ডিনারটা আজ সবাই মিলে বাইরে করার প্ল্যান। কাছেই "পানসী" নামের চমৎকার একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে। ভাইয়া বললো, একবারও যায়নি সেখানে।খাবার নাকি একেবারে ফাইভ স্টার কোয়ালিটি। ভাইয়ার দুই ছেলেমেয়ে শুচি আর শুভ্র, ওরাও বাইরে খাবার বায়না করছিলো খুব। সবাইকে নিয়ে তাই পানসীতে যাবার প্ল্যান করেছে আমার বর রনি।
আমি রেডি হয়ে ভাইয়ার ঘরে এলাম। ভাবী শাড়ি পরছে এখনো।বললাম,
__সেই কতো আগে মা আর বাবা রেডি হয়ে বসে আছে। তোমাদের আর কতক্ষণ লাগবে?
ভাইয়া, ভাবীর চোখ কপালে উঠে গেলো।
__ মা-বাবাকে এতদূর টেনে নিয়ে যাবার দরকার কি রে, তিথি? ওদেরকে বলতে গেলি কেনো? রাতে কতটুকুই বা খাবে ওরা? আমরা তো ওদের জন্য খাবার নিয়েই আসবো। কাল দুপুরে গরম করে খাইয়ে দিবো । না, না, ওদের যাবার কোনো দরকার নেই।
শুচি আর শুভ্র পাশ থেকে গাল ফুলিয়ে বললো,
__ দাদাভাই আর দাদু হাঁটতে পারে না তো, ফুপি। ওরা গেলে সব কিছু স্লো হয়ে যাবে, একটুও ফান হবে না।
আমি একটু কঠিন সুরে বললাম,
__ সবার সাথে বাইরে গেলে ওদের একটু ভালো লাগবে, ভাইয়া। বিছানায় কতক্ষণ শুয়ে থাকা যায় বলো? তোমরা আগে গিয়ে খাবার অর্ডার করতে থাকো। আমি আর রনি বাবা মাকে নিয়ে আসছি।
ভাইয়া আর ভাবী বেশ বিরক্ত হলো।বললো,
__সবাই একসঙ্গে যাবো ভেবেছিলাম, তোরা আবার আলাদা যাবি।
শুচি আর শুভ্রর মুখের দিকে চেয়ে আমার বাইরে যাবার আনন্দটা কমে গেলো।
বাবা-মায়ের এইভাবে বিছানায় পড়ে যাবার কারণটা আমার কাছে একটু একটু পরিষ্কার হচ্ছে।অথচ ওদের এমন কিছু বয়স হয়ে যায়নি।
সত্যি বলতে, ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা মায়ের শরীরের ধাঁচ একদম আলাদা। কখনো জ্বর হতেও দেখিনি আমি।দিব্যি ভরপুর আলাদা সংসার ছিলো ওদের।দিনরাত ছুটে বেড়িয়েছে মা ।
আমার বিয়ের পরেই ভাইয়া বললো, গ্রামের বাড়ির সংসার গুটিয়ে ফেলতে।খামাখা একটা আলাদা খরচ।তখন মনে হয়েছিল, বিষয়টা খারাপ হবে না।
মনে মনে মা-বাবা অন্য কিছু চেয়েছিল কিনা জানি না, তবে মুখে কোনো আপত্তি করেনি।
আমি আর রনি বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পড়েছি ।বিয়ের পরপর দুজনেই এমএস, পিএইচডি করতে চলে গেলাম। ভেবেছিলাম, বাবা-মা ভাইয়ার কাছে থাকলে আমার চিন্তা হবে না। ।ভাইয়া, ভাবী দুজনই বেশ ভালো মানুষ।
প্রথম যেদিন নিজের আলাদা সংসার গুটিয়ে এ বাড়িতে এলো ওরা, আমিও ছিলাম সাথে।
ভাবী মাকে বলেছিলো,
___আপনার এখন পুরোপুরি ছুটি, মা। সারাজীবন অনেক কাজ তো করলেন। এখন শুধু বিশ্রাম। বাবা আর আপনি দুজন মিলে খাবেন, ঘুমাবেন আর আল্লাহ্কে ডাকবেন ।
মনটা খুশিতে ভরে গিয়েছিলো আমার । কজন শাশুড়ির কপালে এমন বৌমা জোটে?
তবু পরদিন সকালে, দুপুরে রান্নাঘরে গিয়েছিলেন মা।
এতো বছরের অভ্যাস!
কিন্তু ভাবী জোর করে মাকে বিশ্রাম করতে পাঠিয়ে দিয়েছিল।
ফ্লাইটের আগে আরো দুএকবার এসেছিলাম মা বাবার সাথে দেখা করতে ।তখনও দেখেছি,
বিশ্রাম করা ছাড়া ওদের আর কিছু করার নেই ।
শুচি আর শুভ্র সারাদিন স্কুলে থাকে। তারপর ফিরে এসে টিভি, খেলাধুলা, হোমওয়ার্ক নিয়ে বসে পড়ে। এরপর হরেকরকম টিচার আসে ওদের ।
ব্যস্ত জীবন সবার।
আমি আসার পর সবাই মিলে কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলাম।তখনও মা আর বাবা সঙ্গে যায়নি। যায়নি মানে, ওদের নেয়া হয়নি।
বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান হবার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম থেকে ভাবীর দুঃসম্পর্কের একজন খালাকে খবর দিয়ে আনানো হলো, জামিলা খালা। মা-বাবাকে তো সঙ্গে নেয়া যাবে না। আবার এভাবে একা রেখেও যাওয়া যাবে না।
ভাবী জানালো চিন্তার কিছু নেই। কতবার বেড়াতে গেছে ওরা সবাই। বাবা-মায়ের কিচ্ছু অসুবিধা হতে দেয়নি।
জামিলা খালা বেশ কাজের, সেই সাথে বিশ্বস্তও।যেকোনো জায়গায় বেড়াতে গেলেই উনি কিছুদিনের জন্য চলে আসেন। রান্নাবান্না, বাজার সদাই সব কিছু তে পটু তিনি।
বাবা-মাকে ফেলে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা মোটেই ভালো লাগেনি আমার। কিন্তু ভাইয়া ভাবী এ বিষয়ে বেশ কঠোর। বললো,
__এতোদূর জার্নি করলে ওদের শরীর খারাপ হবে। রাস্তাঘাটে বাথরুম করা নিয়েও বিরাট ঝামেলা। হোটেলের খাওয়া দাওয়া এই বয়সে সহ্য হবে না। অসুস্থ হলে পরে ভাবীকেই সামলাতে হবে সব, ইত্যাদি ইত্যাদি ।
পাঁচ বছর ধরে আমি বিদেশে। সব দায়িত্ব ভাইয়া ভাবীই পালন করছে।আমি কেবল মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠিয়েছি। হঠাৎ এসে ওদের মতামতের বাইরে যাওয়াটা ভালো দেখায় না, তাই আর জোর করিনি।
কিন্তু যাবার সময় মায়ের মুখটা দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল।তখনই মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম, এইবার মা-বাবাকে আমাদের সাথে করে নিয়ে যাবো।
আমি আর রনি ফিরেছি মাসখানেক হলো মাত্র।
এসেই দেখেছি বাবা-মায়ের শরীর বেশ দুর্বল।দিন-রাত বিশ্রাম নিয়েও ওদের শরীরে কোনো প্রান নেই। ঘরভর্তি ওষুধের ছড়াছড়ি ।
ভাবী বললো,
_এই বয়সে কতো আর ভালো থাকবে, বল? যে কদিন বাঁচবে এইসব ওষুধপত্র চলবেই ।
ভাইয়া গলা মিলিয়ে বললো,
__ তোর ভাবী তো সেবাযত্নের কোনো ত্রুটি রাখেনি। সব হাতে তুলে দেয়। আজকাল তো প্রতি বেলার খাবারটাও ঘরে দিয়ে যায়।আর কি করবে, বল?
যত্নের যে কোনো কমতি নেই, সেটা আমিও দেখতে পাচ্ছি।কমতিটা আসলে আমাদের চিন্তায়।
এই বাড়ির চৌহদ্দিতে বন্দী দুজন মানুষ। ছেলেমেয়েকে স্বাধীন করে দিয়ে যারা পরাধীন হয়ে বসে আছে।ওদের কোনো কাজ নেই। কোথাও যাবার তাড়া নেই। শুধু বেঁচে থাকা ছাড়া তাদের জীবনের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। পৃথিবীতে এই মানুষদুটোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।
প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মানুষের বেঁচে থাকার আনন্দ কতটা থাকে, মা-বাবার মুখের দিকে তাকালেই সেটা বোঝ যায়।
পাঁচবছর ভিন্ন একটা দেশে কাটিয়ে এসেছি বলে কিনা জানি না, বাবা-মায়ের এরকম প্রাণহীন জীবনটা ভালো লাগছে না আমার ।
সকালে উঠে সামনের রাস্তায় একটু হাঁটতে যায় দুজন। সেখানেও নানারকম বিধিনিষেধ ।বেশি দূরে যাওয়া যাবে না। রাস্তায় বের হবার দরকার কি?মাথা ঘুরে পড়ে গেলে আর দেখতে হবে না ।বাড়ির সামনে হাঁটলেই হবে, এইসব নানান কথা।
এরপর সারাদিন শুয়ে বসে থাকা।
আস্তে আস্তে খায় বলে মেহমানদের সাথে একই টেবিলে বসানো হয় না। আস্তে হাঁটে বলে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয় না।
চল্লিশ বছর বয়সে যে বাবা মা ছিল সংসারের স্তম্ভ, ষাট পেরোতেই তারা হয়ে গেলো নুয়ে পড়া দুটো দুর্বল প্রাণ।
সব কথায় শুধু বয়সের প্রসঙ্গ টেনে নিয়ে আসে সবাই । আড়ালে ওদেরকে বুড়ো বুড়ি বলে ডাকা হয়। যেকোনো শখের কাজ করতে গেলেই বাঁধা।
অথচ মা একসময় দারুণ কবিতা পড়তো।বাবা ভীষণ সুন্দর গান করতো। অভিনয়ও করেছে পাড়ার নাটকের দলে।কি চমৎকার রান্নার হাত ছিল মায়ের। বাজার করতে কতো ভালোবাসতো বাবা।
চিরকাল মাড় ভাঙা শাড়ি পরেছে মা , এখন ম্যাক্সি পরে থাকে। সামলানো সহজ, তাই। আমি জানি,এই পোশাক কতটা অপছন্দ করে বাবা।
সহজ পোশাকে এখন ওরা শুধুই বিশ্রাম করে। বিশ্রাম করতে করতে ক্লান্ত দুজন মানুষ।
কারণ লোকে বলে,
এ বয়সে এসব মানায় না।
ধর্ম কর্মে মন দেন এবার। এই বয়সে কিসের এতো ফুর্তি? ফুর্তি করার দিন শেষ। আর বাঁচবেন কয়দিন?বুড়া বুড়ির শরীরে এখনো কতো তেজ দেখো!
যতসব এইজ স্টেরিওটাইপ কথাবার্তা ।
কে ঠিক করে দিয়েছে কোন বয়সে মানুষের হাসা বন্ধ হবে?
কোন বয়সে নতুন কিছু শেখা নিষেধ?
কোন বয়সে ভালোবাসা, ভ্রমণ, গান, কবিতা, স্বপ্ন দেখা শেষ হয়ে যাবে?
যে দেশে পাঁচ বছর কাটিয়ে এলাম সেখানে আমার আশি বছর বয়সী প্রতিবেশী দম্পতি কি চমৎকার জীবন কাটাচ্ছে। কাজ থেকে অবসর নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছে । অপূর্ণ সব শখ পূরণ করছে। আরও বেশি বেশি ঘুরতে যাচ্ছে । সামাজিক সেবামূলক কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছে । বেশি বেশি শরীরচর্চা করছে, বাগান করছে।গান শুনছে, নতুন ভাষা শিখছে।
বাবা-মাও সেরকম একটা জীবন কাটাক, এটাই আমার চাওয়া।
হাঁটতে হাঁটতে রেস্টুরেন্টের কাছে চলে এসেছি। যারা একসময় আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছে, তাদের হাঁটার গতি আজ ধীর বলে, একটুও খারাপ লাগে নি আমার।
আমি আর রনি বাবা-মায়ের হাত ধরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা ধরতে দেয় নি।
কেনো দেবে? কেনো নেবে অপ্রয়োজনীয় সাহায্য? সহানুভূতি সবার ভালো না ই লাগতে পারে।
রেস্টুরেন্টে ঢুকতেই সেখানকার লোকজন এগিয়ে এলো।ভাইয়া ভাবীও এলো ।সবাই বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। একজন বললো,
__উনারা বুড়ো মানুষ। উনাদের আগে বসতে দিন।
বসতে দেয়া, সাহায্য করা ভালো। কিন্তু ওরা যে বুড়ো, সেটা যে চেঁচিয়ে বলার দরকার নেই, এই কথাটা কবে বুঝবো আমরা?
খেতে বসে ভাইয়া বললো,
_ কিরে তিথি, খাবার কেমন? বলেছিলাম না একদম ফাইভ স্টার খাওয়া?
আমি বললাম,
_ খাবার সত্যি খুব ভালো। কিন্তু আজকাল আমার শুধু মায়ের হাতের রান্না খেতে ইচ্ছে করে।মা, কাল আমাকে একটু পাবদা মাছের ঝোল আর লাউ চিংড়ি রান্না করে খাওয়াবে? কই মাছ খেতেও ভীষণ মন চাইছে। বাবা গিয়ে বাজার করে আনবে।এইসব জিনিস বাবার মতো দেখেশুনে কেউ কিনতে পারেনা।
মা-বাবার চোখদুটো চকচক করে উঠলো ।একটা কাজের দায়িত্ব পেয়ে, মানুষ দুজন যেন নড়েচড়ে বসলো।যেন কতোটা সম্মান বেড়ে গেলো ওদের।মায়ের মুখে সলজ্জ মিষ্টি হাসি। বাবা নিজের কাঁধ আর ছাতি টানটান করে বসলো।
কিভাবে লাউ কিনতে হয়, আর কই মাছ চিনতে হয়, বাবার সেই গল্প বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনছে রনি।
রেস্টুরেন্টটা সত্যি বেশ ভালো ।সবাই খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে। খুব খুশি সবাই। সুযোগ বুঝে তাই বলেই ফেললাম, বাবা-মাকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা।
ভাইয়া, ভাবী জানে আমি মা হতে যাচ্ছি। ওরা আমার আবদার শুনে আপত্তি করলো না।ওরা তো নিজের সাধ্যমত সবটুকু দায়িত্ব পালন করেছে। এবার আমার পালা।
বাবা-মাকে বাঁচিয়ে রাখতে নয়, তাদের বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে দিতে চাই আমি।
কখনো কখনো ভালো খাবার, পর্যাপ্ত টাকা, যথেষ্ট আরাম কিংবা উন্নত চিকিৎসা কাউকে ভালো রাখার জন্য যথেষ্ট হয় না ।
প্রয়োজন হয় খুব ছোট্ট একটা অনুভূতি।আর সেটা হলো,
" তোমাদের প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায় নি।"
রুচিরা সুলতানা
No comments:
Post a Comment