Monday, October 5, 2026

সুখ


১

আমার মনে হয় ভালো থাকার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে সম্পদ আহরণের পেছনে ছোটাছুটি না করা। আপনি যে শ্রমরূপে দক্ষ, সেটা করে যা উপার্জিত হয়, তা দিয়ে জীবনযাপন করা এবং সন্তুষ্ট থাকা। অতিরিক্তের প্রতি মোহ ত্যাগ করতে পারার ক্ষমতা অর্জন ভালো থাকার সেরা পূর্বশর্ত। তবে মনে রাখতে হবে এটা যেন জোর করে মনের উপর চাপিয়ে দেয়া না হয়। পৃথিবীতে এমন মানুষ বিরল হলেও আছে। তারাই সুখী মানুষ। সুখের বোধ হরণ করে অতিরিক্তের প্রতি প্রবল বাসনা।
২
কিন্তু এমন দৃষ্টিভঙ্গি কি মানবচরিত্রের সঙ্গে যায়?
মনে হয় না।
বরং মানবচরিত্র এর উল্টো। সে চায় পৃথিবীর যা কিছু তার অধীনস্থ করতে। সম্পদ এবং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বাসনা প্রকৃতিগত না হলেও তা সামাজিকগত। সমাজে থাকা মানেই মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপন। এই সম্পর্ক প্রধানত অর্থনৈতিক। আর অর্থনৈতিক মানেই প্রতিযোগিতামূলক। আর প্রতিযোগিতা মানেই হারজিত। দেখা গেছে এই প্রতিযোগিতায় জেতে গুটিকয়েক আর হারে বিপুল সংখ্যক।
এটাই ক্রমে মানুষের ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব তৈরী করে যা পরস্পরকে শ্রেণি শত্র বানিয়ে ফেলে। এটার মিমাংসা সহজে হয় না।
এখানে যারা জেতে তারা দেখতে পায় তাদের সম্পদ ক্রমেই বেড়ে চলছে। এটা একটা পদ্ধতি, যন্ত্রের মত হয়ে ওঠে। মানুষ সেই যন্ত্রের অধীন হয়ে পড়ে। সে চাইলেও সেখান থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে পারে না। এই যন্ত্রের চালিকাশক্তি হচ্ছে পুঁজি। পুঁজি তাকে বাধ্য করে সম্পদ আহরণে। তখন অলরেডি মুনাফা এবং ভোগ তাকে লোভী বানিয়ে ফেলেছে।
অন্যদিকে যারা হারে, তারা বঞ্চিতের বেদনা নিয়ে দিনযাপন করতে থাকে এবং তারা কখনো নিজেদের সুখী বোধ করে না।
শ্রমবিভাজন বেড়ে চলে। যত শ্রমবিভাজন তত পণ্য। শ্রমবিভাজন মানেই একটা নির্দিষ্ট শ্রমের রূপে দক্ষতা। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে মানুষ যে কত শত ধরনের শ্রমে নিযুক্ত, তার শেষ নাই।
এরই মাঝে কিছু মানুষ তার শ্রমার্জিত অর্থে জীবনযাপন করার দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে ফেলেছে। প্রতিযোগিতা চলমান, তথাপি সেখান থেকে জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উদগ্র বাসনার বদলে অর্জিত অর্থ দিয়েই জীবনকে সাজিয়ে ফেলেছে। সেখানে ভোগের আতিশয্যে নেই, কিন্তু সুখের অনুভব আছে।
এই ধরনের মানুষের সংখ্যা, আগেই বলেছি, সামান্য, হয়তো হাতেগোনা।
৩
কিন্তু হাতেগোনা মানুষ দিয়ে কি পৃথিবী চলে? কস্মিনকালেও নয়।
এই যে মানবসভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে কোটি কোটি মানুষের শ্রম বিজড়িত। কাদের শ্রম? প্রধানত শ্রমিকদের। এর পেছনে অর্থায়ন করেছে তথাকথিত পুঁজিপতিরা। তথাকথিত বলছি এই কারণে যে সভ্যতার প্রতিটি ইট শ্রমিকদের শ্রম দিয়েই নির্মিত। সভ্যতা থেকে শ্রম সরিয়ে নিন, কিছুই থাকবে না। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে তাজমহল নির্মিত হবে না, যতক্ষণ শ্রমিকদের শ্রম যুক্ত হচ্ছে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে সভ্যতা মানেই শ্রমিকদের বিনিয়োজিত শ্রম। অথচ এরাই সবচেয়ে বঞ্চিত। এরা নিপীড়িত, অত্যাচারিত। এরা অসুখী, এদের অসুখের বোধ একরকম, আবার বাসনা জর্জরিত সম্পদ কুক্ষিগত করার হিংস্র প্রতিযোগিতায় যারা লিপ্ত, তাদের বোধ ভিন্ন।
কিন্তু সত্য হচ্ছে সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে বঞ্চিতদের রক্ত ও ঘামের বিনিময়ে যারা এইসবের ভোগ থেকে বঞ্চিত। এটা পুঁজিবাদী সমাজের চরিত্র।
সূতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সুখ নিহিত আছে এই সমাজকে ভেঙে এমন একটি সমাজ নির্মাণের মধ্যে যা ব্যক্তিগত সম্পদ কুক্ষিগত করার পথকে বিলুপ্ত করবে।
তবে মনে রাখতে হবে পরম সুখ বলে কিছু নাই। মানুষ মূলত অসুখী প্রাণী।

Ahsan Habib

No comments:

Post a Comment