Wednesday, August 26, 2026

প্রবাসে দাওয়াত, সামাজিকতা এবং কিছু কথা…

 



আমরা যারা দেশের বাইরে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন থেকে দূরে থাকি, তাদের জন্য অন্য প্রবাসীরাই অনেকটা পরিবারের মতো।

❤️
বিদেশে এসে একা থাকাও কঠিন। আবার একটা বড় সামাজিক গ্রুপের মধ্যে থাকলেও দাওয়াতের রাজনীতি, সামাজিকতা আর সম্পর্কের সমীকরণ কখনো কখনো বিরাট এক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের অনেক সমস্যার শুরুই কিন্তু এই দাওয়াত দেওয়া-নেওয়াকে কেন্দ্র করে। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।
ব্যক্তিগতভাবে কোনো দাওয়াত বা অনুষ্ঠানে গিয়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, হাসি-আড্ডা, গল্প করা, সারা সপ্তাহের ব্যস্ততার পর একটু সময় কাটানো, এসব আমি বেশ উপভোগ করি। নিজের বাসায় হোক কিংবা অন্য কারও বাসায়, মানুষজনের সঙ্গে সময় কাটাতে আমার ভালোই লাগে। যদিও উইকএন্ডে একটা দাওয়াত বা অনুষ্ঠান থাকলে তার সঙ্গে আরও অনেক কিছুর ওপর চাপ পড়ে যায়।
যেমন, উইকএন্ডে আমার বাচ্চারা বাসায় থাকে। আমরা কোনো দাওয়াত বা কালচারাল প্রোগ্রামে গেলে তাদের 'সময়' দেওয়া হয় না। আবার সব জায়গায় তারাও আমাদের সঙ্গে যেতে চায় না। এর ওপর বাজার-সদাই, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, সংসারের কাজ তো আছেই। কখনো বাচ্চাদের বন্ধুরা বাসায় আসে স্কুলের প্রজেক্ট করতে, তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। আবার কখনো সখনো উইকডেতেও দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন এলে কয়েকদিন stay করে, তাদের মেহমানদারি করতে হয়।
এর ওপর অফিসের কাজের চাপ তো আছেই। মাঝে মাঝে কাজের প্রেসার বেশি থাকলে বাসায় এসেও আবার লগইন করে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়।
এছাড়া প্রতিদিনের রান্না, ঘর পরিষ্কার করা, গুছিয়ে রাখা, এসব তো আছেই। সেগুলোর কথা আলাদা করে বললাম না, কারণ এগুলো কমবেশি সবাইকেই করতে হয়। আর সেক্ষেত্রে, কারও ব্যস্ততাই কিন্তু আমার চেয়ে কম নয়।
বিশেষ করে যারা মহিলা উদ্যোক্তারা আছেন, তাদের দেখলে আমি সত্যিই অবাক হই। তারা কীভাবে এত কিছু সামলান, আমি ভেবে পাই না! কাজ, পরিবার, সংসার, সামাজিকতা, সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়।
এত কিছুর পর বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে একটু আনন্দ করতে গিয়ে যদি কোনো কারণে সেই আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক।
তাই কোথাও গেলে আমি নিজে খুব সচেতন থাকার চেষ্টা করি। এমন কোনো কথা বা আচরণ যেন না করি, যাতে অন্য কেউ অস্বস্তি বা কষ্ট পান।
যদিও মাঝে মাঝে দেখি, কেউ কেউ এসব ব্যাপারে বেশ অসচেতন।
কে কী পরল, কী করল, কী করল না, কে কী দিল, কে দিল না, কে কার বাসায় গেল, কে গেল না, কে ছবি দিল, কে দিল না, কে খেলো, কে বাদ পড়ল, কে বাদ দিল… বিবিধ পরচর্চা!
কেউ কেউ যেন দুষ্টু ননদ-জা আর শাশুড়ির ভূমিকায় স্থায়ীভাবে আসীন। 🥲 আর অনেক পুরুষও এই ‘কুটনা’ ভূমিকাটা বেশ মনোযোগের সঙ্গে পালন করছেন! 😉
সব মিলিয়ে এসবের একটা মানসিক প্রভাব আছে। শুধু দাওয়াতের সময়টুকু নয়, এর প্রভাব অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্কেও পড়ে।
কখনো কোনো বাসায় দাওয়াতে গিয়ে দেখি, প্রচুর খাবার-দাবার, কত যত্ন করে রান্না করা হয়েছে, অথচ সেই খাবার খেয়ে আরাম করে বসার জায়গা পর্যন্ত নেই! এত মানুষ, AC থাকা সত্বেও গরমে সবাই ঘেমে একাকার।
একটা বাসার তো একটা নির্দিষ্ট স্পেস আছে। তার ওপর আছে গ্রুপ ম্যাচিং, সম্পর্কের সমীকরণ। তারপরও আয়োজক কাউকে বাদ দিতে চান না। কারণ কোনো বন্ধুকে দাওয়াত না দিলে হয়তো সে মনে কষ্ট পাবে। তাই সবার মন রাখতে গিয়ে অনেকেই নিজের ওপর বাড়তি চাপ নেন। এসব দেশে Helping hand-এর সুবিধাও তো অল্প কয়েকজনেরই আছে।
এই সবকিছুর ভিড়ে আমরা কেউ কেউ কখনো সখনো একটু Break নেয়ার চেষ্টা করি। যেখানে না গেলেই নয়, শুধু সেখানেই যাই। সবকিছু সবসময় manage করা সম্ভব হয় না। কিছু জায়গায় হয়তো ‘না’ বলতে হয়, কিছু জায়গা থেকে হয়তো একটু পিছিয়েও আসতে হয়।
ভালো লাগে যখন আমাদের কিছু বন্ধুকে দেখি, তারা আবার সবকিছু কী সুন্দরভাবে ম্যানেজ করে! সম্পর্কের সমীকরণ গুলো বাঁচিয়ে রেখে পথ চলে। সত্যি বলতে, তাদের দেখে আমি অবাক হই। তাদের বাহবা দিই।
আমি জানি না তারা কীভাবে এত কিছু সামলায়! নিশ্চয়ই তারা আমার চেয়ে অনেক চটপটে, কাজকর্মে অনেক ফাস্ট এবং টাইম ম্যানেজমেন্টেও অনেক বেশি পারদর্শী।
আমার এক বন্ধু আছে, প্রায় সব দাওয়াতেই তাকে কমন হিসেবে দেখা যায়। প্রতি উইকএন্ডে, কখনো শুক্রবারে, এমনকি কোনো কোনো উইকএন্ডে তাকে দুটো দাওয়াতেও (দুপুর এবং রাত্রি) দেখা যায় (FB post এ)। আমি মাঝে মাঝে সত্যিই অবাক হয়ে ভাবি, ও কীভাবে এত দাওয়াত ম্যানেজ করে! তার ওপর আবার ফুলটাইম জবও করে।
একদিন কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কীভাবে এত কিছু ম্যানেজ করো?”
ওর উত্তর শুনে আমি খানিকটা পাজলড হয়ে গেলাম।
বলল, "কিছুই ম্যানেজ হয় না!”
ঘরের কাজ পড়ে থাকে। বাসা সবসময় গুছানো থাকে না। প্রায়ই উইকএন্ডে টেকআউট নিতে হয়। এমনকি ওর নাকি বাচ্চার রেজাল্টও খারাপ হয়েছে। কাউকে বলেনি। আরও বলল, আমি যেন ফেসবুকে ওর একের পর এক দাওয়াত, ঘোরাঘুরি আর পার্টির ছবি দেখে খুব অবাক না হই। হঠাৎ একদিন ওর বাসায় গিয়ে হাজির হলে নাকি আসল চিত্রটা বোঝা যাবে! শুনে একটু সহানুভূতিই হলো।
বললাম, “তাহলে এত কিছুর পরও সব জায়গায় যাওয়ার দরকারটা কী? তোমরা তো কোনো নেতা-নেত্রী নও, সমাজসেবীও নও! এত কষ্ট করে সব জায়গায় না গেলেই তো হয়!”
তারপর একটু যোগ করে বললাম, "Unless তুমি ফেসবুকে বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়স্বজনকে দেখাতে চাও যে তোমার একটা gorgeous, colourful and shiny life আছে!” সেটা আলাদা ব্যাপার। তা না হলে কেন এই কষ্টটা স্বীকার করছ?
অবশ্য তোমার যদি এই লাইফস্টাইলই ভালো লাগে, দাওয়াত, আড্ডা, ঘোরাঘুরি, ফান-ফুর্তি ছাড়া ভালো না লাগে, সেটা ভিন্ন কথা। কারণ জীবনে যা করতে ভালো লাগে, তাতে যদি অন্য কারও কোনো ক্ষতি না হয়, তাহলে অবশ্যই নিজের ভালো লাগাটাকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কিন্তু ওর পরের কথাটা শুনে আমি আরও একটু কনফিউজড হলাম।
বলল, ফেসবুকে বিভিন্ন দাওয়াতে অংশ নেওয়ার ছবি দিতে তার ভালো লাগে, সেটা একটা ব্যাপার। কিন্তু আরেকটা বড় কারণ হলো, কোনো একটা দাওয়াতে না গেলে তার অন্য বন্ধুরা ভাববে, তাকে হয়তো দাওয়াতই দেওয়া হয়নি। আর সেটা নাকি খুব লজ্জার ব্যাপার! একই ধরণের কথা আমি আরো দু-এক জন বন্ধুর কাছেও শুনেছি।
আমি সত্যিই বুঝলাম না, একটা দাওয়াতে সবাইকে দাওয়াত করতেই হবে কেন? আর দাওয়াত না পাওয়াটা কেনো লজ্জার ব্যাপার হবে?
সবাইকে সব জায়গায় ডাকতে হবে, সবাইকে সব জায়গায় যেতে হবে, সবাইকে সবকিছুর অংশ হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম তো নেই।
কেউ হয়তো আপনাকে ডাকেনি। তার মানে এই নয় যে সে আপনাকে অপছন্দ করে।
আবার আপনি কাউকে ডাকতে পারেননি। তার মানে এই নয় যে সম্পর্ক শেষ।
(আমার বন্ধুর নাম-ধাম গোপন রেখেই, অবশ্যই ওর অনুমতি নিয়ে কথাগুলো শেয়ার করলাম। ও নিজেও জানতে চায়, ওর মতো করে আরও কেউ ভাবে কি না!)
আমার মনে হয়, প্রবাসের জীবন এমনিতেই অনেক ব্যস্ত। অনেক কিছু সামলাতে হয়। তার মধ্যে সম্পর্কগুলোকে যদি আমরা একটু সহজভাবে নিতে পারি, তাহলে জীবনটাও অনেক সহজ হয়।
সবাইকে সব জায়গায় পাওয়া যাবে না। সবাই সব দাওয়াতে যেতে পারবে না। কেউ হয়তো ডাকতে পারবে না, কেউ হয়তো যেতে চাইবে না। এটাই স্বাভাবিক।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, জীবনটা আসলে কতটা জটিল করব, সেই সিদ্ধান্তটাও আমাদের নিজেদের।
দাওয়াত থাকুক, আড্ডা থাকুক, ছবি থাকুক, আনন্দ থাকুক।
কিন্তু তার সঙ্গে একটু স্বস্তিও থাকুক।

❤️Mily Islam



No comments:

Post a Comment