Saturday, October 10, 2026

উত্তরাধিকার'

 


যে লোকটা আমার স্বামী হয়ে ফিরে এসেছিল, সে আসলে আমার স্বামী ছিল না।
কথাটা আমি প্রথম রাতেই জেনে গিয়েছিলাম। তারপর এতগুলো দিন, এত মানুষের চোখের সামনে, আমি তাকে স্বামী বলে ডেকেছি, তার পাতে ভাত বেড়েছি, রাতে তার সঙ্গে শুয়েছি। কেউ ধরতে পারেনি। অন্তত আমি তা-ই ভাবতাম।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, একটা মেয়ে কী করে নিজের স্বামীকে চিনতে ভুল করে? আমি ভুল করিনি। ভুল করলে আজ এই গল্পটা বলবার দরকারই পড়ত না।
আমার নাম রেহানা। হাওরের এক গ্রাম চরকান্দায় আমার শ্বশুরবাড়ি। বর্ষায় আমাদের চারপাশ পানিতে ডুবে যায়, পানির মাঝে দ্বীপের মতো জেগে থাকে কয়েকটা পাড়া। শুকনো মৌসুমে মানুষ হেঁটে পার হয়, বর্ষায় চলে নৌকায়। আমাদের বাড়ি গ্রামের পশ্চিম কোণে, নৌকাঘাট থেকে হাঁটা পথে পাঁচ মিনিট। দুটো টিনের ঘর, একচালা রান্নাঘর, গোয়ালে দুটো ছাগল, আর বাড়ির পেছনে ঘন বাঁশঝাড়। বাড়িতে থাকি আমি আর আমার শাশুড়ি হাসিনা বানু। শাশুড়ির চোখে ছানি পড়েছে, বছর তিনেক হলো তিনি মানুষের মুখ দেখেন না, দেখেন আন্দাজে।
আমার স্বামী কামাল সৌদি আরব গিয়েছিল একানব্বই সালে। প্রথম তিন বছর টাকা পাঠিয়েছে, মাঝেমধ্যে চিঠিও লিখেছে। চিঠি আমি পড়ে শোনাতাম মাকে, কারণ মা পড়তে জানতেন না, আর কামাল চিঠি লিখত মাকে উদ্দেশ করেই। আমার জন্য চিঠির শেষে একটা লাইন থাকত, "রেহানা কেমন আছে" প্রশ্নবোধক চিহ্নটুকু দিত না। সে জানত না, নাকি দিতে দরকার মনে করত না, আজও আমি বলতে পারি না।
চুরানব্বই সালের পর টাকা আসা বন্ধ হলো, আর চিঠিও।
আমাদের অঞ্চলে এ নিয়ে একটা কথা চালু আছে। যে যায়, সে হয় টাকা পাঠায়, নয় খবর পাঠায়। দুটোর একটাও যদি না আসে, তার বউকে কাটাতে হয় এক অনিশ্চিত জীবন। স্বামী মরে গেছে, তা-ও বলা যায় না, কারণ লাশ আসেনি। আবার স্বামী আছে, সেটাও জোর দিয়ে বলা যায় না, কারণ মানুষটা ফেরে না। সেই বাড়িতে আমি ছয়টা বছর কাটিয়েছি। বাপের বাড়ি থেকে আনা একটা সিঙ্গার সেলাইমেশিন ছিল, তাতে ব্লাউজ-পেটিকোট সেলাই করতাম, গ্রামের মেয়েদের কাঁথায় নকশা তুলে দিতাম। দুটো ছাগল পুষতাম, একটার নাম কালি, আরেকটার ধলি। নাম রাখার ব্যাপারে আমার মাথায় কখনো নতুন কিছু আসত না।
সত্তার মেম্বার মাঝেমধ্যে এসে বসতেন আমাদের উঠানে। মোটাসোটা মানুষ, কপালে নামাজের কালশিটে দাগ, মুখে সবসময় এক দুঃখী ভাব লেপটে থাকত। বলতেন, "রেহানা, কামাল আর ফিরত না। যে ফিরবার না, তার লাইগা বইসা থাকলে বয়সটাই পার হইয়া যায়।" তারপর এমনভাবে তাকাতেন, যেন বয়স চলে যাওয়া থেকে বাঁচার একটা সমাধান তাঁর পকেটেই গোছানো আছে। তিনি নিজে বিবাহিত, কিন্তু কোরান-হাদিসে নাকি চারটা পর্যন্ত অনুমতি আছে, সেই কথাটাও প্রতিবার মনে করিয়ে দিতে ভুলতেন না।
আমি বাটিভর্তি মুড়ি আর গুড় এগিয়ে দিয়ে বলতাম, “মেম্বর সাব, আমার তো স্বামী আছে।”
তিনি গুড়ে কামড় দিয়ে বলতেন, “কই?”
আমি বলতাম, “হেইডাই তো প্রশ্ন।”
এভাবেই দিন চলছিল। তারপর আষাঢ় মাসের এক বৃহস্পতিবার, বিকেলের বৃষ্টি সবে থেমেছে, পাশের বাড়ির শামসু হাঁপাতে হাঁপাতে উঠানে ঢুকল। বয়স বারো, লুঙ্গি হাঁটু অবধি গোটানো, পা দুটো কাদায় মাখামাখি।
"চাচি! চাচি! কামাল চাচা আইছে! ঘাটে নামছে!"
আমার হাতে তখন একটা ব্লাউজের হাতা। সুইটা আঙুলে ফুটল, টেরও পেলাম না। মা বারান্দায় তসবি জপছিলেন, দানা গোনা হঠাৎ থেমে গেল।
"কেডা আইছে?"
"কামাল চাচা, দাদি! নৌকা থেইকা নামছে, মাথায় টিনের বাক্স!"
মা উঠে দাঁড়ালেন, হাত বাড়িয়ে আমাকে খুঁজলেন। আমি সেই হাত ধরলাম, আর টের পেলাম, বুড়ো মানুষটার হাত থরথর করে কাঁপছে। তাঁর হাত সেদিন যতটা কাঁপছিল, তেমন কাঁপা আমি জীবনে আর কখনো দেখিনি।
ঘাটে ততক্ষণে অর্ধেক গ্রাম জড়ো হয়ে গেছে। হাওরের গ্রামে খবর বাতাসের চেয়েও দ্রুত চলে, কারণ পানি শব্দকে বয়ে নিয়ে যায়। ভিড় ঠেলে আমরা এগোলাম। লোকে পথ ছেড়ে দিল, আর ফিসফিস করল। সেই ফিসফিস আমি স্পষ্ট শুনেছি। "কামালের বউ" "কত বছর হলো গো" "বুড়ির কপালডা ভালো" "বউটারও"
সে দাঁড়িয়ে ছিল ঘাটের কাঠের পাটাতনে। লম্বা, রোগা, গাল ভাঙা, মুখে অযত্নের দাড়ি। গায়ে সবুজ-সাদা চেক শার্ট, বহু ধোয়ায় রং হারিয়ে গেছে। পায়ের কাছে নামানো একটা টিনের ট্রাঙ্ক, ঢাকনায় আলকাতরা দিয়ে কিছু লেখা, বুঝা যায় না।
মা তার সামনে গিয়ে থামলেন, আমি হাত ছেড়ে দিলাম। মা দুই হাত বাড়িয়ে তার মুখে বোলাতে লাগলেন, কপাল থেকে ভুরু, নাক, গাল, চিবুক; অন্ধ মানুষ যেভাবে পড়ে। আমি লক্ষ্য করলাম, চোখের কাছটায় এসে মা একটু থামলেন, তারপর হাত নামিয়ে ঠোঁটে এলেন।
একটা শব্দ বেরোল মায়ের মুখ থেকে, কান্নাও নয়, হাসিও নয়।
"বাজান।"
লোকটা মায়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরল। বলল, "মা।"
ভিড়ের মধ্যে কোনো মহিলা কেঁদে উঠল। কেউ একজন 'আল্লাহু আকবার' বলে উঠল। পেছনদিকে কে যেন হাসতে শুরু করে হাসতে হাসতে কাশতে লাগল। ছেলেরা চিৎকার করে বাড়ি বাড়ি খবর দিতে ছুটল। আমি একটু দূরে ভেজা পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, এখন আমার কী করা উচিত। যে মেয়ের স্বামী নয় বছর পর ঘাটে নেমেছে, তার চোখ দিয়ে পানি পড়ার কথা, তাই না? ঠিক কতটা? কখন?
আমি জানতাম না, এমন নয়। জানাটা আমার নিজেরই ছিল। তাই যতটা অবাক হওয়ার কথা, ঠিক ততটাই হলাম। তার বেশি নয়।
সে মায়ের কাঁধ ছেড়ে আমার দিকে ফিরল। নয় বছর পর। চোখ দুটো গর্তে বসা, নিচে ঘন কালি। বলল, "রেহানা। কেমন আছ?"
গলাটা নরম। প্রশ্নবোধক চিহ্নসহ!
সে রাতে আমাদের উঠানে মানুষ ধরল না। পাড়ার লোক এল, পাশের পাড়ার লোক এল, এমনকি যে বুড়ো গ্রামের বাইরে পা রাখে না, সেও এসে বারান্দায় বসল। চেয়ারম্যান সাহেবের ছোট ভাই মুরগী পাঠালেন। সত্তার মেম্বার নিজে এসে কামালের হাত চেপে ধরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। মুখে যে হাসিটা ছিল, সেটা ঠোঁট পেরিয়ে চোখ পর্যন্ত পৌঁছাল না।
সবাই কামালকে প্রশ্ন করল, সৌদি কেমন, এতদিন কোনো খবর দেয়নি কেন? সে ধীরে ধীরে উত্তর দিল। বলল, শুরুতে কাজ ভালোই ছিল, তারপর কফিলের সঙ্গে ঝামেলা বাধে, পাসপোর্ট কেড়ে নেয়, সে পালিয়ে বেড়ায়, শহরের এক কোণে লুকিয়ে কাজ করে, শেষে পুলিশ ধরে, জেলে রাখে, তারপর দেশে পাঠায়। এই গল্প আমি আগেও অনেকের মুখে শুনেছি, এই এলাকায় এটা প্রায় সবার গল্প। শ্রোতারা মাথা নাড়ছিল, কারণ গল্পটা তাদের চেনা। যে গল্প মানুষ আগেও শুনেছে, তাকে অবিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গভীর রাতে শেষ লোকটা বিদায় নিল। মা শুয়ে পড়লেন পাশের ঘরে, ছেলের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকার পর। মা ঘুমিয়ে পড়লে সে আলতো করে হাত ছাড়াল, যেন কাঁচের জিনিস নামাচ্ছে।
আমি আমাদের ঘরে বসে ছিলাম। বিছানার চাদরটা সকালেই বদলে রেখেছিলাম। কেন বদলেছিলাম, তা তখন নিজেকেও জিজ্ঞেস করিনি। টেবিলের ওপর কেরোসিনের কুপি জ্বলছিল। শিখাটা ছোট করে রাখা।
সে এসে দরজায় দাঁড়াল, এক হাতে দরজার পাল্লা ধরে, যেন ভেতরে ঢুকবার আগে অনুমতি লাগে।
“আমি কি... এইহানে বইতে পারি?”
নয় বছর আগে আমার স্বামী এই ঘরে ঢুকত লাথি মেরে দরজা খুলে। কখনো অনুমতি চায়নি। সেই মানুষটাকে আমার সারা শরীর চিনত, পায়ের শব্দ, ঘামের গন্ধ, হাতের ওজন, সরষের তেল আর বিড়ির গন্ধ। অথচ এই মানুষটার গা থেকে আসছিল সস্তা সাবানের গন্ধ, লঞ্চঘাটের দোকান থেকে কেনা।
আমি বললাম, “এইডা তো তোমারই ঘর।”
সে খাটের কিনারায় বসল। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বললাম না। বাইরে ব্যাঙ ডাকছিল, দূরে হাওরের পানিতে কোথাও বৈঠার শব্দ। আমার হাত দুটো কোলে রাখা, খেয়াল করলাম আঙুল কাঁপছে।
“বাতিডা নিভাইয়া দিমু?”
"না। থাক।"
সে তাকাল। কুপির আলোয় তার মুখের হাড়গুলো স্পষ্ট। জেলফেরত মানুষের মুখ। বয়স ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ হবে, অথচ দেখাচ্ছে পঞ্চাশের মতো।
“তুমি আমারে কিছু জিগাইবা না?”
"না।"
"ক্যান?"
এই প্রশ্নের উত্তর আমি ঘাট থেকে ফেরার পুরো পথটায় অনেক ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে সব উত্তর মাথা থেকে উবে গেল, আর মুখ থেকে বেরোল এমন একটা কথা, যা আগে ভাবিনি।
“জিগাইলে তো জবাবও শুনতে অয়। জবাব শুনলে আবার কিছু একটা করন লাগে। আইজ রাইতে আমি কিছুই করবার চাই না।”
সে চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল, "আইচ্ছা।"
এরপর কে আগে কাকে ছুঁয়েছিল, সে কথা আমি আর জানি না।
এখানে আমি কিছু লুকোব না। এই গল্প ফাঁকা রেখে বলা যায় না। আমার বয়স তখন বত্রিশ। নয় বছর কোনো পুরুষ মানুষের স্পর্শ পাইনি। নিজের শরীরকে এতদিন একটা পুরোনো ঘরের মতো তালা মেরে রেখেছিলাম, জানালা বন্ধ, বিছানা ঢাকা। সেখানে যে কেউ ঢুকতে পারে, সেই কথাটাই ভুলে গিয়েছিলাম।
তার হাত এল কপালে, তারপর চুলে, তারপর কাঁধের নিচে। এমন করে কেউ আমাকে আগে ছোঁয়নি। কামালের হাত ছিল দাবির হাত। এই হাত ছিল প্রশ্নের হাত। প্রতি ইঞ্চিতে সে থামছিল, যেন মুখ দেখে বুঝে নিচ্ছে, এখানে কি এগোনো চলে। আমি চোখ বুজলাম, আবার খুলে ফেললাম, কারণ বন্ধ চোখে ভয় হচ্ছিল, কাকে কল্পনা করে ফেলব কে জানে।
ব্লাউজের বোতাম সে খুলল একটা একটা করে। আমার হাতও কাঁপছিল তার শার্টের বোতামে। নয় বছরের উপোসের পর সামনে ভাত পেলে মানুষের যেমন হয়, খিদে এত বেশি থাকে যে খাওয়ার কথাই মনে থাকে না। শুধু বসে বসে কাঁপে। আর মনে মনে ভয় পায়, সবটা আবার স্বপ্ন হয়ে যাবে না তো?
কান্না এল, থামাতে পারলাম না। সে থেমে গেল।
"আমি কি..."
"না," আমি বললাম। "থাইমো না।"
সে থামল না। কিন্তু সারাক্ষণ এমন ধীর, এমন সাবধান ছিল যে মনে হচ্ছিল আমি কোনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে চিনছি। শরীর নামের জিনিসটা যে আনন্দ পেতে পারে, ব্যথা ছাড়া, ভয় ছাড়া এই সত্যিটা আমি একেবারে ভুলেই গিয়েছিলাম। কুপির শিখা ছোট হয়ে এল। বাইরে কোথাও একটা পেঁচা ডাকল। সেই রাতে আমি তার পিঠে নখ বসিয়েছি, কাঁধে দাঁত বসিয়েছি, নিজের গলা থেকে এমন শব্দ বেরোতে শুনেছি যা আমার নিজেরই অজানা ছিল। পাশের ঘরে মা ঘুমোচ্ছেন, এই কথা মনে পড়তেই তার কাঁধে মুখ গুঁজে হাসতে শুরু করলাম, সে-ও হাসতে লাগল। কামাল কখনো আমার সঙ্গে হাসেনি।
শেষে সে পাশে শুয়ে রইল, আমার মাথা তার বুকের ওপর। ঘামে ভেজা চামড়া আস্তে আস্তে ওঠানামা করছিল। আমি তার পিঠে হাত বুলিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নামলাম, ধীরে, যেন কিছু খুঁজছি।
সে ফিসফিস করে বলল, "রেহানা।"
"হুঁ।"
"তুমি জানো, তাই না?"
বাইরে আবার বৃষ্টি নামল। টিনের চালে প্রথমে টুপটাপ, তারপর ঝমঝম। অনেকক্ষণ আমি কোনো জবাব দিলাম না। শেষে বললাম, "ঘুমাও।"
সেই রাতে আমার আর ঘুম এল না। সে ঘুমিয়ে পড়ল সহজে, বাচ্চাদের মতো আমার হাত ধরে রেখে। আমি টিনের চালের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম, যে মেয়ে সারাজীবন আইন, সমাজ আর স্বামীর ভয়ে চলেছে, সে হঠাৎ এক রাতে এমন কী করে বসল, যা থেকে আর পেছন ফেরার পথ রইল না?
উত্তরটা আমার জানাই ছিল। কেবল তখনো তা বলবার সময় আসেনি।
পরদিন সকালে রান্নাঘরে চুলা ধরাচ্ছি, পেছনে এসে দাঁড়াল সে।
"আমি কিছু করমু নি?”
কামাল কখনো রান্নাঘরে পা রাখেনি, ওই ঘরকে সে মনে করত মেয়েদের এলাকা, ঢুকলে নাকি পুরুষের জাত যায়। অবাক হয়ে বললাম, "তুমি গিয়া বইসো। মা উঠলে তোমারে খুঁজবাইন।”
“মা উইঠা আগে নামাজ পড়বাইন,” সে বলল, “তার আগে পানিডা নিয়া আই।”
কলসি নিয়ে সে টিউবওয়েলের দিকে গেল। তাকিয়ে দেখলাম, হাঁটায় একটা ঢিলেঢালা ভাব, কাঁধ সামান্য নোয়ানো। কামাল হাঁটত বুক চিতিয়ে, যেন রাস্তাটা তার কাছে ঋণী।
প্রথম সপ্তাহে গ্রামের লোক একে একে এসে দেখে গেল। কেউ ফল আনল, কেউ ডিম, কেউ শুধু গুড়-মুড়ি খেয়ে গেল। সবার মুখে একই কথা, কামাল বদলে গেছে। কেউ বলল ভালো হয়েছে, কেউ বলল জেলে গেলে মানুষ ঠান্ডা হয়, কেউ বলল সৌদির পানি-হাওয়ার গুণ। আমি মাথা নাড়ি, বাটিতে মুড়ি ঢালি, হাসি। মানুষ আসলে নিজের চোখের চেয়ে নিজের গল্পটাকেই বেশি বিশ্বাস করে। আর 'বিদেশফেরত মানুষ বদলে যায়' আমাদের এলাকার সবচেয়ে পুরোনো গল্পগুলোর একটা।
মা ছেলেকে কাছছাড়া করতে চাইতেন না। সারাদিন কাছে বসিয়ে রাখতেন, মাথায় তেল দিতেন, ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে দিতেন, যেন সে এখনো পাঁচ বছরের। সে সবই মেনে নিত নিঃশব্দে। রাতে না বলতেই মায়ের পা টিপে দিত। একদিন শুনলাম মা বলছেন, "তুই গান গাস কবে থেইকা রে কামু?"
ঘরের কোণে বসে সে নিচু গলায় কী একটা গুনগুন করছিল। ভাটিয়ালির সুর, আমাদের এলাকার নয়, আরও উত্তরের, নেত্রকোনার দিককার।
“জেলখানাত শিখছি, মা। রাইতে ঘুম আইত না।”
মা একটু চুপ থেকে হাসলেন। “তুই তো গান জানতিই না। সুরের লগে গলা মিলাইতে পারতি না।”
“এহনো পারি না।”
"না, মিলে," মা বললেন। "ভালোই মিলে।" তারপর মুখ ফিরিয়ে তসবি টানতে লাগলেন। আমি তখন ভেবেছিলাম, বুড়ো মানুষ বুঝি ছেলের বদলে যাওয়াটা মেনেই নিচ্ছেন। এখন জানি, ওই কথাগুলোর ভেতরে আরও কিছু লুকিয়ে ছিল। তখন সেটা আমার কানে পৌঁছায়নি, কারণ কান তখন অন্য জায়গায় মগ্ন ছিল।
এবার নিজের কথা বলি।
আমি সুখী ছিলাম। এই কথা বলতে লজ্জা লাগে, তবু সত্যি। সকালে উঠে পাশে একজন মানুষকে দেখে ভয় লাগত না। সে ভোরে উঠে মায়ের জন্য কুসুম গরম পানি আনত, তারপর জাল সারাতে বসত। হাওরে মাছ ধরতে যেত, ফেরার পথে ছোট পুঁটি-টেংরা এনে আমার হাতে দিত।
চালের ছাউনির ঝুলে পড়া টিন ঠিক করে দিল, দরজার কব্জায় তেল দিল, গোয়ালের বেড়া বাঁধল। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “এত কাম ক্যান করো?”
সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “ঘরে বইসা হাত খালি রাখলে ভালো লাগে না।”
ঘরে তাকে কোনো নামে ডাকতাম না। 'শোনো' বলতাম, বা 'এই যে।' বাইরে লোকের সামনে 'ও' বলে ডাকতাম, যেমন গ্রামের বউরা ডাকে। কেউ লক্ষ্য করেনি; ডাকনামের বদলে সর্বনামে চালিয়ে দেওয়া আমাদের সমাজে বউদের জন্য খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।
রাতগুলোই ছিল সবচেয়ে কঠিন, আবার সবচেয়ে ভালো। মা শুয়ে পড়লে আমরা ঘরে ঢুকতাম, কুপি নিভিয়ে। যে মেয়ে সারাজীবন অন্ধকারকে ভয় পেয়েছে, সে আস্তে আস্তে অন্ধকার ভালোবাসতে শিখল। একদিন বৃষ্টির রাতে নিজে থেকেই তার কাছে গিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম, আর বুঝলাম, নিজের চাওয়াকে নিজের কাছে স্বীকার করাটাও একরকম আনন্দ। সে কানে ফিসফিস করে বলেছিল, “তুমি কী চাও, কও তো?”
জিভে আটকাচ্ছিল, তবু বলেছিলাম। সে শুনেছিল এমনভাবে, যেন আমার ইচ্ছাগুলো কোনো দামি জিনিস। কামালের কাছে আমার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। কামাল আমাকে ছুঁত যেভাবে লোকে নিজের গোলার ধান মাপে।
কামালের কথা আমি বারবার বলতে চাই না। তবে না বললে আমাকে বোঝা যাবে না, তাই একটুখানি বলি।
বিয়ের পর প্রথম বছর সে শুধু রাগী ছিল। দ্বিতীয় বছরে গায়ে হাত তুলল। তৃতীয় বছরে আমি পোয়াতি হলাম। পাঁচ মাসের মাথায় একদিন ভাত দিতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। সেদিন এমন এক লাথি মারল যে আমি উঠানে ছিটকে পড়লাম, আর সেই রাতেই আমার ভেতর থেকে সবকিছু ঝরে গেল। মা সারারাত আমার পাশে বসে রইলেন, ছেলের দিকে একবারও তাকালেন না। কামালের বাবা বেঁচে থাকতে মাকে যেভাবে মারত, মা সেটা ভোলেননি। সেই রাতে মা কিছু বলেননি, শুধু আমার কপালে হাত রেখে বসে ছিলেন।
তারপর কামাল সৌদি গেল। স্বীকার করব, লঞ্চে তাকে তুলে দেওয়ার দিন বুকে যে আনন্দ হয়েছিল, বিয়ের দিনের আনন্দও তার কাছে কিছু না। পরে টাকা বন্ধ হলো, চিঠি বন্ধ হলো, আমি একবারও কাঁদিনি। প্রতিটা বছর পার হওয়ার মানে ছিল, আরেকটা বছর আমি বেঁচে আছি, কেউ আমাকে মারছে না।
এমন একটা মেয়ের ঘরে যদি এমন একজন মানুষ আসে, যার হাত নরম, গলা নরম, যে খেতে বসে আমার মুখে খাবার তুলে দেয়, আপনি কী আশা করেন, আমি তাকে ধরে বাইরে ছুড়ে ফেলব?
গ্রামের সবাই অবশ্য অতটা সরল ছিল না। সত্তার মেম্বার ঘনঘনই আসতেন, নতুন কামালের সঙ্গে সৌদির গল্প আমি লক্ষ্য করতাম, প্রশ্ন করার সময় তিনি কামালের চোখের দিকে তাকাতেন না। তাঁর চোখ পড়ে থাকত মুড়ির বাটির ওপর। সেও উত্তর দিত ধীরেসুস্থে, খুঁটিনাটিসহ, নিখুঁত। একদিন সত্তার মেম্বার জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার বাপের কবর কোনদিকে, মনে আছে?"
সে বলল, “পুব দিকে। বটগাছডার পাশে।”
সত্তার চুপ করে গেলেন। তাঁর চোখ একবার আমার দিকে এল, আবার ফিরে গেল। বুঝলাম, লোকটা শুধু সন্দেহই করছে না, আশাও করছে। সে চায়, কিছু একটা ভেঙে পড়ুক।
কারণ আমি আগে থেকেই জানতাম সত্তার মেম্বারের আসল টান কোথায়। আমার শ্বশুরের ভিটার পেছনের জমিটা, পুরো এক বিঘা, ওই জমির ওপর তাঁর নজর বহুদিনের। কামাল না ফিরলে জমি নিয়ে টানাটানি করা সহজ, ফিরলে কঠিন।
এসব জেনেও আমি কিছু বলতাম না। ঘরে আমাদের দুজনের মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে গিয়েছিল, সবকিছু নিয়ে কথা হবে, শুধু একটা বিষয় বাদে।
এক গভীর রাতে, পাশাপাশি শুয়ে সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আমি যদি কোনোদিন চইলা যাই, তুমি কী করবা?”
তার বুকে আঙুল দিয়ে একটা গোল দাগ কাটছিলাম, আঙুল থামল না।
“কই যাইবা?”
“জানি না। যদি যাইতেই হয়?”
“তাইলে আমিও যামু।”
সে হেসে ফেলল, অন্ধকারে হাসির শব্দ, তারপর একটা নিশ্বাস।
“তুমি যাইবা না। তোমার এইখানে ঘর আছে, মা আছেন, মেশিন আছে।”
“আমি যে ঘর পাইছি, ওইডা এই মেশিন-মা আর টিনের চাল দিয়া হয় নাই।”
এটা ছিল আমার বলা সবচেয়ে সত্যি কথাগুলোর একটা। আর সবচেয়ে বিপজ্জনকও।
সে আমার চুলে হাত রাখল। অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর বলল, “ঘুমাও, রেহানা।”
তখনো আষাঢ় ফুরায়নি, শ্রাবণও পুরো নামেনি। ভেবেছিলাম, সময় গড়ালে ভয়টা কমে আসবে। ভুল ছিল সেই ভাবনা। দিন যত গড়ায়, ভয় কমে না, শুধু অন্য ঠিকানায় বাসা বাঁধে।
আমার ভয় বাসা বেঁধেছিল ঘাটে। রোজ বিকেলে কলসি আর কাপড় নিয়ে ঘাটে যেতাম, আর প্রতিটা নৌকার দিকে তাকাতাম। কে নামছে, কী পরনে, চলার ভঙ্গি কেমন। ঘাটের পাটাতনে প্রতিটা অচেনা পায়ের শব্দে বুক ধক করে উঠত।
ভাদ্র মাসের এক রোববার, যাকে আমি সবচেয়ে ভয় পেতাম, সে এল। কিন্তু ঘাট দিয়ে নয়।
সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমেছিল। বারান্দায় বসে আমরা তিনজন ভাত খাচ্ছিলাম, আমি, মা, আর সে। মাঝখানে কুপি, চারপাশে পোকা উড়ছিল। মা সেদিন অনেকদিন পর মুরগির ঝোলের গল্প করছিলেন, কামাল ছোটবেলায় কীভাবে ঝোল নিয়ে কাড়াকাড়ি করত। সে ধৈর্য্য ধরে শুনছিল।
হঠাৎ ছাগল দুটো ডেকে উঠল।
কালি আর ধলি এমন করে সচরাচর ডাকে না। ওরা ডাকে খিদের সময়, আর ভয় পেলে। সেই ডাকটা ছিল স্পষ্ট ভয়ের। ভাতের থালা রেখে আমি উঠে দাঁড়ালাম। উঠানের পেছনে বাঁশঝাড় অন্ধকার, বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ছে। ঠিক সেই অন্ধকার চিরে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।
প্রথমে শুধু একটা ছায়া, তারপর কুপির আলো তার গায়ে পড়ল। কোমর পর্যন্ত কাদামাখা, পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি আর ওপরে একটা ধূসর শার্ট, পিঠে কীসব লেখা। গাল বসা, মুখের একপাশে নিচের ঠোঁট থেকে থুতনি পর্যন্ত একটা কাটা দাগ। সামনের দুটো দাঁত নেই। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, উকুনের ভয়ে জেলে যেমন করা হয়।
সে ঘাট দিয়ে আসেনি। হাওর পেরিয়ে এসেছে কোনো জেলে নৌকায়, তারপর বাঁশঝাড়ের পেছন দিয়ে হেঁটে। আমাদের বাড়ি তার নিজের হাতের তালুর মতো চেনা। ঠিক সে কারণেই ঘাট দিয়ে আসেনি, ঘাট দিয়ে এলে লোকে আগেই দেখে ফেলত, জিজ্ঞেস করত, থামাত।
আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।
সে উঠানে এসে দাঁড়াল। চোখ দুটো আমার ওপর দিয়ে গেল, তারপর বারান্দায়। মাকে দেখল।
"মা।"
গলাটা ভাঙা, কর্কশ, ভেতর থেকে ছেঁড়া। কিন্তু সেই গলা শুনে এক মুহূর্তে আমি যেন আবার বাইশ বছরের সেই মেয়ে হয়ে গেলাম, উঠানে পড়ে রক্ত ঝরছে। হাঁটু কেঁপে উঠল।
মা হাতে ভাতের থালা ধরে বসে আছেন। আমি তাঁর মুখ দেখলাম। সেই মুখে একটা কিছু ঘটে গেল, ঠিক কী ঘটল বলতে পারব না। যেন মাটির অনেক গভীর থেকে কেউ একটা দড়ি টেনে ধরেছে, আর সেই দড়ির অন্য প্রান্ত বাঁধা মায়ের বুকের ভেতর। তারপর মুখটা আবার ঠান্ডা, চুপ।
"মা, আমি কামাল। আমি ফিরা আইছি।"
বারান্দার এককোণে বসে ছিল সে। সবাইকে ছাপিয়ে কথাগুলো তার কানে গেল। হাত থেকে ভাতের প্লেটটা পড়ে গেল, ঠকাস শব্দ। সে উঠে দাঁড়াল। কুপির আলো পড়ল তার মুখের একপাশে।
উঠানের লোকটা সোজা তার দিকে তাকাল। তার মুখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর অবিশ্বাস, তারপর এমন একটা কিছু, যার নাম আমি জানি না। বিস্ময় থেকে ক্রোধের পথে কোনো দূরত্বই নেই, দেখলাম।
"জব্বার," সে বলল, "জব্বার, তুই!"
নামটা শুনে আমার ভেতর কিছুই হলো না। কেন হলো না, সে কথা পরে বলব।
"তুই এইহানে কী করস? আমার ঘরে? আমার মায়ের পাশে?" সে এক পা এগোল, আর আমার সারা শরীর টের পেল সেই এক পায়ের ভার। "আমার বউয়ের..." তার চোখ এবার আমার ওপর স্থির হলো।
আমার পাশের লোকটা, এই নয় বছর পর ফেরা কামাল, ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমার হাত তার হাতে। ভেবেছিলাম তার হাত ঠান্ডা হবে, কাঁপবে। কাঁপছিল বটে, কিন্তু মুখ সে ফেরায়নি। লোকটার দিকে তাকিয়ে খুব স্পষ্ট করে বলল, "আপনে কেডা?"
আমি তার মুখের দিকে তাকাইনি। তাকালে হয়তো ধরা পড়ে যেতাম। সে কথাটা এমন ঠান্ডা গলায় বলল যে আমার কাছেও সেটা অচেনা শোনাল।
ততক্ষণে শামসুর মা চিৎকার জুড়েছেন। আশপাশের বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, কুকুর ডাকছে, বাঁশঝাড়ে কেউ ছুটছে। এক মিনিটের মধ্যে উঠান ভরে গেল। যারা সেদিন সকালে কামালের ঘাটে ফেরা দেখেছিল, তারা আজ আবার জড়ো হলো। চোখে অবিশ্বাস, কিন্তু তার নিচে এক ধরনের চকচকে ভাব, যেটা আমি আগেও দেখেছি। নিজের গ্রামের ভেতর একটা নাটক ঘটতে দেখলে লোকের চোখে এই ভাবটা আসে, দুঃখ, বিস্ময়, কৌতূহল, আর তার নিচে এক ধরনের ক্ষুধা।
"দুই কামাল!" কেউ একজন বলল। কথাটা ঘুরে ঘুরে ছড়িয়ে গেল। "দুই কামাল।"
দ্বিতীয় কামাল হাত বাড়িয়ে মায়ের দিকে ছুটতে গেল। দুজন লোক তাকে ধরে ফেলল। সে ছটফট করে চিৎকার করল, "মা! মা, তুই কথা ক! তুই আমারে চিনস না? আমি কামু!"
মা কথা বললেন না। ছানি পড়া চোখ দুটো উঠানের অন্ধকারে স্থির। ঠোঁট একবার নড়ল, শব্দ বেরোল না।
সত্তার মেম্বার ভিড় ঠেলে ঢুকলেন, হাতে টর্চ, মুখে এক উত্তেজিত হাসি, যা তিনি লুকানোর চেষ্টা করছিলেন। “শান্ত অউন, সবাই শান্ত অউন। রাইতের বেলা বিচার বসে না। চেয়ারম্যান সাবরে খবর দিছি। কাইল সকালে বইয়া মীমাংসা অইব।”
সেই রাতে দ্বিতীয় কামালকে তালা দিয়ে রাখা হলো চেয়ারম্যানের গোলাঘরে। দরজার সামনে দুজন প্রহরী বসল। যাওয়ার পথে সে চিৎকার করছিল, আমার নাম ধরে, মায়ের নাম ধরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি সেই চিৎকার শুনছিলাম। একে একে সবাই চলে গেল।
ঘরে এসে সে বিছানার কিনারায় বসল, মুখ ফ্যাকাশে, হাত দুটো হাঁটুর ওপর। দরজা বন্ধ করে আমি তার সামনে দাঁড়ালাম।
"রেহানা," সে বলল।
"কথা কইয়ো না," আমি বললাম, "দেয়ালেরও কান আছে।"
অনেকক্ষণ সে চুপ করে রইল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল, "ওর মুখে কাটার দাগ আছিল না। আমরা যখন একলগে আছিলাম, তখন তো আছিল না।”
আমি জবাব দিলাম না। বুঝতে পারছিলাম, এই কথাটার আড়ালে অনেক কিছু লুকিয়ে আছে, যা আজ রাতে কেউ মুখ ফুটে বলবে না।
সে ধীরে বলল, "ভাবছিলাম, আরও কয়ডা দিন সময় পাইমু।”
আমি পাশে বসে তার হাতের ওপর হাত রাখলাম। "ঘুমাও। কাইল সকালে সব ঠিক অইয়া যাইব।”
সত্যিই বিশ্বাস করেছিলাম কথাটা। সেই রাতে আমি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেছিলাম, কাল সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে।
চেয়ারম্যান আবদুল মতিন ষাট বছরের মানুষ, শান্ত স্বভাব, আস্তে কথা বলেন। গ্রামের শিক্ষিত মানুষ, দরকারে ঢাকা পর্যন্ত যান, লোকে তাঁকে সম্মান করে, ভয়ও পায়। সকালে তাঁর বাড়ির উঠানে চাটাই বিছানো হলো। মাঝখানে তিনি, দুপাশে মেম্বাররা, সামনে অর্ধেক গ্রাম। আমাদের বসানো হলো একপাশে; মা, আমি, আর ফেরা কামাল। অন্যপাশে দুজন প্রহরীর মাঝে বসে আছে দ্বিতীয় কামাল। গতরাতের চেয়ে তাকে আরও ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চোখ লাল, ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্ত।
চেয়ারম্যান প্রথমে দুজনকে আলাদা আলাদা প্রশ্ন করলেন; বাবার নাম, মায়ের নাম, গ্রামের নাম, কোন স্কুলে পড়েছে, কোন মাস্টার ছিল, বিয়ের দিন কাজী কে ছিলেন, দেনমোহর কত। দুজনই সব প্রশ্নের ঠিক উত্তর দিল। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ফেরা কামাল প্রতিটা উত্তর দিচ্ছিল ধীরে, নরম গলায়। দ্বিতীয় কামাল দিচ্ছিল দ্রুত, চড়া গলায়, কখনো কখনো প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই।
চারপাশে ফিসফিসানি উঠল। “দুইজনেই তো সব জানে। এইডা আবার কেমন কথা?”
তখন দ্বিতীয় কামাল চিৎকার করে বলল, “চেয়ারম্যান সাব, হুনেন। ওই লোকটার নাম জব্বার। নেত্রকোনার মানুষ, বাপ-মা কেউ নাই। আমার লগে তিন বছর জেল খাটছে, পাশাপাশি শুইতাম। রাইতের পর রাইত আমি তারে আমার বাড়িঘরের গল্প কইছি; মায়ের কথা, বউয়ের কথা, গোয়ালঘরের কথা, বাঁশঝাড়ের কথা, সবকিছু। হে সব হুনছে, সব মুখস্থ কইরা রাখছে। আমি জ্বরে পড়লাম, জেল-হাসপাতালে নিল। আর এই হারামজাদাডা আমার আগেই চইলা আইছে! আইয়া আমার নাম ধইরা, আমার জায়গায় বইয়া আছে!”
প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনলাম। প্রতিটাই সত্যি। আর লক্ষ্য করলাম, সত্যিটা বলার ঠিক সেই মুহূর্তে চারপাশের লোকগুলোর মুখে কী ঘটছিল। মাথা নাড়ছিল ঠিকই, কিন্তু উল্টোদিকে। দু-একজন হাসছিল। একজন বলল, "বুদ্ধি আছে বটে ব্যাটার।"
কারণটা সোজা। চেয়ারম্যান সাহেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “যদি তোমার কথাই সত্যি হয়, তাইলে তুমি এইভাবেই কইবা। আবার তুমি নিজেই যদি জব্বার হও, কামালের মুখ থাইক্যা সব হুইনা আইছ, তাইলেও তো এই একই কথা কইবা, খালি নামডা উল্টাইয়া দিবা। এহন আমরা বুঝমু ক্যামনে, কেডা আসল কামাল আর কেডাই বা জব্বার?”
দ্বিতীয় কামাল চুপ করে গেল। এই প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে ছিল না, কারণ এই প্রশ্নের উত্তর আসলে হয়ই না। দুজন মানুষ যদি একই কাহিনির দুই প্রান্তে দাঁড়ায়, কাহিনিটা তখন আর কাউকে কিছু বলে না।
“আমার কাগজপত্র আছে,” হঠাৎ সে বলল। “ঢাকা বিমানবন্দরে আমার...” থেমে গেল। “ওরা আমারে ছাড়পত্র দিছিল। ওইডা নিয়া গেছে। বিমানবন্দরেই রাইখা দিছে।”
"তাইলে কাগজ নাই," চেয়ারম্যান শান্ত গলায় বললেন।
"আমার পাসপোর্ট কফিল কাইড়া রাখছে।"
"তাইলে প্রমাণ নাই।"
দ্বিতীয় কামাল মাথা নামিয়ে নিল, কাঁধ কাঁপছিল।
চেয়ারম্যান সাহেব তখন ফিরলেন মায়ের দিকে। গলা নরম হয়ে এল, মানুষ যেমন ভাঙা কাচের সামনে নরম হয়ে আসে।
“চাচি,” বললেন তিনি, “আপনে তো মা। মায়েরা তো নিজের পোলারে চিনতে পারে। আপনে কন, কোনডা আপনার পোলা?”
পুরো উঠান নিস্তব্ধ হয়ে গেল। হাওরের পানির শব্দটুকুও যেন থেমে গেল।
আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ মুহূর্ত ছিল সেটা। কারণ জানতাম, আমার সামনের সব দিন এখন ঝুলে আছে এই বুড়ো মানুষটার ছানি-পড়া চোখের ওপর। কামালের গলা মায়ের চেনা, নয় বছরের ব্যবধানও একজন মায়ের কানকে পুরোপুরি ঠকাতে পারে না। শুধু আশা করছিলাম, মা বিশ্বাস করতে চাইবেন, তাঁর ছেলে নরম হয়ে ফিরেছে।
কেউ একজন মাকে ধরে নিয়ে গেল দ্বিতীয় কামালের সামনে। মা দাঁড়ালেন, দুই হাত বাড়ালেন, কামালের মুখে হাত রাখলেন।
কপাল ছুঁলেন, ভুরু, নাক, তারপর কাটা দাগের ওপর দিয়ে আঙুল বোলালেন, ধীরে, অনেকক্ষণ। কামালের চোখ থেকে পানি গড়াতে লাগল, মায়ের আঙুল ভিজে গেল। ফিসফিস করে সে বলল, "মা। আমি। আমি কামু।"
মা হাত নামিয়ে নিলেন। দেখলাম, তাঁর ছানি-পড়া চোখ দিয়েও পানি গড়াচ্ছে।
"না," মা বললেন।
উঠানে একটা শব্দ হলো, যেন অনেক মানুষ একসঙ্গে শ্বাস টেনে নিল।
“এইডা আমার পোলা না," মা আবার বললেন, আরও জোরে। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন। কেউ ধরার আগেই হাতড়ে হাতড়ে ফেরা কামালের কাছে এলেন, মুখে হাত রাখলেন। এবার দ্রুত, যেন শুধু নিশ্চিত হচ্ছেন।
"এই আমার কামু।"
দ্বিতীয় কামাল চিৎকার করে উঠল। সেই চিৎকার আমি কোনোদিন ভুলব না। মানুষের গলা থেকে এমন শব্দ বেরোলে বুঝতে হয়, ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেছে। সে মায়ের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল, প্রহরীরা টেনে ধরল। "মা! মা! আমি তোর পেটে হইছি! তুই আমারে নয় মাস পেটে রাখছস! তুই কী করস মা!" গলা ফেটে যাচ্ছিল তার।
মা ফিরে তাকালেন না। আমার হাত খুঁজছিলেন। আমি সেই হাত ধরলাম, বরফের মতো ঠান্ডা।
চেয়ারম্যান এবার ফিরলেন আমার দিকে। “রেহানা মা, আপনে ওর বউ। আপনে কন, আপনের কী মনে অয়?”
আমি উঠে দাঁড়ালাম। সবার চোখ আমার ওপর, সত্তার মেম্বারের চোখ সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় কামালের দিকে তাকালাম। এই প্রথম, গতরাত থেকে এই প্রথম, তার চোখে চোখ রাখলাম। সে তাকিয়ে আছে, কিছু বলছে না। চোখে এমন এক দৃষ্টি, যা আগে কখনো দেখিনি, কারণ আগে সেই দৃষ্টি তার চোখে আসার দরকারই পড়েনি। অনুনয়ের দৃষ্টি।
আমি বললাম, "ও আমার স্বামী না।"
কথাটা এত সহজে মুখ থেকে বেরোল যে আমি নিজেই অবাক হলাম। কাঁপুনি ছিল না, ইতস্তত ভাব ছিল না। গলা কাঠের মতো শক্ত আর পরিষ্কার। পরে একজন বুড়ি মহিলা বলেছিলেন, “বউডার কথায় এক্কেরে আদালতের সুর আছিল গো।”
দ্বিতীয় কামাল হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। প্রহরীরা কাঁধ ছেড়ে দিল। সে আর চিৎকার করল না, শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কেউ নিজের কবর দেখছে।
তারপর, ঠিক যখন মনে হলো সব শেষ, সে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়াল, প্রহরীদের হাত ছাড়িয়ে দুই লাফে ফেরা কামালের সামনে গিয়ে তার গলা চেপে ধরল।
"তুই আমার জিন্দেগি নিলি! আমার মা, আমার বউ..."
লোকজন চিৎকার করে উঠল। চারজন পুরুষ ঝাঁপিয়ে পড়ল। দ্বিতীয় কামালকে টেনে ছাড়ানো হলো, তারপর শুরু হলো মার; লাথি, কিল, বাঁশের লাঠির বাড়ি। প্রথমে ছয়জন, তারপর দশজন। সে মাটিতে পড়ে গোঙাতে লাগল। দেখলাম, সত্তার মেম্বারও একটা লাঠি তুলেছেন।
তখন ফেরা কামাল দৌড়ে এসে লোকগুলোর মাঝে ঢুকল। “ছাইড়া দেন! আর মাইরেন না ওরে! আল্লার দোহাই লাগে, ওরে ছাইড়া দেন!”
লোকগুলো থেমে গেল, অবাক চোখে তাকাল। যে আক্রমণের শিকার হলো, সে-ই কিনা আক্রমণকারীকে বাঁচাচ্ছে?
পরে গ্রামে এই ঘটনা নিয়ে অনেক কথা চলল। একটা বিষয়ে সবাই একমত, কামালের মনটা বড় হয়ে গেছে। সৌদি থেকে ফিরে সে একেবারে ফেরেশতা বনে গেছে।
চেয়ারম্যান রায় দিলেন। জালিয়াতির অপরাধে লোকটাকে গ্রামছাড়া করা হবে, পরের বার ফিরলে থানায় সোপর্দ করা হবে। নৌকায় তুলে ওপারে নামিয়ে দেওয়া হলো তাকে, রক্তাক্ত, লাল চোখ, ভাঙা পাঁজর নিয়ে।
ঘাটে দাঁড়িয়ে দেখলাম নৌকাটা ছোট হতে হতে হাওরের পানিতে মিলিয়ে গেল।
মা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, হাত তখনো আমার হাতে। মুখ না ফিরিয়ে খুব আস্তে বললেন, “বউমা, চলো। ভাত চড়াইতে অইব।”
পরের কয়েকটা দিন গ্রামে আর কোনো কথা হলো না, শুধু এই ঘটনা নিয়েই আলোচনা চলল। রহিমার মা নিজের মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সব বলে এলেন। দোকানে দোকানে চায়ের কাপ হাতে মানুষ বসে বলল, নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি। জালিয়াতের গল্প প্রতিবার একটু একটু বড় হলো। কেউ বলল তার হাতে ছুরি ছিল, কেউ বলল সে নাকি জিনের আসর করে। তিনদিন পর শোনা গেল, লোকটার নাকি আসলে দুটো বউ, একটা ভারতে।
আমাদের বাড়িতে সবাই চুপচাপ রইল।
মা আগের মতোই ছেলের মাথায় তেল দিতেন, ভাত মাখিয়ে খাওয়াতেন, কিন্তু আর গল্প করতেন না। তসবি টানতেন বেশি, নামাজের চৌকিতে বসে থাকতেন বেশিক্ষণ। একদিন জিজ্ঞেস করলাম, "মা, শরীলডা খারাপ নি?"
বললেন, "না গো মা। বয়স অইলে এমনই অয়। চুপচাপ থাকতেই মন চায়।”
আর সে, যাকে আমি তখনো বাইরে কামাল বলেই ডাকি, চোখে পড়ার মতো কমে যেতে লাগল। জাল সারাতে বসত, হাত চলত না। ভাত খেতে বসে থালা সরিয়ে রাখত। রাতে আমার পাশে শুয়ে থাকত পিঠ ফিরিয়ে। একরাতে আমি তার পিঠে হাত রাখলাম। সে সরিয়ে দিল না, সাড়াও দিল না। দেয়ালের দিকে চোখ রেখে বলল, “ওর পাঁজরডা ভাইঙ্গা গেছে, দেখছো? ওরা যখন মাইরছিল, আমি হুনছি, কাঠির লাহান কী জানি একটা ভাইঙ্গা গেল।”
“জালিয়াতগো তো অমন মাইর খাইতেই অয়।”
“রেহানা।” সে ফিরল না। “মা কিল্লাই কইল, ও তার পোলা না? আমি এই কথার মানেই তো খুঁইজা পাই না।"
আমি চুপ রইলাম। ওই প্রশ্নের উত্তর নিজেও জানতাম না। মাকে নিয়ে আমি এতদিন যে হিসাব করে রেখেছিলাম, তাতে মা ছিলেন একজন অন্ধ বুড়ি, যার চোখ নেই, কান ভুল শোনেন। সেদিন উঠানে প্রথমবার টের পেলাম, ওই হিসাব ভুল ছিল।
সে আরও আস্তে বলল, "আমি কি গিয়া সব কইয়া দিমু?”
"কী কইবা?"
সে কিছু বলল না। আমি বললাম, "তুমি কারও কাছে কিছু কইলে তোমারেও গেরামছাড়া করব। খালি গেরামছাড়া না, তোমার নামে মামলা অইব, আর আমারেও সমাজ থেইকা একঘরে কইরা দিব।”
"জানি।"
"তাইলে আর কইয়ো না।"
সে ঘুমাল না। আমিও না। দু'জনে অন্ধকারে চোখ খুলে পাশাপাশি পড়ে রইলাম, যেন দুটো আলাদা নৌকা, একই ঘাটে বাঁধা।
এর কয়েকদিন পর, এক বিকেলে আমি ঘাটে গেলাম।
ঘাটের পাশে একটা পুরোনো নৌকা আছে, অনেক পুরনো, ডাঙায় তোলা, তলা ফাটা, কচুরিপানায় অর্ধেক ঢাকা। ছেলেপুলেরা তাতে লুকোচুরি খেলে, বড়রা বিশেষ যায় না। কলসি আর কাপড়ের বালতি নিয়ে নিচের ধাপে নামলাম। সূর্য হাওরের ওপারে নামছিল, পানি লাল হয়ে এসেছে, পাখিরা সারি বেঁধে ফিরছে।
পেছন থেকে একটা হাত আমার কবজি চেপে ধরল।
চেঁচাইনি। গলা দিয়ে শব্দ বেরোনোর আগেই অন্য হাতটা মুখ চেপে ধরল। তারপর টেনে নিয়ে গেল নৌকার আড়ালে, কচুরিপানার ভেতর। পা ভিজে গেল পানিতে।
“চুপ কর। চিল্লাইস না। তোরে কিছু করতাম না।”
দ্বিতীয় কামাল। এই কয়েকদিনে আরও শুকিয়ে গেছে। ডান হাতটা বুকের কাছে ধরা, শার্টের নিচে বাঁধা কাপড়, পাঁজরের ওপর। চোখের নিচে আরও গাঢ় কালি, একগালে নীলচে ফোলা দাগ। কিন্তু চোখে সেই চেনা দৃষ্টি, তবে আজ তার ওপর একটা পর্দা পড়েছে ক্লান্তি, নাকি শোক, বুঝতে পারলাম না।
হাত সরাল। আমি শ্বাস নিলাম।
"রেহানা।" ফিসফিস করে বলল। "তুই আমারে চিনস। তুই জানস আমি কে।"
আমি কিছু বললাম না।
“তোর বাম বুকের উপরে একটা তিল আছে। বিয়ার রাইতে তুই এমন কাঁপতেছিলি, আমি ভাবছিলাম তোর জ্বর আইছে। তোর মা-বাপে যেদিন আমারে বিয়ার কথা কয়, তুই রান্নাঘরের পিছে লুকাইয়া আছিলি, আমি দেখছিলাম। তোর পেটের বাচ্চাডা যেইটা...” গলা ভেঙে থেমে গেল। “হেইডা আমি জানি, রেহানা। আমি জানি, আমি কী করছি।”
তার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথমবার মনে হলো, হয়তো সে সত্যিই বদলেছে। জেলের অন্ধকারে মানুষ এভাবেও বদলায়, শুনেছি। হয়তো বছরের পর বছর নিজের পাপ নিয়ে ভেবেছে। হয়তো মাফ চাইতেই এসেছে।
“আমি জেলখানায় বইসা ভাবছি, রেহানা। ভাবছি, তুই কেমন আছস। আমি আর মাইরধর করি না, আল্লার কসম, আর কারেও মারি না। খালি একবার সবার সামনে কইয়া দে, আমিই কামাল। তাইলেই সব ঠিক অইয়া যাইব। আমি তোরে আর...”
"আমি আপনারে চিনি না।"
নিজের গলার আওয়াজে নিজেই চমকে উঠলাম। আবার সেই কাঠের মতো শক্ত গলা।
কামালের মুখ বদলে গেল। যেন কেউ চোখের পেছনের আলোটা নিভিয়ে দিল। যে ক্লান্তি আর শোক দেখছিলাম, সেগুলো সরে গিয়ে নিচ থেকে উঠে এল আরেকটা জিনিস, যা আমি আমার শরীর দিয়ে চিনি।
"তুই।" সে বলল। "তুই এইসব করছস। তুই ওই জব্বারটারে... তুই..."
আমার চুলের মুঠি চেপে ধরল। সারা শরীরে সেই পুরোনো ভয় টের পেলাম, ঠিক যেমন ছিল নয় বছর আগে, উঠানের কাদায়। তারপর গলায় ঠেকল ঠান্ডা কিছু একটা। একটা ছুরি। ভাঁজ করা, স্টিলের হাতল। ফলার কোণ চামড়ায় বসে গেল।
"আমি তোরে মাফ করছি। মাফ করছি। কিন্তু তুই যদি আমারে না চিনস..." তার নিশ্বাস মুখে এসে লাগছিল, পচা দাঁত আর ওষুধের গন্ধ। "তাইলে আমার আর কিছু হারানোর নাই। ওইটারে আমি কাইটা ফালামু। তোরেও।"
"চাচি! ও চাচি! কালি কই গেছে! কালি বাঁধন ছিঁড়ে পালাইছে!"
শামসুর গলা, ঘাটের ওপরের রাস্তা থেকে।
কামালের হাত থেমে গেল। এক মুহূর্ত শুনল। তারপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে কচুরিপানার ভেতর দিয়ে ছুটল, পাঁজরে বাঁধা কাপড়, খোঁড়া পা। মুহূর্তে নৌকার ওপাশে মিলিয়ে গেল।
পানিতে বসে রইলাম, কোমর পর্যন্ত ভেজা। হাত কাঁপছে, গলা জ্বলছে। পাশে কচুরিপানার ডালে আটকে একটা জিনিস চকচক করছিল।
ছুরিটা। ধস্তাধস্তিতে হাত থেকে পড়ে গেছে।
তুলে নিলাম, ফলাটা মুড়ে হাতলের ভেতর গুঁজে দিলাম। ব্লাউজের ভেতর লুকিয়ে ফেললাম, শামসুর ডাক আরও কাছে আসার আগেই। শামসু নেমে এলে আমি তখন কলসিতে পানি ভরছি।
"কালি পালাইছে?"
"হ চাচি, ওইদিকে দৌড় দিছে।"
"চল, ধরি।"
সেই রাতে ছুরিটা লুকিয়ে ফেললাম চাউলের টিনের নিচে, রান্নাঘরের কোণের সেই বড় টিনটায়, যেখানে বছরের ধান ঝেড়ে চাল রাখি। কাউকে বললাম না, ফেরা কামালকেও না। পরে ভেবেছি কেন বলিনি। উত্তর সোজা, বললে প্রশ্ন উঠত, একা ঘাটে গিয়ে কী করছিলাম, নৌকার আড়ালে একজন পুরুষের সঙ্গে কতক্ষণ ছিলাম? একজন স্ত্রীলোকের ইজ্জত আমাদের সমাজে ছুরির চেয়েও ধারালো।
কিন্তু আসল উত্তর ছিল আরেকটু গভীরে, যা সেই রাতে নিজেকেও বলিনি।
এবার বলি, দারোগা সাহেবকে আমি কী বলেছিলাম।
কারণ ঘটনার পর পুলিশ এলে আমি যা বলেছি, তার প্রতিটা শব্দ ছিল সত্যি। শুধু সেই সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যিটা আমি বলিনি।
ঘটনা ঘটেছিল ভাদ্র মাসের এক মঙ্গলবার রাতে। সারাদিন বৃষ্টি হয়েছিল, রাতে আরও জোরে। হাওরের পানি এক রাতেই হাতখানেক বেড়ে গেল। টিনের চালে এমন ঝমঝম শব্দ, পাশের মানুষের কথাও শোনা যায় না।
দারোগা সাহেবকে বলেছিলাম, সেরাতে ভাত খেয়ে আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। সে একটু আগে থেকেই চুপচাপ ছিল। রাতের কোনো এক সময় বিছানা থেকে উঠে বাইরে গিয়েছিল, হয়তো পায়খানায়, বা বারান্দায় বসে থাকতে, গভীর রাতে প্রায়ই এমন করত। বৃষ্টির শব্দে গভীর ঘুমে ছিলাম, টের পাইনি। ভোররাতে উঠে দেখি বিছানায় নেই, ভাবলাম নামাজে গেছে। রোজকার মতোই চুলা ধরালাম, ভাতের হাঁড়ি চড়ালাম। তারপর বাইরে এসে ডাক দিলাম, সাড়া নেই। টর্চ হাতে বাঁশঝাড়ের দিকে গিয়ে দেখি, বাঁশের গোড়ায় মাটিতে চিত হয়ে পড়ে আছে। বুকের বাঁ দিকে কালো ক্ষত, শার্ট রক্তে ভেজা, চোখ খোলা।
চিৎকার করেছিলাম। পাড়ার লোক ছুটে এসেছিল।
এটুকুই বলেছিলাম।
সাব-ইন্সপেক্টর মনিরুজ্জামান সেসব একটা লাল খাতায় লিখলেন।
তিনি এসেছিলেন দুপুরের দিকে, নৌকায়, সঙ্গে দুজন কনস্টেবল। বয়স চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ, মোটা গোঁফ, চোখের নিচে ফোলা, হাতে ছোট একটা নোটখাতা। আস্তে কথা বলতেন। চেহারায় এমন এক ক্লান্তি, যেন সারাজীবন মানুষের মিথ্যা শুনতে শুনতে বিরক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছেন। লাশ দেখলেন অনেকক্ষণ, বাঁশের গোড়ায় বসে মাটির দিকে চেয়ে। বৃষ্টিতে সব ধুয়ে গেছে, পায়ের ছাপ নেই, কিছু নেই।
তারপর বসলেন আমাদের উঠানে। প্রথমে মায়ের সঙ্গে, তারপর আমার সঙ্গে।
“আপনার স্বামী কেমন মানুষ ছিল?”
“ভালা মানুষ আছিল, দারোগা সাব।”
“নয় বছর পরে ফিরে এসে এত ভালো?”
“জেলে মানুষ বদলাইয়া যায়।”
তাকালেন আমার দিকে, লম্বা এক দৃষ্টি, যা পড়ে কিছুই বোঝা যায় না। নোটখাতায় কিছু লিখলেন। "শুনলাম, আরেকজন লোক নাকি নিজেকে কামাল বলে দাবি করেছিল?"
"জি, হেরে গেরাম থাইক্যা বাইর কইরা দেওয়া অইছে।”
"আপনি নিশ্চিত, সে আপনার স্বামী ছিল না?"
"আমি ওর বউ, দারোগা সাব। আমি জানি।"
"আপনি জানেন।" কথাটা আস্তে করে উচ্চারণ করলেন, যেন শব্দটার ওজন মাপছেন। "কীভাবে জানেন?"
"আমি জানি, কেডা আমার স্বামী। আমার শরীল জানে।"
শেষ কথাটা সত্যি ছিল। হয়তো তাই বলতে পেরেছিলাম। লক্ষ্য করলাম, দারোগার কলম এক মুহূর্তের জন্য থামল, তারপর আবার চলল।
সত্তার মেম্বারকে আলাদা করে জেরা করলেন, তা দূর থেকে দেখলাম। মেম্বার সাহেব হাত নেড়ে নেড়ে কী সব বোঝাচ্ছিলেন, ঘামছিলেন, মোটা গলা বারবার কেঁপে উঠছিল। পরে শুনলাম, সেরাতে তিনি নাকি তাঁর দ্বিতীয় বউয়ের বাড়িতেই ছিলেন, নদীর ওপারে, আর সে বউ আর বউয়ের মা দুজনেই সাক্ষী। জমির কথাও উঠেছিল। কামাল মরলে সবচেয়ে লাভ কার, সেই প্রশ্ন নিয়ে দারোগা সাহেব অনেকক্ষণ ভেবেছিলেন, জানি।
আর আমাকে নিয়েও ভেবেছিলেন, এটা তখনই বুঝেছিলাম। কারণ বিকেলে আবার আমাকে ডাকলেন, এবার একা, রান্নাঘরের পাশে, যেখানে কেউ শুনবে না।
"আপনি বললেন, ভোরে উঠে আগে ভাত চড়ালেন, তারপর স্বামীকে খুঁজতে গেলেন।"
"আমি রোজ এমনই করি।"
"হ্যাঁ, জানি, সব বাড়িতেই এমন হয়। কিন্তু স্বামী নামাজে গিয়ে থাকলে বাড়িতে নামাজের চৌকি আছে, মসজিদও কাছেই। সেখানে আগে খুঁজলেন না কেন?"
“আমি... ভাবছিলাম, এহনই ফিরব।”
"আচ্ছা।" তাঁর গলায় কোনো বিরক্তি ছিল না। "একটা কথা বলি। আমি বিশ বছর চাকরি করছি। যত খুন দেখেছি, অর্ধেকই ঘরের ভেতর। আর যে ঘরে স্বামী খুন হয়, সে ঘরের বউ প্রথম যে কাজটা করে, সেটা সবসময় একটু অদ্ভুত হয়। কেউ কাঁদে, কেউ হাসে, কেউ ঘর ঝাড়ু দেয়। আপনি ভাত চড়ালেন। অদ্ভুত নয়, তবে মনে রাখার মতো।"
আমি চুপ করে রইলাম, বুকের ভেতর একটা মাছ লাফিয়ে উঠল।
তিনি হাসলেন, ক্লান্ত মানুষের হাসি। "ভয় পাবেন না। আপনাকে নির্দিষ্ট করে সন্দেহ করছি না। সবাইকে সন্দেহ করি, এটা আমার অভ্যাস।"
পরদিন সকালে তাঁর লোকেরা সেই পুরোনো নৌকার কচুরিপানার মধ্যে দ্বিতীয় কামালকে খুঁজে পেল। ওখানেই পড়ে ছিল, ঘুমন্ত, পাঁজর বাঁধা কাপড়ে রক্তের দাগ, জ্বরে পুড়ছে। আর নৌকার তলায়, কাঠের ফাটলে, কনস্টেবলরা পেল একটা ভাঁজ-করা ছুরি, স্টিলের হাতল, ফলায় শুকনো রক্ত।
ছুরিটা দারোগা সাহেব দেখালেন আমাকে, একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটের ভেতর।
"চেনেন?"
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর যে কাজটা করতে হবে জানতাম, সেটাই করলাম। কাঁদতে শুরু করলাম।
“এইডা... ও একদিন আমারে ঘাটে দেখাইছিল। আমার গলায়...” গলায় হাত দিলাম, দাগটা তখনো ছিল। “ভয়ে কাউরে কিছু কই নাই, দারোগা সাব। লজ্জায়। আমি একা ঘাটে গেছিলাম...”
দারোগা সাহেব গলার দাগের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মুখে কোনো ভাব ছিল না। শুধু বললেন, "আমাকে আগে কেন বলেননি?"
"লজ্জায়।"
"হুঁ।" আবার সেই ছোট্ট হুঁ।
তাকে যখন ধরে নিয়ে গেল, দ্বিতীয় কামাল তখন জ্ঞানে ছিল না, জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছিল। কিন্তু নৌকায় তোলার সময় একবার চোখ মেলল। আমাকে দেখল, ঘাটে, ভিড়ের মধ্যে। ঠোঁট নড়ল। শোনা ছাড়াই আমি সেই নড়া পড়লাম।
"তুই!"
শুধু একটা শব্দ।
দারোগা সাহেবও দেখেছিলেন, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছু বললেন না। একটু পরে নৌকা ছাড়ল। চরকান্দা গ্রামের লোকেরা বলাবলি করল, যে লোক নিজের নামে নিজের বাড়িতে ঢুকতে চেয়েছিল, সে শেষে নিজের বোনা বিদ্বেষেরই ফল পেল।
ঘরে ফেরার কথাও ভুলে ঘাটে দাঁড়িয়ে রইলাম।
পাশে দারোগা সাহেব হঠাৎ বললেন, "একটা কথা বলি। আদালতে কেউ জানতে চাইবে না, লোকটা সত্যিই কামাল ছিল কি না। গ্রামের সবাই তাকে কামাল বলছে, তার মা বলছেন কামাল, তার বউও বলছে কামাল। এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী চাইবে তারা?"
তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে, আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, "আর বিধবার মিথ্যা কেউ খুঁজে বেড়ায় না।"
এবার সেই কথাগুলো বলব, যা এতক্ষণ বলিনি।
শুরুতেই বলেছিলাম, কেউ ধরতে পারেনি বলেই আমি ভাবতাম। এতক্ষণ যা বলেছি, তার প্রতিটা শব্দই সত্যি। শুধু যা বলিনি তা হলো, এই ফেরা কামালকে, মানে জব্বারকে আমি নিজেই ডেকে এনেছিলাম।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে এক ঝড়ের রাতে সে এসে আমাদের বাড়ির পেছনের দরজায় টোকা দিয়েছিল। কেউ দেখেনি। এসেছিল কামালের খবর নিয়ে, কামাল যেভাবে তাকে বলে দিয়েছিল। বলেছিল, কামাল বেঁচে আছে, দেশে ফিরবে দুই-তিন মাসের মধ্যেই। কামালের কথাগুলোও হুবহু আমাকে বলেছিল, কারণ সে সৎ মানুষ, সত্য ঢেকে রাখতে জানত না। কামাল তাকে বলেছিল, “আমি ফিরা গিয়া আগে ওই হারামজাদিরে ঠিক করমু। নয় বছরে নিশ্চয়ই আরেক মর্দ জুটাইছে। ওর জিবডা কাইট্টা নিমু।”
সেই রাতে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে লোকটাকে ভেতরে বসিয়েছিলাম, মুড়ি খেতে দিয়েছিলাম। আর তখন কুপির আলোয়, তাকে ভালো করে দেখলাম। লম্বা, রোগা, দাড়ি-ভরা মুখ, বসা চোখ। কামালের একটা ছবি ছিল আমার কাছে, একানব্বই সালের পাসপোর্টের ছবি। সেই রাতে ছবিটা বের করে সামনে রাখলাম। একেবারে এক নয়। কিন্তু জানতাম, নয় বছরের জেল, না-খাওয়া, দাড়ি আর রোদে পোড়া; এসব মিলিয়ে মানুষের মুখ এমন একটা জায়গায় চলে যায়, যেখানে সব পুরুষের মুখ প্রায় একরকম হয়ে আসে। আর যারা চিনবে, তারা চিনবে নয় বছর আগের একটা ছেলেকে, আজকের এই মানুষটাকে নয়।
জিজ্ঞেস করলাম, "আপনের কেউ আছে?"
বলল, “না। বাপ-মা ছোট থাকতেই মইরা গেছে। মামার বাড়িত কামলার মতো খাটছি। হেইখান থাইকাই পালাইয়া সৌদি গেছিলাম। অহন দেশে ফিরা কই যামু, কিছুই জানি না।”
আমার ভেতরে যা জেগে উঠল, তা আজও ঠিকঠাক বলতে পারব না। দয়া নয়, ঘৃণাও নয়; একটা ঠান্ডা সুবিধার হিসাব। একজন মানুষ, যার জন্য কেউ কাঁদবে না, যার খোঁজে কেউ আসবে না। আমার ঘরে জায়গা আছে, আর তার কোনো জায়গা নেই।
গ্রামে সত্য ঠিক করে কে? কাগজ না, প্রমাণ না, ছবি না। যে আগে এসে উঠানে বসে, যার পাশে মা কাঁদে, যার হয়ে বউ কথা বলে, সত্য তারই। এই শিক্ষা আমি পেয়েছিলাম বাবার বাড়িতে, একটা জমির মামলায়, যেখানে আসল মালিক হেরে গিয়েছিল শুধু দেরিতে এসেছিল বলে। ভেবেছিলাম, কামাল ফিরলে তার জায়গায় অন্য একজন বসে থাকলে কী হবে? যে মানুষ নিজের ঘরে ঢুকে অন্য একজনকে নিজের জায়গায় দেখে, তার প্রথম কাজ হয় প্রমাণ করা সে কে। আর প্রমাণ করার চেষ্টাটাই লোকের চোখে তাকে অভিযুক্ত করে তোলে, জালিয়াত বানিয়ে দেয়।
জব্বারকে সবকিছু বলেছিলাম, তিন রাত ধরে। প্রথমে রাজি হয়নি। বলেছিল, “কামাল ভাইয়ের লগে তিন বছর এক বিছানায় ঘুমাইছি। জ্বর হইলে মাথায় জলপট্টি দিছি। আমি হেই ভাইয়ের লগে এমন কাম করতে পারমু না।”
বলেছিলাম, “হে আমারে মাইরা ফালাইব।"
সে চুপ করে গেল। তৃতীয় রাতে বলল, "আমি করমু।"
তবু বুঝেছিলাম, সে শুধু আমার ভয়ের জন্যই রাজি হয়নি। সে একটা ঘর চেয়েছিল। নিজের নামে নয়, অন্য কারও নামে হোক, তবু এমন একটা ঘর, যেখানে ভোরে কেউ তার জন্য ভাত চড়ায়।
সে আমাকে কামালের কাহিনি শোনাল, রাতের পর রাত যা শুনেছিল, কোন পুকুরে ছেলেবেলায় সাঁতার শিখেছে, কোন মাস্টারকে ভয় পেত। বাকিটা আমি তাকে শিখিয়ে দিলাম, কে কে আসবে, কে কী জিজ্ঞেস করবে, কার সামনে চুপ থাকতে হবে, কীভাবে হাঁটতে হবে যাতে কামালের মতো লাগে, অথচ যথেষ্ট বদলানো মনে হয়। ঘাটের দিনটাও আমিই ঠিক করে দিয়েছিলাম, কোন লঞ্চে আসবে, কখন নামবে।
প্রথম রাতে যখন সে বলেছিল, “তুমি আমারে কিছু জিগাইবা না?” ওটা তার কথা ছিল না, ওটা ছিল আমাদের আগে থেকে ঠিক করা কথা। আর যখন সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "তুমি জানো, তাই না?" সেটা কোনো প্রশ্ন ছিল না, সেটা ছিল তার ভয়। জানতে চাইছিল, আমি এখনো রাজি আছি কিনা। বলেছিলাম, ঘুমাও।
ভালোবাসার কথা আগে বলিনি, কারণ তাতে অনেক কিছু ঢাকা পড়ে যায়। সত্যিই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। কিন্তু শুরুতে তাকে বেছে নিয়েছিলাম, যেভাবে মানুষ বাজার থেকে ঠিক মাপের তালা বেছে নেয়। তারপর, আস্তে আস্তে, সেই তালাটাই হয়ে উঠল আমার ঘরের আসল বাসিন্দা।
মাকে নিয়ে আমার হিসাব ভুল ছিল, এই কথা নিজের মুখে স্বীকার করব। বুড়ো মানুষটাকে ভেবেছিলাম শুধুই অসহায় এক অন্ধ। কিন্তু সেদিন ঘাটে, "বাজান" বলার সময়, মায়ের গলায় দুই ধরনের কান্না শুনেছিলাম। তখন ভেবেছিলাম আনন্দ। আজ জানি, ওটা ছিল বিদায়।
তারপর সেই রাত। মঙ্গলবারের রাত।
সালিশের পর থেকে জব্বার ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছিল। প্রতিদিন কামালের কথা ভাবত, ওর পাঁজর ভাঙার শব্দ ঘুমের মধ্যেও শুনত। মঙ্গলবার রাতে, ভাত খাওয়ার পর, বলল, “আমি কাইল সকালে থানায় যামু।”
থালা ধুচ্ছিলাম, হাত থামল না।
"সব কইয়া দিমু। কমু, আমি জব্বার, নেত্রকোনার মানুষ। কমু, ওই লোকটাই কামাল। তোমার নাম কমু না, রেহানা। কমু, আমিই জোর করছি, ভয় দেখাইছি। তোমার কিছু অইব না। পুরুষ মানুষের কথা হেরা বিশ্বাস করব।”
"আর আমি?" জিজ্ঞেস করলাম।
"তুমি?"
“কামাল যদি আবার ফিরা আসে, হে আমারে কী করব?”
অনেকক্ষণ চুপ রইল। তারপর বলল, “আমি আর পারি না রে রেহানা। রাইতে ঘুমাইতে পারি না। আর পারতাছি না।”
তাকে বোঝাতে লাগলাম, ঘণ্টার পর ঘন্টা ধরে, বিছানায় বসে। বললাম গলার দাগের কথা, ঘাটের কথা, ছুরির কথা। বললাম, কামাল আমার গলায় ছুরি ধরে কী বলেছিল। সব শুনল, চোখ বন্ধ করে। শেষে বলল, "তুমি ঠিকই কইছো, কিন্তু তাতে সত্যিটা বদলায় না।”
সেই মুহূর্তে বুঝলাম, আমি তাকে হারাতে চলেছি। তাকে হারালে সব হারাব। আর ঠিক তখনই আমার ভেতরের সেই ঠান্ডা জায়গাটা জেগে উঠল, যে জায়গা দিয়ে তাকে বেছে নিয়েছিলাম।
বললাম, “আইচ্ছা। কাইল সকালে যাইয়ো।”
সে তাকাল, বিস্মিত, কৃতজ্ঞ। তার হাত ধরলাম। "আজ রাইতটা আমার।"
সেই রাতে তাকে এমনভাবে ভালোবাসলাম, যেভাবে আমি কাউকে কখনো বাসিনি। তার প্রতিটা ইঞ্চি মুখস্থ করে নিলাম। বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে গেল, কানে কানে নাম ধরে ডাকলাম, জব্বার, জব্বার। এই প্রথম। সে কেঁদে ফেলল, আমিও কাঁদলাম। সেই কান্না সত্যি ছিল, এটা অস্বীকার করব না।
পরে সে বিছানা থেকে উঠল। বলল, “ঘুম আইব না, একটু বাইরে গিয়া বসি।”
জানতাম কোথায় বসবে, বাঁশঝাড়ের ধারে, যেখানে ইদানীং একা বসে থাকত রাতে। বিছানায় পড়ে রইলাম। দশ মিনিট, বিশ মিনিট। টিনের চালে বৃষ্টি। তারপর উঠলাম, ব্লাউজ গায়ে দিলাম, চালের টিনের নিচ থেকে ছুরিটা বের করলাম, বাইরে বেরিয়ে এলাম।
বাঁশের একটা গুঁড়ির ওপর বসে ছিল সে। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মুখ তুলে তাকাল।
"ঠান্ডা লাগব," বললাম, "ভিতরে চলো।"
হাত বাড়িয়ে আমাকে কোলের ওপর টেনে নিল। দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলাম, গলা জড়িয়ে। ডান হাতের ছুরিটা রইল তার পিঠের পেছনে। সে চুলে মুখ গুঁজল, আমি তার কাঁধের ওপর দিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর ছুরিটা তুললাম, বাঁ হাতে তার মুখ চেপে ধরে, বুকের বাঁ দিকে, পাঁজরের নিচে, একবার মাত্র।
সে নড়ে উঠল। হাতের নিচে ঠোঁট কাঁপল। আমার দিকে তাকাল, একটুও অবাক হয়নি। শুধু একটা শব্দ বেরোল, আমার নামের মতো, যদিও চাপা পড়ে ঠিক বোঝা গেল না।
তারপর কোলের ওপর শান্ত হয়ে গেল।
তাকে শুইয়ে দিলাম, চিত করে, ঠিক যেভাবে পরে দারোগাকে বলেছিলাম। ব্লাউজ রক্তে ভিজে গেছে। বৃষ্টির পানি দিয়ে হাত-পা ধুলাম। ছুরিটা ঝেড়ে নিয়ে নিচু হয়ে ছুটে গেলাম ঘাটের দিকে। পুরোনো নৌকার তলায়, কাঠের ফাটলে ছুরিটা গুঁজে দিলাম, মাত্র দুই হাত দূরে কামাল জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। সে নড়ল না। ফিরে এলাম। রান্নাঘরে গিয়ে রক্তমাখা ব্লাউজ খুলে চুলায় গুঁজে দিলাম, ওপরে কয়লা চাপিয়ে, আর নতুন ব্লাউজ গায়ে দিলাম।
তারপর সবচেয়ে সহজ কাজটা করলাম। চালের টিন থেকে চাল মাপলাম, হাঁড়িতে পানি ঢাললাম, চুলার ওপর বসালাম। ধোঁয়া উঠতে লাগল, ব্লাউজ পুড়ছে। কেউ আগুনের গন্ধ পেলে ভাতের গন্ধই ভাববে।
ভাত চড়ানো ছিল আমার প্রথম কাজ। আজও ভাবি, কেন করেছিলাম এটা? দারোগা সাহেবকে বলেছি, রোজই করি এমন। কিন্তু সত্যি হলো, তখন মাথায় একটাই চিন্তা ছিল, সকালে মা কী খাবেন।
ভাতের হাঁড়ি বসিয়ে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পড়লাম। সারা শরীর কাঁপছিল, আর টের পাচ্ছিলাম, সারাজীবন ঘুমিয়ে থাকা কিছু একটা এই প্রথম পুরোপুরি জেগে উঠেছে।
মামলা চলল প্রায় দেড় বছর, কিশোরগঞ্জের জেলা আদালতে। তিনবার সাক্ষী দিতে গিয়েছি। প্রতিবার ঘাট থেকে নৌকা, নৌকা থেকে বাস, বাস থেকে হেঁটে আদালত। প্রতিবার উকিল সাহেব জিজ্ঞেস করেছেন, "আপনি কি নিশ্চিত, আসামি আপনার স্বামী নয়?" বলেছি, "জি।" মা-ও তাই বলেছেন। চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন। সত্তার মেম্বারও বলেছেন, আর বলার সময় আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেই চোখে এমন কিছু দেখেছিলাম যা ভাবিয়ে তুলেছিল, তিনি কতটা জানেন!
মরা মানুষটা আসলে কে ছিল, এটা কেউ জানতে চায়নি।
শুধু আসল কামাল চিৎকার করেছিল। আদালতে, কাঠগড়ায়, প্রতিটা শুনানিতে। "আমি কামাল! আমার বউ সব জানে! ও আমার ঘর ভাঙছে!" বিচারক একসময় থামিয়ে বললেন, "আপনি নিজেই প্রমাণ করছেন আপনি জালিয়াত। আপনার কথামতো নিহত ব্যক্তি আপনার সঙ্গে জেলে ছিল। তাহলে আপনি তাকে চিনতেন, আর তাকে খুন করার মোটিভও আপনার ছিল।"
রায় এল যাবজ্জীবন। ফাঁসি হলো না, হয়তো বিচারক সাহেব তার পাগলের মতো আচরণের মধ্যে এমন কিছু সন্দেহ করেছিলেন, যার নাম তিনি নিজেও জানতেন না।
আদালত থেকে বেরোনোর সময় সে আমার পাশ দিয়ে গেল, দুই সিপাইয়ের মাঝে, হাতে হাতকড়া। আমার দিকে তাকাল না। যাওয়ার পথে শুধু খুব নিচু গলায় বলল, ঠিক সেই গলায়, যেটা ঘাটে শুনেছিলাম, "তুই ডাইনি।"
জবাব দিইনি।
রায়ের দিন দারোগা সাহেব আদালতে ছিলেন। দূর থেকে একবার মাথা নাড়লেন, ঠিক বিদায়ের ভঙ্গিতে। কিছুদিন পরে শুনলাম, উত্তরের কোনো জেলায় বদলি হয়ে গেছেন। যাওয়ার আগে তাঁর খাতাটা থানার আলমারিতে তালা দিয়ে রেখে গেছেন। সেখানে কী লেখা আছে, জানি না। হয়তো কিছুই নেই।
আর মা? আরেকটা শীত পার করলেন। মাঘ মাসে এক ঠান্ডা রাতে, ঘরে কুপির আলো ছোট, মায়ের পাশে বসে পা টিপে দিচ্ছিলাম। অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বললেন, "বউমা, ঘুমাইছো?"
"না মা।"
“আমার একটা কথা কওনের আছে।”
হাত থামালাম না।
“ছানি পড়লে চোখ কমে, কান বাড়ে। এইডা জানো তো?” টিনের চালের দিকে মুখ করে বললেন, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন। “ঘাটে যেদিন নামল, আমি ওর গলা হুনলাম। ‘মা’ কইয়া ডাক দিল। আমি জানতাম, এইডা আমার কামু না। কামুর গলায় ডাকের মধ্যে একটা দাবি আছিল। আর এই পোলার গলায় আছিল একটা ভিক্ষা।”
হাত থেমে গেল আমার।
“কান্দতেছিলাম, কারণ বুঝতে পারতেছিলাম, আমার পোলা আর নাই। হয় মইরা গেছে, নয়তো যেইখানে আছে, আমার কাছে আর ফিরা আইব না। কিন্তু ওই মানুষটারে আমি রাখলাম। কারণ, সে আমার পা টিপা দিত, হাত ধইরা অজুর পানি আগাইয়া দিত। আমার কামু একবারও এই কাম করে নাই, বউমা। একবারও না।”
একটু থামলেন, বুকের ভেতর একটা ঘড়ঘড় শব্দ।
“যেদিন আসল কামু উঠানে আইল, ওর গলা হুইনা বুকের ভিতরটা কেমন ওলটপালট হইয়া গেল। পেটের পোলা, আমি চিনুম না তারে? মুখে হাত দিলাম, ঠোঁটে হাত দিয়া দেখলাম। বুঝলাম, ওই ঠোঁট আমার বংশেরই, ওর বাপের মতো। যে ঠোঁট দিয়া বাড়ির মাইয়াগো গালি দিত।”
"মা..."
“তোমার শ্বশুর আমারে মারত, তুমি জানো। নিজের চোখে দেখছি, আমার পোলাও ওই একই হাতে তোমারে মারছে। যেদিন তোমার বাচ্চাডা পড়ে গেল, তোমার কপালে হাত রাখছিলাম, মনে আছে? ওই দিনই ঠিক করছিলাম, এই বংশের আর কোনো মাইয়ারে কেউ মারতে পারব না। কিন্তু ওই দিন কিছু করি নাই, করছি পরে।”
কিছু বলতে পারলাম না, গলা শুকিয়ে গেছে।
“কইছিলাম, ‘এইডা আমার পোলা না।’ মিছা কই নাই, বউমা। মায়েরা পোলার মুখ চেনে। সত্যি কথাই কইছিলাম, খালি উল্টা দিক থেইকা।”
কুপির দিকে মুখ ফেরালেন, যদিও আলো তিনি দেখতে পান না।
“আর মঙ্গলবার রাইতে আমি ঘুমাই নাই। দরজা খোলার আওয়াজ হুনছি, দুইবার, বৃষ্টির মইধ্যে। তোমার পায়ের আওয়াজও হুনছি, কাদার মইধ্যে। আমি জানতাম, তুমি কই গেছ, আর কী লইয়া গেছ।”
কুপির শিখা একবার কেঁপে উঠল।
“তারপর হাঁড়ির ঢাকনার আওয়াজ হুনছি, অনেক ভোরে। ভাবলাম, মাইয়াডা ভাত চড়াইছে। ভাত চড়ানো তো ঠিকই আছে। আমি বুড়া মানুষ, বউমা। সকালে ভাত না খাইলে চলে?”
চোখ দিয়ে পানি গড়াতে লাগল আমার, কিন্তু কোনো শব্দ করলাম না।
“থানায় কিছুই কই নাই। ক্যান কই নাই, হেইডা জিগাইয়ো না। ওই পোলাডারেও ভালোবাসছিলাম, হেইডা সত্যি কথা। তয় আমার ঘরে যে মাইয়াডা ভাত বাড়ে, তারে পুলিশের হাতে তুইলা দেই কেমনে? আর আমার কামুরে... হেরে তো অনেক আগেই মাফ কইরা দিছিলাম, বউমা। মাফ করা সহজ, কিন্তু আগলাইয়া রাখা বড় কঠিন। আমি পারি নাই, আমার কামুরে আগলাইয়া রাখতে পারি নাই।”
মা আমার দিকে মুখ ফেরালেন। ছানিতে ঢাকা চোখ দুটো আমার ওপর স্থির, যেন পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছেন।
“তুমি যা করছ, হেইডার হিসাব আল্লার কাছে দিবা। আমি তোমার বিচার করতাম যামু না। নিজের হিসাব নিজেই দিমু। আমার দুই পোলার এক পোলারে আমি ফাঁসাইছি, আরেক পোলা আমার চোখের সামনে মইরা গেল, আমি কিছুই করতে পারি নাই। আমরা দুইজনই সমান, বউমা।”
আর কিছু বললেন না। পা টিপতে লাগলাম, অনেকক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লেন।
সকালে ডাকলাম, "মা, ওঠেন, ভাত হইছে।"
তিনি আর উঠলেন না।
আজ রান্নাঘরে বসে আছি। চুলার ওপর হাঁড়ি। মা নেই, জব্বার নেই, কামাল জেলে। গ্রামের লোক দয়ার চোখে দেখে, কেউ কেউ ভক্তির চোখে। 'কামালের বিধবা' বলে ডাকে। সুন্দর সেলাই করি বলে অনেক মেয়ে কাজ নিয়ে আসে। সত্তার মেম্বার আর এদিকে আসেন না। তাঁর সঙ্গে আমার এখন ভালোই সম্পর্ক। দুজনেই দুজনের সব জানি, তবু কেউ কাউকে কিছু বলি না।
আজ সকালে চালের টিনের ঢাকনা খুললাম, হাত ঢুকিয়ে চাল তুললাম। তিন মুঠো। হাঁড়িতে ঢালার সময় খেয়াল করলাম, তিনজনের চালই মেপেছি।
হাত থামালাম। এক মুঠো ফিরিয়ে রাখলাম, তারপর আবার ফিরিয়ে নিলাম।
একজন মরেছে, আরেকজন বন্দি, একজন এখনো বেঁচে। তিন সংখ্যাটাই আমার কাছে ঠিক মনে হলো।
ভাত চড়ালাম।
'

No comments:

Post a Comment