বিজ্ঞানের সাম্প্রতিকতম গবেষণা বলছে আমাদের অন্ত্রে বাস করা কয়েক ট্রিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া — Microbiome — আমাদের মস্তিষ্ক ও অনুভূতিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। আমাদের পেটের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক সব মিলিয়ে প্রায় ৩৮ ট্রিলিয়ন অণুজীব বাস করে। এদের সামগ্রিক নাম মাইক্রোবাইম। এরা আপনার শত্রু নয়, বরং আপনার দেহের বাসিন্দা। ভাড়াটে নয়, অংশীদার। মজার তথ্য হলো আপনার শরীরে যত কোষ আছে, তার সমসংখ্যক এই অণুজীব আছে। আমাদের আনন্দের হরমোন সেরোটোনিনের ৯৫ শতাংশ তৈরি হয় এই অন্ত্রে। অর্থাৎ, আমি কী ভাবছি বা কেমন বোধ করছি, তা অনেকটা নির্ভর করে আমার পেটের ভেতরের সেই অদৃশ্য অনুজীবদের মর্জির ওপর।
ভাবুন একবার। আপনার মন খারাপ। আপনি ভাবছেন কারণটা হয়তো অফিস, সম্পর্ক, একাকীত্ব। কিন্তু হয়তো কারণটা আরো গভীরে। আপনার অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বদলে গেছে। তারা আর সেই রাসায়নিক সংকেত তৈরি করছে না, যা স্নায়ুর পথে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে। আপনি জানেনও না। শুধু বোধ করছেন একটা ভাষাহীন ভার।
এই অন্ত্র আর মস্তিষ্কের সংযোগকে বিজ্ঞানীরা বলছেন Gut-Brain Axis। আর এই অক্ষটি কেবল রাসায়নিক নয়, স্নায়বিকও। কলেজজীবনে ট্রেনে যাতায়াত করতাম, এক হকার হজমি গুলি বিক্রির সময় বলতেন — পেট ভালো যার, মন ভালো তার। আমরা ফ্রি হজমি গুলি খেয়ে হাসতাম। এখন বিজ্ঞান বলছে, লোকটা ঠিকই বলেছিলেন। Vagus Nerve — শরীরের দীর্ঘতম স্নায়ু — সরাসরি অন্ত্র থেকে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। অর্থাৎ পেট থেকে মাথায় একটা সরাসরি তার টানা আছে। এবং সেই তারে কী বার্তা যাচ্ছে, তা নির্ভর করছে আপনার পেটের ভেতরের সেই অদৃশ্য জগতের ওপর।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ যখন একসাথে বসে একই থালায় খাবার ভাগ করে খেত, তখন শুধু পুষ্টি নয়, বিনিময় হতো অন্যের শরীরের ব্যাকটেরিয়াগুলোও। এটাকে বলা যায় জৈবিক গণতন্ত্র।
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস আসলে একসাথে খাওয়ার ইতিহাস। নবজাতকের নামকরণ উপলক্ষে পাড়ার লোককে খাওয়ায় মানুষ । বিয়েতে ভোজ না হলে তো বিয়েই হয় না। এমনকি শ্রাদ্ধের দিনেও পাত পড়ে — যেন মৃত্যুর শোককেও হজম করতে হয় একসাথে বসে। দুর্গা পুজো, ঈদ, বড়দিন, বাদনা পরব — প্রতিটি উৎসবের কেন্দ্রে একটাই দৃশ্য: মানুষ গোল হয়ে বসে খাচ্ছে।
এটা কি কেবল সংস্কৃতি? নাকি শরীরের কোনো গভীর প্রয়োজন?
Oxford-এর বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী Robin Dunbar একটাই প্রশ্ন নিয়ে বছরের পর বছর ঘুরেছেন — মানুষ একসাথে খায় কেন? শুধু পেট ভরাতে? ২০১৭ সালে হাজারো মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি দেখালেন, যারা নিয়মিত অন্যদের সঙ্গে বসে খায় তারা বেশি সুখী, জীবনে বেশি সন্তুষ্ট, এবং বিপদে পাশে থাকার মতো বন্ধু তাদের বেশি। Dunbar-এর সিদ্ধান্ত ছিল, একসাথে খাওয়া আসলে মানুষের সামাজিক বন্ধন তৈরির একটি বিবর্তনীয় পদ্ধতি হিসেবে গড়ে উঠেছে। কেবল খাদ্যগুণের কারণে নয়। একসাথে খাওয়ার সময় শরীরে Oxytocin ক্ষরণ হয় — যে হরমোনকে বলা হয় বন্ধনের হরমোন। একই থালায় হাত পড়লে শরীর বুঝে নেয়, এরা আমার দল।
আর মাইক্রোবাইমের দিক থেকে দেখলে ছবিটা আরো রহস্যময়। একই ধরনের খাবার ধীরে ধীরে তাদের অন্ত্রের জগতের মধ্যে কিছু মিল তৈরি করে, তখন তাদের চিন্তার ধরন, বিপদের প্রতি প্রতিক্রিয়া, এমনকি আবেগের বহিঃপ্রকাশেও এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য তৈরি হয়। প্রাচীন গোষ্ঠীর সেই দৃঢ় আনুগত্যের গোপন কারিগর ছিল হয়তো তাদের অভিন্ন খাদ্যাভ্যাস। একসাথে খাওয়া মানে একটি সামষ্টিক জৈবিক মন তৈরি করা।
এই কারণেই মানুষ ছোটে।
বিয়েবাড়িতে খাওয়া না হলে মন ভরে না। ঈদের সেমাই পাড়ার সবাই মিলে না খেলে স্বাদ লাগে না, যদিও রেসিপি একই। শ্রাদ্ধের ভাত খেতে দূর থেকে আসা মানুষ — তারা আসলে জানে না কেন আসছে। আসলে শরীর টানছে ভেতর থেকে।
এই টানটা শুধু সংস্কৃতি নয়। এটা বিবর্তন।
লক্ষ বছর ধরে যে মানুষ দল বেঁধে খেয়েছে, সে বেঁচেছে। একা একা খাওয়া মানুষ দুর্বল হয়েছে — শুধু পুষ্টিতে নয়, Microbiome-এ, Oxytocin-এ, সামষ্টিক বন্ধনে। সেই স্মৃতি আজও শরীরে উপস্থিত আছে বলেই ভোজের টেবিল দেখলে পেটের ভূত জেগে ওঠে।
নৃতত্ত্ববিদ Marshall Sahlins দেখিয়েছেন, শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে খাবার ছিল সামষ্টিক। কেউ একা খেত না। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজ এলো, জমি এলো, পরিবার এলো, ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তি হলো, বাড়ি ঘিরে বেড়া উঠলো — মানুষ প্রথমবার আলাদা উঠোনে বসে আলাদা হাঁড়িতে রান্না করতে শুরু করল। সেই প্রথম জন্ম নিল বিচ্ছিন্নতা।
ঠিক তখনই মন্দির এলো।
দেবতার ভোগ, প্রসাদ, লঙ্গরখানা, ইফতার মাহফিল, গুরুদ্বারের লঙ্গর — এগুলো ধর্মের আবিষ্কার নয়। এগুলো শরীরের পুরনো প্রয়োজনকে নতুন কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। দেবতা একটা অজুহাত। আসল কাজটা হলো হাজার মানুষের Microbiome এক জায়গায় মেলানো, Oxytocin ছাড়ানো, সামষ্টিক জৈবিক সুর ফেরানো। মানুষ যখন ছোট পরিবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, শুধু সম্পর্ক নয়, Microbiome-ও আলাদা হয়ে গেল। প্রতিটি উঠোনে আলাদা হাঁড়ি, আলাদা অণুজীব, আলাদা জৈবিক সুর। শরীর অনুভব করল একটা অভাব — যেটার নাম সে জানত না।
ধর্মীয় স্থানে বাৎসরিক মেলা সেই অভাব পূরণ করতে এলো। হাজার মানুষ একজায়গায় — একই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, একই রান্নায় হাত দিচ্ছে, গায়ে গা লাগিয়ে বসছে। Microbiome আবার মিলছে। সামষ্টিক জৈবিক সুর ফিরছে। শরীর চিনতে পারছে — এরা আমার দল। দেবতা সেখানে নিমিত্তমাত্র। আসল যজ্ঞটা অণুজীবের।
প্রথমত একসাথে বসে কথা বললে, হাসলে, শ্বাস নিলে — মুখের অণুজীব বাতাসে মেশে। পাশের মানুষ সেটা গ্রহণ করে। দ্বিতীয় দফায় স্পর্শের মাধ্যমে । হাত মেলানো, কোলাকুলি, একই জিনিষপত্র ধরাধরি করলে ত্বকের অণুজীব সরাসরি যায়। আর তৃতীয় উপায় একই খাবার ভাগ করে খাওয়া। একই রান্না, একই মশলা, একই জলের উৎস — পেটের ভেতরে একই ধরনের অণুজীব টিকে থাকার সুযোগ পায়। সরাসরি বিনিময় না হলেও ভেতরের জগৎ কাছাকাছি হয়। তিনটের মধ্যে তৃতীয়টা সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে কম রোমান্টিক। একসাথে না বসলেও, শুধু একই রান্নাঘরের খাবার খেলেই অনেকটা কাজ হয়।
WHO বলছে করোনার প্রথম বছরে বিশ্বজুড়ে বিষণ্নতা ও উদ্বেগ ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে দীর্ঘ একাকীত্বে Cortisol বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্যটা হলো — ঐ দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় Microbiome-এও আঘাত লেগেছিল। মানুষ একা খাচ্ছে, আলাদা রান্না করছে, স্পর্শ নেই, ভিড়ে হাঁটাহাঁটি নেই ফলে পেটের অণুজীবের বৈচিত্র্য কমে গেছে। বিজ্ঞানীরা অনেকে এটাকে বললেন Microbiome diversity loss।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো লকডাউন উঠে যাওয়ার পর মানুষ প্রথমে কী করেছিল। রেস্তোরাঁয় গেছে। আত্মীয়ের বাড়িতে গেছে। উৎসবে ছুটেছে। একসাথে খেতে চেয়েছে।
ভ্যাকসিন নয়, খাবারের টেবিল খুঁজেছিল আগে। শরীর জানত তার কী দরকার।
আধুনিক যুগে আমরা যখন আলাদা আলাদা প্যাকেজড ফুড বা বিচ্ছিন্ন ডায়েটে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি, তখন সেই সামষ্টিক জৈবিক সুরটি কেটে যাচ্ছে। একই ছাদের তলায় থেকেও আমাদের ভেতরের ব্যাকটেরিয়াল ভূতগুলো এখন আলাদা আলাদা ভাষায় কথা বলছে।
পরিবারের চারজন চারটি ডায়েটে। একজন হোস্টেলে, একজন ভিনদেশে কাজে গেছে, একজন Intermittent Fasting, একজন Vegan। ফলে পেটের ভেতরের জগৎ আলাদা। সেরোটোনিনের মাত্রা আলাদা। প্রতিক্রিয়ার ধরন আলাদা। একই ঘরে বাস করেও তারা ক্রমশ আলাদা জৈবিক সত্তা হয়ে উঠছে।
এই বিচ্ছিন্নতা কোনো পারফিউম বা দামী উপহার দিয়ে ভরাট করা সম্ভব নয়। কারণ শূন্যতাটা সম্পর্কের নয়, শরীরের ভেতরের।
তাহলে কি উত্তর হলো একসাথে খাওয়া?
এত সহজ নয়। কারণ শুধু একসাথে বসলেই হয় না। প্রত্যেকে ফোনে মুখ গুঁজে একসাথে বসে থাকলে Oxytocin ক্ষরণ হয় না, Microbiome বিনিময় হয় না। শরীর একে অপরকে স্পর্শ করে না।
যে উৎসবে মানুষ সত্যিকারের হাসে, চোখে চোখ রাখে, একই পাত্রে হাত দেয় — কেবল সেখানেই পেটের ভূত জেগে ওঠে। সে ভূত প্রাচীন। সে জানে তার কী দরকার।
আমাদের DNA যেমন পূর্বপুরুষের ভয় বহন করে, তেমনি আমাদের Microbiome বহন করে পূর্বপুরুষের সংযোগের স্মৃতি। একটা ভূত আমাদের সতর্ক রাখে, আরেকটা ভূত আমাদের একসাথে রাখতে চায়।
No comments:
Post a Comment