Sunday, August 16, 2026

সব কান্না দুঃখের নয়

 



মামারা কখনো আমাদের বাড়িতে দাওয়াত পেতেন না। আব্বা নিজেই তাদের আসতে নিষেধ করে দিতেন। কখনো সখনো নিজ থেকে এলে বাড়ির বাজার সদাই বন্ধ হয়ে যেত। আব্বা বলতেন, “মাসের শেষ। হাতে কোন টাকাপয়সা নেই। ঘরে যা আছে তাই দিয়ে কাজ চালিয়ে দাও।”
মা কিছু বলত না। ঘরে যা থাকত তাই খাইয়ে মামাদের বিদায় করে দিতো। যাওয়ার সময় কড়া গলায় শাসিয়ে দিয়ে বলত, “কতবার বলেছি এই বাড়িতে আসবি না। তা-ও দু'দিন পরপর চলে আছিস কেন?”
মায়ের কথার জবাবে মামারা মাথা চুলকে হাসত। জড়ানো গলায় বলত, “জারিফকে দেখতে আসি। তুমি তো কখনো আমাদের বাড়িতে যাও না।”
মায়ের নানাবাড়িতে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। উৎসব অনুষ্ঠানে দেখতাম মা শুকনো মুখে ঘুরছে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আঁচলে চোখের পানি মুছছে। মায়ের কষ্ট একটু-আধটু বুঝলেও আমার কিছু করার ছিল না। আমি শুধু দেখতাম। মা নিজের হাতে পোলাও কোর্মা রাঁধত। যত্নসহকারে বাড়ির সবার পাতে তুলে খাওয়াত। তবে নিজে কিছু মুখে তুলতো না। খেতে ইচ্ছে করছে না বলে এড়িয়ে যেত। আব্বার কাছে এসব স্বাভাবিক লাগত। তিনি কিছুই বলতেন না।
মায়েরা তিন ভাইবোন। মা বড়। দুই ভাই ছোট। কতই বা বয়স! একজনের বারো, অন্যজনের পনেরো। নানা নেই। ছোট মামা জন্মের পরপরই নানা মা'রা গিয়েছেন। অভাবে সংসার। নানি তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোন রকমে খেয়ে পরে দিন কাটায়। এমন অবস্থায় হঠাৎই দাদা মায়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। স্কুলে যাওয়ার সময় তিনি মাকে দেখেছেন। দেখেই পছন্দ করে ফেলেছেন। অপরূপ সুন্দরী মেয়ে, বিয়েতে তেমন কোন খরচ খরচা করতে হবে না। সংসারের অভাব কিছু কমবে– এসব ভেবেই বোধহয় নানি বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন। অবশ্য রাজি না হওয়ার কিছু ছিল না। আব্বা সরকারি চাকরি করেন। দাদার আর্থিক অবস্থা জমিদারের চেয়ে কোন অংশে কম না। বিশাল বড় বাড়ি, বাড়ির পেছনে চার বিঘে জায়গা জুড়ে পুকুরে, সামনে ফুলের বাগান। দু'টো গাড়ি আছে। নিজেদের ব্যবসা আছে। এমন ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। পাড়াপ্রতিবেশি সবাই মায়ের ভাগ্যের তুমুল প্রশংসা করল। সবাই এমন রাজ কপাল নিয়ে জন্মায় না।
বিয়ের পর মা এই বাড়িতে এসে উঠল। বনেদি বাড়ির বনেদি নিয়মনীতি। দাদা সবাইকে এমন দেখালেন যেন তিনি খুব অসহায় একটা মেয়েকে ছেলের বউ করে নিয়ে এসেছেন। সমাজের মহানুভব মানুষের তালিকায় তার নাম সবার উপরে থাকা উচিত। তবে এ কথা সত্যি– মায়ের বিয়েতে নানির এক পয়সাও খরচ হয়নি। দাদা নিজে সব কেনাকাটা করে দিয়েছেন। বিয়ের দিন দুই চারজন বরযাত্রীর খাওয়ার আয়োজন ছিল। তিনি বিয়ের আগেরদিন রাতে লোক দিয়ে বাজার-সদাই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
এমনিভাবে দাদা সবার কাছে মহান মানুষ হয়ে রইলেন। আব্বা অল্প বয়সী অনবদ্য সুন্দরী একটা মেয়েকে নিজের বউ হিসাবে পেলেন। নানি খরচখরচা ছাড়া এ বড় বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিতে পেরে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। সবকিছুর মাঝে মা খুব বিপদে পড়ে গেল। বিয়ের কয়েক মাসের মাথায় তার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। পাছে যদি এ বাড়ি থেকে টাকাপয়সা চু'রি করে মা ভাইয়ের হাতে দিয়ে আসে। হাড়হাবাতের স্বভাব নাকি কখনো বদলায় না। নানি প্রায়ই দুই মামাকে নিয়ে মা'কে দেখতে আসতেন। বাবা একদিন মা'কে ডেকে নিষেধ করে দিলেন। রোজ রোজ ফকির মিসকিনের মতো এ বাড়িতে আসার কী আছে? মেয়ের শ্বশুর বাড়ি রোজরোজ আসার মতো কোন জায়গা না। দুঃখে অপমানে নানি আর এখন আমাদের বাড়িতে আসেন না। মামারা আসে। আমাকে দেখতে আসে। মামাদের সাথে আমার বয়সে তেমন ব্যবধান নেই। তারা আমায় মাথায় করে রাখে৷ আদর করে। লুকিয়ে লুকিয়ে এটা ওটা এনে খাওয়ায়। এইতো দু'দিন আগে ছোট মামা এসেছিল। লাল রঙের নাম না জানা কতগুলো ফল আমার হাতের ভেতরে দিয়ে বলল, “কেউ দেখার আগে খেয়ে ফেল। দারুণ স্বাদ। টক মিষ্টি।”
এর আগে বড় মামা একটা খেলনা কিনে দিয়েছিল। আব্বা দেখার পর ফেলে দিয়েছেন। কড়া গলায় বলেছেন, “এত দামী খেলনা থাকতে এসব বাজে জিনিস দিয়ে খেলতে হবে কেন? কত দাম এই খেলনার? দশ বিশ টাকায় ফুটপাতে কিনতে পাওয়া যায়।”
আব্বার কথা ভুল। দশ বিশ টাকায় এই খেলনা কিনতে পাওয়া যায় না। বড় মামা দুইশো ত্রিশ টাকা দিয়ে খেলনাটা কিনেছে। গাছে উঠে নারকেল, সুপারি পেড়ে টাকা জোগাড় করেছে। মামা মায়ের কাছে সব স্বীকার করেছিল। আমি তখন শুনেছি। কিন্তু আব্বা শোনেননি। বারবার বলার পরেও হাত থেকে খেলনাটা নিয়ে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলেছেন। প্রতিদিন গোসলের সময়ে আমি ওই খেলনাটা খুঁজি। পাই না। তখন আমার খুব কান্না আসে। চোখ জ্বা’লা করে।
আজ আমাদের বাড়িতে অনুষ্ঠান। দাদার মায়ের নামে মিলাদ। বেশ কয়েকজন এতিম খাওয়ানো হবে৷ আব্বা সমস্ত বাজার সদাই নিয়ে বাড়ি ফিরতেই মা তার কাছে গেল। নরম গলায় বলল, “মারুফ, ফিরোজকে আসতে বলব?”
“কেন? ওদের আসতে বলবে কেন?”
“না মানে বাড়িতে মিলাদ। এতিমদের খাওয়ানো হবে। ওরাও তো এতিমই।”
আব্বা মায়ের উপর চিৎকার করে উঠলেন।
“হ্যাঁ! তোমার ভাইয়েরা আমার বাড়িতে এতিমের খাওয়া খেতে আসবে? লোক সমাজে আমার মানসম্মান রাখবে না তাই না? মানে আর কী বলব! তোমার কী কোন মানসম্মান নেই? ঘরে ঢুকতেই মেজাজটা খারাপ করে দিলো।”
আব্বা বেরিয়ে গেলেন। আমি পা টিপেটিপে মায়ের কাছে গিয়ে বসলাম। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। অস্পষ্ট গলায় কিছু বলল কি-না ঠিকমতো বুঝতে পারলাম না। মায়ের চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললাম, “মা আব্বা মামাদের পছন্দ করে না কেন?”
“কিছু না বাবা। এমনিতেই। তোমার মায়ের তেমন কোন পরিচয় নেই। খুব বেশি লেখাপড়া শেখেনি। যাওয়ার মতো কোন জায়গা নেই। খুব ভীতু স্বভাবের। তার পায়ের নিচের মাটি শক্ত না। তাই তার পরিচয়ে তোমার মামারা এ বাড়িতে আসতে পারে না।”
মায়ের কথাগুলো কঠিন মনে হলো। সবটুকু বুঝলাম না। তবে খুব বড়সড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমি মামাদের এই বাড়িতে দাওয়াত দেব। নিজের টাকায় বাজার করে আনব। তাহলে আর কেউ কিছু বলতে পারবে না। দাদা আমায় খুব স্নেহ করেন। তার কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া সহজ হবে। দাদা বলে দিলে আব্বা আর না করতে পারবেন না।
বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে মা সে-সব ছুঁয়ে দেখে না। অস্পষ্ট স্বরে কাঁদে। হয়তো তার নিজের মা ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। মামারা কখনো এতো ভালো খাবার খেতে পায় না। নানির বয়স বেড়েছে। তিনি আর আগের মতো কাজকর্ম করতে পারেন না। আব্বা কখনো তাদের টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করেন না। ঈদ এলে দুয়েকটা কাপড় কিনে দেন। এতটুকুই। মামাদের দাওয়াত দিলে নিশ্চয়ই মা খুব খুশি হবে। তখন আমরা সবাই একসাথে বসে খাব।
মায়ের মুখে শুনেছিলাম– ভালো কাজের নিয়ত করলে আল্লাহ নিজেই একটা ব্যবস্থা করে দেন। কথাটা সত্যি। আল্লাহ আমাকেও একটা ব্যবস্থা করে দিলেন। ঈদ উপলক্ষে মহল্লার বাচ্চাদের নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা হবে। প্রথম পুরষ্কার তিন হাজার টাকা। এই টাকা পেতে গেলে অনেকগুলো ধাপে জিততে হবে। এক বুক আশা আর মন ভরা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নাম দিলাম। সবাই ভীষণ উৎসুক।
সাদা খামে মোড়ানো তিন হাজার টাকা হাতে পেয়ে আমার চোখে পানি এসে গেল। দাদা খুব গর্ব করে বললেন, “সবাই দেখো, আমার দাদাভাই মহল্লার সবাইকে হারিয়ে দিয়েছে।”
দাদা হাসছেন। বাড়ি ফিরেও আমায় নিয়ে অনেক কথা হলো। দাদা আমাকে তার কাছে ডেকে বললেন, “দাদু ভাই তুমি এই টাকা দিয়ে কী করতে চাও?”
“বাজার করব। গোশত কিনব, মাছ কিনব।”
“তাই? তা এসব কে খাবে?”
“মামারা। দাদু, আমি মামাদের দাওয়াত দিতে চাই।”
আব্বা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। দাদা তাকে থামিয়ে দিলেন। যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “ঠিক আছে। তোমার মামাদের আসতে বলো। তাদের নিয়েই না হয় বাজারে যাব।”
পরদিন সকাল হতেই মামারা এলো। নানিও তাদের সাথে এসেছেন। দাদা নিজে নানিকে আসতে বলেছেন। ঘরে ঢুকেই বড় মামা আমায় কোলে তুলে ঘোরাতে শুরু করল। ঝলমলে গলায় বলল, “প্রতিযোগিতার কথা আগে বলবি তো। বললে আমরাও দেখতে আসতাম– কীভাবে তুই সবাইকে পেছনে ফেলে একদম ফার্স্ট হয়ে গেলি।”
মা হাসল। হাসি-হাসি মুখ করে বলল, “যদি হেরে যায় তাই আগে থেকে বলেনি।”
মায়ের হাসি খুব সুন্দর। শেষবার মাকে কবে এত সুন্দর করে হাসতে দেখেছি মনে করতে পারি না। দাদার সাথে গিয়ে বাজার করে নিয়ে এসেছি। আব্বা বাড়িতে নেই। কী একটা কাজে বাইরে গিয়েছেন। আব্বা থাকলে খুব ভালো হতো। সবাই মিলে একসাথে বসে খেতাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মামাদের সাথে খেলতে আরম্ভ করলাম। আব্বা বাড়িতে নেই। পুকুরে ঝাঁপাঝাপি করলে আজ আর কেউ রাগ করবে না।
রান্না শেষ হতে হতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। মা অনেক যত্ন নিয়ে সমস্ত রান্না শেষ করেছে। দুপুরে খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। দেরি না করে খেতে বসে গেলাম। মা খাবার বেড়ে দিলেন। কোমল গলায় বলল, “যার যা লাগবে বলবি। মুখ বুঁজে থাকবি না কিন্তু।”
আমি বললাম, “মা, তুমিও আমাদের সাথে বসো না?”
জীবনে প্রথমবারের মতো মা সবার সাথে খেতে বসল। নিজের পাতে গোশতের টুকরো তুলে নিয়ে বলল, “গোশত অনেক ভালো সেদ্ধ হয়েছে।”
মায়ের চোখে পানি। সে চোখের পানি লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। পারছে না। মায়ের ভাবসাব আমি বুঝতে পারি না। এখন এখানে কান্নার কী আছে?
হাত-মুখ ধুয়ে মায়ের কোলের কাছে গিয়ে বসলাম। বিরক্ত মুখে বললাম, “তুমি তখন কাঁদছিলে কেন?”
মা আমাকে জড়িয়ে ধরল। অসম্ভব কোমল গলায় বলল, “সব খুশি তো হাসিতে প্রকাশ করা যায় না বাবা। মাঝেমধ্যে খুব বেশি খুশি হলে মানুষের চোখে পানি এসে যায়।”
আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। মাঝেমধ্যে মা অনেক কঠিন কথা বলে। আমি সে-সব কথার মানে বুঝতে পারি না। তখন নিজেকে কেমন অসহায় লাগে। একদিন মাকে খুব করে ব'কা দিতে হবে। সে কেন এত কঠিন কথা বলে? মা আমাকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল, “জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত হলো প্রিয় মানুষদের তৃপ্তি সহকারে খেতে দেখা।”
মায়ের এই কথাটা আমি বুঝলাম। অদ্ভুত রকমের ভালোলাগা সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল। চোখ ভিজে উঠল। প্রিয় মানুষদের খুশি করতে পারলে এত ভালো লাগে কেন!

No comments:

Post a Comment