কিংবদন্তি বলে, প্রয়াগের কাছে এক বৃদ্ধ পণ্ডিত ধানের তুষের আগুনে বসে আছেন। তুষের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে দ্রুত শেষ হয়ে যায় না, ধীরে ধীরে পোড়ায়। সেই আগুনে বসে থাকা মানুষটির নাম কুমারিল ভট্ট। তরুণ শঙ্কর নাকি তাঁর কাছে এসেছিলেন বিতর্কের আশায়। কিন্তু কুমারিল জানালেন, তাঁর হাতে আর সময় নেই। শঙ্কর যেন মণ্ডন মিশ্রের কাছে যান।
ঘটনাটি ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্য নয়। কুমারিলকে ঘিরে আরেকটি বিখ্যাত কাহিনি আছে। বৌদ্ধদের যুক্তি ভেতর থেকে বুঝে তাদের মোকাবিলা করার জন্য তিনি নাকি ছদ্মবেশে বৌদ্ধ আচার্যদের কাছে শিক্ষা নিয়েছিলেন। পরে সেই প্রতারণার জন্যই প্রায়শ্চিত্ত করতে তুষের আগুনে বসেন। এসব কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কিন্তু মানুষ কুমারিলকে যেভাবে মনে রেখেছে, তার মধ্যে তাঁর দর্শনের একটি ইঙ্গিত আছে। বিশ্বাস, জ্ঞান ও কর্তব্য তাঁর কাছে শুধু তর্কের বিষয় ছিল না। এগুলোর সঙ্গে মানুষের জীবনও জড়িত।
কুমারিল সম্ভবত সপ্তম শতাব্দীর ভারতীয় দার্শনিক। তিনি পূর্বমীমাংসার অন্যতম প্রধান চিন্তক এবং বৌদ্ধ জ্ঞানতত্ত্বের শক্তিশালী সমালোচক। তাঁর সময়ে ভারতীয় দর্শনের জগৎ প্রবল বিতর্কে মুখর। বৌদ্ধ যুক্তিবিদ দিঙ্নাগ ও ধর্মকীর্তি জ্ঞান, ভাষা ও প্রত্যক্ষ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তুলছেন। ন্যায়, মীমাংসা এবং অন্যান্য দর্শনও নিজেদের অবস্থান আরও সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করতে বাধ্য হচ্ছে। এই তর্কের মধ্যেই কুমারিলের চিন্তা গড়ে ওঠে।
তাঁর দর্শনের কেন্দ্রে একটি খুব সাধারণ অথচ গভীর প্রশ্ন আছে: আমরা কোনো কিছুকে সত্য বলে বিশ্বাস করি কেন?
চোখ মেলে সামনে একটি গাছ দেখলে সাধারণত আমরা প্রথমেই ভাবি না, গাছটি সত্যিই আছে কি না। আমরা দেখি এবং বিশ্বাস করি। পরে যদি কাছে গিয়ে বুঝি, যাকে গাছ ভেবেছিলাম সেটি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি খুঁটি, তখন আগের ধারণা বদলে যায়। অর্থাৎ মানুষের জ্ঞান সব সময় সন্দেহ দিয়ে শুরু হয় না। প্রথমে কোনো কিছু আমাদের কাছে সত্য বলে ধরা দেয়, পরে ভুলের কারণ দেখা দিলে আমরা তাকে সংশোধন করি।
এই সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্যেই কুমারিল জ্ঞানতত্ত্বের একটি মৌলিক সূত্র খুঁজে পান। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ধারণা স্বতঃপ্রামাণ্য (Svataḥ Prāmāṇya)। কথাটির অর্থ এই নয় যে মানুষের মনে যা আসে, তা-ই সত্য। বরং কোনো জ্ঞান স্বাভাবিকভাবে জন্মালে তাকে গ্রহণ করার আগে আরেকটি জ্ঞানের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় না। তাকে ভুল মনে করার কোনো কারণ না থাকলে আমরা তাকে প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করি। পরে বিরোধী কোনো অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান এসে সেই বিশ্বাসকে বাতিল করতে পারে।
অন্ধকারে দড়িকে সাপ মনে হলে মানুষ ভয় পায়, পিছিয়ে যায়। সেই মুহূর্তে সাপের জ্ঞানটিই তার আচরণ চালাচ্ছে। পরে আলো জ্বালিয়ে দড়ি দেখা গেলে নতুন জ্ঞান পুরোনো জ্ঞানকে বাতিল করে। এখানেই কুমারিলের বক্তব্যের সূক্ষ্মতা। আমরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সব জ্ঞানকে আগে থেকেই সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করাই না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্বাস দিয়ে শুরু করি, কারণ দেখা দিলে সন্দেহ করি।
বহু শতাব্দী পরে স্কটিশ দার্শনিক টমাস রিডের সাধারণ বোধের দর্শনে এই প্রশ্নের সঙ্গে একটি দূরবর্তী মিল দেখা যায়। রিড মনে করেছিলেন, বাইরের জগৎ আছে, স্মৃতি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য, আমাদের প্রত্যক্ষ সাধারণভাবে বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, এসব মৌলিক বিশ্বাসের পক্ষে প্রতিবার নতুন করে যুক্তি হাজির করে জীবন শুরু করা সম্ভব নয়। মানুষের কিছু স্বাভাবিক বিশ্বাসকে সন্দেহের আগে প্রাথমিক মর্যাদা দিতেই হয়। কুমারিল ও রিড অবশ্য একই কথা বলেন না। রিডের প্রশ্ন মানুষের সাধারণ জ্ঞানক্ষমতা নিয়ে, কুমারিলের স্বতঃপ্রামাণ্য একটি বৃহত্তর জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থার অংশ এবং শেষ পর্যন্ত বেদের কর্তৃত্ব ব্যাখ্যাতেও ব্যবহৃত হয়। তবু দুজনের চিন্তার একটি মিল আমাদের থামিয়ে দেয়। প্রতিটি বিশ্বাসের আগে যদি সেই বিশ্বাসের প্রমাণ চাই, তাহলে জ্ঞান শুরু হবে কোথা থেকে?
এই সমস্যাটি কুমারিলের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ মীমাংসার মতে বেদ অপৌরুষেয় (Apauruṣeya), অর্থাৎ কোনো ব্যক্তিমানুষ তার রচয়িতা নন। সাধারণত কারও কথা বিশ্বাস করার আগে আমরা বক্তার বিশ্বাসযোগ্যতা বিচার করতে পারি। তিনি বিষয়টি জানেন কি না, সত্য বলছেন কি না, ভুল করার সম্ভাবনা আছে কি না। কিন্তু যেখানে কোনো মানব-রচয়িতাই নেই, সেখানে এই পদ্ধতি চলবে কীভাবে?
কুমারিলের উত্তর ছিল, কোনো জ্ঞান গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সব সময় একজন নির্ভরযোগ্য বক্তার সনদ দরকার হয় না। জ্ঞান যদি যথাযথভাবে জন্মায় এবং তাকে বাতিল করার কোনো কারণ না থাকে, তবে তাকে প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করা যায়। এই যুক্তি তাঁর কাছে বেদের কর্তৃত্ব ব্যাখ্যারও ভিত্তি হয়ে ওঠে।
এখানেই কুমারিলের একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। তিনি বেদের অত্যন্ত দৃঢ় রক্ষক, অথচ বেদকে সত্য প্রমাণ করার জন্য সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের শরণ নেন না। বেদ সত্য কারণ ঈশ্বর তা লিখেছেন, এমন যুক্তি তাঁর নয়। বরং বেদের অপৌরুষেয়তা এবং জ্ঞানের স্বতঃপ্রামাণ্যের ওপর তিনি নির্ভর করেন। ধর্মীয় কর্তৃত্বকে রক্ষা করছেন, কিন্তু সেই কর্তৃত্বের নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরকে বসাচ্ছেন না। ভারতীয় দর্শনের ইতিহাসে এই অবস্থান বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
মীমাংসার কাছে বেদের গুরুত্ব শুধু ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্নেও নয়। তাদের প্রধান আগ্রহ ছিল ধর্ম বা কর্তব্য কীভাবে জানা যায়। চোখ দিয়ে গাছ দেখা যায়, আগুন দেখা যায়, মানুষ দেখা যায়। কিন্তু কোন কাজ করা উচিত, কোন কাজ কর্তব্য, কোন কর্মের কী ফল হবে, এসব একইভাবে চোখে দেখা যায় না। মীমাংসা মনে করে, বৈদিক বিধিবাক্য এমন কিছু কর্তব্যের জ্ঞান দেয়, যা সাধারণ প্রত্যক্ষের নাগালের বাইরে।
জ্ঞানের উৎস নিয়েও কুমারিলের চিন্তা খুব সূক্ষ্ম। ভাট্ট মীমাংসায় প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও শব্দের পাশাপাশি অর্থাপত্তি (Arthāpatti) এবং অনুপলব্ধি (Anupalabdhi) স্বতন্ত্র জ্ঞানপথ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
অর্থাপত্তির পুরোনো উদাহরণটি খুব সাধারণ। একজন মানুষ দিনে কিছু খান না, অথচ তাঁর শরীর মোটা হচ্ছে। দুটো তথ্যই যদি সত্য হয়, তাহলে এমন কিছু মেনে নিতে হয় যা আমরা সরাসরি দেখিনি। তিনি নিশ্চয়ই অন্য কোনো সময়, ধরা যাক রাতে, খান। এখানে ধোঁয়া দেখে আগুন অনুমান করার মতো পরিচিত কোনো চিহ্ন থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। জানা তথ্যগুলো অন্যথায় একসঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না বলে একটি নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে হচ্ছে।
আধুনিক দর্শনে “সর্বোত্তম ব্যাখ্যার অনুমান” নামে যে ধরনের চিন্তার কথা বলা হয়, তার সঙ্গে এখানে কিছু সাদৃশ্য চোখে পড়ে। দুটিকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কিন্তু মানুষের চিন্তার একটি সাধারণ প্রবণতা দুই ক্ষেত্রেই ধরা পড়ে। আমরা কখনো এমন কিছু স্বীকার করি, যা সরাসরি দেখা যায়নি, কারণ সেটি না মানলে আমাদের জানা ঘটনাগুলো অর্থপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আরও আশ্চর্য অনুপলব্ধির ধারণা। আপনি ঘরে ঢুকে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বইটি নেই।” কিন্তু নেই-কে দেখলেন কীভাবে? যে বস্তু নেই, তাকে তো চোখে দেখা যায় না। কুমারিলের ধারায়, কোনো বস্তু উপস্থিত থাকলে উপযুক্ত অবস্থায় তাকে দেখা যেত, অথচ দেখা যাচ্ছে না, এই না-পাওয়াই তার অনুপস্থিতির জ্ঞান দেয়। টেবিল দেখা যাচ্ছে, আলো যথেষ্ট, চোখও ঠিক আছে, কিন্তু বই দেখা যাচ্ছে না। তাই আমরা জানি, বইটি টেবিলে নেই। অনুপস্থিতিও এভাবে জ্ঞানের বিষয় হয়ে ওঠে।
কুমারিলের দর্শনের সৌন্দর্য এখানেই। তাঁর প্রশ্ন বড়, কিন্তু তার উপাদান খুব ছোট। একটি গাছ দেখা, দড়িকে সাপ ভাবা, না খেয়েও কারও মোটা হওয়া, টেবিলে একটি বই না থাকা। দর্শন তখন দূরের কোনো দুর্বোধ্য বিষয় থাকে না, মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে এসে দাঁড়ায়।
বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে তাঁর তর্কে এই বাস্তববাদ আরও স্পষ্ট। কিছু বৌদ্ধ চিন্তাধারায় বাহ্যজগৎ, প্রত্যক্ষ এবং মানসিক প্রতিরূপের সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কুমারিলের মতে আমরা শুধু মনের ভেতরের কোনো প্রতিচ্ছবির সঙ্গে বন্দী হয়ে নেই। আমাদের জ্ঞান এমন একটি বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, যা আমাদের চেতনার বাইরে নিজের অস্তিত্ব রাখে। বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যও আমরা বাস্তবভাবেই চিনতে পারি।
এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রকাশ দেখা যায় অপোহ তত্ত্ব (Apoha Theory) নিয়ে তাঁর বিতর্কে। দিঙ্নাগের বৌদ্ধ ভাষাতত্ত্বে “গরু” শব্দের অর্থ কোনো চিরস্থায়ী, স্বতন্ত্র “গরুত্ব” নয়। বাস্তবে আছে বিশেষ বিশেষ বস্তু। তাহলে বহু আলাদা গরুকে একই শব্দে ডাকা সম্ভব হয় কীভাবে? অপোহের ধারণা অনুযায়ী শব্দ অর্থ তৈরি করে বর্জনের মাধ্যমে। সহজ করে বললে, “গরু”কে ধরা হয় “অগরু” থেকে পৃথক করার মাধ্যমে।
কুমারিল এর মধ্যে একটি সমস্যা দেখলেন। যদি গরুকে বুঝতে হয় অগরু বাদ দিয়ে, তাহলে অগরু কী তা বুঝতে গেলেও গরুর ধারণাটি কোনোভাবে দরকার। দুটো ধারণা যেন একে অন্যের ওপর নির্ভর করছে। একটিকে ব্যাখ্যা করতে অন্যটির দরকার, আবার অন্যটিকে ব্যাখ্যা করতে প্রথমটির। কুমারিল মনে করেন, ভাষা শুধু বর্জনের মাধ্যমে কাজ করে না। বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে কিছু বাস্তব সাধারণ বৈশিষ্ট্যও আমরা চিনতে পারি।
এই তর্ক পড়লে বহু শতাব্দী পরে ফের্দিনাঁ দ্য সসুরের ভাষাচিন্তার কথা মনে পড়তে পারে। সসুর দেখিয়েছিলেন, ভাষায় একটি চিহ্নের মূল্য অন্য চিহ্নগুলোর সঙ্গে তার পার্থক্য ও সম্পর্কের মধ্য দিয়েও তৈরি হয়। অপোহ আর সসুরের তত্ত্ব এক নয়। একটিকে অন্যটির পূর্বসূরি বলাও ভুল হবে। তবু উভয় ক্ষেত্রেই একটি প্রশ্ন ফিরে আসে: কোনো শব্দের অর্থ কি সরাসরি কোনো বস্তুর ভেতর থেকে আসে, নাকি অন্য কিছুর সঙ্গে পার্থক্যের মধ্য দিয়ে তার সীমানা তৈরি হয়?
এই জায়গায় কুমারিলের সঙ্গে সসুরের অমিলই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কুমারিল ভাষাকে শুধু পার্থক্যের ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ করতে চান না। তাঁর মতে বাস্তবের মধ্যেই এমন সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে, যাকে ভাষা চিনতে পারে। ফলে ভাষা শুধু নিজের ভেতরে চিহ্নের সম্পর্ক নয়, বাইরের বাস্তব জগতের সঙ্গেও যুক্ত।
কর্ম ও ফলের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতেও কুমারিলের মীমাংসা একটি বিশেষ ধারণা ব্যবহার করে, অপূর্ব (Apūrva)। একটি বৈদিক কর্ম এখন করা হলো, কিন্তু তার ফল যদি অনেক পরে আসে, তাহলে বর্তমান কর্ম ও ভবিষ্যৎ ফলের মধ্যে যোগসূত্র কোথায়? অপূর্ব সেই ব্যবধান বোঝানোর চেষ্টা। একে কোনো রহস্যময় জাদুশক্তি ভাবার চেয়ে বর্তমান কর্ম ও দূরবর্তী ফলের মধ্যে অনুমিত কার্যকর যোগসূত্র হিসেবে বোঝা ভালো। এখানেও সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকে প্রতিটি কর্মের বিচারক হিসেবে বসানোর প্রয়োজন পড়ে না।
এ পর্যন্ত এলে কুমারিলকে খুব আধুনিক বলে মনে হওয়ার একটি প্রলোভন তৈরি হতে পারে। সেই প্রলোভন এড়ানো জরুরি। তাঁর প্রশ্নের কিছু অংশ আজও জীবন্ত, কিন্তু তাঁর দার্শনিক প্রকল্প আধুনিক বিজ্ঞান, ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিকতার প্রকল্প ছিল না। তাঁর চিন্তার একটি বড় উদ্দেশ্য বৈদিক কর্তৃত্ব রক্ষা করা। ফলে তাঁর দর্শনের ভেতরেই একটি টানাপোড়েন আছে। যুক্তি কি খোলা মনে সত্যের সন্ধান করছে, নাকি আগে থেকেই স্বীকৃত একটি সত্যকে রক্ষা করছে?
কার্ল পপারের সঙ্গে এখানেই একটি সীমিত তুলনা করা যায়। পপার মনে করেছিলেন, কোনো তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না, তাকে সমালোচনা ও পরীক্ষার মুখে রাখতে হয়। কুমারিলও স্বীকার করেন, কোনো জ্ঞান পরে বিরোধী জ্ঞানে বাতিল হতে পারে। কিন্তু এখানেই মিল প্রায় শেষ। পপারের কাছে সমালোচনা জ্ঞানের অগ্রগতির কেন্দ্রীয় শক্তি। কুমারিলের কাছে প্রাথমিক বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি মৌলিক, এবং বেদের কর্তৃত্ব এমন একটি বিশেষ মর্যাদা পায়, যা আধুনিক সমালোচনামূলক যুক্তিবাদের সঙ্গে সহজে মেলে না।
কুমারিলের নৈতিক জগত নিয়েও আধুনিক পাঠকের প্রশ্ন থেকে যায়। ধর্ম বা কর্তব্যের জ্ঞান যদি প্রধানত বৈদিক বিধির মধ্যে নির্ধারিত হয়, তাহলে বেদের বাইরে মানুষের নৈতিক অভিজ্ঞতার স্থান কোথায়? অন্যের কষ্ট দেখে যে সহমর্মিতা জন্মায়, অন্যায় দেখে যে প্রতিবাদ আসে, কিংবা বিবেক থেকে যে সিদ্ধান্ত তৈরি হয়, তার মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে? আধুনিক নৈতিক চিন্তার বড় অংশ যেখানে মানুষের যুক্তি, স্বাধীনতা, কল্যাণ, অধিকার বা পারস্পরিক দায়ের মধ্যে নৈতিকতার ভিত্তি খোঁজে, কুমারিল সেখানে একেবারে ভিন্ন একটি জগৎ থেকে কথা বলেন। এই অমিল আড়াল করলে তাঁকে বোঝা হবে না, বরং আমাদের সময়ের পোশাক তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হবে।
তবু স্বতঃপ্রামাণ্যের প্রশ্নটি সহজে বিদায় নেয় না। ন্যায় দর্শনের চিন্তকেরা বলেছিলেন, জ্ঞান সত্য কি না তা নির্ধারণে বাহ্য যাচাই দরকার। ভুল জ্ঞানও তো প্রথমে সত্য বলেই মনে হয়। শুধু প্রাথমিক বিশ্বাসযোগ্যতা যথেষ্ট কেন?
কুমারিলের পাল্টা প্রশ্নটিও সহজ নয়। প্রতিটি জ্ঞানকে যদি আরেকটি জ্ঞান দিয়ে যাচাই করতে হয়, তাহলে সেই দ্বিতীয় জ্ঞানকে যাচাই করবে কে? তৃতীয়টি? তৃতীয়টিকে চতুর্থটি? কোথাও না কোথাও কি আমাদের এমন কোনো জ্ঞান থেকে শুরু করতে হবে না, যাকে আপাতত বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করছি?
এই প্রশ্নের কারণেই কুমারিল আজও পুরোনো হয়ে যাননি। আমরা সংবাদ পড়ি, স্মৃতির ওপর নির্ভর করি, চোখকে বিশ্বাস করি, অন্য মানুষের কথা শুনি। প্রতিটি বিশ্বাসের পেছনে আরেকটি প্রমাণ, তার পেছনে আরেকটি প্রমাণ চাইতে থাকলে জীবন অচল হয়ে যাবে। আবার যা সামনে আসে সবকিছু সত্য বলে গ্রহণ করলেও আমরা ভুল, গুজব ও প্রতারণার শিকার হব। মানুষের জ্ঞান তাই বিশ্বাস ও সন্দেহের মাঝখানে চলতে থাকে।
কুমারিল আমাদের শেখাননি যে যা প্রথমে সত্য মনে হয়, তা সত্যই। তাঁর আরও গভীর প্রশ্ন হলো, সন্দেহ করার আগেই আমরা কেন বিশ্বাস করি, এবং কখন সেই বিশ্বাস প্রত্যাহার করা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দায় হয়ে ওঠে।
তুষের আগুনের সেই বৃদ্ধ মানুষটির কাছে ফিরে গেলে প্রশ্নটি আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি সত্যিই সেই আগুনে বসেছিলেন কি না, আমরা জানি না। তাঁর জীবনের গল্পটিও প্রথমে আমাদের কাছে একটি বিশ্বাসযোগ্য কাহিনি হিসেবে আসে। তারপর আমরা ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি, সন্দেহ করি, সংশোধন করি।
অদ্ভুতভাবে, কুমারিলকে নিয়ে বলা কিংবদন্তিটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর দর্শনের সামনে এসে দাঁড়ায়।
সত্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও হয়তো এমনই। আমরা কোনো এক জায়গা থেকে বিশ্বাস শুরু করি। কিন্তু কোথায় বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে, আর কোথায় তাকে প্রশ্ন করতে হবে, সেই বিচার থেকেই জ্ঞানের আসল দায় শুরু হয়।
Kuloda Roy
No comments:
Post a Comment