পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান নোবেল জয়ী কার্ল ডেসরথ নামের ভদ্রলোক বাচ্চাদের টিফিন বানাচ্ছেন, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে তখন অভিনেতা মুকিত জাকারিয়া উনার স্ত্রীর প্রশংসা করে বলেছেন যে রাত চারটার দিকে উনার স্ত্রীকে বলেছেন- পরোটা খাইয়ুম। স্ত্রী তাকে ১০২ ডিগ্রী জ্বর নিয়েও পরোটা বানিয়ে খাইয়েছেন। এরও কিছুদিন আগে আরেক অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম উনার পরকীয়ার প্রসঙ্গে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেছিলেন- এইটাই উনি, এইভাবেই উনাকে ভালবাসতে হবে! মানে খেয়াল করেছেন এদের আচরণের মিলটা?
এই প্রসঙ্গে একটা মজার মিম মনে পড়লো। সেই মীমে লেখা ছিলো- You'll ask a man what a good wife is and he will describe a maid! অর্থাৎ তুমি একটা লোককে ভালো স্ত্রীর বৈশিষ্ট্য জিজ্ঞেস করলে সে তোমাকে একটা দাসীর বর্ণনা দিবে!
এই মীমটা আসলে সত্যি।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বাংলাদেশের পুরুষরা ভালবাসা বলতে যা পোট্রে করে চলেছেন সেটা মূলত 'স্যাক্রিফাইস'। নারী যখন ১০২ ডিগ্রী জ্বর নিয়ে উনার আবদার মেটাবে, নারী যখন অন্য নারীর অস্তিত্বের কথা জেনেও বাচ্চার কথা ভেবে, সমাজের কথা ভেবে অন্যায় মেনে নেবে এবং একটা অসম্মানের জীবন বেছে নেবে এইটা মোটাদাগে ভালোবাসা বাঙ্গু পুরুষের কাছে।
ঝামেলা হচ্ছে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সেইসাথে অর্থনৈতিক মুক্তি মেয়েদের হাতে একটা চাবি তুলে দিয়েছে, এই চাবিটার নাম হলো ডিভোর্স। মেয়েরা যখন টায়ার্ড হয়ে যায় তখন তারা ডিভোর্স দিয়ে সরে আসে। এই সরে আসাটা একেবারেই সহজ না। কিন্তু সরে আসে কারণ তারা জানে পচা শামুকে পা কাটলে সেটা থেকে সেরে ওঠার মলম তার কাছেই আছে!
যেখানে বলিউড, টলিউডের সিনেমা নারীর অসম্মান মেনে নেয়াকে ভালবাসা হিসেবে দেখায়, সেখানে নিজের জন্য স্ট্যান্ড নেয়াটা একেবারেই ইজি না।
আমার মনে আছে আমি যখন ডিভোর্সের ডিসিশনে অটল ছিলাম তখন আমার এক্স আমাকে সম্বোধন করেছিল Bit*h লিখে। মানুষ ওই লেখা দেখলে দুঃখ পাবে, আমি খুশি হয়েছিলাম যে আমি আসলে ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম, যে লোক আমাকে এই সম্বোধন করতে পারে সে আমাকে কখনো ভালোইবাসেনি!
আমি থালাবাসন ধুতে খুবই অপছন্দ করি, মেইনলি রান্নার পরে থালাবাসন ধোয় জেরেমি। পেঁয়াজ কাটতে আমার অসহ্য লাগে, বেশিরভাগ সময় সেটা বিনাবাক্যে করে সে। এর কারণ কি জানেন? আপব্রিংগিং। আমি জেরেমির বাবা-মায়ের সঙ্গে যখনই দেখা করতে যাই, পুরো পরিবারের সময় যখন হলিডে কাটাই, রান্না করেন মূলত জেরেমির বাবা আর ভাই। আমরা সবাই একসঙ্গে প্রতিবারই কিছু না কিছু রান্না করি। ওদের কখনো বলতে শুনিনি এইটা মেয়েদের কাজ বা ওইটা ছেলেদের কাজ।
আমার প্রিয় অর্থনীতবিদ অমর্ত্য সেন আর নবনীতা দেবসেন আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন কারণ নবনীতা দেখেছিলেন অমর্ত্য নামের এই অসাধারণ ভদ্রলোকটি চিনামাটির বাসনপত্র সিংকে জমিয়ে রাখলে পরিস্কার করতে গিয়ে ঠোকাঠুকি লাগলে ভেঙে ফেলে। ফলে ভেঙে যাওয়ার ভয়ে তিনি নিজে ধুতেন। কিন্তু তারপরও সংসার টেকেনি।
প্রিয় পুরুষ, আপনার পার্টনার আপনাকে যেভাবে চেনে সেভাবে আর কেউ চেনেনা। আপনি যখন স্ত্রীর প্রশংসা করছেন তখনও আপনি কেমন করে তাকে ট্রিট করেন সেটা বের হয়ে যায়।
এক সময় আপনার আম্মা নিজে না খেয়ে আপনার বাবাকে খাইয়েছেন বলাটা ক্যুলনেস ছিলো, কিন্তু আপনার মায়ের হাড্ডিতে যে আথ্রাইটিস হয়েছে, সেটা ক্যুল না। সেটা মূলত অবহেলা।
এই বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ পাওয়া কার্ল ডেসরথ বলেছেন- My hope is that we can increase empathy and understanding. এমপ্যাথি আর আন্ডারস্ট্যান্ডিং শুরু হয় পাশের মানুষটাকে বোঝার মধ্য দিয়ে।
প্রিয় পুরুষ- অবহেলা আর অবজ্ঞাকে প্রেম বলে প্রচার বন্ধ করেন। যে প্রেম আপনার বউয়ের শরীরের ক্ষতি করে, যে প্রেম আপনার বউয়ের আত্মসম্মানবোধকে কবর দেয়, যে প্রেম আপনার বউকে মানুষ হিসেবে সমান করে দেখেনা, যে প্রেম ১০২ ডিগ্রী জ্বরের রোগীকে দিয়ে পরোটা বানায়ে নেয়-সেই প্রেম দিয়ে আমরা নারীরা কি করবো বলেন?
Jannatun Nayeem Prity

No comments:
Post a Comment