১
প্রায় প্রতিটি ডিভোর্সের পেছনে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি অনিবার্য তা হোক নারীর পক্ষে কিংবা পুরুষের পক্ষে। এটা নির্ভর করে প্রধানত অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর।
দাম্পত্য যখন ক্রমে একঘেয়ে হয়ে ওঠে, উঠবেই, তখন একটা ছিদ্র তৈরী হয়। সেই ছিদ্রে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়ে। এটা প্রকৃতির নিয়ম যে দুর্বল স্থান তার চেয়ে সবল বস্তুর দখলের শর্ত তৈরি করে দেয়।
কথায় বলে 'প্রকৃতি শূন্য স্থান রাখে না', কথাটা সত্য। মানুষ প্রকৃতিরই অংশ, তবে সে সচেতন কিন্তু প্রকৃতির অমোঘ সত্যটি সে এড়াতে পারে না। মানুষ যে প্রকৃতি থেকে আলাদা হয়ে আলাদা প্রকৃতি তৈরি করে সেখানে মানবিকতা একটি চমৎকার নির্মাণ, কিন্তু এটি মানুষের সাথে মানুষের যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়, তার চাপে ভেঙে ভেঙে যায়, তখন তার জন্মদাত্রী প্রকৃতির চরিত্র প্রাপ্ত হয়, হয়ে ওঠে তার মত অবোধ। মানুষের আর একটি স্বতঃস্ফূর্ত নির্মিতি, সমাজ, তা একটি মুখোশ, তার নামে মানুষ আধিপত্যের আড়ালে নিজের কায়েমী স্বার্থ হাসিল করে।
২
তাহলে ডিভোর্স একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু শত শত হাজার হাজার দাম্পত্য টিকে থাকে, সেসব কিভাবে টিকে থাকে?
ব্যতিক্রম বাদে কোন দাম্পত্যই টিকে থাকার কথা নয়। কিন্তু থাকে যেমন করে আমাদের সমাজ টিকে থাকে। সমাজ বা রাষ্ট্র টিকে আছে একটা দ্বন্দ্বের নিয়মে। সেটা কি? একে বলে বিপরীতের সহাবস্থান। একদিকে আছে টাকাওয়ালা যাদের আমরা পুঁজিপতি বলি, ঠিক তার বিপরীত দিকেই আছে শ্রমিক শ্রেণী। তাদের স্বার্থ পরস্পর বিপরীত কিন্তু তারা একই স্থানে কাজ করে। কাজ না করে উপায় নাই। এটা ভেঙে ফেলার শর্ত তৈরি হয় প্রতিমুহূর্তে কিন্তু ভাঙে না।ভেঙে ফেলার জন্য যে রাজনৈতিক সচেতন সংগ্রাম দরকার, তা তৈরি হতে সময় লাগে, লাগে উপযুক্ত কর্মকৌশল।
দাম্পত্যও কিন্তু একটা দ্বন্দ্বমুখর স্থান। এখানেও নিপীড়ক এবং নিপীড়িতের বসবাস। কোন দাম্পত্যে স্বামী কোন দাম্পত্যে স্ত্রী পরস্পর নিপীড়িত নিপীড়ক। এটা শুধু শ্রম শোষণের উপর নির্ভর করে না, আরো নানারকম সাংস্কৃতিক কারণ হাজির হয় যা ঐ অর্থনৈতিক হায়ায়ার্কি থেকে উদ্ভুত হয়। আমরা সেসব তলিয়ে দেখি না, শুধু বলি মনের মিল হয়নি।
৩
এটা তো ঠিক যে পুঁজিবাদী সমাজে বিয়ে একটি বাজার যেখানে নারীপুরুষ পরস্পরের কাছে বিক্রি হয়। তবে এখানে নারীকেই কেনা হয়, পুরুষ কেনে। উল্টাটাও হয়। সেটা প্রকাশ্য নয়, অপ্রকাশ্য।
এই যে বিয়ের মাধ্যমে নারীপুরুষ পণ্য হয়, তার মানে তাদের একটা ব্যবহারমূল্য আছে এবং সেটা একসময় উশুল হয়। নানাভাবে এটা হয়, প্রধানত হয় সন্তান উৎপাদনের মধ্য দিয়ে যা সম্পদের উত্তরাধিকার বহন করে।
ব্যবহারমূল্য যখন উশুল হয়, তখন তার জায়গা হয় ময়লার ঝুড়িতে। এটা বস্তুর বেলা সহজ, কিন্তু মানুষের বেলা সহজ নয়, কারণ, মানুষ একটি শ্রমশীল প্রাণী। তখন সে হাতবদল করে। এই হাতবদল হয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। মানুষ যেহেতু সাংস্কৃতিক প্রাণী, সূতরাং এর সব কর্মকাণ্ডে সংস্কৃতির ছাপ না থেকে পারে না। এই ছাপ অনেককিছু ঢেকে দিতে পারে।
দাম্পত্য যখন টলমল করে ওঠে, উঠবেই, তখন কোথা থেকে যেন একটা সাহায্যকারী এসে হাজির হয়, এটাই সেই তৃতীয়পক্ষ।
আবার তারা একে অপরের কাছে বিক্রি হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তার আগে চাই আমাদের মহার্ঘ ডিভোর্স।
ডিভোর্স ভালো কি মন্দ, তার প্রভাব কি- এসব আলোচনায় ডিভোর্সের কিছু যায় আসে না, সে হবেই। কারণ ভালোমন্দ ঘটনার ভেতরে যে শর্ত তৈরি হয় তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একটা সময় পর্যন্ত এর কিছু প্রভাব থাকে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারে না।
পৃথিবীর প্রাপ্তবয়ক বিবাহিত মানুষ দুভাগে বিভক্ত: ডিভোর্সী এবং অডিভোর্সী।
Ahsan Habib
No comments:
Post a Comment