আমার খুব কাছের বান্ধবী চৈতির ডিভোর্স হয় হঠাৎ করে৷ এক সন্ধ্যায় চৈতি ফোন করে আমায় বলল,
—পৌষী তোর কাছে ক'টা দিন থাকতে দিবি আমায়?
আমি এত অবাক হয়েছিলাম। ইউনিভার্সিটিতে আমাদের ডিপার্টমেন্টে ফার্স্ট হয়েছিল চৈতি। স্কলারশিপও পেয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে আঙ্কেল আন্টি মনের মত ছেলে পেয়ে বিয়ে দিয়ে দিলেন চৈতিকে।
চৈতি অবশ্য বাড়িতে কথা বলেছিল। আঙ্কেল আন্টি বললেন,
—একটা ভালো বিয়ে জীবনে আশীর্বাদের মত। অর্ণব সোনার টুকরো ছেলে। ভগবান এমন ছেলে শতযুগে একজন করে পৃথিবীতে পাঠান।
তারপর তো বিয়ে হয়ে গেল চৈতির। বিয়ের পর চৈতি অনেক কিছু ছাড়লো। ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেছিল। তাও ছাড়লো। ভালো নাচ করত। তাও ছাড়লো।
জিজ্ঞেস করতেই বলল,
—শুধু ভালো ছেলে পেলেই তো হয় নারে পৌষী; সংসারটাও তো মন দিয়ে করতে হয়।
সেই চৈতির এমন ফোন পেয়ে আমি বোকা হয়ে গিয়েছিলাম।
—আমার কাছে এসে থাকতে হলে তোকে বলতে হবে? চলে আয়।
—আমি অর্ণবকে ডিভোর্স দিচ্ছি পৌষি।
মা-বাবা বাড়িতে থাকতে দেবে না বলেছে। আমি কয়েকটা দিনই থাকবো। এর মধ্যে ঠিক কিছু ম্যানেজ করে ফেলব। যতদিন তোর কাছে থাকব আমি কন্ট্রিবিউট করব।
—এরকম করে বলিস না প্লিজ। আমি যদি তোর কাছে যেতাম বলতে পারতি এরকম?
চৈতি সেই প্রথমবার কাঁদলো। হাউমাউ করে। ফোনের ওপাশে ওর কান্না আমাকে এপাশে ভাসিয়ে দিচ্ছিলো কষ্টের সমুদ্রে। বড় শক্ত মেয়ে চৈতি। কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি ওকে। মনে আছে ইউনিভার্সিটিতে ওর আর আমার বন্ধুত্ব খুব ফেমাস ছিল।
সবাই খুব বলতো, একজন সর্বনাশ, আর একজন পৌষ মাস।
প্রহর শেষের আলোয় রাঙা কথাটা থেকেই ওকে সবাই ডাকতো সর্বনাশ বলে। আর দুজনেরই মাসের নামে মিল করে নাম তো বন্ধুত্বও খুব জমে গিয়েছিল। ছেলেরা পর্যন্ত আমাদের হিংসে করত।
চৈতি এলো। শান্ত চেহারা। পুরো অবয়ব জুড়ে হতাশা লুকানোর সে কী আপ্রাণ চেষ্টা । যেন খুব ভালো আছে ও। সেদিন ও আসবার পরেই খুব করে বৃষ্টি নেমেছিল। ঝমঝমিয়ে। চৈতি বলল,
—দেখ, সব কেমন ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। পৃথিবীটাও চায় না থাকুক কিছু।
—মনের ভেতরটা ধুয়ে ফেলতে পারবি?
—ওটা সবার আগেই ধুয়েছি পৌষী। বাইরেটাই ধুতে পারলাম বড্ড দেরি করে। একটা ভুল বিয়ে মানে জানিস, শত বছরের অভিশাপ মাথায় নেয়া।
আমি সেদিন জানলাম। একটা সম্পর্কে দুটো মানুষ যখন আলাদা হয়। সবার আগে আলাদা হয় মন। শরীর বড্ড দেরি করে। লোকে দেখে তো। তাই একটু রয়ে সয়ে আলাদা হতে হয়। কিন্তু মনটা, মনের ভেতরটা দগদগে ঘা, পোড়া নিয়ে দূরে চলে যায় বহুদিন আগে।
চৈতি এসেই দেখলাম বেশ ছুটাছুটি করছে। দেশের বাইরে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য এপ্লাই করেছিল। হয়েও গেল ওর। রেজাল্ট ভালো ছিল।
যাবার দিন তারিখ ঠিক হবার আগে একদিন বসলো আমার সাথে।
বলল,
—গিয়েই তোকে ওখানে ঘুরতে নিয়ে যাব। মিষ্টুনকে সঙ্গে নিয়ে যাবি। বলবি, মাসির পক্ষ থেকে গিফট।
—তুই একেবারে যাচ্ছিস? আর ফিরবি না?
—জানি না। তবে মনে হয় না আজীবন থাকতে পারব। এই দেশটাকে এত ভালোবাসি, নিজের ছাই এদেশের মাটিতে না মিশলে মরেও তো শান্তি পাবো না রে।
চলে যাবার কয়েকদিন আগে এক বিকেলে আমি চৈতিকে জিজ্ঞেস করলাম।
—অর্ণবকে ছাড়লি কেন? তোদের তো কখনো ঝগড়া হতেও শুনিনি। এত ভালো কাপল তোরা। আমরা তো রীতিমতো তোদের এক্সাম্পল দিয়ে ব্র্যান্ডিং করতাম।
চৈতি জবাব না দিয়ে হাসলো।
—বল না শুনি!
অনেকবার জিজ্ঞেস করার পর চৈতি বলল,
— স্বামী তার স্ত্রীকে খেতে দেবে, পরতে দেবে, সেইফটি দেবে, অসুখবিসুখ হলে যত্ন করবে, ভালোবাসবে, তার সাধ আহ্লাদের খেয়াল করবে, তার সম্মানটুকুর মূল্যায়ন করবে এগুলো না সংসারে খুব বেসিক। এগুলো করে একজন স্বামীর মহান হবার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো তাকে করতেই হয়। এগুলো লাক্সারি নয়। কিন্তু এগুলো করে যদি কেউ মহান সাজে, প্রতিমুহূর্তে তোমাকে ফিল করায় এগুলো তুমি ওর থেকে পাচ্ছো, এগুলো তোমার দায়, সেই সংসারে কি থাকা যায়?
কয়েকটা লাইন। আমি একটু পজ নিলাম। এগুলো তো আসলেই খুব বেসিক। ভাবিনি তো এমন করে।
—অথচ আমি তার জন্য রান্না করা, তার ব্যাগ গুছিয়ে দেয়া, তার জন্য অপেক্ষা করাটাকে বেসিক ধরেই সংসার করেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম এগুলো আমার করতেই হত। বরং তার জন্য আমার ভালোবাসা কম পড়ে কিনা সেই নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতাম সারাক্ষণ। সারাক্ষণ মনে হতো, আমি পারছি তো ওকে ভালোবাসার বেস্ট ভারশনটা দিতে। আর সে…! কোনোকিছুতে যদি বেসিকটাই না হয় তাহলে বাকীটা কি করে হবে বল?
চৈতি চলে গেল। যাবার কিছুদিন পর আমায় ফোন করলো। বলল,
—বেড়াতে আয়। তোদের মিস করছি।
ভিডিও কলে দেখছিলাম ওকে। ঝলমল করছিল ওর মুখটা। দেখে এত শান্তি লাগলো। মনে আছে, যেদিন এসেছিল আমার কাছে কেমন শুকনো মত ক্লান্তি ছিল চোখের কোলে। ঘুম না হওয়া চোখ দুটোতে একরাশ অভিযোগ ছিল এই বেঁচে থাকা নিয়ে। আজ দেখো সেই চোখেই বৃষ্টি ভেজা গন্ধরাজের পাপড়ির মত স্নিগ্ধতা।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—-কেমন আছিসরে তুই?
—ভালো আছি। এখন তো অন্তত শুনছি না, কার টাকায় ঘরে বাজার আসে টের পাও না! শপিংয়ে যাওয়ার টাকাগুলো কেমন করে আসে টের পাও না তো! রেস্টুরেন্টে বিল কার পকেট থেকে যায় টের পাও না তো!
আমি আবার একটু থমকে গেলাম। এই কথাগুলো এত চেনা আমার কাছে। এত পরিচিত।
আমার নিজের বিল আমিই দিতে পারি এখন। তাও একসময় অনেক শুনেছি। সারাদিন লুপে শুনতে থাকা প্রিয় গানের মত অবজ্ঞার এই লাইনগুলো বারবার শুনেছি। বুকের ভেতরে ছিল এই লাইনগুলো।
—এই পৌষী, তুই কবে আসবি বলতো, আমি সব এরেঞ্জ করে দিই! একটু বেশি করে ছুটি নিবি, এখানে অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে দেখার। মিষ্টুনকে বল না, তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট করে ফেলতে।
—তুই এরেঞ্জ করবি কেন? আমি আমার মত করে আসব।
—তোর মত করে মানে?
—তোকে এত টাকা পয়সা খরচ করতে হবে না। আমরা আসব তো বললাম।
চৈতি থমথমে মুখ করে বলল,
—সেদিন আমায় তোর কাছে এমন নির্ভার হয়ে থাকতে দিয়েছিলি কেন তবে?
—-তোর আমার বন্ধুত্বে ওটা খুব বেসিক ছিল চৈতি। এটুকু তুইও আমার জন্যও করতি। সারাক্ষন ওটাকে এভাবে গ্লোরিফাই করার কিছু নেই।
—-ওটা বেসিক?
—হু। বেসিকই তো। মিনিমাম লেভেলের বেসিক।
চৈতি ফোনের ওপাশে হাসলো। খুব হাসলো। আমি মুগ্ধ হয়ে ওকে দেখতে লাগলাম। চৈতির হাসি সুন্দর! বৃষ্টির মত সুন্দর! কিশোরীর প্রথমবার শাড়ি পরার মত সুন্দর! ফুলের গায়ে শিশির চুইয়ে পড়ার মত সুন্দর!
অথচ জানেন, মাঝে মাঝে একটু থেমে পেছন ঘুরে সংসারটার দিকে তাকালে সামান্য বেসিকটাই দেখতে পাই না।
তবে চৈতির মত করে নির্ভার শান্তির হাসি আমি কোনোদিনও হাসতে পারব না। আমার কাছে মিষ্টুন আছে। ওর জন্য আমাকে বেসিকটুকু ছাড়াই সংসার করতে হবে। এই পৃথিবীর লক্ষ কোটি মেয়ে বেসিকটুকু না বুঝে পেয়েও সংসার করে। করতে হয়।
মা বলেছেন, সংসারে পেছন ফিরে দেখতে নেই। দেখলেই চোখ জ্বালা করে। চোখে জ্বালা ধরানোর চাইতে না তাকানোই তো ভালো!
No comments:
Post a Comment