এরিস ছিল অশান্তির দেবী, হেরা ও জিউসের কন্যা। যেখানে যত রাগারাগি, মন কষাকষি, ঝগড়াঝাঁটি, দলাদলি, মামলাবাজি হয়েছে---ধরে নিতে হবে এরিস তাতে ইন্ধন যুগিয়েছে। এজন্য দেবতারাও তাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলত, কোনো পার্টিতে গ্যাদারিং এ ডাকতো না। ডাকলেই তো ঝগড়া বাধাবে, কূটনামি করে অশান্তির সৃষ্টি করবে।
কাহিনীর শুরু থেটিস ও পেলেউসের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিয়েতে সব দেবদেবী এমনকি নরদেবতাদেরও নিমন্ত্রণ করা হয়েছে---শুধু এরিস বাদে।
উপেক্ষিত এরিস রাগে ফুঁসে উঠে--- দাওয়াত দেয়নি তো কী হয়েছে, আমি এমনি এমনি যাব! কিন্তু পার্টি ভেনুতে পৌঁছে ভিতরে ঢুকতে পারে না, হার্মিস তাকে বাঁধা দেয়। ফলে ক্ষিপ্ত অপমানিত এরিস অতিথিদের উদ্দেশ্যে এক সোনার আপেল ছুড়ে দিয়ে ফিরে আসে--- আপেলের গায়ে লেখা ছিল “সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরীর জন্য”।
এ নিয়ে সব দেবীদের মধ্যে একটা হুড়াহুড়ি কাড়াকাড়ি পড়ে যায়, প্রত্যেকে দাবী করে যে আপেলের মালিক সে। হুলুস্থুল, হৈচৈ--- দেবতারাও অমৃতপাত্রে চুমুক দিতে দিতে মজা উপভোগ করছিল--- যাক, একটা নতুন কিছু তো হল, নাহলে এসব বিয়ের অনুষ্ঠান মহা বোরিং হয়! উত্তেজনা কমে এলে অন্যান্য দেবীরা রণে ভঙ্গ দিলেও হেরা, এথিনা ও আফ্রোদাইতি মাটি কামড়ে পড়ে রইল। কেউ নিজের দাবী একচুল ছেড়ে দিতে রাজি না। পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠছে, বিয়েবাড়ির আনন্দ উবে গিয়ে একটা চুলাচুলি হবার উপক্রম হতেই জিউসকে ডেকে এনে এর মীমাংসা করতে বলা হয়। বেচারা জিউস আনন্দ ফুর্তিতে মগ্ন ছিল, হঠাৎ করে বিউটি কন্টেস্টের জাজ হয়ে মনে মনে প্রমাদ গোণে। প্রতিযোগীর মধ্যে একজন তার স্ত্রী ও একজন মেয়ে। হেরা দেবী আবার সৎ মেয়ে এথিনাকে দুচোখে দেখতে পারে না। সেজন্য দুজনের একজনকে বিজয়ী ঘোষণা করলে অপরজন যে তার কী হাল করবে ভাবতেই জিউসের চুল খাড়া হয়ে গেল। আবার এ দুজনকে বাদ দিয়ে আফ্রোদাইতিকে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা ঘোষণা করলে বাকি দুজন যে একজোট হয়ে তার উপর হামলা করবে না, তাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কী গেরো রে বাবা!
তবে জিউসকে এমনি এমনি তো আর দেবরাজ বলা হয় না। নিজেকে বাঁচাতে সে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বিচারের দায়িত্ব নিজের ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে প্রিন্স প্যারিসকে তলব পাঠায়। প্যারিস করুক সুন্দরীদের বিচার। আফটার অল, 'সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দর' হিসাবে এ ছেলেটার খ্যাতি আছে। সে সুন্দর বুঝবে না তো কে বুঝবে?
প্যারিস ছিল ট্রয়ের যুবরাজ। দেবতার দূত হার্মিস তাকে সাথে করে নিয়ে আসতে জিউস তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়। স্বয়ং জিউস তাকে ডেকে পাঠিয়েছে, এতবড় একটা দায়িত্ব অর্পণ করেছে--- গর্বে এক প্যারিস ফুলে দশ প্যারিস হয়ে গেল। প্যারিস এত সহজে রাজি হওয়ায় জিউসও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।
অতঃপর প্যারিস তিন সুন্দরীদের দিকে এগিয়ে যায়, এক একজনের চারিদিকে ঘুরে ঘুরে 'ইন্সপেকশান' করে। হেরাদেবীর কাছে আসতে সে ফিসফিসিয়ে বলে
--- শোন প্যারিস, আমাকে বিজয়ী ঘোষণা কর, আমি তোমাকে পুরা এশিয়া আর ইউরোপের কর্ণধার বানিয়ে দেব।
যুদ্ধদেবী এথিনার কাছে যেতে সে বলে
--- প্যারিস, যুদ্ধে নাম করতে চাও? আমাকে আপেলটা পাইয়ে দাও, আমি তোমাকে প্রতিটা যুদ্ধে জয়ী বানিয়ে দেব।
সবশেষে আফ্রোদাইতির কাছে গেলে সে কটাক্ষ হেনে বলে
--- প্যারিস ডার্লিং, তোমার পুরস্কার হবে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী রমণী। তুমি শুধু আমাকে জিতিয়ে দাও।
দেখা যাচ্ছে দেবতারাও ঘুষ টুস দিতে ওস্তাদ ছিল!
তো প্যারিস কাকে জিতিয়ে দিল?
এর উত্তর দেবার প্রয়োজন আছে কি? অবশ্যই আফ্রোদাইতিকে। সুন্দরী রমণীর কাছে রাজ্যপাট, যুদ্ধ বিগ্রহ সব তুচ্ছ। হেরা ও এথিনার অগ্নিদৃষ্টির সামনে আফ্রোদাইতির হাতে সোনার আপেল তুলে দিয়ে তাকে মিস ইউনিভার্স ঘোষণা করা হল।
আফ্রোদাইতি কিন্তু তার কথা রেখেছিল। প্যারিসকে পাইয়ে দেয় পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী রমণী--- হেলেন অফ স্পারটা। হেলেন অবশ্য স্পারটার রাজা মেনেলাসের স্ত্রী কিন্তু তাতে কী! প্রিন্স প্যারিস হেলেনকে ভাগিয়ে নিয়ে গেলে একে একে নিচের ব্যাপারগুলি ঘটে---
১। বউ হারিয়ে খেপচুরিয়াস মেনেলাস ভাই আগামেমননের কাছে গিয়ে কেঁদে পড়তে দুজনে অনুসারীদের জড়ো করে ট্রোজানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
২। হেরা ও এথিনা তাদের পক্ষ নেয়। কারণ সহজেই অনুমেয়। Hell hath no fury like a woman scorned!
৩। ট্রোজানদের পক্ষে থাকে আফ্রোদাইতি।
৪। যুদ্ধদেবতা এরেস প্রথমে মা হেরাকে কথা দিয়েছিল যে সে গ্রিকদের পক্ষ হয়ে লড়বে। কিন্তু এজ ইউজুয়াল, সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। আফ্রোদাইতির রূপের মোহে অচিরেই পালটি খেয়ে সে দল বদলাল।
৫। দশ বছর ধরে যুদ্ধ চলল।
৬। ট্রয় রাজ্য ধ্বংস হয়ে গেল।
৭। বেচারা প্যারিস পৈতৃক প্রাণটা হারায়। হেলেনকেও হারাল।মানে আম ছালা দুটাই গেল!
৮। সবশেষে হেলেন আর মেনেলাসের মিলমিশ হয়ে গেল। তাদের একটা মেয়েও হল।
বাপ রে বাপ!
Tabassum Naz
No comments:
Post a Comment