"আপনাকে সোজা হয়ে বসতে হবে ,ম্যাডাম।"
আমার এরাবিয়ান ডাক্তার, অনেকটা ধমকের সুরেই বললেন কথাটা। বারবার একই কথা বলে তিনি সম্ভবত বিরক্ত হয়ে গেছেন।
আমি আমার সাধ্যমত সোজা হয়ে বসতে চেষ্টা করলাম।
ডাক্তারকে এবার একটু হতাশ মনে হলো ।গম্ভীর গলায় বললেন,
__আপনি আমার দিকে তাকান।
দেখলাম ডাক্তার একেবারে সিনা টান করে বসেছেন।এরপর তিনি আমাকে দাঁড়িয়ে দেখালেন। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকবার দেখিয়েছিলেন, কিভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে, কিভাবে সোজা হয়ে বসতে হবে।
একটা ছোট্ট দূর্ঘটনায়,এই বেয়াল্লিশ বছর বয়সে এসে আমার মেরুদন্ডের হাড়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে। খুব কষ্ট পাচ্ছি।এই বিদেশের বাড়িতে ভাঙা মেরুদন্ড নিয়ে চাকরি এবং সংসার সামলানো বেশ কঠিন।পুরো পরিবারসমেত চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলাম।
আপাততঃ এই ডাক্তার ভদ্রলোকের চিকিৎসা নিচ্ছি ।
ডাক্তারের বিরক্ত চেহারা দেখে, আমার হাসবেন্ডও আমার উপর রেগে গেলো ।
একটু আগে এক্স-রে রুমে, কমপক্ষে দশবার রেডিওলজিস্ট আমার দাঁড়ানোর পজিশন ঠিক করে দিয়েছিল। তবু তাদের মনমতো দাঁড়াতে পারিনি । পরবর্তীতে সিটি স্ক্যান করিয়েছে, সঠিক চিত্রের জন্য।
ডাক্তার, রেডিওলজিস্ট এবং হাজবেন্ডের ধমক খেয়ে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছিল।
সত্যি বলতে আমি নিজেও জানতাম না যে,আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে বা বসতে পারি না। এই এতো বছরে, কেউ সেকথা আমাকে বলেনি তো।
হসপিটাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে, গাড়িতে আমার হাসবেন্ড আমার সঙ্গে ইচ্ছামত চোটপাট করল। সে মানতেই পারছে না যে,আমার মত বয়সের মহিলাকে বসা এবং দাঁড়ানো শেখানোর জন্য এত কষ্ট করতে হবে।
চোটপাট অবশ্য এক সপ্তাহ ধরেই চলছে।
সেই বেচারার দোষ নেই। যে কোন মূল্যে আমাকে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই হবে।তা না হলে, আমার মেরুদন্ডের ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগবেনা।
ডাক্তারের পরামর্শে, দুটো লম্বা ধাতব পাত বেল্টের মাধ্যমে আমার মেরুদণ্ডে বেঁধে দেওয়া হল। যেন চাইলেই আমি ঝুঁকে যেতে না পারি।
এই বেল্ট বাধার পর, নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হয়েছি বহুবার।
না বেল্টের জন্য লজ্জিত হইনি।
লজ্জিত হয়েছি নিজের ঝুকে যাওয়া নিয়ে। সারাদিনে কয়েক শতবার, এই ধাতব পাতগুলো আমাকে জানান দেয়, আমি ঝুঁকে দাঁড়াচ্ছি বা ঝুঁকে বসছি।
নিজের বহু বছরের অভ্যাসবশত যখনই ঝুঁকে যাচ্ছি, ধাতব পাতগুলো আমাকে বাঁধা দিচ্ছে।
বিষয়টি আমাকে বেশ নাড়া দেয়।
আমি তখন সদ্য বয়সন্ধিতে পা দিয়েছিলাম।সোজা হয়েই দাঁড়াতাম তখন ।প্রতিবেশী এক খালাম্মা চোখ বড় বড় করে আমাকে বলেছিলেন,
__ এত সোজা হয়ে দাঁড়াস কেন তুই? এভাবে ছেলেরা দাঁড়ায়। মেয়েদের কখনো এভাবে দাঁড়াতে হয় না ।এতে করে মেয়েদের মধ্যে পুরুষালি ভাব চলে আসে। দেখতে চোখে লাগে তখন।
খালাম্মা আরো বলেছিলেন,
__ শোন, তুই কত লক্ষ্মী মেয়ে না? লক্ষীমন্ত মেয়েরা এতো সোজা হয়ে দাঁড়ায় না। লক্ষ্মী মেয়েদেরকে একটু ঝুঁকে দাঁড়াতে হয়। নত হয়ে থাকতে হয়।তাহলে ভালো পরিবারে বিয়ে হয়।
বেশ দ্বিধায় পড়ে গেছিলাম সেসময় ।কিন্তু ভালো মেয়ে হবার লোভ সামলানো, ওই বয়সী আমার জন্য খুব একটা সহজ ছিল না।
তাছাড়াও যতদূর মনে পড়ে, সোজা হয়ে দাঁড়ানো নিয়ে বেশ কবার বকা শুনেছিলাম সেসময়।একবার এই বদঅভ্যাস হয়ে গেলে পরে আর ঠিক হয় না তো , তাই সবাই মিলে আমাকে ঝুঁকে যাওয়া শিখিয়েছিল।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমাদের প্রতিবেশী এক কলেজ শিক্ষিকাকে নিয়ে খালাম্মারা বেশ সমালোচনা করতেন ।উনি ছিলেন সরকারি কলেজের শিক্ষক, মাথা উঁচু করে সোজা হয়ে হাঁটতেন সবসময় ।ঠিক যেভাবে আমার ডাক্তার দেখিয়েছেন।
কি ভালো লাগতো আমার!
কিন্তু আশেপাশের বাকি খালাম্মারা একজোট হয়ে বলতেন,
__ কি দেমাগ চয়ন ম্যাডামের, বাপ রে! হাঁটার সময় ভুলে যায় সে পুরুষ না মহিলা। দেখতেও এক্কেবারে পুরুষের মত লাগে।খালি লেখাপড়া শিখেছে, আদব কায়দা শিখে নাই।
চয়ন ম্যাডামের জন্য খুব কষ্ট হতো আমার।
পাড়া-প্রতিবেশী বয়োজ্যেষ্ঠ খালাম্মাদের কাছেই শুনেছি, তারা তাদের নিজের ছেলে বা নিজের ভাই অথবা নিজের আত্মীয় স্বজনের জন্য মেয়ে খুঁজতে গেলে, কেমন লক্ষীমন্ত মেয়ে খোঁজেন।
তারা অনেক মেয়েকে বিয়ের পাত্রী হিসেবে বাতিল করে দিয়েছেন, শুধুমাত্র টানটান করে দাঁড়ানোর অপরাধে।
কলেজে ,বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও খুব একটা আলাদা নয়। ভালো মেয়েদের খাতায় যাদের নাম ছিল, তারা মেরুদন্ড সোজা করে হাঁটা মেয়েদেরকে নিয়ে আড়ালে টিপ্পনি কাটতো, হাসাহাসি করতো।
আবার ছেলে বন্ধুদের দেখতাম, নত হয়ে লাজুক ভঙ্গিতে চলা মেয়েদের প্রতি একটু বেশি আকর্ষণ অনুভব করতো।
এইসব দেখতে দেখতে, আমার সোজা মেরুদন্ড কবে কখন স্হায়ীভাবে ঝুঁকে গেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।
টানা একমাস ধাতব পাতের মধ্যে নিজের মেরুদন্ড বাঁধা থাকার পর, ডাক্তার আমাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করার পরামর্শ দিল।
তবে মজার বিষয় হলো, ধাতবপাত খুলে ফেলার পর, আমি আবারো ঝুঁকে দাঁড়াতে শুরু করি। এতবছরের অভ্যাস, একমাসে বদলানো আমার জন্য সহজ ছিল না।
অতঃপর, আমার মেরুদন্ড আরো তিনমাসের জন্য ধাতব পাতের মধ্যে আটকে দেয়া হলো। এছাড়া আর কোন পথ নেই । ঝুঁকে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমার সম্পূর্ণ মেরুদন্ডর গঠনই বদলে গেছে।
কেন জানি আমার তখন মনে হলো ,বাংলাদেশের শতকরা নব্বইভাগ মেয়ের মেরুদন্ডের চিত্র আমার মতই হবে।
যখনই আমরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম, কারো না কারো সদুপদেশ গ্রহণ করে ঝুঁকে গেছি। ভালো মেয়ে হবার লোভ আমাদের সবার আছে।
আজকাল একটু ঝুঁকলেই ,নিজে থেকে বুঝতে পারি।
এখন আমার সব দ্বিধা কেটে গেছে। ভালো মেয়ে হবার লোভটাও নেই। তাই, সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছি আজকাল।
ভাবতে দারুণ লাগে,
মেরুদন্ড ভেঙে, অবশেষে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিখেছি আমি ।
রুচিরা সুলতানা
No comments:
Post a Comment