Saturday, November 14, 2020

 


১৫/১১/ ২০২০


গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসকে একদিন তার এক শিষ্য জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা গুরুদেব, আপনি কি আমায় বলতে পারেন, কিভাবে আমি আমার জিবনের লক্ষ্যে পৌছাতে পারবো?"

সক্রেটিস মুচকি হেসে বললেন, "আচ্ছা আমি তোমাকে সেটা বলতে পারবো, তবে সেটার জন্য তোমাকে আগামীকাল বিকেলে নদীর ধারে আসতে হবে।"
তো যেই কথা সেই কাজ, পরদিন বিকেলে শিষ্য নদীর ধারে গিয়ে গুরুর অপেক্ষা করতে লাগলো। একটুপর সক্রেটিস ও এলো। এসে সক্রেটিস বললো "এবার তোমাকে আমার সাথে জলে নামতে হবে"।
কেন বা কী? এসব কিছু জানতে না চেয়েই শিষ্য তার গুরুর সাথে জলে নেমে গেল। কারণ তার গুরু নিশ্চয়ই তাকে কোন ভালো শিক্ষা দিবেন, এ বিশ্বাস তার ছিল।
তো জলে নামতেই সক্রেটিস তার ছাত্রের মাথা পানিতে চেপে ধরলো শক্ত করে, শিষ্য কিছু বুঝে উঠতে না পেরে হাত পা দাপিয়ে, পানিতে হাস-ফাস শুরু করলো। সে যতই মাথা তুলতে চেষ্টা করে সক্রেটিস তাকে আরও জোরে চেপে ধরে।
এভাবে মিনিট দেড়েক চেপে ধরে রাখার পর, সক্রেটিস তার শিষ্যকে ছেড়ে দিলো এবং কিছুক্ষণ পর বললো, "তুমি নিশ্চয় তোমার প্রশ্নের উত্তরটি পেয়েছ?"
শিষ্য বললো, "কিভাবে গুরুদেব?"
সক্রেটিস এবার বললো, "দেখ যখন তোমাকে আমি জলের নিচে চেপে ধরেছিলাম, তখন তোমার একমাত্র লক্ষ্য কী ছিল? কিসের জন্য তুমি আপ্রাণ চেষ্টা করছিলে?"
শিষ্য বললো "আমার লক্ষ্য ছিল শুধু কিভাবে আমি আমার জীবন বাঁচাবো? কিভাবে মুক্তি পাব এই পানি থেকে?
-"জগতের আর কোন চিন্তা কি তখন তোমার মাথায় ছিলো?"
-"না গুরুদেব।"
ঠিক এভাবেই যখন তুমি তোমার জীবনের নির্ধারিত লক্ষ্যকে, শুধুমাত্র একটি লক্ষ্যে পরিণত করতে পারবে, জগতের অন্যসব চিন্তা মাথা থেকে দূরে রেখে তখনি তুমি তোমার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। হতে পারবে সফল একজন মানুষ। তাই লক্ষ্য ঠিক করে পরিশ্রম করে যাওয়াই তো দরকার, সফলতাও একদিন আসবে ।

Friday, November 13, 2020

 

আর কতকাল?

 মুহম্মদ জাফর ইকবাল 
 ১৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
8Shares
facebook sharing button
messenger sharing button
twitter sharing button
pinterest sharing button
linkedin sharing button
print sharing button
খবরের শিরোনামটি দেখে আমি শিউরে উঠেছিলাম- একজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমি ভাবলাম, না জানি কোন দেশে এরকম একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, আমাদের দেশে তো কখনও এরকম নিষ্ঠুরতা হয় না।

খবরের শিরোনামটি দেখে আমি শিউরে উঠেছিলাম- একজন মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমি ভাবলাম, না জানি কোন দেশে এরকম একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, আমাদের দেশে তো কখনও এরকম নিষ্ঠুরতা হয় না।

খবরের ভেতরে চোখ বুলিয়ে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। এ ভয়ংকর ঘটনাটি আমাদের দেশের ঘটনা, লালমনিরহাটে অক্টোবরের ২৯ তারিখে ঘটেছে। যতই খবর আসতে থাকল, ততই খবরটি আরও অবিশ্বাস্য এবং আরও ভয়ংকর মনে হতে থাকল।

আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুননবী নামের যে মানুষটিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন।

কোরআন শরিফের অবমাননা করেছেন, এ অপবাদ দিয়ে তাকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে। খবরের যে অংশটি সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সেটি হচ্ছে, যখন তাকে অসংখ্য মানুষ মিলে আক্রমণ করেছে, তখন তাকে উদ্ধার করে কোনো একটি অফিসে নিয়ে আসা হয়েছিল, কিন্তু তারপরও উন্মত্ত জনতার হাত থেকে তাকে রক্ষা করা যায়নি; তারা সেখান থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করেছে।

তাহলে কি মেনে নিতে হবে আমাদের দেশে আসলে কোনো মানুষের নিরাপত্তা নেই? একজন নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে একটা অপবাদ দিয়ে কিছু মানুষকে উন্মত্ত করে ওই ব্যক্তিকে যখন খুশি মেরে ফেলা যাবে? পুলিশ-র‌্যাব গিয়েও তাকে বাঁচাতে পারবে না? ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে একজন নিরপরাধ মহিলাকেও হত্যা করার ঘটনা আমরা কি এর আগে দেখিনি?

লালমনিরহাটের ঘটনার তিন দিন পর আমরা আবার একই ধরনের আরেকটি ঘটনার খবর পেয়েছি। এটি কুমিল্লার মুরাদনগরের ঘটনা। আমাদের খুবই সৌভাগ্য সেখানে কেউ মারা যায়নি, যাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছিল, তারা আগেই বাড়ি থেকে সরে গিয়েছিলেন।

তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে। প্রথমে খবর ছড়ানো হয়েছে, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একজন একাত্মতা প্রকাশ করেছে, তারপর রীতিমতো মাইকে ঘোষণা দিয়ে পরের দিন ঢালাওভাবে সবার ওপর আক্রমণ করা হয়েছে।

উন্মত্ত মানুষ যখন বাড়িঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে, তখন ফায়ার-ব্রিগেডকে সেই আগুন নেভানোর জন্য যেতে দেয়া হয়নি। পুলিশ এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় সেই ঘটনা ঘটেছে- আবার সেই একই ব্যাপার, তাদের বাড়িঘর রক্ষা করা যায়নি। লালমনিরহাটে যাকে হত্যা করা

হয়েছে তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান। মুরাদনগরে যাদের বাড়িঘর পোড়ানো হয়েছে তারা সনাতন ধর্মাবলম্বী। আমাদের দেশটি এরকম ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক হয়ে গেল কেমন করে?

এ ঘটনাগুলোর কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে। আমরা রামুতে এটি ঘটতে দেখেছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও ঘটতে দেখেছি, দেশের অন্যান্য জায়গাতেও প্রায় নিয়মিতভাবে এরকম ঘটনা ঘটছে।

সব জায়গাতেই মোটামুটি একই ধরনের ঘটনা, প্রথমে ফেসবুকে দেয়া বক্তব্যের নাম করে কোনো একটা রটনা হয়, তারপর মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়, তারপর শতশত উন্মত্ত মানুষ ধর্ম রক্ষার নামে ছুটে আসে। পুলিশ কিছু করতে পারে না কিংবা করতে চায় না এবং ভয়ংকর কিছু ঘটনা ঘটে যায়।

বিষয়টি শুধু ধর্মীয় উন্মত্ততা থেকে ভিন্ন কিছুও হতে পারে। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে, কারণ অনেক সময় দেখা যায়, যারা আক্রমণ করছে তারা স্থানীয় মানুষ নয়, তাদের অন্য এলাকা থেকে আনা হয়েছে।

এসব ঘটনা ঘটানো হয় ধর্মের নামে, অথচ ইসলাম ধর্মের কোথাও এ ধরনের কথা বলা নেই। যারা এগুলো করে তারা আর যাই বিশ্বাস করুক, ইসলাম ধর্মকে বিশ্বাস করে না। আমি পবিত্র কোরআন শরিফ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি, যে কথাগুলো আমার চোখে আলাদাভাবে পড়েছে সেটি হচ্ছে, কতবার সেখানে সীমা লঙ্ঘন না করার কথা বলা হয়েছে।

পৃথিবীর মানুষ তাদের কাজকর্মে যদি সীমা লঙ্ঘন না করত, তাহলে এ পৃথিবীটাই কি একটা অন্যরকম পৃথিবী হয়ে যেত না? কোরআন শরিফের যে আয়াতটি আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং যেটি আমি অসংখ্যবার অন্যদের শুনিয়েছি সেটি হচ্ছে এরকম : এ কারণেই আমি বনি ইসরাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যদি কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে (৫:৩২)।

এরকম অসাধারণ বাণী শোনার পরও কেমন করে একজন মানুষ ধর্মের নামে আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে পারে? হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের সময় একটি অসাধারণ ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই ভাষণের এক জায়গায় তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না।

ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণে অতীতে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। কোরআন শরিফ অবমাননা করা হয়েছে, এরকম একটি অপবাদ দিয়ে যদি একজন ধর্মপ্রাণ মানুষকে পুড়িয়ে মারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না হয়ে থাকে, তাহলে আর কী বাড়াবাড়ি হতে পারে?

খবরের কাগজে দেখেছি, লালমনিরহাটের সেই ঘটনার পর বেশকিছু মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শহীদুননবীর আপনজনের এ মুহূর্তে সান্ত্বনা পাওয়ার কিছু নেই, যারা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে এ দেশ, দেশের সরকার এবং আমাদের মতো দেশের মানুষ কি অপরাধবোধের বোঝা একটুখানিও কমাতে পারব?

শহীদুননবীর এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল, তার কাছে শুনেছি জুয়েলের একজন সদ্য এইচএসসি পাস করা মেয়ে আছে। এ মেয়েটির জীবনের এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর কি কিছু আছে?

জুয়েল রংপুর পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করতেন, শুনেছি তার লাইব্রেরিতে কোনো একটি অনৈতিক ঘটনা কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করার কারণে উল্টো তার নিজের চাকরিটাই চলে গেছে। সে কারণে তিনি মানসিকভাবে একটু বিপর্যস্ত হয়েছিলেন।

পুরো বিষয়টি কি আরও একটু ভালো করে তদন্ত করে দেখা উচিত নয়? তার জীবনটা তছনছ করে দেয়ার জন্য আরও কোথাও কি তার ওপর অবিচার করা হয়েছিল? এ পরিবারের উপার্জনক্ষম আর কেউ নেই, সরকার এবং প্রশাসনের অবশ্যই এ পরিবারের দায়িত্ব নেয়া উচিত।

একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর অপরাধীদের শাস্তি দেয়া, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সাহায্য করা দেশের সরকারের দায়িত্বের ভেতর পড়ে। তবে সেই ঘটনাটি ঘটতেই না দেয়া আসলে সরকারের সত্যিকারের দায়িত্ব।

তাই আমরা আশা করব, সরকার তার মূল দায়িত্বটি আগে পালন করবে- এ দেশে এরকম ঘটনা ঘটতেই দেবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরও অনেক বেশি সতর্ক থাকবে, তাদের ইন্টেলিজেন্স আরও অনেক বেশি কার্যকর হবে।

মুরাদনগরের ঘটনার পর সেখানকার পুলিশের কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ এসেছে, তাদের কেউ কেউ নাকি বলেছেন, ইউনিফর্ম পরা না থাকলে তারাও ধর্ম রক্ষার এ আন্দোলনে যোগ দিতেন! এরকম পুলিশ কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করতে হবে, যারা আমাদের দেশের মূল আদর্শকেই বিশ্বাস করে না।

সামনের বছরটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর। যে স্বপ্ন সামনে রেখে ৫০ বছর আগে আমাদের দেশ মুক্ত করা হয়েছিল সেটিই কি আমাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নয়? এ স্বপ্নপূরণের জন্য আর কতকাল আমরা অপেক্ষা করব?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

Thursday, November 12, 2020

 

ভাড়াটে

আজ সকালে উঠে দেখলেন, বাগানে আইসক্রিমের কয়েকটা প্যাকেট পড়ে। কাল বেশ কিছু লোক এসেছিল ভাড়াটের ঘরে, তা তিনি টের পেয়েছিলেন। এখন প্যাকেট দেখে তাঁর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল।


-মৌমিতা চক্রবর্তী / Date : Monday, August 31 , 2020



“মোটর কিন্তু দিনমানে একবারই চলবে, তাতে জল ফুরোলে তুমি নেয়েছ কি না, রেঁধেছ কি না আমি দেখব না,” ঊষাদেবী ভাড়াটে ঘরে পা রাখার আগেই শর্তসমূহ আউড়ে গেলেন। “বাগানে একটা কুচিও নোংরা ফেলবে না। যে চুলোয় থাকো, রাত দশটার মধ্যে বাড়ি ঢুকবে। ছাদ ব্যবহার শুধুমাত্র জামাকাপড় শুকোনর জন্যই করতে পারো, আর বাড়ি ছাড়ার ইচ্ছে থাকলে তিন মাস আগে জানাতে হবে।”

রজনী ভয়ে ভয়ে মাথাটাকে কাঁধ অবধি হেলিয়ে সম্মতি জানাল। কিন্তু ঊষাদেবীকে দেখে ভিতরে ভিতরে খানিকটা শুকিয়ে গেল সে। আসলে অল্প বয়স, তার উপর একপ্রকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বিয়ে করেছে। রজনী অনেক ছোটতে মাকে হারিয়েছে, ভাই হতে গিয়ে মা আর ভাই দুজনেই মারা যায়। তারপর থেকেই সত্‍মায়ের অত্যাচার। সঞ্জয়কে ভালবেসেই বিয়ে। কিন্তু সঞ্জয়ের বাড়িতে মেয়ের কূলমর্যাদা, নিম্নমানের আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত নানা আপত্তি থাকায় ওরা নিজেরা বিয়ে করে ঊষাদেবীর বাড়িতে উঠেছে। এমন অবস্থায় শঙ্কা, ভীতি খানিক বেশিই থাকে। তার উপর যদি বাড়ির মালকিনের এমন রূপ দেখে, তাহলে অতটুকু মেয়ের আর দোষ কী!

ঊষাদেবীর বাড়িটা বেশ বড়। বাড়ির পিছন জুড়ে আম, কাঁঠাল, লেবু, সুপুরি, পেয়ারা, জবা, টগর, বেলি, কেতকি ছাড়াও লঙ্কা, ঢেঁড়শ, বেগুন, ধনেপাতা এসবের খুচরো চারাও রয়েছে। অভয়বাবু চলে যাওয়ার পর থেকেই ঊষাদেবী একা। তাই নিচতলাটা ভাড়া দেন। কিন্তু কোনও ভাড়াটেই তিনমাসের বেশি টেকে না। তার কারণটা অবশই একপাক্ষিক। পাড়া, রাস্তাঘাট, দোকানবাজার… সকলেই ঊষাদেবীকে খিটখিটে বুড়ি বলেই চেনে। আসলে মানুষের ভাবনাচিন্তা আর বাকযন্ত্রের মধ্যে যে ফিল্টার থাকে তা ঊষাদেবীর নেই বললেই চলে!

ঊষাদেবী শুনছেন নিচে নানারকম খুটখাট, ঠকঠক শব্দ চলছে। টিভির শব্দটা বাড়িয়ে দিলেন বিরক্তিতে। “বাহার কত টিভি লাগানোর, ভাড়া বাড়িতে অত শখ কীসের শুনি!” নিজের মনে গজগজ করতে লাগলেন। ঘড়িতে দেখলেন প্রায় আটটা বাজে, তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে দৌড়লেন। আটটা বেজে গেলে আর রাতের খাবার মুখে তোলেন না। রাতে একটা রুটি খান ঠিক এক পোয়া দুধ দিয়ে। বিশাখা বাসন ধোয়া, ঘর পরিষ্কার, সকাল আর রাতের খাবারটা করে দিয়ে যায়। প্রায় পনেরো বছর ধরে কাজ করছে। প্রথম প্রথম কয়েকবার ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়েছিল, এখন দুজনই দুজনকে বুঝে গিয়েছে। তাই শত ঝামেলা হলেও ঊষাদেবী জানেন বিশাখা আসবেই আর ওঁরও বিশাখাকে ছাড়া চলবে না।

পরের দিন ভোরে নিচে ফুল তুলতে নামলেন ঊষাদেবী। সকালে স্নান সেরে পুজো দিয়ে তবে কিছু মুখে দেন। বারান্দা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন রজনীদের ঘরের জানলাটা খোলা। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন--- ইস, বেহায়া মেয়ে কোথাকার! কারও যেন নতুন বিয়ে হয় না!! একছুটে বাগানে নামলেন। আজ আর তাঁর কোনওকিছুতেই তেমন মন বসল না। পুজোতেও না, মন্ত্র পাঠে কতবার যে ভুল হলো কে জানে! শুধু তাঁর ভাড়াটের শয্যাদৃশ্যটা চোখে ভাসতে থাকল। বিশাখা চলে যাওয়ার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকক্ষণ নিজেকে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, পঁয়ষট্টিতেও তাঁর যা রূপ আছে তাতে ধারেকাছে পৌঁছয় না রজনী। দেরাজ খুলে বিয়ের সীতাহারখানা বের করে পরলেন। মুগ্ধ চোখে নিজেকে দেখতে দেখতে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এটা বোধহয় ফুলশয্যার দিনই শেষ গলায় দিয়েছিলেন। বিয়ে, স্বামীসোহাগ, আবদার, অভিমান এসব সম্পর্কে সইদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুনে পনেরো বছরে তার যা ধারণা হয়েছিল, ওই একটা দিনই যথেষ্ট ছিল তা খানখান হওয়ার জন্য। না না, অভয়বাবু কোনওভাবেই নিপীড়ন করেননি। শুধু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আর পাঁচটা দামি আসবাবের মতই এ বাড়ির শোভা বাড়াবে সে। কিছুদিন পর তিনি জানতে পারেন  আর-একজনের সঙ্গে অভয়বাবুর সম্পর্ক রয়েছে। শুধুমাত্র বাবার নির্দেশেই ঊষাদেবীকে আনা, না হলে ত্যাজ্যপুত্র হতেন।

দরজার কড়ার মৃদু শব্দে ফিরে এলেন অতীত থেকে। ঝটপট হারখানা গুছিয়ে ফেলে নিজেকে ঠিকঠাক করে দরজা খুললেন।

“মাসিমা, একটু এঁচোড় রান্না করেছিলাম, নিরামিষেই কিন্তু...” রজনী ভীত হাতে এঁচোড়ের বাটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। আজ খুব ভালভাবে রজনীকে দেখলেন তিনি। ওর কালো রূপে মায়াবী একটা চটক আছে। একঢাল চুল, আঁকা দুটো চোখ… চকচকে, প্রাণবন্ত। এমন চেহারার ছবি তিনি দেখেছেন, নিজের অ্যালবামে। তফাত শুধু গায়ের রঙে। নিজেকে বর্তমানে নিয়ে এসে বললেন, “তোমার সাহস তো কম নয়, আমার গাছের কাঁঠাল চুরি করে রান্না করে আমাকেই দিতে এসেছ!” রজনী অনেক কষ্টে তাঁকে বোঝায় বাজার থেকেই এই কাঁঠাল আনা হয়েছে। তবু রজনী রেহাই পায় না।

“চান করে রান্না করেছ?”

“না তো…”

“বেরোও ঘর থেকে, ছি ছি ছি জাত মারলে গা!”

রজনী কাঁদতে কাঁদতে একছুটে নিচে নেমে আসে। এরপর থেকে আর কোনওদিন ঊষাদেবীর ঘরে যায়নি। কিন্তু ঊষাদেবী বহুবার রজনীর ঘরে গিয়েছেন, যখন রজনী স্নানে যায়। অভাবের নতুন সংসারে মাছ খুব একটা হয় না রজনীদের, ওই শাকপাতা, সবজি দিয়েই চলে যায়। রজনী স্নান সেরে এসে দেখে মাছের বাটির ঢাকনা আলগা আর চারটে টুকরোর মধ্যে পড়ে রয়েছে তিনটে। বেড়াল সন্দেহে সেদিন বাটি ধরে সব মাছ ফেলে দিলেও পরে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে বুদ্ধিমতী রজনী বাটিতে পড়ে থাকা বাকি মাছ পরম তৃপ্তিতে খেয়েছে। প্রথম দু’দিনেই এক পিস মাছ গায়েব হওয়া আর ঝাঁটার ডগায় লম্বা ধবধবে সাদা চুল পাওয়ার বিষয়টা বুঝতে তার বেশি সময় লাগেনি। বরং তারপর থেকে তাদের মাছ এলে রজনীর ফরমায়েশে পাঁচটা টুকরো আসত।

আসলে ঊষাদেবী মাছ খেতে বড় ভালোবাসতেন। স্বামীকে অকালে হারালে আঁশ থেকে চিরকালের জন্য বঞ্চিত হলেন। একে একে শ্বশুর, শাশুড়ি পরলোক গমনের পর যখন একা হয়ে গেলেন তখনও লোকলজ্জায় খেতে পারেননি। আর পারবেনই বা কীভাবে! একবার বিশাখাকে আনতে দিয়েছিলেন, এই মস্ত একটা কাতলা হাতে ঝুলিয়ে বাজার থেকে ফিরে বিশাখা চোখমুখ ঘুরিয়ে বলেছিল, “জানো তো, বড়মা পাশের বাড়ির রমেন কাকু এতবড় মাছ দেখে আমায় জিজ্ঞাসা করছিল.... কী রে বিশাখা মিত্তির বাড়িতে আজ কেউ আসবে নাকি!” ঊষাদেবীর গলা শুকিয়ে এসেছিল লজ্জায়, ভয়ে। হঠাত্‍ই চিৎকার করে বলে উঠলেন, “যার আসার কথা ছিল, আসবে না জানিয়েছে। তুই মাছ নিয়ে বাড়ি চলে যা, এক্ষুনি যা, আজ আমার জন্য কিচ্ছু রাঁধতে হবে না, আমার নির্জলা উপোস।”

সেদিন একটা দানাও দাঁতে কাটেননি। বিছানায় শুয়ে শুধু বালিশ ভিজিয়েছেন অবোধ বালিকার মতো। এ যন্ত্রণা যে কাউকে বলা যায় না। এ বয়সে এমন লোভ যে পাপ!

আজ সকালে উঠে দেখলেন, বাগানে আইসক্রিমের কয়েকটা প্যাকেট পড়ে। কাল বেশ কিছু লোক এসেছিল ভাড়াটের ঘরে, তা তিনি টের পেয়েছিলেন। এখন প্যাকেট দেখে তাঁর মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। ওদের ঘরে ঢুকে রজনীকে টেনে নিয়ে এলেন বাগানে। “তোমরা ফুর্তি করবে, আর নোংরা করবে আমার বাগান! বাবার জায়গা পেয়েছো তুমি! এই মুহূর্তে পরিষ্কার করো।” গ্রীষ্মের কড়া রোদে বাগান পরিষ্কার করে যখন মেয়েটা জ্বরে তিনদিন উঠতে পারেনি, দূর থেকে রজনীর কপালে সঞ্জয়ের জলপট্টি দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, সযত্নে চুলগুলো টেনে খোঁপা করে দেওয়া দেখে মনে মনে অভিসম্পাত করেছেন, “একবার মরেই দেখ না স্বামীসোহাগী মেয়ে! তিনদিন যাবে না ছোকরা ঘরে বউ তুলবে, এই বলে দিলুম।”

প্রায় বছর খানেক হল রজনীরা টিকে গিয়েছে ভাড়াটে হয়ে, বেশিরভাগটা তার দিক থেকে সমন্বয় করেই। আসলে উঠে যেতে মন মাঝে মাঝে চাইলেও সামর্থ্যের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। ঊষাদেবীর বাড়ি ভাড়া ছিল তুলনামূলক বেশ কমই। আসলে অর্থের প্রয়োজনে তিনি তো ভাড়া দেননি কোনকালেই। কিন্তু আজ রাতে শুতে যাওয়ার আগে হঠাত্‍তীব্র অথচ চাপা কান্নার শব্দ নীচতলা থেকে ভেসে এল। জানলার কাছে কান পাততেই বুঝলেন রজনীর কিছু একটা হয়েছে। গুটিগুটি পায়ে নিচে এলেন তিনি। বন্ধ দরজার ফাঁক গলে যা কিছু শব্দ কানে এলো তাতে তিনি বুঝলেন ডাক্তার নাকি ওদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে স্বাভাবিকভাবে রজনী কোনওদিনই মা হতে পারবে না। ঊষাদেবী কোনও শব্দ না করে উপরে উঠে এলেন। ভাবলেন--- খুব আমাকে জিজ্ঞাসা করা না, মাসীমা আপনার কোনও আত্মীয়স্বজন নেই? ভেবেছিলি আমি বুঝিনি! আমি যে নিঃসন্তান সেটাই জানতে চাইছিলি তো! এবার দেখ, কেমন লাগে!

কিন্তু সারাটা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে থাকলেন। কানে শুধু রজনীর ওই আর্ত কান্নাই ভেসে আসছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল সেদিনের কথা। গভীর রাতে তীব্র যন্ত্রণায় যখন তিনি কলঘরে শোণিতধারায় বীজ-প্রাণের ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলেন, সেদিন তাঁর কান দুটো এমন নৈরাশ্যের সুরই শুনেছিল। কী অদ্ভূত, তিনি ছাড়া এ কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পায়নি! বন্ধ কলঘরে গলার শিরা ফুলে উঠেছিল, নিজের অক্ষমতা, ব্যর্থতায় একঢাল চুল থেকে মুঠো মুঠো চুল উঠে এসেছিল হাতে। কীইবা করতেন! যেখানে নিজের স্বামীই স্বীকার করতে চাননি যে একরাতে শুধু নেশার ঘোরেই তিনি নিজের স্ত্রীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন! সেদিনও কী চূড়ান্ত অপমানিত হয়েছিলেন ঊষাদেবী, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে প্রিয় মানুষটির আবেশজড়ানো কন্ঠে অচেনা নারীর নাম শুনে! কাউকে কিছু বলতেও পারেননি।

পরপর দুটো দিন চলে গেলো, রজনী ছাদে একবারও উঠল না। ঊষাদেবীর মনটা যে কেন জমাট হয়ে আছে কে জানে! আজ বিশাখাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কী রে নীচতলার মেয়েটা অমন গুম মেরে গিয়েছে কেন?”

“তুমি জানো না! ওই বৌদির নাকি বাচ্চা হবে না। আই ভি না কী, ওসব করতে হবে। ওর বরের তো অত টাকা নেই, তাই দোকানটা বেচবে বলেছিল। কিন্তু রজনী বৌদি দিব্বি দেছে, দোকান বেচলে ওরা খাবে কী!” একনিঃশ্বাসে উগরে দিচ্ছিল বিশাখা, কিন্তু ঊষাদেবী হঠাত্‍রণমূর্তি ধারণ করে বললেন, “চুপ কর!” বিশাখা আড়ালে মুখ ভেংচে সরে গেল ----- ইসস, বুড়ির দরদ যেন উথলে পড়ছে! “ওদের দুটোর জীবনে তোমার চোখের কালো নজর পড়েছে তা আমি হলফ করে বললাম....” যাওয়ার আগে অস্ফুটে বলে গেল বিশাখা।

দুপুর গড়াতেই পত্রিকাগুলো নিয়ে বসলেন ঊষাদেবী। স্বাস্থ্যবিষয়ক একাধিক পত্রিকা তাঁর ড্রয়ারে রয়েছে। বিশাখা ওই আই ভি না কী বলল, ওটা তিনি ওখানেই একবার দেখেছিলেন। তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকলেন। শেষমেষ দুপুর গড়িয়ে বিকেলের রামধনুর নরম আলোয় খুঁজে পেলেন। সারাটা রাত বিস্তারিতভাবে পড়ে বোঝার চেষ্টা করলেন।

পরের দিন সকাল সকাল নিচে নেমে এলেন। দরজায় কড়া নাড়তেই সঞ্জয় বেরিয়ে এল। দেখলেন রজনী ঘুমোচ্ছে। ঢলঢলে চোখদুটোর নীচে কালশিটে পড়ে গেছে। ইসস, ঘুমোলে মেয়েটার মুখটা যেন আরও মায়ায় ভরে যায়!

রজনী তার উপস্থিতি টের পেয়ে ঝটপট বিছানায় উঠে বসে ভয়ে কুঁকড়ে গেল। ঊষাদেবী তার মাথায় স্নেহের হাতখানা রেখে বললেন, “চলো তোমার ডাক্তারের কাছে যাই দুজনে, দেখি উনি কী বলছেন!”

রজনী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, “সঞ্জয়, দোকানটা ভালভাবে চালাও তুমি। এই মেয়ের চিকিৎসার সব ভার আজ থেকে আমার।”

বছরখানেকের মধ্যে সফলভাবে আই ভি এফ পদ্ধতিতেই রজনী এখন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওর ফ্যালোপিয়ান টিউবে কিছু ব্লকেজ ছিল। তার খুব শখ, মেয়ের মা হবে। আর নাম রাখবে উষসী।