জাপানের এক ম্যাচমেকিং পরামর্শদাতা কিকুনো সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা নিয়ে লিখেছেন।
গল্পের নায়িকা মিনামি, বয়স ২৯।
পেশায় আইটি কর্মী।
ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে তার পরিচয় হয় ৩১ বছর বয়সী এক পুরুষের সঙ্গে।
দেখতে ভালো, চাকরি ভালো, বছরে আয় প্রায় ৮ মিলিয়ন ইয়েন। কাগজে-কলমে যাকে বলে একেবারে “পারফেক্ট প্রোফাইল”।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।
প্রতিবার দেখা হলেই মিনামির নাকে লাগত একটা টক ধরনের ভেজা কাপড়ের গন্ধ।
জাপানিতে এ ধরনের গন্ধকে বলা হয় 生乾き臭(なまがわきしゅう / নামাগাওয়াকি-শু)।
কাপড় ঠিকমতো না শুকালে বা ভেজা অবস্থায় দীর্ঘ সময় থাকলে যে বিশেষ গন্ধ তৈরি হয়।
প্রথমবার মিনামি বিষয়টা এড়িয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বারও ভেবেছিলেন হয়তো কাকতালীয়। কিন্তু বারবার একই গন্ধ পাওয়ার পর তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়,এটা কি শুধু একটা কাপড়ের সমস্যা, নাকি ওই ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনযাপনেরই একটা অংশ?
শেষ পর্যন্ত মিনামি সম্পর্কটা আর এগোতে দেননি।
এটা অহংকার নয়। বরং এক ধরনের বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত।
কারণ পরিচ্ছন্নতা, কাপড় ধোয়ার অভ্যাস, ঘর গুছিয়ে রাখা কিংবা নিজের শরীর ও আশপাশের গন্ধ নিয়ে সচেতনতা এসব অভ্যাস একদিনে তৈরি হয় না।
শৈশব থেকে বছরের পর বছর ধরে একজন মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে এগুলো গড়ে ওঠে। তাই “বিয়ের পর বুঝিয়ে ঠিক করে ফেলব” বাস্তবে বিষয়টা এত সহজ নয়।
আজ যে গন্ধ আপনার কাছে সামান্য বিরক্তিকর লাগছে, একসঙ্গে থাকার পর সেটাই প্রতিদিনের অস্বস্তির কারণ হতে পারে। আজ যে অগোছালো জীবনকে আপনি উপেক্ষা করছেন, বিয়ের পর সেটাই প্রতিদিনের ঝগড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
জাপানে আবার গন্ধের ব্যাপারটা বেশ সংবেদনশীল।
এখানে 香害(こうがい / কোগাই) নামে একটি শব্দও প্রচলিত হয়েছে।
অতিরিক্ত পারফিউম, সুগন্ধি ফ্যাব্রিক সফটনার কিংবা অন্য কোনো তীব্র কৃত্রিম ঘ্রাণ যখন আশপাশের মানুষের অস্বস্তির কারণ হয়, তখন সেটাকে বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
অর্থাৎ জাপানে শুধু দুর্গন্ধ নয়, অতিরিক্ত সুগন্ধও সমস্যা হতে পারে।
ট্রেন, বাস, অফিস বা লিফটের মতো জায়গায় মানুষ খুব কাছাকাছি থাকে। সেখানে ঘামের তীব্র গন্ধ, অতিরিক্ত পারফিউম কিংবা কাপড়ে লেগে থাকা শক্তিশালী খাবারের গন্ধ অন্য মানুষের অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
অনেক বিদেশিই আবার বলেন, ট্রেন বা বাসে মাঝেমধ্যে তাদের পাশের সিট ফাঁকা থেকে যায়। এটাকে সরাসরি “জাপানিরা বিদেশিদের পাশে বসতে চায় না” বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে strong perfume, body odor কিংবা curry ও মসলাযুক্ত খাবারের গন্ধ কাপড়ে লেগে থাকা কিছু ক্ষেত্রে মানুষ দূরে বসতে চাওয়ার একটি কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার রান্নায় মসলা, রসুন, পেঁয়াজ, কারি,এসবের ঘ্রাণ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
আমাদের কাছে যে গন্ধ একেবারে স্বাভাবিক, জাপানের তুলনামূলক scent-sensitive পরিবেশে সেটা অন্য কারও কাছে অনেক বেশি তীব্র মনে হতে পারে।
আবার অনেকেই ভাবেন বেশি পারফিউম দিলে আরও পরিষ্কার বা স্মার্ট লাগবে। জাপানে ব্যাপারটা উল্টোও হতে পারে। এমন জায়গায় এমন পরিমাণ পারফিউম ব্যবহার করা হলো যে পাশের মানুষের মাথা ধরছে,সেটাকে কেউ ভালো ম্যানার বলবে না।
কিকুনোর গল্পটার মূল কথাও এখানেই।
প্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাকরি, বেতন, চেহারা কিংবা রিজিউম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে আরও সাধারণ কিছু বিষয় শেষ পর্যন্ত অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়।
একজন মানুষ বছরে ৮০ লক্ষ ইয়েন আয় করতে পারেন। সেই টাকা আপনাকে ভালো বাড়ি, ভালো গাড়ি কিংবা আরামদায়ক জীবন দিতে পারে।
কিন্তু তার সঙ্গে একই ঘরে প্রতিদিন স্বস্তিতে থাকা যাবে কি না,সেটা তার বেতন ঠিক করে না। তার অভ্যাস ঠিক করে।
জাপানে বসবাস করলে বিষয়টা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
পরিষ্কার কাপড় পরা, নিয়মিত গোসল করা, নিজের ঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, অন্য মানুষের অসুবিধা হতে পারে এমন গন্ধ সম্পর্কে সচেতন থাকা,এসবকে এখানে খুব বড় কোনো বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে দেখা হয় না।
এগুলো অনেকের কাছেই ন্যূনতম সামাজিক ম্যানার।
তাই কেউ প্রথমে আপনার চাকরি দেখে মুগ্ধ হতে পারেন। আপনার বেতন শুনে impressed হতে পারেন। আপনার ডিগ্রি কিংবা চেহারাও পছন্দ হতে পারে।
কিন্তু আপনার সঙ্গে জীবন কাটাবেন কি না,সেই সিদ্ধান্তটা হয়তো নেবেন আরও ছোট ছোট কিছু বিষয় দেখে।
আপনি কীভাবে থাকেন, নিজের যত্ন কীভাবে নেন, ঘর কেমন রাখেন, কাপড় কতটা পরিষ্কার রাখেন এবং নিজের কারণে পাশের মানুষটি অস্বস্তিতে পড়ছে কি না,এসব দেখে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই ৮০ লক্ষ ইয়েনের থেকেও বড়।
Sahin No Sekai

No comments:
Post a Comment