Friday, September 18, 2026

বৃষ্টি (হুমায়ূন আহমেদের রোমাঞ্চকর ছেলেবেলা)


ছ -য়-সাত বছরের একটি বালক জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে বৃষ্টি দেখছে। সিলেটের বিখ্যাত 'বৃষ্টি। ফিনফিনে ইলশেগুঁড়ি না, ঝুমবৃষ্টি। এই বৃষ্টি একনাগাড়ে সাত দিন পর্যন্ত চলতে পারে। ছেলেটি বৃষ্টি দেখছে,

তবে তার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নেই, বিস্ময়বোধ নেই, আছে দুঃখবোধ ও হতাশা। তাকে সারা দিনের জন্য আটকে রাখা হয়েছে। আজ সে ঘর থেকে বের হতে পারবে না। সে একটি গুরুতর অপরাধ করেছে। কাঠের সিন্দুকের ওপর পাঁচটা চিনামাটির প্লেট রাখা ছিল, সব কটা একসঙ্গে ভেঙেছে। বাসায় আর কোনো প্লেট নেই।

প্রাথমিক শান্তি চড়থাপড় একদফা হয়েছে। বালক এই ধরনের শাস্তিকে হিসাবের মধ্যে ধরে না। বালকের মাতা এই তথ্য জানেন বলে মানসিক শান্তির দিকে গেলেন। ঘোষণা করা হলো, এখন থেকে সবাই প্লেটে করে খাবে, বালক খাবে মেঝেতে। মেঝের একটা অংশ পরিষ্কার করে রাখা হবে, সেখানেই ভাত-তরকারি দেওয়া হবে।

বালক এই মানসিক শান্তিও আমল দিল না। কারণ, সে জানে এই কাজটি করা হবে না। সে এই বয়সেই বুঝে গেছে, বড়দের কথা এবং কাজ এক না। একটি দরিদ পরিবারের কাছে পাঁচটা চিনামাটির প্লেট যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, এটা বোঝা গেল যখন বালককে ছুটির দিনে বন্দী করে রাখা হলো।

বন্দী ঠিকমতো শাস্তি ভোগ করছে কি না তা তার ভাইবোনেরা এবং কাজের ছেলে রফিক মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে দেখে যাচ্ছে। সবচেয়ে আনন্দিত রফিক। তার মুখ ভর্তি হাসি। এই বাসার যেকোনো শিশুকে শাস্তি পেতে দেখলে সে বিমল আনন্দ উপভোগ করে।

দুপুরের ভাত খাবার সময়

বালককে মুক্তি দেওয়া হলো। সে ছুটে বের হয়ে গেল। প্রথম কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে লাফালাফি করল;

তারপর দৌড়ে রাস্তা পার হলো। রাস্তার ওপাশেই মাঠ। মাঠে কিছু নিচু জায়গা আছে, সেখানে পানি জমেছে। পানির ওপর ঝাঁপাঝাঁপি করা যায়। মাথার ওপর ঝুমবৃষ্টি, পায়ের নিচে পানি-কী আনন্দ। বালককে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য ছাতা দিয়ে রফিককে পাঠানো হলো। সে গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ বালকের লাফালাফি দেখল; তারপর ছাতা বন্ধ করে নিজেও ঝাঁপাঝাঁপিতে যুক্ত হলো। যুক্ত কেনই বা হবে না? রফিক বালকের চেয়ে দু-এক বছরের বড়। বৃষ্টিবিলাস থেকে সে কেন নিজেকে দূরে রাখবে।

রফিকের নেতৃত্বে বৃষ্টিযাপনের অর্থ হলো একের পর এক দুঃসাহসিক অভিযান। তার একটি হচ্ছে-দেয়াল টপকে প্রফেসর সাহেবের বাড়িতে ঢোকা (অধ্যাপক, এমসি কলেজ)। প্রফেসর সাহেবের বাগান ভর্তি আমগাছ। ঝড়-বৃষ্টিতে গাছতলায় নিশ্চয়ই অনেক আম পড়েছে।

অভিযান সফল হলো। পকেট ভর্তি আম নিয়ে বালক পরবর্তী অভিযানে বের হলো। পাকা 'পুসকুনি'তে গোসল। পাকা পুসকুনিতে সব দিন স্নানের সুযোগ হয় না। বড় কেউ সঙ্গে গেলেই সুযোগ হয়। তখনো সমস্যা, বড়দের কারণে মনের আশ মিটিয়ে পানিতে ডুবাডুবি খেলা যায় না।

মহানন্দে পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপির একপর্যায়ে রফিক লক্ষ করল, ছাতাটা সঙ্গে নেই। পরবর্তী অভিযান ছাতা খুঁজে বের করা।

শুকনা। ছাতা হারানো গেছে, না জানি কী হয় সন্ধ্যার আগে আগে তারা বাসায় ফিরল। দুজনের মুখ বস্তুই আশ্চর্যের ব্যাপার, ছাতা নিয়ে কেউ একটা কথাও বলল না। মনে হয় বাসার কেউ রফিকের ছাতা নিয়ে বের হওয়ার বিষয়টা জানে না। সারা দিন বৃষ্টিতে ভেজার জন্য কোনো শান্তি হলো না।

পারিবারিক আদালতের প্রধান বিচারপতি, বালকের বাবা, অপরাধের সব ফিরিস্তি শোনার পর কিছই বললেন না। রেডিওর নব ঘোরাতে লাগলেন। এই সময়ে 'আকাশবাণী' থেকে নাটক প্রচার করা হয়। তিনি নাটক শুনতেই বেশি আগ্রহী। বালক তখনো নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। তার ধারণা, শান্তির ব্যবস্থা হবে রেডিওর নব ঘোরানো শেষ হওয়ার পর। নব ঘোরানো একসময় শেষ হলো। প্রধান বিচারপতি বালকের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত গলায় বললেন, দাঁড়িয়ে আছিস কী জন্য?

বালকের মা রাগী গলায় বললেন, এতক্ষণ তোমাকে কী বললাম? প্রধান বিচারপতি বললেন, কী বলেছ?

কী বলেছি তুমি জানো না?

না। আবার বলো।

মা উঠে চলে গেলেন। প্রধান

বিচারপতি পুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, তোর মা কি রাগ করে উঠে চলে গেল?

পুত্র হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

তোর মায়ের রাগ ভাঙানোর ব্যবস্থ করতে হবে। জোরেশোরে বৃষ্টি নামলে বলবি-গুষ্টিসুদ্ধ বৃষ্টিতে ভিজব। বৃষ্টিতে ভিজলে কী হয়, জানিস?

না। গায়ের ঘামাচি মরে। তোর কি

ঘামাচি আছে?

গা ভর্তি ঘামাচি।

কোনো চিন্তা নাই, ঘামাচি ধ্বংসের ব্যবস্থা করছি। বৃষ্টিটা ভালোমতো নামতে দে।

পাঠক, উপন্যাসের মতো কি লাগছে? মনে হচ্ছে কি ঔপন্যাসিক একটা পারিবারিক উপন্যাস ফেঁদেছেন? কিছুক্ষণের মধ্যেই নাটকীয় ঘটনা ঘটবে। কাহিনি এগোবে তরতর করে।

উপন্যাস লিখছি না। নিজের শৈশবের কথাই লিখছি। পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। সবকিছু হুবহু মনে

নেই। যেসব জায়গা মনে নেই, সেসব জায়গায় Fill up the blank করেছি। লেখকের স্বাধীনতাও ব্যবহার করেছি, তবে যেটুকু না করলেই নয় শুধু ততটুকুই। উদাহরণ দিই-সারা দিন রফিককে নিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা, ছাতা হারানো-সব ঠিক আছে। এত বড় অপরাধের পর কোনো শাস্তি হয়নি, তাও ঠিক আছে। শাস্তির বদলে ওই রাতেই যে আবারও সবাই মিলে বৃষ্টিস্নান উৎসব করেছে, তাও ঠিক আছে। শুধু শান্তিবিষয়ক কথোপকথন তৈরি করা-কারণ, কেন শাস্তি হয়নি, সেটা মনে করতে পারছি না।


হুমায়ূন আহমেদ

No comments:

Post a Comment