এক প্রাচীন ঋষিকে জিজ্ঞাসা করিলাম, "হে মহাজ্ঞানী, মানুষ এত অশান্ত কেন? পৃথিবীতে তো নদী আছে, বন আছে, আকাশ আছে, নক্ষত্র আছে—তবুও মানুষের হৃদয়ে শান্তি নাই কেন?"
ঋষি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকিলেন।
তিনি একটি শুকনো পাতাকে হাতে তুলিয়া বাতাসে ছেড়ে দিলেন। পাতাটি বাতাসের ইচ্ছায় ভাসিতে লাগিল। তখন তিনি কহিলেন,
"এই পাতাটিকে দেখো। ইহার কোনো অভিযোগ নাই, কোনো অহংকার নাই। সে জানে—যাহা আসিয়াছে,
একদিন তাহা চলিয়াও যাইবে। কিন্তু মানুষ ক্ষণস্থায়ী জিনিসকে চিরস্থায়ী ভাবিয়া আঁকড়াইয়া ধরে। সেখানেই দুঃখের জন্ম।"
আমি বলিলাম, "তবে ধ্যান কী?"
ঋষি কহিলেন, "ধ্যান মানে পাহাড়ে গিয়া বসা নয়, চোখ বন্ধ করাও নয়।
ধ্যান হইল নিজের ভিতরের শব্দকে নীরব করিবার বিদ্যা। যে মানুষ নিজের লোভকে দেখিতে পারে, নিজের ক্রোধকে চিনিতে পারে, নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করিতে পারে—সে-ই ধ্যানের প্রথম দ্বারে পৌঁছায়।"
তিনি নদীর দিকে আঙুল তুলিয়া বলিলেন, "নদী কখনো নিজের জন্য বয়ে যায় না, বৃক্ষ নিজের জন্য ফল ধরে না, সূর্য নিজের জন্য আলো দেয় না।
প্রকৃতি জানে—অস্তিত্বের অর্থ গ্রহণে নয়, দানে। কেবল মানুষই সংগ্রহ করিতে করিতে ভুলিয়া যায়, একদিন তাহার দুই হাতই শূন্য হইয়া যাইবে।"
আমি পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলাম, "তবে জ্ঞান কাহাকে বলে?"
ঋষি বলিলেন, "যে অনেক বই পড়িয়াছে, সে জ্ঞানী হইতেই পারে না।
যে নিজের মনকে পড়িয়াছে, নিজের অহংকারকে ভাঙিয়াছে, নিজের লোভকে পরাজিত করিয়াছে—প্রকৃত জ্ঞান তাহারই। কারণ অজ্ঞান মানুষ পৃথিবীকে বদলাইতে চায়, জ্ঞানী মানুষ নিজেকে বদলাইতে শেখে।"
তিনি মুঠোভর্তি বালু হাতে লইয়া বলিলেন, "এই বালুকণার মতোই মানুষের জীবন। যত শক্ত করিয়া ধরিবে, তত দ্রুত ফসকাইয়া যাইবে।
আর যত সহজে ধরিবে, ততক্ষণ তাহা তোমার হাতে থাকিবে। জীবনের প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সুখ, প্রতিটি অর্জনও ঠিক তেমনই।"
অবশেষে ঋষি চক্ষু মুদিয়া কহিলেন, "মনে রাখিও—লোভ কখনো পূর্ণ হয় না, অহংকার কখনো তৃপ্ত হয় না, কামনা কখনো শেষ হয় না।
কিন্তু যে মানুষ অল্পে সন্তুষ্ট হইতে শেখে, ক্ষমা করিতে শেখে, নীরব থাকিতে শেখে এবং প্রতিদিন কিছুক্ষণ নিজের অন্তরের সামনে দাঁড়ায়—তাহার হৃদয়ে এমন এক শান্তির জন্ম হয়, যাহা কোনো রাজ্য, কোনো ধন,
কোনো ক্ষমতা কিনিয়া দিতে পারে না।"
সেই দিন বুঝিলাম—মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু পৃথিবীর অন্য কোনো মানুষ নয়;
তাহার নিজের অশিক্ষিত মন। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষক কোনো গ্রন্থ নয়; নীরব ধ্যান। যে নিজের অন্তরকে জয় করিতে পারে, সে সমগ্র বিশ্বকে জয় করার প্রয়োজন অনুভব করে না।
Raton Hossain Joy
No comments:
Post a Comment