এটা যদি কোনো ফেসবুক কমেন্ট সেকশনের উত্তেজিত সমর্থকের কথা হতো, হয়তো স্ক্রল করে চলে যেতাম। কিন্তু ছবির বক্তব্য অনুযায়ী কথাটি বলেছেন ১১ দলীয় জোটের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী অলি আহমেদ। অর্থাৎ যিনি নিজেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের প্রার্থী হয়েছেন, তাঁর রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় একটি জোট ক্ষমতায় আসতে পারেনি কারণ সেখানে রেজওয়ানার মতো কিছু “হারাম মেয়ে” ছিল!
বক্তব্যটি এখানে ব্যক্তিগত রুচিহীনতার সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রপতি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যার, তিনি নাগরিককে দেখছেন হালাল-হারামের শ্রেণিবিন্যাসে।
আমি ভাবছি, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যোগ্যতায় কি নতুন কোনো ধারা যুক্ত হয়েছে, যেখানে প্রার্থীকে দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের ঈমান, নামাজ এবং ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতার হিসাব রাখার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে?
একজন নারীকে রাজনৈতিকভাবে অযোগ্য প্রমাণ করতে তাঁর নামের আগে ‘হারাম’ বসাতে হলো কেন? তাঁর বক্তব্য ভুল হলে বক্তব্যের জবাব দিন। তাঁর রাজনীতি ক্ষতিকর হলে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করুন। তাঁর তথ্য মিথ্যা হলে প্রমাণ দিন। কিন্তু একজন নারীকে মোকাবিলা করতে গিয়ে তাঁর ঈমান, নামাজ এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিসত্তার ধর্মীয় বৈধতা নির্ধারণ করতে বসা কোনো রাজনৈতিক argument না, এটা gendered moral policing।
অলির কথা শুনে আমার হাসি আসে নাই, তবে অনেক প্রশ্ন এসেছে মনে…
বাংলাদেশের মুসলমান রাজনীতিবিদদের সবাই কি নামাজি বা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি?
যদি না হন, তাহলে একটি জোটের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুধু রেজওয়ানার নামাজের হিসাবটাই কেন সামনে এলো?
জোটের পুরুষ নেতাদের attendance sheet কোথায়?
কে ফজর বাদ দিয়েছেন, কে এশা পড়েননি, কার ঈমান কতটা বিশুদ্ধ, কার কারণে কত শতাংশ রহমত আটকে গেছে, সেই হিসাবটা কি কেউ নিয়েছিলো?
নাকি পুরুষের নামাজ ব্যক্তিগত, আর নারীর নামাজ political data?
এই selective scrutiny টা বলে দেয়, বিষয়টি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের না, এর সঙ্গে misogyny ও গভীরভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই কৌশল অবশ্য নতুন কিছু না। পুরুষ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে সাধারণত বলা হয় দুর্নীতিবাজ, স্বৈরাচারী, অযোগ্য, দেশবিরোধী। নারী এলেই অভিধান আশ্চর্য দ্রুততায় বদলে যায়: বেহায়া, চরিত্রহীন, নাস্তিক, ধর্মবিরোধী, এবার ‘হারাম’।
পুরুষের পলিটিক্স বিচার হয় তার পলিটিক্স দিয়ে; নারীর পলিটিক্স বিচার করতে তাঁর শরীর, পোশাক, চরিত্র, যৌনতা, ধর্মাচরণ এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাস পর্যন্ত রাজনৈতিক আদালতে হাজির করা হয়। ধর্ম এখানে নারীর ওপর রাজনৈতিক শৃঙ্খলা আরোপের gendered instrument হয়ে উঠছে।
খাবার হারাম হতে পারে, কোনো কাজকে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় হারাম বলা যেতে পারে। কিন্তু একজন জীবিত মানুষকে যখন হারাম মানুষ বানিয়ে দেওয়া হয়, তখন তাঁকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, তাঁর ব্যক্তিসত্তাকে morally contaminated হিসেবে নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে।
প্রথমে নারীটির মতামত আর আলোচনার বিষয় থাকে না; আলোচনার বিষয় হয়ে যায় নারীটি নিজেই। তারপর তাঁর ধর্মীয় বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এরপর তিনি আর সমান মর্যাদার political interlocutor নন। তিনি হয়ে ওঠেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই supposedly একটি রাজনৈতিক জোটকে দূষিত করে।
একজন নারী এতটাই ‘হারাম’, I mean এতো powerfully ‘হারাম’ যে তাঁর পাশে দাঁড়ালে একটি গোটা রাজনৈতিক জোটের ওপর আল্লাহর রহমত নেমে আসার পথও বন্ধ হয়ে যায়!
বাংলাদেশের পুরুষতন্ত্র নারীর ক্ষমতা স্বীকার করতে শেষ পর্যন্ত যে এমন theological generosity দেখাবে, ভাবিনি।
এবং কথাটি যখন রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত একজন ব্যক্তির মুখ থেকে আসে, তখন sexism থেকে বিষয়টি রাষ্ট্রচিন্তার প্রশ্ন হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতি তো কেবল নামাজি মুসলমানের রাষ্ট্রপতি নন। তিনি নামাজি ও বেনামাজি মুসলমানের, হিন্দুর, বৌদ্ধের, খ্রিস্টানের, বিশ্বাসীর, অবিশ্বাসীর, নারী ও পুরুষের রাষ্ট্রপতি। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদের ভাষায় সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান; ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে; ৪১ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতা স্বীকার করে। রাষ্ট্রপতির শপথও কোনো নাগরিকের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের attendance sheet পরীক্ষা করার শপথ না; সংবিধান রক্ষার শপথ।
আর রাজনৈতিক causality হলো: জোট ক্ষমতায় আসেনি কেন? Electoral strategy? সংগঠন? প্রার্থী? জনসমর্থন? রাজনৈতিক বার্তা? ভোটারের সিদ্ধান্ত?
না। রেজওয়ানার মতো “হারাম মেয়ে” ছিল। তাই আল্লাহর রহমত আসেনি।
Political science এর এতদিনের syllabus তাহলে বড়ই অপচয়। Election studies বন্ধ করে একটি নতুন বিভাগ খোলা যায়: Department of Divine Electoral Analytics.
নির্বাচনের আগে তারা coalition audit করবে:
নামাজি সদস্য: ৮৭%
দাড়ির গড় দৈর্ঘ্য: সন্তোষজনক
নারী সদস্যদের halal compliance: যাচাইাধীন
আল্লাহর রহমত পাওয়ার সম্ভাবনা: margin of error ±৩%।
Exit poll ও আর লাগবে না। Ballot counting এর আগে রহমত forecast বেরিয়ে যাবে।
গণতন্ত্রে ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের ভোট এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া থেকে; কোনো রাজনৈতিক নেতার দেওয়া ধর্মীয় সার্টিফিকেট থেকে নয়।
বাংলাদেশের একজন নাগরিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারেন, অনিয়মিত পড়তে পারেন, এক ওয়াক্তও না পড়তে পারেন, অন্য ধর্মের হতে পারেন কিংবা কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসই না রাখতে পারেন। এসবের কোনোটিই তাঁর নাগরিকত্ব, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ কিংবা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার বাতিল করে না।
আর এই বক্তব্যের শ্রোতা কারা, সেটিও দেখার বিষয়। রাজনৈতিক rhetoric কখনো vacuum এ তৈরি হয় না; বক্তা জানেন কোন শব্দে তাঁর audience সাড়া দেবে। যদি এমন শ্রোতার সামনে ‘হারাম মেয়ে’, ‘নামাজ পড়ে না’, ‘আল্লাহ রাসুলে বিশ্বাস করে না’ বলা রাজনৈতিক applause তৈরি করে, তাহলে সমস্যাটি একজন বক্তার চেয়েও বড়।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে ওয়াজ গুলোতে নারীর পোশাক, পর্দা, চরিত্র, চলাফেরা, যৌনতা, স্বামী মানা না মানা, ‘ভালো নারী’ বনাম ‘খারাপ নারী’, এসব দিয়েই নৈতিকতার বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে, বিপুল moral discourse তৈরি হয়েছে।
অবশ্যই সব ওয়াজ বা সব বক্তাকে এক কাতারে ফেলা যায় না। কিন্তু যে রাজনৈতিক ভাষা নারীকে প্রথমে মানুষ বা নাগরিক না দেখে তার ধর্মীয় ও যৌন নৈতিকতা দিয়ে মাপে, সেটা সেই পরিচিত moral vocabulary ই রাজনীতিতে আমদানি করছে।
ফলে ব্যাপারটা দাঁড়ায়, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হচ্ছে, অথচ political programme এর বদলে চলছে ঈমান পরীক্ষা; electoral analysis এর বদলে ওয়াজের vocabulary; আর একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীর নামাজের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে একটি জোটের রাজনৈতিক ভাগ্য।
ওয়াজের মঞ্চের জেন্ডার পলিটিক্স যদি সরাসরি রাষ্ট্রচিন্তার ভাষায় ঢুকে পড়ে, তখন বিষয়টি আর হাসির থাকে না।
রাজনৈতিক নাগরিকত্বের দরজায় একবার ধর্মীয় শুদ্ধতার স্ক্যানার বসিয়ে দিলে প্রশ্ন হয়, স্ক্যানার এর কন্ট্রোল কার হাতে?
আর এই জায়গায় ১১ দলীয় জোটের রাজনৈতিক দায় আছে। একজন ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে কী বিশ্বাস করেন, সেটি তাঁর ব্যাপার। কিন্তু ১১টি রাজনৈতিক দল যখন তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের প্রার্থী হিসেবে সামনে আনে, তখন তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর শুধু তাঁর একার না।
একারণে আমি সেই ১১ দলের কাছেও জানতে চাই: আপনাদের কাছেও কি বাংলাদেশের নারী নাগরিক ‘হালাল’ ও ‘হারাম’ দুই শ্রেণির? একজন নারী নামাজ না পড়লে তাঁর political legitimacy কমে যায়? যদি না যায়, তাহলে আপনাদের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর এই ভাষার সঙ্গে আপনাদের রাজনৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক কী?
আর ধর্মের দিক থেকেও ব্যাপারটা কম অদ্ভুত নয়। আল্লাহ কাকে রহমত দেবেন, কার ইবাদত গ্রহণ করবেন, কার ঈমান কতটুকু, সেই metaphysical authority ও যদি নির্বাচনী মঞ্চের রাজনীতিবিদ নিজের হাতে তুলে নেন, তাহলে আল্লাহর এখতিয়ারের একটা অংশও মনে হচ্ছে political decentralisation এর আওতায় চলে এসেছে!
আল্লাহর রহমতের বণ্টন অন্তত আল্লাহর কাছেই থাকুক। রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীরা একটু ছোট দায়িত্ব দিয়ে শুরু করুন: বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের মানুষকে সমান নাগরিক হিসেবে দেখা।
বাংলাদেশের মানুষের কপাল ভালো, এই ধরনের রাষ্ট্রচিন্তাকে বঙ্গভবনে পাঠানো হয়নি; এই ‘ওয়াজি রাষ্ট্রপতি’র হাত থেকে বঙ্গভবন অন্তত বেঁচে গেছে। নইলে এই political methodology দেখে মোটেও অবাক হতাম না, যদি কয়েক দিনের মধ্যেই বঙ্গভবনে নতুন একটি শাখা খুলে বসত, “নাগরিক ঈমান, নামাজ ও রহমত যাচাই অধিদপ্তর।”
রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে মাইক টেস্ট হতো:
হ্যালো, হ্যালো, পেছনে আওয়াজ যায়? বোনেরা পর্দা ঠিক করেন। এবার জাতীয় নীতি নিয়ে আলোচনা শুরু করছি…
যে ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একজন নারীকে বিচার করতে তাঁর যুক্তি নয়, তাঁর নামাজ ও ঈমানকে মাপকাঠি করেন, তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন বিশ্বাস, ভিন্ন জীবনযাপন এবং ভিন্ন ধর্মাচরণের কোটি কোটি নাগরিককে কোন চোখে দেখতেন?
যে ১১টি দল তাঁকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্য মনে করেছিল, তারা সেই নাগরিকদের কোন চোখে দেখে?
Lubna Tureen
No comments:
Post a Comment