্যায়িত করতো আমাদের আওয়ামী লীগের দালাল বলে। একাডেমির ক্লাসগুলোতেও সব সময় বোঝানো হতো, আওয়ামী লীগ হচ্ছে ভারতের দালাল। পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করতেই আওয়ামী লীগ সচেষ্ট। এমনকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।”
তিনি আরও লিখেছেন:
“সামরিক একাডেমিতে থাকাকালে আমি সম্মুখীন হয়েছি শুধু নিকৃষ্ট অভিজ্ঞতার। সেখানে দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের প্রতি পাকিস্তানিদের একই অজ্ঞতার ঐতিহ্যবাহী প্রতিচ্ছবি। অবৈধ উপায়ে পাকিস্তানিদের দেখেছি বাঙালি ক্যাডেটদের কোনঠাসা করতে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন যেমন, আমি যখন শিক্ষক হলাম তখনো তেমনিভাবেই বাঙালি ক্যাডেটদের ভাগ্যে জুটতো শুধু অবহেলা, অবজ্ঞা আর ঘৃণা। আন্তঃসার্ভিস নির্বাচনী বোর্ডে গ্রহণ করা হতো নিম্নমানের বাঙালি ছেলেদের, ভালো ছেলেদের নেওয়া হতো না ক্যাডেটরূপে। রাজনৈতিক মতাদর্শ আর দরিদ্র পরিবারের নামে প্রত্যাখ্যান করা হতো তাদের। এর সবকিছুই আমাকে ব্যথিত করতো।”
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজগুলো সামরিক ক্যাডেট তৈরির লক্ষ্যেই তৈরি। সেনা প্রশিক্ষণ একাডেমিগুলোতে যে মানসিকতা প্রচার হয়, সেগুলোই যে আরও অল্প বয়স থেকে ক্যাডেট কলেজগুলোতে প্রয়োগ করা হবে, সেটা শিশু বা পাগল না হলে সহজেই বোঝার কথা। ক্যাডেট কলেজগুলো যে টোটাল ইনস্টিটিউশন এবং সেগুলো যে ইঙ্গ-মার্কিন সেনা এলিট মানসিকতা তৈরির একটি মগজধোলাই কেন্দ্র, সেটা আমি আগেই লিখেছি। এবং পাকিস্তানে সেনাশাসন আসার পর স্থানীয় সংস্কৃতির রাজনৈতিক শক্তির প্রতি ঘৃণা তৈরিই যে তাদের মার্কিন স্থানীয় সংস্কৃতি উৎপাটন মডেলে হয়েছে, সেটাও আমি অন্যত্র লিখেছি। বাংলাদেশ স্বাধীর হবার পর সেটা পরিবর্তনের আগেই ঘটে ১৯৭৫ এর সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও বাংলাদেশকে পুনরায় নতুন নামে পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত করার ঘটনা। ক্যাডেট কলেজগুলো সেই বাঙালী সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তানী মগজধোলাই কেন্দ্র হিসাবেই রয়ে যায় পাক মার্কিন ভূরাজনৈতিক প্রভাবে।
মনোবিদ্যার দৃষ্টিকোন থেকে আলবেয়ার কাম্যু যে সময়ের কথা বলেছেন, সেই সময়গুলোতে দেখা যায় অতিরঞ্জিত আড়ম্বরপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। যারা মনোবিদ্যার কালো ত্রয়ী বা ডার্ক ট্রায়াড সাইকোলজির ব্যক্তিত্ব। বাস্তবতাবোধ হারিয়ে যারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার, জিয়াউর রহমানের চেয়েও বড় বিএনপি এবং নবী মুহম্মদের চেয়েও বড় মুসলিম বনে যায়। কোরানে এদের নিয়েই সাবধান করা আছে যারাই হল ভুয়া হাদিসের মুসলমান। যাদের লক্ষ্য সত্যকে হত্যা করা।
সত্য বলা লেখককে ধ্বংস করা, হত্যা করা, তাকে নিঃশেষ করে দেওয়া পৃথিবীতে নতুন নয়। আমার নানা লেখা পড়ে অনেকে আবার মহা চিন্তায় পড়ে গেছেন, আমি আসলে কোন দলের। কেউ ভাবছেন আমি জামাত, কেউ ভাবছেন আমি রাশিয়ান, কেউ ভাবছেন আমি ইরানী, কেউ ভাবছেন আমি সুফি দরবেশ। অনেকে আবার ভাবছেন, আমি হয়তো নেতা হতে চাইছি। সত্য বলা কবি নজরুল “আমার কৈফিয়ৎ” কবিতায় যেন আমার কথাই লিখে গেছেন। কবিতাটি ১৩৩২ সালে ‘বিজলী’ পত্রিকার আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। পরে ৮২ পংক্তির এই কবিতাটি ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করে ১৯২৬ সালে প্রকাশ করা হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের আমার কৈফিয়ৎ কবিতাটি অংশবিশেষ:
“বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’
আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,
দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!
---
আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!”
© সিরাজুল হোসেন

Saturday, July 25, 2026

বিবর্তন আমাদের শেখায়,

 


"পরকীয়া অত্যন্ত জরুরি জিনিস” - এই মর্মে একটি ভিডিও সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে জেনেটিক্স ও প্রাণী আচরণের নামে এমন কিছু দাবি করা হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আংশিক ও খণ্ডিত উপস্থাপনা মাত্র।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। “পরকীয়া” মূলত একটি আইনগত ও সামাজিক পরিভাষা, যা বৈধ বিবাহ বা বৈবাহিক চুক্তি ভঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। দুটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পারস্পরিক চুক্তি ভঙ্গকে কখনোই “অত্যন্ত জরুরি জিনিস” বলা যায় না।
হয়তো বক্তা এখানে পরকীয়া বলতে বহুগামিতা (পলিগামি) বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু জিনবিদ্যা বা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান কোথাও বলে না যে বহুগামিতা মানুষের জন্য অপরিহার্য বা সর্বোত্তম প্রজনন কৌশল।
অনেকে দাবি করেন, “বহুগামিতা জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ায়, তাই এটি ভালো” এবং “প্রাণীজগতেও তো এমনটাই দেখা যায়।” বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল ও একমাত্রিক নয়। জিনগত বৈচিত্র্য, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানুষের মানসিক দক্ষতা এবং প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার মধ্যে একটি জটিল ভারসাম্য কাজ করে।
প্রথম সমস্যা হলো, মানব সমাজে বহুগামিতা সাধারণত সমানভাবে বিস্তৃত হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা শারীরিকভাবে প্রভাবশালী পুরুষ এবং তুলনামূলকভাবে অধিক আকর্ষণীয় নারীদের মধ্যেই এটি কেন্দ্রীভূত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অধিক স্বাধীন পশ্চিমা সমাজগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বহু যৌনসঙ্গী থাকার প্রবণতা পুরো জনগোষ্ঠীতে সমানভাবে ছড়িয়ে থাকে না; বরং একটি অপেক্ষাকৃত ছোট অংশের মধ্যেই তা কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে বহুগামিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো জনগোষ্ঠীর জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করে - এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
জিনগত বৈচিত্র্য অবশ্যই একটি প্রজাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি নতুন পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন বা নতুন রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অভিযোজনের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে তাই বলে বৈচিত্র্য যত বেশি, ততই ভালো - এমন ধারণাও সঠিক নয়। যেমন আত্মীয়দের মধ্যে প্রজননের ফলে ইনব্রিডিং ডিপ্রেশন যেমন হতে পারে, তেমনি অত্যন্ত দূরবর্তী জিনগত মিশ্রণেও আউটব্রিডিং ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি এখানে ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করে।
প্রাণীজগতে বহুগামিতা যেমন প্রচলিত, তেমনি বহু প্রজাতিতে একগামিতাও স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত। উল্লুক, বহু প্রজাতির পাখি এবং কিছু কুকুরজাতীয় প্রাণী দীর্ঘমেয়াদি যুগল-বন্ধন গড়ে তোলে। এটি প্রমাণ করে যে নির্দিষ্ট পরিবেশে একগামিতাও একটি সফল বিবর্তনীয় কৌশল হতে পারে।
মূল বিষয় হলো, জিনগত বৈচিত্র্য বাড়ানোর জন্য বহুগামিতা একমাত্র বা সর্বোত্তম উপায় নয়। জনসংখ্যার মধ্যে অভিবাসন, জিন-প্রবাহ (gene flow) এবং সময়ে সময়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্তঃপ্রজননও একই ভূমিকা পালন করে।
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের মিলন কৌশলও একমাত্রিক নয়। মানুষ একটি মিশ্র প্রজনন কৌশল অনুসরণকারী প্রজাতি। পুরুষের ক্ষেত্রে কিছু মাত্রায় বহুগামিতার প্রবণতা দেখা যায়, কারণ পুরুষের প্রজনন সাফল্যের তারতম্য সাধারণত নারীর তুলনায় বেশি।
মানুষের সন্তানের আছে দীর্ঘতম শিশুকাল। যা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পরিচর্যানির্ভর সন্তান লালন পালনের উদাহরণ। তাকে বড় করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, শিক্ষা ও সম্পদের প্রয়োজন হয়। ফলে পরিবারে পিতার বিনিয়োগও বিবর্তনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই কারণেই সামাজিক একবিবাহ বা স্থিতিশীল যুগল-বন্ধন একটি শক্তিশালী অভিযোজন হিসেবে গড়ে উঠেছে। অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্রেসিনের মতো যুগল-বন্ধনকারী হরমোন এবং সামাজিক নিয়ম—উভয়ই এই বন্ধনকে শক্তিশালী করে।
প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত ভারসাম্য। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত জিনগত বৈচিত্র্য, সংক্রামক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি হ্রাস, সন্তানের কার্যকর লালন-পালন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। শুধু একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে অন্যগুলোকে উপেক্ষা করলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এই কারণেই প্রকৃতিতে কোনো একক প্রজনন কৌশল সর্বজনীনভাবে বিজয়ী নয়। কোথাও বহুগামিতা, কোথাও একগামিতা, আবার কোথাও পরিবেশভেদে নমনীয় কৌশল দেখা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু সমাজে একবিবাহ শুধু নৈতিক বা ধর্মীয় কারণে নয়, বরং রোগ নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের তুলনামূলক সুষম বণ্টন এবং সন্তানের দীর্ঘমেয়াদি লালন-পালনের জন্য একটি কার্যকর সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় শুধু জিনগত বৈচিত্র্যই যথেষ্ট নয়। মানুষের শিশুর শৈশব অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক দীর্ঘ। একটি শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে পরিণত হতে প্রায় ১৫–২০ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে সে ভাষা, সহযোগিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিয়ম, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বন্দ্ব মোকাবিলার মতো দক্ষতা মূলত পরিবার ও সমাজের কাছ থেকেই শেখে। এর কারণ হল মানুষ কগনিটিভ প্রাণী। অর্থাৎ তার বেঁচে থাকায় জিনের সমান গুরুত্বপূর্ণ হল তার চিন্তা ও আচরণগত শিক্ষা যেটা সে দীর্ঘ শিশুকালে শেখে। প্রাণীজগতে উল্লুকেরও আছে মানুষের কাছাকাছি শিশুকাল। এটা আশ্চর্য নয় যে প্রকৃতিতে তারাও একাগামী জীবন যাপন করে।
মানুষের ক্ষেত্রে প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি সংগ্রামের চেয়ে সামাজিক দক্ষতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই দক্ষতাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে বিকশিত হয় একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং ধারাবাহিক পারিবারিক পরিবেশে। ঘন ঘন সম্পর্ক পরিবর্তন, পরিবার ভাঙন বা অস্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ এই শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির **অ্যাটাচমেন্ট তত্ত্ব** অনুযায়ী, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে শিশুর সঙ্গে প্রধান পরিচর্যাকারীর নিরাপদ ও ধারাবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা তার মানসিক বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। এই নিরাপদ সংযুক্তি থেকেই শিশুর নিরাপত্তাবোধ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক গড়ার সক্ষমতা জন্ম নেয়। এই সম্পর্কের জন্য ধারাবাহিক উপস্থিতি, পরিকল্পিত পরিচর্যা এবং মানসিক নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে পিতার ভূমিকাও কেবল অর্থনৈতিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা যায়, একজন সক্রিয় ও স্থিতিশীল পিতৃচরিত্র শিশুর আত্মবিশ্বাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা, অধ্যবসায়, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং শিক্ষাগত সাফল্যের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত। পিতা অনেক সময় শিশুকে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করেন। বিপরীতে, পিতার দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি বা অস্থিতিশীল উপস্থিতি এসব বিকাশকে দুর্বল করতে পারে।
এই কারণেই মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাসে সামাজিক একগামিতা বা স্থিতিশীল যুগল-বন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও মানুষের মধ্যে বহুগামিতার জৈবিক প্রবণতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
সবশেষে বলা যায়, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার জন্য শুধু জিনগত বৈচিত্র্যই যথেষ্ট নয়। সমানভাবে প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যা পরবর্তী প্রজন্মকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল, সামাজিকভাবে দক্ষ, সহযোগিতাপূর্ণ এবং প্রতিকূলতার মুখে সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। বিবর্তন আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল কোনো চরমপন্থা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য।

© সিরাজুল হোসেন