Tuesday, October 20, 2026

জীবন নদীর কুল কিনারা নাই

 



গোলেনূর দাদীর সুপারি বাগানের মাথায় আজকাল মেঘ দু’দণ্ড আর জিরিয়ে নেয় না। বাইরবাড়ির সীমানা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ পাতার তেজপাতা গাছটাও রোদের ভারে নুইয়ে পড়ে না। এদিকে দোচালা টিনের চালে টুপটাপ নিহার পড়ার শব্দ মিশে যায় ভোরের আজানের সাথে।

ও দিদি, শেফালি পাতার রসটুকু খেয়ে নাও তাড়াতাড়ি……
সারাদিনে এই একটা সময় যখন ঠাকুমার ডাকে আমার সারা দিতে ইচ্ছা হয় না। এই সময়ে ঠাকুমাও খুব কঠোর। আমার সকল অনিচ্ছাকে অবহেলা করে নির্দ্বিধায় আমার হাতে ধরিয়ে দেয় পেতলের ছোট গ্লাসে শেফালি পাতার রস আর চিরতার রস। চোখ ভরা অভিমান আর নি:শ্বাস আটকে আমি শেষ করি সেই তিতকুটে রস। ফাঁকা গ্লাস ঠাকুমার হাতে পৌঁছে যেতেই আমি আবার ফিরে পাই আমার সেই ঠাকুমাকে, যে ঠাকুমা কারণে অকারণে আমার হাত ভরে দেয় আনন্দ আর আস্বাদে,
ও ঠাকুমা, কোথায় পেলে রাঘবসই? দাদু এনেছে?
দাদুর হাতেও ফাঁকা তিতকুটে রসের গ্লাস একটা,
গিন্নী, কাল সন্ধ্যায় সাহা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে রাঘবসইয়ের পাক দেখেই তোমার কথা মনে হল। খেয়ে দেখো তাড়াতাড়ি।
দাদু এমনই হুটহাট এটা ওটা এনে আমাকে চমকে দেয়। শহরে যাবার পর তা যেন আরও বেড়ে গেছে। কাল পালদাদুর জন্য ধুতি আনতে গিয়ে আমার জন্য সোনারঙের পাম্প সু নিয়ে এলো হুট করেই।
পাল দাদু খড়ের কাঠামোয় দোমাটি লাগিয়ে ফেলেছে আজ। শুকিয়ে গেলেই তাতে পড়বে রঙ। পালদাদু যতক্ষণ বাইরবাড়ির মন্দির আঙিনায় থাকে ততক্ষণ আমাকেও পাওয়া যায় ওখানে। পড়ে আসা দুপুর হোক কিংবা টিমটিমে ইলেকট্রিক বাতির ভর সন্ধ্যা হোক আমি মন্দির আঙিনাতেই পড়ে থাকি। গোলরিমের চশমা পড়া পালদাদুও সুযোগ পেলেই হাঁক দেয়,
মনি কই রে, এদিক আয় গণেশের শুরে কেমন ঢেউ দিয়েছি দেখে যা।
পালদাদুর বাড়িতে রেখে আসা নাতিন নাকি হুবহু আমার মতন দেখতে। তাই পালদাদু সেই নাতিনের ভাগে রাখা সব আদর আর আহ্লাদ আমাকে দিয়ে ফিরে যাবার সময় দু’হাত ভরে ঠাকুমার দেওয়া নাড়ু মোয়া নিয়ে যায় নাতিনের জন্য।
প্রতিমার গায়ে রঙ ধরিয়ে তবেই পাল দাদু ফিরবে। তাই খানিক সময় পরপরই পালদাদু পরখ করে দেখে দোমাটির জল টানল কিনা।তবে পালদাদু যতই ফেরার জন্য তাড়াহুড়ো করুক না কেন ঠাকুমা কিন্তু তাতে সুর মেলায় না,
দাদা, বছরে মাত্র একবার এলে ক’দিন একটু জিরিয়ে নিতে হয়।
পালদাদুকে যতই জিরোতে বলুক ঠাকুমা নিজে কিন্তু ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে এই সময়গুলোতে। ব্যস্ত না হয়ে উপায় আছে? পালদাদু যে ঠাকুমার দেশের মানুষ। ঠাকুমার বাড়ি নাকি ছিল পালদাদুর পাড়াতেই। তাই তো পালদাদু এলেই প্রতি সন্ধ্যায় বড় ঘরের লালমেঝেয় চায়ের আড্ডা গল্প জমে ওঠে ঠাকুমার বাড়ির পাশে লালদিঘীর গল্প, আবার কখনো বটতলার কালীবাড়ির গল্প নিয়ে।
সেসব গল্পে ঠাকুমার মুখে কখনও হাসি ছড়িয়ে পড়ে তো কখনও হাসি ফুরিয়ে যায়। ঠাকুমা বারবার জেনে নিতে চায় কেমন আছে নিজের বাড়ি, নিজের পাড়া। মধু আর চিনি দাদু ওপারে চলে যাবার পর ঠাকুমার আর কোনোদিন নিজের বাড়িতে ফেরা হয়নি। আর ওপারে যেখানে ঠাকুমার ভাইদের বাড়ি এখন সেখানে যাবার জন্য যে বই দরকার তাও নাকি তো ঠাকুমার নেই।
সে কোন বই, কেমন বই? নিজের মানুষদের কাছে যেতে বই কেন লাগবে? আমার এসব প্রশ্নের জবাবে ঠাকুমা শুধুই নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে আমার মুখের দিকে। সেই চোখটা অবশ্য আমার কাছে কেমন যেন অচেনা লাগে।
তবে সেই অচেনা সময় কয়েক মুহূর্তের জন্য।
ও ঠাকুমা…….
আমার এই ডাকেই ঠাকুমা সব ফেলে আমার কাছে চলে আসে।
আজও তাই হল। দুপুরের পাত উঠে গেলেও ঠাকুমার অবসর নেই। নেই ভাতঘুমের ফুরসত। ব্যতিব্যস্ত ঠাকুমাকে আমি বারবার ডেকে নিজের আবদার জানাই,
ও ঠাকুমা, আইনুল চাচা কবে আসবে ঢ্যাপ নিয়ে? কাল তো ঠাকুরের গায়ে রঙ পড়লেই পূজা চলে আসবে।
কিংবা
ও ঠাকুমা, ক’জোড়া নারকেলের নাড়ু বানাবে এবার?
আমার এসব এলেবেলে প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই ঠাকুমা জলে ভেজায় লাল চিড়া। উঠোনের খোলা উনুনে আঁচ পড়ে গেছে এরই মধ্যে।মনিপিসি লাল বারান্দায় কলাপাতায় কুরিয়ে নিচ্ছে নারিকেল।
খোলা উনুনে পেতলের খাবরি উঠলো। তাতে মাটির হাঁড়ি থেকে পড়লো অনেকটা ঝোলা গুড়।
ও ঠাকুমা, এতগুলো চিড়া ভেজালে কেন? কে খাবে দুধচিড়া এই অবেলায়?
আমার পাকা পাকা কথায় ঠাকুমা হেসে উঠলো,
ও দিদি, দুধচিড়া না পুলি হবে চিড়ার।
এর আগে আমি কখনও দেখিনি ঠাকুমাকে চিড়ার পুলি বানাতে। তবে আমাকে কিছু না বলতে দিয়ে ঠাকুমা আবার বলে উঠলো,
মায়ের হাতে এই পিঠা শেষ খেয়েছিলাম দিদি ওরা দেশ ছাড়ার আগে…..
ঠাকুমার শব্দগুলোর সাথে কি দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এলো? সেসব অবশ্য ভাবার ফুরসত আমার হল না। উনুনের গুড়ের কড়াইয়ের এবারে সাদা ভেজা ভেজা কুরানো নারকেল পড়লো।
উঠোনে এখন শেষ বেলার মিহি রোদ। সেই রোদে বাইরবাড়ির দেবদারু বাগানের ছায়া এসে পড়েছে বড় ঘরের চালে।
জলে ভেজানো লালচিড়া জল ছেঁকে তুলে নিলো ঠাকুমা। এরপর একটা পুরাতন সাদা পরিষ্কার ধুতির উপর চিড়েগুলো রেখে চিপে চিপে ঠাকুমা জল ঝড়িয়ে নিলো।
গুড় নারকেলের ছেইতে ঠাকুমা সাদা এলাচ গুঁড়ো আর কিশমিশ মিশিয়ে পেতলের খাবরি নামিয়ে নিলো উনুন থেকে।
এবার জল ঝরানো লালচিড়ায় ঠাকুমা খানিক ময়দা আর চালের গুঁড়ো মিশিয়ে একটা মণ্ড বানিয়ে নিলো। আর সেই মণ্ড থেকে বানাল অনেকগুলো লেচি।
বেলা ডুবে গেলো। ছায়াহীন উঠোনে এখন খোলা উনুনের ওম। মনিপিসি ধোয়া কাপড়ে সন্ধ্যাবাতি জ্বালাল তুলসীতলায়।
আর এরসাথেই জ্বলে উঠলো রান্নাঘরের বেড়ায় ঝুলানো টিমটিমে ইলেকট্রিক বাতিটা।
লেচিগুলোয় দ্রুতহাতে নারকেলের মণ্ড পুরে দিলো ঠাকুমা। উনুনে উঠলো ঘি মেশানো তেলের কড়াই। অল্প আঁচে তেল তেতে উঠতে সময় নিলো খানিক।
পালদাদু মন্দির আঙিনা থেকে বড়ঘরে গিয়ে উঠলো। কাঠের টেবিলে বেজে চলেছে দাদুর রেডিও। সন্ধ্যা আহ্নিক সেরে দাদুও এসে বসলো পালদাদুর সাথে।
কড়াইয়ে পড়লো লালচিড়ার পুলি। সন্ধ্যার আলগোছ বাতাসে ভেসে আসছে শেফালী ফুলের ঘ্রাণ। শুক্লাদের ঠাকুর ঘর থেকে ছুটে আসছে শঙ্খের শব্দ। ও বাড়ির জেঠি ঠাকুমা সন্ধ্যা পূজায় বসেছে।
চিড়ার পুলিগুলো লাল করে ভেজে নিলো ঠাকুমা। লাল বারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে বসেছে চা এর সসপ্যান।
বড় ঘরের মেঝেয় পড়লো পাটি। আজ সন্ধ্যার চায়ের আড্ডায় ঠাকুমার দেশের গল্প না এলেও সেই দেশের লালচিড়ার গল্প আসবে এ কথায় ও কথায়। সেই গল্পে ঠাকুমা কখনো ঝলমল করে উঠবে তো কখনও নিশ্চুপ।
আর সব ছাড়িয়ে কাঠের টেবিলে দাদুর নিশ্চল রেডিও গেয়ে চলবে,
জীবন নদীর কুল কিনারা নাই
সুখের তরী ডুবে গেছে...,
দুখের সাথি নাই রে
চোখের জলে নদী বইয়া যায়..

স্মৃতি ভদ্র

No comments:

Post a Comment