খালেক আংগুরিকে সত্যিই ভালোবেসেছে। আংগুরি হিসেব জানেনা- কিন্তু খালেককে সে কখনও বেহিসেবী হতে দেয়নি! রাশিদার সাথে সংসার করেছে কিন্তু কখনও এনিয়ে অভিমান অভিযোগ করেনি।
তার পরামর্শ তৈরি করেছে শ্রদ্ধা আর নির্ভরতা । রাশিদা সমাজের চোখে তার স্ত্রী আর সন্তানের মা হয়েছে সৎ কিন্তু প্রকৃত সহচর হয়ে উঠতে পারেনি! অংগ ভাগাভাগি করলেই অর্ধাঙ্গিনী হওয়া যায়না॥
আজ আংগুরিকে কোনমতেই হারাতে চায়না খালেক। রাশিদার উপর ভরসা নেই কখন সে কি করে বসে! তাবিজ কবজ পানি পড়া কোনকিছুতেই তার কোন উন্নতি নেই। প্রসবের শেষ কয়টা দিন আংগুরিকে তার বাবার বাড়ি রেখে আসার ফয়সালা করে।
আংগুরি সাত মাসের বাচ্চা পেটে নিয়ে আপাদমস্তক বোরখায় ঢেকে বাবার বাড়ি যাবার জন্য তৈরী হয়। নুরি,জরি, স্বপ্না মড়া কান্না জুড়ে দেয়। মা বলে ডেকেছে রাশিদাকে কিন্তু আজন্ম মা বলে জেনেছে আংগুরিকে। জন্মাবধি তারা কখনও বিচ্ছিন্ন হয়নি।
আঠারো মাসের পরী অত কিছু বোঝে না- তাও তিন বোনের কান্না দেখে সেও কাঁদে। আংগুরি পরীকে কোলে নিয়ে রওনা দেয় । এতটুকু মাইয়াকে রাশিদার কাছে রেখে যেতে তার মন সায় দেয়না। সাথে খালেক !
উঠান না পেরোতেই রাশিদা আলুথালু বেশে উপস্থিত হয়। জোর করে সে আংগুরির কোল থেকে পরীকে এক টানে কোলে নেয়। পরী কান্নার দমকে লাল হয়ে যায় কিন্তু রাশিদা পরোয়া করে না। আংগুরি জোর খাটায় না - হাজার হলেও পরী রাশিদার গর্ভজাত সন্তান!
রাশিদার পরীকে টেনে নেয়া মাতৃত্বের মমতা নয় অধিকার ফলানোর এলান!
খালেক আংগুরিকে বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফেরত আসে । একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে পুরো পৃথিবীটাই যেন শূন্য শূন্য ঠ্যাকে! অধিকার দাবি না করেও সে রমনী নিজের অজান্তেই দেহমন সব অধিকার করে বসে আছে! সতের বছরের অভ্যসততায় আজ সে শুধু প্রিয়জন নয় - জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ।
রাশিদাকে বরাবর খালেক করুনার চোখেই দেখে এসেছে । একজন অসুস্থ মানুষকে যেভাবে মানুষ দেখে! তার ভুল ত্রুটিতে কখনও রেগে অগ্নিশরমা হয়নি- বরং প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছে। কারন আংগুরি তার সমস্ত মন প্রাণ ধ্যান জুড়ে ছিল! কোহিনুর হীরে যার দখলে আছে, কাঁচপাথর নিয়ে সে মাথা ঘামায় না।
আজ তার রাশিদার উপর বড্ড ক্ষোভ হয় ! আংগুরির সাথে বিচ্ছেদের দায়ে সে রাশিদার উপর চরম বিতৃষ্ণ বোধ করে।
এদিকে , রাশিদা যতই জগৎ ভোলা হোক - নারী তো ! খালেকের বিরহ , খালেকের বিষাদ, খালেকের বিতৃষ্ণা সবটা না হলেও খানিকটা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে! সে বোঝে, রাজ্য ছেড়ে মহারানী চলে গেছে তবুও শূন্য সিংহাসনে তার অধিষ্ঠান এখনও অটুট! আর উপস্থিতির চেয়েও তার অনুপস্থিতি অনেক বেশি সরব॥
স্বামীকে সে কিছু বলতে পারেনা , হৃদয়ের জমিন নদীর বুকে জেগে ওঠা চর নয় যেটা লাঠিয়াল দিয়ে দখল করা যাবে । আগে শাশুড়ির সাথে ঝগড়া করে মনের ঝাল মেটাতো - এখন শাশুড়িও তার সাথে কথা বলেন না! বিশেষ করে দাই শরীফার মায়ের উপর অহেতুক আক্রমণে শাশুড়ি আরও বিরূপ!
অত:পর রাশিদার নিস্ফল ক্রোধ তার চার কন্যার উপর বর্ষিত হয়। আপন মায়ের বিমাতাসুলভ আচরণে মেয়েদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে । যতক্ষণ তাদের আব্বা বাসায় না আসে ততক্ষণ তারা পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়! পরী তো “ক্ষিধেয় খাওয়া আর অসুখে দাওয়া” এই দুই এর অভাবে আংগুরি যাওয়ার পর থেকেই অসুস্থ ।
হেরে যাওয়া লড়াই এ প্রতিপক্ষের নাগাল না পেয়ে হুদাই নিষ্পাপ শিশুদের উপর চড়াও হয় রাশিদা।
এভাবেই কাটে তিন মাস। একদিন রাশিদা উঠান ঝাড়ু দিয়ে ঝরাপাতা স্তুপ করছে! খালেক পরীর মাথায় জলপটটি দিচ্ছে! কাল থেকে মেয়েটার জ্বর বেড়েছে! আংগুরি যাবার পর থেকে একটা দিন ভালো থাকেনি পরী। সে নিজেই কি ভালো আছে???
একজনকে দাওয়াই আনতে গৌরিপুর গনজে পাঠানো হয়েছে সে উঠানে এসেই হাঁক দেয় ! “মিয়াভাই, জব্বর খবর আনছি গো ভাই! আংগুরি ভাবীর পোলা হইসে! এইমাত্র শুইন্যা আসলাম। “
“আংগুরিজান ভালো আছে ? “খালেকের গলা কাঁপছে! সন্তান, পুত্র , কন্যা, সংসার, সম্পদ সব কিছুর চেয়ে বড় হলো এই নারীর ভালো থাকা!
“ভাবীজান ভালা আছে”
আম্মা, নুরি,জরি-.উচ্চস্বরে ডাকে খালেক! সন্তান প্রসবের কথাটা জানাতে উৎসুক!
রাশিদা খবরটা শুনেই পাথর হয়ে যায় ! মগজের কোষে কোষে দাপিয়ে বেড়ায় আক্রোশের লেলিহান শিখা! ফেনিয়ে ওঠে তিব্র ঈর্ষা!
এমনসময় ছুটে আসতে গিয়ে উঠানে ঝরাপাতার স্তুপে পড়ে যায় জরি! রাশিদা হাতের ঝাড়ু দিয়ে ঠাস ঠাস করে জরিকে বাড়ি দিতে শুরু করে ! নুরি বোনকে বাঁচাতে আসলে তাকেও নির্মমভাবে পেটায় সে !
আজ খালেকের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায় ! যা সে এগারো বছরে কখোনো করেনি আজ সে তাই করে ! রাশিদার হাত থেকে ঝাড়ু কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়। ঠাস ঠাস করে রাশিদার গালে চার পাঁচটা চড় কষিয়ে দেয় ,
“ আমার মাইয়াগোর গায়ে হাত দিবিনা , কইলাম । তুই শুধু জন্ম দিসোস, এগোরে পাইলা পুইষা আংগুরিজান বড় করসে। এগোরে মারোনের তুই কেডা ? তুই বাইর হ এই বাড়ি থিকা, আজই যেন এই বাড়িত তোর শ্যাষ দিন হয় ! “
সে দ্রুত তৈরি হয়ে মালেক আর জনা দুয়েক কামলা নিয়ে আংগুরিকে আনতে রওনা হয়! তাকে দেখার জন্য পরানডা আনচান করে! সবুর সয়না!
যাবার আগে ফরমান জারি করে, এসে যেন সে রাশিদাকে আর এই বাড়িতে না দেখে !
এরপর কি হয়েছিলো-কেউ জানেনা। খালেক যখন সবাইকে নিয়ে বাড়ি ফেরে তখন জবাই করা চারটি লাশের চারপাশে পুরো এলাকার মানুষ ভিড় করেছে। ফ্রক পরা গলা কাটা চারটি কচি দেহ ! তাদের মুখের অভিব্যক্তিতে এখনও ভয়ার্ত বিস্ময় । খালেক রাশিদার চার মেয়ে !
পুলিশ এসে খালেক ও রাশিদা দুজনকেই হত্যাকাণ্ডের দায়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়! রাশিদার চোখে এক বিন্দু পানি নেই । মুখে অনর্গল সে বিড়বিড় করছে ।
রাশিদাকে এক নজর দেখতে ময়মনসিংহের অনেক এলাকা থেকে নাকি ট্রাক ভরে মানুষ আসতো !
চার মাস পর খালেক জামিনে মুক্তি পায়! কারা অভ্যনতরে দীর্ঘদিন রাশিদার মানসিক চিকিৎসা চলে। আনুমানিক পাঁচ বছর পর এই মামলার রায় হয় !
চারটি হত্যাকাণ্ডের দায়ে একশ বিশ বছরের সাজা হয় রাশিদার। তবে সাজা একই সাথে চলবে বলে মোট ত্রিশ বছর খাটতে হবে বলে ময়মনসিংহ জেলা জজ রায় দেন।
No comments:
Post a Comment