Saturday, August 15, 2026

ফেলা যায় না কিছুই।

 


আমরা যারা সৌভাগ্য অথবা দূর্ভাগ্যক্রমে বাঙাল বাড়িতে জন্মেছি তারা ছোটো থেকেই জানি সব খাওয়া যায়।‌ খাবারের খোসা থেকে আঁটি, ফুল থেকে পাতা এবং একটু নুন‌ হলুদ বা কাঁচা লঙ্কা, আদতেই সব খাওয়া যায়!
কখনো কারো মুখে ব্যঙ্গোক্তি শুনি, বাঙালরা নাকি সবাই জমিদার ছেলো! সবাই জমিদার ছিলো নাকি জানি না তবে সবার একটা নিকানো উঠোন, টগরফুলের গাছ, তুলসীমঞ্চ, দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসার মতো আমেজ ছিলো। মায়ের মুখে শোনা সবকিছু ছেড়ে একরাত্রে বেরিয়ে পড়েছিলো অনেকে। হেঁটে পেট্রোপোল বর্ডার আসতে হবে, কোমরের গোঠে রাখা যৎসামান্য সোনাদানা, কিছু চাল ডাল কাঁচা আনাজ। তখনি শুনেছিলাম টানা তিনদিন নাকি ভেজানো চিঁড়ে আর কাঁঠাল খেয়েই থাকতে হয়েছিল তাদের। শিকড় উপড়ে আসা মানুষগুলো তাই কন্দমূল খেয়েই কাটিয়ে দিতে পারে দিনের পর দিন। উদ্ধাস্তু কলোনীর বেড়ার ওপর ঝুলে থাকা তেলাকুচা পাতাই অমৃত লাগে খিদের পেটে, আর সাথে লাগে শুধু অনেকটা ঝাল... কাঁচা, পাকা, শুকনো বা চুঁইঝাল! বারেবারে জল খেলে কম খাবারেই হয়ে যায়!
ছোটো থেকেই মা'কে দেখতাম খুব কম উপকরণে রান্না করতে, খুব কম তেল, নামমাত্র মশলা। ফেলতো না প্রায় কিছুই। ফুলকপি বা বেগুনের ডাঁটি , কুমড়োর ভিতরের নরম অংশটা, পালংশাকের গোড়ার শক্ত অংশটা সব দিব্যি মিশে যেতো পাঁচমিশালি তরকারিতে। লাউ বা কুমড়ো বা আলুর খোসা কখনো ফেলতে দেখিনি আমি, কুচিকুচি করে কেটে , শুকনো পাতার জ্বালটা একটু কম করে অল্প তেলে ভেজে নিতো সেগুলো। মানকচুর যেই অংশটা খেলে গলা ধরে সেটা দেখতাম ভালো করে ছাড়িয়ে নিতো, চাক করে কেটে তারপর জলে অল্প নুন দিয়ে ভাপিয়ে জলটা ফেলে দিতো। ভেজে নিলেই দিব্যি খাওয়া যেত। মাসের শেষদিকটা , যখন বেশ টানাটানি থাকতো, তখন প্রায়ই চুপড়ি নিয়ে নেমে পড়তো পুকুরে। পুঁটি, বেলে, চাঁদা , খয়রা পেয়ে যেতো। পুকুর ধারে কলমি বা মালঞ্চশাকের আড়ত, লকলকে আগা। চুনোমাছগুলো ধুয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে , একটু সরষের তেল অল্প মশলা দিয়ে কলাপাতায় বেঁধে মাটির পাত্রে চাপা দিলেই দুইবেলার খাওয়ার চিন্তা শেষ।
প্ল্যাটারে কুমড়ো ফুলের বড়া, হেলেঞ্চা পাতার বড়া এবং লাউ আর আলুর খোসা ভাজা। ওই যে, খোসা থেকে আঁটি পর্যন্ত ফেলা যায় না কিছুই।

Baishakhi Roy

No comments:

Post a Comment