Sunday, August 9, 2026

বিনা উৎসবেই আনন্দমূখর সেসব দিন

 



সেসব দিন বিনা উৎসবেই আনন্দমূখর হয়ে উঠতো। চালকুমড়ার মাচায় ফুল এলেও আনন্দ, আবার ঢেঁকির গড়ে শস্য পড়লেও আনন্দ। দিনগুলোর গা জুড়ে এক অদ্ভুত সুখ লেপ্টে থাকতো।
আমাদের বাড়িতে আলাদা কোনো ঢেঁকিঘর ছিল না। প্রকাণ্ড বরই গাছের তলায় পাতা থাকতো আমাদের ঢেঁকি। তাই সুযোগ পেলেই ঢেঁকিকে গাড়ি বানিয়ে আমি চলা করতাম।
গিন্নি তোমার গাড়িতে আমাকে নেবে? দাদুর প্রশ্নের উত্তরে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েই আবার গাড়ির বেগ বাড়াতাম, ভুঁওওওও।
সকালের স্নান সেড়ে ঠাকুমা উঠোনে কাপড় মেলছে। দিদি, তুমি সাহেব কাকুর মতোন আমাকে ছেড়ে বিদেশ যাবা? এই প্রশ্নে কী হতো জানি না, আমি আকাশের দিকে একবার তাকিয়েই, ঢেঁকি গাড়ি ফেলে ছুটে যেতাম ঠাকুমার কাছে। কিন্তু জড়িয়ে ধরতে পারতাম না। ঠাকুমার নিত্যপূজা হয়নি তখনো।
না, আমি আমার দিদিকে যেতে দিলে তো! আমরা দুইবোন এই বাড়িতেই থাকবো—-আমার সকল উৎকন্ঠা এক নিমেষেই দূর করে দিতো ঠাকুমা।
আমি তখন নির্ভার মনে ঢেঁকি গাড়ি ভুলে কাঁসার বাটি ভরে মুড়ি নিয়ে বসি দাদুর পাশে, বাইরবাড়ির দেবদারু তলায়। বাটির মুড়ি পেটে যায় কম, মাটিতে ছড়ায় বেশী। নিজের বাটির গুড়ের বাতাসা শেষ করেই দাদুর বাটিতে চোখ।
ও দাদু, তোমার বাতাসা ফুরায়নি? আমার মুড়ির বাটিতে দাদু নিজের বাতাসাটি ফেলতেই ঠাকুমার নিত্যপূজার ঘন্টা বেজে উঠতো।
আর তা ছাপিয়ে যায় ‘মাঠা.......মাঠাআআআ....’হরিপদ ঘোষের হাঁক।
মাঠার ভাঁড় নামে আমাদের বাইরবাড়িতে। তাঁতঘড়ের চাল ছুঁয়ে আসা অল্প রোদে ঝলমল করে ওঠে মাঠার হাড়ি।
ও মনিপিসি, দাদুর পান্জাবি কই? আমাকে আটআনা দাও। মাঠা খাবো।
মনিপিসিটা এমনই, যখনই খুঁজি বাড়িতে থাকেনা। দেরী হলে হরিপদ ঘোষ ভাঁড় নিয়ে চলে যাবে যে।
ঠাকুমা আহ্নিক শেষ করে ডাকে, মনি। পূজার কৌটা থেকে আটআনা বের করে আমার হাতে দিয়ে বলে, পূজা শেষ হয়ে গেছে নমো করে যাও।
আমি লাল মেঝেয় কোনোরকমে কপাল ছুঁইয়ে এক দৌড়ে বাইরবাড়ি। তাঁতিরা ততক্ষণে হরিপদ ঘোষের ভাঁড়ের মাঠা অর্ধেক করে ফেলেছে।
ও হরিপদ নতুন হাড়ি খোলো, আমার গিন্নিকে বেশী করে ভাসা মাখন দিয়ে মাঠা দাও, দাদুর হুকুম মেনে গ্লাসে মাঠা পড়ে আমার ভাগের।
আমি আনন্দে হাত বাড়িয়ে যতই একগ্লাস মাঠা নেই না কেন, দু’এক চুমুক কোনোরকমে খেয়েই ভাসতে থাকা সব মাখন আঙুল চুবিয়ে খেয়ে নিতাম। ব্যস্, আমার মাঠা খাওয়া শেষ।
সেদিন আর সকালে আমাদের বাড়িতে ঘি ফেলা ফেনা ভাত হতো না। আটআনায় কেনা দু’জগ মাঠায় চিড়া আর মুড়কি ভিজিয়ে হতো জলখাবারের আয়োজন। সাথে থাকতো চিনিচম্পা কলা আর গুড়ের বাতাসা।
সকালের কাজের চাপ কম থাকায় ঠাকুমা বড়ঘরের বারান্দায় পাঠ করতে বসতো শ্রীচৈতন্যের অমৃতকথা অথবা মহাভারত। আমি পেয়ারা গাছের তলায় ভাঙা খোয়া দিয়ে মানুষ আঁকতে আঁকতে দেখতাম পাঠে ঠাকুমার তন্ময় হয়ে যাওয়া।
দেবরাজ ইন্দ্র নিরবিচ্ছিন্ন মুষলধারে বৃষ্টি করিতে লাগিলেন, কিন্তু অর্জুন তাহাতে কিছুমাত্র শংকিত না হইয়া দিব্য শরজাল বিস্তার করত সেই বৃষ্টি নিবারণ করিয়া........
আমি ঠাকুমার কন্ঠে বৃষ্টিজলের আভাস পেয়ে মানুষ আঁকানোয় ভুল করে ফেলি।
বাবু বাজার পাঠাইছে, বাজারের দুটো ব্যাগ উঠোনে থপ করে ফেলেই রিক্সাওয়ালা দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়।
আমাদের বাড়ির আলসে সময় চন্চল হয়ে ওঠে।
আজ উনুনে দুই পাক উঠবে। প্রথম পাকে বাড়ির সবার জন্য আমিষ রান্না, আর পরের পাকে ঠাকুমার পারণের নিরামিষ রান্না।
ঝক্কি অনেক, তাই সময় নষ্ট না করে রান্নাঘরের উনুন জ্বলে ওঠে। যতই তাড়াহুড়ো হোক না কেন আমিষ পাকে বেলা অর্ধেক গড়িয়ে যায়। বাড়ির সবার খাওয়া শেষে উনুন আর রান্নাঘর লেপেমুছে শুরু হয় পারণের রান্না।
বেশী কিছু না, জালি কলাই আর জালি কুমড়ার চাক ভাজি।
ভাজা মাসকলাইয়ের ডাল সেদ্ধ বসিয়ে ঠাকুমা জালি কুমড়োর আগার দিক ডুমো করে নেয় ডালে দেবার জন্য। আর গোড়ার দিক চাক করে কেটে নেয় ভাজার জন্য।
ডাল ফুটে উঠলেই লোহার ডাল ঘুটনি দিয়ে ঘুটে তাতে আরেকটু গরম জল দিয়ে হলুদ লবণ ফেলে দেয় ঠাকুমা। এরপর কয়েকটি বুকচেরা কাঁচামরিচ আর ডুমো জালি কুমড়া ফুটতে থাকা ডালের ভেতর পড়েই হাবুডুবু খায়।
মা'র বেটে রাখা মৌরি কুমড়ো একটু নরম হয়ে এলেই ডালে ফেলে ঠাকুমা।কলাই ডালে সাথে মৌরি বাটার মিলমিশ হতেই অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ রান্নাঘর ছেড়ে উঠোনে মেলে রাখা বাতাসে উড়তে থাকা শুকনো কাপড়গুলোর সাথে ঘুরপাক খেতে শুরু করে।
এরপর জালি কুমড়ো ভালভাবে সেদ্ধ হয়ে গেলে ডালের কড়াই উনুন থেকে নেমে আসে। সে জায়গা দখল করে পেতলের খাবড়ি। উনুনের আঁচে খাবড়ি তেতে উঠলেই তাতে তেল পড়ে। এরপর অপেক্ষা না করেই ঠাকুমা তেজপাতা আর শুকনো মরিচ তেলে দেয়। তেতে ওঠা তেলে শুকনো মরিচ পড়তেই রঙ বদলে ফেলে। এরপর গোটা মৌরি ফোড়ন। ঠাকুমা কড়াইয়ের ডাল ঢেলে দেয় ফোড়নে।
একটা দমকা ধোঁয়া কড়াইয়ের ভেতর থেকে উঠে পালিয়ে যায় রান্নাঘরের জানালা দিয়ে, ফোড়নের সব ঘ্রাণ ডালে মেশার আগেই। এরপর টগবগ করে ফুটতে থাকা জালি কলাইয়ের ডালে ছেঁচে রাখা আদা পড়ে বেশ খানিকটা।
ঠাকুমা অল্প চিনি ছড়িয়ে নামিয়ে নেয় ডালের খাবড়ি।
এরপর জালি কুমড়োর চাক ওঠে উনুনে। আমি ততক্ষণে ইতুদের বাড়িতে খেলতে চলে গেছি।
আমাদের বাড়ির রান্নাঘরের ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দ ইতুদের উঠোন পর্যন্ত আসছে।
আমরা খেলছি পলান টুক টুক। কয়েকবার জেতার পর যেই না ইতু আমাকে প্রথমবারেই খুঁজে পেয়েছে, আমি আঁড়ি দিয়ে চলে এসেছি বাড়ি।
রান্নাঘরের ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দ ততক্ষণে থেমে গিয়েছে।
ঠাকুমা খেতে বসেছে। কাঁসার বগি থাল থেকে ভাত তুলে যখন ঠাকুমা মুখে দেয়, তখন পড়ে যাওয়া বেলার মরা রোদ আমাদের উনুনের পাশে নিভৃতে এসে গা মেলে।
আর আমি ঠাকুমার পাশে বসতেই আছরের নামাজ শেষ করে গোলেনুর উঠোনে দাদী এসে দাঁড়ায়, দোয়া পড়ে আমাকে ফুঁ দেবে বলে।

আমি যে ঘুমের ভেতর সারাদিন যা করি তাই আওড়াই।

স্মৃতি ভদ্র

No comments:

Post a Comment