Monday, February 9, 2026

রাশিদার রাশিফল

 

নবজাতকের কচি কন্ঠের চিৎকার ভোরের মোলায়েম বাতাসে অনুরণিত হয়। সে পৃথিবীতে তার অস্তিত্বের জানান দিতে বেপরোয়া। আঁতুড় ঘরে এখনও জমে আছে আবছা আঁধার। রাশিদা আশাহত হবার আশংকা জেনেও উৎকন্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করে - নানী, পোলা না মাইয়া ?

দাই শরীফার মা রাত জাগার ক্লান্তি ভুলে উৎফুল্ল- এই প্রসব করাতে জব্বর কষ্ট পোহাতে হয়েছে ! গলায় নাড়ি প্যাচানো ছিলো ! ফুল বের করতেও গলদঘর্ম হতে হয়েছে। রাশিদার মনের অবস্থা চিন্তা না করেই সে বলে, “পরীর লাহান মাইয়া হইসে গো রাশিদা- তোর গায়ের রং আর ব্যাপারির মতো নাক নকশা পাইসে !”
চতুর্থ কণ্যা। শরীফার মা’র ডলাডলির চোটে এখন আরও প্রবল তেজে হাত পা ছুঁড়ে চিৎকার করছে । রাশিদার খুব ইচ্ছে করে শিশুটিকে গলা টিপে মেরে ফেলতে। মরা বাচ্চা ছেলে না মেয়ে এটা নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামায় না।
কিন্তু শ্রান্ত দেহে শক্তিতে কুলায় না ! তাছাড়া, শরীফার মা কাঁথা পেচিয়ে শিশুকে নিয়ে বাইরে চলে যায়!
খালেক তখন সবে ফজরের নামাজ শেষ করে এসে দাওয়ায় বসেছে ! আংগুরি এই ভোরেই গোসল সেরে পুকুর থেকে ফিরছে ! উদিয়মান সূর্যের কমলা রশ্মি তার ভেজা চুলের ডগায় পড়ে ঝিকমিক করছে ! কাঁধের ভেজা গামছার পানি চুইয়ে ছিটের লাল ব্লাউজ ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। কী অপার্থিব সৌন্দর্য! খালেক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে।
এই নারীকে একেক সময় একেক রকম লাগে ! তাকে বহুবার একান্তে পেয়েও তার দিকে নির্মিশেষ চেয়ে থাকার আশ মেটেনা!ঐ শরীর তার চেনা তারপরও কী ভীষণ রকম অচেনা মনে হয় ! ইসরাফীল ফেরেশতা যেদিন শিংগায় ফুঁক দিয়ে কেয়ামত ঘোষনা দিবেন - সেই মহাপ্রলয় ক্ষণেও বুঝি এই নারীর দিকেই তার সব ধ্যান জ্ঞান আটকে থাকবে !
শরীফার মার কোলে সদ্যজাত শিশুকে দেখে আংগুরি কাসাব বাটিতে মধু নিয়ে ছুটে আসে! “ও ছোটমিয়া, পরী হইসে গো - কইন্যার কানে আযান দাও”
খালেক সম্বিৎ ফিরে পায় ! ছেলে না মেয়ে এসব নিয়ে তার চিন্তা নাই ! এই জগৎ সংসারে জমি জিরাত আর আংগুরিজান এই দুই ছাড়া তার আর কোন বিষয়ে আগ্রহ নাই !
রাশিদা চল্লিশ দিনের মাথায় ছোটিঘর থেকে বের হয়ে দাওয়ায় বসে। এই ক’দিন নুরি,জরি, স্বপ্না কি খেয়েছে, কেমন আছে সে খোঁজ নেয়নি! বড় মেয়ে নুরি মাঝে মাঝে উঁকি মেরে মা কে দেখে গেছে! মা বেশিরভাগ সময়ই একা একা কি যেন বক বক করে। কখনও কখনও জোরে চিৎকার দেয়! বড় ভয় করে নুরির!
পরীর জন্মের পর শাশুড়ি এবার রাশিদার মুখও দেখেন নি। যে বউ একের পর এক চার চারটা মেয়ে বিয়ায় তার মুখ দেখতে কোন শাশুড়ি চায় ! রূপ দেখে পুলার বউ বানিয়ে ঘরে আনা চরম ভুল হইসে ! বিয়ের চার বছর পর চুরখাই এর লোকের মুখে শুনেছে রাশিদার কাহিনী। রাশিদার জ্বিন গর্ভে কোন পুত্র সন্তান জন্ম নিতে দেয় না!
রাশিদার বুনিতে দুধও আসতে দেয় না এই দুষ্ট জ্বিন ।রাশিদা তার কোন সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ায় নাই ! খালেককে আরেকটা বিয়ে করানোর বিষয়টা ভাবতে হবে ! আংগুরিকে দিয়ে প্রস্তাবটা খালেকের কানে তুলতে হবে। খালেক আংগুরির কোন কথা ফেলে না !
শাশুড়ি দিনরাত এই নিয়ে ভাবে !
আংগুরি উঠানে পাটি বিছিয়ে পরীকে শুইয়ে তার গায়ে সরিষার তেল মালিশ করছে! বিষনয়নে দৃশ্যটা দেখে রাশিদা!
দূর থেকে শরীফার মা কে পান চিবুতে চিবুতে আসতে দেখে!
দাই এর কি কাজ এই বাড়িতে এখন ?
দাই এসে গুঁজগুজ করে আংগুরির কানে কানে কি যেন বলে !
আংগুরি লাজুক মুখে মাথা নাড়ে !
জ্বিনটা ক্ষেপায় রাশিদাকে! কিছু একটা আছে। অশুভ কিছু ! জানতে হবে- “দাই বুড়ি মা*গী এত পিরীত করে কি বললো - আংগুরিকে !”

আংগুরি হাসি হাসি মুখে শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে দাই এর হাতে কি যেন গুঁজে দেয় ! নিশ্চয়ই টাকা! আংগুরির আঁচলে সবসময় টাকা বাঁধা থাকে। পোলাপান কটকটি, বাতাসার জন্য আব্দার করলে,শাশুড়ির হঠাৎ বাতের ব্যথার তেল দরকার হলে খালেক বাড়ি না থাকলেও যেন সমস্যা না হয় এজন্য খালেক সবসময় আংগুরিকে টাকা দেয়। রাশিদার হাতে টাকা দেবার প্রশ্নই উঠে না ! রাশিদা সংসারের দরকারি অদরকারি কোন কিছুই মনে রাখতে পারেনা।
রাশিদা তীক্ষ্ণ চোখে দুজনকে লক্ষ্য করে। তার মন বলছে কোন একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে দাই আর আংগুরির মধ্যে! রাশিদার হয়তো পোলা হইসিলো দাই বেডি তারে বদলাইয়া সবতেরে কইসে তার মাইয়া হইসে! পরী হয়তো তার নিজের কইণ্যা না। সব সম্পত্তি আংগুরির দুই পোলার নামে করার মতলব!!
রাশিদার মনে সন্দেহ দানা বাঁধে! এই চার কন্যা কি তার পেটের সন্তান? কই ?! তার গুষ্টির মধ্যে তো কারও গর্ভে পরপর চার কন্যা জন্মে নাই ! তবে তার কেন পরপর চার মাইয়া। তার জ্বিনের সাথে সে পরামর্শ করে - সারাদিন নিজের মনে কথা বলে!
নিজের চিন্তায় অতিরিক্ত মগ্ন থাকার কারণে রাশিদা টের পায়না আংগুরি ইদানিং একটু ধীরে সুস্থে চলাফেরা করে। তার লাউ এর ডগার মতো লকলকে শরীর একটু যেন নুয়ে পড়েছে । আজ কদিন হলো কন্যাদের নিয়ে পুকুরে ঝাঁপা ঝাঁপি করে গোসল করেনা সে- কুয়োতলায় কোনমতে গোসল সেরে নেয় ! চকচকে উজ্জ্বল শ্যমলা ত্বকের জৌলুস খানিকটা ম্লান । মুখে ঘাড়ে হালকা কালো ছোপ। তবুও, বুক আর নিতম্ব আগের চেয়ে ভারী হয়ে তাকে আরও বেশি মোহনীয় দেখায় ।
এর মাঝে দাই শরীফার মা আবারও আসে! আংগুরির ঘরে দরজা বন্ধ করে কি এত কথা তার ? এত মৃদু কন্ঠে আলাপ চলে যে, দরজায় কান পেতেও রাশিদা শুনতে পায়না । শাশুড়ির সাথে আলোচনা করলে ব্যাপারটা খোলাসা হতো হয়তো কিন্তু শাশুড়ি এখনও রাশিদাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে থাকেন।
ধীরে ধীরে রাশিদার বদ্ধমূল ধারনা হলো, সে পুত্রসন্তান জন্ম দিয়েছিলো -আংগুরি এই দাই এর সহযোগিতায় তাদের মেরে ফেলেছে ! সংসার আর সম্পত্তির উপর নিরংকুশ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য এটা কালনাগিনী আংগুরির চাল। এই চরম অযৌক্তিক ধারনা সে মনে প্রাণে প্রবলভাবে বিশ্বাস করা শুরু করলো।
মেয়েদের মুখের দিকে অপলকে চেয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করে কোনটা তার পেটের সন্তান আর কোনটা দাই বদলে দিয়েছে! নিজের সাথে কারও মুখের আদলের মিল পায়না সে!
ধীরে ধীরে এমন অবস্থা হলো রাশিদা মৃত পুত্র সন্তানের সাথে কথা বলা শুরু করলো ! রাশিদার মনোজগতে যে প্রবল তোলপাড় চলছে তা কারও নজরে এলো না - অথবা এলেও এটা যে ভয়াবহ আনজাম ঘটাতে চলেছে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামালো না!
একদিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে । আংগুরির ঘর থেকে দাই শরীফার মা বের হয়ে উঠানে পা দেবে ঠিক সেই সময় আড়াল থেকে আচমকা রাশিদা বের হয়ে এসে চুলের মুঠি ধরে হ্যাচকা টানে তাকে মাটিতে ফেলে দমাদম চ্যালাকাঠ দিয়ে বাড়ি শুরু করে ! মারার ফাঁকে অনর্গল বকে চলে, “আমার পোলাদের ক্যান মারলি তুই ? আমার পেটের সন্তানদের ক্যান মারলি ?”
বৃদ্ধা দাই এই আকস্মিক আক্রমণে হত বিহ্বল হয়ে যায় । চিৎকার দিতেও ভুলে যায় ! রাশিদার হ্যাংলা শরীরে আজ যেন প্রেতের শক্তি ভর করেছে। আংগুরি আর তার শাশুড়ি দৌড়ে আসে! চালাঘর থেকে কামলারা ভীড় করে! একমাত্র আংগুরির স্বামী মালেক যেমন দড়ি পাকাচ্ছিলো তেমনি বসে থেকে চুপচাপ কাজ করে যায় !
খালেক মাগরিবের নামাজ পড়ে এসে এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়।
রাশিদা হাফাতে হাফাতে খালেককে বলে, “এই বুড়ি মা*গী ট্যাহার লেইগ্যা আমার পুলা মাইরা ফালাইসে! ট্যাহা নিতে সে এই বাড়িত আহে !”
খালেক ভেবে পায়না কি বলবে ! শেষ পর্যন্ত বলে, “আংগুরিজান পোয়াতি- চৌদ্দ বছর পর আবার পেটে সন্তান আসছে তাই দাই নিয়মিত তার দেখাশোনা করতে আসে !”
আংগুরির সন্তান হবে ? এ কি করে সম্ভব? রাশিদা এই বাড়িতে বউ হয়ে আসার এগারো বছর যাবৎ কখনও তার ভাসুরকে স্ত্রী আংগুরির সাথে ঘনিষ্ঠ হতে দেখেনি! এমনকি চোখাচোখি বা কোন কথোপকথন পর্যন্ত করতে দেখেনি ! ভাসুর মালেক শক্ত সোমত্ত জোয়ান পুরুষ, দৃঢ় চোয়াল ,পেশীবহুল সুঠাম দেহ কিন্তু নিজের পৌরুষ সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল নয়।সে তার নিজের জগতে বসবাস করে - নারীসঙ্গ সম্পর্কে সে অজ্ঞাত।
খাওয়া খাদ্য ব্যতীত আর কোন প্রকার শারিরীক চাহিদা থাকতে পারে সেটা তার বোধগম্য নয় ॥ নারী তো দূরের কথা কোন মানুষ ডাকলেও সে সাড়া দেয়না, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনা! তবে ?
হঠাৎ রাশিদার মনে পড়ে যায় , খালেকের ঘরে দেখা সেই দৃশ্য ! কুপির আলোয় দুটি চকচকে ঘর্মাক্ত শরীর - কানে বাজে দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের সেই রোম খাড়া করা শব্দ …..
পৃথিবী মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে যায়…
(চলবে)

No comments:

Post a Comment