Sunday, October 18, 2026

এ এক অন্নমঙ্গল

 










শরতের চাঁদের রূপ অপরূপ, ধবধবে সাদা সে চাঁদ। এ সময় নানান উৎসব, সেসব আশ্বিনের দিন রাত পেরিয়ে আসে কার্তিক। আর আসে ফসল কাটার আগাম বার্তা, শীতের ফসল, ধান, অন্ন আসবে ঘরে গেরস্তালিতে। বাংলার কৃষক অপেক্ষা করে ফসলের।।
আশ্বিন যায়, কার্তিক আসে
মা লক্ষ্মী গর্ভে বসে।
আশ্বিনের সংক্রান্তিতে হয় গাসসি, গাড়ু সংক্রান্তি, নল সংক্রান্তি বা ডাক, জেহুরি, বা জলবিষুব ব্রত অর্থাৎ ধানের আজ সাধভক্ষণ। আ্‌শ্বিনের মাঝের থেকে কার্তিক, মাস জুড়ে ধানের গর্ভধারণ কাল, ধানের গর্ভধারণ এর সময় কীটপতঙ্গ, পোকার উপদ্রব খুব। আসলে হেমন্তের দিন হয় রুক্ষ, অথচ এই সময় ধান হয় পুরুষ্টু, তার থোরে দুধ আসে হেমন্তের দিনে, তাই মা লক্ষ্মীকে আহবান করে, সমস্ত পোকামাকড়, মশামাছি ইত্যাদি থেকে পরিবার আর ফসল রক্ষার ব্রতই এই সংক্রান্তিতে পালিত হয়।
চাষীর বাড়ি হয় নল বাঁধা, দিনের বেলা সংগ্রহ করা হয় নানান উপকরণ, ওল, মানের পাতা, সর্ষে, সলিতা ঘাস, তিতা পাট পাতা, নিমের পাতা, কালমেঘ, শসার পাতা, কাঁচা হলুদ, তেঁতুল পাতা, সাথে কেউ কেউ শুকনো মাছ রাখেন, নানান ঔষধি গাছ সংগ্রহ করেন গ্রামের মানুষ। তারপর নল ঘাসের সাথে এজ বিশেষ বাঁধনে সব বেঁধে রাখা হয় তুলসী তলায়,পর দিন রাত থাকতে বাড়ির থেকে কৃষক যান ক্ষেতে, সব জমিতে তারা নল দেন, প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন, আর উচ্চারিত হয় মন্ত্র -
ওল বোল মানেরপাত।
ভজ গোঁসাই দুধ ভাত।
রাই, সরিষা প্যাকাটি খড়ি।
ওড় বোড়, কাঁকুড় লাড়ি।
আকাশের জল
পাতালের নক
ছোট বড় ধান ফুলো,ফুলো।
এই মন্ত্র তিনবার বলে জমিতে নল পুঁতে দুটি নল ফেরত আনেন, তার একটি গোয়ালে, অপরটি দেওয়া হয় সার কুঁড়েতে। মাঠ জুড়ে কৃষকরা মন্ত্র উচ্চারণ করেন, প্রার্থনা করেন নল সংক্রান্তির ঔষধিতে ধান হবে সুস্থ সবলা, সব বাধা কাটিয়ে ফসল উঠবে তার ঘরে, মা অন্নপূর্ণা আসবেন সোনালি ফসল নিয়ে।
চাষীরা বাড়ি ফেরেন, ছড়া কাটেন -
আশ্বিন গেলো, কার্তিক এলো
ছোট বড় ধান সমান হলো
ফাটলে দিয়ে নল।
ধান ফলে গল -গল।
আজ তারা কেউ মুড়ি খাবেন না, তারা খাবেন রুটি, লুচি ইত্যাদি।।
কেবলমাত্র নল বাঁধা ছাড়াও ধানকে পোকামাকড় থেকে বাঁচাতে আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো ধুন্ধুল, কালীপুজোর রাতে,বাঁশের আগায় তালপাতা বেঁধে পো ড়ানো হয়, এই আগু নে অনেক ক্ষতিকর পোকা নষ্ট হয়, ধানের ক্ষতি কম হয়।
নল সংক্রান্তির দিন কোথাও কোথাও হয় গাড়ুর ব্রত, গাসসি।
বুরা গিয় ভালা আ
অলক্ষ্মীকে তাড়াইয়া লক্ষ্মী আ।
গাড়ুর ডাল রান্না করেই এই ব্রতের সূচনা। কি এই ডাল? এর নাম অসামবারি, সম্বারা দেওয়া হয় না, তেল ব্যবহার হয় না তাই এই নাম। আগে হতো খেসারির ডালে, এখন মটর ডালে হয় গাড়ুর ডাল। মরসুমি সবজি যা কিছু, আলু, পটল, কুমড়ো, রাঙালু, গাঁটি, খামালু, মানকচু, দুধ কচু, কৃষ্ণ কচু, মুলো, টকের সবজি, নানান উপকরণ।
মহাময়ার সংসারেও হতো গাসসি ব্রত। রাত থাকতে মাখনবালা, বাচ্চাদের উঠিয়ে দিতেন, কাঁচা তেঁতুল পুড়িয়ে ঠোঁটে মাখাতেন, প্যাকাটি পুড়িয়ে চোখে কাজল দিতেন, এতে নাকি শীতের দিনে ঠোঁট ফাটে না। তারপর পালা বাড়ির অবলা জীবদের, তাদের স্নান করিয়ে তাদের গায়ে হলুদ বেটে ছোপ দেন মহামায়া, আজ তার হেঁশেলে অনেক হ্যাপা, আখায় তৈরি হয় অসুরের মুঠি, খই আর চাল ভেজে গুড়ো করে তৈরি হয় মুঠি। হাঁড়িতে জল ফোটে, তাতে মুঠি সেদ্ধ হয়, সকলে স্নান সেরে আসে নিমের পাতা আর মেহেদি পাতা বাটা মেখে, তারপর নিম পাতা দিয়ে বাচ্চাদের খেতে হয় এই মুঠি, এতে শীতের খোসপেচরা দূরে থাকে, অশুভ শক্তি বাচ্চাদের কাছে আসে না।
এই সব ঝামেলা চুকলে হয় গাড়ুর ডাল।
উঠোন আজ ঝকঝকে করে লেপা, তাতে আলপনা, শুভ মানুষের আর অশুভ মানুষের। বিশাল হাঁড়িতে ডাল ফোটে, তাতে অনাবাদি শাক পাতা, কচু, শাপলা, সীম, চই, বরবটি, জলপাই, কাঁচা তেঁতুল, আমড়া। টকের সবজি ছাড়া গাড়ুর ডাল হয় না। এতে সম্বার হবে না, ডাল ঘন হয়ে এলে তাতে নারকেল কোরা, মরিচ, আর টেলে নেওয়া পাঁচ ফোরন গুড়ো করে মেশানো। আজ হবে শালুকের টক, চালতার অম্বল, গুড় নারকেল সরষে গুড়ো দিয়ে।





সংসারের বাচ্চাদের আজ দেওয়া হবে এই ডাল, কিন্তু মহামায়া আর মাখনবালা খাবেন আগামীকাল, তারা খাবেন খাসা চালের ভাত, গাড়ুর ডাল, গুড় আর চালতার টক। তাদের ব্রত সম্পন্ন হবে-
আশ্বিনে রান্ধে কার্তিকে খায়।
যে বর মাঙ্গে সেই বর পায়।
মহামায়া তার সংসারের মঙ্গল কামনায় রোগব্যধির উপদ্রুব কমাতে পালন করেন গাসসি। তাদের তো নিজের জন্য কিছু চাওয়ার ছিলো না, সংসারের, সন্তানের, জীবদের জন্যই তাদের ব্রত পালন। কখনো তাদের কথা বলা হয়নি, তাদের রোগব্যাধি নিয়ে ভাবা হয়নি। আজ তার নাতি অনেক কাল পরে রাঁধে গাড়ুর ডাল, সব শাকপাতা তার সংগ্রহে নেই, যা আছে তাই দিয়ে রাঁধি, মহামায়ার হেঁশেলের সম্মান জানানোর এক গুরু দ্বায়িত্ব তুলে নিয়ে পরম যত্নে রাঁধে তার নাতি, ভাতের পাতে আজ গাড়ুর ডাল, চালতার টক।

এ এক
অন্নমঙ্গল

মানুষ জীবনের নোঙর ফেলে ভাতের গন্ধে।

Samita Gopal Halder

No comments:

Post a Comment