Saturday, August 22, 2026

উপমহাদেশের ১৫০০-২৫০০ বছর আগের এক নারীর রূপচর্চা কেমন ছিলো

 


এখনের স্কিনকেয়ার নিয়ে তো অনেক কথা বলি।কিন্তু এই একটু জানতেও হয়তো কারো মন চাইতেই পারে।যখন না ছিলো এত ক্যামিকেলের নাম, না ছিলো এত ব্রান্ড।
এটা আসলে ইতিহাসের গল্প হবে নাকি স্কিনকেয়ার নিশ্চিত না।তাই স্কিনকেয়ার ট্যাগেই দিলাম।
মনে করি,২০০০ বছর আগের এক অভিজাত ও রাজবংশীয় নারী কুন্তলা।
প্রতিদিন ভোরে উঠে কুন্তলা প্রথমেই রাতে গোলাপের পাপড়ি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা গোলাপ পানি দিয়ে মুখ ধোয়।এরপর আখোরট বাদামের তেল ও কয়লা দিয়ে বানানো কাজল ব্যবহার করে চোখে।মুখে হালকা করে দেয় হত অংগরাগ।
অংগরাগের প্রধান উপাদান ​চন্দন কাঠ যা বাটা পাথরে ঘষে শুকনো করে পাউডারের মত ব্যবহার করতো।এটা একি সাথে ত্বক ঠান্ডা রাখলে ও উজ্জ্বল করতে ব্যবহার হতো।এর সাথে সুগন্ধী ও রঙের আভার জন্য মেশানো হত
​অগুরু,​কুঙ্কুম বা জাফরান,​কস্তুরী।এর সাথে ঠোঁট এ দিত লাক্ষা বা রংগিন ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি লিপবাম।
চুলে তেল দেওয়া এখনো বাকি।তবে যে কোনো তেল চুলে কেনো অভিজাত নারী হয়ে দেবে?
চুলের জন্য ব্যবহার হতো তিল তেল বা নারিকেল তেল।চুল লম্বা,চকচকে ও সুগন্ধময় করতে জুঁই,জবা ও স্থানীয় বুনো ফুল ও নানান শিকড় যেমন ভৃংগরাজ,নিম পাতা ভিজিয়ে রেখে সেই তেল চুলে ব্যবহার করতো।
এখন চুল পরিপাটি করে বেধে মাথায় ফুল দিয়ে সকালের রূপচর্চার শেষ করে কুন্তলা।
দুপুরে স্নানের সময় চলে আসে।সবচাইতে কাছের দুই দাসী আসে তেল নিয়ে।
প্রাচীন ভারতের রূপচর্চায় বিশ্বাস ছিলো, কেবল চামড়ার ওপরের স্তরে প্রসাধন মাখলে স্থায়ী সৌন্দর্য মেলে না। ভেতরের পুষ্টির জন্য নিয়মিত তেল মালিশ বা 'অভ্যঙ্গ' অত্যন্ত জরুরি।
এই অভ্যঙ্গ বা তেল মালিশের জন্য ছিলো বিশেষ বিশেষ তেল।যেমন দুপুরে স্নানের আগে কুমকুমাদি তেল।এই কুমকুমাদি তেলের প্রাচীন ফর্মুলায় মূলত প্রায় ১৬টি বা তার বেশি মূল ভেষজ উপাদান, তিল তেল এবং দুধের এক নিখুঁত সংমিশ্রণ ব্যবহার করার কথা আছে।
কারো যদি আগ্রহ হয় জানার জন্য,তাই এই তেলের প্রধান উপাদান
​কুঙ্কুম বা জাফরান।এরপরে
​রক্তচন্দন ও শ্বেতচন্দন,​মঞ্জিষ্ঠা,​যষ্টিমধু,​পদ্মকেশর ও নীলকমল,
​খস,​লোধ্র,​পদমক বা পদ্মকাঠ,​লাক্ষা,
​নাগকেশর তিল তেলে মিশানো হত গরুর দুধে সাথে
​আয়ুর্বেদের 'তৈল পাক বিধি' অনুযায়ী এটা বানানো হত, যা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ।
তো এই কুমকুমাদি তেল সারা শরীরে মালিশের পর মাখা হতো কুন্তলার শরীরে উপটান।এই উপটানের প্রধান উপাদান হত ৩ টি,চন্দন বাটা,হলুদ ও অশোক ফুল।এবং ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তন হতো বাকি উপাদান।
​হেমন্ত ও শীতকাল:এ ঋতুতে ত্বকের রুক্ষতা দূর করতে বরইয়ের বীজ ,বাসক শিকড়,লোধ এবং সরিষার পেস্ট বা প্রলেপ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
ঠোঁট ফাটা রোধ করতে বেলের খোসা বা ভেষজ উপাদানের সাথে নারীর দুধ মিশিয়ে লাগানোর বিধান ছিল।
​বসন্তকাল:বসন্তে ত্বক সতেজ রাখতে দভ ঘাসের শিকড়, চন্দন, খস এবং চালের গুঁড়ো বা পেস্ট ব্যবহারের নিয়ম।
​গ্রীষ্মকাল: প্রচণ্ড গরমে ত্বক ও শরীর শীতল রাখতে পদ্মফুল,খস,দুর্বা ঘাস,যষ্টিমধু এবং চন্দন বাটার প্রলেপ লাগানোর নিয়ম।
​বর্ষাকাল: বর্ষার আর্দ্রতায় কালিয়াটক,তিল,খস, জটামাসী ও পদ্মকাকড় দিয়ে তৈরি উপটান ব্যবহারের নিয়ম।

এছাড়াও ব্যবহার হত তেতুল বা আমলকির পেস্ট মাঝে মধ্যে।ভিটামিন সি যুক্ত এখনের এক্সফলিয়েটর আর কি।
চুলে দেওয়া তেল পরিষ্কার করতে ব্যবহার হত শিকাকাই,রিঠা, আমলকী এবং সুগন্ধি মাটির গুঁড়ো পানিতে গুলে।এটা কাজ করতো শ্যাম্পুর মতো।
এরপর স্নান শেষে কুন্তলার চুল শুকানোর সময় দাসীরা নিয়ে আসতো ধোঁয়া দেওয়ার বিশেষ পাত্র।এতে থাকতো ধূপ,অগুরু,কর্পুরসহ বিভিন্ন সুগন্ধী।এতে চুল থেকে সবসময়ই আসতো সুঘ্রান।এবং শরীরে দেওয়া হত বিভিন্ন ফুল থেকে তৈরি সুগন্ধি।যেমন জেসমিন,গন্ধরাজ ইত্যাদি।
এছাড়া বিভিন্ন চর্মরোগের জন্য আয়ুর্বেদ অনুযায়ী আলাদা আলাদা প্রলেপ তো ছিলোই।যেমন--ব্রণ (যাকে 'যৌবন পীড়িকা' বলা হয়েছে) দূর করতে বালা,অতিক্সবা,এবং যষ্টিমধু দিয়ে তৈরি বিশেষ পেস্ট বা প্রলেপ ব্যবহারের নিদের্শ রয়েছে।
সাধারণত প্রাচীনকালে এই উষ্ণ ও গরম উপমহাদেশে সবাই দু'বার স্নান করতো।একবার মধ্য সকালে ১০ টার দিকে।একবার অন্ধকার হয়ে যাওয়ার পর।
অভিজাত ও বংশীয় নারীরা ২য় বার স্নানের সময় সুগন্ধি ফুল ভেজানো পানিতে শরীর ধুয়ে নিতেন।এরপর সুগন্ধি তেলে চুল পরিপাটি করে বেধে,আবারও অংগরাগ ও সুগন্ধি মেখে ঘুমাতেন।কুন্তলাও তার ব্যাতিক্রম না।
এভাবেই হতো তখনের অভিজাত নারীদের রূপচর্চা।প্রাচীন বলেই তাদের নোংরা ভাবার কোনো সুযোগ নেই।উলটো বেশিরভাগ প্রাচীন সভ্যতা এখনের চাইতে বেশি হাইজেনিক ছিলো।

সূত্র বা রেফারেন্স -চরক সংহিতা,সুশ্রুত সংহিতা, বাৎসায়নের কামসূত্র,অষ্টাঙ্গ হৃদয়ম এবং প্রাচীন তামিল সঙ্গম সাহিত্য থেকে।

No comments:

Post a Comment