Monday, November 16, 2020

 

এই ‘লোক দেখানো’ ক্ষমা কি আপনি চাইবেন?

আমিনুল ইসলাম


আমি রাজনীতিবিদ নই। রাজনীতির সাথে সম্পৃক্তও নই। 
নিজেকে লেখক বলতেও আমার সঙ্কোচ হয়। 
আমি সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্র এবং শিক্ষক। সেই সাথে লেখালেখি'র চেষ্টা করি। সমাজের নানান অসঙ্গতি তুলে ধরার চেষ্টা করি। 
আমার এই লেখা এই দেশের একটা পক্ষের পছন্দ নাও হতে পারে। 
লেখার আগে আমি বেশ কয়েকবার ভেবেছি- এই নিয়ে লেখা উচিত হবে কিনা। এরপর মনে হয়েছে সমাজের প্রতি দায় থেকে হলেও আমার লেখা উচিত। 
যেই দেশে মন্ত্রী-এমপিরা দিনে দুপুরে এমনকি স্কুল শিক্ষক'কে কানে ধরে উঠবস করায়! 
যে দেশে এমপি পুত্র প্রকাশ্য দিবালোকে মদ খেয়ে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ মেরে বুক উঁচু করে বলে- জানো আমি কার ছেলে? 
যেই দেশে রাজনৈতিক নেতারা ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা মেরে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। 
সেই দেশে একজন মন্ত্রী এবং সাংসদ প্রকাশ্য দিবালোকে গতকাল এক প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা'র পায়ে ধরে মাফ চেয়েছেন।

আমি রাজনীতি করি না। আমার এই লেখা দয়া করে আপনারা যারা নানান দলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত; সেই দৃষ্টি'তে দেখবেন না।

আমি জানি না এই এই মন্ত্রী'র উদ্দেশ্য কি ছিল। সেটা কারো পক্ষে'ই হয়ত জানা সম্ভব না। 
তবে ঘটনাটা পত্রিকায় পড়ে এবং ভিডিও দেখে বুঝার চেষ্টা করেছি।

ওই প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা অনুষ্ঠানে বসার জন্য চেয়ার পান'নি। এই জন্য তিনি ক্ষোভ জানিয়ে চলে যাচ্ছিলেন অনুষ্ঠান থেকে। এতে অনুষ্ঠানের অতিথি ওই মন্ত্রী'র হয়ত খুব একটা দায় ছিল না।

অনেকেই ওই মুক্তিযোদ্ধাকে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোন ফায়দা হয়নি। তিনি চলেই যাচ্ছিলেন।

এমন সময় ওই মন্ত্রী দৌড়ে এসে প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধার পায়ে চেপে ধরে ক্ষমা চান। এরপর অবশ্য ওই মুক্তিযোদ্ধা রাজি হয়েছেন।

তো, এই হচ্ছে ঘটনা। এরপর এখন কি হচ্ছে জানেন?

বিরোধীদলের (সেটা যখন যে দল'ই থাকুক) মানুষ তো এই দেশে সরকার যে কোন কাজ করলেই সেটার সমালোচনা করে। ঠিক যেমনটা সরকার করে বেড়ায় বিরোধীদলের সম্পর্কে। আমরা যারা রাজনীতি করি না; তারা এই সবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। 
এখন দেখছি এমনকি মন্ত্রী'র নিজ দলের মানুষরাও এই নিয়ে হাসাহাসি করছে। সমালোচনা করছে!

কেউ বলছে- ছিঃ ছিঃ কতো বড় আঁতেল! পায়ে ধরে ক্ষমা চায়! নিশ্চয় বদের হাড্ডি! 
আরেকদল বলছে- এইভাবে কেউ ক্ষমা চায়!

অন্য আরেক দল বলছে, ক্ষমা চেয়েছেন ভালো কথা। নিজের ফেসবুকে এটা নিয়ে আবার লেখার কি আছে।

এইসব দেখে এক রকম সামাজিক দায় থেকে লিখতে বসেছি।

হুমায়ূন স্যারের জন্মদিন ছিল ১৩ নভেম্বর। ইচ্ছে করে'ই এই জন্মদিনে কিছু লিখিনি। উনার সাথে সপ্তাহ খানেক কাটানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। এই জন্মদিনে আমি স্রেফ ওই সময়গুলো নিজের মতো করে মনে করার চেষ্টা করেছি।

যা হোক, হুমায়ূন আহমেদ তার কোথাও কেউ নেই বই'তে একটা চমৎকার বিষয় লিখে গিয়েছেন। আপনারা যারা নাটক'টি দেখেছেন, তাদের মনে থাকার কথা।

বাকের ভাই'কে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছে। কেউ তাকে ছাড়াতে যাচ্ছে না। এলাকার মেয়ে মুনা এরপর বাকের ভাই'র বড় ভাইয়ের কাছে গিয়েছে। যে কিনা বড় সরকারি কর্তা। গিয়ে বলেছে:

- আপনি আপনার ভাই'কে ছাড়িয়ে আনতে যাচ্ছেন না কেন? 

-সে একটা বখাটে। তাকে ছাড়িয়ে আনার কিছু নেই।
 
-কিন্তু তিনি তো মানুষের উপকারও করেন।

-এইসব লোক দেখানো উপকার।

এরপর মুনা বলেছে:

- সেই লোক দেখানো উপকারটাই বা কয় জন করছে? আপনি করবেন? কেউ একজনের লোক দেখানো উপকারে যদি কারো জীবন বেঁচে যায়, তাহলে ক্ষতি কি?

হুমায়ূন স্যারের লেখা এই উক্তিটা আমি মাঝে মাঝে'ই ব্যবহার করি। মানুষ যখন বলে- লোক দেখানো উপকার; তখন আমার খুব হাসি পায়। সেই উপকারটাই বা কয় জন করছে? সমাজে বিনা স্বার্থে উপকার করার মানুষ কি খুব একটা আছে? কেউ যদি লোক দেখানো উপকার করে কারো জীবন বাঁচিয়ে দেয় কিংবা কারো ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটায় তো ক্ষতি কি?

একজন বর্তমান মন্ত্রী প্রকাশ্যে পা ধরে একজনের কাছে ক্ষমা চাইছেন; সেটা তো আমাদের সবার'ই উচিত প্রশংসা করা।

যেই দেশে মন্ত্রী-এমপিরা মানুষকে চড়-থাপ্পড় দিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ মেরেও বলে- জানো আমি কার সন্তান! কেউ কোন দিন কোন অন্যায় স্বীকার'ই করে না। 
সেই দেশে একজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে পা ধরে একজন প্রবীণ ব্যক্তি'র কাছে ক্ষমা চাইছে; এতেও আমরা সমালোচনা করে বেড়াচ্ছি। হাসাহাসি করছি। কেউ কেউ আবার বলছে এইসব লোক দেখানো!

তো, এই লোক দেখানো ক্ষমা কি আপনি চাইবেন? নাকি চেয়েছেন কোন দিন?

ক্ষমতা যে কতোটা খারাপ, সেটা নিশ্চয় কারো অজানা নয়। আমি নিজ জীবন থেকে সেই শিক্ষা পেয়েছি। একজনকে সামান্য একটু ক্ষমতা দিয়ে দেখেন আপনার জীবনে। সে আর আপনাকে মানুষ'ই মনে করবেন না। ক্ষমতা মানুষকে অমানুষ করে দেয়।

যেই দেশে অপরাধ করে কেউ অপরাধ স্বীকার'ই করে না। সেই দেশে একজন মন্ত্রী ক্ষমা চাইবার পরও মানুষ এই নিয়ে হাসাহাসি করছে।

তাহলে মানুষজন ভুল স্বীকার করবে কেন? ক্ষমা চাইবে কেন?

আবার এই আমরা'ই বলি- ক্ষমা চান। ভুল স্বীকার করেন!

আমাদের তো সভ্যতার এই সংস্কৃতি'ই গড়ে উঠেনি।

এই মন্ত্রী যদি লোক দেখানোর জন্যও পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে থাকে; তাতে সমস্যা কোথায়? 
সেই ক্ষমাটাই বা কয়জন চাইছে?

আমাদের সবার'ই  উচিত প্রশংসা করা। তার অন্য অনেক কাজের যদি সমালোচনা করতে হয়, করুন। কিন্তু এই কাজের সমালোচনা করতে হবে কেন? এটি'র প্রশংসা করুন।  যাতে করে এমন সংস্কৃতি সমাজে গড়ে উঠে। মানুষজন যাতে তাদের ভুল বুঝতে পারে। ক্ষমা চাইতে যেন শেখে।

অপছন্দের মানুষ কিংবা বিপরীত পক্ষের কেউ যে ভালো কিছু করতে পারে; এর জন্য যে প্রশংসা করা সম্ভব; সেই ব্যাপারটাই আমরা জানি না। এটা চর্চার ব্যাপার। এই সংস্কৃতি আমাদের গড়ে তুলতে হবে। নইলে জীবনেও আমরা সভ্য হবো না।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Sunday, November 15, 2020

 

খান আসাদ: বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতি ক্যন্সারের মতো

খান আসাদ: ইউরোপে লিবারেল ও বামেরা একটি আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি মুসলমানদের নিয়ে। এরা সব সময় ‘মুসলমানদের’ সহায়তা করেছে, কারণ এরা বহুজাতিক সমাজের স্বপ্ন দেখে, একটি বহুজাতি ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করে। কেন করে? তার জবাব ইউরোপের ইতিহাসের ভেতরে আছে। জাতিগত বা সংস্কৃতির পার্থক্যকে, ব্যবহার করা হয়েছে সহিংসতার জন্য। ফ্যাসিস্টরা এটা করেছে। ইউরোপীয় লিবারেল ও বামপন্থীরা ফ্যাসিজম থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এরা আর জাতি বা সংস্কৃতি ঘৃণায়, তথা আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। কিন্তু এখন শাদা বর্ণবাদী নিওনাৎসিদের উত্থান ঘটছে। এরা বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ধারনায় বিশ্বাসী নয়। নিওনাৎসিদের উত্থানে ‘রাজনৈতিক ইসলামের’ বা ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের একটি ভূমিকা আছে। ফলে ইউরোপে ‘ইসলাম বা মুসলমান’ নিয়ে যে রাজনীতি, ডান ও বামের, সেটি একেবারেই ইউরোপীয়দের নিজেদের ঘরের রাজনীতি।

ভারতীয় উপমহাদেশ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। পাকিস্তানে ও ভারতে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনীতি প্রধান্যে। বাংলাদেশেও সাম্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনীতি ক্যন্সারের মতো। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আত্মপরিচয়ের রাজনীতিও ফ্যাসিবাদ। মুক্তিযুদ্ধ না হলে, আমরা হয়তো আফগানিস্তানের চেয়েও খারাপ অবস্থায় থাকতাম। ভুলভাবে ‘ইসলাম বা মুসলমানকে জাতীয় পরিচয় হিসেবে ভাবা হচ্ছে, ইউরোপেও। জাতি ও ধর্মসম্প্রদায় যে আলাদা তা গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। ‘আরবীয়’ না বলে ‘মুসলমান’ বলা হয়। ‘ইসলাম ভার্সেস ওয়েস্ট’ একটি সাধারণীকৃত আরোপিত ধারণা, যা ছিলো একটি কৌশল আড়াল করার, একাধারে সাম্রাজ্যবাদ অন্যধারে বিভিন্ন জাতির স্বকীয় সংস্কৃতিকে। সাম্রাজ্যবাদী বুদ্ধিজীবীদের এই ফাঁদে পা এডোয়ার্ড সাইদের মতো বামপন্থীও দিয়েছেন। উদহারণ সাঈদের বইয়ের শিরোনাম Covering Islam অথবা আহমদ ছফা বাঙালি ‘মুসলমানের’ মন খোঁজেন।

ইউরোপে এখন লিবারেল ও বামদের আত্মজিজ্ঞাসার পর্ব চলছে। ফ্রান্সের ঘটনার আগে থেকেই, মাল্টিকালচারালইজমের পক্ষে এবং ‘ইসলামোফোবিয়ার’ বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা কি আসলে তাদের নিজেদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে কিনা। ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে, সংস্কৃতির নামে ‘রাজনৈতিক ইসলামকে’ ভুলভাবে সংস্কৃতি ভেবে, এর ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে আড়াল করছে কিনা। বৈধতা দিচ্ছে কিনা অন্য অঞ্চলের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদকে। ব্যাপারটা এরকম যে ডানপন্থীরা যখন মুসলমানদের ডেমোনাইজ করছে বা সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করছে, লিবারেল ও বামপন্থীরা তখন ‘মুসলমানদের’ রোমান্টিসাইজ করছে। ‘ইসলামী’ গান কতো সুন্দর এবং ‘ইসলামী’ কাবাব কতো ভালো, সেই আলাপ করছে। এর মাঝে হারিয়ে যাছে, আরবি, পার্সি, বিহারি বা বাঙালি জাতীয় সংস্কৃতির পরিচয়।

গান ও খাবার ‘ইসলামী’ হয়ে যাচ্ছে। বামেরা আসলে, সাম্রাজ্যবাদ ও রাজনৈতিক ইসলামের দেওয়া আত্মপরিচয়ের রাজনীতির মধ্যে আটকে গেছে কিনা, আত্মজিজ্ঞাসা সেখানে। সবাই না। অনেকেই স্থানীয় ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার সাথে বৈশ্বিকভাবে সকল ধরনের ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার জ্ঞান রাখেন। ‘মুসলমান’ আত্মপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করাটা এখন তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি নিয়ে অমর্ত্যসেনের Identity & Violence খুব কাজের বই। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি, সেটা আজ বিশ্বব্যাপী। বহুত্ববাদী আত্মপরিচয় ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিকল্প দরকার। যে বিকল্প বৈষম্য ও সহিংসতা থেকে মুক্তি দেবে, শুধু ইউরোপীয়দের নয়, আরবীয় বা ভারতীয়দের নয়, সকল মানুষকে। আজকে তাই সেই বৈশ্বিক বদলের রাজনীতি চাই, বৈশ্বিক সংহতির ভিত্তিতে। Leave No One Behind. ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

Saturday, November 14, 2020

 


কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে একজন মানুষ সফল হয়

উত্তর পাওয়া যায় ড. ডেভিড জে. শার্টজের দ্য ম্যাজিক অব থিংকিং বিগ বইতে। লেখক বলেছেন, সফল তাঁরাই হন, যাঁরা বড় স্বপ্ন দেখতে জানেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করেন। পরামর্শ দেওয়ার সময় অসংখ্য বাস্তব উদাহরণ ব্যবহার করেছেন তিনি। ফলে বইয়ের বিষয়বস্তু বোঝা পাঠকের জন্য সহজ হয়েছে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৯ সালে; যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২০ সালে এসেও অধ্যাপক শার্টজের পরামর্শ ও আলোচনা বেশ সময়োপযোগী।

বিশ্বাসেই শুরু

যেকোনো বড় কাজের পেছনে যে বিষয় চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে, তা হলো বিশ্বাস। আপনি যদি বিশ্বাসই না করেন যে আপনার পক্ষে সফল হওয়া সম্ভব, তাহলে আপনি সেই পথে এগোনোর পদক্ষেপ নেবেন কী করে? তাই বড় কিছু করতে হলে প্রয়োজন নিজের চিন্তার পরিধিকে বিস্তৃত করা। চিন্তায় ও কাজে-কর্মে আশা, আনন্দ, উদ্যম আনা। এড়িয়ে চলা চাই ছোটখাটো বিবাদ বা তুচ্ছ বিষয়। যেকোনো তুচ্ছ বা নেতিবাচক ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামানো কি একজন বড় মাপের মানুষের বৈশিষ্ট্য?

অজুহাতের ওষুধ

সফলতায় বিশ্বাস কিন্তু নিছক কোনো সুখকল্পনা নয়। এই বিশ্বাস তখনই পূর্ণতা পায় যখন আপনি এই বিশ্বাসকে সফল করতে কাজে নেমে পড়বেন। কেউই পুরোপুরি নিখুঁত নয়। পুরোপুরি উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি কখনো মেলে না। কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না শতভাগ ঝুঁকি। তাই উপযুক্ত পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করা শুধুই সময়ের অপচয়। যে কাজ আপনি আজ করতে পারেন, তা আগামীকালের জন্য কেন ফেলে রাখবেন?

বয়স, স্বাস্থ্য, ভাগ্য বা বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত অজুহাতকে আপনার দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে দাঁড় করাবেন না।

ভয়ে নেই জয়

প্রতিটি ভয়েরই কোনো একটা কারণ থাকে। তাই সেই কারণ দূর না করে ভীতির বিষয়টিকে নিছক এড়িয়ে যাওয়া মোটেও কাজের কথা নয়। ভয়কে দূর করতে দরকার পদক্ষেপ গ্রহণ। ধরা যাক, আপনার ভয় হলো পরীক্ষায় খারাপ করা নিয়ে। আপনি যদি সারা দিন পরীক্ষা খারাপ হলে কী হবে, তা নিয়ে চিন্তা করেন, তবে তা আপনার পরীক্ষা ভালো হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখবে না; বরং ভালো করার আশা নিয়ে পড়াশোনা করাই কাজে দেবে। অনেক সময় আত্মবিশ্বাসহীনতার কারণে আমাদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। ড. শার্টজ তাঁর বইয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কিছু পরামর্শ দিয়েছেন: সামনের সারিতে বসার চেষ্টা করা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা, হাঁটার গতি ২৫ শতাংশ বাড়ানো, আলোচনায় অংশগ্রহণ ও নিজের মতো তুলে ধরা, প্রাণ খুলে হাসা।

সৃজনশীলতা সবখানে

সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে আমাদের অনেকের একটা বদ্ধমূল ধারণা হলো—এ বুঝি শুধু শিল্পী বা লেখকদের মতো নির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পৃথিবীতে নতুন কিছু করতে হলে যেকোনো ক্ষেত্রেই সৃজনশীলতা নামক দক্ষতাটি খুব দরকার। ভালো ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে একজন ভালো মা বা বাবা হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সৃজনশীলতা। প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার, কীভাবে আমি প্রতিটি ক্ষেত্রে আরও ভালো করতে পারি? প্রশ্ন করা এবং অন্যের কথা শোনা সৃষ্টিশীলতাকে উসকে দেওয়ার দারুণ উপায়।

সঙ্গীসাথি দৃষ্টিভঙ্গি

আপনি যা-ই করেন না কেন, তা হলো আপনার দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। আর ঠিক সে কারণে আপনি যদি নিজেকে মূল্যহীন বা অকেজো মনে করেন, তবে একটা সময় আপনি সেটিই হয়ে উঠবেন। অন্যদিকে নিজেকে মানুষ হিসেবে যথাযথ মূল্য দিলে বড় চিন্তা করাটাও আপনার জন্য খুব সহজ হয়ে যাবে।

প্রাণশক্তিতে বসবাস

বড় চিন্তা করতে চাইলে এমন সংস্কৃতিতে অবস্থান করা দরকার, যেটি আশা, কর্মচাঞ্চল্য আর উদ্যমে ভরপুর। এমন সব মানুষ যেন আপনার চারপাশে থাকে, যারা শুধু নিজেরাই বড় স্বপ্ন দেখে না, অন্যের মাঝেও উৎসাহ–উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেয়। অন্যদের উৎসাহ দিতে হলে আগে দরকার নিজেকে সক্রিয় ও উদ্যমী করে তোলা। কারও কাছ থেকে মূল্য পেতে চাইলে প্রয়োজন সেই মানুষটিকেও গুরুত্ব দেওয়া। অন্যদের ইতিবাচক কাজে উৎসাহ দিন; তাঁদের মধ্যে সঞ্চার করুন প্রাণশক্তির।

আমার ভুলটি কোথায়

ব্যর্থতা তখনই সাফল্যের ভিত্তি স্থাপন করে, যখন কেউ ব্যর্থতার ক্ষেত্রে নিজের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চিহ্নিত করতে পারে। নিয়মিত নিজেকেই নিজের গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে। অন্যের গঠনমূলক সমালোচনা (অবশ্যই অর্থহীন নিন্দা নয়) শোনার মাধ্যমে নিজের ত্রুটি দূর করা যায়। কোনো একটি পদ্ধতিতে ব্যর্থতা এলে পরবর্তীকালে সেই ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা চাই। তবেই আপনি প্রতিনিয়ত আরও উন্নতির পথে এগোতে পারবেন।

লক্ষ্যহীন জীবন হালবিহীন নৌকা

আমরা ভবিষ্যতে কোথায় যেতে চাই, তার ওপর আমাদের কর্মপরিকল্পনা নির্ভর করে। তাই লক্ষ্য স্থির করা দরকার। এ ক্ষেত্রে ভালো একটি কৌশল হলো, জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আপনি নির্দিষ্ট সময় পর কোথায় যেতে চান, সেটি কাগজে-কলমে লিখে ফেলা। এর ফলে একটি পরিষ্কার চিত্র তৈরি হবে। দৈনন্দিন ছোট ছোট পদক্ষেপ বা অভ্যাস আপনাকে আপনার বড় লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, তাই সেগুলোর বেলায়ও হেলাফেলা করা যাবে না। নতুন কিছু শেখার বেলায় সময় এবং অর্থ বিনিয়োগ করলে আমাদের জীবন হয় সমৃদ্ধ।

হয়ে উঠুন পথপ্রদর্শক

বিশ্বের বড় বড় কাজ অনেক সময়ই একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয় না। এখানে প্রয়োজন হয় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করার মাধ্যমে আপনিও একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে পৃথিবীর এই ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেন। অধ্যাপক শার্টজের মতে, নেতৃত্ব দিতে হলে দরকার, আপনার অধীনে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের চিন্তাভাবনার পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝার চেষ্টা করা, তাঁদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা এবং সব সময় প্রগতির পথে এগোনোর চেষ্টা করা।

একজন সফল পথপ্রদর্শকের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো চিন্তা করতে পারা। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে চিন্তাভাবনার জন্য রোজ খানিকটা নিঃসঙ্গ সময় বের করে নিতে পারেন। এই একাকী সময়ের চিন্তাভাবনা আপনার সৃজনশীলতাকে বাড়াবে; ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও কর্মক্ষেত্রসংক্রান্ত নানান সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখবে।

*সংগ্রহীত