Friday, February 13, 2026

রাশিদার রাশিফল

 দশম পর্ব

দাই শরীফার মা কাপড়ের পোটলার মতো জুবুথুবু হয়ে মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে! বাঁ হাতটা সম্ভবত ভেঙেছে - বেঢপভাবে ফুলে উঠেছে! ঘুনে ধরা বুড়ো হাড়ে চ্যালাকাঠের উপর্যুপরি বাড়ি সহ্য হয়নি॥ পাতলা হয়ে আসা চুল হ্যাচকা টানের চোটে জায়গায় জায়গায় খাবলা খাবলা ভাবে উঠে উসকো খুসকো।
্যথার যন্ত্রণায় সে ছটফট করছে আর রাশিদাকে ক্রমাগত অভিশাপ দিচ্ছে।”তোর উপর আল্লাহ’র গজব পড়বো- দেখিস! আমি তোর বাচ্চা বিয়ানোর বেদনা কমাইসি আর তুই আমারে মারলি, আমার জবান ফালাইন্যা যাইব না! গজব পড়ব”। ভর সন্ধ্যায় তার আহাজারিতে গা শিউরে ওঠে!
আংগুরি দুজন কামলাকে দ্রুত কবিরাজ আনতে পাঠায় । রাশিদা আবার যেন অন্য জগতে চলে গেছে। বিড়বিড় করে নিজের মনে কথা বলছে।
খালেক পরীকে কোলে নিয়ে পায়চারি করছে। বেচারী বড্ড ভয় পেয়েছে!
ঘুমন্ত পরীকে সাবধানে খাটে শুইয়ে দেয় খালেক! ঘুমের মধ্যেও সে ফোঁপাচ্ছে!
আংগুরি হারিকেন হাতে ঘরে ঢোকে”ছোটমিয়া, খাইতে আসো!”
চমকে ওঠে খালেক! হারিকেনের আলো তেরছাভাবে আংগুরির পেলব গালে পড়েছে! কি অদ্ভুত মায়াবতী লাগছে তাকে! সতের বছরে ঐ মুখ একটুখানিও পুরানো হয়নি, ঐ দেহের লাবণ্য কিছুমাত্র ম্লান হয়নি! কিছু সম্পর্কের কোন নাম নেই তবুও তা জীবনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ যে সমাজের বদনামের ভয় আর ভবিষ্যৎ এর আনজামের আশংকা তাকে বশ করতে পারেনা।
মালেক আর খালেক পিঠাপিঠি ভাই। মালেক বছর দুয়েকের বড় । মালেক অনেক দেরী করে কথা বলতে শিখেছে - তাও কথা মানে অতি অল্প কয়েকটি অর্থবোধক শব্দ মাত্র । মক্তবে পড়া হয়নি তার , কেউ ডাকলে সে সাড়া দিতো না, কারও চোখের দিকে কখনও তাকাতো না। আপন মনে গরু ছাগল হাঁস মুরগি নিয়ে তার বিচরণ।
শারিরীক ভাবে পৌরুষের লক্ষণ তার মধ্যে যথাসময়ে প্রকাশিত হলেও মানসিক ভাবে সে এসব বোধ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। গ্রামে এমন মানুষের চিকিৎসার কথা কেউ ভাবেনা - এমন ভ্যাবলা হাবলা কিসিমের মানুষ কমবেশি তো সব সংসারে থাকেই!
মালেককে বিয়ে দেবার ব্যপারে খালেকের একেবারেই মত ছিলো না। কিন্তু তার মা ছেলের বিয়ে দিয়েই ছাড়বেন । তার সন্তান বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এটা তিনি মানতে নারাজ। এমনিতেই মায়েরা সন্তানের কোন ত্রুটি চোখে দেখেও দেখেন না সেই সাথে বড় সন্তানের প্রতি সব মায়ের স্নেহের আতিশয্য থাকে । তাছাড়া কে জানে, বিয়ের পর মালেক হয়তো স্বাভাবিক হয়ে যাবে ।
হতদরিদ্র ঘর থেকে আংগুরিকে বিয়ে করিয়ে আনা হলো। মানুষের পেটে যখন ক্ষিধে থাকে তখন তার মোকাবেলায় বাকী সব চাহিদা ফিকে হয়ে যায় কিন্তু যখন তার ক্ষিধে মিটে যায় তখন একের পর এক অন্য চাহিদাগুলো সজাগ হতে শুরু করে।
মালেকের মানসিক গঠন এমনভাবে তৈরি যে সে অভ্যসত গন্ডির বাইরে কিছু করতে পারেনা! এমনিতে সে শান্ত স্বভাবের কিন্তু চেনা পরিবেশের তিলমাত্র এদিক ওদিক হলেই সে অস্থির হয়ে যায় !
আজন্ম সে মা বেড়ে দিলে খাবার খায়, ঘুমায় সে গোয়াল ঘরের পাশে মূল বসত ভিটের উল্টো দিকে ! তার নিজস্ব জগতে নতুন কারও অনুপ্রবেশ সে বড্ড বিচলিত হয়। বউ শব্দটা সে জানে কিন্তু এর মানে সে বোঝে না।
আংগুরি লাজ শরমের মাথা খেয়ে মালেকের সাহচর্য লাভের বহু চেষ্টা করেছে। কিন্তু, যে পুরুষ চোখের দিকেই তাকাতে জানে না- দৃষ্টির মাদকতা দিয়ে তাকে বশ করা যায়না। যে শরীর ছুঁতেই দেয় না স্পর্শের তেলেসমাতি দিয়ে তাকে মাতিয়ে তোলা দু:সাধ্য! নারীসঙ্গ মালেকককে উষ্ণ করে তোলে না বরং একধরণের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে! একটা সময় আংগুরি বোঝে, স্বামীর সান্নিধ্যের সাধ তার ইহজনমে মিটবে না- ক্ষান্ত দিয়েছে।
শরীরকে নাহয় বোঝানো যায়, কিন্তু মনটা সময়ে অসময়ে বড় উচাটন হয়। আংগুরি তবু মনের ঘরে খিল এটে ছিলো! সাংসারিক সব কাজে সে মন প্রাণ ঢেলে দিয়েছিলো॥ হঠাৎ করেই দেবর খালেক যেন সবকিছুই ওলট-পালট করে দিলো!
প্রবল শারিরীক আকর্ষণ দিয়েই তাদের সম্পর্ক শুরু! দীর্ঘদিনের বুভুক্ষ শরীর হার মেনেছিলো খালেকের আহ্ববানে! আদরের স্পর্শসুখে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল সকল দ্বিধা। সে দ্বিচারিনী নয়- তার জীবনে পুরুষ স্পর্শ ঐ একজনেরই ! দুটি পুত্র সন্তানের জননী সে।
ভেবেছিলো দেবরের সুন্দরী বউ ঘরে এলে হয়তো এই সম্পর্কের ইতি ঘটবে ! কিন্তু রাশিদার সৌন্দর্য কাছে টানেনি বরং তার মানসিক বিকার খালেককে আংগুরির প্রতি আরও অনুরক্ত করেছে!
অভাব দেখেছে আংগুরি - তাই তার স্বভাবে আবেগ নেই! তার কাছে ভালোবাসা মানে খেয়ে পরে ভালো থাকা!
নিজের বাবার ভিটেতে সে চার চালার বাড়ি করেছে, প্রচুর ধানী জমির মালিক সে।
(চলবে )

No comments:

Post a Comment