রাঢ় বাংলার মানভূম থেকে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, ছত্তিশগড়, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, অসম, বাংলাদেশ — বিভিন্ন অঞ্চলে আজ করমের আচার পালিত হচ্ছে। কোথাও রূপ বদলেছে, কোথাও গান বদলেছে, কোথাও কাহিনি বদলেছে। কিন্তু করমের কেন্দ্রে অপরিবর্তিত থেকে গেছে কয়েকটা জিনিস: বৃক্ষ, বীজ, অঙ্কুর, মাটি, জল, গান, আর মানুষের ভবিষ্যৎ।
দশ বছর ধরে করম দেখছি। যত দেখেছি, ততই মনে হয়েছে করম পরবকে "ফসলের উৎসব" বললে তার গভীরতাটা ধরা পড়ে না।
এই উপলব্ধিটা প্রথম হয়েছিল 'পান্তা ভাতে পান্না' দেখতে দেখতে।
একটা ছোট ঘরের মাটির মেঝে। দেওয়ালে আলপনা দেওয়া হয়েছে। সামনে ধানের চারা। তার সামনে বসে কয়েকজন ব্রতপালনকারী। সামনে পান্তা ভাত, শাক। নুন নেই। তারা ধানের চারাটার সামনে বসে খাচ্ছেন। খাওয়া শেষ হলে চারাটাকে আবার জমিতে ফিরিয়ে রেখে আসা হল।
ছবিটা যখন তুলেছিলাম, এত কথা হয়তো মাথায় ছিল না। আজ ফিরে তাকালে দৃশ্যটা অন্যরকম লাগে।
আমি কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই ধানের চারার সামনে বসে মানুষকে পান্তা ভাত খেতে দেখার মধ্যে একটা অদ্ভুত আবেগ কাজ করে। মানুষ যেন খাদ্যের উৎসের সামনে বসে খাদ্য গ্রহণ করছে। যে গাছ তাকে অন্ন দেবে, তার সামনে বসেই সে নিজের অন্ন খাচ্ছে। তারপর সেই চারাটাকেই আবার মাটিতে ফিরিয়ে দিচ্ছে।
এ যেন কৃষির কাছে একটা নীরব ঋণস্বীকার।
করমের আগে কয়েকদিন ধরে জাওয়া তৈরি হয়। অঞ্চলভেদে বীজের সংখ্যা বদলায় — কোথাও পাঁচ রকম, কোথাও সাত বা নয় রকম বীজ। বাঁশের পাত্রে বালির সঙ্গে বীজ বোনা হয়, হলুদ-জল আর তেল দেওয়া হয়, তারপর কয়েকদিন ধরে অঙ্কুরের যত্ন নেওয়া হয়।
আমরা সাধারণত ritual আর কৃষিকে আলাদা করে দেখি — একদিকে কৃষি, বাস্তব কাজ; অন্যদিকে পূজা, বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু জাওয়ার মধ্যে এই দুটোকে আলাদা করা কঠিন। বীজ বাছাই হচ্ছে। মাটিতে রাখা হচ্ছে। জল দেওয়া হচ্ছে। অপেক্ষা করা হচ্ছে। অঙ্কুর দেখা হচ্ছে। তারপর সেই অঙ্কুরকে ঘিরে গান হচ্ছে।
বীজের ভিতরে জীবন আছে এই সাধারণ অথচ বিস্ময়কর সত্যটা কৃষক প্রতিমুহূর্তে জানেন। 'আচরণীয় কৃত্য' সেই জ্ঞানকে শুধু ব্যবহারিক রাখে না, তাকে অর্থ দেয়। বীজকে অঙ্কুরিত করা তখন হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎকে চোখের সামনে আনা। আজ যে বীজ, কয়েকদিন পরে সে সবুজ। আজ যে সবুজ, কাল সে ফসল। ফসল থেকে অন্ন। অন্ন থেকে শরীর। শরীর থেকে সন্তান। সন্তান থেকে সমাজ।
জাওয়া-উৎসবকে অবিবাহিত তরুণীদের ভবিষ্যৎ মাতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। সেখানে গান ও শরীরী অনুশীলনের মাধ্যমে প্রজন্মান্তরে মাতৃত্বের জ্ঞান সঞ্চারের কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ অঙ্কুর এখানে শুধু ফসলের প্রতিরূপ নয়। উদ্ভিদের জন্ম এবং মানুষের জন্ম একই প্রতীকী ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।
বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।
মেয়ে ভবিষ্যতে মা হবে।
জমি ফসল ধারণ করবে।
ঘর সন্তান ধারণ করবে।
প্রকৃতি উৎপাদন করবে।
মানুষও উৎপাদন করবে।
এই কারণেই করমকে শুধু “fertility festival” বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনই শুধু “agricultural festival” বলাও অসম্পূর্ণ।
এটা উর্বরতার সংক্রান্ত বিশ্বাস ও আচারের বহুস্তরীয় কল্পনা।
তাই করমের জাওয়া শুধু চারা নয়। সে ভবিষ্যতের একটা ছোট্ট দৃশ্য।
করম নিয়ে প্রচলিত একটা লোককাহিনি আছে।
আঁটকুড়া এক রাজা। সন্তানহীন। খাদ্যের সন্ধানে বেরিয়ে প্রখর রোদে করমের একটা ডাল ভাঙলেন। সেই ডালে ছিল ভ্রমর ও ভ্রমরি। তারা মগ্ন ছিল সৃষ্টি-রহস্যে। ডাল ভাঙায় মিলনে বাধা পড়ল। রুষ্ট হয়ে তারা অভিশাপ দিল — তোর কখনও সন্তান হবে না। পরে তারাই উপায় বলে দিয় — ভাঙা ডাল ঘরে নিয়ে গিয়ে ভক্তি সহকারে পূজা করো। রাজা করম পূজা উদযাপন করে সন্তান লাভ করলেন। জন্ম নিল করমু আর ধরমু।
এখানে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হল—করমের সৃষ্টি-কাহিনির ভিতরেই যৌনতা ও প্রজনন উপস্থিত। ভ্রমর-ভ্রমরির মৈথুন এখানে অশ্লীল বা হাস্যরসাত্মক দৃশ্য নয়। এখানে সেই দৃশ্য “সৃষ্টি রহস্য”-এর প্রতীক। একদিকে ভ্রমর-ভ্রমরি নিজেদের সন্তান সৃষ্টির কাজে ব্যস্ত। অন্যদিকে রাজা সন্তানহীন। আর করমের ডাল ভেঙে যাওয়ার পর সেই করমই হয়ে উঠছে সন্তানলাভের মাধ্যম। প্রকৃতির reproductive cycle এবং মানুষের reproductive desire একই কাহিনির মধ্যে এসে গেছে।
"করম ডাল কাইটতে গেলি করম ছলমল রাজার বেটা বাহিরাঁঞছে টাঙ্গি ঝলমল…"
করমু আর ধরমু বড় হয়। একদিন করমের আচার পালনের সময় করমু ভুল করে। বাসি ভাতের বদলে গরম ভাতে পান্না করে। করমের গায়ে ফোস্কা পড়ে। তারপর থেকে করমুর ভাগ্য খারাপ হতে থাকে। রাগ করে সে করমের ডাল উপড়ে ফেলে দেয়। তারপর শুরু হয় তার অনুসন্ধান, তার যাত্রা — পথে নানা মানুষের সঙ্গে দেখা,
আর প্রতিটি ঘটনা থেকে সে কিছু শিখে ফিরে আসে। এখানে করম হঠাৎ fertility cult-এর সীমানা ছাড়িয়ে নৈতিকতার কাহিনি হয়ে ওঠে।
করমু ভুল করে।
ভুলের ফল ভোগ করে।
নিজের ভুলের মুখোমুখি হয়।
করমকে ফিরিয়ে আনে।
অর্থাৎ করমের কাঠামোটি হতে পারে: ভুল → বিপর্যয় → উপলব্ধি → যাত্রা → শিক্ষা → পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
করমের কাহিনি তাই একটি moral ecology তৈরি করে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করলে যেমন ফল ভোগ করতে হয়, তেমনি সামাজিক ও নৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করলেও তার ভোগান্তি আছে। একটা গাছের পূজা থেকে একটা সমাজ তার শিশুদের এই কথাগুলোই শেখায়।
করমের শেষ দিনের আচার — পান্তা ভাতে পান্না। লেখায় ব্যবহৃত ছবিতে দেখুন: জমি থেকে ধানের চারা তুলে আনা হয়েছে। তার সামনে বসে ব্রতপালনকারী নুন ছাড়া বাসি ভাত খাচ্ছেন। তারপর চারাটাকে আবার জমির নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
এই দৃশ্যটা দেখলেই আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কৃষক যখন চাষাবাদ করেন — তখন মাঠে বসেই খেতে হয়। মাঠ থেকে বাড়িতে ফিরে খাওয়া-দাওয়া করে আবার মাঠে পরিশ্রম করতে যাওয়া সম্ভব হয় না। আমার বাবা-কাকারা যখন মাঠে কাজ করতেন, আমি নিজেও খাবার নিয়ে গেছি। কাজ থামিয়ে মানুষ মাঠেই বসে খাওয়া-দাওয়া করেছেন, তারপর আবার কাজে ফিরেছেন।
এটা নিছক দরকারের কথা — বাস্তব প্রয়োজনের কথা। কিন্তু এই একই জিনিস যখন রিচুয়ালের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তখন তার একটা আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়ে যায়। মাঠে বসে খাওয়াটা যেখানে ছিল শ্রমের প্রয়োজন, সেখানে ধানের চারার সামনে বসে খাওয়াটা হয়ে ওঠে 'বিশেষ অর্থের' প্রয়োজন। শরীর যেটা রোজ করে বেঁচে থাকার জন্য, করম পরব সেটাকেই নিয়ে যায় স্মরণের জায়গায়।
এই দৃশ্যটা যেন একটা গোটা কৃষিচক্রকে কয়েক মিনিটে অভিনয় করে দেখায় — মাটি থেকে ধান, ধান থেকে অন্ন, অন্ন থেকে মানুষ, মানুষ থেকে পশু ও ঘর, আর ঘর থেকে আবার মাটি। এখানে খাদ্য বাজারের জিনিস নয়। খাদ্যের উৎসকে চোখের সামনে আনা হয়েছে। মানুষ সেই উৎসের সামনে বসে খাচ্ছে, তারপর তাকে আবার তার জায়গায় ফিরিয়ে দিচ্ছে। যেন বলা হচ্ছে — তুমি আমাকে খাওয়াও, আমি তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি।
পান্তা হল আগের দিনের রান্না করা ভাতের জলভেজা রূপ। মাঠে যাওয়া কৃষকের চেনা খাদ্য। শ্রমজীবী জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সহজ খাবার। যে অন্ন যোগাচ্ছে, তার সামনে বসেই সেই খাদ্য গ্রহণ করা। অন্ন আকাশ থেকে আসে না — তার একটা বীজ আছে, মাটি আছে, জল আছে, কৃষক আছে, শ্রম আছে। তারপর তার শরীর আমাদের শরীর হয়।
করম পরব যখন বারবার দেখেছি মনে হয়েছে করমের জওয়া কি seed-bed বা nursery-র কৃষিজ্ঞানকে ritual-এর মধ্যে ধরে রেখেছে? কারণ কৃষির ইতিহাসে একটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হল—বীজ সরাসরি মূল জমিতে না ফেলে আগে একটি ছোট জায়গায় বীজ অঙ্কুরিত করা, চারা তৈরি করা, তারপর সেই চারা মূল জমিতে বসানো। ধানচাষে এই nursery থেকে transplanting পদ্ধতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও দেখতে দেখতে মনে হয়েছে প্রশ্নটা আরও বড় হওয়া দরকার: করম কি কৃষিকাজকে শুধু প্রযুক্তি হিসেবে নয়, একটি নৈতিক সম্পর্ক হিসেবে দেখতে শেখায়?
ক্যামেরা হাতে এই দৃশ্যের পাশে দাঁড়িয়ে মনে একটা বীজমন্ত্র তৈরি হয়েছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে — হে বৃক্ষ, হে প্রথম অঙ্কুর, তুমি আছ তাই ক্ষুধার নিবৃত্তি হচ্ছে। তোমার ক্ষমতা আমাদের ভিতর প্রবাহিত হোক।
আমরা সাধারণত ভাবি, মানুষ গাছের পূজা করে তার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার জন্য যথা ফসল, সন্তান, সুখ, সমৃদ্ধি। কিন্তু উলটো দিক থেকেও দেখা যায়। মানুষ এখানে প্রথমে গ্রহণকারী। তারপর সে স্বীকার করে — যা গ্রহণ করছে, তার একটা উৎস আছে।
একটা লোকবিশ্বাস আছে — হড় সমাজের সৃষ্টি-রহস্য করম বৃক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে। প্রথমে করম বৃক্ষের সৃষ্টি, তারপর তার শিকড়ে হড়ের (মানুষের) জন্ম। বৃক্ষের শিকড়ে যদি মানুষের জন্ম হয়, তাহলে বৃক্ষ আর বাইরের প্রকৃতি থাকে না — সে পূর্বপুরুষ, সে জন্মের স্মৃতি, সে সমাজের শিকড়। আর জাওয়া সেই বিশাল বৃক্ষের ছোট্ট, অস্থায়ী সংস্করণ।
আজ করমকে দেখলে মনে হয়, কৃষি মানুষকে কী শিখিয়েছিল? অপেক্ষা করতে শিখিয়েছিল। বীজ পুঁতে সঙ্গে সঙ্গে ফসল পাওয়া যায় না। যত্ন করতে শিখিয়েছিল। অনিশ্চয়তা মেনে নিতে শিখিয়েছিল। সব বীজ অঙ্কুরিত হয় না। শ্রমের মর্যাদা শিখিয়েছিল। প্রত্যাবর্তন শিখিয়েছিল। মাটি থেকে যা আসে, শেষে মাটিতেই ফিরে যায়। আর হয়তো ঋণ স্বীকার করতে শিখিয়েছিল, কারণ মানুষ একা বাঁচে না।
গাছ তাকে খাওয়ায়। গাছ তাকে ছায়া দেয়। পশু কৃষিকাজে সাহায্য করে। মাটি তাকে ধারণ করে। জল তাকে বাঁচায়। এই সম্পর্কের ভিতর দাঁড়িয়ে করমতিরা যেন বলে — আমি একা নই। আমার অন্নের ভিতর অন্য জীবনের শ্রম আছে। আমার শরীরের ভিতর মাটির খাদ্য আছে। আমার সন্তানের ভিতর ভবিষ্যৎ আছে।
আর হয়তো সেই জন্যই করমের শেষ দিনে ধানের চারার সামনে বসে মানুষ পান্তা ভাত খায়, তারপর চারাটাকে আবার জমিতে ফিরিয়ে দেয় — ঠিক যেমন মাঠের কৃষক মাঠেই বসে খেয়ে আবার মাঠে ফেরেন। শুধু এখানে শ্রম নয়, স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা কাজ করে।
সুব্রত ঘোষ