Sunday, August 16, 2026

নীরবতা

 


দীপ্তির সংসারটা ঠিক যেন একখণ্ড কাঁচের মতো। স্বচ্ছ, সুন্দর, কিন্তু সামান্য আঘাতেই চুরমার হয়ে যাওয়ার ভয়ংকর এক প্রবণতা তাতে মিশে আছে। আজম আর দীপ্তির বিয়ের মাত্র দুই বছর। প্রেম করে বিয়ে, অথচ সেই প্রেমের রঙ যে এতো দ্রুত ধূসর হয়ে যাবে, সেটা দীপ্তি স্বপ্নেও ভাবেনি।

​রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশটা আজ বড্ড ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। দীপ্তি একমনে রান্না করছিল, কিন্তু তার কান পড়ে আছে ড্রয়িংরুমে, সেখানে থমথমে স্তব্ধতা। গত সাত দিন ধরে এই বাড়িতে কেউ তার সাথে কথা বলছে না। এমনটা মাঝে মধ্যেই হয়। দীপ্তির তখন পাগল পাগল লাগে।
ঘটনার সূত্রপাত অতি সামান্য এক বিষয় নিয়ে। বিকেলের নাস্তায় দীপ্তি পিয়াজুটা একটু কড়া করে ভেজেছিল, যা শাশুড়ি হামিদা বানুর দাঁতে সয়নি। ​হামিদা বানু সেদিন প্লেটটা সরিয়ে দিয়ে শুধু বলেছিলেন,
- বাড়ির বউ হয়ে এলে রান্নাবান্না শিখে আসতে হয়। তোমার বাপ- মা কিছুই না শিখিয়ে মেয়ে বিদায় করলেন কেমন করে?
এত তুচ্ছ ঘটনায় বাবা মা নিয়ে কথা বলায় দীপ্তির মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে সামান্য প্রতিবাদের সুরেই বলেছিল,
- মা, সব কথায় আমার বাবা মাকে টেনে আনা কি খুব জরুরী? আর আপনার ছেলে আজ একটু মুচমুচে খেতে চেয়েছিল বলেই এরকম করে বানিয়েছি।
​ব্যাস, এটুকুই ছিল অপরাধ। হামিদা বানু সেই যে মুখ ফেরালেন, তারপর থেকে বাড়িতে এক অখণ্ড নীরবতা। আর আজম? সে তো মায়ের আঁচলধরা আদর্শ ছেলে। মায়ের গোমড়া মুখ দেখে সেও দীপ্তির সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল।
​দীপ্তি প্রথম দুই দিন পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিল। সে বারবার আজমের কাছে গিয়েছে।
-আজম, শোনো না, একটা সামান্য পিয়াজু নিয়ে এতো রাগ! কথা বলছো না কেন? দীপ্তি আজমের হাত টেনে ধরেছিল।
আজম কোনো উত্তর দেয়নি। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইল গভীর মনোযোগ দিয়ে, যেন দীপ্তি ওখানে নেই।
​এক বিকেলে দীপ্তি যখন ড্রয়িংরুমে বসে শূন্য চোখে টিভির দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন তার ফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল মেহের ভাবী। মেহের এই বাড়ির বড় বউ । আজমের বড় ভাই আর মেহের বছর পাঁচেক আগেই এই বাড়ি ছেড়ে আলাদা হয়ে গেছে। সবাই বলে মেহের নাকি খুব বেয়াদব, তাই শাশুড়ির সাথে বনিবনা না হওয়ায় সংসার ভেঙে বের হয়ে গেছে। কিন্তু দীপ্তি এতদিনে বুঝে গেছে আসল সত্যিটা কি?
​দীপ্তি ফোনটা কানে নিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল,
-হ্যাঁ ভাবী।
ওপাশ থেকে মেহেরের শান্ত গলা শোনা গেল,
-এখনও কি নীরবতা পালন চলছে দীপ্তি? সাত দিন হয়ে গেল না?
দীপ্তি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-হ্যাঁ ভাবী, আজমও কথা বলছে না। আমি কি করব বুঝতে পারছি না, দম বন্ধ হয়ে আসছে।
​মেহের ওপাশ থেকে হাসল।
-দীপ্তি, একটা কথা মনে রাখবে। ওরা তোমাকে দিয়ে ঠিক সেটাই করাচ্ছে যা ওরা চায়। তুমি কান্নাকাটি করবে, ক্ষমা চাইবে, আর ওরা তৃপ্তি পাবে। আমি যেদিন থেকে ওদের এই ফাঁদে পা দেওয়া বন্ধ করলাম, সেদিনই আমি খারাপ হয়ে গেলাম। তোমার ভাই অবশ্য আজমের মতো ছিল না বলেই আমরা আজ শান্তিতে আলাদা সংসার করছি। কিন্তু তুমি যদি এখনই শক্ত না হও, তবে এই আজীবন সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট তোমার মনের ভেতরটা ধ্বংস করে দেবে।
​দীপ্তি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
-তাহলে আমি কি করব?
মেহেরের কণ্ঠস্বর এবার দৃঢ় হলো।
-ওরা তোমাকে অবহেলা করছে তো? তুমিও ওদের অবহেলা করো। নিজেকে ভালোবাসো, দেখাও যে ওদের কথা না বলায় তোমার কিছু যায় আসে না। সাজো, ভালো খাবার খাও, নিজের মতো থাকো, গান শোনো, টিভি দেখো, বই পড়ো, বাইরে ঘুরে আসো। মনে রাখবে দীপ্তি, ইগোকে ইগো দিয়েই ভাঙতে হয়।
​মেহের তাকে ফোনে আরও কিছু দীর্ঘ পরামর্শ দিল। ঠিক কিভাবে কথা বলতে হবে, কিভাবে তাকাতে হবে সবটাই যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের পরিকল্পনা।
​পরদিন সকাল। দীপ্তি যথারীতি ঘুম থেকে উঠল। কিন্তু আজ তার চোখেমুখে কান্নার কোনো ছাপ নেই। সে খুব সুন্দর করে পরিপাটি হয়ে রান্নাঘরে গেল।
​আজম ডাইনিং টেবিলে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। সে আশা করেছিল দীপ্তি আজও হয়তো করুণ সুরে বলবে, -আজম, চা খাবে তো? প্লিজ একটু কথা বলো না আমার সাথে।
কিন্তু দীপ্তি কিছুই বলল না। সে নিজের জন্য কফি বানাল, আজমের সামনে তার নাস্তা রেখে দিয়ে স্বাভাবিকভাবে নিজের কফি নিয়ে বারান্দায় চলে গেল।
​আজম কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে একবার দীপ্তির দিকে তাকাল। দীপ্তি গুনগুন করে গান গাইছে। আজমের কেমন যেন একটু খটকা লাগল।
​বিকেলে হামিদা বানু সোফায় বসে তসবিহ পড়ছিলেন। দীপ্তি ঘরে ঢুকে খুব মিষ্টি করে হাসল। হামিদা বানু ভাবলেন এখনই বুঝি দীপ্তি পা ধরে আগের মতোই ক্ষমা চাইবে, কাঁদবে। কিন্তু দীপ্তি শুধু বলল,
-মা, আজ আব্বু ফোন করেছিলেন। আমার বাসায় বড় ফুপু এসেছেন। তার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি, ফিরতে একটু রাত হবে। ফ্রিজে খাবার রাখা আছে, আপনারা খেয়ে নেবেন।
​বলেই দীপ্তি উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। হামিদা বানু বিস্ময়ে চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনলেন।
​আরো দুই দিন কেটে গেলো। দীপ্তি এখন একদম স্বাভাবিক। সে ঘরে মুভি দেখছে, বান্ধবীদের সাথে ফোনে হাসাহাসি করছে, নিজের মতো রান্না করছে, গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে, কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে ছাদে পায়চারি করছে, যা আজম আর হামিদার কাছে এক বিস্ময়কর অনুভূতি।
​এক রাতে শোয়ার ঘরে আজম দেখল দীপ্তি হেডফোন লাগিয়ে খুব মন দিয়ে একটা কমেডি মুভি দেখছে আর হাসছে। আজমের ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে ভেবেছিল কথা বলা বন্ধ করলে দীপ্তি সবসময়কার মতো ভেঙে পড়বে, কান্নাকাটি করবে। কিন্তু দীপ্তি তো দিব্যি আছে!
​আজম বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ বেশ জোরেই বলে উঠল,
-আমার নীল শার্টটা কোথায়?
দীপ্তি মুভি থেকে চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় বলল, -আলমারির দ্বিতীয় তাকে আছে।
আজম অবাক! দীপ্তি কথা তো বলছে, কিন্তু সেই আকুতিটা কোথায়? সেই আকুলতা নেই!
​পরদিন সকালে দীপ্তি তার পছন্দের নিজের জন্য রান্না করে ড্রয়িংরুমে যখন সে খুব আয়েশ করে সেই খাবার নিয়ে বসল, তখন হামিদা বানু সোফায় বসে আড়চোখে দেখছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন দীপ্তি সবসময়কার মতো থালা নিয়ে তার কাছে এসে বলবে,
-মা, একটু চেখে দেখুন। কিন্তু দীপ্তি নিবিষ্ট মনে নিজের খাবার খেল, যেন তার পাশে কেউ বসে নেই। খাওয়ার পর সে খুব যত্ন করে নিজের ঘরে গিয়ে আয়নার সামনে বসে চুল বাঁধলো তারপর ফোনের স্পিকারে পছন্দের রবীন্দ্রসংগীত চালিয়ে ঘর গোছাতে লাগল।
​বিকেলে আজম অফিস থেকে ফিরে দেখে দীপ্তি বারান্দায় গাছগুলোর যত্ন নিচ্ছে। আজম বারান্দার দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, আশা করল দীপ্তি তাকে দেখে অন্তত পানি এগিয়ে দেবে, ঠিক যেমনটা সবসময় দীপ্তি পানির গ্লাস হাতে তার পেছনে ঘোরে। কিন্তু দীপ্তি একবার তার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক একটা হাসি দিয়ে আবারও গাছে পানি দিতে শুরু করল। আজমের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হলো। সে ভাবত সে কথা না বললে দীপ্তি অন্ধকারের বাসিন্দা হয়ে যাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দীপ্তি তার নিজের আলোতে আলোকিত।
​সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এলো ডাইনিং টেবিলে। দীপ্তি সবার জন্য খাবার সাজিয়ে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু সে আজ নিজের জন্য আলাদা একটা থালা নিয়ে নিজের ঘরে চলে যাচ্ছিল।
হামিদা বানু এবার আর সহ্য করতে পারলেন না। গম্ভীর গলায় ডাকলেন,
-বৌমা, তুমি কি আমাদের সাথে বসে খাবে না?
​দীপ্তি দরজার পাশ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
-মা, আপনারা তো অনেকদিন ধরেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন, অবশ্য প্রায়ই করেন। আমি ভাবলাম আপনারা হয়তো আমার উপস্থিতি পছন্দ করছেন না, আমি থাকলে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারছেন না। আপনাদের এই নীরবতাকে সম্মান জানাতেই আমি নিজের ঘরে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মাঝখানে ঢুকে আপনাদের শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাতে চাই না।
​হামিদা বানু এই প্রথম নিজের ইগোর ওপর একটা বড় আঘাত অনুভব করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, দীপ্তি এখন আর অবহেলিত হওয়ার যন্ত্রণায় ছটফট করছে না, বরং সে তাদের অবহেলাকেই তাদের ওপর ফিরিয়ে দিচ্ছে। আজম টেবিল থেকে উঠে এসে দীপ্তির হাত ধরল।
-দীপ্তি, অনেক হয়েছে। মা আর আমি আসলে...
​দীপ্তি আজমের কথা কেড়ে নিয়ে বলল,
-আসলে কি আজম? তোমরা ভেবেছিলে তোমাদের এই সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট দিয়ে আমাকে বশ করবে? আমি আর তোমাদের এই একতরফা শাসনকে ভয় পাই না। তোমরা কথা বললে বলবে আর না বললে নাই। তবে খুব বেশিদিন তা সহ্য করবো না। আমাকে অবহেলা করলে আলাদা হয়ে যাবো, পারবে তো তখন দশ লাখ টাকা দেনমোহর পরিশোধ করতে? আর হ্যাঁ, তোমার জবটাও তো আমার মামার কোম্পানিতেই তাই না? বলে দীপ্তি চলে গেল।
​হামিদা বানু মাথা নিচু করে খাবারের প্লেটের দিকে তাকালেন। সেই মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এই বাড়ির দীর্ঘদিনের ইগো।
​ যে বাড়িতে একসময় কথা শোনার জন্য সে চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত, সেখানে এখন কথার জোয়ার বয়ে যায় তবে সেই জোয়ারের উৎস দীপ্তি নয়, বরং আজম আর হামিদা বানু। মেহের ভাবীর সেই অমোঘ মন্ত্র দীপ্তিকে শিখিয়ে দিয়েছে যে, গুরুত্ব পাওয়ার জন্য সবসময় উপস্থিত থাকতে হয় না, মাঝেমধ্যে অনুপস্থিতিটাও জরুরি।
​বাড়ির পরিবেশটা এখন এক অদ্ভুত মোড় নিয়েছে। হামিদা বানু এখন সকাল হতেই ড্রয়িংরুমে বসে গলা ছেড়ে দীপ্তিকে ডাকেন।
-বৌমা, ও বৌমা! আজ বিকেলে কি একটু পায়েস রাঁধবে? তোমার হাতের পায়েসটা যা হয় না।
দীপ্তি রান্নাঘর থেকে উত্তর দেয়,
-দেখি মা, সময় পেলে করব।
বলেই সে আবার নিজের কাজে মগ্ন হয়ে যায়। হামিদা বানু থতমত খেয়ে বসে থাকেন। তিনি আশা করেছিলেন দীপ্তি হয়তো আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলবে,
-অবশ্যই মা, আপনি খেতে চেয়েছেন আর আমি করবো না! তা কি হয়? কিন্তু দীপ্তির এই মাপা উত্তর তাকে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ফেলে দিল।
​আজমের অবস্থা আরও করুণ। সে এখন অফিস থেকে ফিরেই দীপ্তির আশেপাশে ঘুরঘুর করে।
-দীপ্তি, এই দেখো তোমার জন্য কি এনেছি। সেই যে একদিন নীল রঙের কাঁচের চুড়ির কথা বলেছিলে না? আজম খুব উৎসাহ নিয়ে চুড়ির প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। দীপ্তি প্যাকেটটার দিকে একবার তাকাল মাত্র। তারপর নির্লিপ্ত গলায় বলল,
-ওহ আচ্ছা, ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দাও। কাজ শেষ করে দেখব।
আজমের চোখে স্পষ্ট হতাশা। দীপ্তি ফোনের দিকে তাকিয়ে কার সাথে যেন মেসেজে হাসাহাসি করতে শুরু করল। আজম ঘরে দাঁড়িয়ে রইল এক অদৃশ্য দেয়ালের সামনে। সে বুঝতে পারছে, দীপ্তি তাকে শাস্তি দিচ্ছে না, বরং তাকে ঠিক সেই আয়নাটা দেখাচ্ছে যেটা আজম সবসময় দেখায়।
​মাঝে মাঝে অবশ্য দীপ্তি খুব চমৎকার ব্যবহার করে। একদিন হয়তো নিজে থেকেই আজমের পছন্দের ভুনা খিচুড়ি রাঁধল, হামিদা বানুর সাথে বসে পুরনো দিনের গল্প করল। সেদিন আজম আর তার মা মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন, "যাক, সব বোধহয় ঠিক হয়ে গেছে।" কিন্তু সেই স্বস্তিটুকু স্থায়ী হয় না। পরদিন সকালেই হয়তো দেখা যায় দীপ্তি আবার সেই মৌনব্রত ধারণ করেছে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে সে শুধু হ্যাঁ বা না দিয়ে উত্তর সারে।
​এই যে অনিশ্চয়তা কখন দীপ্তি হাসবে আর কখন সে পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে যাবে এই ব্যাপারটা আজম আর হামিদা বানুকে তটস্থ করে রাখে। তারা এখন দীপ্তির প্রতিটি মেজাজ বুঝে চলার চেষ্টা করে।
​এক রাতে শোয়ার ঘরে আজম খুব অসহায়ভাবে বলল, -দীপ্তি, তুমি কি আমার ওপর এখনও রাগ করে আছো? আমি তো এখন সব সময় তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করি।
দীপ্তি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে শান্ত গলায় বলল,
-রাগ! না তো আজম। আমি শুধু একলা থাকা শিখে গেছি।
​আজম কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে বুঝতে পারল, ঘোড়ার লাগাম এখন পুরোপুরি দীপ্তির হাতে। সে চাইলে এই রথ সামনের দিকে দৌড়াবে, আর না চাইলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।
​মেহের ভাবীর সাথে প্রায়ই দীপ্তির ফোনে কথা হয়। তিনি সামান্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেই বললেন,
-দীপ্তি, স্বাধীনতা মানে শুধু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসা নয়, স্বাধীনতা মানে ঘরের ভেতরে থেকেও নিজের শর্তে বাঁচা। তুমি আজ স্বাধীন, যা আমি পারি নি। তবে এটাও ঠিক তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড এই ক্ষেত্রে তোমাকে হেল্প করেছে। না হলে হয়তো কবেই ওরা...
- জানি ভাবী, আমাকে বের করে দিত। ডিভোর্স দিয়ে দিত। আরেকটা বৌ ঘরে আনতো। ঠিক এজন্যই আমি আর সত্যিকার ভাবে আজমকে আপন ভাবতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে, বুঝতে পারি না ওর আসল রুপ কোনটা? সত্যিই আমাকে ভালোবাসে নাকি ওর ক্যারিয়ার। তাই আমিও নিজের ইচ্ছেমতো বৃত্ত বানিয়েছি যা ঐ মা ছেলে কে সবসময় তটস্থ করে রাখে।
কথা শেষ করে ​দীপ্তি বারান্দায় গিয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকাল। সে এখন আর কারো করুণার পাত্রী নয়, সে এই সংসারের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক, সেটা যেভাবেই হোক হয়তো আজমের নিঃস্ব হবার ভয়ে অথবা সত্যি ভালোবাসায়। নীরবতার যে বিষ তাকে একসময় নীল করে দিয়েছিল, সেই নীরবতাকেই সে আজ নিজের রক্ষাকবচ বানিয়ে নিয়েছে।

কলমে:সুবর্না শারমিন নিশী

No comments:

Post a Comment